১৯৭৫ সালের ৭ নভেম্বরের ঐতিহাসিক সিপাহী বিপ্লব

১৯৭৫ সালের ৭ নভেম্বরের ঐতিহাসিক সিপাহী বিপ্লব

:: জিবলু রহমান/ ওয়াসিম ইফতেখার ::

শেখ মুজিব নিহত হওয়ার পর আওয়ামী লীগের ৯৫ শতাংশ নেতা-কর্মীরাই খন্দকার মোশতাক আহমদের ক্ষমতা গ্রহণকে স্বাগত জানিয়েছিলেন। এদিকে ১৯৭৫ সালের ১৫ আগষ্ট মুজিব সরকারের ইতিহাস নির্ধারিত নির্মম পতনের পর ঢাকায় মালিবাগ মোড়ে অবস্থিত বাকশালের স্থানীয় অফিসটি কে বা কারা যেন মসজিদ বানিয়ে ফেলে। কিন্তু এতে স্থানীয় বাকশাল নেতারা তাদের প্রিয় নেতার মৃত্যুর জন্য যতোটা না বেদনাহত হয়, তার চেয়ে বেশি কষ্টপায় এই অফিসটিকে মসজিদ বানানোর জন্য। ১৫ আগষ্টের পর বাকশাল নেতারা আত্মগোপন করলেও ভেতরে ভেতরে ফুঁসতে থাকে।

১৫ আগষ্ট রাতেই মোশতাক তাঁর প্রেসিডেন্ট হিসেবে দায়িত্ব গ্রহণের পর প্রথম বেতার ভাষণ দেন। মোশতাক যে মন্ত্রীসভা গঠন করেছিলেন তাতে সবাই আওয়ামী লীগের ছিল। মোশতাক মন্ত্রীসভায় কোন প্রধানমন্ত্রী ছিলেন না। ঐতিহাসিকভাবে এ কথাই সত্য যে, শেখ মুজিবের মৃত্যুর পর পর গঠিত সরকার সকল বিচারেই ছিল আওয়ামী-বাকশালী সরকার। মন্ত্রীসভার একজন মাত্র সদস্য তথা প্রতিমন্ত্রী সৈয়দ আলতাফ হোসেন ছিলেন বাকশাল উপলক্ষে বিলুপ্ত রুশপন্থী ন্যাপের নেতা, অন্যদিকে প্রতিরক্ষা উপদেষ্টা জেনারেল ওসমানী বাকশাল গঠনের প্রতিবাদে দলত্যাগ করেছিলেন। এ প্রসঙ্গে খন্দকার মোশতাকের একটি বক্তব্যই খুব উল্লেখযোগ্য। ১৯৮৪ সালের ১০ আগষ্ট একজন ভারতীয় সাংবাদিককে দেয়া সাক্ষাৎকারে তিনি বলেছিলেন, ‘…..দেশকে সেই গৃহযুদ্ধ থেকে বাঁচাবার জন্য আমি ক্ষমতা নিয়েছিলাম। সেদিন তো ফণী বাবুও আমার পাশে ছিলেন…..আপনারা দেখেছেন সবই ছিল।’  (সূত্রঃ পার্থ চট্টোপাধ্যায়, ইন্দিরা গান্ধীর সঙ্গে দেশে দেশে’, পৃষ্টা. ২০২-২০৬) 

দেখা গেলো, শেখ মুজিবোত্তরকালের প্রেসিডেন্ট মোশতাক নিজেও স্বীকার করেছেন যে, তিনি নিজে শুধু নন, তার মন্ত্রীসভারও সকলে বাকশাল তথা আওয়ামী লীগের নেতা ও প্রতিনিধি ছিলেন। ১৬ আগষ্ট সরকারী মালিকানাধীন দৈনিক ইত্তেফাকের প্রথম সংবাদের মূল হেডিং ছিল ‘খন্দকার মোশতাকের নেতৃত্বে সশস্ত্র বাহিনীর শাসন ক্ষমতা গ্রহণ’ (অস্থায়ী প্রধান বিচারপতি সৈয়দ এবি মাহমুদ হোসেন রাষ্ট্রপতিকে শপথ বাক্য পাঠ করান)।’

মোশতাক ক্ষমতা গ্রহণের ১৫ দিন যেতে না যেতেই সেপ্টেম্বর-অক্টোবর জুড়ে সরকার পতনের ষড়যন্ত্র চলতে থাকে। ৩১ অক্টোবর থেকে প্রকাশ হতে থাকে এর আলামত। সে এক দুঃস্বপ্নের সময়। গুজব রটতে থাকে যে মোশতাক আহমদ ও সেনাবাহিনীর প্রধান মেজর জেনারেল জিয়াউর রহমান গৃহবন্দী অথবা নিহত হয়েছেন। বঙ্গভবন থেকে রাষ্ট্রপতির নামে যেসব নোট ইস্যু হতে থাকে, তাতে রাষ্ট্রপতির নাম বা স্বাক্ষর ছিল না। এ থেকে ধারণা করা হয় যে, ক্ষমতা দৃশ্যপট থেকে বিদায় নিয়েছেন রাষ্ট্রপতি মোশতাক। দেশের বেতার বা সংবাদপত্রে রাষ্ট্রপতি মোশতাকের বরাত দিয়ে কোনো খবর প্রচার বা প্রকাশ করতে ব্যর্থ হয়।

গাড়ীতে করে সেনাবাহিনী প্রত্যকটি মহল্লায় গিয়ে জনগণকে আইন ও শৃঙ্খলা বজায় রাখার অনুরোধ জানিয়েছে, দেশের সার্বভৌমত্বকে অক্ষুন্ন রাখার জন্য আকুল আবেদন রেখেছে-কামনা করেছে জনগণের ঐকান্তিক সহযোগিতা। সেনাবাহিনী, বিডিআর, পুলিশ, আনসার, তথা সমস্ত আইন প্রয়োগকারী সংস্থার সাথে জনগণের আন্দোলন প্রাণের স্পন্দন একইলয়ে স্পন্দিত হয়েছে। জিয়ার বীরত্বপূর্ণ প্রত্যাবর্তনে আনন্দে উদ্বেলিত ঢাকার মানুষ স্বতঃস্ফূর্তভাবে বের করেছে মিছিল। ট্রাকে ট্রাকে উল্লসিত জনতার গগনবিদারী শ্লোগানে মুখরিত হয়ে উঠেছে ৭ নভেম্বরের সকাল। সিপাহী ও জনতার মিলিত বিপ্লবে ৪ দিনের দুঃস্বপ্নের প্রহর শেষ হয়। এর কিছুক্ষণ পর জেনারেল জিয়া জাতির উদ্দেশ্যে তার ঐতিহাসিক ভাষণ দেন। জিয়ার কণ্ঠে স্বাধীনতা সংগ্রামের সেই দুর্যোগময় দিনে যেভাবে উদ্বেলিত করেছিল বাংলার মানুষকে, ঠিক তেমনিভাবে যেন আবারও সৃষ্টি করেছিল উম্মাদনার জোয়ার।  

১৫ আগষ্ট পটপরিবর্তনের পর অভ্যুত্থান নেতারা বঙ্গভবন থেকে প্রকারান্তরে দেশ শাসন করতে থাকেন। অভ্যুত্থানকারীরা সেনা ছাউনিতে ফিরে যেতে অস্বীকার করে। কিছুদিনের মধ্যে সেনাবাহিনীর সিনিয়র সদস্যরা ক্রমশ মেজরদের ওপর ক্ষীপ্ত হয়ে ওঠেন। বিশেষত ঢাকা ব্রিগেড প্রধান শক্তিমান কর্ণেল শাফায়াত জামিল এটাকে চ্যালেঞ্জ হিসেবে গ্রহণ করেন। সেনাবাহিনীর প্রধান জিয়াউর রহমান উভয় গ্র“পের মাঝে ভারসাম্য বজায় রাখছিলেন। রাষ্ট্রপতি মোশতাকের প্রতিরক্ষা উপদেষ্টা ওসমানীও উভয় গ্র“পের মধ্যে সমঝোতা সৃষ্টির জন্য নিরলস পরিশ্রম করেছিলেন। কিন্তু রাজনৈতিকভাবে শাফায়াত জামিলের কাছে শিগগিরই জিয়ার ভারসাম্য আর ওসমানীর সমঝোতা অর্থহীন হয়ে দাঁড়ায়। শাফায়াত জামিল মুক্তিযোদ্ধা, মেধাবী অফিসার এবং উচ্চাকাঙ্খী বিগ্রেডিয়ার খালেদ মোশাররফকে তার পরিকল্পনার ধারক ও বাহকে পরিণত করতে সক্ষম হন। খালেদ মোশাররফ সেনাবাহিনীতে তখন ছিলেন ৩নং ব্যক্তি চীফ অব জেনারেল স্টাফ। ২ নং শক্তি ডেপুটি চীফ অব স্টাফ এরশাদ ভারতে প্রশিক্ষণরত অবস্থায় থাকায় সেনাবাহিনীতে খালেদই জিয়ার পরবর্তী ব্যক্তিত্ব হয়ে দাঁড়ান।

২ নভেম্বর রাতে শাফায়াত জামিল রাজধানীর রেডিও, টিভি, বিমানবন্দর এবং কেন্দ্রীয় টেলিফোন এক্সচেঞ্জ দখল করে বঙ্গভবন ঘেরাও করেন। দেশ গৃহযুদ্ধের মুখোমুখি এসে দাঁড়ায়। ৩ নভেম্বর ভোররাতের দিকে একদল সামরিক অফিসার জিয়ার সাথে দেখা করেন। তারা তাকে রাতে তাদের গৃহীত ব্যবস্থাদি মেনে নিতে চাপ প্রয়োগ করেন। জিয়া সকাল ১১টায় সেনাসদরে সম্মিলিত জরুরি সভা আহবানের প্রস্তাব দেন। শাফায়াত জামিল প্রেরিত এই সব অফিসাররা জিয়ার প্রস্তাব নাকচ করেন। তারা জিয়াকে হুমকি প্রদান করেন। সেনাপ্রধান হিসেবে দৃশ্যত জিয়ার কার্যকারিতা অচল হয়ে পড়ে।

এদিকে সেনাবাহিনীতে গুজব রটে যায় ভারতের নীল-নক্সা অনুযায়ী জেলে অন্তরীণ তাজউদ্দিন প্রধানমন্ত্রী হচ্ছেন। আওয়ামী লীগ ক্ষমতায় ফিরে আসছে। আগষ্ট বিপ্লবের নেতারা দেশ ত্যাগ করার প্রাক্কালে ৩ নভেম্বর সংঘটিত হয় মর্মান্তিক জেল হত্যাকান্ড। খালেদ মোশাররফ ইতিপূর্বের সমঝোতা অনুযায়ী খোন্দকার মোশতাককে প্রেসিডেন্ট মেনে নিয়ে সেনাপ্রধান হতে চাচ্ছিলেন। মোশতাককে কোনোক্রমে রাজি করাতে না পেরে তিনি নিজেই নিজেকে সেনাপ্রধান ঘোষণা করেন। নৌ ও বিমান প্রধানের ব্যাজ পরিয়ে দেন। কিন্তু জেল হত্যাকান্ডের ফলে অতি দ্রুত সবকিছু পাল্টে যায়। শাফায়াত জামিল মন্ত্রিসভার বৈঠক চলাকালীন অবস্থায় সভাকক্ষে প্রবেশ করেন। তিনি মোশতাককে দারুণভাবে অপমান করে পদত্যাগে বাধ্য করেন। শাফায়াত জামিলের প্রস্তাব অনুযায়ীই পরে সুপ্রিম কোর্টের প্রধান বিচারপতি এ.এস.এম. সায়েমকে পরবর্তী প্রেসিডেন্ট মনোনীত করা হয়।

৩ নভেম্বর কেন্দ্রীয় কারাগারে আটক তাজউদ্দিন আহমদ, সৈয়দ নজরুল ইসলাম, মনসুর আলী ও কামরুজ্জামান নিহত হন। ৪ নভেম্বর সকল মস্কোপন্থী দল. গ্রুপ এবং বাকশালীরা শেখ মুজিবের বাড়ীর দিকে এক শোক মিছিল করে এগিয়ে যায়। মস্কোপন্থী ছাত্র ইউনিয়ন জহুরুল হক হলে একটি কন্ট্রোল রুম স্থাপন করে, সেখান থেকে বেতারে সংবাদপত্রে নানা ধরনের নির্দেশ দিতে থাকে। সেদিনই মোশতাক মন্ত্রীসভার তাহের উদ্দিন ঠাকুর ও শাহ মোয়াজ্জেম হোসেনকে গ্রেফতার করা হয়। নভেম্বর মাসের প্রথমদিকে দেশে আসলে কি ঘটছে বা ঘটতে যাচ্ছে তা দেশবাসী বা মিডিয়া আচঁ করতে পারেনি। 

৩ নভেম্বর থেকে ৬ নভেম্বর ছিল দেশ ও জাতির জন্য সুকঠিন, সংকট-সন্ধিকাল। ৩ থেকে ৬ নভেম্বর মূলত দেশে কোন সরকারই ছিল না। ৩ থেকে ৬ নভেম্বর বাংলাদেশের মানুষ বাস করেছে এক অসহনীয় আশংকাঘেরা পরিবেশে। রাস্তা দিয়ে তাদের চলাফেরা দেখলে মনে হত যেন মৃত লাশ রাস্তায় চলাফেরা করছে। আইন-শৃংখলার অবনতিতে পুলিশ সবকিছুতে নিয়ন্ত্রণ রাখতে ব্যর্থ হয়। গোটা রাজধানী একটি ভৌতিক এলাকায় পরিণত হয়। চারদিকে শোনা যায় নানা গুজব। রাজনৈতিক-সামাজিক পট পরিবর্তনের আভাসে একটি অস্বস্তিকর থমথমে ভাব বিরাজ করতে থাকে।

১৫ আগষ্টের অভ্যূত্থানের মাধ্যমে আওয়ামী-বাকশালী সরকারের পতন ঘটলে জনমনে স্বস্তির ভাব ফিরে এলেও যেহেতু এ অভ্যূত্থান ছিল মাত্র কিছুসংখ্যক দুঃসাহসী সেনা নায়কের একটি অসমাপ্ত বিপ্লব, সুতরাং এর বিরুদ্ধে ষড়যন্ত্র ছিল অনিবার্য। ৩ নভেম্বর সেই অনিবার্য বিপ্লব তথা অভ্যুত্থান সেনাবাহিনীর দ্বিতীয় ব্যক্তি খালেদ মোশাররফ আর একটি পাল্টা ক্যুয়ের মাধ্যমে ঘটান। এই অভ্যূত্থানকারীরা প্রেসিডেন্ট মোশতাক আহমদকে অপসারণ করে প্রেসিডেন্ট হিসেবে বসান বিচারপতি আবু সাদাত মুহাম্মদ সায়েমকে। বিচারপতি সায়েম একই সঙ্গে প্রধান সামরিক আইন প্রশাসকও হন।

 ৩ নভেম্বরই ঢাকা সেনানিবাসে এক অভ্যুত্থান ঘটিয়ে তিনি সেনাবাহিনী প্রধান জিয়াকে পদচ্যুত ও গ্রেফতার করেন। তিনি জিয়াকে অন্তরীণ করে রাখেন এবং তার ওপর সার্বক্ষণিক নজর রাখার ব্যবস্থা করেন। জিয়ার টেলিফোন সংযোগ বিচ্ছিন্ন করে তার সাথে বাইরের সকল যোগাযোগ বন্ধ করা হয়। একই সঙ্গে তিনি নিজে পদোন্নতি নিয়ে সেনাবাহিনীর প্রধানের পদটি দখল করে বসেন। তিনি এর আগে সিজিএস ছিলেন। ৪ নভেম্বর জিয়ার কাছ থেকে খালেদ মোশাররফ সেনাবাহিনীর প্রধানের দায়িত্ব গ্রহণ করেন। সম্ভাব্য সংঘাত এড়ানোর পর ৬ নভেম্বর খালেদ মোশাররফ বঙ্গভবনের নিয়ন্ত্রণ হাতে নেন, প্রেসিডেন্ট মোশতাক আহমদকে গ্রেফতার করেন এবং তার মন্ত্রিসভা ভেঙ্গে দেন।

খালেদ মোশাররফ সেনা অভ্যূত্থান ঘটানোর সঙ্গে সঙ্গে বাকশাল নেতারা আত্মগোপন অবস্থা থেকে বেরিয়ে আসেন। ৩ নভেম্বর বিকেলে মোশাররফের মায়ের নেতৃত্বে বাকশাল ও সিপিবির মহিলারা ঢাকা নগরীতে একটি মিছিল বের করে। পরদিন ৪ নভেম্বর দৈনিক ইত্তেফাকে ঐ মিছিলের ছবিটি প্রকাশিত হওয়ার সঙ্গে সঙ্গে সারাদেশে এই খবর ছড়িয়ে পড়ে যে, একটি ভারতপন্থী অভ্যূত্থান ঘটেছে। এর ফলে পরিস্থিতি দ্রুত ঘোলাটে হয়ে ওঠে। ঢাকা মহানগরী একটি গুজবের নগরীতে পরিণত হয়। মালিবাগের স্থানীয় বাকশাল নেতারা যারা তাদের অফিসকে মসজিদ বানিয়েছে, তাদের খোঁজাখুঁজি শুরু করে। চারদিকে থমথমে পরিস্থিতি। সবাই আতঙ্কিত। কি ঘটতে যাচ্ছে কিছুই বোঝা যাচ্ছিল না। ইতোমধ্যে মানুষের কানে আসছিল দেশের বিভিন্ন গ্যারিসন থেকে সৈনিকরা ঢাকা অভিমুখে আসতে শুরু করেছে ভারতপন্থী অভ্যুত্থানকারীদের হটিয়ে দিতে। মুখে মুখে গোটা নগরীতে এটা ছড়িয়ে পড়েছিল। কিন্তু অনেকে আবার বিশ্বাসও করতে পারছিল না। এভাবে তিনদিন অতিক্রম করার পর ৬ নভেম্বর রাতে কুমিল্লা ও যশোর থেকে সিপাহীরা ঢাকা অভিমুখে রাস্তায় অবস্থান নেয়। তখন টান টান উত্তেজনা। ভয়-ভীতিতে সবাই আড়ষ্ট । উচ্চস্বরে কথাবার্তা বলা পর্যন্ত বন্ধ হয়ে গেছে। বাকশালী দানব আবার জনপদে ফিরে আসে কিনা-সেটা নিয়েই সাধারণ মানুষ আতঙ্কিত হয়ে পড়েছিল। 

যে কোন ব্যাখ্যায় খালেদের সকল কর্মকান্ড ছিল অবৈধ, ক্ষমতাও তিনি অভ্যুত্থানের মাধ্যমে দখল করেছিলেন। কিন্তু সে সময় যেমন, পরবর্তীকালেও তেমনি একথা প্রচার করা হয়েছে যে, সেনাবাহিনীর অভ্যন্তরে শৃঙ্খলা তথা চেইন অব কমান্ড প্রতিষ্ঠার উদ্দেশ্যেই নাকি তিনি অভ্যুত্থান ঘটিয়েছিলেন। বাস্তবে এই প্রচারণা সত্ত্বেও খালেদের অভ্যুত্থানটি রাজনৈতিক পরিচিতি পেয়েছিল এবং সঠিকভাবেই বাকশালপন্থী অভ্যুত্থান হিসেবে চিহ্নিত হয়েছিল। ভারতীয় বেতারে সমর্থনমূলক পরোক্ষ প্রচারণা, বাকশালীদের প্রকাশ্য তৎপরতা এবং তার নিজের মা ও ভাই এর অংশগ্রহণ অনুষ্ঠিত ‘শোক মিছিল’সহ বিভিন্ন ঘটনার মধ্য দিয়ে একথা প্রায় তাৎক্ষণিকভাবে প্রতিষ্ঠিত হয়েছিল যে, নতুন পর্যায়ে আবারও একটি বাকশালী ও ভারতপন্থী সরকার প্রতিষ্ঠা করাই ছিল খালেদের প্রধান উদ্দেশ্য।

বাকশালী ও ভারতপন্থী পরিচিতির সঙ্গে যুক্ত হয়েছিল অন্য একটি প্রধান কারণ। সেনাবাহিনীর সকল পর্যায়ে জনপ্রিয় জিয়াকে পদচ্যুত ও গ্রেফতার করে সেনাপ্রধানের পদ দখল করায় খালেদের বিরুদ্ধে তীব্র অসন্তোষের সৃষ্টি হয়েছিল। সাধারণ মানুষের মধ্যেও খালেদ বিরোধী মনোভাব প্রচন্ড হয়ে উঠেছিল। এ সময় একটি গুজব ছড়িয়ে যায় যে, খালেদ বাকশাল ও একটি বিদেশী রাষ্ট্রের পক্ষে পাল্টা ক্যু ঘটিয়েছেন। এরূপ অবস্থায় সেনা ছাউনির হাজার হাজার সাধারণ সৈনিক ও জনতা একত্র হয়ে একটি অভ্যুত্থান ঘটান। নিহত হন খালেদ মোশাররফ। রাষ্ট্রপতি সায়েম হন প্রধান সামরিক আইন প্রশাসক। জিয়াউর রহমান পুনরায় সেনাবাহিনীর প্রধান নিযুক্ত হন। ক্ষমতার দৃশ্যপটে চলে আসেন জাসদ নেতা কর্ণেল তাহের। তাহের ক্ষমতা গ্রহণের পর বিভিন্ন পদক্ষেপের মাধ্যমে সেনাবাহিনীতে আরো বিশৃংখলা সৃষ্টি করেন। মোদ্দা কথা বাকশালী সরকার, মোশারফ-তাহের সবাই দেশকে ধ্বংসের দিকে ঠেলে দেন।

৩ থেকে ৬ নভেম্বর পর্যন্ত সংঘটিত ঘটনাবলী গোটা জাতিকে উদ্বেগ আকুল করে তোলে। সৈনিকরা যখন লক্ষ্য করে জুনিয়র বনাম সিনিয়রদের দ্বন্দ্ব তাদের জীবনকে শংকাকুল করে তুলেছে, ভাইয়ে ভাইয়ে সংঘর্ষ অত্যাসন্ন তখন তারা তাদের কর্তব্য নির্ধারণের জন্য ব্যাকুল হয়ে ওঠে। তারা অফিসারদের পারস্পরিক দ্বন্দ্ব এবং দলাদলি দেখে তাদের ওপর আস্থা হারিয়ে ফেলে। যে গুটিকয়েক অফিসারকে সৈনিকরা মোটামুটিভাবে বিশ্বাস করতো তারাও কোনো সমাধান দিতে ব্যর্থ হয়। সৈনিকরা দিক শূণ্যতায় ভুগছিল। এ পরিস্থিতিতে জাসদের বিপ্লবী সৈনিক সংস্থা সক্রিয় হয়ে ওঠে। গণবাহিনী ও বিপ্লবী সৈনিক সংস্থা প্রধান কর্নেল তাহের তখন অসুস্থ অবস্থায় নারায়ণগঞ্জ অবস্থান করছিলেন। তাঁকে বিশেষ ব্যবস্থাধীনে ঢাকা আনা হয়। বিপ্লবী সৈনিক সংস্থার নেতারা সংকট সমাধানে ব্যাকুল সেনাবাহিনীর লোকদের তাহেরের কাছে নিয়ে যায়। রাজনৈতিক যোগাযোগ বিচ্ছিন্ন এই সৈনিকদের নিয়ে তারা অসংখ্য বার সভা করেন। সেনাবাহিনীর সাধারণ সৈনিক ও নন-কমিশন অফিসার পর্যায়ে জাসদের মোট ২৪টি সেল ছিল। এসব সেলসমূহ সৈনিকদের সংঘটিত করার ব্যাপারে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে। সাধারণ সর্বস্তরের সৈনিকরা বিপুল সংখ্যায় সংকটের মুক্তি কামনার লক্ষ্যে কর্ণেল তাহেরের এলিফ্যান্ট রোডস্থ সাময়িক অবস্থানে ভীড় জমায়। এদের মধ্যে জিয়ার বিপুল সংখ্যক সমর্থক ছিল। সেনাবাহিনী তথা দেশের এই সামগ্রিক পরিস্থিতিতে জাসদ তার রাজনৈতিক উদ্দেশ্য সাধনের লক্ষ্যে ব্যবহার করতে উদ্যোগী হয়। জাসদ আনুষ্ঠানিকভাবে বৈজ্ঞানিক সমাজতন্ত্র প্রতিষ্ঠার লক্ষ্যে সিপাহী বিপ্লব পরিচালনার জন্য তাহেরকে সকল ক্ষমতা প্রদান করে এবং বিপ্লবী সৈনিক সংস্থা গোপন সভা এবং সাধারণ সৈনিকদের নিয়ে অনুষ্ঠিত উভয় সভায় তাহেরকে দায়িত্ব দেয়। তাহের এবং তার অনুসারীরা সৈনিকদের আপাত ঐক্য বজায় রাখার জন্য জিয়া বিরোধী বক্তব্য দিতে বিরত থাকে এবং জিয়াকে মুক্ত করার লক্ষ্যেই সমস্ত কর্মকান্ড পরিচালিত হচ্ছে এমন হাবভাব দেখান। বিপ্লবী সৈনিক সংস্থা তাদের আনুষ্ঠানিক বৈঠকে বিপ্লবের ৭টি লক্ষ্য নির্ধারণ করে ঃ 

১। সৈনিকরা সম্মিলিতভাবে বিপ্লব করবে।

২। ষড়যন্ত্রকারী খালেদ মোশাররফকে উৎখাত করা হবে।

৩। সৈনিকরা সেনাবাহিনী ও জনজীবনে শৃঙ্খলা ফিরিয়ে আনবে।

৪। প্রাতিষ্ঠানিক সেনাবাহিনীর পরিবর্তে গণসেনাবাহিনী গঠিত হবে। সমাজ এই লক্ষ্যে পুনর্গঠিত হবে।

৫। বাকশাল ব্যাতীত সকল দল সমন্বয়ে একটি অন্তবর্তীকালীন সর্বদলীয় সরকার গঠিত হবে। 

৬। সকল রাজবন্দীর মুক্তি দেয়া হবে। 

৭। চূড়ান্ত লক্ষ্য হবে সাধারণ নির্বাচনের মাধ্যমে সংসদীয় গণতন্ত্র প্রতিষ্ঠা। 

এসব লক্ষ্যসমূহ অর্জনের জন্য ৬ তারিখে চূড়ান্ত কর্মসূচি গ্রহণ করা হয়। বিপ্লবকালীন কর্মসূচি হবে নিুরূপ ঃ 

১। ৬ তারিখ ঠিক ১২.০০ টায় অর্থ্যাৎ জিরো আওয়ারে বন্দুকের ফাঁকা আওয়াজের মাধ্যমে বিপ্লব শুরু হবে। 

২। জীবন বাঁচানোর অনিবার্য প্রয়োজনই কেবল হত্যা অনুমোদন করা যাবে। 

৩। খালেদ মোশাররফকে গ্রেফতার করতে হবে। 

৪ জিয়াউর রহমানকে মুক্ত করা হবে। কিন্তু তাকে ঢাকা সেনানিবাসের বাইরে বিপ্লবী সৈনিক সংস্থার প্রত্যক্ষ তত্ত্বাবধানে রাখা হবে। 

৫। সৈনিকরা ঢাকা শহর প্রদক্ষিণ করবে এবং বিপ্লবের পক্ষে শ্লোগান দিবে। 

৬। প্রতিটি ট্রাকে কমপক্ষে একজন বিপ্লবী সৈনিক সংস্থার লোক থাকবে। তিনি সাধারণ সৈনিকদের নিয়ন্ত্রণ ও পরিচালনা করবেন। 

৭। ৭ নভেম্বর সকালে রেসকোর্সে সৈনিকদের সমাবেশ অনুষ্ঠিত হবে। এতে অন্তর্বর্তীকালীন সরকার ঘোষিত হবে।

 ৮। বিপ্লবের পর রেডিও-টিভি বিপ্লবী সৈনিক সংস্থা, বিপ্লবী গণবাহিনী এবং জাসদ এর কর্মসূচী এবং এর নেতাদের বক্তব্য প্রচার করবে। 

৯। বিপ্লবের অব্যাবহিত পরেই বিপ্লবী সৈনিক সংস্থার ইউনিট অধিনায়কদের সমন্বয়ে বিপ্লবী পরিষদ গঠিত হবে। 

১০। সামরিক অফিসারদের বিপ্লবকে সমর্থন জানানোর আহবান জানানো হবে। যারা বিপ্লবকে সমর্থন জানাবে না তাদের গ্রেফতার করা হবে। 

১১। কর্ণেল তাহের বিপ্লবের সর্বাধিনায়ক ঘোষিত হলেন। প্রতিটি সৈনিক তার আদেশ পালনে বাধ্য থাকবে। 

যথাসময়ে কোনো রকম বাধা বা বিপত্তি ছাড়াই ঘোষিত জিরো আওয়ারে বন্দুকের গুলি আকাশে ছুঁড়ে বিপ্লব শুরু হয়। সৈনিকরা ব্যারাক থেকে বেরিয়ে আসতে থাকে। সুবেদার সারোয়ারের নেতৃত্বে একদল সৈনিক বিপ্লবী সৈনিক সংস্থার পুর্বেকার কর্মসূচী অনুযায়ী জিয়ার বাসভবনের দিকে অগ্রসর হয়। শ’ শ’ জিয়াভক্ত সাধারণ সৈনিক সারোয়ারকে অনুসরণ করে। ফলে কর্ণেল তাহেরের নির্দেশ মোতাবেক তাকে শহরে অন্তরীণ করার পরিকল্পনা ব্যর্থ হয়। সাধারণ সৈনিকরা জিয়াকে কাঁধে করে আনন্দ করতে থাকে। একদল বিপ্লবী সৈনিক সংস্থার কর্মী তাৎক্ষণিকভাবে ছুটে আসে কর্ণেল তাহেরের কাছে। তারা কর্ণেল তাহেরের কাছে পৌঁছতে না পৌঁছতেই প্রশ্ন করেন কর্ণেল তাহের ‘জিয়া কোথায়’? যখন সবকিছু জানতে পারেন তখন তিনি রাগে সবকিছু শেষ বলে মন্তব্য করেন। তাহের সূচিত বিপ্লব প্রতিষ্ঠার জন্য জিয়াকে অন্তরীণ করার চেষ্টা করে। এবারে সুবেদার সারোয়ার জিয়াকে গিয়ে বলেন:  ‘স্যার, কর্ণেল তাহের আপনার জন্য অপেক্ষা করছেন। তার নেতৃত্বেই বিপ্লব হয়েছে। আপনি মুক্ত হয়েছেন। চলুন স্যার, দেখা করে আসবেন।’ জিয়া আবেগের সাথে তাৎক্ষণিকভাবে জবাব দেন :‘তাহের আমার বন্ধু সে কোথায়? তাকে এই ক্যান্টনমেন্ট থেকে চলে যেতে হয়েছিল। তাকে এখনই এখানে নিয়ে এসো। তিনি এই ক্যান্টনমেন্ট থেকেই সিপাহী-জনতার নেতৃত্ব দেবেন। তিনি তোমাদের নেতা, আমারও নেতা। যাও নিয়ে এসো তাকে এখানে।’

জিয়ার উপস্থিত বুদ্ধি এবং দূরদর্শিতা এবারও জিয়াকে বাঁচিয়ে দেয়। কিন্তু প্রতিপক্ষ তখনও ছিল তৎপর। এবার তারা আসে জিয়াকে রেডিওতে ভাষণ দেবার নাম করে শহরে নিয়ে যেতে। এবারের অভিযানে নেতৃত্ব দেন কর্ণেল তাহেরের ভাই আবু ইউসুফ। জিয়া ইতস্তত করছিলেন। সেখানে ঢাকা ব্রিগেডের কমান্ডার কর্ণেল এ.জেড.এম. আমিনুল হক বীর উত্তম, ব্রিগেডিয়ার মীর শওকত আলী, বীর উত্তম উপস্থিত ছিলেন। কর্ণেল আমিনুল হক প্রস্তাব করেন যে, একটি রেকর্ডিং ইউনিট এখানে এনে জিয়ার ভাষণটি রেকর্ড করা হোক। জিয়ার প্রতি গভীর আস্থাশীল এই সামরিক অফিসারের হস্তক্ষেপে এবারও তিনি বেঁচে যান। ইতিমধ্যে কর্ণেল তাহের-জিয়া সাক্ষাৎকার এবং কোলাকুলি হয়ে গেছে। কিন্তু কর্ণেল তাহের যখন বুঝতে পারেন জিয়া তার উদ্দেশ্য বুঝতে পেরেছেন তখন বন্দুকের নল ঘুরিয়ে দেন। গোটা সামরিক বাহিনী ও সামগ্রিক অর্থে আবার অনিশ্চয়তার মুখোমুখি হয়ে দাঁড়ায়। ৭ নভেম্বর সকালের দিকেই বিরোধ স্পষ্ট হয়ে ওঠে। জিয়া শহীদ মিনারে আয়োজিত সৈনিক-জনতার সভায় ভাষণ দিতে অস্বীকার করেন। তবে কারারুদ্ধ মেজর জলিল, আসম রব সহ সকল নেতাদের মুক্তি দেন। সকাল ১১টায় Two Field Artillery সদর দফতরে অনুষ্ঠিত সভায় কর্নেল তাহের বিপ্লবী সৈনিক সংস্থার ১২ দফা দাবি উত্থাপন করেন। সভায় উপস্থিত ছিলেন জেনারেল ওসমানী, মেজর জেনারেল খলিলুর রহমান, এয়ার ভাইস মার্শাল তওয়াব, কমোডর, এম.এইচ. খান এবং মাহবুব আলম চাষী। কিন্তু কেউই এই দাবি মানার প্রতি কোনো আগ্রহ দেখাননি। ফলে কর্ণেল তাহের আরও ক্রুদ্ধ হয়ে পড়েন এবং তার জনশক্তিকে জিয়ার বিরুদ্ধে পরিচালনার সিদ্ধান্ত নেন। অত্যন্ত দ্রুততার সাথে আবার লিফলেট বিতরণ করা হয়। লিফলেটের ভাষা ছিলঃ ‘আমাদের লক্ষ্য শুধুমাত্র নেতৃত্বের পরিবর্তন নয় এই বিপ্লব হচ্ছে গরীব শ্রেণীর পক্ষে। আমরা আপনাকে (জিয়া) এই বিপ্লবের নেতৃত্বে বসিয়েছি সেই লক্ষ্য অর্জনের জন্য। আপনাকে অত্যন্ত স্পষ্ট করে বলতে হবে আপনি গরীব শ্রেণীর পক্ষে। আপনাকে অবশ্যই সেনাবাহিনীর কাঠামোগত পরিবর্তন করতে হবে।’

সকাল ১১টায় অনুষ্ঠিত নীতি নির্ধারণী সভায় প্রথম আলোচ্য বিষয় ছিল প্রেসিডেন্ট মনোনয়ন। যেহেতু সৈনিকদের একটি অংশ খন্দকার মোশতাকের পক্ষে শ্লোগান দিয়েছে এবং তার ছবি নিয়ে মিছিল করেছে মাহবুব আলম চাষী প্রস্তাব করেন প্রেসিডেন্ট হিসেবে তাকেই পুনর্বহাল করা হোক। কর্ণেল তাহেরও জেনারেল খলিল এতে ঘোরতর আপত্তি জানান। সায়েম তখনও প্রেসিডেন্ট। অন্যরা মুখ খুলছিলেন না। সিদ্ধান্তের জন্য সবাই অবশেষে জিয়ার দিকে তাকান। জিয়া সায়েম এর প্রতি সমর্থন ব্যক্ত করেন। জিয়াকে যখন CMLA করার প্রস্তাব করা হয় তখন জেনারেল খলিলুর রহমান এবং কর্ণেল তাহের Warrant of precedence  এর ধুয়া তুলে আপত্তি জানান। অবশেষে জিয়াকে DCMLA nতে হয়, যদিও ইতিপূর্বে CMLA হিসেবে ঘোষণা করা হয়।

৭ নভেম্বর খালেদ মোশাররফ এবং তার দু’জন সঙ্গী নিহত হওয়া ব্যতীত রক্তপাতের তেমন কোনো ঘটনা ঘটেনি। কিন্তু তাহেরপন্থীরা জিয়ার বিরুদ্ধে কার্যক্রম শুরু করতেই শ্লোগান উত্থিত হয় ‘সিপাহী জনতা ভাই ভাই-অফিসারের রক্ত চাই’, ‘সিপাহী সিপাহী ভাই ভাই-সুবেদারের উপরে অফিসার নাই’, ‘বেঈমান জিয়ার বিরুদ্ধে লড়তে হবে এক সাথে’। 

৮ নভেম্বর সকালে তাহেরপন্থীরা অরাজকতা সৃষ্টি করে এবং ১২ জন অফিসারের কোয়ার্টারে লুটপাট চালায়। এমনকি তারা এসব কাজের জন্য জাসদ তথা গণবাহিনীর লোকদের সেনানিবাসে নিয়ে আসে। জিয়া এবং জিয়াপন্থী সৈনিকদের গ্রেফতারের নির্দেশ দেন কর্ণেল তাহের। অবশ্য ইতিমধ্যে তাহেরপন্থীদের মধ্যেই মতবিরোধ দেখা দেয়। কর্পোরাল হকের নেতৃত্বে একটি গ্র“প তাহেরের ধ্বংসাত্মক কাজের বিরোধিতা করেন। মেজর জলিল ব্যক্তিগত পর্যায়ে তাহেরের এসব কাজে অসন্তোষ প্রকাশ করেন। তারা পরবর্তীকালে ২৩ নভেম্বর সারাদেশে সর্বাত্মক অভ্যূত্থানের সিদ্ধান্ত নেন কিন্তু এর আগেই কর্ণেল তাহের এবং তার অনুগামীদের গ্রেফতার করা হয়। সেসাথে সমাপ্ত হয় বাংলাদেশের ইতিহাসের সবচেয়ে বঞ্ছনাবহুল দিনগুলোর। 

 ১৯৭১ সালে নেতৃত্বহীন জাতিকে নেতৃত্ব দিতে আবির্ভূত হয়েছিলেন সেই সাহসী মেজর, ১৯৭৫ সালের পট পরিবর্তন হলে ৭ নভেম্বর বিপ্ল¬বের পর সিপাহী জনতার ঠিকানা হয়েছিলেন সেই জিয়া। সায়েম রাষ্ট্রপতি হলেও দেশবাসীর দৃষ্টি নিবদ্ধ হয় জিয়ার প্রতি। বিশেষ করে প্রগতিশীল তরুণ সমাজের কাছে তিনি আবির্ভূত হলেন আলোর দিশারী হিসেবে। সারা দেশে নগরে নগরে উল্ল¬াসমূখর সিপাহী আর জনতা প্রদক্ষিণ করে। সেনাবাহিনীর জওয়ানকে বুকে জড়িয়ে ধরে চাষা, আলিঙ্গন করে নাগরিক, ট্যাঙ্কের গলায় ওঠে মালা। যেন ঘুমন্ত নগরী হঠাৎ জেগে উঠে উৎসবে মুখরিত হয়ে। জনগণ আর একবার আধিপত্যবাদ ও সম্প্রসারণবাদের চক্রান্ত নস্যাৎ করে দেয়।

৭ নভেম্বর পথে পথে জনতার কলরোল, পথে বিজয়ের আনন্দ ছিল। তমসাচ্ছন্ন রাত্রির ঘনঘোর অমানিশার অবসান ঘোষণা করে হেমন্তের প্রভাতসূর্যের আগমনের সাথে সাথে পথে নেমেছিল আনন্দোচ্ছল অজস্র মানুষের ঢল। ঢাকার রায়ের বাজার, ঝিগাতলা, ধানমন্ডি, নিউমার্কেট, এলিফ্যান্ট রোড, শাহবাগ সেই কাকডাকা ভোর থেকেই এই সমস্ত এলাকা লোকে লোকারণ্য ছিল। ঘর আর কাউকে বেঁধে রাখতে পারেনি। স্বতঃস্ফূর্তভাবে বেরিয়ে এসেছে সবাই। বেরিয়ে এসেছে ছাত্র-যুবক-বৃদ্ধ, ছোট ছোট ছেলেমেয়েরাও, এমনকি মহিলারও বেরিয়ে এসেছেন কোথাও কোথাও। পথে পথে সে আর এক অভাবিত দৃশ্য। গাড়ীতে গাড়ীতে বিপ্লবী সিপাহী জনতার এক দুর্জয় উল্লাস। মানুষের নিকট স্বাধীনতা আর সার্বভৌমত্ব কতখানি প্রিয়তম সম্পদ তার প্রমাণ মিলেছে এই দিন। ঢাকার রাজপথে সেনাবাহিনীর সাঁজোয়া গাড়ীর শব্দ আর জয়ধ্বনি জনগণের স্বতঃস্ফূর্ত উল্লাস ধ্বনির সাথে একত্রিত হয়েছিল। রাত হতে একটানা গোলাগুলির শব্দে রাজধানীর মানুষগুলি শ্বাসরুদ্ধকর অবস্থায় প্রহর গুনছিল-অকস্মাৎ সেনাবাহিনীর শ্লে¬াগান আর অভয়বাণীকে তাদের সমস্ত জড়তাকে মুছে ফেলে। ১৯৭১ এর ১৬ ডিসেম্বরের মত একইভাবে একই উল্লসিত প্রাণচাঞ্চল্যে মুখরিত হয়েছিল ১৯৭৫ এর ৭ নভেম্বরের প্রত্যুষ। ভোর হতে রাস্তায় রাস্তায় মানুষ  নেমেছে, মিছিল করেছে-জিয়া ও মোশতাকের দীর্ঘ জীবন কামনা করেছে। ট্রাকের পর ট্রাক বোঝাই হর্সোৎফুল¬ সৈনিক-জনতা জিয়া ও মোশতাকের ছবি নিয়ে প্রদক্ষিণ করেছে রাজধানীর বিভিন্ন সড়ক। 

পথে পথে সিপাহী আর জনতা আলিঙ্গন করেছে, হাত নেড়ে জানিয়েছে অভিবাদন-কাঁধে কাঁধ, হাতে হাত এক কণ্ঠে একই আওয়াজ-সিপাহী জনতা ভাই ভাই, জোয়ান জোয়ান ভাই ভাই; বাংলাদেশ জিন্দাবাদ, মেজর জেনারেল জিয়াউর রহমান জিন্দাবাদ, খন্দকার মোশতাক জিন্দাবাদ, আমাদের আজাদী-রাখবই, রাখব, স্বাধীনতা স্বাধীনতা-রাখবই রাখব, হাতের সাথে হাত মিলাও এক কাতারে শামিল হও, হাতের সাথে হাত মিলাও-সিপাহী জনতা এক হও। এত আনন্দ, এত উল্ল¬াস সিপাহী ও জনতার হৃদয়ের কোরাস, শ্লোগানের সাথে কামানের এমন অর্কেস্ট্রা-এ এক অনন্য ইতিহাস। 

গাড়ীতে করে সেনাবাহিনী প্রত্যকটি মহল্লায় গিয়ে জনগণকে আইন ও শৃঙ্খলা বজায় রাখার অনুরোধ জানিয়েছে, দেশের সার্বভৌমত্বকে অক্ষুন্ন রাখার জন্য আকুল আবেদন রেখেছে-কামনা করেছে জনগণের ঐকান্তিক সহযোগিতা। সেনাবাহিনী, বিডিআর, পুলিশ, আনসার, তথা সমস্ত আইন প্রয়োগকারী সংস্থার সাথে জনগণের আন্দোলন প্রাণের স্পন্দন একইলয়ে স্পন্দিত হয়েছে। জিয়ার বীরত্বপূর্ণ প্রত্যাবর্তনে আনন্দে উদ্বেলিত ঢাকার মানুষ স্বতঃস্ফূর্তভাবে বের করেছে মিছিল। ট্রাকে ট্রাকে উল্লসিত জনতার গগনবিদারী শ্লোগানে মুখরিত হয়ে উঠেছে ৭ নভেম্বরের সকাল। সিপাহী ও জনতার মিলিত বিপ্লবে ৪ দিনের দুঃস্বপ্নের প্রহর শেষ হয়। এর কিছুক্ষণ পর জেনারেল জিয়া জাতির উদ্দেশ্যে তার ঐতিহাসিক ভাষণ দেন। জিয়ার কণ্ঠে স্বাধীনতা সংগ্রামের সেই দুর্যোগময় দিনে যেভাবে উদ্বেলিত করেছিল বাংলার মানুষকে, ঠিক তেমনিভাবে যেন আবারও সৃষ্টি করেছিল উম্মাদনার জোয়ার।  

রেডিওতে ঘোষণা করা হচ্ছিল, সিপাহী বিপ্ল¬ব সফল হয়েছে। প্রতিক্রিয়াশীল চক্রের হাত থেকে জিয়াকে মুক্ত করা হয়েছে। বিপ্লবী সেনাবাহিনী ক্ষমতা দখল করেছে। সোমবার থেকে বৃহস্পতিবার-এই ৪ দিনের দুঃস্বপ্নের প্রহর পেরিয়ে এসেছে শুক্রবারের সোবেহ সাদেক, সিপাহী ও জনতার মিলিত বিপ্লব এনেছে শুক্রবারের বিজয়ের সূর্য। 

৭ নভেম্বরের ঘটনা অনেকটা পরিষ্কার হলেও আওয়ামী-বাকশাল, জাসদ ও কিছু রাজনৈতিক দল সিপাহী-জনতার অভ্যূত্থানকে  সহজভাবে মেনে নিতে পারেনি বলেই আজ এ নিয়ে বির্তকের সূত্রপাত করতে থাকে। প্রকৃতপক্ষে আওয়ামী-বাকশাল ও জাসদ একই ঘরণার নায়ক। তাদের আসল গোড়া একই মাটিতে প্রোথিত। যেমন মোশাররফ আর কর্ণেল তাহেরের স্তুতিতে মেতে ওঠে তখন আর এ ব্যাপারে সিদ্ধান্ত নিতে কারো কষ্ট হবার কথা নয়। সবার আজ একটি প্রশ্ন ৭ নভেম্বরে তাহের যদি খালেদের বিরুদ্ধে সত্যিই বিপ্লব সংগঠিত করবে তাহলে দুজনকে সমর্থন করে আওয়ামী লীগ ও জাসদ স্মৃতিচারণ করে কোন হিসাবে?

দুই।

৭ ই নভেম্বর সম্পর্কে আন্তর্জাতিক খ্যাতিসম্পন্ন সাংবাদিক অ্যান্থনি মাসকারেনহাস তার ‘বাংলাদেশ এ লিগ্যাসি অব ব্লাড’ বইতে লেখেন—‘১৯৭৫ সালের ৫ ও ৬ নভেম্বর ক্যান্টনমেন্টসহ সারা শহরে ছড়ানো হলো হাজার হাজার প্রচারপত্র। এই কাজগুলো করল বামপন্থী জাসদ। এ সময় রাজনৈতিক দল জাসদ ছিল নিষিদ্ধ। কিন্তু এরা কাজ করছিল বিপ্লবী সৈনিক সংস্থা এবং বিপ্লবী গণবাহিনীর আবরণে। একটি ব্যাপারে ডান ও বাম উভয় রাজনৈতিক দলই একমত ছিল। আর তা হচ্ছে, খালেদ মোশাররফ একজন বিশ্বাসঘাতক, ভারতের দালাল এবং সে ঘৃণিত বাকশাল ও মুজিববাদ ফিরিয়ে আনতে চাইছে।’

জাসদ এক ধাপ আরও এগিয়ে গেল। তারা বলল, সিনিয়র অফিসাররা নিজেদের স্বার্থে জওয়ানদের ব্যবহার করছে। সাধারণ মানুষ ও জওয়ানদের ব্যাপারে কোনো মাথাব্যথা নেই। গণজাগরণের ডাক দিয়ে জাসদ ১২টি দাবি পেশ করে। এগুলোর মধ্যে ছিল—ব্যাটম্যান প্রথা বাতিল করতে হবে, অফিসারদের ব্যক্তিগত কাজে সৈন্যদের ব্যবহার করা চলবে না, পোশাক ও পদমর্যাদার ক্ষেত্রে জওয়ান ও অফিসারদের ব্যবধান দূর করতে হবে, দুর্নীতির বিরুদ্ধে কঠোর ব্যবস্থা নিতে হবে, সব রাজবন্দিকে মুক্তি দিতে হবে। জাসদের দাবিগুলো সে সময়ে তাত্ক্ষণিকভাবে সৈনিকদের সমর্থন আদায়ে সক্ষম হলো।

জাসদের এই দাবিনামা এবং গণঅভ্যুত্থানের ডাক দেয়ার পেছনে যে ব্যক্তিটি কাজ করছিলেন—তিনি হলেন সাবেক আর্মি অফিসার লে. কর্নেল (অবসরপ্রাপ্ত) আবু তাহের। তিনিই প্রথম জওয়ানদের মধ্যে ‘ওরা এবং আমরা’ এই ধারণার সৃষ্টি করান এবং অফিসারদের বিরুদ্ধে জওয়ানদের মাথা তুলে দাঁড়াতে সাহায্য করেন।

মধ্যরাতের কিছু পরই অর্থাত্ ৭ নভেম্বরের ভোরের দিকে জওয়ানরা ব্যারাক থেকে বেরিয়ে পড়ল। তারা অস্ত্রাগার থেকে স্টেনগান-রাইফেলসহ অন্যান্য অস্ত্র লুট করল এবং তারা ‘সিপাই-সিপাই ভাই ভাই, অফিসারদের রক্ত চাই’ এবং ‘সিপাই-সিপাই ভাই ভাই, সুবেদারদের ওপরে অফিসার নাই’ ইত্যাদি স্লোগান দিতে দিতে দ্রুত ক্যান্টনমেন্টে ছড়িয়ে পড়ল।

সারা ঢাকা শহরে এই ‘সিপাহি বিপ্লব’ দ্রুত ছড়িয়ে পড়ল। রাত ১টার মধ্যেই সিপাহিরা পুরো ক্যান্টনমেন্ট দখল করে নিল। এদের কেউ কেউ ক্রমাগত ফাঁকা গুলি ছুড়তে লাগল। অন্যরা উত্তেজিত অবস্থায় স্লোগান দিতে দিতে অফিসারদের খুঁজতে লাগল। বেঙ্গল ল্যান্সারের হাবিলদার সারওয়ারের নেতৃত্বে একদল জওয়ান গেল জেনারেল জিয়ার বাসভবনে।

চার দিন বন্দি থাকার পর মুক্তি পেলেন জেনারেল জিয়া। নৈশ পোশাক পরিহিত অবস্থাতেই জিয়াকে উল্লসিত জওয়ানরা কাঁধে করে নিয়ে গেল ২ ফিল্ড আর্টিলারির হেডকোয়ার্টারে। ঘটনার আকস্মিকতায় তখন বিহ্বল হয়ে পড়েছেন জিয়া। নাম না জানা অনেক জওয়ানের সঙ্গে আলিঙ্গন, করমর্দন করলেন তিনি। তাদের কাছ থেকে ছাড়া পেয়ে জিয়া প্রথমেই ফোন করলেন জেনারেল খলিলকে। তাকে বললেন, ‘আমি মুক্ত। আমি ভালো আছি। আমার জন্য কোনো চিন্তা করবেন না।’

জিয়া তার মুক্তিদাতাদের কয়েকজন অফিসারকে তার কাছে নিয়ে আসতে বললেন। তারা হচ্ছেন জেনারেল মীর শওকত আলী, জেনারেল আবদুর রহমান এবং কর্নেল আমিনুল হক। সৈন্যরা যখন তাদের নিয়ে এলো, তখন তিনি তাদের প্রত্যেকের সঙ্গে কোলাকুলি করলেন। সৈন্যদের নিয়ন্ত্রণ করতে তিনি তাদের সহযোগিতা চাইলেন। বললেন, ‘আমি রক্তপাত চাই না।’

গ্রন্থটিতে আরও বলা হয়েছে, রাত দেড়টার দিকে জওয়ানরা রেডিও স্টেশন দখল করে নিল। তারা রাতের কর্মীদের জানাল যে, জেনারেল জিয়াউর রহমানের নেতৃত্বে সিপাহি-জনতার বিপ্লব শুরু হয়ে গেছে। বিস্মিত রেডিওর কর্মকর্তারা প্রথমে বুঝে উঠতে পারলেন না তারা কী করবেন। যখন তারা টের পেলেন যে, জওয়ানরা তাদের ভয় দেখাচ্ছে না এবং খালেদ মোশাররফ পরাজয়বরণ করেছেন; তখন তারা সবাই উল্লসিত সৈন্যদের সঙ্গে যোগ দিলেন। সৈন্য এবং সাধারণ মানুষ ভর্তি কিছু ল্যান্সার ট্যাঙ্ক শহরের মাঝখানে এসে পৌঁছল। ক্যান্টনমেন্টে গোলাগুলির শব্দ শুনে প্রথমে লোকজন ভয় পেয়ে গিয়েছিল। কিন্তু রেডিওতে ক্রমাগত ‘সিপাহি বিপ্লবের’ ঘোষণা এবং জেনারেল জিয়ার ক্ষমতা দখলের খবর শুনে হাজার হাজার লোক স্রোতের মতো রাস্তায় নেমে এলো। তিন দিন ধরে তারা বিশ্বাস করছিল যে, ভারত খালেদ মোশাররফের মাধ্যমে তাদের কষ্টে অর্জিত স্বাধীনতাকে বিপন্ন করছে। এখন সেই দুঃস্বপ্ন কেটে গেছে। সর্বত্র জওয়ান এবং সাধারণ মানুষ খুশিতে একে অপরের সঙ্গে কোলাকুলি করল, রাস্তায় নামল। সারারাত তারা স্লোগান দিল, ‘আল্লাহু আকবার, বাংলাদেশ জিন্দাবাদ, সিপাহি বিপ্লব জিন্দাবাদ’। অবস্থা দেখে মনে হচ্ছিল, ১৯৭১ সালের মার্চ মাসের মতো এদেশের মানুষ আবার জেগে উঠেছে। এটা ছিল একটি স্মরণীয় রাত।

রেডিও বাংলাদেশে এক সংক্ষিপ্ত ভাষণে জেনারেল জিয়াউর রহমান ঘোষণা করেন, তিনি সাময়িকভাবে প্রধান সামরিক আইন প্রশাসকের দায়িত্বভার গ্রহণ করেছেন। সেনাবাহিনীর অনুরোধে এবং দেশের বর্তমান পরিস্থিতিতে বাধ্য হয়েই তিনি এ দায়িত্ব গ্রহণ করেছেন। তিনি বলেন, সাধ্য অনুযায়ী তিনি তার কর্তব্য পালন করবেন। দেশকে সামনের দিকে এগিয়ে নিয়ে যাওয়ার জন্য তিনি সবাইকে ঐক্যবদ্ধ এবং কঠোর পরিশ্রম করার আহ্বান জানান। তিনি অবিলম্বে সবাইকে কাজে যোগ দেয়ারও নির্দেশ দেন।

নভেম্বরের দিনপঞ্জি – ৬/৭ নভেম্বর

খালেদ , হুদা ও হায়দার

৫ নভেম্বর মীর শওকত আলীর ফোনে বিরক্ত হয়ে ওঠেন খালেদ মোশাররফ। অবশেষে খালেদের অনুমতি পেয়ে ৬ নভেম্বর বিমান যোগে ঢাকাতে এসে খালেদের সাথে ২/৩ ঘন্টা রুদ্ধদ্বার বৈঠক করেন। আমার ধারনা বৈঠকে তাঁরা বোধহয় জিয়ার ভাগ্য নিয়ে আলোচনা করে থাকবেন। আমার এটাও মনে হয় পরবর্তিতে খালেদের মৃত্যুর পিছনে এই মিটিং এর কিছুটা হলেও ভূমিকা আছে।

.

৬ নভেম্বর দুপুরে বঙ্গ ভবনে রাষ্ট্রপতি সায়েমের শপথ গ্রহণ অনুষ্ঠিত হয়। দুপুর থেকেই বঙ্গ ভবন, সোহরাওয়ার্দি থেকে ট্যাংক গুলো ফিরিয়ে আনা হয়। সন্ধ্যার ভেতর সবগুলো ট্যাংক তাঁদের ইউনিট লাইনে পৌঁছে যায় অবশ্য গোলন্দাজ রেজিমেন্টের কামানগুলো ৪ নভেম্বরে লাইনে ফিরে এসেছিল।

অভ্যুত্থানের চতুর্থ দিনঃ ‘সিপাহী বিপ্লব’ ও ঠাণ্ডা মাথাতে খালেদকে হত্যা।

৬ নভেম্বর খবর পেলাম “বিপ্লবী সৈনিক সংস্থা” নামে একটি সংগঠন উস্কানি মূলক লিফলেট ছড়াচ্ছে। এ ধরনের কোন সংগঠনের অস্তিত্বের কথা এই প্রথম শুনলাম। যায় হোক জানতে পারলাম সৈনিকদের ভেতর চাপা উত্তেজনা ও অফিসারদের বিরুদ্ধে ফুঁসে উঠছে তাঁরা। খালেদ সন্ধ্যার দিকে ট্যাংক রেজিমেন্টে গেলেন সৈনিকদের উত্তেজনা প্রশমন করার জন্য। সৈনিকদের ধৌর্যশীল হবার পরামর্শ দিয়ে তিনি বলেন সৈনিকদের বিরুদ্ধে কোন ব্যাবস্থা নেওয়া হবেনা।

রাত ১০ টার দিকে খালেদ ফোনে আমাকে বঙ্গ ভবনে ডাকিয়ে নিলেন। বঙ্গ ভবনে যাবার জন্য যখন গাড়িতে উঠছি তখন ব্রিগেড মেজর হাফিজ আমাকে জানালো প্রথম বেঙ্গলের একজন সিনিয়র জেসিও বলেছে রাত ১২ টাতে সৈনিকরা বিদ্রহ করবে, জাসদের বিপ্লবী সৈনিক সংস্থার আহবানে ও নেতৃত্বে তাঁদের লোকেরাই এই বিদ্রহ ঘটাবে। খালেদ ও আমাকে মেরে ফেলার সিদ্ধান্ত দেওয়া হয়েছে বলে আমাকে জানানো হয়।

১১ টার দিকে বঙ্গ ভবনে পৌঁছে দেখি খালেদ তখনো এসে পৌঁছেনি। তাঁর আসতে আরো ২০/২৫ মিনিট দেরি হয় কারণ দুজন সাংবাদিক তখন খালেদের বাড়িতে অবস্থান করছিলেন। মজার ব্যাপার হচ্ছে ঐ দুই সাংবাদিকের পত্রিকাতে খালেদের মৃত্যুর পর তাঁকে রুশ ভারতের দালাল আখ্যা দিয়ে সংবাদ ছাপানো হয়।

যায় হোক খালেদ আমাকে ডেকে মধ্যস্ততা করার জন্য বললেন। সামরিক আইন প্রশাসকদের বিন্যাস নিয়ে তাঁর সাথে অন্য দুই প্রধানের মতের মিল হচ্ছিল না। ১৫ অগাস্টের মোস্তাক নিজেকে চিফ মার্শাল ল এডমিনিস্ট্রেটর ঘোষনা করলেও খালেদ চাচ্ছিলেন আর্মি চিফ কে চিফ মার্শাল ল এডমিনিস্ট্রেটর করতে। এই ফাঁকে সেনানিবাসের পরিস্থিতি খালেদকে আমি জানালে তিনি বিশেষ গুরুত্ব দিলেন না। আমাদের কথা বার্তার মাঝ পথেই ক্যান্টনমেন্ট থেকে সিপাহী বিদ্রহ শুরু হবার খবর এলো।

মিটিং ভেঙে হুদা ও হায়দারকে নিয়ে খালেদ চলে গেলেন , অন্য দুই প্রধানও চলে গেলেন তবে আমাকে বঙ্গ ভবনে থেকে যেতে নির্দেশ দিলেন। খালেদ প্রথমে মোহাম্মদপুরে আত্মীয়র বাসা হয়ে রংপুর ব্রিগেড থেকে আসা দশম বেঙ্গলের সেলটার শেরেবাংলা নগরে অবস্থান নেন।

রাত ১২ টার পর সিপাহীরা প্রথমেই মেজর মহিউদ্দিনের নেতৃত্বে জিয়াকে মুক্ত করে ফিল্ড রেজিমেন্টের মাঠে নিয়ে আসে।

রাত্রিকালীন অবস্থানের পর সকালে খালেদ ঐ ১০ম বেঙ্গলের অবস্থানে নাস্তা করেন। এরপর ১১ টার দিকে এলো সেই মর্মান্তিক মূহুর্ত। ফিল্ড রেজিমেন্টের কয়েকজন অফিসারের অর্ডারে খালেদ ও তাঁর দুই সঙ্গীকে গুলি করে হত্যা করা হয়। 

এই হত্যাকান্ডের বিচার আজো হয়নি। ফিল্ড রেজিমেন্টে যারা সদ্য মুক্ত জেনারেল জিয়ার আশেপাশে অবস্থান নিয়েছিলেন তাঁদের ভেতর কেউ কেউ নিশ্চয় জড়িত ছিলেন। তবে সিপাহী বিপ্লবের অন্যতম নায়ক কর্নেল তাহের ও তৎকালীন জাসদ নেতৃবৃন্দ এর দায় কোনদিন এড়াতে পারবে না।

জিয়া মুক্ত হবার পরপর রাত তিনটার দিকে বঙ্গ ভবনে নিজেই আমাকে ফোন করলেনঃ

*Forgive and forget, let’s unite the army.  জিয়া বললেন।

আমি একটু রুঢ ভাবেই বললাম  

*আপনি সৈনিকদের দিয়ে বিদ্রহ করিয়ে ক্ষমতাই থাকতে পারবেন না। আপনি বাঘের পিঠে সাওয়র হয়েছেন আর নামতে পারবেন না। আপনি যা করার অফিসারদের নিয়ে করতে পারতেন, সৈনিকদের নিয়ে কেন?

এই সময় একটি অদ্ভুত ব্যাপার খেয়াল করলাম, জিয়ার সাথে আমার কথা বাংলা ইংরাজি মিশিয়ে হচ্ছিল। আমাদের কথার যে অংশগুলো বাংলা ছিল কে যেন তা ইংরেজিতে ভাষান্তর করে কাউকে সাথে সাথে জানাচ্ছিল। আমি স্পষ্টত বুঝতে পারছিলাম। অর্থাৎ আমার ও জিয়ার কথোপকথন বঙ্গ ভবনের কেও একজন বিদেশি সোর্সের কাছে পাচার করছিল।

রাত ৩.৩০ নাগাদ নারায়ে তাকবির , সিপাই সিপাই ভাই ভাই/অফিসারের রক্ত চাই’ স্লোগান শুনলাম। সেই সাথে মুহু মুহু ফাঁকা গুলির আওয়াজ। ২য় বেঙ্গলের দুটি পদাতিক কোম্পানি তখন আমার সাথে বঙ্গ ভবনের দায়িত্বে ছিল , সাথে রক্ষীবাহিনী থেকে রূপান্তরিত পদাতিক ব্যাটালিয়নের একটি। সাথে সাথে কোম্পানি কমান্ডারদের নির্দেশ দিলাম পজিশন নিতে এবং বিদ্রহীরা গুলি করলে প্রতিরোধ করতে।  ১৫/২০ মিনিট পর স্লোগান ও ফাঁকা গুলির শব্দ আরো প্রখর, তীব্র ও নিকট হতে লাগলো।

আশ্চর্জ হয়ে দেখতে লাগলাম আমার সৈনিকেরা কোন পাল্টা গুলি ছুড়ছে না। বিদ্রহী সিপাহীদের ঐ শ্লোগানে তারাও মোহাবিস্ট হয়ে গিয়েছে! তাঁরা ওদের বিরুদ্ধে কিছুই করবেনা।

এই পরিস্থিতিতে আমার কোম্পানি কমান্ডারের কথাতে আমরা এখান থেকে বেড়িয়ে গিয়ে ক্যান্টনমেন্টে যাবার সিদ্ধান্ত নিলাম।

ওদিকে ফায়ারিং ও স্লোগান তখন একেবারে মুখোমুখি। উপায়ান্তর না পেয়ে আমি, দিদার ও কয়েকজন সৈনিক নিয়ে বঙ্গ ভবনের দেওয়াল টপকে বেড়িয়ে এসে অপেক্ষমান সামরিক ডজ গাড়িতে উঠে পরলাম। ক্যান্টনমেন্টে যাওয়া সমীচীন হবে না বুঝতে পারলাম , আর আমার জরুরী ভিত্তিতে চিকিৎসা দরকার । বঙ্গ ভবনের দেওয়াল টপকে পালানোর সময় আমার পা ভেঙে গিয়েছিল।

ভাবলাম কুমিল্লা সেনানিবাস এখনো শান্ত তাই ওখানে যাবো এবং সিএমএইচএ ট্রিটমেন্ট নেবো। মেঘনা ফেরী ঘাটে পৌঁছে মনে হল কুমিল্লা সেনানিবাসও নিরাপদ হবেনা, এতক্ষণে হয়তো ওখানেও খবর পৌঁছে গিয়েছে। সৈনিকদের ফেরত পাঠিয়ে আমি ও দিদার মুন্সিগঞ্জের যাবার সিদ্ধান্ত নিলাম। মেঘনা ঘাটে কর্মরত স্টাফদের কাছ থেকে লুঙ্গি গেঞ্জি নিয়ে তাড়াতাড়ি গায়ে চাপিয়ে  সামরিক ইউনিফর্ম ছাড়লাম। 

দু ঘণ্টা নৌকা চলার পর দেখি এসডিও লঞ্চ নিয়ে নারায়ণগঞ্জ যাচ্ছে। তাঁকে থামিয়ে, আমার পরিচয় দিয়ে চিকিৎসার প্রয়োজনের কথা জানালাম। দিদারের পরিচয় আর জানানো হল না, দিদারকে ভার্সিটি পড়ুয়া আমার সাহায্যকারী পরিচয় দেওয়া হল। 

এসডিও-র সাথে আমি পুলিশি হেফাজতে থানা হাজতে চলে গেলাম আর দিদার মিশে গেলো লাখো জনতার কাতারে।

নারায়ণগঞ্জ থানা থেকে ২য় ফিল্ড রেজিমেন্টে জিয়ার সঙ্গে যোগাযোগ করলাম। জিয়ার পক্ষে জেনারেল মীর শওকত আলী ফোন ধরে আমাকে বললেনঃ

*

“ শাফায়াৎ তুমি ওখানেই থাকো, আমি লেঃ কর্নেল আমিনুল হককে পাঠাচ্ছি। ও তোমাকে নিয়ে আসবে”।

ঘণ্টা দুয়েক পরে আমিনুল এলো। তাঁর সাথে ২/৩ টি গাড়িতে চতুর্থ বেঙ্গল রেজিমেন্টের সৈনিক। আমরা ঢাকার উদ্দেশ্যে রওনা হয়ে গেলাম। ঢাকাতে পৌঁছে সিএমএইচ এ ভর্তি হয়ে গেলাম ভাঙা পায়ের চিকিৎসা করার জন্য। 

এখানে এসেই খালেদ, হায়দার ও হুদার নির্মম হত্যাকান্ডের খবর শুনি। পরে জানতে পারি, মুক্তি পেয়ে জিয়া দ্বিতীয় ফিল্ড রেজিমেন্টে এসে প্রথম অর্ডারেই বলে দিয়েছিলেন:

*There should be no bloodshed. No retribution. Nobody will be punished without proper trial.

বাংলাতে “ কোন ধরনের রক্তপাত ঘটানো যাবে না , কোন প্রতিশোধ নিতে পারবে না, যথাযথ বিচার ছাড়া কাউকে কোন শান্তি দেওয়া যাবে না”।

.

অথচ জিয়ার নির্দেশ উপেক্ষা করে এবং যাবতীত শৃঙ্খলা ভঙ্গ করে, ঠাণ্ডা মাথায় হত্যা করা হয় সেনাবাহিনী তথা মুক্তিযুদ্ধের তিন বীর সেনানীকে।

(তথ্য: কর্নেল শাফায়াৎ জামিল (অবঃ) ৭১ এর মুক্তিযুদ্ধ, রক্তার্ত অগাস্ট ও ষড়যন্ত্রময় নভেম্বর)

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *