রক্ষীবাহিনী মুক্তিবাহিনীর স্থান নেবার জন্য সৃষ্টি করা হয়েছিল

রক্ষীবাহিনী মুক্তিবাহিনীর স্থান নেবার জন্য সৃষ্টি করা হয়েছিল

রক্ষীবাহিনী মুক্তিবাহিনীর স্থান নেবার জন্য সৃষ্টি করা হয়েছিল

শেখ মুজিব বঙ্গবন্ধুর মর্যাদা এবং জাতির পিতার পরিচিতি নিয়ে ১০ই জানুয়ারি ১৯৭২ সনে ঢাকায় আসেন। উল্লেখ্য তিনি ১৯৭১ সনের ২৫শে মার্চ অবধি পাকিস্তানের প্রধানমন্ত্রী হওয়ার জন্যে আলোচনা চালিয়ে গেছেন। তিনি স্বাধীনতা চাননি। তরুণেরা তারুণ্যবশে আবেগ-বশবর্তী হয়ে স্বাধীনতার দাবি ও সঙ্কল্প তাকে দিয়ে জোর করে তার মুখে উচ্চারণ করিয়েছিল তার আপত্তি ও পরিব্যক্ত অনীহা সত্ত্বেও। তার বাড়িতেও ওরাই স্বাধীনতার পতাকা উড়িয়েছিল তার হাতেই। মানুষের বিশেষ করে বাঙালীর স্বভাব হচ্ছে হুজুগে। তাই তারা কাক-শিয়ালের মতো বুঝে না বুঝে শেখ মুজিবকে স্বাধীনতা সংগ্রামী বলে মেনে নিল। সেভাবেই তার প্রতি ভক্তি-শ্রদ্ধা ও আনুগত্য নিবেদন করল। শেখ মুজিব কিন্তু তার দলের লোকদের নিয়ন্ত্রণে ও শাসনে অনুগত রাখতে পারলেন না। তার রক্ষীবাহিনীর, তার অনুচর, সহচর, সহযোগীর লুন্ঠনে, পীড়ন-নির্যাতনে, অত্যাচারে, শাসনে-শোষণে দেশে দেখা দিল নৈরাজ্য, প্রতিষ্ঠিত হল ত্রাসের রাজত্ব। দেখা দিল দুর্ভিক্ষ, মরল লক্ষাধিক মানুষ। এ সুযোগে উচ্চাশী মুশতাক ও অন্যরা হল ষড়যন্ত্রে লিপ্ত। অস্থিরচিত্ত ও অনভিজ্ঞ রাজনীতিক নীতি আদর্শেও হলেন অস্থির। ফলে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের ইঙ্গিতে তার মুক্তিযোদ্ধা আওয়ামী লীগের একটি উচ্চাশী ক্ষুদ্রদল তাকে সপরিবার-পরিজন হত্যা করল। সম্ভবত: শেখ মণিই ভাবী শত্রু তাজউদ্দীনকে মুজিবের প্রতিদ্বন্ধী বলে মুজিবের কান-মন ভারী করে তাকে পদচ্যুত করিয়েছিল। রাজত্বটাও প্রায় পারিবারিক হয়ে উঠেছিল – সৈয়দ হোসেন, সারনিয়াবাদ, শেখ মণি, কামাল, জামাল তখন সর্বশক্তির আধার কার্যত। আজো শেখ মুজিব ও স্বাধীনতা বা মুক্তিযুদ্ধই শহুরে চাটুকারদের ও স্থূলবুদ্ধির লোকদের মুখে সগর্ব-সগৌরব উচ্চারিত। এর মধ্যে দেশ-মানুষ নেই। স্বদেশী স্বজাতি স্বধর্মী স্বভাষী স্বজনের শাসনে মানুষ স্বাধীন হয় না। মৌল মানবাধিকারে স্বপ্রতিষ্ঠ হলেই কেবল ব্যক্তি মানুষ স্বাধীন হয়। ভাত-কাপড়ে জন্মগত অধিকার পেয়ে দেহে-মনে-মগজে-মননে স্বাধীন থেকে জীবনযাপনের অধিকারই স্বাধীনতা। সে স্বাধীনতা চাইতে শেখেনি আমাদের মানুষ॥” আহমদ শরীফ  আহমদ শরীফের ডায়েরি : ভাব–বুদ্বুদ ॥ জাগৃতি প্রকাশনী – ফেব্রুয়ারি, ২০০৯ । পৃ: ১৯৯–২০০  রক্ষীবাহিনী বোধহয় মুক্তিবাহিনীর স্থান নেবার জন্য সৃষ্টি করা হয়েছিল। মুক্তিবাহিনীর গেরিলাদের বোধহয় রেগুলার আর্মিতে নেওয়া যেত না। নিলে ডিসিপ্লিন রাখা দায় হত। কিন্তু রেগুলার আর্মি থাকলে তার উপরেই  বেশি জোর দিতে হয়। প্রাক্তন গেরিলার উপর নয়। প্রাক্তন গেরিলাই বা কেন রক্ষীবাহিনীতে যোগ দিয়ে রেগুলার আর্মির কাছে খাটো হতে যাবে?  তার চেয়ে সরকারের আয়ত্ত্বের বাইরে থাকবে ও স্বাধীনভাবে কাজ করবে। ২ “… আমরা অবাক হয়ে দেখি বাংলাদেশের সংবিধান সংশোধিত হয়েছে। পার্লামেন্ট আছে, কিন্তু তাতে বিরোধীপক্ষ নেই। সরকারপক্ষই একমাত্র পক্ষ। গণতন্ত্রী দুনিয়ার কোথাও কেউ এমন দৃশ্য দেখেছে? দুই পক্ষ নিয়েই গণতন্ত্র নামক পক্ষী। তার একটা পক্ষ ছেদ করলে তাকে গণতন্ত্র বলে চেনা যায় কি? তারপর প্রেসিডেন্টের ক্ষমতা হলো সর্বময় কর্তার। তিনিই যাকে ইচ্ছা মন্ত্রী করবেন। প্র্ধানমন্ত্রী বলে একজনকে রাখবেন বটে, কিন্তু সবকটা দফতরের উপর তার এখতিয়ার থাকবে না। শেখ সাহেব স্বয়ং হলেন প্রেসিডেন্ট। নিজের হাতে রাখলেন দেশরক্ষা বিভাগ। অর্থাৎ সৈন্যদল। এখানে বাংলাদেশের একটি বিশেষত্বের কথা বলি। আর সব দেশের মতো সে-দেশেও একদল সৈন্য আছে ও একদল পুলিশ আছে। কিন্তু মাঝখানে আছে আরও একটি দল। সেটির নাম রক্ষীবাহিনী। ভারতে বা অন্য কোথাও আমি এর মতো কিছু লক্ষ করিনি। চীনে রেড গার্ড বলে কী যেন আছে শোনা যায়। একদা জার্মানিতে না কোথায় ব্ল্যাক গার্ড বলেও একটা সংস্থা ছিল। রক্ষীবাহিনীর বিরুদ্ধে নানা অভিযোগ আমার কানে আসে ও চোখে পড়ে। এ বাহিনী আমাদের হোম গার্ড নয়। পুলিশের অধীন নয়। এর হাতে অস্ত্র আছে ও পুলিশের চেয়ে সে অস্ত্র বোধহয় মারাত্মক। একে ক্ষমতাও দেওয়া হয়েছে যতদূর জানি পুলিশের চেয়েও বেশি। ক্ষমতা থাকলে তার অপব্যবহারও থাকে। এবার এক বিশিষ্ট বুদ্ধিজীবি আমাকে তার উদাহরণ দেন। তাছাড়া যে দেশে রেগুলার আর্মি আছে সে দেশে এরকম একটি দল থাকলে তাকে আর্মিরই অধীন করা উচিত। নয়তো সে হয়ে ওঠে আর্মির প্রতিদ্বন্দ্বী সমান্তরাল এক আর্মি। তখন গাত্রদাহের কারণ ঘটে। রক্ষীবাহিনী বোধহয় মুক্তিবাহিনীর স্থান নেবার জন্য সৃষ্টি করা হয়েছিল। মুক্তিবাহিনীর গেরিলাদের বোধহয় রেগুলার আর্মিতে নেওয়া যেত না। নিলে ডিসিপ্লিন রাখা দায় হত। কিন্তু রেগুলার আর্মি থাকলে তার উপরেই বেশি জোর দিতে হয়। প্রাক্তন গেরিলার উপর নয়। প্রাক্তন গেরিলাই বা কেন রক্ষীবাহিনীতে যোগ দিয়ে রেগুলার আর্মির কাছে খাটো হতে যাবে? তার চেয়ে সরকারের আয়ত্ত্বের বাইরে থাকবে ও স্বাধীনভাবে কাজ করবে। বাংলাদেশের সৈন্যদলটি আকারে ক্ষুদ্র হলেও তাতে তিনটি পরস্পরবিরোধী উপাদান। তার সবচেয়ে অভিজ্ঞ অফিসার যারা তারা পাকিস্তানে আটকা পড়েছিলেন। কেউ কেউ পাকিস্তানের সহযোগীও ছিলেন। পরে মত পরিবর্তন করেন। তাদের চেয়ে কম অভিজ্ঞতা যাদের তারা বাংলাদেশের মুক্তিযুদ্ধে যোগ দিয়ে আরেক রকম অভিজ্ঞতা সঞ্চয় করেন, সেটা বিদ্রোহের অভিজ্ঞতা। অপেক্ষাকৃত অনভিজ্ঞ তরুণরা দেশের স্বাধীনতার পরে কমিশন পেয়েছেন, ইতিপূর্বে হয়তো মুক্তিবাহিনীতে লড়েছেন। এই তিন শ্রেণীর মধ্যে অধিকারী ভেদ আছে। নিম্ন অধিকারী যদি উচ্চ অধিকারীকে কমান্ড করে তা হলে সেটা যেমন অসহ্য হয়, তেমনি অসহ্য হয় তার অবাধ্যতা। এমন প্রশ্নও তো উঠতে পারে, যুদ্ধের অভিজ্ঞতা কার কত বেশি, মুক্তিযুদ্ধের অভিজ্ঞতা কার কত বেশি? কিংবা মুসলমান হিসাবে কে কতটা ধর্মপ্রাণ, বাঙালি হিসাবে কে কতটা দেশভক্ত? কিংবা সমাজবিপ্লবের দিন কার ভূমিকা কতখানি নির্ভরযোগ্য? কিংবা গণতন্ত্রের গণেশ ওল্টালে কার মনে হর্ষ, কার মনে বিষাদ? … শেখ সাহেব ফতোয়া দিলেন বাকশাল নামক পাঁচমিশালি পার্টিতে সিভিল ও মিলিটারি কর্মচারীরাও সদলবলে যোগ দেবেন। সমাজতন্ত্রী দেশে সরকারি কর্মচারীদের সংখ্যা তো চক্রবৃদ্ধি হারে বৃদ্ধি পায়। আগে যে কাজ একজনকে দিয়ে হত এখন তার জন্যে পাঁচজন কর্মচারী লাগে। নইলে বেকারসমস্যা দূর হবে কী করে? তাহলে দাঁড়ায় এই যে কালক্রমে বাকশাল হবে আর একটা আমলাতন্ত্র। দু-দুটো আমলাতন্ত্র দেশশাসন করবে। দুটোই একছত্রাধীন। যেদিন ছত্রপতির তিরোধান সেদিন ছত্রভঙ্গ। …দৈনিকপত্র বলতে এখন মাত্র চারখানা। দুখানা রাষ্ট্রায়ত্ত, দুখানা আধা সরকারি। বাদবাকি সব কাগজ বন্ধ। তবে চাকরি হারাবে না কেউ। হারাবে শুধু প্রতিবাদ বা সমালোচনার স্বাধীনতা। ওদিকে সভাসমিতি করেও কি বোঝানো যাবে যে আরেকটা দিক আছে? সেটাই বিবেচনাযোগ্য? … ভেবেছিলুম শেখ সাহেবকে চিঠি লিখে বোঝাতে চেষ্টা করব যে কলোনিয়াল সিস্টেম রদ করতে গিয়ে গোসলের পানির সঙ্গে বাচ্চাকেও ঢেলে দেবেন না। তার চেয়ে পানিটাকেই পাল্টে দিন, বাচ্চাটাকে রাখুন। আরও বলতে চেয়েছিলুম যে সুপ্রীম কোর্টকে পঙ্গু করে জুডিসিয়ারিকেই ঠুঁটো করা হচ্ছে। এটা পার্লামেন্টারি তো নয়ই, প্রেসিডেনশিয়াল ডেমোক্রেসিও নয়। যদি ইংলন্ড বা আমেরিকা তার আদর্শ না হয় তবে তিনি সমাজতন্ত্রী দেশগুলির আদর্শ গ্রহণ করতে পারেন। এ কীরকম গণতন্ত্র যাতে নাগরিকদের নির্বাচনের অধিকার আছে, অথচ যাদের ভিতর থেকে নির্বাচন করতে বলা হবে তারা সকলেই একই দলভুক্ত? নির্বাচনের স্বাধীনতা তা হলে রইল কোথায়?” অন্নদাশঙ্কর রায়  স্মৃতিতে আগস্ট ॥ সম্পাদনা: সোহরাব হাসান ॥ মাওলা ব্রাদার্স – মার্চ, ১৯৯৮ । পৃ: ১৩৭–১৪১  ৩ “… মনে আছে, কবিগুরু রবীন্দ্রনাথ একবার লিখেছিলেন ভূতের পা পশ্চাদদিকে, স্বাধীনত্তোর আওয়ামী লীগ যেনো ভূতগ্রস্ত রাজনৈতিক দলের মতো পেছনের দিকে ছুটছে। জনতার দিকে এগিয়ে না গিয়ে সে যেনো জনতার থেকে বিচ্ছিন্ন হয়ে যাওয়ার এক অবাঞ্ছিত অভাবিত টানা-হেঁচড়ায় নেমে পড়েছে। এই ভূতে পাওয়া মানসিক বিকার থেকে আওয়ামী লীগকে রক্ষা করতে হবে।…

'আমাকে মিথ্যেবাদী বলার অনুমতি আপনাকে দেবো না'

‘আমাকে মিথ্যেবাদী বলার অনুমতি আপনাকে দেবো না’

সোমবার সন্ধ্যা…তার মানসিক যোগ্যতা সম্পর্কে আমার সন্দেহ ছিল।..তার ভারসাম্যহীনতাকে আমি আর কোন ভাবেই ব্যাখা করতে পারি না।..আমি যত তাকে পর্যবেক্ষণ…

অন্যের জীবন রক্ষা করে নানাজানকে মরতে হল মুক্তিযোদ্ধাদের হাতে

অন্যের জীবন রক্ষা করে নানাজানকে মরতে হল মুক্তিযোদ্ধাদের হাতে

 … ১৯৭১ সনের কথা। মুক্তিযুদ্ধের শেষ পর্যায়। রোজার মাস। থাকি মহসিন হলে ৫৬৪ নম্বর রুমে। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের হলগুলি তখন ছাত্রদের…

মুক্তিযুদ্ধের সময় যেভাবে গর্তে লুকিয়েছিলেন জাফর ইকবাল

মুক্তিযুদ্ধের সময় যেভাবে গর্তে লুকিয়েছিলেন জাফর ইকবাল

“… ডিসেম্বর মাসে যখন ‘শেষ যুদ্ধ’ শুরু হয়েছে তখন আমি যাত্রাবাড়ীতে এক দূরসম্পর্কের মামার বাসায়। ঢাকার আকাশে জঙ্গি বিমানের ডগ…

ইতিহাসচর্চা কী তাহলে থেমে যাবে?

ইতিহাসচর্চা কী তাহলে থেমে যাবে?

মহাত্মা গান্ধীকে নিয়ে ভারতে সিনেমা হয়েছে একাধিক। ঐতিহাসিকরা নানা সময়ে তাদের গবেষণায়, মহাত্মা গান্ধীকে নানাভাবে চিত্রিত করেছেন, তিনি সমকামী ছিলেন…