জিয়া সামরিক আইন প্রত্যাহার করে গণতন্ত্রে ফিরে গিয়েছিলেন

জিয়া সামরিক আইন প্রত্যাহার করে গণতন্ত্রে ফিরে গিয়েছিলেন

বঙ্গভবনে এক অনুষ্ঠানে আমার স্ত্রী রুবীকে এক মহিলার সঙ্গে দীর্ঘ সময় আলাপ করতে দেখি। এধরনের অনুষ্ঠানে একজনের সঙ্গে আলাপ না করে অনেকজনের সঙ্গে ঘুরে ঘুরে আলাপ করা সমীচিন। কিন্তু খতাটা তখন রুবীকে বলার অবকাশ পাইনি। এক সময় সুযোগ পেয়ে রুবীকে বললাম, একজনের সঙ্গে এতক্ষন এমন কী কথা?

কথার কি শেষ আছে? রুবী বলল, ভদ্রমহিলা খুব ভাল।

কে এই মহিলা?

উনার নাম খালেদা। তাঁর স্বামী আর্মীতে আছেন। তুমি তাকে চিনতে পার।

কি  নাম তাঁর স্বামীর?

জিয়াউর রহমান।মুক্তিযুদ্ধের সময় মেজর জিয়া নামে রেডিওতে স্বাধীনতার ঘোষণা দিয়েছিলেন।

বললাম, চিনি। একবার তাঁর সঙ্গে আমার আলাপ পরিচয় হয়েছে। তবে তিনি একটু রিজার্ভ প্রকৃতির। বেশী কথা বলেন না।

মূলত এরশাদই প্রথমবারের মতো বাংলাদেশে সামরিক আইনের মাধ্যমে দেশ শাসন করেছিলেন। এর আগ পর্যন্ত সামরিক আইনের মাধ্যমে কেউ দেশ শাসন করেননি। জিয়া সামরিক আইন জারি করেননি। ১৯৭৫ সালের ১৫ আগষ্ট বঙ্গবন্ধুর হত্যাকাণ্ডের পর মোশতাক ক্ষমতায় এসে সামরিক আইন জারি করেন। জিয়া তাঁর অধীনে ছিলেন। পরে তিনি সায়েমের অধীনে ছিলেন। পরে যদিও জিয়া প্রধান সামরিক আইন প্রশাসক হয়েছেন, কিন্তু প্রেসিডেন্ট হওয়ার আগে তিনি নিজে কোন ফরমান জারি করেননি। … জিয়া দ্রুত সামরিক আইন প্রত্যাহার করে গণতন্ত্রে ফিরে গিয়েছিলেন।

এর আগে কর্নেল জিয়াউর রহমানকে কখনও বঙ্গভবনে বা কখনও বঙ্গবভনের বাইরে দেখেছি। তাঁর সঙ্গে তেমন কথা হয়নি। পরে একদিন তাঁর সঙ্গে বঙ্গভবনে আলাপ করার সুযোগ পেয়েছিলাম। দুপুরে সামরিক সচিব লেফটেন্যান্ট কর্ণেল ফিরোজ সালাহউদ্দীনের অফিসে বসে আলোচনা করছি। এমন সময় জিয়াউর রহমান এলেন।ঘরে ঢুকে দরজার পাশে দাঁড়িয়ে সামরিক সচিবকে স্যালুট করলেন। বললেন, আসতে পারি স্যার?

আস। জিয়া।বস। সামরিক সচিব বললেন।

আমার একটা ।এ্যাপোয়েন্টমেন্ট ছিল। কর্ণেল জিয়া জানালেন।

হ। জানি। তয় একজন মন্ত্রী হঠাৎ কইরা রাষ্ট্রপ্রধানের সাথে সাক্ষাৎ করতে আইছেন। একটু বইতে হইব।

কর্ণেল সালাহউদ্দীন কর্ণেল জিয়ার সঙ্গে আমার পরিচয় করিয়ে দিলেন। আমি বললাম, উনার সঙ্গে আমার আগেই পরিচয় হয়েছে।

চা খেতে খেতে কিছুক্ষন কথা হল। রাষ্ট্রপ্রধানের অফিসের সাংকেতিক বাতি নিবছেনা।অর্থাৎ মন্ত্রী মহোতদয় বেশী সময় নিচ্ছেন। আমি কথা প্রসঙ্গে মুক্তিযুদ্ধে তৎকালীন মেজর জিয়াউর রহমানের প্রসংশা করলাম।তাঁর মুখে বুঝলাম কথাগুলো তাঁর পছন্দ করেছেন। কিন্তু কোন রকম উষ্ঞনতা প্রকাশ করলেন না।

কিছুক্ষন আলাপচারিতার পরে আমি আবার বললাম,আপনাকে একটা কথা বলতে চাই। যদি কিছু মনে না করেন।

বলুন।

আসলে কথাটা মনের মধ্যে চাপ সৃষ্টি করেছে।এজন্য না বলে থাকতে পারছি না। বললাম, দেশে গণতান্ত্রিক সরকার না থাকলে অথবা আপনি আর্মী অপিসার না হলে, আমি বলতাম যে, আপনি বাংলাদেশের প্রধান ব্যক্তি হবেন। কর্ণেল জিয়া মুখ ফিরিয়ে তাকালেন এবং চশমার ফাঁকে দৃষ্টি মেলে রইলেন। কোন কথা বললেন না।

ফিরোজ সালাহউদ্দীন বললেন, এই কথা কেমতে কইতাছ?।

উনাকে দেখে আমার এমনটা মনে হয়েছে। মনের মধ্যে কথাটা ধরে রাখতে পারলাম না।

ইতোমধ্যে এডিসি ক্যাপ্টেন এনাম ঘরে ঢুকে  কর্ণেল জিয়াকে জানাল, রাষ্ট্রপ্রধান তাঁর জন্য অপেক্ষা করছেন। উনি উঠে যেতেই কর্ণেল  ফিরোজ সালাহউদ্দীন  প্রায় ক্ষেপে উঠলেন, আমার ওপর। বললেন, এরকম এম্বারাসিং কথাবার্তা কওন তো উচিৎ হয় নাই।

বললাম ,কথাটা শুনে  উনি তো কোনরকম রিআক্ট করলেন না।

সামরিক সচিব বললেন, জিয়ার কথা কইতাসি না। বঙ্গবন্ধুর কানে গেলে কি অবস্থা হইব ,ভাইবা দেখ। বঙ্গবভনের ;দেয়ালেরও কান আছে। কে কখন রিপোর্ট কইরা দিব,তার ঠিক কি? বঙ্গভবনের অফিসার হইয়া লুজটক করা তোমার উচিৎ  না।

কথাটার  পেছনে অন্য কোনো কায়কারণ ছিলো না। আমার ইনটুইশন থেকে বলছি—

আর কখনো এরকম কইবানা। সামরিক সচিব ঠান্ডা হলেন।

কয়েক বছরের মধ্যে মেজর জেনারেল  জিয়াউর রহমান বাংলাদেশের রাষ্ট্রপতি হন।

ব্রিগেডিয়ার ফিরোজ সালাহ উদ্দীন তার সামরিক সচিব।

– মাহবুব তালুকদার/  নির্বাচন কমিশনার / বঙ্গভবনে পাঁচ বছর ॥ [ ইউপিএল- তৃতীয় মুদ্রণ, ২০০৫ । পৃ: ৩১-৩২ ]

দুই।

আমার মতে, জিয়া যদি  চীফ অব আর্মী স্টাফ হিসেবেই থাকতেন, তাহলে  সেনাবাহিনী ব্যাপকভাবে লাভবান হতো। সেনাবাহিনীর মধ্যে তিনি একজন স্ব স্বভাবজাত নেতা ও  এবং বাংলাদেশের  স্বাধীনতায় তাঁর অবদান অবশ্যই  অমূল্য । সেনাবাহিনীতে জনওয়ান মনে করে তাঁর মাথার চারপাশে একটা জ্যোতিবর্লয় আছে। আমার মনে হয়েছে চীফ অব আর্মী স্টাফ –এর পদ থেকে সরে গিয়ে তিনি একটা ঝুকি নিতে যাচ্ছেন।

আবু সাদত সায়েম। বঙ্গভবনের শেষ দিন গুলি/ মাওলা ব্রাদার্স/ ফেব্রুয়ারী ২০১৮ পৃষ্ঠা-৩৬ 

তিন।

♦ জিয়াউর রহমান ১৯৭১ সালে চট্টগ্রামে পাকিস্তান সেনাবাহিনীর বিরুদ্ধে প্রতিরোধ যুদ্ধে শক্ত অবস্থান গড়ে তুলেছিলেন।চট্টগ্রাম বেতার কেন্দ্র থেকে স্বাধীনতার ঘোষণাও দিয়েছিলেন।সেই ঘোষণা প্রথমবার নিজের নামে দিলেও দ্বিতীয়বার তিনি বঙ্গবন্ধুর নামে দিয়েছিলেন।এর ফলে তাঁর যে ভাবমূর্তি দেশে এবং বিদেশে গড়ে ওঠে,আজও তা অম্লান। দেশ ও জাতির চরম বিপদের সময় তাঁর কণ্ঠস্বরে জনগণ উজ্জীবিত হয়েছিল।এটা তাঁর এক বিরাট অবদান। অবশ্য এ কাজটি তখন যে কেউই করতে পারতেন। কিন্তু ভাগ্যবান বলে তিনি এটা করেছিলেন। তাঁর সেই ভরাট গলার আহবানে বাঙালি জাতির মধ্যে আশার আলো সঞ্চারিত হয়েছিল।

অন্যদিকে ব্যক্তিগতভাবে জিয়ার দেশপ্রেম, সততা, ঐকান্তিকতা ছিল সব সন্দেহের উর্ধ্বে। যদিও কর্নেল তাহেরের বিচার নিয়ে এক ধরনের বিভ্রান্তি ও ধুম্রজাল রয়েছে। কর্নেল তাহের সেনাবাহিনীর ভেতরে যেভাবে হত্যাযজ্ঞ শুরু করেছিলেন,সেটা ছিল এক ঘৃণ্য অপরাধ। অনেক নিরীহ মানুষকে তাঁর বিপ্লবী সংস্থা হত্যা করেছে। নিহতদের কেউ রাজনীতির সঙ্গে জড়িত ছিল না। তাদের বিরুদ্ধে সেনাবাহিনীতে দুর্নীতির কোন অভিযোগও ছিল না। অন্যদিকে জনগণের মধ্যে কর্নেল তাহেরের কোন ভিত্তি ছিল না। জাসদের যে গণবাহিনী ছিল, তারা বিভ্রান্তিকর বৈজ্ঞানিক সমাজতন্ত্রের স্লোগান দিয়ে হত্যাযজ্ঞ চালিয়েছে…।

তাহেরের কাজটি কোনো মূল্যবোধের পর্যায়ে পড়ে না। এটা কোন ধরনের দর্শন হতে পারে না। ১৯৭৫ সালের ৬ নভেম্বর রাতে তাঁর বিপ্লবী সৈনিক সংস্থা স্লোগান দিয়েছে, ‘অফিসারের রক্ত চাই/সুবেদারের ওপরে অফিসার নাই।’ অর্থাৎ এটা প্ল্যানটেড কোন স্লোগান। বিদেশ থেকে আমদানি করা স্লোগান, যাতে বাংলাদেশ সেনাবাহিনী শক্ত ভিতের ওপর গড়ে উঠতে না পারে, । সেনাবাহিনী যদি গড়ে উঠতে না পারে, তাহলে যারা সুবিধাটা নেবেন, তাঁরাই এই কাজ করিয়েছিলেন। এ কারনেই জিয়া তাঁদের বিরুদ্ধে চূড়ান্ত এ্যাকশনে চলে যান। সেনাবাহিনীতে ডিসিপ্লিন বরখেলাপ করে যখনই কেউ কাজ করবে, ডিসিপ্লিন ভঙ্গের যে ধারাগুলো আছে, সেটা তাঁর ওপর বর্তাবে। সুতরাং বিচারে তাঁর মৃত্যুদণ্ড হতে পারে। কেউ তাঁকে জোর করে মৃত্যুদণ্ড দিচ্ছে না। শৃঙ্খলা ভঙ্গের কারণেই বিচার। সেটা সংক্ষিপ্ত আকারেও সেনাবাহিনী করতে পারে। কোর্ট মার্শাল যেটা হয়, সেটা বৈধ এবং আইনগতভাবে এটার বৈধতা আছে।

মূলত এরশাদই প্রথমবারের মতো বাংলাদেশে সামরিক আইনের মাধ্যমে দেশ শাসন করেছিলেন। এর আগ পর্যন্ত সামরিক আইনের মাধ্যমে কেউ দেশ শাসন করেননি। জিয়া সামরিক আইন জারি করেননি। ১৯৭৫ সালের ১৫ আগষ্ট বঙ্গবন্ধুর হত্যাকাণ্ডের পর মোশতাক ক্ষমতায় এসে সামরিক আইন জারি করেন। জিয়া তাঁর অধীনে ছিলেন। পরে তিনি সায়েমের অধীনে ছিলেন। পরে যদিও জিয়া প্রধান সামরিক আইন প্রশাসক হয়েছেন, কিন্তু প্রেসিডেন্ট হওয়ার আগে তিনি নিজে কোন ফরমান জারি করেননি। … জিয়া দ্রুত সামরিক আইন প্রত্যাহার করে গণতন্ত্রে ফিরে গিয়েছিলেন।

১৯৭১ ও আমার সামরিক জীবন/আমীন আহম্মেদ চৌধুরী/পৃষ্ঠা-৭২,৭৪,৭৬/প্রথমা প্রকাশন/২০১৬।

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *