সাপ্তাহিক ‘খবরের কাগজ’-এর বিস্মৃত কাহিনী

সাপ্তাহিক 'খবরের কাগজ'-এর বিস্মৃত কাহিনী

:: আলী রীয়াজ ::

বাংলাদেশের এক সময়ের সর্বাধিক পরিচিত ও প্রচারিত সাপ্তাহিক ‘খবরের কাগজ’-এর সূচনা পর্বের ইতিহাস লেখার ইচ্ছে আমার কখনোই ছিলোনা। এর একটি অন্যতম কারণ হচ্ছে এর সঙ্গে আমার সংশ্লিষ্টতা। সাধারনত কোনও ধরণের সংগঠন বা প্রতিষ্ঠানের সঙ্গে যুক্ত থাকলে, বিশেষ করে শুরুতে যুক্ত থাকলে, আমি তার ইতিহাস লিখতে অনুৎসাহী হই; কারণ হচ্ছে এতে করে আত্মপ্রচারের একটা বিপদের আশংকা থাকে। সব ঘটনা মনে না থাকার কারনে কারো অবদান ছোট করে ফেলার ভয়ও মনে থাকে। কিন্ত সম্প্রতি নাঈম (নাইমুল ইসলাম খান) সংক্ষেপে খবরের কাগজের একটি ইতিহাস হাজির করায় এক ধরণের অনুপ্রেরনা পেলাম, খানিকটা বাধ্যবাধকতাও মনে হল। কারণ নাঈমের লেখা ইতিহাসটি কেবল আংশিক নয়, খানিকটা বিভ্রান্তিকরও বটে। ভাবলাম যতটা মনে আছে লিখে ফেলাই ভালো।সাপ্তাহিক খবরের কাগজের প্রকাশনা শুরু হয়েছিলো ১৯৮১ সালে। এর প্রধান উদ্যোক্তা ডাকসুর ত্ৎকালীন সাধারন সম্পাদক আখতারউজ্জামান এবং আমি। কিউবার কমিউনিস্ট পার্টির ‘গ্রানমা’র মতো ব্রডশিট আকারে একটি পত্রিকা বের করার সিদ্ধান্ত নেই ১৯৮১ সালের শুরুতে। নাম ঠিক হয় – সাপ্তাহিক কাগজ।

১৯৮৩ সালের ঈদ সংখ্যা সামরিক শাসনের কারনে কাগজ বের করা দুরূহ হয়ে পড়ল। অফিসে তালা ঝোলানো ছাড়া বিকল্প থাকলো না। তারপরেও কয়েকজন মিলে কাগজটা বের করতে থাকলাম – ছাপা হয় কম, বিক্রির জন্যে দেয়া হয়না। অনিয়মিত হয়ে পড়ল খবরের কাগজ।  তখন এর আকারেও বদল ঘতলো – হয়ে পড়ল ম্যাগাজিনের আকার। ছাত্র আন্দোলন শুরু হল সেপ্টেম্বরে। আমি আর কার্যত নিয়মিত ভাবে কাগজের দিকে চোখ রাখতে পারলাম না । কিন্ত বিশেষ সংখ্যা বের করার কাজ এড়ানো যেত না। (১৯৮৩ সালেরে ঈদ সংখ্যার ছবি সংযুক্ত)। ১৯৮৫ সালে যখন কারাগারে আটক হয়ে আমি আর আখতার ভাই ভবিষ্যতে কাগজটা কিভাবে আবার গুছিয়ে তুলতে হবে এই আলোচনা করতাম মান্না ভাই (মাহমুদুর রহমান মান্না) এই বলে রসিকতা করতেন যে আমারা কেন ভাবছি যে শিগগিরই আমরা কারামুক্ত হবো। জেল থেকে বেরুবার পর আখতার ভাইই কার্যত কাগজটি অনিয়মিতভাবে হলেও অব্যাহত রাখলেন। আমার সংশ্লিষ্টতা সীমিত হলেও বাদ পড়লো না (১৯৮৬ সালে ঈদ সংখ্যার ছবি)।

এও সিদ্ধান্ত নেই যে এটি কোনভাবেই দলীয় প্রভাবের মধ্যে থাকবেনা। সেই সময়ে এই নিয়ে আলোচনায় আমার সঙ্গে ছিলো যশোর থেকে আসা তরুন কবি ও আমাদের বন্ধু সাজ্জাদ হোসেন এবং ছাত্রলীগের সংগঠক জহুরুল আমীন কাইউম। মুদ্রণ বিষয়ে সাজ্জাদের অভিজ্ঞতা এবং নতুন চিন্তা ভাবনাই ওর সংযুক্তির কারণ। আয়োজন শুরু করার আগেই এর সঙ্গে যুক্ত হন রায়হান ফেরদাউস, আমাদের কাছে যিনি মধু ভাই।পত্রিকাটির সরকারী অনুমোদন নিতে গিয়ে আমরা দুটো সমস্যায় পড়লাম। প্রথমত আখতার ভাইয়ের নামে ডিক্লারেশন দিতে কর্মকর্তারা রাজি হলেন না। দ্বিতীয়ত ‘কাগজ’ নামে একটি পত্রিকার ডিক্লারেশন আছে। প্রথম সমস্যার সমাধান আমাদের আগেই বিবেচনায় ছিলো। আমরাও চাইছিলাম আখতার ভাইয়ের নাম না থাকলেই ভালো। সিদ্ধান্ত নেয়া হয় আখতার ভাইয়ের কাজিন – মফিজ ভাইয়ের (কে বি এম মফিজুর রহমান খান) নামে অনুমোদন নেয়া হবে। সেইভাবেই আবেদন করা হয়; মফিজ ভাই প্রকাশক। সম্পাদক রায়হান ফেরদাউস। দ্বিতীয় সমস্যার সমাধান হলো– আমরা একে নাম দিলাম ‘খবরের কাগজ’। কিন্ত ইতিমধ্যে যেহেতু লোগো তৈরি হয়ে গেছে, তৈরি করেছেন রেখায়ণখ্যাত রাগীব আহসান – সেই জন্যে এর মধ্যে ছোট করে ‘খবরের’ কথাটা যুক্ত করা হবে। (যতদিন খবরের কাগজ বেরিয়েছে ততদিন এইভাবেই লোগো ব্যবহৃত হয়েছে)। এই ভাবেই ‘কাগজ’ হল ‘খবরের কাগজ’।এই পত্রিকার বিভাগীয় সম্পাদক হিসেবে যোগ দেন সাহিত্য পাতার জন্যে মঈনুল আহসান সাবের, অর্থনীতি পাতার জন্যে ফারুক মঈনুদ্দিন, নিউজ দেখার দায়িত্বে আবিদ রহমান। স্মৃতি বিভ্রাট না ঘটলে আরো যোগ দেন ফয়সল মোকাম্মেল। সম্ভবত মারুফ চিনুও ছিলেন। এর আড্ডায় যারা আসতো তারাই কিছু না কিছু করতেন, সেই সূত্রে সুব্রত শংকর ধর কিছু না কিছু করে থাকবে। তুষার দাশ এসেছে প্রায়শ, সম্ভবত তাকেও কিছু না কিছু কাজে ব্যস্ত করা হয়েছে। এই রকম আরো অনেকেই। যোগ দেন কথাটা আসলে এক্ষেত্রে সঠিক নয়। কেউ কোনো রকম বেতন বা ভাতা নিয়ে বা কাগজে কলমে লিখে যোগ দেননি।এর অফিস বানানো হয় ২৩ সিদ্ধ্বেশ্বরী’তে – আমার পৈত্রিক নিবাসের গ্যারেজে। হ্যাঁ, ঠিক পড়েছেন গ্যারাজে। পত্রিকা বেরোয় ১৯৮১ সালে শেষ দিকে। এর পৃষ্ঠাসজ্জা বা মেক-আপ করতো সাজ্জাদ আর আবিদ। মুদ্রনের দায়িত্বে ছিলেন নিখিল। নিখিল পেশায় ছিলেন পেস্টার, দৈনিক আজাদে কাজ করতেন আর নিয়মিতভাবেই অন্যান্য সাপ্তাহিক কাগজের পেস্টিং করতেন দিনের বেলা। আমাদের কাগজের কম্পোজের দায়িত্ব নিয়ে তাঁর বাসার কম্পোজের জন্যে আরো অনেক টাইপ কেনেন। তাঁর স্ত্রী এবং অন্য কয়েকজন কম্পোজ করতেন। পত্রিকা ছাপা হতো দৈনিক আজাদ প্রেসে। সার্কুলেশনের দায়িত্বে ছিলো ফারুক। মহসিন আল আব্বাস ছিলো সকল কাজের কাজী। আর কাইউম ছিলো সব সমস্যার সমাধান।রিপোর্টিংয়ের কথা বলি। সেখানে যারা রিপোর্ট করতেন তাঁদের মধ্যে ছিলেন নাজিমুদ্দিন মোস্তান এবং মতিউর রহমান চৌধুরী। তাঁরা তখন বিখ্যাত সাংবাদিক। তাঁরা কখনোই অফিসে আসেননি, তাঁদের কাছ থেকে গিয়ে লেখা আনা হতো। তাঁদের প্রতিবেদন তাঁদের নামে ছাপা হত না। কেননা তাঁর একটি দৈনিকের সিনিয়র সাংবাদিক। পত্রিকা বেরুবার পরে কয়েক সপ্তাহেই এটি সামান্য দৃষ্টি আকর্ষন করলো। কারণ হল ব্রড শিটে দুই রঙে আর কোনো কাগজ তখন ছাপা হতোনা। কিন্ত বিজ্ঞাপন পাওয়া যেতো খুব কম। এর মধ্যে ১৯৮২ সালে আমি আবার ডাকসু’র সাহিত্য সম্পাদক পদে নির্বাচিত হলাম, আখতার ভাই ভিপি। তখন খবরের কাগজ কার্যত মধু ভাই চালান। ১৯৮২ সালের মার্চ মাসে যখন এটা স্পষ্ট হয়ে গেলো যে সামরিক শাসন আসছে। সেই সময়ে ২৪ মার্চের সংখ্যার শিরোনাম করা হল – ‘আর মাত্র সাত দিন’। দুর্ভাগ্যজনক হল – ২৪ মার্চের এই সংখ্যা বাজারে দেয়া যায়নি। এই রিপোর্টটি দুইজন রিপোর্টারের আলাদা দুটো রিপোর্টের তথ্যের ভিত্তিতে ডেস্কে লেখা হয়েছিল।

১৯৮৩ সালের ঈদ সংখ্যা সামরিক শাসনের কারনে কাগজ বের করা দুরূহ হয়ে পড়ল। অফিসে তালা ঝোলানো ছাড়া বিকল্প থাকলো না। তারপরেও কয়েকজন মিলে কাগজটা বের করতে থাকলাম – ছাপা হয় কম, বিক্রির জন্যে দেয়া হয়না। অনিয়মিত হয়ে পড়ল খবরের কাগজ।  তখন এর আকারেও বদল ঘতলো – হয়ে পড়ল ম্যাগাজিনের আকার। ছাত্র আন্দোলন শুরু হল সেপ্টেম্বরে। আমি আর কার্যত নিয়মিত ভাবে কাগজের দিকে চোখ রাখতে পারলাম না । কিন্ত বিশেষ সংখ্যা বের করার কাজ এড়ানো যেত না। (১৯৮৩ সালেরে ঈদ সংখ্যার ছবি সংযুক্ত)। ১৯৮৫ সালে যখন কারাগারে আটক হয়ে আমি আর আখতার ভাই ভবিষ্যতে কাগজটা কিভাবে আবার গুছিয়ে তুলতে হবে এই আলোচনা করতাম মান্না ভাই (মাহমুদুর রহমান মান্না) এই বলে রসিকতা করতেন যে আমারা কেন ভাবছি যে শিগগিরই আমরা কারামুক্ত হবো। জেল থেকে বেরুবার পর আখতার ভাইই কার্যত কাগজটি অনিয়মিতভাবে হলেও অব্যাহত রাখলেন। আমার সংশ্লিষ্টতা সীমিত হলেও বাদ পড়লো না (১৯৮৬ সালে ঈদ সংখ্যার ছবি)।

১৯৮৭ সালের জুলাই মাসে আমি প্রবাসে চলে গেলাম। ১৯৮৮ সালের গ্রীষ্মকালে আমি ঢাকায় আসলে জানলাম যে আখতার ভাই খবরের কাগজের অনিয়মিত প্রকাশনা অব্যাহত রেখেছেন। তাঁকে এই কাজে সাহায্য করছেন মোশতাক দাউদি। পরের বছর আখতার ভাই আমাকে জানান যে, জিল্লুর রহমান এবং নাঈমুল ইসলাম খান তাঁকে অনুরোধ করেছে – খবরের কাগজ তাঁরা নিয়মিতভাবে প্রকাশ করতে উৎসাহী। আখতার ভাই আমার কাছে জানতে চান এই নিয়ে আমার কোনও আপত্তি আছে কিনা। আমি খানিকটা বিস্মিত হলাম, আমার আপত্তির বা সম্মতির প্রশ্ন আসছে কেন? তিনি মনে করিয়ে দিলেন যে, ১৯৮১ সালে যারা স্বপ্ন দেখে এই কাগজ বের করেছে আমি তাঁদের একজন। জিল্লুর আর নাঈম আমার ঘনিষ্ঠ। ইতিমধ্যেই জিল্লুর এবং নাঈম আমার সঙ্গে কথা বলেছে। আমি আখতার ভাইকে বললাম এটি আপনি টিকিয়ে রেখেছেন এবং কাগজপত্রে এর মালিক মফিজ ভাই- আপনারা সিদ্ধান্ত নিন।

এই পর্যায়ে ১৯৮৮ সালের শেষে নাঈমুল ইসলাম খান এবং জিল্লুর রহমান খবরের কাগজের দায়িত্ব এবং কালক্রমে মালিকানা নেন। অফিস জোনাকি সিনেমা হলের কাছে পল্টনে নেয়া হয়। ঢাকায় আসলে সেখানেই সময় কেটেছে অনেক।  খবরের কাগজের এই পর্যায়ের শুরু থেকেই এর নির্বাহী সম্পাদক জিল্লুর আমাকে লেখার জন্যে অনুরোধ করে এবং আমি সেখানে নিয়মিত কলাম লিখতে শুরু করি; নাম – ‘দূরদেশ’। বিষয় আন্তর্জাতিক রাজনীতি। হাওয়াইয়ের হনলুলু শহরে বসে নিয়মিতভাবে লেখাটা ছিলো চ্যালেঞ্জ। লিখে পোস্ট করে পাঠাতে হয়। তবে তা সাপ্তাহিক ঘটনা প্রবাহ নির্ভর কলাম ছিলো না, ছিলো বিষয় ভিত্তিক। যেমন ১৯৮৯ সালের জানুয়ারি মাসে লেখা একটি কলামের বিষয় হচ্ছে ‘বিশ্ব জুড়ে নতুন আর্থ-রাজনীতিক বাস্তবতা তৈরি হচ্ছে’। ২৬ ফেব্রুয়ারিতে লেখা এবং ঐ সপ্তাহে প্রকাশিত লেখার শিরোনাম ছিলো ‘আফগানিস্তান – কেন এই পরাজয়?’। আন্তর্জাতিক বিষয় নিয়ে দীর্ঘ সব রচনা, যা একেবারে সপ্তাহের উত্তেজনায় ভরা নয়, এমন বিষয় নিয়ে ১৯৮৯ জানুয়ারি থেকে ১৯৯২ সালের ডিসেম্বর পর্যন্ত চার বছর আমাকে লিখতে দেয়ার জন্যে আমি জিল্লুর আর নাইমের কাছে কৃতজ্ঞ। (এই লেখাগুলো নিয়ে আমার বই দূরদেশ প্রকাশিত হয় ১৯৯৩ সালের ফেব্রুয়ারীতে)। ইতিমধ্যে খবরের কাগজের মালিকানায় পরিবর্তন ঘটে, অফিসের বদল হয়, আমি সেই অফিসে জিল্লুর-নাঈমের সঙ্গে আড্ডা দিলেও এই পত্রিকার সঙ্গে আমার সম্পর্ক হয়ে পড়ে কেবল লেখকের। ১৯৯২ সালের শেষ পর্যন্ত আমি লেখা অব্যাহত রাখি।

পাদটীকাএই লেখাকে পাঠকরা নাঈমের সঙ্গে আমার বাহাস বলে মনে করলে ভুল করবেন। নাইমের সঙ্গে আমার পরিচয় চার দশকের। এর মধ্যে অনেক অনেক কাজ আমরা একসাথে করেছি। নাইমের লেখায় “খবরের কাগজে দেশসেরা যারা অবশেষে নিয়মিত লিখেছিলেন” সেই তালিকার শেষ দিকে আমার নাম দেখে মনে হল আসলেই কি আমি ‘অবশেষে’ যুক্ত হয়েছিলাম? সেই ভাবনা থেকেই এই ইতিহাসের অবতারনা। নাইমের দেয়া খবরের কাগজের প্রচ্ছদে কি কারনে ১৯৯০ সালে ৯ম বর্ষ লেখা আছে তার কারণ এখন মনে হয় বোঝা সহজ হবে।

আলী রীয়াজ: যুক্তরাষ্ট্রের ইলিনয় স্টেট ইউনিভার্সিটির সরকার ও রাজনীতি বিভাগের ডিস্টিংগুইশড প্রফেসর

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *