মার্কিন নির্বাচন বাংলাদেশে কী ধরণের প্রভাব ফেলতে পারে

মার্কিন নির্বাচন বাংলাদেশে কী ধরণের প্রভাব ফেলতে পারে

:: পিনাকী ভট্টাচার্য ::

আমেরিকার নির্বাচনে কে জিতলো কে হারলো সেটায় বাংলাদেশের কী আসে যায়? এটা নিয়ে বাংলাদেশের বিশিষ্ট ফেইসবুক বুদ্ধিজীবিদের বক্তব্য হচ্ছে, কিছুই আসে যায় না। 


বাংলাদেশের এই সো কল্ড পলিটিক্যাল এনালিস্ট বলে দাবীদারেরা এতোই নাদান, এতোই বেকুব, এতোই আত্মম্ভরিতায় ভরপুর এবং সেইসাথে এতোই হ্রস্বদৃস্টিসম্পন্ন যে এরা বিশ্বরাজনীতি বুঝতে একেবারেই অক্ষম। এবং এই বিশ্ব রাজনীতির পরিবর্তন বাংলাদেশকে কীভাবে প্রভাবিত করতে পারে সেই বিষয়ে পুর্ব ধারণা করতে অপারগ। 


আমি পলিটিক্যাল এনালিস্ট না, আমি হিউম্যান রাইটস নিয়ে কাজ করি। কিন্তু তাও আমি সম্ভবত এদের চাইতে বেটার পলিটিক্যাল প্রেডিকশন আর এনালাইসিস করতে পারি। 


আমেরিকার নির্বাচনে কে জিতলো এতে বাংলাদেশের অবশ্যই যায় আসে। সামান্য যায় আসে না, বিশাল যায় আসে। শুধু বাংলাদেশের না দুনিয়ার আসে যায়।আমেরিকার নির্বাচনে যেই জিতুক আমি বলেছিলাম এই নির্বাচনের পরে বাংলাদেশের রাজনৈতিক পরিবর্তনের বিরাট সম্ভাবনা সৃস্টি হবে। কীভাবে হবে? 
আসেন সেই আলাপ করি। আমি যেই লজিকগুলো দেবো প্রত্যেকটার পিছনে ডেটা এবং ফ্যাক্টস আছে। আমার বানানো কথা নয়। 

আমেরিকার সেই সম্ভাব্য পরাজয়ে বাংলাদেশে বিশ্ব ব্যাংক তার কৌশলগত বিনিয়োগ প্রত্যাহার করে নেবে শিক্ষা আর স্বাস্থ্যতে। এর ইম্যপ্যাক্ট সুদুরপ্রসারী। এবং বাংলাদেশের এই নগদ লস চায়না এখন পুরণ করে দেয়ার মতো অবস্থায় নাই। টাকা আছে চায়নার কিন্তু পলিসি নাই এই সেক্টরে ইনভেস্ট করার।  মনে রাইখেন, আমি র‍্যাবের বিরুদ্ধে সিনেটে আমেরিকার বাই পার্টিজান মুভের কমপক্ষে দুই সপ্তাহ আগেই বলছিলাম হিউম্যান রাইটস ভায়োলেশন করা সরকারি বাহিনীগুলোর প্রধানদের বিরুদ্ধে স্যাংশনের কাজ চলতেছে। সেইটা দৃশ্যমান হইছে। বাইডেন প্রশাসন শেখ হাসিনার সরকারের হিউম্যান রাইটস ভায়োলেশন নিয়া দ্রুতই খড়্গহস্ত হইবে।


ট্রাম্প কেন জিতেছিলো? সারা দুনিয়াতে ফ্যাসিস্ট জাতিয়তাবাদী শক্তি কেন জিতেছিলো? কারণ আমেরিকান নেতৃত্বে গ্লোবাল ক্যাপিটালিজম চিনের উত্থানে তার নেতৃত্ব হারাচ্ছিলো। এই পটভুমিতে ট্রাম্পের মতো উগ্র জাতিয়তাবাদী রাজনীতিবিদের উত্থান হয়েছিলো সারা দুনিয়ায়। তার প্রথম টার্মে সে আমেরিকার গ্লোবাল ভুমিকাকে খাটো করে নিজের দেশের অর্থনীতিতে জোয়ার সৃস্টি করতে চেয়েছিলো। অনেকে বলেন ট্রাম্প কোন যুদ্ধে জড়ায় নাই। কথা সত্য। কিন্তু সে তার পলিসিতে অর্থনীতিতে জোয়ার সৃস্টি করতে পারে নাই নানা কারণে। এই দ্বিতীয় টার্মে সে তার নেতৃত্বের অবস্থান ফিরে পাওয়ার জন্য চিনের সাথে সরাসরি সংঘাতে যেতো।  ট্রাম্প জিতলে চিনের সাথে একটা যুদ্ধাবস্থা সৃস্টি করে নেতৃত্ব ফিরে পেতে চাইতো। এইটা করলে  আমেরিকা হারতো লজ্জাজনকভাবে এবং চিনের কর্তৃত্ব প্রতিষ্ঠিত হতো নিরংকুশভাবে। এটা আমেরিকান এস্টাব্লিশমেন্ট চায় নাই। তাই বাইডেন জিততেছে। বাইডেনও চিনের কর্তৃত্বকে চ্যালেইঞ্জ করবে কিন্তু সেটা যুদ্ধ বাধায়ে না। সে এশিয়াতে তার অবস্থান সংহত করে, চিনকে হিউম্যান রাইটস ইস্যুতে চাপে ফেলে আলোচনার টেবিলে বেশী সুবিধা আদায় করে চিনের সাথে সমঝোতা করে। এইভাবেও চিন গ্লোবাল নেতা হবেই। কিন্তু আমেরিকান স্টেইক এই পদ্ধতিতে বেশী থাকবে। ইকোনোমিক লিডারশিপ হারালেও পলিটিক্যাল আর মরাল পাওয়ার আরো অনেকদিন আমেরিকারই থেকে যাবে। আমেরিকা এই পলিসি পার্সু করবে। এভাবেই সে তার অর্থনৈতিক ও বানিজ্যিক সুবিধাকে ম্যাক্সিমাইজ করবে। 


আমেরিকান এই পলিসি পার্সু করার প্রথম এবং প্রধাণ দেশ হচ্ছে বাংলাদেশ। কেন? আসেন আমরা এইবার এইটা নিয়ে আলাপ করি। 


এই অঞ্চলে চিনের প্রভাব ঠেকানো আর ওয়ার অন টেররের লোকাল বরকন্দাজ হিসেবে আমেরিকা যখন ইন্ডিয়াকে ঠিক করেছিলো এবং ভেট হিসেবে বাংলাদেশের কর্তৃত্বকে ভারতের হাতে তুলে দিয়েছিলো তারপর থেকেই আমেরিকার বাংলাদেশের উপরে সরাসরি কর্তৃত্ব হারায়। ভারত আমেরিকাকে বাদ দিয়েই বাংলাদেশের প্রভু হয়ে ওঠে। শুধু তাই না, ভারত তার নিরংকুশ প্রভাবকেও হারিয়ে ফেলে চিনের কাছে। যেই চৌকিদারি ভারতকে দেয়া হয়েছিলো সেইটাও সে ধরে রাখতে পারেনা। আমেরিকা ওয়ার অন টেররের পলিসি পরিত্যাগ করেছে। সে বুঝেছে কী লস সে করেছে। সে তার পজিশন এখন রিগেইন করবে। এই পলিসি সে আনুষ্ঠানিকভাবে গহণ করেছে ইন্দো চায়না জোটের মাধ্যমে। যেই জোটে হাসিনা যাবেনা বলে সাফ জানিয়ে দিয়েছে।


এই অঞ্চলে একমাত্র বাংলাদেশেই আমেরিকান প্রভাব পুণঃপ্রতিষ্ঠা করার ম্যাচিউরড অবস্থা আছে। আমেরিকা সেটা লুকায় নাই যে এই ইন্ড প্যাসিফিক জোটের জন্য বাংলাদেশের অন্তর্ভুক্তি অত্যাবশ্যকীয়। দুইটা কারণে বাংলাদেশের পরিস্থিতি আমেরিকার জন্য ম্যাচিওরড। এক নম্বর কারণ হচ্ছে, সরকার অজনপ্রিয় এবং এই সরকারকে যদু মধু রাম শ্যাম বদলে দিতে পারলে সারা দেশের মানুষ তারে মাথায় তুলে নাচবে। দুই নাম্বার কারণ হচ্ছে আমেরিকা চাইলে এখনো বাংলাদেশের প্রভাবশালী শক্তিমান মহলকে প্রভাবিত করতে পারে। কীভাবে পারে, জিজ্ঞাসা কইরেন না, ওয়ান ইলেভেন কীভাবে করছিলো আমেরিকা সেইদিকে দেখেন উত্তর পাইবেন। 


আমেরিকান পলিসি পার্সুড হবার কারণে ক্ষমতার পরিবর্তনে বাংলাদেশের সাথে চিনের সম্পর্ক হ্রাস হবে? 
না সেটা হবেনা, আমি অনুমান করি বরং বাংলাদেশ নিয়ে চিন আর আমেরিকার একটা ফয়সালা হবে। পলিটিক্যাল প্রভাব থাকবে আমেরিকার যেই প্রভাব এখন আছে ইন্ডিয়ার আর ইকোনোমিক প্রভাব থাকবে চিনের। আমেরিকাকে বাংলাদেশের সাথে এখন ডিল করতে হলে যেমন ভারতের মাধ্যমে ডিল করতে হচ্ছে সেটা আগামীতে ভারতকে করতে হবে আমেরিকার মাধ্যমে। 


এই পরিবর্তনের প্রভাব সুদুরপ্রসারী। শেখ হাসিনা এই ত্রিশংকু অবস্থা থেকে মুক্তি পাবেনা। এইটার ফয়সালার ক্ষমতা শেখ হাসিনার হাতে নাই। বাংলাদেশের কর্তৃত্ব নিয়ে আমেরিকা যদি চিনের সাথে এই লড়াইয়ে পরাজিতও হয় (যদিও আমি মনে করি সেই সম্ভাবনা খুব ক্ষীণ) তাহলেও শেখ হাসিনার জন্য বড় সমস্যা অপেক্ষা করছে। 


কী সেই সমস্যা? 
আমেরিকার সেই সম্ভাব্য পরাজয়ে বাংলাদেশে বিশ্ব ব্যাংক তার কৌশলগত বিনিয়োগ প্রত্যাহার করে নেবে শিক্ষা আর স্বাস্থ্যতে। এর ইম্যপ্যাক্ট সুদুরপ্রসারী। এবং বাংলাদেশের এই নগদ লস চায়না এখন পুরণ করে দেয়ার মতো অবস্থায় নাই। টাকা আছে চায়নার কিন্তু পলিসি নাই এই সেক্টরে ইনভেস্ট করার। 
মনে রাইখেন, আমি র‍্যাবের বিরুদ্ধে সিনেটে আমেরিকার বাই পার্টিজান মুভের কমপক্ষে দুই সপ্তাহ আগেই বলছিলাম হিউম্যান রাইটস ভায়োলেশন করা সরকারি বাহিনীগুলোর প্রধানদের বিরুদ্ধে স্যাংশনের কাজ চলতেছে। সেইটা দৃশ্যমান হইছে। বাইডেন প্রশাসন শেখ হাসিনার সরকারের হিউম্যান রাইটস ভায়োলেশন নিয়া দ্রুতই খড়্গহস্ত হইবে। লিখ্যা রাখেন। 


শেখ হাসিনার সামনে এখন একটাই পথ খোলা, হিউম্যান রাইটস ভায়োলেশন বন্ধ করা, অপোজিশনকে পলিটিক্যাল স্পেইস দেয়া। এখন আপনারা বলেন, সেইটা কী শেখ হাসিনা করতে পারবে? শেখ হাসিনার শাসন টিকে যাওয়ার প্রধাণ কারণ হিউম্যান রাইটস ভায়োলেশন। আর এইটাই তার একিলিস হিল। সবচেয়ে দুর্বল অংশ। সে হিউম্যান রাইটস ভায়োলেশন বন্ধ করলে আর অপোজিশনকে পলিটিক্যাল স্পেইস দিলে নিজেই থাকতে পারবে না। 


যারা জিগাইতেন মানবাধিকার নিয়া কথা বইলা কী হয়? এইবার দেখেন কী হইতেছে। 
ফেইসবুকে লেখালেখি কইর‍্যা কী হয়, এই প্রশ্ন যারা করতেন, তাদের কই। এই ফেইসবুকের আওয়াজ রাখতে পারছেন জন্যই হাসিনা রেজিমকে ঘৃণা করতে শেখাইছেন ব্যাপক সাধারণ মানুষকে। এইটাই রাজনৈতিক পরিবর্তনের গ্রাউন্ড তৈরি করবে। 


এখন আবার জিগাইয়েন না, হাসিনার পরে কে ক্ষমতায় আসবে। পিকচার আভি বাকি হ্যায় মেরা দোস্ত।

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *