বিশ্বাসঘাতক আমরা নই, সরকারই বিশ্বাসঘাতক

বিশ্বাসঘাতক আমরা নই, সরকারই বিশ্বাসঘাতক

বিশ্বাসঘাতক আমরা নই, সরকারই বিশ্বাসঘাতক

আজ লিখিতে বসিয়া বিশিষ্ট লেখক শ্রী নির্মল সেনের একটা লেখার কথা মনে পড়িল। “বাংলাদেশ আমার বাংলাদেশ” শীর্ষক সেই লেখাটি আজ হইতে ঠিক এক বছর আগে এই দিনে (১৬ ই ডিসেম্বর, ১৯৭৪) প্রকাশিত হয়। নির্মল সেন নির্ভয়ে অনেক নির্মম সত্য কথা নিবন্ধে তুলে ধরেন। তিনি বলেন যে, ‘মেহেরপুরের আম-বাগান’, ‘বালিগঞ্জের অভিজাত এলাকা’, ‘আগরতলার কয়েকটি ভবন’ এর গল্পই সব গল্প নয়। আছে আরো অনেক গল্প। সেই গল্প-বলাচ্ছলে তিনি তুলিয়া ধরেন ১৯৭২ সালে মুক্তিবাহিনীর ছেলেদের চরিত্র হননের জন্য সেই ষড়যন্ত্রের আলেখ্যও। মাত্র চার বছরের স্বাধীনতা জীবনে বাংলাদেশও কম লাভ করে নাই। আর তাই শ্রদ্ধেয় সাংবাদিক বন্ধু নির্মল সেনকেও (ফেডারেল সাংবাদিক ইউনিয়নের সভাপতিরূপে) গত বছর ২৫শে সেপ্টেম্বর বলিতে শুনিয়াছি, “হয় এই সরকার থাকবে , না হয় আমরা থাকবো। বিশ্বাসঘাতক আমরা নই, সরকারই বিশ্বাসঘাতক”। … সেই ভবিষ্যদ্বাণী সত্য প্রমাণিত হইয়াছে। ওরা নাই, আমরা আছি, আমরা থাকিবও। কিন্তু যাইবার আগে চারটা বছরের মধ্যে ওরা এই জাতির কী করিয়া গিয়াছে, আজ ১৬ই ডিসেম্বর তার একটা সালতামামি সমীক্ষা হওয়া দরকার। বিভিন্ন একাডেমির ‘নিরলস প্রচেষ্টার’ ইতিহাস লেখার নামে তৈলায়ন ও পৃষ্ঠকুন্ডলায়ন চার বছরে যথেষ্ট হইয়াছে। আর নয়। এবার সত্যিকার একটা হিসাব-নিকাশ হউক। একটি বিখ্যাত বৈদেশিক পত্রিকার প্রতিনিধির সহিত এক ‘গোপন সাক্ষাৎকার’ এদেশের জনৈক প্রবীণ বামপন্থী দলপতি দাবী করিয়াছেন যে, ‘পঁচিশ হাজারের অধিক দেশপ্রেমিক রাজনৈতিক কর্মীকে সেই স্বৈরাচারী শাসনামলে নিধণ করা হইয়াছে’। কারও কারও মতে নিধন সংখ্যাটা আরো বৃহৎ। রাষ্ট্রীয় বা দলীয় পর্যায়ে যাহাদের সেই শাসনামলে ‘নির্মুল’ করা হইয়াছে, অনেকের মতে, তাহাদের সংখ্যা নিরূপণের জন্য পাঁচ মিনিটে কুলাইবেনা। তিনি বলেন, “সীমান্তের ওপারে যারা গিয়েছিল তারা সকলেই সৎ এবং সাধু ছিল এ দাবী কেউ করবেনা। অনেক নেতা এবং উপনেতাই সৎ এবং সাধু জীবনযাপন করেননি। এজন্য বিদেশে আমাদের মুখে কলংক লেপন করা হয়েছে। অনেকের জন্য মুখ দেখান ভার হয়েছে। অনেক নেতা ছিলেন যারা সুযোগ পেলে ইয়াহিয়া খানের কাছে এসে আত্মসমর্পণ করতেন। অনেক নেতাই ছিলেন যারা মানুষের দুর্গতির সুযোগ নিয়ে ভারতের ব্যাংকে টাকা জমিয়েছেন। অনেক নেতাই ছিলেন যারা কোনদিন ফ্রন্টে না গিয়ে বাক্স কাধে নিয়ে ছবি তুলে কাগজে ছাপিয়েছেন। তারা আজও আছেন। আছেন বহাল তবিয়তে। কিন্তু তারা তো সব নয়। সব নয় ওরা যারা বাংলাদেশে এসে একগাল দাড়ি দেখিয়ে কাঁধ পর্যন্ত চুল ঝুলিয়ে মুক্তিবাহিনীর লোক সেজেছিল। ওরা সব নয় যারা বাংলাদেশের বুকে গাড়ী বাড়ী হাইজ্যাক করেছিল। তাদের মধ্যে অধিকাংশ মুক্তিবাহিনীর শিবিরের কাছাকাছিও যায়নি। ওরা কলকাতা আর আগরতলার ‘নেতৃত্ব’ করেছে। ওরা ভাগাভাগির জন্য প্রতিযোগিতা করেছে। ওরা গ্রামের হাজার হাজার তরূণকে শত্রুর মুখে ঠেলে দিয়ে কলকাতা, আগরতলা, শিলং আর দিল্লীতে ভাষণ দিয়েছে আর সভা করেছে। “বাংলাদেশ আমার বাংলাদেশ”-এ সেই নেতাদের গল্প বলিয়াছেন নির্মল সেন। ….. সেই নেতা-উপনেতারা এবং লম্বা চুল আর বাবরিওয়ালা হাইজ্যাকাররা ওখানেই থামেন নাই। নির্মল সেনের বক্তব্য অনুযায়ী, তারা ১৯৭২ সালের প্রথম দিন হইতেই খুব সুচতুরভাবে একটা গভীর ষড়যন্ত্র চালাইতেছিলেন প্রকৃত মুক্তিবাহিণীর চরিত্র-হননের উদ্দেশ্যে। তার ভাষায়, সেই ষড়যন্ত্রকারীরা মুজিবনগরে গিয়েছিল, কিন্তু বাংলাদেশের স্বাধীনতা সংগ্রাম তারা সমর্থন করেনি। তারা জানত, মুক্তিবাহিনীর সদস্যরা তাদের চেনে। তারা জানত মুক্তিবাহিনীর সদস্যরা যদি বাংলাদেশে এসে সত্য কথা ফাঁস করে দেয় তাহলেই (‘নেতাদের’) রাজনৈতিক এবং সামাজিক অস্তিত্ব বিপন্ন হবে। তাই এই নেতারা বাংলাদেশে এসেই ষড়যন্ত্র শুরু করেছিলেন। এমনকি যে নেতারা একদিন দালালদের হত্যার জন্য মুক্তিবাহিনীর তরণদের নির্দেশ দিয়েছিল তারাই আবার এই হত্যার জন্য মুক্তিবাহিনীর ছেলেদের বিরুদ্ধে মামলা দায়ের করা শুরু করল। … দিনের পর দিন হাজতে পুরে রাখা হয়েছে। জামিন পর্যন্ত দেয়া হয়নি। এ ঘটনা থেকে একান্তই পরিস্কার, শুধু সীমান্তের এপারে নয়, সীমান্তের ওপারেও যারা ছিলেন তাদের অনেকেই এই বাংলাদেশের স্বধীনতা চাননি। তারা মুক্তিবাহিনীকে বরদাশ্ত করতে পারেননি। তারা জানতেন যে, এই মুক্তিবাহিনীর ছেলেরা যদি বাংলাদেশে ফিরে গিয়ে তাদের এই কাহিনী জনসমক্ষে তুলে ধরতে পারে তাহলে তাদের রেহাই নেই। তাই দেখা গেছে, দেশ স্বাধীন হবার পর প্রতি জেলায় এমন একটি চক্র যে চক্রের নেতারা ওপারে ছিলেন সারাদেশে অসংখ্য নকল মুক্তিবাহিনী সৃষ্টি করেছেন। পার্মিট-লাইসেন্স দিয়ে কিনতে চেষ্টা করেছেন মুক্তিবাহিনীর সৎ তরুনদের। … একদল তরুন দেশের জন্য প্রাণ দিতে গিয়ে পরিচিত হয়েছে চোর বাটপার আর হাইজ্যাকার হিসেবে আর তার ভিত্তিতে রচিত হচ্ছে আরেক ইতিহাস। “বাংলাদেশ আমার বাংলাদেশ” নিবন্ধে নির্মল সেনের এক বছর আগেকার সেই বক্তব্য ছিল আরও দীর্ঘ। অব্যক্তও হয়ত রাখিয়া গিয়াছিল অনেক কিছু, অনেক নেতার অনেক কথা, অনেক কীর্তিমানের অনেক কীর্তিগাঁথা। বলিতে চাহিলেও হয়ত অনেক কথা তখন বলা যায় নাই। বলার উপায় ছিলনা। কারণ, কারোরই ঘাঁড়ের উপর দুইটা মাথা নাই। লেখক নিজেই আরেক প্রসঙ্গে অন্যত্র স্বীকার করিয়াছেন, ‘আমি একজন সাংবাদিক, কিন্তু স্টেনগানকে আমিও অস্বীকার করতে পারিনা’। বস্তুতঃ গত চার বছরের ইতিহাসে একটা বড় অধ্যায়ই এই স্টেনগান, এল-এম-জি, এস-এল-আর এর শ্বেত সন্ত্রাসের ইতিহাস। শোনা যায় বাংলাদেশের একজন বিখ্যাত চিত্র পরিচালক স্বাধীনতার কিছুদিন পর একদা অদ্ভূতভাবে স্বগৃহ হইতে অন্তর্হিত হন। সেই যে নিখোঁজ হইয়া গেলেন আর কোনদিন ফিরিলেন না। একাত্তরের মুক্তিসংগ্রামকালে তিনিও ওপারে গিয়াছিলেন এবং টেপে ও ক্যামেরায় এমন অনেক বাস্তব আলেখ্য নাকি ধরিয়া আনিয়াছিলেন যাহা ডকুমেন্টারি চিত্রাকারে প্রকাশ পাইলে ‘কীর্তিমান নেতা-উপনেতা’দের রেহাই ছিলনা। হি নিউ অল দীজ ‘এফেয়ার্স’ টু মাচ। এবং সেই টু মাচ জানাটাই হইল তার কাল। অকস্মাৎ একদা তিনি নিখোঁজ হইলেন। আর কোনদিন ফিরিলেননা। “বাংলাদেশ আমার বাংলাদেশ” এর বিবরণের সাথে সেই প্রখ্যাত চিত্র পরিচালকের চির অন্তর্ধান ঘটনার কি অদ্ভূত মিল। মাত্র চার বছরের স্বাধীনতা জীবনে বাংলাদেশও কম লাভ করে নাই। আর তাই শ্রদ্ধেয় সাংবাদিক বন্ধু নির্মল সেনকেও (ফেডারেল সাংবাদিক ইউনিয়নের সভাপতিরূপে) গত বছর ২৫শে সেপ্টেম্বর বলিতে শুনিয়াছি, “হয় এই সরকার থাকবে , না হয় আমরা থাকবো। বিশ্বাসঘাতক আমরা নই, সরকারই বিশ্বাসঘাতক”। … সেই ভবিষ্যদ্বাণী সত্য প্রমাণিত হইয়াছে। ওরা নাই, আমরা আছি, আমরা থাকিবও। কিন্তু যাইবার আগে চারটা বছরের মধ্যে ওরা এই জাতির কী করিয়া গিয়াছে, আজ ১৬ই ডিসেম্বর তার একটা সালতামামি সমীক্ষা হওয়া দরকার। বিভিন্ন একাডেমির ‘নিরলস প্রচেষ্টার’ ইতিহাস লেখার নামে তৈলায়ন ও পৃষ্ঠকুন্ডলায়ন চার বছরে যথেষ্ট হইয়াছে। আর নয়। এবার সত্যিকার একটা হিসাব-নিকাশ হউক। একটি বিখ্যাত বৈদেশিক পত্রিকার প্রতিনিধির সহিত এক ‘গোপন সাক্ষাৎকার’ এদেশের জনৈক প্রবীণ বামপন্থী দলপতি দাবী করিয়াছেন যে, ‘পঁচিশ হাজারের অধিক দেশপ্রেমিক রাজনৈতিক কর্মীকে সেই স্বৈরাচারী শাসনামলে নিধণ করা হইয়াছে’। কারও কারও মতে নিধন সংখ্যাটা আরো বৃহৎ। রাষ্ট্রীয় বা দলীয় পর্যায়ে যাহাদের সেই শাসনামলে ‘নির্মুল’ করা হইয়াছে, অনেকের মতে, তাহাদের সংখ্যা নিরূপণের জন্য পাঁচ মিনিটে কুলাইবেনা।…