বাকশালকে সিপিবি ‘শোষিতের গণতন্ত্র’ বলে উল্লেখ করলো

বাকশালকে সিপিবি ‘শোষিতের গণতন্ত্র’ বলে উল্লেখ করলো

১৯৭৫ সালের জানুয়ারী মাসে সংসদে কুখ্যাত চতুর্থ সংশোধনী পাস হলো মাত্র দশ মিনিটে। এটা বাকশাল ব্যবস্থা। এই চতুর্থ সংশোধনীর দ্বারা  শেখ মুজিবুর রহমান  আজীবন রাষ্ট্রপতি ও ডিকটেটরে পরিনত হলেন। বাকশাল ব্যবস্থাটি ছিল নিম্নরুপ:

১. ‘ জাতিরজনক বঙ্গবন্ধু  শেখ মুজিবুর রহমান আজীবন রাষ্ট্রপতি থাকবেন’ এবং তিনি সকল ক্ষমতার মালিক ও উৎস। অনেকটা রাজতন্ত্রের মত।

২.দেশে মাত্র একটি রাজনৈতিক দল থাকবে, যার সভাপতি  হবেন স্বয়ং   শেখ মুজিবুর রহমান। কেন্দ্রীয় কমিটি, অন্যান্য সংস্থা এবং বিভিন্ন কেন্দ্রীয় কমিটিতে কে বা  কারা থাকবেন, তা তিনিই ঠিক করে দেবেন। অন্যান্য রাজনৈতিক দল নিষিদ্ধ হবে। পরে তিনি এই শাসক দলের নাম দেন  বাংলাদেশ কৃষক শ্রমিক আওয়ামী লীগ, সংক্ষেপে বাকশাল।

৩. শ্রমিক, কৃষক, নারী , ছাত্র, যুব এই ধরনের  সকল গণসংগঠন বেআইনী হবে। একটি মাত্র  কৃষক, শ্রমিক ( ট্রেড ইউনিয়ন) ছাত্র,যুব ,নারী সংগঠন থাকবে। যার নাম, কেন্দ্রীয় কমিটি ও কেন্দ্রীয় পদে  কে বা কারা থাকবেন, তাও শেখ মুজিবুর রহমান  ঠিক করে দেবেন।

৪. দেশে মাত্র চারটি সরকারী পরিচালনাধীন সংবাদপত্র থাকবে, বাকী সকল সংবাদপত্র, সাময়িকী প্রকাশ  নিষিদ্ধ  হবে। ১৬ জুন এ আদেশ জারী করা হয়। বহুদিন পর্যন্ত  সাংবাদিকরা এই দিনটিকে কালো দিবস হিসেবে পালন করতেন।

৫. পার্লাামেনট নির্বাচনে কেউ প্রতিদ্বন্দ্বিতা করতে চাইলে, তাকে শেখ মুজিবুর রহমানের পূর্ব অনুমতি নিতে হবে।

৬. সেদিন যে পার্লামেন্ট ছিলো তার মেয়াদ আরো দুই বছর বাড়ানো হলো এবং যেসব সংসদ সদস্য বাকশালে যোগদানে  অস্বিকৃতি জানাবেন, তাদের সদস্যপদ বাতিল হবে।   আওয়ামী লীগের জেনারেল ওসমানী ও ইত্তেফাকের মালিক মইনুল হোসেন বাকশালে যোগদান করতে অস্বিকৃতি  জানালে সংসদ সদস্য পদ হারালেন। মানবেন্দ্র লারমা অবশ্য কৌশলগতভাবে বাকশালে যোগ দিয়ে  সাংসদ হিসেবে রয়ে গেলেন। আবদুল্লাহ সরকার ( বর্তমানে বাসদ নেতা) বাকশালে যোগ দেননি এবং সংসদ সদস্য পদ হারালেন। এই কারণে তার বিরুদ্ধে গ্রেফতারী পরোয়ানাও জারী করা হয়।

মোট কথা বাকশাল  ব্যবস্থাটি ছিল চরম স্বৈরতান্ত্রিক এবং এক ব্যক্তির নিষ্ঠুর শাসন। এ ব্যবস্থা মানা যায় না। সিপিবি এটাকে ‘শোষিতের গণতন্ত্র’ বলে উল্লেখ করলো। সংশোধনবাদের অতি নিকৃষ্ট  দৃষ্টান্ত। ন্যাপ (মো) নেতা ডা. ওদুদ আমার বাবার বন্ধু ছিলেন। তিনি আমাকে বলেছিলেন, ‘ পার্লাামেনন্টারি ডেমোক্রেসি, বুজোর্য়া গণতন্ত্রের যুগ শেষ হয়ে গেছে। ন্যাপ (মো) নেতাকে খুব উৎসাহিত মনে হচ্ছিল। কিন্তু বুর্জোয়া গণতন্ত্রের বদলে সমাজতান্ত্রিত গণতন্ত্র প্রতিষ্টিত হলো। নাকি এক ধাপ পিছিয়ে, ফ্যাসিবাদি ব্যবস্থার প্রবর্তন? এ প্রশ্নটি সেদিনে  কমিউনিষ্ট পার্টি  ( মস্কো পন্থী)  অথবা ন্যাপ (মো) নেতৃত্বের মাথায় আসেনি। অথচ মজার ব্যাপার বাকশাল ব্যবস্থায় বাকশাল দলের নেতৃত্বে,  অথবা মন্ত্রীসভায় কোথাও  তাদের কোনো স্থান ছিলো না। বাকশালের সবোর্চ্চ সংস্থা  কার্যনির্বাহী কমিটির  সাধারণ সম্পাদকসহ ১৫ জনের মধ্যে ১৫জনই আওয়ামী লীগের ।বাকশালের ১১৫ জনের কেন্দ্রীয় কমিটির মধ্যে মাত্র একজন   (মোহাম্মদ ফরহাদ)  ছিলেন সিপিবির এবং ৫ জন ছিলেন  ন্যাপ (মো)থেকে। অন্য সব দলের মত সিপিবি ও ন্যাপ বিলুপ্ত হয়েছিলো। আমাদের দলকে আমরা আন্ডাগ্রাউন্ডে নিয়ে যাই। কিন্তু সিপিবি ও ন্যাপ ( মো) সেচ্ছায়  এবং সানন্দে বিলুপ্ত করা হয়। তবে এখন শোনা যায়, কমরেড মণি সিং না কি বলেছিলেন, অতি গোপনে পার্টির একটি ক্ষুদ্র কেন্দ্র  রাখা দরকার। পুরো সংগঠনকে বিলুপ্ত করে  অমন একটি  ছোট কেন্দ্র রাখলে তা কোনো কাজে লাগত কি-না জানিনা। প্রকৃত অর্থেই তারা হয়ে উঠলেন বিলোপবাদী। ক্ষমতার সামান্য কিছু সাধ, সামান্য কিছু উচ্ছিষ্ট ভোগে তারা শুধু তৃপ্তই হননি, একেবারে আনন্দে উল্লসিত  হয়ে উঠছিলেন। তবে আমি বিশ্বাস করি  একথা সিপিবির সবার জন্য প্রযোজ্য নয়। মণি সিং এর মতো নেতাকে সংশোধনবাদী বলতে পারি, তবে নিশ্চিতভাবেই  সচেতন সুবিধাবাদী  বা লোভি বলতে পারি না। সোভিয়েত পার্টিকে অনুসরণ করতে গিয়ে  তাদের চিন্তা চেতনায়  এই ধরনের অধ:পতন  এসেছিলো, হয়ত নিজের অজান্তেই। আর শেখ মুজিব ও আওয়ামী লীগ সম্পর্কে একধরনের মোহ  সৃষ্টি হয়েছিলো, যার কোনো যুক্তিসংগত  কারণ ছিলো না। ঠিক এমনই মোহ দেখেছি নেহেরু বা ইন্দিরা গান্ধি সম্পর্কে সিপিআই নেতৃত্বের যাদেরকে সিপিআই ( এম) দক্ষিনপন্থি কমিউনিষ্ট বা সংশোধনবাদী বলতেন। ইন্ধিরা গান্ধির ঘৃণিত জরুরী অবস্থাকালীন স্বৈরাচারী ভুমিকাকে সিপি আই একইভাবে সমর্থন যুগিয়েছিলো এবং ক্ষমতার সুযোগ সুবিধার কিছু উচ্ছিষ্ট ভোগ করেছিলেন।

বাকশাল ব্যবস্থাকে শেখ মুজিব তার দ্বিতীয় বিপ্লব বলে আখ্যায়িত করেন। বিপ্লবের লক্ষ্য হিসেবে  চারটি কথা ঘোষিত হয়েছিলো। ১. জাতীয় ঐক্য ২. ৩.দুর্ণীতি দমন ৪. জনসংখ্যা বৃদ্ধি প্রতিরোধ। এর মধ্যে সমাজতন্ত্র বা  শোষিতের গণতন্ত্রের নাম গন্ধও  নাই। অথচ এটাকে শুধু শেখ মুজিব নয়, সিপবিও বলল ‘বিপ্লব’। শেখ মুজিবের মৃত্যুর পর বেশ পরে সিপিবি অবশ্য বলেছিল যে, সেদিন বিপ্লবী ধারার পরিবর্তন সূচীত হয়েছিলো বলে যা মনে করেছিলেন, তা ভুল ছিল । তবে তারা এখনও বলেন যে, শেখ মুজিবের  নেতৃত্বে ‘বিপ্লবী’ নয়,তবে প্রগতির ধারার অগ্রগতি ঘটেছিল। আমি বাকশাল ব্যবস্থার এবং  সিপিবি’র ভুল চিন্তার  সমালোচনা করে  ছোট্ট একটি পুস্তিকা লিখেছিলাম- ‘এ মোহ পরিত্যাগ করুন-সিপিবি’র বন্ধুদের প্রতি’।

 

সূত্রঃ শতাব্দী পেরিয়ে / হায়দার আকবর খান রনো  [ তরফ প্রকাশনি  পঞ্চম মুদ্রণ অক্টোবর ২০১২  পৃ২৩৩,২৩৪,২৩৫ ২৩৬ ]

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *