সত্যকে আটকানোর কি কোন পথ খোলা আছে

সত্যকে আটকানোর কি কোন পথ খোলা আছে

:: মুজতবা খন্দকার ::

আমার বাসার নিচে একটা বিউটি পার্লার আছে। গত পচিশে মার্চের পর থেকে সেটা বন্ধ ছিলো। বিউটি পার্লারের মালিক একজন নারী। তিনি তার স্বামী ও দুই ছেলে মেয়েসহ পার্লারের সাথে লাগোয়া দুটি ঘর নিয়ে থাকতেন। করোনা ছড়ানোর পর তারা পার্লার বন্ধ করে গ্রামে ফিরে গিয়েছিলেন। সরকার সাধারন ছুটি প্রত্যাহারের পর ওরা ঢাকা ফিরে আসে। কিন্ত, পার্লারের কদর আর সেইভাবে নেই।যেটা ছিলো গত জানুয়ারী এবং ফেব্রুয়ারীতে। পনের হাজার টাকা ভাড়া। বন্ধের তিনমাস পর ঢাকা আসা মাত্র বাসার মালিক চেয়ে বসেছে। এখন পার্লারে আগের মতন কেউ সুন্দরী হতে আসেনা। বেচারি পড়েছেন,মহা বিপদে। আজ সকালে হঠাৎ দেখলাম,পার্লারের সাইনবোর্ড সরাচ্ছেন মহিলার স্বামী। জিজ্ঞেস করলাম হঠাৎ.. কি ব্যাপার অনত্র চলে যাচ্ছেন বুঝি শরীফ সাহেব? কোনো উত্তর নেই,রাজ্যের বিষন্নতা মুখে। কিছুক্ষন পরেই এলেন পার্লারের মালিক রত্না ম্যাডাম। উনাকে জিজ্ঞেস করতেই বললেন,আসল কাহিনি। তিনমাস দেশে ছিলেন। ফিরে এসে ভেবেছিলেন,সেই আগের জমজমাট অবস্থা না হলেও কাষ্টমার পাবেন কোনোরকমে চালিয়ে যাবেন।কিন্তু গত এক মাসে দিনে সাকুল্যে দুজন কি তিনজন নারী আসেন। এদিকে বাসার মালিক ভাড়ার তাগাদা দিয়েই চলছেন। কি আর করবো ভাবছি গ্রামেই ফিরে যাবো। ভাড়া তো দিতে পারিনি,বলেছি গ্রামে গিয়ে উনার (স্বামীর দিকে ঈশারা করে) জমি বিক্রি করে ভাড়ার টাকাটা বিকাস করে দেব। জিম্মা হিসেবে আমার পার্লারের জিনিসপত্র রেখে দিচ্ছি। রত্না ম্যাডামের চোখে পানি…
এই ছোয়াচে মহামারির সময় কে আসবে সাজতে.. যে শহরে বিয়ের কোনো উৎসব নেই। নেই কোনো পার্টি। তবে কেন কিসের তরে সাজগোজ।
রত্না ম্যাডামের পার্লার কেন,সব খানেই তো একই অবস্থা।
এই যেমন আমার বাসার মালিকের চারটি ফ্ল্যাট ছিলো, এখন তার দুটি খালি। গতকাল তার সাথে দেখা,সিড়িতেই বললেন,দোতলার একটি, তিন তলায় একটি খালি হয়েছে.. আপনি চাইলে দুটোর একটাতে শিফট করতে পারেন। আমি বললাম, এখন দরকার হবেনা,চারতলায় আমি বেশ আছি!

তাই তো বিবেকের টানে কিছু মুজিব ভক্ত নাসিমের মৃত্যুর পর কিছু সত্য কথা লিখেও পার পায়নি.. দলের নেতাকর্মী হয়েও মামলা জেল থেকে তারা রেহায় পায়নি… সত্য বলাকে আটকানোর পথ আছে, কিন্তু সত্যকে আটকানোর কি কেনো পথ আছে, কোনো আইন আছে, কোনো সরকারের?

দুই।

ভাড়াটিয়া পরিষদ নামের একটি বেসরকারি সংগঠনের সভাপতি বাহরানে সুলতান বাহার বলেছেন, ‘আমাদের কাছে যে হিসাব রয়েছে, তাতে এরই মধ্যে প্রায় ৫০ হাজার লোক বাসা ছেড়ে দিয়েছে।’

রাজধানীতে ভাসমান মানুষ ও বস্তিবাসীদের নিয়ে কাজ করা ‘সাজেদা ফাউন্ডেশন’-এর কর্মকর্তারা নিম্ন আয়ের মানুষের ঢাকা ছাড়ার বিষয়টি জানেন বলে নিশ্চিত করেছেন।
তবে কী পরিমাণ মানুষ করোনার প্রভাবে ঢাকা ছেড়েছে এর কোনো পরিসংখ্যান নেই সরকারি কোনো দপ্তর বা সিটি করপোরেশনের কাছে।

২০১১ সালের সর্বশেষ আদমশুমারি অনুসারে, রাজধানীর জনসংখ্যা এক কোটি ৭০ লাখ। ভাড়াটিয়া পরিষদের হিসাব মতে, এর মধ্যে ৮০ শতাংশ লোক ভাড়ায় বসবাস করে। সে হিসাবে ঢাকা শহরে ভাড়ায় থাকে এক কোটি ৩৬ লাখ মানুষ।

অর্থনীতিবিদরা বলছেন, করোনার কারণে মানুষের জীবনে বিপর্যয় নেমে এসেছে। আর্থিক বিপর্যয়ের কারণে সমাজের শ্রেণি কাঠামোতে পরিবর্তন ঘটে গেছে।

গত ৮ জুন বাংলাদেশ অর্থনীতি সমিতি একটি জরিপ তথ্য প্রকাশ করেছে। ওই জরিপে বলা হয়েছে, সাধারণ ছুটির ৬৬ দিনে দেশের তিন কোটি ৫৯ লাখ ৭৩ হাজার ২৭১ জন লোক চাকরি বা উপার্জন হারিয়েছেন। করোনার বিস্তার ঠেকাতে সরকার ঘোষিত সাধারণ ছুটির আগে দেশে মোট দরিদ্র মানুষের সংখ্যা ছিল তিন কোটি ৪০ লাখ। ছুটির ৬৬ দিনেই ‘নবদরিদ্র’ মানুষের সৃষ্টি হয়েছে। দরিদ্র মানুষের সংখ্যা দাঁড়িয়েছে ছয় কোটি ৮০ লাখে।

অর্থনীতি সমিতির মতে, সাধারণ ছুটির কারণে বহুমাত্রিক ক্ষতির সম্মুখীন হয়েছে অনানুষ্ঠানিক খাতের ব্যবসা। বিশেষ করে ফেরিওয়ালা, হকার, ভ্যানে পণ্য বিক্রেতা, চা-পান-সিগারেট, খুদে দোকান, মুদি দোকান, ক্ষুদ্র হোটেল, রেঁস্তোরা, মাঝারি পাইকারি ব্যবসা। সারা দেশে এ ধরনের ব্যবসায়ীর সংখ্যা ৮৬ লাখের ওপরে। তাদের ওপর নির্ভরশীল সাত কোটি ৮০ লাখ মানুষের জীবন-জীবিকা। যারা দেশের মোট জনসংখ্যার ৪৬ শতাংশ।

গতকাল একাত্তর চ্যানেলে হঠাৎ দেখলাম ওরা বলছে বাংলাদেশ ব্যাংকের রিজার্ভ না কি আমার রেকর্ডব্রেক করেছে। আমি হাসি আর বলি, গাছে যদি বেল পাকে তাতে কাকের কি! রির্জাভ যদি বাড়ে.. তাতে জনগনের কি,ওটাতো যারা লুটেপুটে খাওয়ার তারা খাবে,ওতে পাবলিকের কি? এর আগে দেশের স্বঘোষিত বিশ্বের শ্রেষ্ঠ অর্থমন্ত্রী মাল মুহিতেে সময় দেশের রিচার্ভ চুরি গেলো,তার কি কোনো কিনারা হয়েছে?


জিডিপির গ্রোথ কেবলি বাড়ছে,উন্নতি হচ্ছে স্বৈনে শ্বৈনে! আমরা উন্নত বিশ্বের কাতারে পৌছে গেছি.. কত শত বোলচাল! তাহলে ঢাকা শহর থেকে নিম্নবিত্ত থেকে মধ্য বিত্তরা কেন চলে যাচ্ছে..
করোনার শুরুতে এটা নিয়ে গা করেননি শাসকদলের কেউ। উনারা ব্যস্ত তথন জাতীর পিতার জন্মশতবার্ষিকী উদযাপনের মচ্ছবে। কোটি টাকার আতশবাজি পোড়ানো থেকে কি না করেছেন। যেই উনাদের পরম বন্ধু হিন্দুস্থানের প্রধানমন্ত্রী উৎসবে শামিল হবার ব্যাপারে পিটটান দিলেন.. তখনই উনাদের মোহভঙ্গ হলো। অথচ এর মাঝে যা হবার তা হলো।


এরপর পচিশে মার্চ থেকে ঘোষনা করলেন,সরকারী ছুটি। অথচ করা দরকার ছিলো কঠোর লকডাউন। কিন্তু তা না করে সাধারন ছুটি। জনগন যাদের ঘরে খাদ্য মজুদ নেই,তারা কতদিন ঘরে বসে থাকবে। তারা ছুটলেন জীবিকার সন্ধানে। সরকার খাদ্য বিতরন কর্মসুচী শুরু করলো.. দেখা গেলো সেগুলির বেশীরভাগই লুট কিম্বা আত্মসাৎ করছে দলের নেতারা।


লক ডাউন করা হলে.. জনগনের সব দায়িত্ব পড়ে সরকারের, সরকার জনগনের দায়িত্ব নিতে চায়না বলে লকডাউন করেনি। ফলে যা হবার তাই হয়েছে,কমিউনিটি ট্রান্সমিশন যতটুকু হবার হয়েছে। রির্জাভ ফুলে ফেপে আকাশে উঠেছে, জিডিপি বেড়েছে তাহলে কেন মাত্র তিনমাস জনগনকে তিন বেলা খেতে দিতে এত অনিহা! এত এত উন্নয়নের গল্প মধ্যম আয়ের দেশের বড়াই সেটা কোথায় গেলো! কথায় বলে ভাত দেবার মুরোদ নেই,কিল দেবার গোসাই!


এখন আবার অধিক করোনা আক্রান্ত এলাকা চিহিৃত করার নামে শুরু হয়েছে তামাশা। রেড,ইয়োলো,গ্রিন জোন চিহৃিত করে বসে আছে, আছে তো আছেই,কোনো কার্যকর পদক্ষেপ নেবার কোনো খবর নেই।
এক রাজাবাজারকে পাইলট প্রকল্প ধরে বসে আছে। আর রাজাবাজারের জনগন কত খারাপ সেটা দেখিয়ে প্রমান করতে চাইছে যত দোষ,ওই নন্দ জনগনের..
আর এদিকে,নিজেরা যে যেভাবে পারছেন,দেশ ছাড়ছেন। কেউ কানাডা,কেউ সিঙ্গাপুর…
উন্নয়ন যদি টেকসই না হয়,সেটা যদি হয় ফাপা বেলুন তাহলে কিছুই হয়না। আগে মুখ খুলতো বিরোধী মানুষ। এখন নিজের দলের মানুষও মুখ খুলতে শুরু করেছে।

ডিজিটাল নিরাপত্তা আইন নামের কথিত আইন দিয়ে মানুষের মুখ কত দিন কিম্বা কতজনকে স্তব্দ করে রাখা যায়,ষোল কোটি মানুষ যখন কথা বলবে,তখন কোন আইন দিয়ে আটকাবেন, ভেবেছেন কি?
মোহাম্মদ নাসীম পোড় খাওয়া দলের নেতা। কিন্ত তার আমল নামা কি বলে, তিনি যখন স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী ছিলেন,তখন তার স্ত্রীর বিরুদ্ধে নানা অভিযোগ ছিলো,লোকে তাকে মিসেস টেন পার্সেন্ট বলতো। তারপর তাকে স্বাস্থ্যমন্ত্রী করলেন.. চরিত্রের কি কোনো বদল হয়েছিলো .. স্বাস্থ্যমন্ত্রনালয়ে নাসীম সাহেবের সময়ে যারা কাজ করতেন,সেই আমলা,ডাক্তার,বিএমএ, স্বাচিপ, এসব সংগঠনে আমাদেরও বন্ধু বান্ধব কিছু আছে। তাদের কাছ থেকে শোনা তথ্য নিশ্চই কাহিনি নয়। তাই তো বিবেকের টানে কিছু মুজিব ভক্ত নাসিমের মৃত্যুর পর কিছু সত্য কথা লিখেও পার পায়নি.. দলের নেতাকর্মী হয়েও মামলা জেল থেকে তারা রেহায় পায়নি… সত্য বলাকে আটকানোর পথ আছে, কিন্তু সত্যকে আটকানোর কি কেনো পথ আছে, কোনো আইন আছে, কোনো সরকারের?


রবী ঠাকুরেরর কনিকা নামে একটি কবিতা আছে,যেটা আমার খুব পছন্দের, সেটার দুটি চরণ উদ্ধিতি দিয়ে শেষ করি এ লেখা-
দ্বার বন্ধ করে দিয়ে ভ্রমটারে রুখি।
সত্য বলে, আমি তবে কোথা দিয়ে ঢুকি?

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

Shares