একজন আলী যাকের

একজন আলী যাকের

অভিনেতা আলী যাকেরকে আগে থেকে চিনতাম না। সত্তর দশকের গোড়ার দিকে (১৯৭২ কিংবা ১৯৭৩ সালের ২১শে ফেব্রুয়ারি তারিখে) রাতের বেলায় বিটিভি মুনীর চৌধুরীর ‘কবর’ নাটকটি প্রযোজনা করে দেখায়। ‘নেতা’র ভূমিকায় আলী যাকের নামে একজন মোটাসোটা লোক অভিনয় করেছিল। আমি তার অভিনয়ের প্রশংসা করলে, আমার ভাইঝিরা জানিয়েছিল যে, লোকটি নবাব ভাবীর বোনপো, ডাকনাম ছোটলু।

আরও জানতে পেরেছিলাম যে, সে ‘এশিয়াটিক’ নামে একটি বিজ্ঞাপনী সংস্থার মালিক। আমার দিলখুশায় অবস্থিত অফিসের কাছেই করিম চেম্বার্সে তার অফিস। সেই সঙ্গে জানতে পেরেছিলাম যে, সে ‘নাগরিক’ নামে একটি নাট্যদলের প্রধান।

আলী যাকেররা যদি সত্যিই দেশটাকে ভালবাসতো, উনি কিন্তু ধরতে গেলে মুক্তিযোদ্ধা। যুদ্ধের সময় রেডিওতে কথিকা পড়তো। সেই ছেলেগুলো, অথচ অর্থের কাছে সে হেরে গেলো। চোখের সামনে দেখা। যেয়ে দেখ না ওর অফিসে। বনানীতে। লিফটওয়ালা বাড়ি। পাঁচতলা। ৭১ এ পাকিস্তানের অ্যাড অ্যাজেন্সিতে চাকুরী করতো আলী যাকের। তখন ঠিক হলো এগুলো তো শত্রুর সম্পত্তি। তারা তখন কম্যোনিস্ট। যত ওয়ার্কার আছে সবার নামে অ্যাড এজন্সিটা নেয়া হবে। এটা কমার্স ব্যাংকের ওভার ড্রাফটে চলতো। তখন আলী যাকের ওখানকার কর্মচারী। ঠিক হলো যারা কর্মচারী তারা মালিক হয়ে যাবে। সত্যিকার অর্থে মার্ক্সবাদ বলতে যা বুঝো তুমি। শ্রমিকরাই হবে মালিক। আর কেনার সময় আলী জাকেরের নামে কিনে ফেললো। তখন শ্রমিক গেলো কই? একটাই শ্রমিক ছিল? প্রতারণা মানে… এতো বড় বড় বাঘের বাচ্চা তোমাদের সামনে, দে আর দ্যা ডেমি গড। সাধারণ মানুষের কাছে দেবতা॥”

‘থিয়েটার’ পত্রিকার ‘হ্যামলেট’ অনুবাদের প্রথম কিস্তি প্রকাশিত হওয়ার পর ‘কবর’ নাটকে ‘নেতা’র ভূমিকায় আলী যাকেরের অভিনয় স্মরণ করে আমার মনে হয়েছিল, রাজা ক্লডিয়াসের ভূমিকায় সে ভালই অভিনয় করতে পারব্। তাই পত্রিকাটির একটি কপি নিয়ে তার সঙ্গে দেখা করার জন্য তার অফিসে গিয়েছিলাম।

ভিতরে খবর পাঠানো হলে, সে বাইরের ঘরে এসে আমার সঙ্গে দেখা করে। আমার পরিচয় দেওয়ার পর পত্রিকাটির কপি তাকে দিয়ে নাটকটি মঞ্চস্থ করার জন্য তাকে ব্যক্তিগতভাবে উদ্যোগ নিতে অনুরোধ করেছিলাম। এছাড়া, যেহেতু সে ইংরেজি সাহিত্যের ছাত্র ছিল, অনুবাদের ভুল-ত্রুটি দেখিয়ে দেওয়ার জন্যও তাকে বলেছিলাম।

আমার পরিচয় পেয়ে সে আমাকে চিনতে পেরেছিল কিনা, জানি না; তার উপর, আমি তার চেয়ে বয়সে কমপক্ষে দশ বছরের বড় – তথাপি, সে আমাকে কোনও শ্রদ্ধাসৌজন্য দেখায়নি। নিজে ঘরের একটিমাত্র চেয়ারে বসে, আমাকে দাঁড় করিয়ে রেখেই সে আমার কথা শুনেছিল, এবং বিনা মন্তব্যে পত্রিকাটি গ্রহণ করেছিল। তারপর কোনও কথা না বলেই ভিতরে চলে গিয়েছিল।

আশ্চর্য এবং আহত হলেও তখন আমার মনে হয়েছিল, হয়তো ভীষণ ব্যস্ত আছে সে। ‘থিয়েটার’ পত্রিকা অনুবাদের দ্বিতীয় ও তৃতীয় কিস্তি ছাপা হওয়ার পর তাকে কপি পৌছাতে গিয়ে তার কাছ থেকে অবিকল একই রকমের নিস্পৃহ এবং শ্রদ্ধাসৌজন্যহীন আচরণ পেয়েছিলাম। তার জন্য বেশ কিছুটা আহত হলেও ভেবেছিলাম যে, হয়তো সে অফিসে ব্যক্তিগত আলাপ পছন্দ করে না।

… দ্বিতীয় সংস্করণের কপিও আলী যাকেরকে উপহার দিয়েছিলাম। বলেছিলাম, তাদের ‘নাগরিক’ নাট্যদলে উপযুক্ত সংখ্যক অভিনেতা-অভিনেত্রী না থাকলে, ‘থিয়েটার’ নাট্যদলের সঙ্গে মিলিতভাবে তারা এই নাটকটি মঞ্চস্থ করতে পারে। কিন্তু, আলী যাকের সেই প্রস্তাবেও দৃশ্যত কোন আগ্রহ দেখায়নি।

তারপরও তার সঙ্গে পরবর্তী দু’বছরের মধ্যে কয়েকবার দেখা করেছিলাম। এর মধ্যে সে একবার আমাকে ভিতরের ঘরে ডেকে পাঠায়। গিয়ে, দরজার বাইরে দাঁড়িয়ে থেকেই দেখি, সে ও অভিনেতা আতাউর রহমান চা খাচ্ছে, এবং গল্প করছে। বুঝতে পেরেছিলাম যে, কারও সঙ্গে তেমন হৃদ্যতা থাকলে সে অফিসেই আপ্যায়ন করে এবং ব্যক্তিগত কথাও বলে।

সেদিন সে আমার দিকে বিরক্তির দৃষ্টিতে তাকালে, আমি অপ্রস্তুত হয়ে সংক্ষেপে তাকে ‘হ্যামলেট’ নাটক মঞ্চস্থ করার কথা বলেছিলাম। সে উত্তরে শুধু বলেছিল, ‘আচ্ছা দেখব’। কিছুটা অপদস্থ হয়ে সেদিন ফিরে এসেছিলাম।

… এর মধ্যে, ঠিক কবে আমার জানা নেই, আলী যাকেরের এশিয়াটিক এডভাইজার্সের অফিসটি মগবাজার স্থানান্তরিত হযেছিল। ১৯৮৩ সালের ১৫ই ডিসেম্বর তারিখে সকালবেলা অফিস যাওয়ার পথে আমার ভাগিনেয়ী মুন্নির জন্মদিন উপলক্ষে তাকে শুভেচ্ছা জানাতে এবং অসুস্থ আম্মাকে দেখতে মগবাজারে গিয়েছিলাম। তখন জানতে পারি যে, আলী যাকেরের অফিসটি কাছেই। মেজ ভাগিনেয় জাকেরের কাছ থেকে ঠিকানা জেনে নিয়ে সেখানে গিয়েছিলাম।

উপস্থিত হয়ে দেখতে পেয়েছিলাম যে, সৈয়দ শামসুল হক সেখানে আগে থেকেই একটি সোফায় বসে আছেন। তিনি ‘কথাসাহিত্য’ সংগঠনের একজন সক্রিয় সদস্য, এবং তার সঙ্গে মাত্র তিন দিন আগে নির্বাহী পরিষদের সভায় দেখা হয়েছিল। তাই খুশি হয়ে তার পাশের সোফাতেই বিনা আমন্ত্রণে বসে পড়েছিলাম এবং কোনও ভূমিকা না করেই আলী যাকেরকে বলেছিলাম যে, ‘আপনারা আমার অনূদিত ‘হ্যামলেট’ নাটকটি কবে মঞ্চস্থ করবেন? আমার বয়স বেড়ে যাচ্ছে; সামনের বছর পঞ্চাশ বছরে পা দেব। হয়তো আর বেশিদিন বাঁচব না। মারা যাবার আগে নাটকটির মঞ্চায়ন দেখে যেতে চাই। যেহেতু অনুবাদক হিসাবে ইংরেজি ‘হ্যামলেট’ নাটকটি খুঁটিয়ে পড়েছি, হয়তো মহড়ার সময় এবং মঞ্চায়নকালে নাটকটি অভিনয়ের বিভিন্ন দিক সম্পর্কে ভাল suggestions দিতে পারব।’

আলী যাকের সৈয়দ শামসুল হককে এক মগ কফি এগিয়ে দিয়ে আমাকে উদ্দেশ করে বলেছিল, ‘কেন বাঁচবেন না? পঞ্চাশ আর কত বেশি বয়স? আরও অনেক বছর আপনি বাঁচবেন।’ কিন্তু, তার বলার ধরণে কোনও আন্তরিকতা ছিল না। বরং একটু মুখ বেঁকিয়ে এবং চিবিয়ে কথা বলছিল। এ ছাড়া, গত প্রায় এগারো বছরের মতো সেদিনও নাটকটি মঞ্চায়নের ব্যাপারে তার কাছ থেকে কোনও সুস্পষ্ট আশ্বাস শুনতে পাইনি।

সহসা আমার নিজেকে সেখানে ভীষণভাবে অবাঞ্ছিত মনে হয়েছিল। মনে পড়ে গিয়েছিল যে, সে তো আমাকে কোনও দিন চা-কফি দিয়ে আপায়্যন করেনি; বসতেও পর্যন্ত বলেনি। মনে হয়েছিল, সেদিন আমি অনাহুত এসে পড়ায় বরং সে বিব্রত বোধ করেছে। সৈয়দ শামসুল হকের সঙ্গে আগামী নাটকের বিষয়ে বোধ হয় তার আলোচনা হওয়ার কথা। তাই আমি আর কথা না বাড়িয়ে উঠে পড়েছিলাম।

আজ আমি নিশ্চিত, শাহাবুদ্দীন ও যাকের প্রথম থেকেই আমার প্রতি বিরূপ ধারণা, তীব্র বিদ্বেষ, এবং হিংস্র আক্রোশ পোষণ করে। অনাদি অন্ধকার থেকে উত্থিত এই হিংস্রতা প্রতিবন্ধীদেরই প্রতি।

… ১৯৮৩ সালের ১৫ই ডিসেম্বরের পর আলী যাকেরের সঙ্গে আর কোনওদিন দেখা করতে যাইনি। তবে, সেদিন অপরাহ্নে বই মেলা থেকে বের হয়ে যাওয়ার পথে ‘সব্যসাচী’ নামের একটি স্টলের ভিতর ঢুকে পূর্ব থেকে পরিচিত স্টলের মালিক, প্রকাশক সৈয়দ আমজাদ হোসেন রাজার (সৈয়স শামসুল হকের ছোট ভাই) সঙ্গে কথা বলছিলাম, এবং সৈয়দ শামসুল হকের কিছু বই কিনবার উদ্দেশ্যে বাছাই করছিলাম।

সে সময় একবার ঘুরে দাঁড়াতেই হঠাৎ দেখতে পেয়েছিলাম যে, আলী যাকের স্টলের বাইরে দাঁড়িয়ে আছে, এবং সৈয়দ আমজাদ হোসেন রাজার সঙ্গে কথা বলছে। আমাকে দেখে অপ্রত্যাশিতভাবে সে একগাল হেসে জিজ্ঞাসা করেছিল, ‘কেমন আছেন?’

আমার তখন মনে হয়েছিল, এই লোকটির কাছে আমার আর আশা করার মতো কিছু নেই; কোনও সম্পর্ক রাখারও তেমন দরকার নেই। সে তো আমার এক যুগ ধরে লালিত স্বপ্ন – ‘হ্যামলেট’ মঞ্চস্থ করা দেখতে পাওয়া – সম্পূর্ণ ধ্বংস করে দিয়েছে। তাই আমি কাঁধ ঝাঁকিয়ে খুবি নিস্পৃহভাবে বলেছিলাম, ‘আছি একরকম।’ তারপর তার দিকে পিঠ ফিরিয়ে আবার বই বাছাই শুরু করেছিলাম।

বোধ হয় এতেই সে তার প্রতি আমার মনোভাব বুঝে গিয়েছিল। সুতরাং, বছর তিনেক বাদে, ১৯৮৮ সালে, এক বিয়ের অনুষ্ঠানে তাকে যখন কিছুটা দূর থেকে দেখেছিলাম, লক্ষ করেছিলাম যে, সে চেষ্টা করে আমার থেকে দূরে দূরে থাকছে। সেদিন মনে মনে হেসেছিলাম।

সর্বপ্রকার বিচারে মনুষ্যত্ববোধবিবর্জিত সেই ভাঁড়শ্রেণীর লোকটিকে ইদানীং ‘আলোর পথযাত্রী’, ‘আলোকিত মানুষ’, ‘আলোয় ভুবন ভরা’, ইত্যাদি তকমা গায়ে এঁটে তেলতেলে হাসিমুখে যত্রতত্র অনুষ্ঠান করতে, এবং ঘুরে বেড়াতে দেখা যায়॥”

– আবু শাহরিয়ার (কবি) / বালুকাবেলায় ॥ [ পার্ল পাবলিকেশন্স – ফেব্রুয়ারি, ২০০৯ । পৃ: ১৫/৩১-৩২/৬১-৬২/৭০ ]

০২


“… আলী যাকেররা যদি সত্যিই দেশটাকে ভালবাসতো, উনি কিন্তু ধরতে গেলে মুক্তিযোদ্ধা। যুদ্ধের সময় রেডিওতে কথিকা পড়তো। সেই ছেলেগুলো, অথচ অর্থের কাছে সে হেরে গেলো। চোখের সামনে দেখা। যেয়ে দেখ না ওর অফিসে। বনানীতে। লিফটওয়ালা বাড়ি। পাঁচতলা। ৭১ এ পাকিস্তানের অ্যাড অ্যাজেন্সিতে চাকুরী করতো আলী যাকের। তখন ঠিক হলো এগুলো তো শত্রুর সম্পত্তি। তারা তখন কম্যোনিস্ট। যত ওয়ার্কার আছে সবার নামে অ্যাড এজন্সিটা নেয়া হবে। এটা কমার্স ব্যাংকের ওভার ড্রাফটে চলতো। তখন আলী যাকের ওখানকার কর্মচারী। ঠিক হলো যারা কর্মচারী তারা মালিক হয়ে যাবে। সত্যিকার অর্থে মার্ক্সবাদ বলতে যা বুঝো তুমি। শ্রমিকরাই হবে মালিক। আর কেনার সময় আলী জাকেরের নামে কিনে ফেললো। তখন শ্রমিক গেলো কই? একটাই শ্রমিক ছিল? প্রতারণা মানে… এতো বড় বড় বাঘের বাচ্চা তোমাদের সামনে, দে আর দ্যা ডেমি গড। সাধারণ মানুষের কাছে দেবতা॥”

জাঁ নেসার ওসমান / সাক্ষাৎকার

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *