সাম্প্রদায়িকতার উন্মত্ত ও দাম্ভিক প্রকাশ ইতিহাসে দুর্লভ

সাম্প্রদায়িকতার উন্মত্ত ও দাম্ভিক প্রকাশ ইতিহাসে দুর্লভ

দ্বিতীয় পর্বের পর… 

ব্রাক্ষণ্যবাদের দম্ভ

“… হিন্দু ধর্মের পুনরুজ্জীবনের শুভচিন্তায় কারো আপত্তি থাকতে পারে না।

 কিন্তু শুভচিন্তার কালে সাম্প্রদায়িকতার যে অশুভ চিন্তায় মত্ত হয়েছিলেন তৎকালীন শিক্ষিত হিন্দু সমাজ এবং সাহিত্যের ক্ষেত্রেও

 যে কদর্য ও গ্লানিকর পঙ্কের আবর্ত সৃষ্টি করেছিলেন, সেটাই ছিল সবচেয়ে বেদনার দিক।

উনিশ শতকের শেষের দিকে বঙ্কিমচন্দ্র প্রমুখ চিন্তাবিদরা এই কদর্য ঘূর্ণাবর্তের স্রষ্টা এবং আজাদি-উত্তরকাল পর্যন্ত ছিল তার মলিনতা-আবিলতার প্রাধান্য।

যত দ্বেষ, যত হিংসা, যত শত্রুতা হাজার বছরের প্রতিবেশী এদেশের মাটিতে জাত, সর্বাংশেই ভারতীয় উপমহাদেশের স্থায়ী বাসিন্দা মুসলমানের প্রতি। সাম্প্রদায়িকতার এমন উন্মত্ত ও দাম্ভিক প্রকাশ জগতের ইতিহাসে খুবই দুর্লভ

 চোখের দৃষ্টিকে খর্ব করার ফলে এই স্বদেশীর উগ্রভক্তরা কী পরিমাণে চিন্তাশক্তিরও অধোগতি ও অসঙ্গতি দেখিয়েছেন্, ‘ঋষি’-আখ্যাত বঙ্কিমচন্দ্রের এই ধর্মচিন্তাতেই তা সুপরিস্ফুট :

“… মুসলমানের পর ইংরেজ রাজা হইল, হিন্দুপ্রজা তাহাতে কথা কহিল না। বরং হিন্দুরাই ইংরেজকে ডাকিয়া রাজ্যে বসাইল।

 হিন্দু সিপাহী, ইংরেজের হইয়া লড়িয়া, হিন্দুর রাজ্য জয় করিয়া ইংরেজকে দিল। কেননা, হিন্দুর ইংরেজের উপর ভিন্ন জাতীয় বলিয়া কোন দ্বেষ নাই। আজিও ইংরেজের অধীনে ভারতবর্ষ অত্যন্ত প্রভুভক্ত। ইংরেজ ইহার কারণ না বুঝিয়া মনে করে হিন্দু দূর্বল বলিয়া কৃত্রিম প্রভুভক্ত।”

এই অনুক্ত কারণটি অত্যন্ত প্রকটিত এবং বঙ্কিম-গান্ধী-রবীন্দ্রনাথ থেকে ক্ষুদ্রতম হিন্দুর মানসে সে কারণটি এভাবে প্রতিক্রিয়া করেছে : ভারতীয় জাতীয়তার চিন্তায় মুসলমানের স্থান নেই, ‘একধর্ম রাজ্যপাশে’ [শিবাজী উৎসব/রবীন্দ্রনাথ – ] যে ভারতকে বেঁধে দেওয়ার স্বপ্ন জাগ্রত হয়েছে, সে ভারতে ইসলাম নিতান্তই অস্তিত্বহীন, অস্বীকৃত।

 মুসলমানকে ভাইরূপে, প্রতিবেশীরূপে চিন্তা করা দূরে থাক; মুসলমানকে বিদেশি আক্রমণকারী ব্যতীত অন্যকিছু ভাবতেই প্রস্তুত হয় নি হিন্দু মানস। সবচেয়ে হাস্যকর উক্তি ‘হিন্দুর ইংরেজের উপর ভিন্ন জাতীয় বলিয়া কোনো দ্বেষ নাই’

– যত দ্বেষ, যত হিংসা, যত শত্রুতা হাজার বছরের প্রতিবেশী এদেশের মাটিতে জাত, সর্বাংশেই ভারতীয় উপমহাদেশের স্থায়ী বাসিন্দা মুসলমানের প্রতি। সাম্প্রদায়িকতার এমন উন্মত্ত ও দাম্ভিক প্রকাশ জগতের ইতিহাসে খুবই দুর্লভ

জাস্টিস আবদুল মওদুদ 

মধ্যবিত্ত সমাজের বিকাশ : সংস্কৃতির রূপান্তর  মাওলা ব্রাদার্স (পুনমুদ্রণ) - ফেব্রুয়ারি২০১১  পৃ২৫০

। ৬ ।

“… যদি ধরে নিই যে ভারতবর্ষের ইতিহাস শুধু পর্বে পর্বে যারা ভারতবর্ষের খন্ডে খন্ডে শাসন ক্ষমতার অধিকারী থেকেছে

সেই শাসক শ্রেণীর ইতিহাস তাহলেও কি দাবি করতে পারি যে ভারতবর্ষের ইতিহাস প্রণেতাগণ কোনও ভারসাম্যপূর্ণ ঐতিহাসিক পরিপ্রেক্ষিত

ছাত্রছাত্রীদের চোখের সামনে তুলে ধরার চেষ্টা করেছেন? মহম্মদ ঘুরীর তরাইনের যুদ্ধে সাফল্য থেকে পলাশীর যুদ্ধে সিরাজদৌল্লার

বিপর্যয় পর্যন্ত সাড়ে পাঁচশ বছরের কিছু বেশি কাল পর্যন্ত যে-ইতিহাস তার মধ্যে ইসলাম ধর্মাবলম্বী সুলতান বা বাদশাহ কতদিন ভারতের বৃহত্তর অংশে নিজেদের ক্ষমতা প্রয়োগ করেছে?

কতটা ইসলাম ধর্ম এবং আরবী ভাষা স্থানীয় জনসাধরণের উপর জুলুম করে চাপিয়েছে? রাজকার্যে কতটা মুসলিমদের অতিরিক্ত সুযোগ-সুবিধা অথবা অগ্রাধিকার দিয়েছে? ভারতবর্ষের ধনসম্পদ কর রূপে আয় করে অথবা লুঠ করে কতটা তারা নিজ নিজ মুলুকে নিয়ে গিয়েছিলেন?

ঠিক কথা যে ১১৯২-এ তরাইনের যুদ্ধজয়ের সাত বছরের মধ্যে বখতিয়ার খলজি ১১৯৯ খ্রিস্টাব্দেই বঙ্গবিজয় করেন। এটাকে মুসলিম সাফল্যের একটা চমকপ্রদ দৃষ্টান্ত বলা যায়।

 কিন্তু ইলতুৎমিশের ২৬ বছর এবং বলবনের ২০ বছর অর্থাৎ ৪৬ বছরের সুলতানী শাসন মোটামুটি গঙ্গা-যমুনার দোয়াবেই সীমাবদ্ধ ছিল। আলাউদ্দিন খলজিই প্রথম দক্ষিণ দিকে সুলতানীকে প্রসারিত করেন।

 তার শাসনকাল ১২৯৬ থেকে ১৩১৬ পর্যন্ত অর্থাৎ ২০ বছর এবং মুহম্মদ বিন তুঘলকের শাসনকাল ১৩২৫-৫১ পর্য্ন্ত ২৬ বছর বিস্তৃত।

 সাধারণভাবে বলা যায় যে দিল্লির সুলতানী প্রায় ৬০ বছর ভারতের এক বৃহৎ অংশের উপর বহাল ছিল।

 পরবর্তী পর্যায়ে যেসব খন্ড খন্ড রাজ্য সারা ভারত জুড়ে আবির্ভূত ও প্রতিষ্ঠিত হয় সেসবের মধ্যে বাংলা, বাহমনি, মালবা, গুজরাট প্রভৃতি

রাজ্যের শাসনকর্তারা অবশ্যই ইসলাম ধর্মাবলম্বী ছিলেন, কিন্তু ইসলাম ধর্ম প্রচারে ও প্রতিষ্ঠায় তাদের আগ্রহের অথবা তৎপরতার

প্রমাণ পাওয়া যায় না। অন্যদিকে দেখি যে মহম্ম…

ক্রমশ…
One thought on “সাম্প্রদায়িকতার উন্মত্ত ও দাম্ভিক প্রকাশ ইতিহাসে দুর্লভ”

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *