সাহিত্য ও সংস্কৃতির জগতে শহীদুল্লাহ কায়সার অপরাজেয়

সাহিত্য ও সংস্কৃতির জগতে শহীদুল্লাহ কায়সার অপরাজেয়

     “… (পা. কা.) : আপনি ত নাকি একবার বিয়ে করেছিলেন?

(শ. কা.) : হ্যা, জোহরা বেগম নামে কলকাতার একজন রমণীকে বিয়ে করেছিলাম। জোহরা বেগমের বাবা কলকাতার আর. আহমেদ খাদ্যমন্ত্রী ছিলেন। জোহরা বেগম ও তার মা ঢাকায় আহমদুল কবিরের বাড়ি বেড়াতে এসেছিল। অনেক দিন ছিল। আহমদুল কবির আমার বন্ধু। ও-বাড়িতেই আমার সাথে ওর পরিচয় হয়। জোহরা বেগম এক সময় আমাকে বিয়ে করার ইচ্ছে প্রকাশ করে। ওর মায়েরও তাতে অমত ছিল না। আহমদুল কবিরও এব্যাপারে খুব উৎসাহ দেখিয়েছিল। জোহরা বেগমের সাথে মিশে ওকে আমারও অপছন্দ হয়নি। আহমদুল কবিরের বাড়িতেই আমাদের বিয়ে হয় ১৯৫৮ সালে। লায়লা কবির (আহমদুল কবিরের স্ত্রী), ফরিদা হাসান (লায়লার বড় বােন), সাদরী ইস্পাহানি, আমার বন্ধু, এরা বিয়ের সব আয়ােজন করে। কিন্তু বিয়ে করে নীড় বাঁধা হল না, কারণ সেদিনই রাত ১২টায় আমাকে জেলে চলে যেতে হয়েছে। জেলখানায় আমার অনিশ্চিত জীবনে ওর সম্ভাবনাময় জীবনকে নষ্ট করতে চাইল না। কলকাতার মেয়ে। এখানকার পরিবেশ ভিন্ন। এ-পরিবেশ ওর ভাল লাগেনি। আমি জেলখানায় থাকতে সরাসরি আমার সঙ্গে কথা বলে চলে গেছে। ওকে আমি আমার ভালবাসার জোরে আটকাতে চাইনি। I could not be a cause of her unhappiness. 

আমার বাবা শহীদুল্লা কায়সার। এ দেশের একজন প্রখ্যাত সাহিত্যিক, সাংবাদিক ও রাজনীতিবিদ। স্কুলে ছাত্রজীবন থেকেই তিনি বামপন্থী রাজনীতির সঙ্গে জড়িয়ে পড়েন। তারপর আমৃত্যু সে আদর্শকে সামনে রেখেই তিনি সারাজীবন কাজ করেছেন মানুষের মুক্তির লক্ষ্যে। জেল জুলুম অত্যাচার নিপীড়ন সয়েছেন হাসি মুখে। কিন্তু তাঁর বিশ্বাস ও আর্দশ থেকে সরে দাঁড়াননি। এক সময় হাতে তুলে নিলেন কলম। তাঁর লেখায় ফুটে উঠলাে সমাজ দেশ ও কালের প্রতিচ্ছবি। শুরু করলেন সাংবাদিকতা। তাঁর শাণিত কলমের আঁচড়ে সংবাদের সম্পাদকীয় ও উপসম্পাদকীয় মানুষের চেতনাকে করল আঘাত। স্বাধিকার, গণতন্ত্র, বাঙালির অধিকারের প্রশ্নে তাঁর সাহসী উচ্চারণ সংগ্রামী মানুষকে করেছে উজ্জীবিত। এ সংগ্রামী মানুষটি স্বাধীনতা যুদ্ধে রক্তক্ষয়ী সংগ্রামে হারিয়ে গেলেন। বাবার কথা আমার মনে নেই। কোন স্মৃতিও নেই। কিন্তু আছে তাঁর সাহিত্য, রাজনৈতিক আদর্শ, আর এ স্বাধীন বাংলাদেশ॥”

… শহীদুল্লাহ কায়সার আমার পাশে এসে বসল। একদৃষ্টিতে আমার দিকে তাকিয়ে থাকল। সে-দৃষ্টিতে আমার সকল অণু-পরমাণু বলে উঠল — বল, তােমার কথা বল —

আমি বললাম – ‘আপনি স্ত্রীর পত্র” গল্পটি পড়েছেন? 

– হা, পড়েছি। 

– মৃণালকে আপনার কেমন লাগে? 

– অসম্ভব সাহসী, প্রতিবাদী। 

– ধরুন, আমি মৃণাল।

সঙ্গে সঙ্গে ওর চেহারায় যন্ত্রণার একটা প্রচণ্ড ছাপ ফুটে উঠল। ঠোঁটটা কামড়ে চেয়ারে গাটা এলিয়ে দিল। আবার উঠে পায়চারি শুরু করল- মাথাটা অসম্ভবভাবে চেপে ধরল। আবার আমার দিকে তাকিয়ে আমার পাশেই বসল।

আমি বললাম – আমি কি মৃণালের কথা বলব? 

– মৃণালের কথা না শুনে আমি এখান থেকে যাব না- যত রাতই হােক। 

শুরু হল মৃণালের কথা।

আমি বলেছি আমার ঋষি বাবার কথা। বাবা তাঁর সমস্ত সম্পত্তি স্কুলকে দান করেছেন বলে আমাদের আর্থিক অবস্থা মােটেই ভাল যাচ্ছিল না। আমরা যত বড় হতে লাগলাম, খরচ বেড়ে চলল। আর্থিক অবস্থারও অবনতি হতে লাগল। স্কুলের স্যারদের সাহায্য-সহযােগিতা না পেলে আমার ম্যাট্রিক পাসও করা হত না। স্যাররা বই যােগাড় করে দিতেন — বাড়ি এসে আমাকে পড়াতেন। গ্রামের লােক আমাকে জড়িয়ে স্যারদের সম্পর্কে কুৎসা রটিয়েছে অনেক। সুবিধা হয়েছে এই – বাবারও জেদ চেপে গেল। আমার মধ্যেও একটা কঠিন প্রত্যয় কাজ করল। যত বেশি বাধাপ্রাপ্ত হয়েছি, তত বেশি শক্তি অর্জন করেছি। আমার ম্যাট্রিক পরীক্ষার কেন্দ্র ছিল চান্দিনা (দাউদকান্দি যাবার পথে)। একটি বড় থানা শহর বলা যায়। বাবা আমাকে নিয়ে চলে গেলেন চান্দিনা। আমি যাতে পরীক্ষা দিতে না পারি, সে জন্য গ্রামের আত্মীয়স্বজন কষ্ট করে থানার ও.সি. থেকে শুরু করে চান্দিনা হাইস্কুলের প্রধান শিক্ষকসহ আরাে অনেক স্থানীয় ব্যক্তিত্বকে আমার সম্পর্কে নানা কথা বলে এসেছে। তাতে ওদের কিছু টাকা-পয়সাও খরচ হয়েছে বৈকি। আমি যথারীতি পরীক্ষা দিতে গেলাম।

… মেজো আপা তখন ফেঞ্চুগঞ্জে। দুলাভাই সেখানে সার কারখানায় উচ্চপদস্থ কর্মচারী। হােস্টেলে একদিন আপার চিঠি পেলাম এবার ছুটিতে এখানে চলে এসাে। বেড়াতে যাবার আনন্দ সবার কাছেই সুখকর। ট্রেনে যেতে যেতে চা বাগান দেখব, চলন্ত ট্রেন থেকে দূর-দূরান্তের গ্রাম দেখব। সে কি আনন্দ আমার! ট্রেন ভ্রমণ এই প্রথম আমার জীবনে। দূরে, বহু দূরে যাত্রা এই প্রথম। খুশিমনে গেলাম ফেঞ্চুগঞ্জ। কদিন পর ঢাকা থেকে বেড়াতে এসেছে দুলাভাইর বন্ধু, বন্ধুপত্নী ও বন্ধুর ২৫/২৬ বছর বয়সের শ্যালক মিঃ ‘জ’। আমার সঙ্গে ওদের আচার-আচরণে কথাবার্তায় মনে হল তারা এখানে বেড়াতে এসেছে কোন অজানা উদ্দেশ্যে। তবু ব্যাপারটা তত গুরুত্ব দিয়ে দেখিনি। কারণ মামাকে চমক লাগাবার মত এদের মধ্যে তেমন কিছু লক্ষ করিনি।

মহা আনন্দে ফেঞ্চুগঞ্জে কদিন বেরিয়ে ওরা ঢাকায় চলে গেল। ওরা চলে বার পর মেজো আপা আমাকে হাসতে হাসতে বলল — মিঃ ‘জ’কে কেমন লাগল?

– মোটেও ভাল লাগেনি। ভাল লাগার মত ভদ্রলোকের মধ্যে ত কিছু চোখে পড়েনি। Unsmart — বােবা বােবা নিষ্প্রভ অসহায় অসহায় বলে মনে হয়েছে।

– ওরা তােকে পছন্দ করেছে। ঢাকা থেকে এখানে তােকে দেখার জন্যই এসেছিল।

বুঝতে পারলাম, মেজো আপা এ-ব্যাপারে যথেষ্ট উদ্যোগী ভূমিকা পালন করেছে এবং অনেক আগে থেকেই।

আপা বলল, মিঃ ‘জ’ ওর বাবা-মার একমাত্র ছেলে — ব্যবসা করে। বিরাট বড় লােক। ঢাকায় ওদের বিরাট বাড়ি আছে। মিঃ ‘জ’ও তােকে পছন্দ করেছে।

আমি আমার সম্পর্কে যথেষ্ট সচেতন। কোন ছেলে আমাকে দেখে অপছন্দ করবে না আমি জানি। সুতরাং খুশিতে টগবগ হবার কিছু ছিল না। ফলে এব্যাপারে কথা বাড়েনি। কলেজ খুলে গেলে আমি যথারীতি চলে এলাম হােস্টেলে। ফেঞ্চুগঞ্জ থেকে নিয়ে এসেছি মজার এবং হাসির খােরাক। এ-বয়সে এ-ধরনের রােমাঞ্চকর ঘটনায় মেয়েদের সত্তায় দারুণ স্পন্দন জাগে। মনের গােপন জায়গাটা নড়ে ওঠে। জীবনকে কত রঙে দেখে। নির্ঝরিণীর স্রোতে নিজেকে ভাসিয়ে দেয়। আমার অনুভূতিতে সেদিন কোন বােধ জাগেনি। যেমন ছিলাম তেমনি আছি। এক বিন্দুও নড়ে উঠিনি। ফলে ঐ ঘটনা ভুলেই গেছি। আগের মতই আমি আমার জগতে প্রবেশ করলাম।

… হঠাৎ একদিন মেজো আপা আমার হােস্টেলে। সঙ্গে মিঃ ‘জ’-এর বাবা ও বােন। ওদের দেখে এবার বিব্রত হলাম না, লজ্জা পেলাম না। বরং যথেষ্ট স্মার্টলি নিজেকে উপস্থাপন করলাম। আমার দ্বিধা-যন্ত্রণার কোন ছাপ ফেলতে দিলাম না মুখে। ভাব এমন, আমি দয়া করেছি। আপা সুপারকে বলে আমাকে সারাদিনের ছুটি নিয়ে বাইরে নিয়ে গেল। ওদের সবার সঙ্গে কোটবাড়ি, ময়নামতি বেড়িয়ে ফিরলাম একটি সাধারণ হােটেলে। আমি অত্যন্ত স্বাভাবিক। কলের পুতুলের মত যা বলছে তাই করছি। অতিথিদের নিয়ে সেজো আপার বাসায়ও উঠতে পারত! যেহেতু সেজো দুলাভাই এ-বিয়েতে রাজি নয়, সেকারণে কুমিল্লা আগমনের খবরও তাকে জানান হয়নি। মামাও সেদিন উপস্থিত থাকতে পারতেন, কিন্তু তিনিও আজ নেই। তাঁর অভিমান (বােধ হয়) একারণে যে, আমাকে মামাই মানসিকভাবে চাপ দিয়ে ‘রাজি’ কথাটা আদায় করেছেন। পরে অবশ্য মামা আমাকে এ-কথাই বলেছেন। সেই ছােট সাধারণ হােটেলে আমরা পাঁচজন। বিয়ের ‘পানচিনি’।

এ-দিনটির জন্য মেয়েরা কত স্বপ্ন দেখে। রঙের মাধুরী মিশিয়ে কত রঙের ছবি আঁকে। অথচ ভাগ্যের কি নির্মম পরিহাস। স্বপ্ন দেখার সময় মিলল না। ছবি আঁকা হল না! বন্ধুদের বলা হল না! কোন আত্মীয়-স্বজনের ভিড় জমল না! নীরবে নিভৃতে একটি হােটেল-কক্ষে আমার কি হয়ে গেল! কেন এ-প্রহসন! জীবনের এমন শুভ লগ্নটি আমার অস্তিত্বে কোন আবির ছড়াল না। আমাকে যা করতে বলা হল তাই করলাম। নির্দিষ্ট সময়ে আমাকে হােস্টেলে নামিয়ে ওরা চলে গেল।

এ-পরিহাসকে কিছুতেই মেনে নিতে পারলাম না। মনে মনে কষ্ট পেলাম কিন্তু কিছু করার সাধ্য যে নেই আমার! হােস্টেলে ফিরে স্যারকে সব বলেছি। আমাদের পারিবারিক বিষয়ে কিছু বলার অধিকার যে ওনার নেই! তাই দুঃখ পাওয়া ছাড়া আর উপায় কি! তবু আমার মনের অবস্থা বুঝে নানাভাবে আমাকে সান্ত্বনা দিলেন। আমি কিছুতেই সান্ত্বনা খুজৈ পাচ্ছিলাম না। গর্বিতা যৌবনের প্রথম বিয়ের আনন্দ। কিন্তু এ ত আমার জন্য আনন্দ নয় – বেদনা। আমার মন যখন সুনীল আকাশের নিঃসীম দিগন্তে ছুটে বেড়াতে চেয়েছিল –  আমার দৃষ্টি যখন রূপালি পর্দায় প্রতিবিম্বিত হতে চেয়েছিল — শৃঙ্খলিত হল আমার মন, আমার দৃষ্টি। আমি পারলাম না বাধাকে অতিক্রম করতে। তবু শৃঙ্খলিত মন দিয়ে সে-মানুষটির ছবি আঁকতে চেয়েছি – আমার দৃষ্টিতে তার ছায়া ফেলতে চেয়েছি। কল্পনার বালুচরে হাত ধরে ছুটে বেড়াতে চেয়েছি তাকে নিয়ে – ব্যর্থ হয়েছি বারবার।

… আমার বিয়ে হয়ে গেল ১৯৬৩-র ১লা আগস্ট। সেদিন আমার মনে কোন আলাে জ্বলেনি। যেমন জ্বলেনি বাড়ির কোন ‘হ্যাজাক বাতি’। গ্রামের বিয়েশাদিতে ‘হ্যাজাক বাতি’র ব্যবস্থা করা হত। কি আশ্চর্য, সেদিন একটি বাতিও কেউ জ্বালাতে পারেনি! হ্যারিকেনের আলােয় সারা বাড়িটা থমথমে বলে মনে হয়েছে। এক সময় বাবার কাছে উঠে গেলাম। কোলে মাথা রেখে কত কাঁদলাম। পরম শান্তি পেলাম। সুখ পেলাম। সেদিনের স্মৃতিতে এটুকুই আমার সুখ। বাবা কেবল ফ্যালফ্যাল করে তাকিয়ে থাকলেন আমার দিকে। শেষরাতে আধাে আধাে চাঁদের আলােয় মেঠোপথের ভাঙা রাস্তা দিয়ে আমি চললাম ঢাকা শহরে। জীবনের একটি অধ্যায়ের সূত্রপাত হলাে।

… ভদ্রলােক শিক্ষিত ভদ্র। তিনি পুরুষ, তবে সম্পূর্ণ পুরুষ নন। তাতেও আমার দুঃখ ছিল না। ভেবেছি, এ জীবন ত আমার নিস্ফল। ভুলে থাকব সবার ভালবাসার উষ্ণতায়। ভুলে থাকব জীবনের একটা দিক — পড়ালেখা। করব–একটা জীবনের কি-ই-বা মূল্য। কেটে যাবে দিনগুলাে, তবু কাউকেই বলব না। মা-বাবা-বােন কষ্ট পাবে। ওরা ত আমার মঙ্গল চেয়েছিল। মঙ্গল আলাে আমার জীবনে জ্বলেনি। এ ত ওদের দোষ নয়। ভাগ্যের নির্মম পরিহাসের শিকার আমি। ভাবলাম, বিধাতা বিন্দুর মত কুৎসিত করে গড়লেন না কেন আমাকে। তবেই আমি বেঁচে যেতাম। আমাকে আসতে হত না এ-অন্ধকার গলিতে। কিন্তু আমি পারলাম না – মানসিক নির্যাতনকে সহ্য করতে পারলাম না। এ-বাড়িতে আমার সবচেয়ে অপরাধ, আমি পাড়াগাঁয়ের গরিবের মেয়ে। যৌতুক ছাড়া বাড়িতে প্রবেশ করেছি। উঠতে বসতে গঞ্জনা। আমার ঋষি বাবাকে ভৎসনা। ও-বাড়িতে একটাও কাজের লােক ছিল না। সারাদিন কাটত কাজের চাপে। বালতি দিয়ে পানি টেনে টেনে ধুতে হত ওদের একতলা-দোতলা। পরিষ্কার ঝকঝকে থাকতে ভালবাসত ওরা। কিন্তু কি আশ্চর্য, মনটা ওদের পরিষ্কার ছিল না! গােয়ালঘরের গরুবাছুর দেখা থেকে শুরু করে বাড়ির সব কাজ করেও কাউকেই খুশি করতে না পারার ব্যর্থতা আমাকে কষ্ট দিত। যৌতুকের ব্যাপারটা প্রতিদিন আমার কানে কাঁটার মত বিধত।

… মিঃ ‘জ’ ও বাড়ির একমাত্র ছেলে। বাড়িতে একজন মেয়েমানুষের প্রয়ােজন। তাই এত কষ্ট করে পাড়াগাঁ থেকে সাধারণ মেয়েকে খুঁজে নিয়ে এল। ভেবেছিল, গ্রামের মেয়েটি এমন বিরাট ফাঁকি মেনে নেবে। যাবতীয় কাজ করে আমার খাবারের স্থান ছিল রান্নাঘরে। কারণ চেয়ার-টেবিলে গ্রামের মেয়েরা খেতে অভ্যস্ত নয়। আমার কোন দুঃখ থাকত না — যদি ও-বাড়িতে আমি নারীর মর্যাদা পেতাম। যদি ভালবাসা স্নেহ পেতাম। ভুলে থাকতে পারতাম অন্য দিকটা। আমার প্রতি মিঃ ‘জ’-র কোন দৈহিক ও মানসিক আকর্ষণ থাকবার কথা নয়। কিন্তু আমার প্রতি মমতা ছিল না বললে মিথ্যা বলা হবে। সুন্দরের প্রতি একটা আকর্ষণ ত থাকবেই। আমার প্রতি অত্যাচারের প্রতিবাদ করতে কোনদিন দেখিনি। আসলে প্রতিবাদ করার সাহস ছিল না তার। এ-ধরনের নির্লিপ্ততায় আমার যন্ত্রণা বেড়েই চলল। আমার স্বপ্ন ভেঙে চুরমার হয়ে গেল। কোথায় এসে পড়লাম! এ কি মেয়েদের স্বপ্নরাজ্য? ও-বাড়িতে আমার দম বন্ধ হয়ে এল। ‘বিন্দু’ গায়ে আগুন ধরিয়ে মরেছে। যন্ত্রণা আর নির্যাতন থেকে বেঁচেছে। আমি বিন্দুর মত গায়ে আগুন ধরিয়ে মরতে পারলাম না। কারণ জীবনকে আমি ভালবাসি। ভালবাসি জগৎ-সংসারকে। দু চোখ ভরে পৃথিবী দেখতে ভালবাসি।

‘মরিতে চাহি না আমি সুন্দর ভূবনে’। আমি মৃণালের মত বাঁচতে চেয়েছি। জীবনের শেষটুকু দেখতে চেয়েছি। দেখতে চেয়েছি নারী নির্যাতনের শেষ কোথায়। কিন্তু কই! এখনও, এই বিংশ শতাব্দীতে নারীরা নির্যাতিতা! নারীরা ঘরের সাজান আসবাবের মত যেমন ইচ্ছা তেমন ব্যবহ‍্রত হয়। বিন্দু মৃণালদের কান্না এখনও ধ্বনিত হয়, আমরা শুনতে পাই না। বাতাসে উড়ে যায়। ও বাড়ির নির্যাতন আমাকে নতুন করে ভাবতে শিখিয়েছে। বােধের তীব্রতায় আমি নড়ে উঠলাম। জীবনকে এভাবে নির্যাতনের যাঁতাকলে নিষ্পেষিত করে শেষ করতে ইচ্ছে হল না। এ ত আত্মহত্যার সমান। আত্মহত্যা পাপ। 

যে-বাড়িতে মানুষের কোন মূল্য নেই, যে-বাড়িতে টাকা দিয়ে মানুষের মূল্য যাচাই হয় —  সে-বাড়িতে আমার বসবাস অসম্ভব। আর তাছাড়া যাকে ঘিরে আমার জীবন আবর্তিত হবার কথা — সে ত থেকেও নেই। আমি অবহেলিত অপমানিত হয়েছি দিনের পর দিন। লােকটির পৌরুষে লাগেনি কোনদিন। যে-পুরুষ স্ত্রীর মর্যাদা দিতে পারে না, যে-পুরুষ মেয়েদের ফাঁকি দেয় সে স্বামী হবার অযােগ্য। অযােগ্য স্বামীদের কাছে থাকলে নারীত্বের অবমাননা হয়। 

… এবার মনে মনে জ্বলে উঠলাম। এভাবে বাঁচা যায় না। এভাবে বেঁচে থাকা মৃত্যুর সমান। আমার জীবন আমার কাছে মূল্যবান। মনে মনে ঠিক করলাম এ-বাড়িতে আমি আর থাকব না। কেউ যদি আমাকে নিতে না আসে আমি পালিয়ে যাব। তাই যাওয়া উচিত। এখনও যদি কোন পত্রিকায় দেখি, কোন মেয়ে স্বামীর অত্যাচারে কিংবা যৌতুকের অত্যাচারে আত্মহত্যা করেছে – তাদের প্রতি আমার রাগ হয়। কেন চলে আসে না ওরা? জানি, সমাজ বা পরিবারের বোঝা ওরা হতে চায় না – কিন্তু পৃথিবীটা ত অনেক বড়। একটা মানুষের জায়গা কোথাও-না-কোথাও হবে। এ-সমাজে ভালমানুষ বাস করে।

প্রত্যয় জাগল মনে। শ্বাসরুদ্ধকর অবস্থা থেকে মুক্তি পেতে হবে। বড় দুলাভাইকে ফোন করলাম। বড় দুলাভাই ঢাকাতেই থাকেন। আমাকে দেখতে আসেন না। ও-বাড়ির নিচের অন্ধকার ঘর পেরিয়ে ভেতরে আসার অধিকার ওনার নেই। এলে আমার সঙ্গে ত দেখা হবে না। মাঝে মাঝে ফোন করেন — কিন্তু আমাকে ডেকে দেয়া হয় না। এখন আর ফোনও করেন না। ফোন করার কোন অধিকার নেই আমার। কিন্তু তবু ফাঁক পেলে লুকিয়ে লুকিয়ে চুরি করে ফোন করতাম। কিছু বলতে পারতাম না ফোনে। শুধু কাঁদতাম। এ-কান্নাটুকুই হত আমার সান্ত্বনা। একদিন সেরকমই চুপি চুপি দুলাভাইকে ফোন করলাম। বললাম – মাকে একটা চিঠি লিখে দিন যেন বাবার অবস্থা খারাপ বলে। আমাকে নিতে কাউকে পাঠায়। দুলাভাই, এখানে যে আমি আর থাকতে পারছি না। আর কিছু দিন থাকলে আমি মারা যাব। কিছু একটা উপায় আমার জন্য করবেন?’ বুঝতে পারছি, দুলাভাই ওপাশ থেকে কষ্টই পাচ্ছেন। কিছু বলে সান্তনা দিতে পারলেন না। বড় দুলাভাই আমাদের সন্তানের মত স্নেহ করতেন। বড় আপার যখন বিয়ে হয়, তখন আমি বছরখানেকের। ওনার কোলেপিঠে আমি বড় হয়েছি। ওনাকে আমরা পিতৃতুল্য ভালবাসি।

মনে মনে ভাবলাম একবার যেতে পারলে আমি আর ফিরব না। তিল তিল করে এভাবে নিজেকে শেষ করতে চাই না। বন্দী জীবনের কষ্ট, শ্বশুরবাড়িতে মেয়েদের নির্যাতন, স্বামীর অবহেলা (যে স্বামী শুধু নামেমাত্র স্বামী) –  একমাত্র নির্যাতিতা নারীই জানে!! 

বড় দুলাভাইর চিঠি পেয়ে মা যথারীতি আমার এক মামাকে পাঠালেন। মামা নিচের অন্ধকার বৈঠকখানা পেরিয়ে ভেতরে আসার অধিকার পেলেন না। আমি আগেই মােটামুটি তৈরি ছিলাম। বাবা-মায়ের দেয়া ২/১টা কাপড় ছােট একটা স্যুটকেসে গুছিয়ে নিলাম। ওদের বাড়ির কোনকিছু সাথে নিলাম না। যৌতুক ছাড়া ও-বাড়িতে প্রবেশের অপরাধে ওদের দেয়া সমস্ত অলঙ্কার ওদের কাছেই বাক্সবন্দী ছিল। ওগুলাের উপর আমার কোন অধিকার ছিল না। কোনদিন ওদের কাছে চেয়ে নেবারও ইচ্ছে হয়নি। ওসবের উপর আমার কোন আকর্ষণও হয়নি কোনদিন। রওনা হবার মুহূর্তে ওরা আমার স্যুটকেসটা তল্লাশি করল। তখন মামা বুঝলেন, এতদিন আমি কোথায় বাস করেছি। ওদের কাছে আমার ছুটি মিলল মাত্র দশ দিনের। মনে মনে ওদের মুখের উপর থুথু মেরে চলে এলাম।

বাড়ি ফিরে মা-বাবাকে সব খুলে বললাম। বললাম আমার সিদ্ধান্তের কথা। ও-বাড়ি আমি আর ফিরে যাব না। 

… (ফেব্রুয়ারি, ১৯৬৯) ১১ তারিখ। ঘুম থেকে উঠেই চলে গেলাম মােফাজ্জল হায়দার স্যারের বাসায়। আমাকে দেখেই ভাবী বলে উঠলেন —“কি ব্যাপার, তােমাকে খুব খুশি খুশি দেখাচ্ছে যে!”

– একটা খবর দিতে এলাম। মেজো আপা ফোন করবে। ভাবছি তার আগে আমিই বলব।

– কি কথা?

বললাম সব। ভাবী গম্ভীর হয়ে গেলেন। ভাবী স্যারকে ডেকে বললেন সব। স্যার আমাকে ডেকে নিলেন ওনার ঘরে। ভয়ে ভয়ে ঢুকলাম।

– যা শুনলাম তােমার ভাবীর কাছে, তা কি সত্য?

– জ্বি।

– তুমি কি ভেবেচিন্তে এ বিয়েতে রাজি হয়েছ? নাকি কেউ আবারও তােমাকে চাপ দিয়ে রাজি করিয়েছে?

– না স্যার, আমি ভেবেচিন্তেই রাজি হয়েছি। কেউ জোর খাটায়নি। বরং সবার ইচ্ছার বিরুদ্ধে।

– তুমি কি শহীদুল্লাহকে আগে থেকে চিনতে? কতদিন ধরে ওর সঙ্গে পরিচয়?

– ওকে আগে দেখিনি। মাত্র ২ দিন আগে দেখেছি — আলাপও তখন থেকে।

– ওর জীবন সম্পর্কে তােমার কি কোন ধারণা আছে? তুমি বুঝতে পারছ কত বড় ঝুঁকি তুমি নিতে যাচ্ছ। তুমি অত্যন্ত সাধারণ মেয়ে। ওর সাথে তাল মিলিয়ে চলতে পারবে বলে মনে হয় না। 

– স্যার, আপনি আমাকে আশীর্বাদ করুন। আমি পারব ওকে সুখী করতে। আমিও সুখী হব।

– ওর বয়স কত জান? 

– জানি।

স্যারকে অসম্ভব উদ্বিগ্ন ও চিন্তিত মনে হল। আমার সঙ্গে এ-নিয়ে আর কোন কথা বাড়ালেন না। শুধু ভাবী বললেন — এখনও সময় আছে — তুমি আরেকবার চিন্তা কর।

– ভাবী, আমি যা ভেবেছি, আমার মনে হয় ভুল ভাবিনি। আপনারা আমাকে দোয়া করবেন।

স্যার ও ভাবীকে সালাম করে বেরিয়ে আসলাম।

শত বাধাকে অতিক্রম করে এ-বিয়ে হল ১৭ই ফেব্রুয়ারি। ওর হাত ধরে আমি গিয়ে উঠলাম ২১ বি. কে. গাঙ্গুলী লেনে।

… শুধু অফিসের সময় ছাড়া কোথাও আমাকে সঙ্গে না নিয়ে বের হতাে না। এমনকি ঢাকার বাইরেও বিভিন্ন সভা-সমিতিতে যাবার সময় আমাকে সঙ্গে নিয়ে যেত। ‘৭০-এ ময়মনসিংহ টাউন হলে ছাত্র ইউনিয়নের সম্মেলনে শহীদুল্লাহ্ প্রধান অতিথি হয়ে গিয়েছিল। যাবার সময় আমাকে নিয়ে যাবে। আমি তখন অসুস্থ। অন্তঃসত্ত্বা। আমার ছেলে অমিতাভ কায়সার পেটে। কিছুতেই যাব না। লজ্জাও লাগছিল ভীষণ। শহীদুল্লাহ আমাকে ছাড়া কিছুতেই যাবে না। বলল —“আরে, বাইরে বের না হলে মানুষকে দেখার সুযােগ থেকে বঞ্চিত হবে। ভাল ভাল কথা শুনবে, সংগ্রামী জনতার সঙ্গে মিশবে — দেখবে, অনেক সত্য তােমার অজানা ছিল। আর তাছাড়া আমার ছেলে জন্মের আগেই ভাল ভাল কথা শােনার সুযােগ পাবে। চল, অমত করাে না। অগত্যা যেতে হলাে।

… ‘৬৯-এর শেষের দিকে ‘সংশপ্তক’ উপন্যাসের নাটক শুরু হয় টিভি-তে। উপন্যাসের নাট্যরূপ শহীদুল্লাহ নিজেই দিয়েছে। সহযােগিতায় ছিলেন মামুন অর-রশিদ। নাটকটি প্রযোজনা করেছিলেন আবদুল্লাহ আল-মামুন। সাহিত্য ও সংস্কৃতির জগতে শহীদুল্লাহ কায়সার অপরাজেয়। একজন সার্থক ও প্রথম সারির ঔপন্যাসিক যখন উপন্যাসের নাট্যরূপ দিতে কলম হাতে নিল — দেখেছি কি নিষ্ঠা ও সততা ছিল তার মধ্যে! নিজেকে আরাে ভাল করে জানবার জন্য মাঝে মাঝে দেখেছি মুনির চৌধুরীর (শ্রদ্ধেয় মুনির স্যার) সঙ্গে টেলিফোনে পরামর্শ করছে। নাটকের প্রতিটি পর্বের ভি. টি. আর. হবার সময় শহীদুল্লাহ্ রামপুরা টিভি (সে-সময় নির্মিতব্য) স্টেশনে উপস্থিত থাকত। মাঝে মাঝে আমাকে নিয়ে যেত। তখন শমী পেটে। এত দর্শকের সামনে যেতে আমার লজ্জা লাগত। কিন্তু ওর অনুরােধে আমাকে যেতেই হতাে। মামুন ভাই এখনও দেখা হলে বলেন ‘ভাবী, মনে আছে সে-দিনগুলাের কথা? শমীকে পেটে নিয়ে আপনি টিভি স্টেশনে আসতেন’।

… দায়িত্বের প্রসঙ্গটা আসতেই আজ আমার মনে পড়ছে যেদিন শমী হবে সেদিনের কথা। ‘৭০-এর ১৪ই জানুয়ারি। সন্ধ্যাবেলা ও বাইরে যাচ্ছে দেখে আমি ওকে না বলে পারলাম না — তাড়াতাড়ি চলে আসবে, আমার শরীরটা ভাল লাগছে না। যে-কোন সময় হয়ত হাসপাতালে যেতে হতে পারে। দরকার হলে তােমাকে ফোনে যােগাযােগ করব। আসলে যাচ্ছ কোথায়?

 ‘একটা জরুরী মিটিং আছে। চলে আসব তাড়াতাড়ি, তুমি চিন্তা করাে না।’

রাত প্রায় বারটার দিকে আমার শরীর বেশ খারাপ হয়ে পড়ল। বিভিন্ন জায়গায় ফোন করলাম। কোথাও পাওয়া গেল না। সবাই জানে আমার শরীর খারাপ। তাই সবাই আমার কাছে জানতে চাইল আমার শরীর খারাপ কিনা বা আসতে হবে কিনা। লজ্জায় কিছুই বললাম না। নিচে শাশুড়ি-মাকেও খবর দিচ্ছি না, তাও লজ্জার কারণে। পাশের ঘরে সুচন্দা আর মেজদা। তাদের ডাকতেও খারাপ লাগছিল। অভিমানে আমার কান্না পেয়ে গেল। লােকটাকে বললাম আমার শরীর খারাপ, অথচ ভুলে বসে আছে। এভাবে রাত দুটো বেজে গেল। শেষ পর্যন্ত মাকে খবর দিলাম। উনি দৌড়ে এলেন। নিজে নিজে ছেলেকে বকুনি দিয়ে যাচ্ছেন। হাসপাতালে যেতে হবে, আর দেরি করা ঠিক নয়। মা মেজদাকে ঘুম থেকে ডেকে তুললেন। মেজদা আমাকে নিয়ে বের হবে আর তখনি শহীদুল্লাহর গাড়ির শব্দ শােনা গেল। অপরাধীর মত উঠে এসে আমার সামনে এসে দাঁড়াল – ‘আসলে মিটিং-এ বসলে সব ভুলে যাই।’ রাত তিনটায় মেডিক্যাল হাসপাতালে আমাকে নিয়ে এল।

আমার ছেলে অমি হবার দিনও একই ঘটনা। ‘৭১-এর ১০ই মার্চ। ‘৭১-এর পয়লা মার্চ থেকেই ত ঢাকায় রাজনৈতিক উত্তেজনা। ১লা মার্চ দুপুর একটার দিকে বেতারে এক ভাষণে প্রেসিডেন্ট ইয়াহিয়া খান ঢাকায় আহূত ১৩ই মার্চের জাতীয় পরিষদ সভা অনির্দিষ্টকালের জন্য বন্ধ ঘােষণা করল। বেতার ভাষণ অবশ্য আমি শুনিনি। বেতার ভাষণের পরেই শহীদুল্লাহ্ অফিস থেকে ফোন করে আমাকে জিজ্ঞেস করল আমি বেতার ভাষণ শুনেছি কিনা। উত্তরে আমি বললাম – ‘না, শুনিনি ত! কেন, কি হয়েছে?’ ওপাশ থেকে ধাম করে ও ফোনটা রেখে দিল। আমি রীতিমত ঘাবড়ে গেলাম। আমি এপাশ থেকে ফোনে চেষ্টা করলাম, কিছুতেই লাইন পাচ্ছিলাম না। ইতিমধ্যে বেতার ভাষণের বিষয়বস্তু আমি জেনে ফেললাম। আমি রাজনীতি বুঝি না — নিজে এ-ব্যাপারে তেমন সচেতনও নই, সুতরাং এর সুদূরপ্রসারী ফল নিয়ে তেমন গুরুত্ব দিয়ে চিন্তা করিনি। তাছাড়া আমার শরীরও খারাপ ছিল।

অমি হবার মাত্র দশদিন আগের ঘটনা॥”

– মুক্তিযুদ্ধ : আগে ও পরে / পান্না কায়সার ॥ [ আগামী প্রকাশনী – ফেব্রুয়ারি, ১৯৯১ । পৃ: ৩৫-৫৪ / ৮১-৮৫ / ১০২-১১৭ ] 

#০২

“… আমার বাবা শহীদুল্লা কায়সার। এ দেশের একজন প্রখ্যাত সাহিত্যিক, সাংবাদিক ও রাজনীতিবিদ। স্কুলে ছাত্রজীবন থেকেই তিনি বামপন্থী রাজনীতির সঙ্গে জড়িয়ে পড়েন। তারপর আমৃত্যু সে আদর্শকে সামনে রেখেই তিনি সারাজীবন কাজ করেছেন মানুষের মুক্তির লক্ষ্যে। জেল জুলুম অত্যাচার নিপীড়ন সয়েছেন হাসি মুখে। কিন্তু তাঁর বিশ্বাস ও আর্দশ থেকে সরে দাঁড়াননি। এক সময় হাতে তুলে নিলেন কলম। তাঁর লেখায় ফুটে উঠলাে সমাজ দেশ ও কালের প্রতিচ্ছবি। শুরু করলেন সাংবাদিকতা। তাঁর শাণিত কলমের আঁচড়ে সংবাদের সম্পাদকীয় ও উপসম্পাদকীয় মানুষের চেতনাকে করল আঘাত। স্বাধিকার, গণতন্ত্র, বাঙালির অধিকারের প্রশ্নে তাঁর সাহসী উচ্চারণ সংগ্রামী মানুষকে করেছে উজ্জীবিত। এ সংগ্রামী মানুষটি স্বাধীনতা যুদ্ধে রক্তক্ষয়ী সংগ্রামে হারিয়ে গেলেন। বাবার কথা আমার মনে নেই। কোন স্মৃতিও নেই। কিন্তু আছে তাঁর সাহিত্য, রাজনৈতিক আদর্শ, আর এ স্বাধীন বাংলাদেশ॥”

শহীদুল্লা কায়সারের নির্বাচিত কলাম : ঊনসত্তর থেকে একাত্তর / সম্পা: শমী কায়সার ॥ [ মাওলা ব্রাদার্স – এপ্রিল, ১৯৯৪ । পৃ: ভূমিকা ] 

#০৩

“… আমার গর্ব – স্বাধীনতা সংগ্রামে ঘৃণিত আলবদর- রাজাকারের হাতে হারিয়ে যাওয়া শহীদুল্লাহ কায়সার। আমি যার বংশধর। যার রক্ত প্রবাহিত হচ্ছে আমার শরীরে, আমার সমস্ত শিরা-উপশিরায়। আমি তারই কন্যা।”

– আমার বাবা : শহীদ বুদ্ধিজীবীর সন্তানদের স্মৃতিকথা / সম্পা: আমীরুল ইসলাম ॥ [ সময় প্রকাশন – ডিসেম্বর, ১৯৯১ । পৃ: ২৮ ]

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *