‘হিজবুল বাহার’-এ দেখা জিয়া: আমার মাটি আমার সমুদ্র

'হিজবুল বাহার'-এ দেখা জিয়া: আমার মাটি আমার সমুদ্র

:: মুনশী আবদুল মান্নান ::

কখনও সমুদ্র দেখিনি। রূপকথা, উপকথা, গল্প, উপন্যাস ও ভ্রমণ কাহিনীতে সমূদ্র যতটুকু বাণীরূপে ধরা পড়ে কিংবা চলচ্চিত্রে যতটুক দৃশ্য গ্রাহ্য করে তোলা সম্ভব হয়, তার বেশি সমুদ্র সম্পর্কে আর কোন ধারণা আমার ছিলনা। সমুদ্র চোখে দেখার, কাছে থেকে দেখার প্রবল আকর্ষণ মনের মধ্যে আশৈশবই ছিল। তবে কতদিন এবং কি ভাবে এই আকর্ষণ তৈরি হয়েছিল জানি না। বঙ্গোপসাগরকে, যার সঙ্গে আমার আত্মীয়তা জন্মসূত্রে বাস্তবে দেখার এক অপ্রতিরোধ্য আবেগ সব সময়ই ছিল।


১৯৮১ সালের জানুয়ারি মাসে অনেকটা হঠাৎ করে বঙ্গোপসাগরকে দর্শনের সুযোগ এসে গেল।১৬ কি ১৭ তারিখ হবে, সহকর্মী বন্ধুবর আ.ক.ম. রুহুল আমিন এসে বললেন, ১৮ তারিখ রাতের ট্রেনে চট্টগ্রাম যেতে হবে। ১৯ তারিখে প্রেসিডেন্ট জিয়াউর রহমানের নেতৃত্বে সমুদ্র সফরে আমিও আমন্ত্রিত। প্রথামে আমিও বিশ্বাস করতে চাই নি। পরে তার কথাতেই বুঝলাম ঐ সফরে যাওয়ার ব্যাপারটি তিনিই নিশ্চিত করেছেন।
এর আগে পত্র-পত্রিকায় খবর বেরিয়েছিল, প্রেসিডেন্ট নাকি বঙ্গোপসাগরে প্রমোদ ভ্রমণে যাচ্ছেন। এই ভ্রমণ সম্পর্কে নানা রকম রসালো কথা-বার্তাও তৈরী হয়েছিল। এটা যে নিতান্তই তাঁর রাজনৈতিক বিরোধীদের প্রচার ছিল তাকে কিছুটা হলেও হেয় প্রতিপন্ন করার অপচেষ্টা ছিল সেটা সফরে শরিক হয়ে বুঝতে মোটেই দেরি হয়নি। যাহোক, বঙ্গোপসাগর দেখার দীর্ঘ লালিত স্বপ্ন এভাবে সফল হবে, ভাবতে পারি নি। অতএব সানন্দে রাজি হয়ে গেলাম।এটা ছিল ‘সমুদ্র সম্পদ আহরণ ও পর্যবক্ষেণ’ সংক্রান্ত দ্বিতীয় অভিলাষ। এর আগে গঠিত সমুদ্র সম্পদ অনুসন্ধান ও আহরণ সংক্রান্ত জাতীয় কমিটিই ছিল এই সফরের আয়োজক সংস্থা। তিনদিনের এই অভিযান শুরু হয়েছিল ১৯ জানুয়ারি। প্রধানত: কৃতী ছাত্র-ছাত্রী ও তরুণদের বঙ্গেপসাগর ও তার সম্পদরাজি সম্পর্কে একটা ধারণা প্রদানের জন্যই এই অভিযানের ব্যবস্থা করা হয়েছিল। তাদের সঙ্গে এই অভিযাত্রায় আরও ছিলেন সমুদ্র বিজ্ঞানী, ভূ-বিজ্ঞান, শিক্ষক ও সাংবাদিক।

এই সফরের চার মাসের কিছু বেশী সময়ের মধ্যে প্রেসিডেন্ট জিয়াউর রহমান চট্টগ্রামের সার্কিট হাউজে মর্মান্তিকভাবে শাহাদত বরণ করেন। আজ বুঝতে পারি, কেন ষড়যন্ত্রকারীরা তাঁকে সরিয়ে দেওয়ার কাজটি এত দ্রুত সম্পন্ন করেছিল। তিনি দেশের স্বাধীনতা-সার্বভৌমতের ও স্বার্থের বিরুদ্ধে ষড়যন্ত্র করছে তাদের চিহ্নিত করতে পেরেছিলেন এবং তাদের কথা দেশের মানুষকে জানিয়ে দেওয়ার কাজ শুরু করেছিলেন। তিনি কি সেদিন জানতে পেরেছিলেন, দেশের মাটি ও সমুদ্রের বিরুদ্ধে যারা ষড়যন্ত্র করছে, তারা তাঁর জীবনের বিরুদ্ধেও ষড়যন্ত্রে লিপ্ত রয়েছে?


আমরা যারা এ অভিযানে শরিক হয়েছিলাম, তাদের কাছে এটা ছিল একটা অভূতপূর্ব ঘটনা। এ রকম ঘটনা অতীতে কখনো ঘটেনি। তখনও সমুদ্র ছিল, জাহাজ ছিল, এ রকম অভিযানে তখনও বেরিয়ে পড়া যেতো। অর্থপূর্ণ কাজে সমুদ্র সফর অতীতে যতদর দৃষ্টি যায়, দেখি না। স্বীকার করতে দ্বিধা নেই, উদ্যোগ ও উদ্যোক্তার অভাবেই অতীতে এটা হয়নি।


ছাত্র-ছাত্রী, ও যুবক শ্রেণীকে শৃংখলাবদ্ধ জ্ঞান অন্বেষণে পরিচালিত করার প্রাথমিক কাজ হচ্ছে উদ্বুদ্ধকরণের কাজ। এখনও পর্যন্ত আমাদের দেশে শিক্ষা, সমাজ ও কর্মজীবনের বিভিন্ন দিকে যে অবিন্যাস্ত অব্যবস্থা বর্তমানে রয়েছে, তা থেকে জ্ঞানের পথে, উদ্বাবনের পথে, কমের পথে ছাত্র-ছাত্রী ও যুবক শ্রেনীকে নিয়ে আসতে হলে আগে প্রয়োজন এ সব ব্যাপারে তাদের উদ্বুদ্ধ করে তোলা। এই ছাত্র-ছাত্রী ও যুব সমাজের প্রতিনিধিত্বশীল অংশকে নিয়ে সমুদ্রে জাহাজ ভাসানো, সমুদ্র ও সমুদ্র সম্পদের সঙ্গে তাদের চাক্ষুষ পরিচয় ঘটিয়ে দেওয়ার একটা বড় উদ্দেশ্য ছিল তাদের ধ্বংস থেকে পুনর্গঠন, বিশৃংখলা থেকে শৃংখলা, হতাশা থেকে আশার আলোয় নিয়ে আসা, জাতীর উন্নয়ন ও কল্যাণে তাদের ভূমিকাকে স্পষ্ট করা এবং এ ব্যাপারে তাদেরকে অনুপ্রাণিত করা।


১৯ জানুয়রি বেলা ১১ টায় চট্টগ্রাম বন্দর থেকে প্রায় দু’হাজার অভিযাত্রী নিয়ে বিরাটকায় জাহাজ ‘হিজবুল বাহার’ সমুদ্র যাত্রা শুরু করে। হিজবুল বাহার ৫৩১ ফুট দীর্ঘ একটি জাহাজ। ১৯৫৩ সালে এটি নির্র্মিত হয় ফ্রান্সে। ১৯৭৭ সালে খরিদা সূত্রে এর মালিক হয় বাংলাদশে। প্রধানত: হজযাত্রী পরিবহনের জন্যই এটি কেনা হয়েছিল। এরই একটি ক্যাবিনে আমাদের কয়েক জনের থাকার ব্যবস্থা হয়েছিল। জাহাজটি যখন ধীরে ধীরে এগিয়ে যাচ্ছিল, তখন আমাদের সকলের দৃষ্টিই ছিল বাইরে। সে এক অপূর্ব দৃশ্য। সমুদের পটভূমিকায় তার তীরভূমি দুর থেকে কি ধরণের দৃষ্টিনন্দন দৃশ্যপটে ধরা পড়ে- না দেখে কল্পনা করা যায় না। ‘হিজবুল বাহারে’র ছাদে তোলা হয়ে ছিল জাতীয় পতাকা। তার সঙ্গে প্রেসিডেন্টের পতাকাও। জাহাজের সামনে নির্দিষ্ট দূরত্ব বজায় রেখে সবার আগে চলছিল নৌ-বাহিনীর ফ্রিগেট ‘ওমর ফারুক’, তার পেছনে পর পর দুটি গানবোট। জাহাজের পেছনে আরো দুটি গানবোট সমুদ্রে হিজবুল বাহারের নিরাপত্তা এবং একটি নৌ-মহড়া প্রদর্শনের জন্যেই এই নৌ-যুদ্ধযান এই সফরের সঙ্গে যুক্ত হয়েছিল। এছাড়া ‘অনুসন্ধানী’ নামে আরও একটি জাহাজ ছিল। ‘অনুসন্ধানী’ সমুদ্র সংক্রান্ত গবেষণা জাহাজ। একদিন আগে এই জাহাজ সমুদ্রে যাত্রা করেছিল এবং ‘হিজবুল বাহারে’র সঙ্গে মিলিত হয়েছিল একদিন পর। অনুসন্ধানীতে বিজ্ঞানী ও বিশেষজ্ঞরা ছিলেন। তারা সমুদ্রের লবণাক্ততা, গভীরতা, মাছের অবস্থান সংক্রান্ত তথ্য সংগ্রহ করেন। মাছ ধরার কাজেও অনুসন্ধানীকে ব্যবহার করা হয়। এতে ১০০ টন মাছ রাখার হিমাগার আছে। সফরকালে অনুসন্ধানীর কর্মীরা কিছু মাছও ধরেছিলেন।


‘হিজবুল বাহার’ চট্টগ্রাম বন্দরে ফিরে এসেছিল ২১ জানুয়ারি বিকেল তিনটায়। আমরা সাগর বক্ষে ২৩০ মাইল এলাকা ভ্রমণ করেছিলাম। আগেই উল্লেখ করা হয়েছে, এই সফরের একটা বিশেষ উদ্দেশ্য ছিল, নিছক ভ্রমণ এর লক্ষ্য ছিল না। এই তিন দিনে আমরা সমুদ্রে সূর্যাস্ত ও সূর্যোদয় দেখেছি। হাজার হাজার ফুট পানির ওপরে দাঁড়িয়ে যতদুর দৃষ্টি যায় অথৈই সমুদ্রের নীল পানি দেখেছি। সাগরের বিশালতায় জীবনের অনিত্যতা ও ক্ষুদ্রতাকে আবিস্কার করেছি। দূর্লভ নৌ-মহড়া দেখেছি। এটি যে কোনো মানুষের জন্যই একটি অনিবার্য স্মৃতি হয়ে থাকার মতো ঘটনা। সে রাতে মাইক যোগে আমাদের জানানো হলো, নৌ-মহড়া অনুষ্ঠিত হবে। কোন দিকে মহড়া অনুষ্ঠিত হবে এবং কোথায় গেলে বা দাঁড়ালে মহড়া দেখা যাবে তাও বলে দেওয়া হলো,আমরা নির্দেশ মোতাবেক জাহাজের ছাদে চলে গেলাম এবং প্রতিক্ষা করতে থাকলাম। হঠাৎ বিকট একটা শব্দ হলো, দেখলাম আকাশে একটা স্থির অগ্নিগোলক। সঙ্গে সঙ্গে ঐ অগ্নিগোলক লক্ষ করে গানবোট থেকে গোলা বর্ষণ করা হলো এবং কিছুক্ষণের মধ্যেই নির্বাপতি হলো। এরপর কিভাবে নৌ-যুদ্ধ হয়, কিভাবে সমুদ্রের তলদেশের সাবমেরিনে আঘাত করা হয়, তাও দেখানো হলো। যারা এই দৃশ্য দেখিনি তাদের কাছে বর্ণনা করে পুরো ব্যাপারটি বুঝানো সম্ভব নয়।


এই তিন দিনে অনেকগুলো ‘গ্রুপ ডিসকাশন’ সেমিনার, সাধারণ আলোচনা ও সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠান হয়। প্রেসিডেন্ট জিয়াউর রহমান ছাত্র-ছাত্রীদের সঙ্গে, যুবকর্মীদের সংঙ্গে, বিজ্ঞানী-বিশেষজ্ঞদের সঙ্গে পৃৃথক পৃথকভাবে আলোচনা করেন। তাদের সঙ্গে ব্যক্তিগত পর্যায়েও মতামত বিনিময় করেন।


২০ জানুয়ারি গভীর রাতে প্রেসিডেন্ট জিয়া সকলের উদ্দেশ্যে ভাষণ দান করেন। সমুদ্রের যে অবস্থানে দাঁড়িয়ে তিনি এই ভাষণ দেন, সেখানে পানির গভীরতা ছিল সাড়ে চার হাজার ফুট। আমার বিবেচনায় প্রেসিডেন্ট জিয়ার এই ভাষণ ছিল তাঁর দেওয়া সকল ভাষণের মধ্যে অন্যতম শ্রেষ্ঠ ভাষণ। আমরা শুধু এই সফরে আমদের সমুদ্রকে দেখলাম না, তার বুকে দাঁড়িয়ে তার বিশাল হৃদয়ের প্রেসিডেন্ট জিয়াকে নতুন করে আবিষ্কার করলাম। তাঁকে অনেকবার দেখেছি। অনকে কথা তাঁর কাছ থেকে শুনেছি। তবু বলবো, তাঁকে পুরোপুরি জানতে পারিনি। সমুদ্র সফরে তাঁকে জানলাম। সফরে না এলে এই জানা অসম্পূর্ণ থাকতো। সমুদ্র দর্শন অপেক্ষা আমার কাছে প্রেসিডেন্ট জিয়াকে জানা এবং তাঁর দেওয়া জাতির দিক-নির্দেশক ভাষণ শোনা এখন অনেক বেশী গুরুত্বপূর্ণ বলে মনে হয়।পৌনে দুইঘন্টা স্থায়ী ঐ ভাষণের শুরুতে তিনি প্রথমে সবাইকে স্বাগত জানালেন। পরে কেন এই সমুদ্র অভিযান, তার ব্যাখ্যা করলেন।এর পর একে একে দেশের অবস্থা বর্ণনা করলেন। আমদের বিশেষ করে ছাত্র ও যুুবকদের কী করণীয়, তা বললেন। একটি ঘোষণা দিলেন। এবং সব শেষে একটি হুশিয়ারি উচ্চারণ করে যথারীতি তাঁর ঐতিহাসিক ভাষণের সমাপ্তি টানলেন।


আগেই উল্লেখ করা হয়েছে, কিছু পত্র-পত্রিকা প্রেসিডেন্ট জিয়ার এই সমুদ্র সফর সম্পর্কে বিরূপ মন্তব্য করেছিল। রাজনৈতিক নেতাদেরও কেউ কেউ এ নিয়ে কটু মন্তব্য করেছিলেন। প্রেসিডেন্ট জিয়ারও এসব জানা ছিল। তিনি তাই শুরুতেই সমুদ্র সফরের কারণ ব্যাখ্যা করলেন, ‘আপনারা জানেন, কোন কোন পত্রিকা ও কেউ কেউ এই সফরকে প্রমোদ ভ্রমণ বলে উল্লেখ করেছেন এবং এই সফরের প্রয়াসকে বাহুল্য ও অপচয় বলে মন্তব্য করেছেন। এ প্রসঙ্গে স্পষ্ট ভাবে আপনাদের জানিয়ে দেই, এটা প্রমোদ ভ্রমণ নয়। এর একটি বিশেষ উদ্দেশ্য আছে এবং কি সেই উদ্দেশ্য ইতিমধ্যে তাঁর কিছু আপনারা জানতে পেরেছেন। সত্য বটে, এই সফরে বেশ কিছু অর্থ খরচ হচ্ছে এবং এ অর্থ জাতিরই অর্থ। কিন্তু একে আমি অপচয় বলি না। আমার বিবেচনায়, এটা বিনিয়োগ এবং এ বিনিয়োগ জাতির বৃহত্তর কল্যাণেই করা হচ্ছে। আপনারা জানেন, সমুদ্র বিশালতার প্রতীক, উদ্দামতার প্রতীক।’সমুদ্রে এলে মানুষ তার সংকীর্ণতাকে, তার কুপমন্ডুকতাকে বিসর্জন দিতে পারে। উদারতার, বিশালতার ও উদ্দামতার অনুপ্রেরণা সমুদ্রের কাছে থেকে লাভ করা যেতে পারে। যাদের আমি এখানে ডেকে এনেছি, তাদেও মধ্যে বিশেষ করে তরুণ ও যুবকরা সংকীর্ণতাকে ও কুপমন্ডুকতা পরিহার করে উদার, উদ্দাম ও সাহসী হয়ে উঠুক এটা আমি চাই এবং বিশ্বাস করি, এই সফর তাদের বিশেষভাবে অনুপ্রাণিত করবে।


আসলে আমাদের জেনারেশনের দেশের জন্য বেশি কিছু দেওয়ার বা করার নেই। যাদের বয়স ৩০ বছরের নিচে, আমরা তাদেরকেই ধরতে চাই, সেই জেনোরেশনকে জাতি পরিচালনার উপযুক্ত নাগরিক হিসেবে গড়ে তুলতে চাই। এটাই আমাদের জন্য সবচেয়ে বড় কাজ। আমি আপনাদের এখানে ডেকে এনেছি আমাদের সমুদ্র, সমুদ্রের সীমানা, সমুদেরর সম্পদ ও সম্ভাবনাকে দেখানোর জন্য, তথা দেশকে দেখানোর জন্য। আমাদের দেশের সমতল ভূমির পাশাপাশি, পাহাড় আছে, সমুদ্র আছে, বনভূমি আছে আমরা অনেকেই তা চোখে দেখিনি। দেশকে ভালোভাবে, পুরোপুরিভাবে না দেখলে, না জানলে কিভাবে দেশের প্রতি মমতা ও ভালবাসা জন্মাবে। দেশ প্রেমের জন্য দেশের সব কিছু দেখা ও জানা প্রয়োজন।


“সমুদ্র গবেষণা এবং সমুদ্রসম্পদ আহরনে বিভিন্ন দেশের অগ্রতির কথা উল্লেখ করে প্রেসিডেন্ট বললেন, পৃথিবীর সব সাগর-উপসাগর জরিপ হয়েছে। একমাত্র বঙ্গোপসাগরেরই কোন জরিপ হয়নি। অথচ এই সাগরেও বিপুল সম্পদ লুকিয়ে আছে। জাতির উন্নয়ন ও অগ্রগতির জন্য সমুদ্রের সম্পদ অনুসন্ধান, আহরণ ও ব্যবহারের ব্যবস্থা আমাদের করতে হবে। আজ এই সফরে যে সব কৃতি ছাত্র এসেছ, সফরের অভিজ্ঞতা যদি তাদের কিছু সংখ্যককেও সমুদ্রের প্রতি আগ্রহী করে তাহলে এবং তারা যদি ভবিষ্যতে সমুদ্র গবেষণায়, সমুদ্র সম্পদঅনুসন্ধান ও আহরণে নিজেদের নিয়োজিত করে, তাহলে জাতির মহকল্যাণ হবে। উন্নতি হবে। এই সফেরের একটি লক্ষ্যই হলো এ ব্যাপারে তাদের উদ্বুদ্ধ ও অনুপ্রাণিত করা । এদিক থেকে আমি মনে করি, এই সফরের ব্যয় অপচয় নয়, বিনিয়োগ। এ নিয়ে যারা সমালোচনায় উৎকণ্ঠা, তারা না জেনে, না বুঝে হৈ চৈ করছেন। এ ব্যাপারে আমার বলার কিছু নেই কিংবা এ দিকে কান দেওয়ার কোন প্রয়োজনীয়তা আছে বলে আমি মনে করিনা।”


বৈজ্ঞানিকদের দৃষ্টিতে পৃথিবী কিভাবে গড়ে উঠেছে তার বর্ণনা দিয়ে প্রেসিডেন্ট তাঁর সামনে উপবিষ্ট বিজ্ঞানীদের প্রশ্ন করলেন, “বিজ্ঞানীরা বলুন, আমার কথা ঠিক কিনা? সবাই সমস্বরে বললেন: “ঠিক।” অত:পর তিনি বললেন: “পৃথিবী যদি একই উপাদানে গড়ে উঠে, তবে অন্যসব দেশের মাটির অভ্যন্তরেও যে সব খনিজ সামগ্রী ও পদার্থ রয়েছে আমাদের দেশের মাটির অভ্যন্তরেও কমবেশী তা আছে। উপাদানের কম বেশির কারনে সম্পদের পরিমাণ কমবেশি হতে পারে কিংবা কোন দেশে সম্পদ মাটির উপরিভাগ, কোন দেশে মাটির গভীরে থাকতে পারে, তবে সম্পদ যে থাকবেই তাতে কোন সন্দেহ নেই।” কণ্ঠে গভীর প্রত্যয় ও দৃঢ়তা এনে এরপর তিনি বললেন: “বাংলাদেশে গ্যাস আছে, তেল আছে, কয়লা আছে, পাথর আছে, এমন কি সোনা বা হিরের মত মূল্যবান সম্পদ থাকাও অসম্ভব নয়। তবে অন্যান্য দেশের তুলনায় বাংলাদেশে খনিজ পদার্থ ও সামগ্রী রয়েছে মাটির অনেক গভীরে। “প্রেসিডেন্ট তাঁর কথাকে বিশ্বাসযোগ্য ও প্রমাণযোগ্য করার জন্য বললেন: “আপনারা জানেন গ্যাস পাওয়া গেছে এবং গ্যাসের বিপুল মজুদ রয়েছে। তৈল আছে এবং আমরা তেলও তুলছি।” এই বলেই তিনি পাশেই রক্ষিত ব্যাগ থেকে তেল ভর্তি ছোট্ট একটা শিশি বের করে সবাইকে দেখিয়ে বললেন, “এই হলো বাংলাদেেশর তেল-পেট্রোল। দেশের উন্নয়ন ও অগ্রগতির অপার সম্ভাবনাও লুকিয়ে আছে এই তেলের মধ্যে। এই তেল আমাদের সম্পদকে সুষ্ঠুভাবে সদ্ব্যবহার করতে পারি তবে আমাদের দুঃখ, দারিদ্র ও অসহায়ত্ব থাকবেনা।”

দেশের দারিদ্র, জনসংখ্যার আধিক্য ইত্যাদির প্রসঙ্গ উল্লেখ করে প্রেসিডেন্ট জিয়া বললেন, “পৃথিবীর বিভিন্ন দেশে ভূপৃষ্ঠের সম্পদ দ্রুতলোপ পাচ্ছে, ভূগভের সম্পদ অনুসন্ধান ও আহরণ এই প্রেক্ষাপটে আরও জোরদার হচেছ। মানুষ আশংকা করছে, ভূগভের সম্পদও একদিন নিঃশেষ হয়ে যাবে। এই আশংকা সামনে রেখেই উন্নত দেশেগুলো সম্পদের অফুরন্ত ভান্ডার সমুদ্রের দিকে নজর দিয়েছে। তারা সমুদ্রের তলদেশে অনুসন্ধান করে বিভিন্ন সম্পদ আহরণ করছে। আমাদের উন্নয়ন ও অগ্রগতি ত্বরান্বিত করতে হলে, পৃথিবীর সঙ্গে তাল মিলিয়ে চলতে হলে ভূগর্ভস্থ সম্পদের পাশাপাশি সমুদ্র সম্পদ অনুসন্ধান ও আহরণের উদ্যোগ গ্রহণ করতে হবে। এটা করতে হবে আমাদেরকেই। অন্য কেউ এসে করে দেবে না। বঙ্গোপসাগরে বিপুল পরিমাণ সস্পদের সম্ভাবনা রয়েছে। পৃথিবীর উপ-সাগরগুলোর মধ্যে সবদিক থেকে বঙ্গেপসাগরই উত্তম বলে বিবেচিত। বঙ্গোসাগরের অন্যান্য সম্পদের মধ্যে তেল থাকতে পারে। পৃথিবীর সব উপসাগরেই যদি তেল পাওয়া যায়, তবে বঙ্গেপসাগরেই বা কেন পাওয়া যাবে না।“এর আগেই বিজ্ঞানীরা বলেছিলেন, বঙ্গোপসাগরের ভূতত্ব অন্যান্য উপসাগরের তুলনায় কিছুটা পৃথক। উপকূলীয় এলাকার ও বঙ্গোপসগরের ভূ-প্রকৃতি একই রকম। বঙ্গোপসাগরের ভূমি উপকূলীয় এলাকা থেকে নীচের দিকে ঢালু হয়ে গেছে। এ সব জায়গায় পানির গভীরতাও কম। এ কারণে বঙ্গোসাগর একদিন স্থল ভূমিতে পরিণত হবে। বিজ্ঞানীরা পরীক্ষা করে দেখেছেন, বাংলাদেশের সীমান্ত জুড়ে বঙ্গোসাগরের এমন অন্তত ৪৪ হাজার বর্গমাইল এলাকা রয়েছে যা সময়ের ব্যবধানে জেগে উঠবে, পরিণত হবে বসবাসযোগ্য ভূমিতে।”এ প্রসঙ্গ টেনে প্রেসিডেন্ট বললেন: “এই উপসাগরেই রয়েছে বাংলাদেশের মানুষের প্রয়োজনের অতিরিক্ত বিপুল সম্পদ এবং মূল ভূমির বেশিষ্ট্যমন্ডিতবিশাল অঞ্চল, যা দু’তিন প্রজন্মের মধ্যেই ভেসে উঠবে। তখন বাংলাদশের মানচিত্র নতুন ভাবে তৈরী করার প্রয়োজন হবে। তিনি আরও বললেন: ‘আমদের মূল ভূখন্ড ভাঙা মাটি যেখানেই জমুক তা আমাদের। আমরা যদি সাহসী হই, ঐক্যবদ্ধ থাকি, তবে কোন ষড়যন্ত্রকারীই আমাদের মাটি ও সমুদ্র স্পর্শ করতে পারবে না’। আমদের বিরুদ্ধে ষড়যন্ত্র চলছে। আমাদের ভুমি ও সমুদ্রের প্রতি পররাজ্য লোলুপদেও শ্যেন দৃষ্টি পড়েছে। কিন্তু আমাদের স্মরণ রাখতে হবে, আমাদের মহান পূর্ব পুরুষেরা স্থলে ও সমুদ্রে ছিলেন যথেষ্ট ক্ষমতাবান। তারা এই উপমহাদেশ দীর্ঘদিন প্রবল প্রতাপে শাসন করেছিলেন।’ পূর্বেও আলোচনা ও প্রস্তাবের ভিত্তিতে প্রেসিডেন্ট জিয়া তাঁর ভাষণে কয়েকটি বিষয়ে ঘোষণা দান কররেন। সমুদ্র গবেষণায় প্রেরণা সৃষ্টি এবং এ ক্ষেত্রে নব ধারার সংযোগজনে তিনি হিজবুল বাহারকে ভাষমান গবেষণা কেন্দ্র ও প্রশিক্ষণ প্রতিষ্ঠানে পরিণত করার ঘোষণা দিলেন এবং বললেন: “এই জাহাজ আজ আপানাদের দিয়ে দিলাম।” ছাত্ররা বঙ্গোপসাগরের নাম পরিবর্তন করে ‘বাংলাদেশ সাগর’ রাখার দাবি জানিয়েছিলেন। তিনি তাদের দাবির প্রেক্ষিতে বললেন: “আজ থেকে বঙ্গোপসাগর নয়, বাংলাদেশ সাগর”। ভূ-বিজ্ঞানিরা বঙ্গোপসাগরের ৪৪ হাজার বর্গমাইলের যে ভূখন্ড জেগে উঠেছে তাকে মুল ভূখন্ডের অংশ ধরে বাংলাদেশের নতুন মানচিত্র তেরী করার প্রস্তাব দিয়েছিলেন, তা সমর্থন করে প্রয়োজনীয় পদক্ষেপ গ্রহণের আশ্বাস দিয়েছিলেন। ছাত্র-ছাত্রীরা পাহাড় দেখার যে দাবি তুলেছিল, তার প্রেক্ষিতে তিনি দেখাতে নিয়ে যাবো।” পরিশেষে অত্যন্ত গম্ভীর কণ্ঠে, প্রবল আবেগে তিনি বললেন:“একটি কথা আজ আপনাদের সকলকে বলতে চাই, এ দেশের ছেলে হিসেবে, মানুষ হিসেবে, প্রেসিডেন্ট হিসেবে। মনে রাখবেন, আমরা উন্নত হই, সমৃদ্ধ হই, মাথা উঁচু করে দাঁড়াই, আমাদের প্রতিবেশীরা তা চায় না। এই কথা আপনারা সব সময় স্মরণ রাখবেন।”


এই সফরের চার মাসের কিছু বেশী সময়ের মধ্যে প্রেসিডেন্ট জিয়াউর রহমান চট্টগ্রামের সার্কিট হাউজে মর্মান্তিকভাবে শাহাদত বরণ করেন। আজ বুঝতে পারি, কেন ষড়যন্ত্রকারীরা তাঁকে সরিয়ে দেওয়ার কাজটি এত দ্রুত সম্পন্ন করেছিল। তিনি দেশের স্বাধীনতা-সার্বভৌমতের ও স্বার্থের বিরুদ্ধে ষড়যন্ত্র করছে তাদের চিহ্নিত করতে পেরেছিলেন এবং তাদের কথা দেশের মানুষকে জানিয়ে দেওয়ার কাজ শুরু করেছিলেন। তিনি কি সেদিন জানতে পেরেছিলেন, দেশের মাটি ও সমুদ্রের বিরুদ্ধে যারা ষড়যন্ত্র করছে, তারা তাঁর জীবনের বিরুদ্ধেও ষড়যন্ত্রে লিপ্ত রয়েছে?

লেখক: বিশিষ্ট সাংবাদিক, কলামিস্ট ও ডিইউজের সবেক সাধারণ সম্পাদক

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

Shares