সংবিধানের সামরিক শাসন স্বীকৃত করতে চেয়েছিলেন এরশাদ

সংবিধানের সামরিক শাসন স্বীকৃত করতে চেয়েছিলেন এরশাদ

:: আতাউস সামাদ ::

“… তবে জেনারেল এরশাদ যখন রাস্তায় মেশিনগান বসিয়ে (যেমন বঙ্গভবনের কাছে, মতিঝিলে) রাতের অন্ধকারে ক্ষমতা দখল করে সামরিক শাসন জারি করেন (লক্ষণীয় যে সামরিক শাসনের ফরমান জারি হয় রাত দেড়টা/দুটোর দিকে বার্তাসংস্থার মাধ্যমে আর রাষ্ট্রপতি আব্দুস সাত্তার পদত্যাগকরার কথা রেডিওতে ঘােষণা করেন পরদিন বেলা এগারটায়) তখন তিনি রাজনৈতিক দলগুলাের পক্ষ থেকে কোন বাধা পাননি। বস্তুতঃপক্ষে আওয়ামীলীগের কোন কোন নেতা বিএনপি’র শাসন শেষ হয়েছে বলে স্বস্তির নিঃশ্বাস ফেলেন আর বিএনপি’র একাংশ যে গােপনে জেনারেল এরশাদের সাথে ষড়যন্ত্র করেছিল তা প্রকাশ পেয়ে যায় যখন এরা বিএনপি বিভক্ত করে এরশাদের সরকারে যােগ দেন। আওয়ামী লীগের কেউ কেউ যে এরশাদের আগমনে খুশি হয়েছিলেন সেই কথা Overseas Correspondents Association, Bangladesh (OCAB)-এর সাথে এক সাক্ষাতকারে শেখ হাসিনা নিজেই বলেছিলেন। তিনি বলেন যে, বিএনপি’র শাসনামলে আওয়ামী লীগের সদস্যদের ওপর খুব অত্যাচার হচ্ছিল বলে ওই দলটি ক্ষমতা থেকে অপসারিত হওয়ায় নিপীড়িত কেউ কেউ খুশি হয়েছিল। আবার বিএনপি থেকে দল ছুটরা সামরিক একনায়ক এরশাদের সাথে যােগ দেবার পর তাদেরই একজন, চোখের ডাক্তার আব্দুল মতিন, এক অনানুষ্ঠানিক আলােচনার সময় আমাকে বলেন, “আমরা যখন দেখলাম যে আওয়ামী লীগের লােকেরা প্রশাসন দখল করার উদ্যোগ নিচ্ছে তখন তারা যাতে এটা না করতে পারে সেজন্য তাদের আগেই আমরা সরকারে যােগ দিই?”

এরশাদ সাহেব যে ধরনের চাটুকার, স্বার্থান্বেষী, নীতিহীন ও ভােগবাদী সামরিক ও বেসামরিক লােকদের নিয়ে শাসনকর্ম চালাতেন তাদের সহায়তায় সংবিধানের সামরিক শাসন জারি করার ব্যবস্থা লিখিয়ে নেওয়া হয়তাে সম্ভব হতো কিন্তু ১৯৮২ সনের মাঝ থেকে আইনজীবীদের তরফ থেকে তাঁর হাইকোর্ট ভাঙ্গার পরিকল্পনার তীব্র বিরােধিতা, ওই বছরের শেষের দিকে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ছাত্ররা সামরিক শাসনের বিরুদ্ধে শ্লোগান দিলে বিশ্ববিদ্যালয়ের কলাভবনে পুলিশ ঢুকে ছাত্র ও শিক্ষকদের মারধাের করা এবং ১৯৮৩’র ফেব্রুয়ারী মাসে ছাত্র মিছিলে পুলিশে প্রচণ্ড গুলীবর্ষণ ও তারপর দিন ডঃ কামাল হােসেনের বাসা থেকে প্রায় ৪০ জন রাজনীতিবিদকে গ্রেপ্তার করার ফলে বেশীরভাগ রাজনৈতিক দল একযােগে সামরিক শাসনের অবসান ও এরশাদের পদত্যাগ দাবী করতে আরম্ভ করে। কখনাে আংশিক সাফল্য, কখনাে ব্যর্থতা আবার কিছুটা সাফল্য এরকম আঁকাবাঁকা পথে প্রায় নয়টি বছর রাজনৈতিক আন্দোলন চলেছে। বহু দ্বন্দ্ব, বহু দোদুল্যমানতা, বহু বিভ্রান্তির মধ্য দিয়েও প্রত্যেক বছরই কিছু না কিছু এরশাদবিরােধী আন্দোলন চলতে থাকার কারণেই বােধ হয় তিনি আর Politico-Military থিওরীটিকে সংবিধানে ঢােকাতে পারেননি।

তবে যে সমস্ত রাজনীতিবিদ জেনারেল এরশাদের সাথে হাত মিলিয়েছিলেন তাঁরা মন্ত্রীত্ব পেলেও কোন স্বস্তি বা সম্মান পাননি। মওদুদ আহমদ যখন শিল্প মন্ত্রণালয়ের দায়িত্বপ্রাপ্ত মন্ত্রী তখন তিনি আমার সামনেই টেলিফোনে তৎকালীন প্রধানমন্ত্রী মিজানুর রহমান চৌধুরীকে আশ্বস্ত করার চেষ্টা করছিলেন যে, তিনি জনাব চৌধুরীকে অপসারণ করে তাঁর গদী দখল করার চেষ্টা করছেন না। আহমেদ বললেন, “মিজান ভাই, আপনি বা আমি বা আমরা দুজনেই থাকব কি থাকব না তা আমাদের উপর নির্ভর করে না। আপনি তাে জানেনই সেটা কাদের উপর নির্ভর করে। আপাততঃ চলুন আপনি ও আমি যে একসাথে আছি সেটা বােঝাবার জন্য আমরা দুজনে একসাথে প্রেসিডেন্ট এরশাদের হাতে বন্যাত্রাণ তহবিলের জন্য একটা চেক তুলে দিই। উনিও দেখলেন, টেলিভিশনে লােকজনও দেখল।”

এছাড়াও জেনারেল এরশাদের সামরিক ও বেসামরিক সহযােগীদের মুখে কতবার “নাথিং সাকসিডস্ লাইক সাকসেস” কথাটা যে শুনেছি তাদের দালালীর যুক্তি হিসাবে তার ইয়ত্তা নেই।

অন্যদিকে তাঁর প্রতি সামরিক বাহিনীর সমর্থন অক্ষুন্ন রাখার জন্য জেনারেল এরশাদ তথাকথিত “পলিটিকো-মিলিটারী” থিওরী চালু করেন। এই চিন্তাধারার মূল কথাটি হচ্ছে সামরিক বাহিনীকে রাষ্ট্রের সব কাজে অংশ বা হিস্যা দিতে হবে। ১৯৭৯ সনে Bangladesh Army Journal-এর জানুয়ারী সংখ্যায় প্রকাশিত এক প্রবন্ধে তিনি লিখেছিলেন, “The British concept of keeping the military absolutely aloof has lost its significance today, because of particular reasons.”

সেই একই প্রবন্ধে তিনি প্রশ্ন করেছিলেন “By the same analogy, where military intervention in politics has been a failure, is it justified to confine a national army merely to the specialized function of defense in a developing country?”

মাঝে মাঝে যে মানুষকে সামরিক শাসনের বােঝা বওয়া মেনে নিতে হবে এই ধারণা দিয়ে তিনি আরাে লিখেছিলেন, “In fact with the evolution of democracy, the danger of military adventure and dictatorship is bound to decline. Till such time certain safeguards should be devised to prevent the army from misuse of power. The constitution should fix the permissible period of rule by martial law, so that when it has inevitably to be promulgated it may not be for periods at a stretch.” অর্থাৎ সংবিধানের সামরিক শাসন স্বীকৃত হােক তিনি তা চাইছিলেন।

এরশাদ সাহেব যে ধরনের চাটুকার, স্বার্থান্বেষী, নীতিহীন ও ভােগবাদী সামরিক ও বেসামরিক লােকদের নিয়ে শাসনকর্ম চালাতেন তাদের সহায়তায় সংবিধানের সামরিক শাসন জারি করার ব্যবস্থা লিখিয়ে নেওয়া হয়তাে সম্ভব হতো কিন্তু ১৯৮২ সনের মাঝ থেকে আইনজীবীদের তরফ থেকে তাঁর হাইকোর্ট ভাঙ্গার পরিকল্পনার তীব্র বিরােধিতা, ওই বছরের শেষের দিকে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ছাত্ররা সামরিক শাসনের বিরুদ্ধে শ্লোগান দিলে বিশ্ববিদ্যালয়ের কলাভবনে পুলিশ ঢুকে ছাত্র ও শিক্ষকদের মারধাের করা এবং ১৯৮৩’র ফেব্রুয়ারী মাসে ছাত্র মিছিলে পুলিশে প্রচণ্ড গুলীবর্ষণ ও তারপর দিন ডঃ কামাল হােসেনের বাসা থেকে প্রায় ৪০ জন রাজনীতিবিদকে গ্রেপ্তার করার ফলে বেশীরভাগ রাজনৈতিক দল একযােগে সামরিক শাসনের অবসান ও এরশাদের পদত্যাগ দাবী করতে আরম্ভ করে। কখনাে আংশিক সাফল্য, কখনাে ব্যর্থতা আবার কিছুটা সাফল্য এরকম আঁকাবাঁকা পথে প্রায় নয়টি বছর রাজনৈতিক আন্দোলন চলেছে। বহু দ্বন্দ্ব, বহু দোদুল্যমানতা, বহু বিভ্রান্তির মধ্য দিয়েও প্রত্যেক বছরই কিছু না কিছু এরশাদবিরােধী আন্দোলন চলতে থাকার কারণেই বােধ হয় তিনি আর Politico-Military থিওরীটিকে সংবিধানে ঢােকাতে পারেননি। ১৯৮৭ তে জেলা পরিষদে সামরিক বাহিনীর আসন বাধ্যতামূলক করার জন্য তিনি যে চেষ্টা চালিয়েছিলেন তার ফলে ১৯৮৬’র সংসদ ভেঙ্গেই গেল। এরশাদ বিরােধীরা ১৯৯০ সনের দ্বিতীয়ার্ধে একত্র হয়ে অক্টোবর-নভেম্বর এই পুরাে দুইমাস রাস্তার আন্দোলন চালিয়ে গেলে শেষ পর্যন্ত সামরিক বাহিনী ও জেনারেল এরশাদের দিক থেকে মুখ ফিরিয়ে নেয় এবং তাঁকে পদত্যাগ করতে বলে। জেনারেল এরশাদ বুঝতে পারেন যে, তিনি আপাততঃ পরাজিত এবং সেজন্য সরেও দাঁড়ান।

এখানে বিরােধী দলগুলাের ভূমিকা প্রসঙ্গে আমি একটা মন্তব্য করতে চাই যে, তিন জোটের ঘােষণা, যাতে এরশাদের বিদায় হবার সাংবিধানিক পন্থা ও তত্ত্বাবধায়ক সরকারের অধীনে নির্বাচন হবার কথা হয়, তা একটি ঐতিহাসিক দলিল এবং এই দলিলটি গণ-জাগরণ ঘটাতে, গণ-আন্দোলনের পিছনে সামরিক বাহিনীর নীরব সমর্থন অর্জন করতে এবং পরিবর্তনের সময় দেশে স্থিতিশীলতা রক্ষা করতে প্রশ্নাতীত অবদান রেখেছিল; তবে একই সাথে সম্ভবতঃ এও সত্যি যে, তিন জোট যে অক্টোবর থেকে একই সময়ে একই লক্ষ্যে রাজপথের আন্দোলন করছিল তার ফলেই নভেম্বরে তিন-জোটের ঐক্যবদ্ধ ঘােষণা প্রদান করা সম্ভব হয়েছিল। আমার এই ধারণা যদি সত্যি হয় তাহলে একথাও ন্যায়সঙ্গতভাবে অনুমান করা চলে যে, যদি ১৯৮২ সনের জানুয়ারী থেকেও তৎকালীন সবক’টি বিরােধীদল পুনরায় সামরিক শাসন জারি প্রতিরােধ করার আন্দোলন আরম্ভ করতাে তাহলে মার্চ মাসে হয়তাে বিএনপি’র একটা অংশও তাদের সাথে এসে যেত। সেক্ষেত্রে জেনারেল এরশাদকে ভাবতে হতাে যে, তিনি সামরিক শাসন জারি করলে তা বিক্ষোভকারীদের ওপর দিয়ে ট্যাংক চালিয়ে বাস্তবায়িত করতে হবে। সেই ঝুঁকি নেবার সাহস তাঁর নাও থাকতে পারতাে।

সামরিক শাসন জারি হবার সম্ভাবনা ভবিষ্যতে যাতে না দেখা দেয় সেজন্য গণতন্ত্র রক্ষায় মুহূর্তের ডাকে বৃহত্তর ঐক্য রচনা করার ব্যবস্থা যেন রাজনৈতিক নেতারা রাখেন – তাদের কাছে এই ঐকান্তিক আবেদন জানাচ্ছি। কারণ, এরশাদ সাহেবের Politico-military থিওরী যে কিছু লােকের মগজ ধােলাই করে রেখে যায়নি তার নিশ্চয়তা কি?”

Source:

Bangladesh: Past Two Decades and the Current Decade / Ed. Qazi Kholiquzzaman Ahmed ॥ [ Academic Publishers – 1994 । p. 471-474 ]

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *