হুমায়ূন ফরিদী: আসল রাজার রাজা; নাইবা জুটলো রাজ অনুগ্রহ!

হুমায়ূন ফরিদী: আসল রাজার রাজা; নাইবা জুটলো রাজ অনুগ্রহ!

:: মুজতবা খন্দকার ::  পঞ্জিকা সংশোধন না হলে আজ হতো বসন্তের প্রথম দিন। নতুন হাওয়া ও ফুলের গন্ধ চতুর্দিকে। এমনি এক  বসন্তদিনে আমাদের ছেড়ে চীরবিদায় নিয়েছিলেন জননন্দিত, ভার্সেটাইল অভিনেতা হুমায়ূন ফরীদি। আরেক নন্দিত নাট্যকার  হুমায়ূন আহমেদ বলতেন, প্রতিটি আনন্দের মাঝেই কিছুটা বিষাদ লুকিয়ে থাকে। আজকের এ আনন্দদিনে আমাদের মাঝে বিষাদ হয়ে বাজছে হুমায়ূন ফরীদির মৃত্যু!

ফরিদীকে নিয়ে আরেক হুমায়ুন স্মৃতিচারণ করেছিলেন এভাবে, ‘দৈনিক বাংলার সহকারী সম্পাদক সালেহ চৌধুরীর মাথায় (কাজকর্ম তেমন ছিল না বলেই মনে হয়) অদ্ভুত অদ্ভুত আইডিয়া ভর করত। একদিন এ রকম আইডিয়া ভর করল। তিনি আমার শহীদুল্লাহ হলের বাসায় উপস্থিত হয়ে বললেন, বাংলাদেশে পাঁচজন হুমায়ূন আছে। দৈনিক বাংলায় এদের ছবি একসঙ্গে ছাপা হবে। আমি একটা ফিচার লিখব, নাম ‘পঞ্চ হুমায়ূন’। আমি বললাম, পাঁচজন কারা? সালেহ চৌধুরী বললেন, রাজনীতিবিদ হুমায়ূন রশীদ চৌধুরী, দৈনিক বাংলার সম্পাদক। আহমেদ হুমায়ূন, অধ্যাপক এবং কবি হুমায়ূন আজাদ, অভিনেতা হুমায়ুন ফরীদি এবং তুমি। আমি বললাম, উত্তম প্রস্তাব। তবে এখন না। আরো কিছুদিন যাক। সময় যেতে লাগল, হুমায়ূনরা একের পর ঝরে পড়তে শুরু করলেন। হুমায়ূন রশীদ চৌধুরী গেলেন, আহমেদ হুমায়ূন গেলেন, হুমায়ূন আজাদ গেলেন। হারাধনের পাঁচটি ছেলের মধ্যে রইল বাকি দুই। এই দু’জনের মধ্যে কে আগে ঝরবেন কে জানে! সময় শেষ হওয়ার আগেই হুমায়ুন ফরীদি বিষয়ে কিছু গল্প বলে ফেলতে চাচ্ছি।’

শুরু করি প্রথম পরিচয়ের গল্প দিয়ে। ফরীদির তখন তুঙ্গস্পর্শী জনপ্রিয়তা। বিটিভির অভিনয় রাজ্য দখল করে আছেন। একদিনের কথা- বেইলি রোডে কী কারণে যেন গিয়েছি, হঠাৎ দেখি ফুটপাতে বসে কে যেন আয়েশ করে চা খাচ্ছে। তাকে ঘিরে রাজ্যের ভিড়। স্ট্রিট ম্যাজিশিয়ানরা ম্যাজিক দেখানোর সময় তাদের ঘিরে এ রকম ভিড় হয়। কৌতূহলী হয়ে আমি এগিয়ে গেলাম। ভিড় ঠেলে উঁকি দিলাম, দেখি হুমায়ুন ফরীদি- চা খাচ্ছেন, সিগারেট টানছেন। রাজ্যের মানুষ চোখ বড় বড় করে দৃশ্য দেখছে; যেন তাদের জীবন ধন্য। হঠাৎ ফরীদির আমার উপর চোখ পড়ল। তিনি লজ্জিত গলায় বললেন- আপনি এখানে কী করেন? আমি বললাম, আপনার চা খাওয়া দেখি। ফরীদি ওঠে এসে আমার হাত ধরে বললেন, আশ্চর্য ব্যাপার। মিতা! আসুন তো আমার সঙ্গে। (নামের মিলের কারণে আমরা একজনকে অন্যজন মিতা সম্বোধন করি) তিনি একটা মনিহারী দোকানে আমাকে নিয়ে গেলেন। সেলসম্যানকে বললেন, আপনার দোকানের সবচেয়ে ভালো কলমটি আমাকে দিন। আমি মিতাকে গিফট করব। ফরীদিকে আমি একটি বই উৎসর্গ করেছি। উৎসর্গ পাতায় এই ঘটনাটি উল্লেখ করা আছে। এখন দ্বিতীয় গল্প। শুরুতেই স্থান-কাল-পাত্র উল্লেখ করি। স্থান সুইডেন, কাল ২০০৮, পাত্র মানিক। এই ভদ্রলোকের সুইডেনে একটি রেস্টুরেন্ট আছে। তিনি একদিন নিমন্ত্রণ করলেন তার বাড়িতে। দেশের বাইরে গেলে আমি কোথাও কোনো নিমন্ত্রণ গ্রহণ করি না। কারো বাড়িতে তো কখনো না। মানিক সাহেবের বাড়িতে গেলাম, কারণ তার চেহারা অবিকল হুমায়ুদ ফরীদির মতো। আপন ভাইদের চেহারাতেও এত মিল থাকে না। ভদ্রলোককে এই কথা জানাতেই তিনি বিনয়ী ভঙ্গিতে বললেন, অনেকেই এমন কথা বলে। আমি বললাম, ফরীদির সঙ্গে ব্যক্তিগতভাবে কোনো পরিচয় কি আছে? মানিক বললেন, সে আমার ঘনিষ্ঠ বন্ধু। ১৯৭১ সালে আমি ও ফরীদি পাশাপাশি দাঁড়িয়ে যুদ্ধ করেছি। আমি চমকালাম! ফরীদি যে একজন বীর মুক্তিযোদ্ধা তা আমার জানা ছিল না। মানিকের বাড়িতে আমার জন্য আরো বড় চমক অপেক্ষা করছিল। সেখানে দেখি তার বাড়ির সবচেয়ে সুন্দর ঘরটির নাম ফরীদি। এই ঘরটি তিনি সারাবছর তার বন্ধু হুমায়ুন ফরীদির জন্য সাজিয়ে রাখেন। যদি ফরীদি বেড়াতে আসেন। অন্য কারো সেই ঘরে প্রবেশাধিকার নেই।

তৃতীয় গল্প। সন্ধ্যাবেলায় ফরীদি টেলিফোন করেছেন। আমি ফোন ধরতেই বললেন- মিতা, আপনি কি আচার খান? আমের আচার, তেঁতুলের আচার এসব? আমি বললাম- খাই। ফরীদি বললেন- সন্ধ্যায় আপনার সঙ্গে গল্প করতে আসব। ভাবছি তখন আচার নিয়ে আসব। তিনি গল্প করতে এলেন, সঙ্গে কোনো আচারের বোতল কোথায়? শেষ পর্যন্ত বলা হলো না। আমরা দুজন দুজনকে মিতা ডাকি কিন্তু আমাদের মধ্যে তেমন ঘনিষ্ঠতা নেই। গল্প শেষ করার পর ফরীদি বিদায় নিলেন। রাত ১২টার মতো বাজে। ঘুমানোর আয়োজন করছি- তখন দরজায় কলিং বেল। দরজা খুলে দেখি হুমায়ুন ফরীদির ড্রাইভার। তার সঙ্গে ২৩টা আচারের বোতল। তার দায়িত্ব ছিল দোকানে দোকানে ঘুরে যত রকমের আচারের বোতল ছিল সংগ্রহ করে নিয়ে আসা। সংগ্রহ করতে দেরি হয়েছে বলেই সে এত রাতে এসেছে। চতুর্থ এবং শেষ গল্প। এই গল্পটি শুনেছি আমার প্রিয় প্রতিভাময়ী এক জনপ্রিয় শিল্পীর কাছে। গল্পটি আমার এতই পছন্দ হয়েছিল যে, এই লেখায় উদ্ধৃত করার লোভ সামলাতে পারছি না। গল্পের পটভূমির পরিবর্তন হয়েছে। নতুন পটভূমিতে গল্পটি বলা শোভন হচ্ছে কি না বুঝতে পারছি না। স্বামী-স্ত্রীর ঝগড়া হয়েছে। ফরীদি স্ত্রীর রাগ ভাঙানোর অনেক চেষ্টা করেছেন। রাগ ভাঙাতে পারেননি। সুবর্ণা কঠিন মুখ করে ঘুমাতে গেছেন। ভোরবেলায় ঘুম ভাঙতেই সুবর্ণা হতভম্ব। ঘরের দেয়াল এবং ছাদে ফরীদি লিখে ভর্তি করে ফেলেছে। লেখার বিষয়বস্তু, সুবর্ণা! আমি তোমাকে ভালোবাসি। সুবর্ণা আমার সঙ্গে হাসতে হাসতেই গল্পটা শুরু করেছিলেন, এক সময় দেখি তার চোখে ভালোবাসা এবং মমতার অশ্রু চিকচিক করছে। পাদটীকা, আচ্ছা এই মানুষটি কি অভিনয়কলায় একটি একুশে পদক পেতে পারেন না? এই সম্মান কি তার প্রাপ্য না? (যে পাঁচ হুমায়ূনের নাম করা হলো তাদের মধ্যে ফরীদি ছাড়া বাকি সবাই একুশে পদক পাওয়া) মিতার ষাটতম জন্মদিনে তার প্রতি আমার শুভেচ্ছা। হে পরম করুণাময়, এই নিঃসঙ্গ গুণী মানুষটিকে তুমি তোমার করুণা ধারায় সিক্ত করে রাখ। আমিন।

হুমায়ুনের এই লেখার পর একদিন টুপ করে কাউকে না বলে চলে গেলেন ফরিদী!

১৯৫২ সালের ২৯ মে ঢাকার নারিন্দায় জন্মেছিলেন হুমায়ুন ফরীদি। তার বাবার নাম এটিএম নুরুল ইসলাম, মায়ের নাম বেগম ফরিদা ইসলাম। চার ভাই-বোনের মধ্যে ফরীদি ছিলেন দ্বিতীয়। ইউনাইটেড ইসলামিয়া সরকারি উচ্চ বিদ্যালয়ের ছাত্র ছিলেন তিনি। ১৯৭০ সালে উচ্চমাধ্যমিক পরীক্ষা দেন চাঁদপুর সরকারি কলেজ থেকে। একই বছর ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের অর্গানিক কেমিস্ট্রিতে ভর্তি হন স্নাতক করতে। কিন্তু পরের বছরই মুক্তিযুদ্ধ শুরু হওয়ায় খাতা-কলম বাক্সবন্দি করে কাঁধে তুলে নেন রাইফেল। দীর্ঘ ৯ মাস পাকিস্তানি হানাদারদের বিরুদ্ধে দামাল ছেলের মতো লড়াই করেছেন ফরীদি। স্বাধীনতার পর ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের পরিবর্তে জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়ের অর্থনীতি বিভাগে স্নাতক জীবন শুরু করেন হুমায়ুন ফরীদি। এখানেই তার অভিনয় প্রতিভার বিকাশ হয়েছিল। অর্থনীতির খটমটে তত্ত্ব বাদ দিয়ে সেলিম আল দীনের কাছে নাট্যতত্ত্বে দীক্ষা নেন তিনি। জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়ে থাকতেই সদস্যপদ পান ঢাকা থিয়েটারের। এই নাট্যদল থেকেই ছড়িয়ে পড়তে থাকে তার অভিনয়ের রঙগুলো। ছিলেন বিশ্ববিদ্যালয়ের ছাত্র সংসদের নাট্য সম্পাদক।

নাটক, চলচ্চিত্র কিংবা মঞ্চ- সবখানেই ছিল হুমায়ুন ফরীদির অবাধ বিচরণ। মঞ্চ দিয়েই শুরু। ঢাকা থিয়েটারের ‘শকুন্তলা’, ‘মুনতাসীর ফ্যান্টাসি’, ‘কীর্তনখোলা’, ‘কেরামত মঙ্গল’-এর মতো মঞ্চনাটকে অভিনয় করে নিজেকে প্রস্তুত করেছিলেন। আদায় করে নেন দর্শকের ভালোবাসা। বাংলাদেশ গ্রাম থিয়েটারের সদস্য হিসেবে গ্রাম থিয়েটারের চট্টগ্রাম বিভাগীয় প্রধান হিসেবে কাজ করেছেন তিনি। ঢাকা থিয়েটারের সদস্য হিসেবে শুধু রাজধানীতে নয়, বিভিন্ন জেলার মঞ্চেও অভিনয় করে জনপ্রিয় হয়েছিলেন। মঞ্চের গণ্ডি পেরিয়ে টিভি নাটক আর চলচ্চিত্রেও স্বতন্ত্র অবস্থান গড়ে নেন হুমায়ুন ফরীদি। ১৯৮২ সালে বাংলাদেশ টেলিভিশনে প্রচারিত ‘নীল নকশার সন্ধ্যায়’ ও ‘দূরবীন দিয়ে দেখুন’ নাটকে অভিনয় করে তিনি তাক লাগিয়ে দেন। তার অভিনীত ধারবাহিক নাটক ‘সংশপ্তক’ আজও দর্শকের স্মৃতির পাতায় ভাস্বর। এতে কানকাটা রমজান চরিত্রে অভিনয় করে নিজেকে অন্য এক উচ্চতায় নিয়ে যান তিনি। অন্য নাটকগুলোর মধ্যে আছে ‘ভাঙনের শব্দ শুনি’, ‘বকুলপুর কতদূর’, ‘দুই ভুবনের দুই বাসিন্দা’, ‘একটি লাল শাড়ি’, ‘মহুয়ার মন’, ‘সাত আসমানের সিঁড়ি’, ‘একদিন হঠাৎ’, ‘অযাত্রা’, ‘পাথর সময়’, ‘দুই ভাই’, ‘শীতের পাখি’, ‘কোথাও কেউ নেই’, ‘তিনি একজন’, ‘চন্দ্রগ্রস্ত’, ‘কাছের মানুষ’, ‘মোহনা’, ‘শৃঙ্খল’, ‘প্রিয়জন নিবাস’। সর্বশেষ তিনি ‘তখন হেমন্ত’ নামের একটি ধারাবাহিক নাটক পরিচালনা করেন এবং ‘পূর্ণ চাঁদের অপূর্ণতায়’ নামের একটি নাটকে অভিনয় করেন।

ফরীদির নাট্যাভিনয় থেকে চলচ্চিত্রে আসা ছিল অনেক নাটকীয়। দেশীয় চলচ্চিত্রের তখনকার বেহাল অবস্থা দেখে রূপালি পর্দার জন্য কাজ করবেন কি-না এ বিষয়ে দ্বিধায় ছিলেন তিনি। শেষ পর্যন্ত সুবর্ণা মুস্তাফার অকুণ্ঠ সমর্থনে এবং নিজের দৃঢ়তায় এক নতুন আঙ্গিক নিয়ে বড় পর্দায় আসেন ফরীদি। তানভীর মোকাম্মেলের ‘হুলিয়া’ তার অভিনীত প্রথম ছবি। নব্বই দশকে বাণিজ্যিক ছবির পরিচালক শহীদুল ইসলাম খোকনের ‘সন্ত্রাস’, ‘দিনমজুর’, ‘বীরপুরুষ’ ও ‘লড়াকু’ ছবিতে নেতিবাচক চরিত্রে অভিনয় করেন। এরপরেই দেশীয় চলচ্চিত্রে খলনায়কের চরিত্র পায় এক অন্যমাত্রা। অবস্থা এমনই দাঁড়িয়েছিল যে, একসময় মানুষ নায়কের পরিবর্তে তাকে দেখার জন্যই প্রেক্ষাগৃহে যেতো। তাই শহীদুল ইসলাম খোকন ‘বিশ্বপ্রেমিক’, ‘অপহরণ’, ‘দুঃসাহস’সহ ২৮টি ছবির মধ্যে ২৫টিতেই রাখেন ফরীদিকে। তার অভিনীত ছবির তালিকায় আরও আছে ‘দহন’, ‘একাত্তরের যীশু’, ‘দূরত্ব’, ‘ব্যাচেলর’, ‘জয়যাত্রা’, ‘শ্যামল ছায়া’, ‘মায়ের অধিকার’, ‘অধিকার চাই’, ‘ত্যাগ’, ‘মায়ের মর্যাদা’, ‘মাতৃত্ব’ ও ‘আহা!’র মতো ছবিতে অভিনয় করে এ দেশের চলচ্চিত্রাঙ্গনে এক উল্লেখযোগ্য পরিবর্তন আনেন ফরীদি। অভিনেতার।

‘হুমায়ুন ফরীদির মতো শিল্পী যেকোনো দেশে জন্মাতে যুগ যুগ সময় লাগে, শতাধিক বছর লাগে। ও একজন ভার্সেটাইল শিল্পী। তাঁকে জিনিয়াসই বলা যায়।’ হুমায়ুন ফরীদিকে নিয়ে কথাগুলো বলেছিলেন প্রয়াত নাট্যজন আতিকুল হক চৌধুরী।আরেক নাট্যজন রামেন্দু মজুমদার বলেছিলেন, ‘হুমায়ুন ফরীদি যখন প্রথম মঞ্চনাটকে অভিনয় করা শুরু করল, তখনই আমি সবাইকে বলেছিলাম এই ছেলে মঞ্চ কাঁপাবে। অবশ্য ফরীদি কিন্তু মঞ্চের চেয়েও তুমুল জনপ্রিয়তা পেয়েছিল চলচ্চিত্রে। তার রসবোধ ছিল প্রখর। কোনো একটা সিরিয়াস মুহূর্তকে তাৎক্ষণিকভাবে প্রাণচাঞ্চল্যে ভরিয়ে দিতে তাঁর তুলনা ছিল না।’মঞ্চ, টিভি ও চলচ্চিত্রের শক্তিমান এই অভিনেতাকে নিয়ে সংস্কৃতিজগতের প্রায় সবারই এমনটাই অভিমত। অভিনেতা হিসেবে তিনি যেমন শক্তিমান, মানুষ হিসেবেও ছিলেন অনন্য।
বর্ণাঢ্য অভিনয় জীবনে হুমায়ুন ফরীদি চলচ্চিত্র, টেলিভিশন ও মঞ্চে সমান দাপটের সঙ্গে অভিনয় করেছেন। অর্জন করেছেন দেশ-বিদেশের লাখো-কোটি ভক্তের ভালোবাসা। অভিনেতা হুমায়ুন ফরীদি বাংলাদেশ টেলিভিশনে প্রচারিত বিখ্যাত সংশপ্তক নাটকে ‘কানকাটা রমজান’ চরিত্রকে অন্যমাত্রায় ফুটিয়ে তোলেন। আর যে নামটি এখনো সেকালের রুচীবোদ্ধা দর্শকদের কাছে আজো চীরস্মরণীয় হয়ে আছে।দারুণ বুদ্ধিদীপ্ত ও রোমান্টিক মানুষ হুমায়ুন ফরীদি আশির দশকের শুরুতে বেলি ফুলের মালা দিয়ে ফরিদপুরের মেয়ে মিনুকে বিয়ে করেন। তাঁর এ বিয়ে সে সময় সারা দেশে বেশ আলোচিত ছিল। সে সংসারে দেবযানী নামে একটি কন্যাসন্তান জন্ম নেয়। পরে হুমায়ুন ফরীদি সংসার শুরু করেন অভিনেত্রী সুবর্ণা মুস্তাফার সঙ্গে। এই গুণী শিল্পীর ব্যক্তিজীবন খুব বেশি সুখের ছিলো না। আশির দশকের শুরুর দিকে মিনুকে বিয়ে করেছিলেন। ২০০৮ সালে সেই সম্পর্কেরও বিচ্ছেদ হয়। পরের সময়গুলো অনেকটা নিঃসঙ্গ কেটেছে এই শক্তিমান অভিনেতার।

 জীবদ্দশায় জাতীয় চলচ্চিত্র পুরস্কার, বাংলাদেশ চলচ্চিত্র সাংবাদিক বাচসাস পুরস্কার পেলেও পাননি রাষ্ট্রীয় কোনো পুরস্কার। কিন্তু তার চেয়ে কম গুনী, শিল্পী, অভিনেতারাও তো  রাষ্ট্রীয় পদক পেয়েছেন। কিন্তু হুমায়ূন ফরিদীকে কেন দেওয়া হলোনা একুশে পদক কিম্বা স্বাধীনতা পদক?  কারণটা কেউ বলেননা, আমাদের মত দলীয় সংকীর্নতার দেশে কোনো ব্রাকেটে কিম্বা বন্ধনিতে নিজেকে আবদ্ধ না করলে, তার খ্যাতি যশ, প্রীতি কিম্বা ফুলেল সংবর্ধনা পাওয়া কঠিন। সেটা ফরিদী জানতেন। কিন্তু কখনোই দল কিম্বা ব্যক্তিপূজো করেননি। রাজনীতিটাও সেইভাবে  তাঁকে টানেনি কখনো। তার সমসাময়িক অভিনেতা-অভিনেত্রীরা যখন গড্ডালিকায় গা ভাসিয়ে দলীয় ক্ষমতার আদর্শ বাস্তবায়নে, মঞ্চে উঠেছেন, রাজনীতিক বক্তব্য দিয়েছেন।  সেখানে ফরিদী একেবারে নির্বিকার। যেন, তিনি এ সমাজের মাঝে বাস করেও  দূর দ্বিপের একা একজন। যে কারনে তার বন্ধু সুহৃদরা তাকে একা ফেলে তর তর করে খ্যাতি বিত্তের চূড়ায় উঠছিলো। ফরিদি তখন, তীমিরের যাত্রী। সবাই যখন রাজঅনুগ্রহ, রাজমাল্য,পদকে একের পর এক পদকে ভূষিত হচ্ছিলেন। তখন ফরিদির মত গুনী অভিনেতা ছিলেন, সবার কাছে ব্রাত্য। এই জন্য হুমায়ুন আহমেদ অনুযোগের সুরে বলেছিলেন, পঞ্চপান্ডবের চারজন যখন রাষ্ট্রীয় পদক পেয়ে ধন্য। সেখানে কেবল ফরিদীর হাত রিক্ত! আসলেই কি ফরিদী জীবদ্দদশায় কিছুই পাননি। না পাননি বললে ভুল হবে। একথা তো ঠিক তিনি রাষ্ট্রীয় কোনো পুরস্কার পাননি ঠিকই.. কিন্তু তার অগুনতি, ভক্ত, সুহৃদ, শুভান্যুধায়ীদের ভালবাসা আর জয়মাল্য ঠিকই পরেছেন ললাটে। তিনি তো আসল রাজার রাজা; নাইবা জুটলো রাজ অনুগ্রহ!

One thought on “হুমায়ূন ফরিদী: আসল রাজার রাজা; নাইবা জুটলো রাজ অনুগ্রহ!”

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

Shares