হাসিনার তুলনা কেবল হাসিনাই

হাসিনার তুলনা কেবল হাসিনাই

আওয়ামী লীগ তার জন্মলগ্ন থেকেই দ্বৈধতার সংকটে ভুগছে। জন্মলাভের সময়ে সরকারী মুসলিম লীগের অপশাসনের বিরুদ্ধে জনগণের তথা আওয়ামী মুসলিম লীগ গঠন করা হয়। কিন্তু ভোট ব্যাংককে পকেটে ভরার জন্য এক সময়ে আওয়ামী মুসলিম লীগ নাম থেকে ‘মুসলিম’ শব্দটি ছেঁটে ফেলা হয়। নতুন চেহারা ধারণ করার নামে দলটির নতুন নাম ‘আওয়ামী লীগ’ সাব্যস্ত হয়। নামে কী বা আসে যায়। গোলাপকে যে নামেই ডাকো, গোলাপ গোলাপই। আওয়ামী মুসলিম লীগ আওয়ামী লীগ নামে নিজেকে যতই সেক্যুলার হিসেবে জাহির করার চেষ্টা করুক না কেন, সংগঠনটি যে মূলত সংখ্যাগরিষ্ঠ বাঙালী মুসলমানের অর্থবিত্ত ও বৈভব অর্জনের একটি হাতিয়ার হিসেবে কাজ করেছে, একথা অস্বীকার করা ইতিহাসকেই অস্বীকার করা।

মুসলমানদের আওয়ামী লীগ যতই হিন্দুদের আস্থা অর্জনের জন্য নানা কসরত করেছে, ততই লক্ষ্য করার বিষয়, তারা অধিক পরিমাণে যত্নবান হওয়ার চেষ্টা করেছে নিজেদের খাঁটি মুসলমান হিসেবে জাহির করার। আর এ জন্যই বহু আওয়ামী নেতা-কর্মীকে দেশী কোট তথা মুজিব কোট পরিধানের পাশাপাশি টুপি পরতে এবং মুখে দাড়ি রাখতে দেখা যায়। অনেককে নামাজ-রোজার প্রতিযোগিতায়ও নেমে পড়তে দেখা যায়। হজ করার বিষয়েও এরা পিছিয়ে নেই। নামের আগে বাহারী ঢঙে ‘আলহাজ’ এবং ‘হাজী’ শব্দদ্বয় এরা বেশ ঢাকঢোল পিটিয়েই ব্যবহার করে থাকেন।

আমরা যারা শেখ হাসিনার রাজনীতি ও তার কলাকৌশলের সাথে একমত নই, আমাদেরও একথা  স্বীকার করতেই হবে যে, হাসিনার কোন বিকল্প নেই। হাসিনার তুলনা কেবল হাসিনাই।কেউ তাকে পছন্দ করুক আর না করুক, তার কথা ও কাজে খুব একটা গরমিল খুঁজে পাওয়া যায় না।অবশ্য যারা তার কথা ও কাজ বুঝতে অক্ষম, তাদের কাছে মনে হতে পারে যে, হাসিনার কথা ও  কাজে অনেক গরমিল রয়েছে।

তবে, কালের আবর্তে হিন্দু ভোটের তোয়াজ করতে গিয়ে এবং একাত্তরের মুক্তিযুদ্ধের সময় ভারতের প্রতি আনুগত্য দেখাতে গিয়ে সেক্যুলারিজমের সমর্থক সাজার নামে ধর্ম নিয়ে আওয়ামী লীগের বাড়াবাড়ি এদেশের সরলপ্রাণ মানুষের ধর্মানুভূতিতে যেভাবে আঘাত করেছে তাতে সাধারণ মানুষের স্বাভাবিক ধারণা জন্মেছে যে, আওয়ামী লীগ ধর্মহীনতায় বিশ্বাসী এবং ইসলামের বিরুদ্ধ শক্তি। অথচ এই আওয়ামী লীগ, যার নেতা শেখ মুজিবুর রহমান ১৯৭০ সালে অখন্ড পাকিস্তানের সাধারণ নির্বাচনে জনগণের কাছে ওয়াদা করেছিলেন যে, ক্ষমতায় গেলে তিনি ও তার দল কোরআন ও সুন্নাহর পরিপন্থী কোন আইন প্রণয়ন করবেন না। কিন্তু বাংলাদেশের অভ্যুদয়ের পরপরই ইসলামের বিরুদ্ধে অপপ্রচার চালানোই আওয়ামী লীগের অন্যতম কাজে পরিণত হল।

… আওযামী লীগের জাতীয় স্বার্থ বিকিয়ে দেয়া, মানুষের ধর্মানুভূতিতে আঘাত করা, একদলীয় শাসন ব্যবস্থার মাধ্যমে গণতন্ত্রকে হত্যা করা, লুটপাট ও দূর্নীতির লীলাভূমিতে দেশকে পরিণত করা, সর্বোপরি, অনাহার ও দুর্ভিক্ষের কবলে দেশকে নিক্ষেপ করা – এসকল গণবিরোধী, জাতিবিরোধী কর্মকান্ড মানুষের চরম ঘৃণা ও ধিক্কারের উদ্রেক করে। আর তাই যখন সীমালঙ্ঘন করে আওয়ামী লীগ দেশের মানুষকে স্থায়ী গোলামে পরিণত করতে উদ্যত হ্য়, প্রকৃতির স্বাভাবিক নিয়মে আওয়ামী শাসকগোষ্ঠী সবংশে নির্মূল হয়ে যায়।

আওয়ামী দু:শাসনের অবসানের পর থেকে জাতি গঠন ও গণতন্ত্র বিনির্মাণে এ দেশের মানুষ বহু চড়াই-উৎরাইয়ের মধ্য দিয়ে যখন বিজয়ের সম্ভাবনার দ্বারে উপনীত হয়, তখনই ভারতীয় আগ্রাসী শক্তি ও তাদের এদেশীয় চর ও নিয়োগীদের মদদে ১৯৯৬-এ আওয়ামী লীগ পুনরায় ক্ষমতায় অধিষ্ঠিত হতে সক্ষম হয়। আগেই বলেছি, আওয়ামী লীগ জন্মের পর থেকেই দ্বৈধতার সংকটে ভুগছে। পুঁজিবাদে বিশ্বাসী হয়েও সমাজতন্ত্রের বুলি তাদের কপ্চাতে হয়েছে। ধর্মবিশ্বাসকে আঁকড়ে ধরেও ধর্মহীনতার প্রচার ও প্রসারকে উৎসাহিত করতে গভীর আগ্রহ দেখাতে হচ্ছে। এতে কাদের লাভ, আজ তা ভেবে দেখার সময় এসেছে।

… আওয়ামী লীগের পাশাপাশি দেশের বৃহত্তম বিরোধী রাজনৈতিক দল বিএনপিকেও অনেক সময়ই আত্মরক্ষামূলক অবস্থান গ্রহণ করতে দেখা যায়। ব্রাহ্মণ্যবাদ ও ভারতীয়দের তুষ্ট করার জন্য বিএনপিকেও অনেক সময় বলতে শোনা যায়, আমরা মৌলবাদী নই। অথচ আওয়ামী লীগ যাদের মৌলবাদী হিসেবে চিহ্নিত করে, বিএনপি ক্ষমতা লাভের আশায় তাদের সঙ্গে ঐক্য মোর্চা করেছে। আসলে রাষ্ট্র্ঘাতী চক্রের প্রচারমাধ্যমের কৌলিণ্যে এবং ব্রাহ্মণ্যবাদী, ধর্মবিরোধী কুচক্রীরা আমাদের চিন্তা ও কৃষ্টির জগতে যে সর্বাধিপত্য প্রতিষ্ঠা করে রেখেছে, তার ফলে আমাদের অনেকের মধ্যেই ধর্মানুরাগ ও ধর্মবিশ্বাসকে কেন্দ্র করে এক ধরণের হীনমন্যতা জন্ম নিয়েছে। যে কোন সভ্য জাতি ধর্মের অপব্যবহার ও অসদ্ব্যবহার ঘৃণার চোখে দেখে। কিন্তু ধর্মনিষ্ঠ মানুষের ধর্মানুরাগ, ধর্মবিশ্বাস ও ধর্মীয় মূল্যবোধ তার জীবনাচার থেকে সে বাদ দিতে পারে না। আজ মাদ্রাসা-মসজিদের ওপর যে নগ্ন হামলা নেমে এসেছে, দেশব্যাপী ওলামা-মাশায়েখদের বিরুদ্ধে যে বিষোদগার হচ্ছে, এবং ইসলামী মূল্যবোধ নির্ভর রাজনৈতিক সংগঠনের বিরুদ্ধে যে ফ্যাসিস্ট অভিযান চালানো হচ্ছে তা কোন অবস্থাতেই একটি বহুবাচনিক গণতান্ত্রিক সমাজ বিকাশের সহায়ক হতে পারে না। এ এক অসুস্থ রাজনীতির পরিচায়ক॥”

 আফতাব আহমাদ ( দৈনিক ইনকিলাব – ০১ মার্চ, ২০০১ )

 দু:সময়ের কথাচিত্র : সরাসরি / মাহবুব উল্লাহ-আফতাব আহমাদ ॥ [ বাড কম্প্রিন্ট এন্ড পাবলিকেশন্স – ফেব্রুয়ারি, ২০০২ । পৃ: ৬২৫-৬২৭ ]

০৩

“… মনে রাখা দরকার, গণঅভ্যুত্থান কখনও জানান দিয়ে আসে না। কারো হুংকারেও গণঅভ্যুত্থান সূচিত হয় না। গণঅভ্যুত্থানের জন্য অবশ্য পূর্বশর্ত হল, শাসকগোষ্ঠীর মারাত্মক গণবিচ্ছিন্নতা, শাসকগোষ্ঠীর অভ্যন্তরে প্রকট দ্বন্ধ এবং এই বাস্তব অবস্থাকে কাজে লাগানোর মত প্রতিপক্ষের সাংগঠনিক ও রাজনৈতিক পারঙ্গমতা। বাংলাদেশে প্রথম দুটি শর্ত পূরণ হলেও তৃতীয় শর্তটি অত্যন্ত দূর্বল হওয়ার কারণে যা ঘটার কথা ছিল, তা ঘটেনি। সম্ভবত এখানেই শাসকদলের সার্থকতা।

যখনই সাধারণ মানুষের সঙ্গে আলাপ করেছি, তখনই সাধারণ মানুষের পক্ষ থেকে একটি দৃষ্টান্তের উল্লেখ করতে শুনেছি। বেগম খালেদা জিয়া যখন সরকারে অধিষ্ঠিত ছিলেন, তখন একের পর এক লাগাতার হরতাল ও অবরোধের কর্মসূচী দিয়েও আওয়ামী লীগ ও তার মিত্ররা তেমন সুবিধা করতে পারছিলো না, এই অবস্থায় হঠাৎ করে যেন সৃষ্টিকর্তার অভিপ্রায়েই পুলিশ কর্তৃক দিনাজপুরে ইয়াসমিন ধর্ষণের ঘটনাটি ঘটল। দিনাজপুরে ঘটে গেল তুলকালাম কান্ড। ইয়াসমিন ধর্ষণের ঘটনায় দিনাজপুরে গণবিদ্রোহের সূচনা হল। কিন্তু শাসকদল বিএনপির পক্ষ থেকে ঘটনাটিকে যথাযথভাবে হ্যান্ডল না করার ফলে পরিস্থিত নিয়ন্ত্রণের বাইরে চলে গিয়েছিল। সে সময়ে দিনাজপুরের এসপি ঘটনা সম্পর্কে এবং ঘটনার ভয়াবহতা সম্পর্কে প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয়কে সময়মত, যথাযথভাবে ব্রিফ না করার ফলে এবং তথ্য সংগ্রহের ক্ষেত্রে সরকারের ব্যর্থতার ফলে পরিস্থিত সত্যি সত্যি সরকারের নিয়ন্ত্রণের বাইরে চলে যায়। থানা, পুলিশ ফাঁড়িতেও জনতা আগুন ধরিয়ে দেয়। পুলিশ আত্মরক্ষার্থে পলায়ন করে।

গণবিক্ষোভ সম্পর্কে আমলাতান্ত্রিক তথ্যের উপর নির্ভরশীলতা সরকারকে কত বিভ্রান্ত করতে পারে, দিনাজপুরের ইয়াসমিনের ঘটনা তারই প্রমাণ। অথচ সেই সময়ে যদি রাজনৈতিক চ্যানেল থেকে তথ্য সরবরাহ করা হত, তাহলে হয়তো ঘটনা এত ভয়াবহ রূপ লাভ করত না।

বর্তমান সরকারের আমলে শুধু একটি ইয়াসমিনের ঘটনা নয়, বহু ইয়াসমিনকে হয় পুলিশ না হয় ধর্ষণকারীদের হাতে সম্ভ্রম বিলিয়ে দিতে হযেছে কিংবা পরিণতিতে মৃত্যুবরণ করতে হযেছে। দূর্ভাগ্যের বিষয়, এ রকম কোন ঘটনার বিরুদ্ধেই দিনাজপুরের মত পরিস্থিতির সৃষ্টি করা সম্ভব হয়নি।

বিরোধী দলগুলির ব্যর্থতার অন্যতম উৎস হল, পত্র-পত্রিকার ওপর নিয়ন্ত্রণহীনতা। আজকের বাংলাদেশে বিপুল সংখ্যক দৈনিক ও সাপ্তাহিক পত্রিকা প্রকাশিত হয়; দুয়েকটি ব্যতিক্রম বাদ দিলে কোনটির ওপরই বিরোধী দলগুলোর তেমন কোন প্রভাব নেই। বস্তুত বলা যায়, আজকাল যেসব পত্র-পত্রিকা প্রকাশিত হয়, তার বেশীরভাগই বিরোধীদল বিরোধী পত্রিকা। দুয়েকটি পত্রিকা গত কয়েক মাস ধরে সরকারের অপশাসনের চিত্র তুলে ধরলেও এগুলোর আসল উদ্দেশ্য সম্পর্কে নিশ্চিত করে কিছু বলা যায় না। এসব পত্রিকায় সুযোগ পেলেই বিরোধীদলীয় নেত্রী ও বিরোধীদল সম্পর্কে ব্যঙ্গ-বিদ্রুপ সম্বলিত কার্টুন, সম্পাদকীয়, উপসম্পাদকীয় প্রকাশ করে। খোদ প্রধানমন্ত্রী নিজে এসব পত্রিকা সম্পর্কে উষ্মা প্রকাশ করেছেন। কিন্তু দেশে বিরোধী দলগুলো কী চান্, সেটা স্পষ্ট নয় বলে জনগণ বস্তুত বিভ্রান্ত হচ্ছে।

আগেই বলেছিলাম, প্রকৃতিতে শুন্যতা বলে কিছুই থাকে না। ১৯৫৭ সালে মওলানা ভাসানী যখন ন্যাশনাল আওয়ামী পার্টি গঠন করেন, তখন তার দাবী ছিল, পাকিস্তানের অন্তর্ভুক্ত প্রদেশগুলোর জন্য পূর্ণ আঞ্চলিক স্বায়ত্তশাসন কায়েম এবং স্বাধীন ও জোটনিরপেক্ষ পররাষ্ট্রনীতি অনুসরণ। এসব প্রশ্নকে কেন্দ্র করেই রাষ্ট্রনায়ক হোসেন শহীদ সোহরাওয়ার্দীর সঙ্গে মওলানা ভাসানীর মতপার্থক্য সৃষ্টি হয়েছিল। ঐতিহাসিক কাগমারী সম্মেলনে মওলানা ভাসানী পশ্চিম পাকিস্তানের প্রতি ‘আসসালামু আলাইকুম’ জানিয়েছিলেন। মওলানা ভাসানীর বিরুদ্ধে বড় বড় কাঠের হরফে তারই প্রতিষ্ঠিত ইত্তেফাক পত্রিকায় তাকে ভারতের চর ও রাশিয়ার দালাল হিসেবে আখ্যায়িত করা হয়েছিল।

মরহুম সোহরাওয়ার্দী মওলানার জোটনিরপেক্ষ পররাষ্ট্রনীতি অনুসরণের দাবীকে শুন্য+শুন্য = শুন্য এই সমীকরণের ফল উল্লেখ করে বাতিল করে দিয়েছিলেন। আর এবার প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা তার তথাকথিত ভোটচোর+স্বৈরাচার+রাজাকার = শুন্য এই সমীকরণ দিয়ে বিরোধীদলের আন্দোলনকে তুড়ি মেরে উড়িয়ে দিলেন। তিনি হোসেন শহীদ সোহরাওয়ার্দীর বিখ্যাত সমীকরণটিকে বর্তমান পর্যায়ে কিভাবে পুনর্মার্জন করে ব্যবহার করা যায়, সে ব্যাপারে প্রচন্ড প্রত্যুৎপন্নমতিতার প্রমাণ দিয়েছেন॥”

– মাহবুব উল্লাহ (দৈনিক ইনকিলাব – ০১ মার্চ, ২০০১)

– দু:সময়ের কথাচিত্র : সরাসরি / মাহবুব উল্লাহ-আফতাব আহমাদ ॥ [ বাড কম্প্রিন্ট এন্ড পাবলিকেশন্স – ফেব্রুয়ারি, ২০০২ । পৃ: ৬২২-৬২৩ ]

০২

 আমরা যারা শেখ হাসিনার রাজনীতি ও তার কলাকৌশলের সাথে একমত নই, আমাদেরও একথা স্বীকার করতেই হবে যে, হাসিনার কোন বিকল্প নেই। হাসিনার তুলনা কেবল হাসিনাই। কেউ তাকে পছন্দ করুক আর না করুক, তার কথা ও কাজে খুব একটা গরমিল খুঁজে পাওয়া যায় না। অবশ্য যারা তার কথা ও কাজ বুঝতে অক্ষম, তাদের কাছে মনে হতে পারে যে, হাসিনার কথা ও কাজে অনেক গরমিল রয়েছে।

… বিরোধীদল ক্ষমতার ধন্বন্তরী বটিকা আপসে গলাধ:করণ করার খোয়াবে বিভোর থেকে থেমে থেমে ‘গণঅভ্যুত্থান’ ঘটাবার নিনাদ যেভাবে তুলছে, তাতে মনে হবে, গণঅভ্যুত্থান বালক-বালিকাদের হাতের মোয়া। ঢাল নাই, তলোয়ার নাই, নিধিরাম সর্দার। বিরোধী শিবিরকে ভারতীয় চর, নিয়োগী ও দালালরা মহামারী আকারে যেভাবে সংক্রমিত করেছে এবং তোয়াজ করার মাধ্যমে কোন ঝুঁকি না নিয়ে নন্দলাল সেজে ক্ষমতার মসনদে বসার যে খায়েশ পেয়ে বসেছে, তাতে আর যাই হোক, গণঅভ্যুত্থান তো দূরের কথা একটি অর্থবহ গণসংগ্রাম রচনা করাও সম্ভব নয়।

আওয়ামী লীগ কলাগাছ নয়, যার সাথে পিঠ ঘষে পিঠের চুলকানি সারা যায়। আওয়ামী লীগ মাদার গাছ। পিঠে খুজলিওয়ালাদের মনে রাখা দরকার, এই মাদারগাছের সাথে পিঠ ঘষলে স্বস্তি পাবার কোন কথা নয়; পিঠের ছাল উঠে যাবে। আর আওয়ামী ফ্যাসিস্টরা ছাল তোলার ব্যাপারে সিদ্ধহস্ত।

লক্ষীপুরের তাহের বাহিনী যখন নিবেদিতপ্রাণ আইনজীবী নুরুল ইসলামকে কেটে টুকরো টুকরো করে মেঘনা গর্ভে ভাসিয়ে দেয়, তখন বিরোধী দলকে কপাল চাপড়ে গালে হাত দিয়ে হা করে থাকতে দেখি আমরা। ক্রন্দনরোল তুলে বিরোধীদল ধরা গলায় বলে, এটা কী হল? এরা বুঝতেও অক্ষম যে, আওয়ামীরা তাদের ক্ষমতাকে চিরস্থায়ী করে রাখার জন্য হেন কাজ করতে কখনি পিছপা হবে না, কিংবা সংকোচবোধ করবে না। আর তাই লক্ষীপুরের ত্রাস, মনুষ্যরূপী দানব তাহের নামক এই ইচ্ছাপিতার বিরুদ্ধে সরকার সমর্থক পত্র-পত্রিকাও যখন সোচ্চার তখন শেখ হাসিনা জাগ্রত জনতার উদ্দেশ্যে চোখ রাঙিয়ে বলেন, “খালি তাহেরের নাম উচ্চারিত হয় কেন”? আর হাসিনার মন্ত্রিসভার ডাকসাইটে মন্ত্রীরা বলেন, “তাহের তাদের অহঙ্কার”।

এই না হলে আওয়ামী লীগ? নিজ দলের নেতা-কর্মী সমর্থক যেই হোক না কেন, তাকে আওয়ামী লীগ শত্রুর মুখে ঠেলে দেয়া তো দূরের কথা, কোন অবস্থাতেই ত্যাগ করতে রাজি নয়। তাই সরকারসমর্থক পত্র-পত্রিকা এসব ইচ্ছাপিতার বিরুদ্ধে যত গণতান্ত্রিক সংগ্রামের আহ্বান জানাক না কেন, আওয়ামী লীগ তার গোত্রীয় মাস্তান ও পান্ডাদের সুবোধ, সুশীল ও সজ্জন বলেই তাদের পক্ষে প্রচার অব্যাহত রাখছে। আর এমনি অবস্থাতেই ইচ্ছাপিতাদের পক্ষে সাংবাদিকদের উদ্দেশ্যে বলা সম্ভব – ‘আমার বিরুদ্ধে কিছু লিখলে হাত-পা কেটে ফেলা হবে’। এরপরও সরকার কিংবা সরকারী দল এসব ইচ্ছাপিতার ইচ্ছার বিরুদ্ধে জননিরাপত্তা আইন কিংবা বিশেষ ক্ষমতা আইন প্রয়োগ করার প্রয়োজনীয়তা দেখে না।

আর বিরোধী দলসমূহ? তারা একদিকে ঐক্যবদ্ধ গণসংগ্রাম চায়, অন্যদিকে দলীয় সংকীর্ণতার গন্ডি অতিক্রম করে বৃহত্তর জাতীয় ঐকমত্য সৃষ্টিতে অনাগ্রহী। একক ক্ষমতায় আওয়ামী লীগের সঙ্গে পেরে না উঠে ক্ষমতার মোহে আচ্ছন্ন হয়ে জোড়াতালি দিয়ে বিরোধী শিবির একটি ঐক্যমোর্চা গঠন করলেও পরস্পরের প্রতি সন্দেহ পোষণ করে যেভাবে কানামাছি খেলা খেলছে, তাতে আর যাই হোক, একটি সুসংহত রাজনৈতিক আন্দোলন রচনা করা সম্ভব নয় এবং এটি বারবার প্রমাণিত হচ্ছে। বিরোধীদল আন্দোলনের নামে জনগণের সঙ্গে যে মশকরা করছে, তা শুধু দু:খজনকই নয়, দূর্ভাগ্যজনকও বটে। বিরোধী শিবিরের শরিক দলগুলোর নেতাদের যখন সরকার পক্ষ সরাসরি আক্রমণ করে, কিংবা রাজনৈতিক মামলা রুজু করে, তখন লক্ষ্য করার বিষয় যে, বিএনপি নেতা-কর্মী না হলে অন্য কারও ব্যাপারে বিরোধী শিবিরের আগ্রহ কম। বিএনপির অবশ্য একটা দম্ভ আছে, তাদের দল বড়, তাই তাদের গুরুত্ব বেশী হতে হবে। কথাটা একেবারে মিথ্যেও নয়। কিন্তু এটিই একমাত্র চরম সত্যও নয়। বিএনপি একাই যদি আওয়ামী দু:শাসনের কালো পাহাড়কে সরাতে পারতো, তাহলে এরশাদ এবংঅপর দুটি ইসলামী সংগঠনের সঙ্গে ঐক্যজোট করতে গেল কেন?

‘৯৫-‘৯৬-এর সহিংস সন্ত্রাসী আওয়ামী আন্দোলনের সময় আজকের মান্যবর মন্ত্রী আব্দুর রাজ্জাককে আমি প্রশ্ন করে বলেছিলাম – “রাজ্জাক ভাই, সারাক্ষণ মুক্তিযুদ্ধের চেতনার কথা বলে শেষ পর্যন্ত জামায়াতে ইসলামীর সঙ্গে কী করে জোট বাঁধলেন?” উত্তরে রাজ্জাক ভাই বলেছিলেন, “দ্যাখ, রাজনীতিতে প্রথমেই খেয়াল রাখতে হয় প্রতিপক্ষের শক্তি কিভাবে ক্ষয়প্রাপ্ত হবে। তোরা সবাই মিলে আমাদের তো ক্ষমতার পিঁড়ি থেকে তাড়ালি, তারপর থেকেই শুধু ভাবছি, কিভাবে পূর্বের অবস্থায় ফিরে যাওয়া যায়। অনেক ভেবে দেখলাম, পঁচাত্তোরোত্তর রাজনীতির প্রবক্তরা যে বাংলাদেশী জাতীয়তাবাদের কথা বলে, সেখানে ফাটল ধরাতে পারলেই আমাদের কাজ হাসিল হয়ে যাবে। বাংলাদেশী ভাবধারার ভোটকে ভাগ করতে হলে জামায়াত-এরশাদ এবং যারা বিএনপির সঙ্গে সমস্বরে বাংলাদেশী ভাবধারার কথা উচ্চারণ করে তাদেরকে আলাদা করে ফেলতে পারলেই আওয়ামী লীগ আবার ক্ষমতায় বসতে পারবে। কাজেই জামায়াতের সঙ্গে জোট বাঁধতে আমাদের কোন অসুবিধা নেই”। রাজ্জাক ভাই এবং আওয়ামী নীতিনির্ধারকদের কৌশল যথার্থই প্রমাণিত হয়েছে।

… মনে পড়ে, আজ থেকে ২৭ বছর আগে তৎকালীন আওয়ামী যুবলীগের সেক্রেটারী জেনারেল নূরে আলম সিদ্দিকী সেলিমদের কমিউনিস্ট পার্টির উদ্দেশে বলেছিলেন, “ওটি হচ্ছে আওয়ামী হেরেমের, রক্ষিতা বা উপপত্নী। উপপত্নী হিসেবে তারা আদর চাইতে পারে, সোহাগ চাইতে পারে, কিন্তু স্ত্রী মর্যাদা চাইতে পারে না”। আওয়ামী সংজ্ঞায় মুক্তিযুদ্ধের চেতনার অর্থই হলো আওয়ামী লীগের ধ্বজাধারী হতে হবে এবং সবকিছুকে প্রধানমন্ত্রীর পিতার স্বপ্ন হিসেবে মেনে নিতে হবে। এর ব্যত্যয় ঘটলেই মুগুর।

সেলিমরা কিংবা রাশেদ খান মেননরা রাজনৈতিকভাবে দেউলিয়াত্বের যে প্রান্তে পৌঁছেছেন, সেখানে তারা ভুলে যান যে, মুজিবী ঝান্ডা আর মুজিবী আদর্শ নিয়ে রাজনীতি করতে হলে মুজিবের তৈরী সংগঠনে একাকার হয়ে যাওয়াই শ্রেয়। ‘আমার যেমন বেণী তেমন রবে, চুল ভিজাবো না। রাঁধিবো, বাড়িবো, ব্যঞ্জনও কুটবো, হাঁড়ি ছোব না’ এই সতীপনা নিয়ে আর যাই হোক, রাজনীতি হয় না। মতিয়া চৌধুরী এবং নুরুল ইসলাম নাহিদের কাছ থেকেও কি এরা কোন শিক্ষা নিতে পারেনি?

… দেশে সংকট ক্রমে ঘণীভূত হয়ে চলেছে। যতই দিন পার হচ্ছে, নির্বাচনের সম্ভাবনা ততই তিরোহিত হচ্ছে। হাসিনা আজ মর্মে মর্মে উপলব্ধি করছেন, এ দেশের মানুষ তার পিতার মৃত্যুতে যেমন ইন্না লিল্লাহে … পড়েনি, তেমনি জনগণ তাকে ক্ষমা করে দিয়ে একটি সুযোগ দেয়ার পর যে শিক্ষা পেয়েছে, তাতে জীবনে আওয়ামী লীগকে আর ভোট দেয়ার কোন কারণ নেই। অতএব ক্ষমতায় থাকতে হলে গায়ের জোরে এবং কৌশলী কারচুপির মাধ্যমে থাকতে হবে।

… আজ সুশীল সমাজের নামে জনসমাজভুক্ত যেসব সুবিধাজীবী নাগরিক ঐক্যবদ্ধ নাগরিক আন্দোলনের নামাবলী গায়ে দিয়ে মাঠে নেমেছে, তাদের উদ্দেশ্য একটাই – এ দেশ থেকে মুক্ত চিন্তাকে নির্বাসিত করা, যুক্তির পথকে রুদ্ধ করা ও বহুমতকে উপড়ে ফেলা। এক মত্, এক পথ, এক নেতা, এক তত্ত্ব, এক দেশ – এই ফ্যাসিস্ট সর্বগ্রাসী দানবীয় দর্শনকে বাংলাদেশে স্থায়ীভাবে প্রতিষ্ঠিত করার জন্য আজ বিদেশের টাকায় পরিচালিত এক শ্রেণীর এনজিও গোষ্ঠী এবং ভারতীয় ব্রাহ্মণ্যবাদ ও ইহুদীবাদের অর্থানুকূল্যে এ দেশে যে কৃত্রিম ঐক্যবদ্ধ নাগরিক আন্দোলন গড়ে তোলার কসরত করা হচ্ছে, তার লক্ষ্য একটিই – ভারতের অনুগ্রহ লাভ এবং ভারতীয় বশংবদ আওয়ামী গোষ্ঠীকে আরেকবার ক্ষমতায় বসানো।

বিরোধী দল “কঠোর কর্মসূচী” ও গণ অভ্যুত্থানের খোয়াবে বিভোর থেকে নর্তন-কুর্দন কম দেখায়নি। কিন্তু সবই ‘পর্বতের মুষিক প্রসব’। অন্যদিকে হাসিনার কথায় কোন নড়ন-চড়ন নেই। যাদের এক হাত দেখে নেয়ার্, তিনি তাদের এক হাত নয়, দুই হাতই দেখে নিচ্ছেন। এমনি বাঁধাহীনভাবে তিনি যদি তার শাসনকার্য অব্যাহত রাখতে পারেন তাহলে দ্বিতীয় মেয়াদের জন্য ক্ষমতায় অধিষ্ঠিত হতে তাকে খুব বেগ পেতে হবে না।

কিন্তু আওয়ামী লীগের আরও একবার ক্ষমতা লাভের অর্থ বাংলাদেশের বিলুপ্তি – এটি যে কোন গবেটও দেয়ালের লিখন পাঠ করলেই বুঝতে পারবে। তবে কি আমরা চরম হতাশা ও তমসাচ্ছন্ন অবস্থায় থাকব? সুবেহ কাজের যত ঘনীভূত হবে, মনে রাখতে হবে, সুবেহ সাদেক তত সন্নিকটে। চারিদিকে যখন নিস্তরঙ্গ স্তব্ধতা বিরাজমান, মনে রাখরে হবে তখন প্রলয় অপেক্ষমাণ। এই প্রলয়ে সবকিছু তছনছ হয়ে যাবে, মিছমার হযে যাবে। প্রকৃতি শুন্যতাকে ঘৃণা করে। Nature abhors vacuum – এ কথাটি বিস্মৃত হয়ে ক্ষমতার মদমত্ততায় যে যতই বাকুম বাকুম করুক না কেন, প্রকৃতির প্রতিশোধ থেকে কেউ রেহাই পাবে না॥”

– আফতাব আহমাদ (দৈনিক ইনকিলাব – ৮ ফেব্রুয়ারি, ২০০১)

– দু:সময়ের কথাচিত্র : সরাসরি / মাহবুব উল্লাহ-আফতাব আহমাদ ॥ [ বাড কম্প্রিন্ট এন্ড পাবলিকেশন্স – ফেব্রুয়ারি, ২০০২ । পৃ: ৬১১-৬১৪ ]

“… রাজনীতিতে মিথ্যা পরিচয় বা ক্রেডেনশিয়াল ব্যবহার করে ফায়দা লোটার প্রয়াস সর্বদা সর্বত্রই নিন্দিত। তেমন একটি কাজ বহুদিন ধরে করে আসছেন প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা। বিভিন্ন সময়ে তার রাজনৈতিক পরিচয়কে উজ্জল ও বর্ণাঢ্য করার জন্য বলা হয় যে, তিনি ইডেন কলেজের ভিপি ছিলেন।

মনজুর-মাওলা সম্পাদিত ‘বাংলাদেশের পঞ্চম জাতীয় সংসদ ‘৯১ এলবাম’ একটি গুরুত্বপূর্ণ রাজনৈতিক দলিল গ্রন্থ। তাতে জাতীয় সংসদের বিরোধী দলীয় নেতার প্যাডে ২০.০৪.৯৪ইং স্বাক্ষরিত শেখ হাসিনার একটি বাণীও সন্নিবেশিত আছে। সেই এলবামে গোপালগঞ্জ-৩ আসনে নির্বাচিত সদস্য শেখ হাসিনার রাজনৈতিক ও ব্যক্তিগত পরিচয়ে উল্লেখ করা হয়েছে যে,

“১৯৬২ সালে যখন দেশে সংঘটিত হচ্ছিল ছাত্র আন্দোলন এবং স্বায়ত্তশাসন ও গণতন্ত্রের জন্য আন্দোলন তখন তিনি রাজনীতিতে জড়িত হন। ১৯৬৫ সালে মেট্রিক পাস করে ইডেন গার্লস কলেজ ও ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে পড়াশোনা করেন। ছাত্র আন্দোলনে তিনি সক্রিয়ভাবে যুক্ত ছিলেন এবং বাংলাদেশের তৎকালীন প্রধান মহিলা কলেজ ইডেন গার্লস কলেজের ছাত্রী সংসদের সহ-সভানেত্রী নির্বাচিত হন। … ১৯৭৩ সালে শেখ হাসিনা ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় থেকে বিএ পাস করেন।”

কিন্তু প্রকৃত তথ্য এবং সত্য হচ্ছে, শেখ হাসিনা কখনো ইডেন কলেজের ছাত্রী-ই ছিলেন না। তিনি পঁয়ষট্টি সালে এসএসসি পাস করে যে কলেজে পড়াশোনা করেন ১৯৬৪ সাল থেকে সে কলেজের নাম গভর্নমেন্ট ইন্টারমিডিয়েট গার্লস কলেজ। শেখ মুজিব সরকার কর্তৃক ১৯৭৩ সালে বদরুন্নেসা কলেজ নাম করণের আগ পর্যন্ত এটি সরকারী ইন্টারমিডিয়েট গার্লস কলেজ-ই ছিল। ‘৬৬-৬৭ শিক্ষাবর্ষে দ্বাদশ শ্রেণীর ছাত্রী থাকাকালে শেখ হাসিনা ওই কলেজের ভিপি ছিলেন। সে সময় ইডেন কলেজে ইন্টারমিডিয়েট সেকশনই ছিলো না। ওই বছর সরকারি ইন্টারমিডিয়েট গার্লস কলেজ ছাত্রী সংসদের সাধারণ সম্পাদিকা নাজমা চৌধুরী এবং একমাত্র ভিপি পদ ছাড়া গোটা সংসদ ছিলো তৎকালীন ‘পূর্ব পাকিস্তান ছাত্র ইউনিয়ন’ (মেনন গ্রুপ)-এর নিয়ন্ত্রণে। বর্তমান প্রধানমন্ত্রীর তা ভুলে যাওয়ার কথা নয়। ইডেন কলেজের ভিপি পরিচয়টা রাজনৈতিক ক্ষেত্রে বেশ গৌরবের। রাজনৈতিক গৌরব বৃদ্ধির জন্য কখনো ইডেন কলেজের ছাত্রী না থেকেও সে কলেজে ভিপি’র ভুয়া পরিচয় প্রদান কি কোনো নেতা-নেত্রীর জন্য অপরিহার্য? ইডেন কলেজ ছাত্রী সংসদের ভিপি’দের নামের তালিকা পরীক্ষা করলেও দেখা যাবে যে আমাদের বর্তমান প্রধানমন্ত্রী কখনো ইডেন কলেজের ভিপি ছিলেন না।

আরো একটি প্রসঙ্গ এখানে এসে যায়। শেখ হাসিনা মেট্রিক পাস করেছেন ১৯৬৫ সালে। তার বিএ পাস করার কথা ১৯৬৯ সালে। তার সঙ্গী-সাথীরা তাই করেছেন। শেখ হাসিনা বিএ পাস করতে ১৯৭৩ সাল পর্যন্ত লাগালেন কেন? এতে কি তার মেধার বিষয়টি ধরা পড়ে না? হয় তিনি চার বার ফেল করেছেন অথবা ফেল করার ভয়ে পরীক্ষা না দিয়ে পাসের জন্য ১৯৭৩ সালে তার পিতার আমলের ‘ঐতিহাসিক পরীক্ষার’ বছরের জন্য অপেক্ষা করেছেন। আমি নিয়মিত পরীক্ষার্থী ও পড়ুয়া ছাত্র-ছাত্রীদের কথা বা সেই ‘ঐতিহাসিক’ বর্ষে পাস করা সকলের কথা বলছি না। কিন্তু অনিয়মিত পরীক্ষা দিয়ে যারা (সকলে নয়) সে বছর ‘সহজ পাসের বন্দোবস্ত’ করেছেন বলে প্রচার আছে, ‘তাদের’ কথা বলছি। এমন প্রচারও ছিলো যে, সে বছর অনেক বাড়ির চেয়ার-টেবিলও নাকি চান্স নিয়েছিল। আমাদের প্রধানমন্ত্রী সম্পর্কে অশোভন কোনো উক্তি না করে একটি প্রশ্ন বোধহয় রাখা যায় যে, “আপনি আপনার অন্যান্য সহপাঠীদের মতো ১৯৬৯ সালে বিএ পাস করলেন না কেন?”

১৯৭৩ সালে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে তো কোনো ‘পাস’ কোর্স ছিলো না। অনার্সে কেউ ফেল করলে তাকে ‘পাস’ ডিগ্রি দিয়ে বিদায় করা হতো। তাহলে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় থেকে তিনি বিএ পাস করেছেন বলা হয় কেন? ১৯৭৩ সালে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় কর্তৃক অনুমোদিত শত শত কলেজ ছিলো। কিন্তু ফরিদপুরের ‘ভাঙ্গা কলেজ’ বা অন্য কোন কলেজ থেকে পাস করা কোনো ছাত্র-ছাত্রীর কি কলেজের নাম না বলে ‘ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় থেকে বিএ পাস করেছি’ বলা শোভন? প্রধানমন্ত্রীর পাসের সন থেকে বোঝা যায় যে, তিনি অনিয়মিত ছাত্রী হিসাবে হয়তো পরীক্ষা দিয়ে থাকবেন। সে পরীক্ষায় আর কি কি ঘাপলা হয়েছিল আজ তা আর নাই বা বললাম। তবে, এক্ষেত্রেও ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় থেকে বিএ পাসের কথা প্রচার করার পেছনে ‘ইমেজ’ বাড়ানোর একটা অসাধু প্রবণতাই যে স্পষ্ট হয়ে ধরা পড়ে, তা বুঝতে কারো বেগ পাওয়ার কথা নয়। কিন্তু এ ধরণের ‘ফলস ইমেজ’ কি বেশি দিন টিকে থাকে?”

 কাজী সিরাজ / দু:শাসনের বিরুদ্ধে লড়াই ॥ [ গ্রন্থকানন – সেপ্টেম্বর, ২০০১ । পৃ: ৩৯৭-৩৯৮ ]

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *