৭৪’র দুর্ভিক্ষ সরকারের চরম ব্যর্থতার ইতিহাস

৭৪'র দুর্ভিক্ষ সরকারের চরম ব্যর্থতার ইতিহাস

দুর্ভিক্ষ রিলিফ সম্পর্কে এখানে কিছু বলা দরকার। বাংলাদেশে ১৯৭২ সাল থেকেই বিভিন্ন দেশ থেকে নানা ধরণের রিলিফ দ্রব্য আসা শুরু করে। এগুলি ‘বাংলাদেশ রেড ক্রিসেন্ট’ (যা আগে ‘রেড ক্রস’ হিসেবে পরিচিত ছিল) সরাসরি নিজের তত্ত্বাবধানে বিতরণ করতো। এই রেড ক্রিসেন্টের চেয়ারম্যান ছিলেন আওয়ামী লীগ নেতা সংসদ সদস্য ও শেখ মুজিবের অতি ঘনিষ্ঠ সহকর্মী গাজী গোলাম মোস্তফা। তিনি প্রথম থেকেই রেড ক্রিসেন্টের রিলিফ বিতরণের ক্ষেত্রে এমন ব্যাপকভাবে দূর্নীতি করেন যাতে ১৯৭২ সালেই তিনি ‘কম্বল চোর’ হিসেবে পরিচিত হন। ১৯৭৪ সালেও তিনি বাংলাদেশ রেড ক্রিসেন্টের চেয়ারম্যান ছিলেন। দুর্ভিক্ষের সময় যখন লক্ষ লক্ষ মানুষ খাদ্যাভাবে এবং অপুষ্টিজনিত কারণে মৃত্যুবরণ করছে, শীত বস্ত্রের অভাবে উত্তরাঞ্চলে তাদের দূর্দশার সীমা থাকছে না তখনো গাজী গোলাম মোস্তফার চুরি দুর্নীতির কোন শেষ ছিল না। তাকে এসময় লোকে কম্বল চোর ছাড়াও তার নামের আদ্যাক্ষর অনুযায়ী বলতো ‘গগম’!

… দুর্ভিক্ষ প্রসঙ্গে এখানে একটি বিষয় উল্লেখ করলে তৎকালীন শাসক গোষ্ঠী ও সরকারের প্রকৃত চরিত্র উপলব্ধি করা খুব সহজ হবে। দেশে যখন জনগণ এক ভয়াবহ সংকটের মধ্যে পড়েছে, দুর্ভিক্ষ গরীব মানুষদের জীবন কেড়ে নিচ্ছে, সে সময় আওয়ামী লীগের প্রধানমন্ত্রী শেখ মুজিবুর রহমান তার দুই পুত্রের বিবাহ দেন। দুই বিবাহই খুব কাছাকাছি সময়ে অনুষ্ঠিত হয় দারুণ জাঁকজমকপূর্ণভাবে। প্রচার মাধ্যমে এর বিবরণ ব্যাপকভাবে প্রচারিত হয়। দুই পুত্রবধূকেই ভূষিত করা হয় হীরাখচিত স্বর্ণালঙ্কারসহ প্রচুর স্বর্ণালঙ্কারে। তাদের দুজনেরই মাথার জন্য তৈরী হয় সোনার মুকুট। সে সময় এই অবস্থার সাথে শ্রমজীবী ও গরীব জনগণসহ সাধারণ মধ্যবিত্ত মানুষ যে নিজেদের অবস্থা মিলিয়ে দেখেছিলেন এতে সন্দেহ নেই। জনগণের জন্য স্বর্গ বানিয়ে দেওয়ার আওয়াজ তুলে যারা ১৯৭১ সালে ক্ষমতা দখল করেছিল তারা জনগণের জন্য নরক রচনা করে নিজেদের জন্য রচনা করেছিল এক স্বর্গরাজ্য। এই স্বর্গরাজ্য অল্প দিনের মধ্যেই ধ্বংস হয়েছিল॥”

– বদরুদ্দীন উমর / আমার জীবন (চতুর্থ খন্ড) ॥ [জাতীয় সাহিত্য প্রকাশ – এপ্রিল ২০১৩ । পৃ: ১১২-১১৪]

বহুল বিতর্কিত বস্ত্রের অভাবে নাকি জাল দিয়ে গা ঢেকে লজ্জা নিবারণের প্রচেষ্টায় লিপ্ত যুবতী বাসন্তীর ছবি খবরের কাগজের প্রথম পৃষ্ঠায় ছাপা হয়ে দেশে-বিদেশে আমাদের লজ্জা রাখার ঠাঁই রইল না। কেউ কেউ সাফাই গেয়ে থাকে, বাসন্তী ছিল পাগলিনী। তাই ও শরীরে জাল জড়িয়েই রেখেছিল। সরকারকে বিব্রত করতে ওর ছবি ছাপানো হয়েছে। যেন বিব্রত হওয়ার মতো ঘটনা আর ঘটেনি! যেন দুর্ভিক্ষটাও পাগলের কান্ড, সরকারের ভাবমূর্তি নষ্ট করার প্রচেষ্টা। অসংখ্য লোকের অন্নাভাবে মৃত্যু কেবল অতিরঞ্জিত রটনা! ‘৭৪ সেই দুর্ভিক্ষ জাতির জন্য সবচাইতে বড় কলঙ্ক এবং সরকারের চরম ব্যর্থতার ইতিহাস হয়ে রইল। এই সর্বনাশা দুর্ভিক্ষ জাতীয় জীবনকে বড় ধরনের নাড়া দিয়ে গেল। দুর্ভিক্ষ হঠাৎ করে আসে না। আধুনিক বিশ্বে সঠিক সময়ে সঠিক সিদ্ধান্ত এবং পরিকল্পনা গ্র্হণ করলে এ ধরণের বিপর্যয় ঠেকানো সম্ভব। কিন্তু সামন্ত-মানসিকতার বিচার-বিবেচনা নিয়ে ট্রাইবাল চিফদের মতো দেশ শাসন করলে তার পরিণতি এমনিই হতে বাধ্য

“… ভুয়া রেশন কার্ড উদ্ধারের জন্য ওই দিন শহরে কার্ফ্যু থাকায় সামরিক বাহিনীর কাছ থেকে কার্ফ্যু পাস সংগ্রহ করতে হয়। সাবেক ছাত্রলীগ নেতা জাহাঙ্গীর (লেফটেন্যান্ট জাহাঙ্গীর) আমাদের কার্ফ্যু পাস নিয়ে নিজে বাসায় আসে। পাস নিয়ে আমি মা বোনকে আনতে যাওয়ার পর আমার স্ত্রী লেফটেন্যান্ট জাহাঙ্গীরের সঙ্গে সামরিক বাহিনীর যেসব সদস্য আমার বাসায় এসেছিলেন, তাদেরকে রুটি, মাখন, ডিম ও চা দিয়ে আপ্যায়ন করেন। পরে আমার স্ত্রীর মুখে শুনেছি, নাস্তা খাওয়ার সময় নাকি তারা বঙ্গবন্ধুকে অকথ্য ভাষায় গালিগালাজ করে বলেছিলেন, ‘তাদের ভরপেট খাবার দেয়া হয় না।মানবেতর জীবন যাপন করতে হচ্ছে। অথচ রক্ষীবাহিনীর সদস্যদেরকে ভালো ভালো খাবার দেয়া হচ্ছে।’ স্বাধীন দেশে সামরিক বাহিনীর সদস্যদের মুখে বঙ্গবন্ধু সম্পর্কে প্রকাশ্যে এ ধরণের কটূ কথা আমার মনে রেখাপাত করে। যথাসময়ে যথাস্থানে আমি তা জানিয়ে দেই॥” 

– মিজানুর রহমান চৌধুরী (সাবেক প্রধানমন্ত্রী) / রাজনীতির তিন কাল ॥ [ হাফেজা মাহমুদা ফাউন্ডেশন – ফেব্রুয়ারি, ২০০১ । পৃ: ১৪৭ ]  

“… জানা গেল, খাদ্য মজুদ দ্রুত বিপদসীমার ঊর্ধ্বে চলে যাচ্ছে। খাদ্যমন্ত্রীর মুখ শুকনো। এতদিন যে তথ্যাদি পরিবেশন করা হয়েছে তা অনেকটা ‘কাজীর গরু খাতায় আছে, গোয়ালে নেই’ রকম অবস্থা। কেবিনেটে অনেক হম্বিতম্বি করা হল। চালের মজুতদার, মোনাফাখোর এবং কালোবাজারীদের বিরুদ্ধে হুশিয়ারি উচ্চারিত হল। চালের ক্রমবর্ধমান মূল্য আর এক দফা বৃদ্ধি পেল। খাদ্যমন্ত্রী স্বয়ং মৌলবী বাজার, শ্যাম বাজার, সোয়ারী ঘাটে গেলেন ব্যবসায়ীদের সঙ্গে আলোচনা করে মূল্যের ঊর্ধ্বগতি রোধ করার পন্থা বের করতে। ফল হল বিপরীত। ছবিসহ খবর পত্রিকাসমূহে প্রকাশিত হলে বাজারে তার বিরূপ প্রতিক্রিয়া হল। আতঙ্ক ছড়িয়ে পড়ল চালের আড়তদার মহলে। ফলে মূল্যের আরও ঊর্ধ্বগতি।

চারদিক থেকেই অবস্থার অবনতির খবর আসতে লাগল। কথায় বলে, Calamity never comes alone. সংকট কখনও বিচ্ছিন্নভাবে ঘটে না। একটার পর একটা দুরপনেয় ঘটনা ঘটতে থাকল। খাদ্য মন্ত্রণালয় চাল আমদানির ব্যবস্থা করেছিল বলে শোনা গেল। এও শোনা গেল, ক্ষুধার্ত মানুষের মুখে অন্ন তুলে দেওয়ার মানসে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র জাহাজ ভর্তি করে চাল পাঠাবার ব্যবস্থা করছে। কার্যত কিছুই দেখা গেল না। সমালোচনার ঝড় বয়ে গেল। সমাজতন্ত্রের প্রতি অধিকতর ঝুঁকে পড়ার কারণে গোস্বা হয়ে যুক্তরাষ্ট্র তাদের খাদ্য বোঝাই জাহাজ অন্যপথে চালান করে দিয়েছে। বাংলাদেশকে একটা শিক্ষা দিতে হবে। কথাটার সত্যতা যাচাইয়ের অবকাশ নেই।

সমাজতন্ত্রীগণ তেজস্বী ভাষায় মার্কিন সাম্রাজ্যবাদের শ্রাদ্ধ করে ছাড়ল। কিন্তু যারা এতকাল সমাজ বিপ্লব আর শাসননীতির আইডিয়া ধার দিচ্ছিল অকাতরে, তাদের পক্ষ থেকে এক মুঠো খাবার এসে পৌঁছল না বিপদগ্রস্ত নিরন্ন মানুষগুলোর দ্বারে। অনেকে বলে থাকে ওদের নিজেদের উনুনই জ্বলে না মার্কিন সাহায্য ব্যতিরেকে। খাদ্য মন্ত্রণালয়ের কথিত আমদানিকৃত চালের জাহাজও কি সাম্রাজ্যবাদীরা চক্রান্ত করে রাস্তা ঘুরিয়ে ভিয়েতনাম বা পূর্ব আফ্রিকায় পাঠিয়ে দিল! দোষ তো নিশ্চয়ই ওদের। তোমাদের পরিধেয় বস্ত্র খুলে গেছে, লজ্জাস্থান মানুষের দৃষ্টিগোচর হচ্ছে, দোষ কি মানুষের না তোমার অগোছাল স্বভাবের! দোষ যারই হোক, ঘটনা যা ঘটবার ঘটে গেল। বঙ্গবন্ধু বা তার সহকর্মীদের কী আন্তরিকতায় অভাব ছিল? তারা কী চেয়েছে দেশের মানুষ খাদ্যাভাবে প্রাণ হারাক? না, সে কথা কারো সম্বন্ধেই বলা যায় না। কিন্তু মানুষের প্রতি কেবল ভালোবাসা থাকলেই চলবে না। আমি তোদের ভালোবাসি বলে গাল ভরা বুলি আওড়ালে শুকনো ভালোবাসায় চিড়ে ভিজবে না। কাজে দেখাও তোমার ভালোবাসা কতটা নির্ভরযোগ্য।

যোগাড়যন্ত্র না করে তুমি সংসার পাতলে কেন? মানুষকে খেতে-পড়তে দিতে অক্ষম তুমি পিতা সেজে কেবল শাসনই করবে! সোহাগ কী কেবল মুখের বুলি! ‘ভাত দিবার ভাতার না, কিল মারার গোঁসাই’! মানুষেরও চোখ খুলে গিয়েছে। ধবধবে সাদা পাজামা-পাঞ্জাবি পরে, ছয় দফার স্মরণে ছয় বোতাম সম্বলিত কালো মুজিব কোট পরিধান করে, আজানুলম্বিত ঘিয়ে রঙের কাশ্মিরী শাল ঝুলিয়ে ক্ষুধার্ত মানুষকে এক থালা অন্নের পরিবর্তে ধৈর্য ধরার আহ্বান জানালে ওদের ধৈর্যের শেষ বাঁধটি ভেঙে যাওয়ার কথা। কিন্তু অভুক্ত-অশক্ত মানুষ ক্ষুধার যন্ত্রণায় কাতর, সোজা হয়ে দাঁড়াতে পারে না, ওরা কী করতে পারে! নিরম্বু উপবাসে আস্তে আস্তে মৃত্যুর কোলে ঢলে পড়ার পূর্বে তারা তাদের শেষ অভিযোগ জানিয়ে যায় সৃষ্টিকর্তার দরবারে, আল্লাহ তুমি মুখ দিয়েছিলে আহার দিবে বলেই। মুখের সে অন্ন যারা কেড়ে নিল, যারা সে অন্ন মুখে পৌঁছাতে পারল না, তাদের তুমি ক্ষমা কর না মাবুদ।

গ্রামগুলোতে কর্ম সংস্থানের অভাব। কাজ না থাকলে উপার্জন নেই। উপার্জন নেই তো খাবে কি? মানুষ নিজেদের ভিটামাটি ছেড়ে শহরমুখী ছুটতে শুরু করল। ভিক্ষাবৃত্তি বেড়ে গেল। যুবতী মেয়েরা ক্ষুধার জ্বালা সহ্য করতে না পেরে পতিতার খাতায় নাম লেখাল। ঘর থেকে বেরুলেই একের পর এক ভিক্ষুক আর ভিক্ষুক। একটু ভাত, না হয় একটু ভাতের মাড় দাও। ক্ষুধার যন্ত্রণা আর সহ্য করা যায় না।

রাস্তায় পড়ে থাকে চলচ্ছক্তিরহিত নর-নারী। গাড়ি করে যাওয়ার সময় ওদের চোখের দিকে, ওদের কঙ্কালসার দেহের দিকে তাকিয়ে শিউরে উঠি। বাচ্চা কোলে শত ছিন্নবস্ত্রে লজ্জা ঢাকার ব্যর্থ প্রয়াশ করছে মা। বাচ্চাটি মায়ের শুকিয়ে যাওয়া মাই চুষে কিছু না পেয়ে কঁকিয়ে ওঠে। জোরে কাঁদবার শক্তিও নেই।

মানুষ আর কুকুরের পার্থক্য ঘুচে গেল। ডাস্টবিন ঘেঁটে উভয়েই খাদ্য খুঁজে প্রাণান্ত হয়। দেশের উত্তরাঞ্চল অপেক্ষাকৃত দরিদ্র এলাকা বিধায় সেখানে দুর্ভিক্ষের প্রকোপ তীব্র আকারে ছড়িয়ে পরল। অনাহারে অসংখ্য মৃত্যুর সংবাদ প্রতিদিন কাগজে ভরপুর। রংপুর জেলার অবস্থা সবচাইতে শোচনীয়। বিভিন্ন জেলা থেকে অগণিত আদম সন্তানের অনাহারে জীবনহানির সংবাদ এল।

বহুল বিতর্কিত বস্ত্রের অভাবে নাকি জাল দিয়ে গা ঢেকে লজ্জা নিবারণের প্রচেষ্টায় লিপ্ত যুবতী বাসন্তীর ছবি খবরের কাগজের প্রথম পৃষ্ঠায় ছাপা হয়ে দেশে-বিদেশে আমাদের লজ্জা রাখার ঠাঁই রইল না। কেউ কেউ সাফাই গেয়ে থাকে, বাসন্তী ছিল পাগলিনী। তাই ও শরীরে জাল জড়িয়েই রেখেছিল। সরকারকে বিব্রত করতে ওর ছবি ছাপানো হয়েছে। যেন বিব্রত হওয়ার মতো ঘটনা আর ঘটেনি! যেন দুর্ভিক্ষটাও পাগলের কান্ড, সরকারের ভাবমূর্তি নষ্ট করার প্রচেষ্টা। অসংখ্য লোকের অন্নাভাবে মৃত্যু কেবল অতিরঞ্জিত রটনা!

‘৭৪ সেই দুর্ভিক্ষ জাতির জন্য সবচাইতে বড় কলঙ্ক এবং সরকারের চরম ব্যর্থতার ইতিহাস হয়ে রইল। এই সর্বনাশা দুর্ভিক্ষ জাতীয় জীবনকে বড় ধরনের নাড়া দিয়ে গেল। দুর্ভিক্ষ হঠাৎ করে আসে না। আধুনিক বিশ্বে সঠিক সময়ে সঠিক সিদ্ধান্ত এবং পরিকল্পনা গ্র্হণ করলে এ ধরণের বিপর্যয় ঠেকানো সম্ভব। কিন্তু সামন্ত-মানসিকতার বিচার-বিবেচনা নিয়ে ট্রাইবাল চিফদের মতো দেশ শাসন করলে তার পরিণতি এমনিই হতে বাধ্য॥”

– শাহ মোয়াজ্জেম হোসেন (মুজিব সরকারের প্রথম চীফ হুইপ) / বলেছি বলছি বলব ॥ [ অনন্যা – সেপ্টেম্বর, ২০০২ । পৃ: ২৩৪-২৩৬ ]

“… যেহেতু যোদ্ধারা ও যুদ্ধের সমর্থক-সহায়করা সবাই আওয়ামী লীগার ছিল না, সেহেতু স্বাধীন বাঙলায় ন্যায়ত জাতীয় সরকার – দলীয় নয়, গঠিত হওয়া ও চালু রাখা বাঞ্ছিত ছিল নতুন নির্বাচনকাল অবধি। তা হল না, ফলে আওয়ামী লীগাররা সরকারী প্রশ্রয়ে অবাধে দূর্নীতি-দুষ্কৃতি আশ্রয়ী হয়ে শত্রু-সম্পত্তি, ব্যবসা-বাণিজ্য, বাড়ি-ঘর দখল করেছে, যেন তারা পররাজ্য জয় করেছে এমনভাবে লুটপাটে, ব্যক্তিগত শত্রু দমনে হিংসা-প্রতিহিংসা প্রয়োগ করেছে। সম্প্রতি আওয়ামী লীগারদের নরহত্যার একটা ইতিবৃত্ত বের হয়েছে [আহমেদ মুসা সংকলিত] । তাতে গাঁয়ে-গঞ্জে-শহরে-বন্দরে নিহত-নির্যাতিত অনেকের পরিচিতি রয়েছে। রক্ষীবাহিনীর গণনির্যাতন স্মৃতিও আরো রোমহর্ষক।

আওয়ামী লীগাররা সমাজতন্ত্রী ছিল না। তাদের সেই শিক্ষা ও দীক্ষাই ছিল না। সম্ভবত: রাশিয়ার প্রভাবে মার্কসবাদে অজ্ঞ ও অদীক্ষিত সেই লোকেরাই আকস্মিকভাবে উচ্চারণ করল, আমরা সমাজতন্ত্রী। সমাজতন্ত্রী হলেই সেক্যুলার হতে হয়, তারও একটা রাষ্ট্রিক জাতীয়তা থাকে, একটা দলীয় গণতন্ত্রও থাকে। একটি সত্তার বা অঙ্গীকারের প্রত্যঙ্গকে চারটি ভাগে দেখানোই ছিল একটা কপটতা। অবশ্যই স্বীকার করতে হবে যে, রচিত ও গৃহীত সংবিধানের বা শাসনতন্ত্রের [১৯৭২ সন] বাদবাকী অংশ ছিল বাঞ্ছিত মানের গণতন্ত্র সম্মত। এবারেও হয়তো রাশিয়ার প্রভাবেই একনায়কত্ব ভিত্তিক সমাজবাদী দল পরিচালিত রাষ্ট্র বানানোর লক্ষ্যে আকস্মিকভাবে দেশে বাকশাল [BKSAL] বা বাঙলাদেশ কৃষক-শ্রমিক-আওয়ামী লীগ দল গঠিত হল, আইনের জোরে নয়, হুকুমে বিঘোষিত এবং দেশশাসক রূপে, সংবিধানের নিয়মে নয় – গায়ের জোরেই একনায়ক সরকারও প্রতিষ্ঠিত হল। এ-ও ছিল এক ত্রাসের রাজত্ব, শিক্ষিত শহুরে চাকুরে-উকিল-ডাক্তার-মাস্টার-সাংবাদিক-বেণেবুর্জোয়া সবাই কেউ লাভে, কেউ লোভে, কেউ স্বেচ্ছায়, কেউ ভয়ে-ত্রাসে বাকশাল সদস্য হয়ে গেল। সারাদেশে ঝুঁকি নিয়ে বাকী থাকলেন খ্যাত লোকের ক্বচিৎ কেউ, করগণ্য তারা। বাকশালী প্রশাসন বিন্যাসে আঞ্চলিক গভর্ণরের অধীন প্রশাসনিক ব্যবস্থা, পরিপূর্ণভাবে চালু হওয়ার কথা ছিল ‘৭৫ সনের পয়লা সেপ্টেম্বর। তার আগেই ১৪ই আগস্ট রাত্রে রাষ্ট্রপতি শেখ মুজিবুর রহমানকে সবংশে হননের ষড়যন্ত্র বাস্তবায়িত হল। এতে দলের লোকেরা স্তম্ভিত, শত্রুরা আনন্দিত, ত্রস্তরা স্বস্থ ও আস্বস্থ হল।

… ১৯৭২ সনের গোড়ায় মুক্ত নায়ক বিজয় গৌরবে যখন দেশে ফিরলেন তখন তিনি ইন্দিরা গান্ধী উচ্চারিত ও জনগণ বন্দিত ‘জাতির জনক ও পিতা’। এ সময়ে রাজাকার ব্যতীত অপ্রকাশ্যে ক্বচিৎ কারো হয়তো মুজিবে আনুগত্যে অভাব ছিল। গাঁয়ে-গঞ্জে নগরে-বন্দরে, এত জনপ্রিয়তা এ উপমহাদেশে আজ অবধি কেউ কখনো পায়নি। জনগণের উচ্চারিত কিংবা অনুচ্চারিত মনের কথা ছিল ‘তোমার নেতা আমার নেতা শেখ মুজিব’। এহেন নেতা স্বনির্ভর না হয়ে হলেন চাটুকারচালিত। গোড়া থেকেই অস্থির চিত্ত, একবার রাষ্ট্রপতি, একবার প্রধানমন্ত্রী, একবার গণ নির্বাচনে আস্থাবান , একবার একনায়কে স্বস্থ, একবার সংবিধান-সংসদ নিষ্ঠ, আবার ‘বাকশাল’ নায়ক। জাতীয় ও আন্তর্জাতিক নানা নিয়ম-নীতি, রীতি-পদ্ধতি, আইন-কানুন প্রভৃতির ক্ষেত্রেও অস্থিরতা ও ক্ষণপরিবর্তন প্রবণতা ছিল নিত্যকার ব্যাপার। এত বড় নেতার প্রয়োজন ছিল না দল, চেলা কিংবা সমর্থক নির্ভরতার। এভাবে তিনি পড়লেন বারো ভূতের কবলে, শিকার হলেন দশচক্রের, পিতার ভূমিকা তিনি পালন করতে জানলেন না বা পারলেন না। নগরে-বন্দরে গাঁয়ে-গঞ্জে সর্বত্র দেখা দিল জোর-জুলুমের রাজত্ব। শঙ্কায়-ত্রাসে মানুষ অস্থির-অস্বস্থ, সরকারী প্রশ্রয়ে ও আশ্রয়ে গুন্ডা-মস্তান-জালিম হুকুম-হুমকি-হামলা চালাচ্ছিল দূর্বল নিরীহ অসহায় ব্যক্তির ও পরিবারের জান-মাল-গর্দানের ও ইজ্জতের উপর। প্রশাসনও দুর্জনেরে রক্ষা করত, দুর্বলেরে হানি। পঁচিশোর্ধ্বে যে কোন বাঙালীই এর সাক্ষ্য। তাছাড়া সম্প্রতি আহমদ মুসা রচিত ‘ইতিহাসের কাঠগড়ায় আওয়ামী লীগ’ বইতে এ বীভৎস, বর্বর কাড়া-মারার সচিত্র সনাম সস্থান পাথুরে প্রমাণ দেয়া রয়েছে। ১৯৭৪ সনে কয়েক লক্ষের প্রাণঘাতী একটা দূর্ভিক্ষও হয়ে গেল। স্বাধীন দেশে খাদ্যাভাবে আদম সন্তান মরে রইল রাস্তা-ঘাটে, হাটে-বাটে, পথে-প্রান্তরে। বিবেকহীন সরকার ও সরকারী দল ছিল নিষ্ক্রিয় নীরব দর্শকের ভূমিকায়। অবশেষে দেশী বিদেশী ষড়যন্ত্রের ফলে আকস্মিকভাবে সপরিবার ও সপরিজন নিহত হলেন তিনি বাকশালী শাসনে পূর্ণতাদানের মূহুর্তে [১৪ই আগস্ট রাতে ১৯৭৫] । এমন জনপ্রিয় নেতা ও নায়কের এ পরিণাম সত্যি ট্র্যাজিক। কিন্তু দেশবাসী শোক করেনি, স্বস্তিবোধ করেছিল। তার দুই অনুগত জন আবু সাঈদ চৌধুরী ও মালেক উকিলের মন্তব্যই তার সাক্ষ্য॥”

– আহমদ শরীফ / বাঙলার বিপ্লবী পটভূমি ॥ [ কৃষ্ণচূড়া প্রকাশনী – ফেব্রুয়ারি, ২০০৮ । পৃ: ৫৬-৬১] 

বাংলাদেশ স্বাধীন হওয়ার পর বাংলাদেশের মুক্তিযুদ্ধকালে মুক্তিযুদ্ধের ব্যয় নির্বাহের জন্যে মুজিবনগর সরকার কর্তৃক সংগৃহীত ৭৫ কোটি টাকার কোন হদিস পাওয়া গেল না। মুক্তিযুদ্ধের নামে আদায় করা সেই অর্থের কোন হিসাব কেউ-ই দিতে পারলো না। এই অর্থ কিভাবে ব্যয় হলো, কে ব্যয় করলো, আর যদি ব্যয় না-ই হয়ে থাকে তবে কোথায় গেল- এই প্রশ্নগুলো উঠতে শুরু করে।

দেশের মানুষ এই প্রশ্নগুলোর উত্তর না জানলেও একজন জানতেন। তাঁর নাম শেখ মুজিবুর রহমান।

ভারত থেকে স্বাধীনতার পর ঢাকায় এসেছিলেন ইন্দিরা গান্ধী প্রশাসনের প্রিন্সিপাল সেক্রেটারি পি. এন. হাকসার। হাকসার ঢাকায় এসে বিভিন্ন বিষয়ে আলোচনা করেন শেখ মুজিবুর রহমানের সাথে। আলোচনাকালে সামনে আসে মুজিবনগর সরকারের সেই টাকার প্রসঙ্গ যা তখন ভারতীয় ব্যাংকে গচ্ছিত ছিল।

মঈদুল হাসানের স্মৃতিচারণ অনুসারে-

তিনি তাঁকে বলেন, “ভারত সরকার এই টাকাটা ফেরত দিতে চায় কিন্তু কীভাবে আমরা ফেরত পাঠাব। ব্যাংক ড্রাফট করে পাঠাব, নাকি তোমরা জিনিসপত্র কিনবে- জিনিসপত্র কিনলে তার বিপরীতে আমরা ব্লক হিসাবে সেই টাকা দেব? তবে আমরা বিদেশী মুদ্রায় দিতে পারবো না, ভারতীয় মুদ্রায় দেব।”

তখন শেখ মুজিব বললেন টাকাগুলো ট্রাকে করে পাঠিয়ে দিতে। বিস্মিত পি. এন. হাকসার শেখ মুজিবকে বললেন, “ট্রাকে করে টাকা কীভাবে দেবো? আমাদের তো সরকারি হিসাব-পদ্ধতি আছে, ব্যাংকিং পদ্ধতি আছে।” তারপর নাকি শেখ মুজিব বলেছিলেন, “সামনে আমার নির্বাচন, এই টাকা সে জন্যে আমার দরকার হবে।”

পি. এন. হাকসার শেখ মুজিবের এই নীতিবহির্ভূত আচরণ ও অর্থলিপ্সায় ব্যথিত হয়েছিলেন। তিনি মিসেস গান্ধী ও তাঁর সহকর্মীদের এ কথা জানান। ১৯৭২ সালের জুন মাসে ভারতের তৎকালীন পরিকল্পনামন্ত্রী ডি. পি. ধর মঈদুল হাসানকে এই ঘটনার কথা জানান। পরে ১৯৮১ সালে খোদ পি. এন. হাকসারও এর সত্যতা স্বীকার করেন। 

উৎসঃ মঈদুল হাসান, ‘মুক্তিযুদ্ধের পূর্বাপর কথোপকথন’ | পৃষ্ঠা-১৪৩

One thought on “৭৪’র দুর্ভিক্ষ সরকারের চরম ব্যর্থতার ইতিহাস”

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

Shares