রবীন্দ্রনাথ আমাদের কবি নন

রবীন্দ্রনাথ আমাদের কবি নন

:: সাহাদত হোসেন খান ::


রবীন্দ্রনাথ কখনো আমাদের কবি নন। তিনি বাঙ্গালি মুসলমানদের প্রতিটি স্বার্থের বিরুদ্ধে অবস্থান নিয়েছেন। বঙ্গভঙ্গ ছিল পূর্ববঙ্গের অবহেলিত বাঙ্গালি মুসলমানদের অনুকূলে। কিন্তু রবীন্দ্রনাথ বঙ্গভঙ্গের বিরোধিতা করেছেন। বঙ্গভঙ্গের বিরোধিতা করতে গিয়ে তিনি হিন্দুত্ববাদী ‘স্বদেশি’ আন্দোলনের পক্ষে ‘আমার সোনার বাংলা’ গান রচনা করেন। শুধু তাই নয়, তিনি ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় প্রতিষ্ঠারও বিরোধিতা করেছেন। তারপরও তাকে আমাদের ‘কবিগুরু’ বলতে হয় এবং আমাদের ভৌগোলিক সত্তার বিরুদ্ধে হলেও তার রচিত ‘সোনার বাংলা’কে আমাদের জাতীয় সঙ্গীত হিসেবে সম্মান করতে হয়।     রবি ঠাকুরের লেখা গান জাতীয় সঙ্গীত হিসেবে আমাদের ওপর চাপিয়ে দেয়া হয়েছে। এ জাতীয় সঙ্গীতে আমাদের মানচিত্রের কথা বলা হয়নি। অখ- বঙ্গদেশের প্রশস্তি গেয়ে এ গান রচনা করা হয়েছিল। আমরা অখ- বঙ্গদেশের বাসিন্দা নই। আজকের বাংলাদেশ হলো বঙ্গদেশের একটি অংশ মাত্র। গণতন্ত্রের প্রতি সুবিচার করা হলে পুরো বঙ্গদেশ পাকিস্তানের অংশে পরিণত হতো। ১৯৪৭ সালে অখ- বঙ্গদেশ পাকিস্তানে যোগদান করলে ১৯৭১ সালে স্বাধীন বাংলাদেশের সীমানা হতো প্রায় দ্বিগুণ। জাতীয় সঙ্গীত নিয়ে ফিলিস্তিনিরাও আমাদের মতো সংকটে। ইতিহাস সম্পর্কে জ্ঞান না থাকায় অনেক মুসলমান ইসরাইলের জাতীয় সঙ্গীত গায়। তার প্রেক্ষিতে ২০২০ সালের ২২ সেপ্টেম্বর মুসলমানদের প্রথম কেবলা মসজিদুল আল-আকসার খতিব শেখ আকরামা সাবরি বলেন, দখলদার ইসরাইলের জাতীয় সঙ্গীত গাওয়া মুসলমানদের জন্য হারাম। কেননা এ সঙ্গীতে বলা হয়েছে, ফিলিস্তিন ভূখ-, বায়তুল মোকাদ্দাস শহর ও মসজিদুল আল-আকসা হচ্ছে ইহদিবাদীদের। তিনি বলেন, সংযুক্ত আরব আমিরাতে যারা ইসরাইলের জাতীয় সঙ্গীত গেয়েছে তারা হয়তো অজ্ঞতা থেকে নয়তো ইহুদিবাদে প্রভাবিত হয়ে গেয়েছে। কিন্তু মুসলমানরা এ সঙ্গীত গাইতে পারবে না। এ সঙ্গীত তাদের জন্য হারাম। সংযুক্ত আরব আমিরাতের একজন নাগরিক ইসরাইলের জাতীয় সঙ্গীত গেয়ে সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে প্রকাশ করে।     এ ভিডিও দেখে ইসরাইলের প্রধানমন্ত্রী বেনিয়ামিন নেতানিয়াহুর মুখপাত্র ভূয়সী প্রশংসা করেন। তারপর শেখ আকরামা সাবরি তার এ প্রতিক্রিয়া ব্যক্ত করেন। কিন্তু আমাদের দেশে ২০২০ সাল পর্যন্ত বিগত ৪৭ বছরে এমন বড় মাপের কোনো ধর্মীয় অথবা রাজনৈতিক নেতা জোর গলায় বলেননি যে, আমরা বাংলাদেশের মানুষ ভারতীয় কবি রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের লেখা গানকে জাতীয় সঙ্গীত হিসেবে গাইতে পারি না। আমাদের স্বাধীন ভূখ-ের অনুকূলে হলে বিদেশির লেখা গানকে জাতীয় সঙ্গীতের মর্যাদা দিতে আমাদের আপত্তি থাকতো না। ইতিহাস সচেতন যেকোনো লোক জানেন যে, ১৯০৫ সালে আমাদের বর্তমান বাংলাদেশের সীমানা নিয়ে গঠিত পূর্ববঙ্গের রাজনৈতিক সত্তা বিলোপে রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর এ গান রচনা করেছিলেন।

বিএসএফের কারসাজি আমাদের কোনো দোষ নেই। ১৯৭১ সালে আমাদের দুঃসময়ে ভারত আমাদের দুর্বলতার সুযোগে রবীন্দ্রনাথের এ গান আমাদের জাতীয় সঙ্গীত হিসেবে চাপিয়ে দেয়। এ কাজটি করেছিল ভারতীয় সীমান্ত রক্ষীবাহিনী (বিএসএফ)। ১৯৭১ সালে বিএসএফ’র ডিজি হিসেবে দায়িত্ব পালনকারী কর্মকর্তা কেএফ রুস্তমজী তার ডায়েরিতে একথা লিখে রেখে গেছেন। রুস্তমজীর ডায়েরি ও নোট অবলম্বনে একটি বই প্রকাশিত হয়েছে। পিভি. রাজগোপাল সম্পাদিত ২০০৯ সালের ডিসেম্বরে প্রকাশিত বইটির নাম ‘দ্য ব্রিটিশ, দ্য ব্যান্ডিটস এন্ড দ্য বোর্ডারম্যান।’ বইটিতে কেএফ রুস্তমজী লিখেছেন, The BSF played a key role in the formation of the Bangladesh Provisional Government, in framing its constitution and in selecting a National Flag and National Anthem.‘বিএসএফ বাংলাদেশের অস্থায়ী সরকার গঠন, দেশটির সংবিধান প্রণয়ন এবং একটি জাতীয় পতাকা ও জাতীয় সঙ্গীত বাছাইয়ে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে।’


বঙ্গভঙ্গের বিরুদ্ধে হিন্দুদের প্রবল আন্দোলনবাংলার ইতিহাসে এটা একটি দুঃখজনক অধ্যায় যে, বাঙ্গালি হিন্দুরা ১৯০৫ সালে বঙ্গমাতা বিভক্তির বিরুদ্ধে লড়াই করলেও ১৯৪৭ সালে তারাই বঙ্গদেশকে বিভক্ত করে। বাঙ্গালি হিন্দুরা স্বেচ্ছায় জাতি হিসেবে তাদের রাজনৈতিক পরিচিতি বিসর্জন দেয় এবং ভারতীয় জাতীয়তার সঙ্গে একাত্ম হয়ে যায়। বঙ্গভঙ্গ হওয়ায় বাংলার মুসলিম সম্প্রদায়ের মধ্যে পৃথক একটি জাতিসত্তা গড়ে ওঠে। সেদিনের জন্ম নেয়া এ পৃথক সত্তাই কালক্রমে একটি আলাদা জাতীয় সত্তায় পরিণত হয়।   এ সত্তা ১৯৭১ সালে স্বাধীন বাংলাদেশ প্রতিষ্ঠার মধ্য দিয়ে পূর্ণতা লাভ করে। বঙ্গভঙ্গ বেশি দিন স্থায়ী না হলেও তার প্রভাব ছিল সুদূরপ্রসারী। ১৯০৫ সালে গঠিত নয়া প্রদেশ পূর্ববঙ্গের সীমান্ত সামান্য কাঁটছাট হয়ে ১৯৭১ সালে বাংলাদেশের মানচিত্রে রূপান্তরিত হয়। এ ব্যাপারে সালাহউদ্দিন আহমদের লেখা ‘বাংলাদেশ: পাস্ট এন্ড প্রেজেন্ট’ বইয়ের একটি মন্তব্য উলে¬খযোগ্য। বইটির ৮ নম্বর পৃষ্ঠায় বলা হয়,‘ The political aspect of the Bengali Nationalism was nurtured in nascent form for a long time. It took shape of a bud in 1905 and was about to blossom in 1947 when the Bengali Muslims joined Pakistan in the hope of enjo–ing full autonomy by virtue of East-Bengal becoming one of its Sovereign units. But the full development of the political aspect of the Bengali Muslim Nationalism had to wait until 1971 when it really bloomed in full in the shape of an independent state of Bangladesh.অর্থাৎ ‘বাঙ্গালি মুসলিম জাতীয়তাবাদের রাজনৈতিক সত্তা দীর্ঘদিনে ধীরে ধীরে বিকাশ লাভ করে। ১৯০৫ সালে তা একটি মুকুলের আকার ধারণ করে এবং ১৯৪৭ সালে পূর্ণ স্বায়ত্তশাসন লাভের আশায় পূর্ববঙ্গ পাকিস্তানের একটি সার্বভৌম অংশে পরিণত হলে বাঙ্গালি মুসলিম জাতীয়তাবাদ প্রস্ফূটিত হওয়ার দ্বারপ্রান্তে পৌঁছে যায়। তবে বাঙ্গালি মুসলিম জাতীয়তাবাদকে পরিপূর্ণ বিকাশের জন্য ১৯৭১ সাল পর্যন্ত অপেক্ষা করতে হয়েছে। সে সময় বাঙ্গালি মুসলিম জাতীয়তাবাদ স্বাধীন বাংলাদেশ রাষ্ট্রের একটি পূর্ণাঙ্গ আকার নিয়ে সত্যিকারভাবে প্রস্ফূটিত হয়।’বঙ্গভঙ্গের মধ্যে স্বাধীন বাংলাদেশের বীজ নিহিত। ১৯০৩ সালের শেষদিকে বঙ্গভঙ্গের মূল পরিকল্পনা প্রকাশ করা হলে নজিরবিহীন বিরোধিতা শুরু হয়। বিশেষ করে প্রভাবশালী শিক্ষিত মধ্যবিত্ত শ্রেণির হিন্দুদের পক্ষ থেকে এ বিরোধিতা আসে। হিন্দু বিশেষ করে বর্ণ হিন্দুরা কেন বঙ্গভঙ্গের বিরোধিতা করেছিল সে ব্যাপারে ভারতের সংবিধান রচয়িতা ড. আম্বেদকর তার ‘পাকিস্তান অর দ্য পার্টিশন অব ইন্ডিয়া’ নামে আলোচিত পুস্তকে মন্তব্য করেছেন যে, The opposition of Bengali Hindus to the Partition of Bengal is an illustration of trait of high cast Hindus. The Hindus had the whole of Bengal, Bihar, Orissa, Assam and even U.P. for their pasture. They had captured the civil service in all these Provinces. The partition of Bengal meant a diminution in the area of this pasture. It means that the Bengali Hindus was to be ousted from Eastern Bengal to make room for the Bengali Musalman who had so far no place in the civil service of Bengal. The opposition to the partition of Bengal on the part of the Bengali Hindus was due principally to their desire not to allow the Bengali Musalman to take their place in Eastern Bengal.অর্থাৎ ‘বঙ্গভঙ্গের প্রতি বাঙ্গালি হিন্দুদের বিরোধিতা হচ্ছে বর্ণ হিন্দুদের চারিত্রিক বৈশিষ্ট্যের একটি উদাহরণ। বাঙ্গালি হিন্দুরা গোটা বঙ্গদেশ, বিহার, উড়িষ্যা, আসাম এমনকি উত্তর প্রদেশকে তাদের বিচরণ ক্ষেত্রে পরিণত করেছিল। এসব প্রদেশে তারা সকল সিভিল সার্ভিস কব্জা করে। বঙ্গভঙ্গের মানে হচ্ছে বিচরণের এ সুবিধা থেকে বঞ্চিত হওয়া। তার মানে বাঙ্গালি মুসলমানদের স্বার্থে পূর্ববঙ্গ থেকে তাদের বিতাড়িত হওয়া। কেননা তার আগে বঙ্গদেশের সিভিল সার্ভিসে বাঙ্গালি মুসলমানদের কোনো স্থান ছিল না। পূর্ববঙ্গে মুসলমানরা যাতে নিজেদের জায়গা করে নেয়ার সুযোগ না পায় সে মানসিকতা ছিল বঙ্গভঙ্গের প্রতি বাঙ্গালি হিন্দুদের বিরোধিতা করার মূল কারণ।’ড. আম্বেদকর তার পুস্তকে বোম্বাই প্রেসিডেন্সি বা বোম্বাই প্রদেশ থেকে সিন্ধুকে পৃথক করার উদ্যোগে হিন্দুদের একই ধরনের দ্বিমুখী বৈশিষ্ট্যের কথা উল্লেখ করেছেন। তিনি বলেছেন, হিন্দুরা ১৯১৫ সালে বোম্বাই প্রেসিডেন্সি থেকে সিন্ধুকে পৃথক করার জোর দাবি জানায়। সিন্ধুতে তখন কোনো প্রতিনিধিত্বকারী সরকার ছিল না। কোনো সরকার ক্ষমতায় থাকলে সে সরকার হতো অবশ্যই মুসলিম। তাই মুসলিম সরকার না থাকায় তারা বোম্বাই প্রেসিডেন্সি থেকে সিন্ধুকে পৃথক করার দাবি জানায়। তাদের এ ধরনের দাবি জানানোর পেছনে এই উদ্দেশ্য কাজ করছিল যে, সিন্ধুকে আলাদা প্রদেশ করা হলে তারা সেখানকার সকল সরকারি চাকরি দখল করবে। কিন্তু ১৯২৯ সালে তাদের অবস্থান ছিল বিপরীত। সে বছর তারা সাইমন কমিশনের সামনে বোম্বাই প্রেসিডেন্সি থেকে সিন্ধুকে পৃথক করার বিরুদ্ধে জোরালো প্রতিবাদ জানায়। ১৯২৯ সালের পরিস্থিতি ১৯১৫ সালের মতো ছিল না। হিন্দুরা বুঝতে পেরেছিল যে, ১৯২৯ সালে বোম্বাই থেকে সিন্ধুকে পৃথক করা হলে সেখানে মুসলিম সরকার প্রতিষ্ঠিত হবে এবং সেখানে তাদের কোনো জায়গা হবে না।   ১৯২৯ সালে যে যুক্তিতে বোম্বাই প্রদেশ থেকে সিন্ধুকে পৃথক করার বিরুদ্ধে হিন্দুরা রুখে দাঁড়িয়েছিল, ঠিক একই যুক্তিতে ১৯০৫ সালে বঙ্গদেশ বিভক্তির বিরুদ্ধে তারা রুখে দাঁড়ায়। বঙ্গদেশের প্রস্তাবিত ভৌগোলিক পুনর্বিন্যাস কায়েমী স্বার্থবাদী এ গ্রুপকে নাড়া দিলে তারা প্রবল আন্দোলন গড়ে তোলে। কলকাতার আইনজীবীগণ আশংকা করতে থাকেন যে, নয়া প্রদেশ গঠন করা হলে ঢাকায় আপিল আদালত প্রতিষ্ঠিত হবে এবং তাতে তাদের নিজস্ব আদালতের গুরুত্ব খর্ব হবে। সাংবাদিকরা ভয় পেতে থাকেন যে, বঙ্গদেশ বিভক্ত হলে ঢাকায় নতুন নতুন পত্রিকার আবির্ভাব ঘটবে। তাতে কলকাতাভিত্তিক সংবাদপত্রের প্রচার ও প্রসার বিঘিœত হবে। কলকাতার ব্যবসায়ী সমাজও আতংকিত হয়ে উঠেন। তারা ভাবতে থাকেন যে, বঙ্গভঙ্গ হলে ব্যবসা-বাণিজ্যের কেন্দ্রস্থল কলকাতা থেকে চট্টগ্রামে স্থানান্তরিত হবে। কেননা চট্টগ্রাম হবে কলকাতার চেয়ে নিকটবর্তী। সেখানকার পণ্য হবে তুলনামূলকভাবে সস্তা। জমিদাররা দেখতে পেলেন যে, পূর্ববঙ্গ আলাদা প্রদেশের মর্যাদা পেলে তাদেরকে ঢাকায় পৃথক তহসিল অফিস খুলতে হবে। তাতে তাদের ব্যয় বৃদ্ধি পাবে।     শিক্ষিত বাঙ্গালি হিন্দুরা মনে করলেন, ভাইসরয় লর্ড কার্জন বঙ্গভঙ্গ করে বাঙ্গালি জাতীয়তাবাদী চেতনা এবং বাংলাভাষী জনগণের ক্রমবর্ধমান সংহতির মূলে আঘাত হানছেন। বাঙ্গালি হিন্দুরা অধিকাংশ ব্যবসা-বাণিজ্য নিয়ন্ত্রণ করতেন। সরকারি চাকরিতে তাদের সংখ্যা ছিল বেশি। সমাজে নেতৃত্ব দিতেন তারাই। এসব সুবিধাভোগী হিন্দুরা মনে করলেন যে, বঙ্গদেশ বিভক্ত হলে বাঙ্গালি জাতি বিভক্ত হয়ে যাবে। বিহার ও উড়িষ্যাসহ বঙ্গদেশে তারা হবে সংখ্যালঘু। এ ধরনের আশংকা থেকে তারা অভিযোগ করেন যে, বঙ্গভঙ্গ হলো বাঙ্গালি জাতীয়তাবাদী চেতনা কোণঠাসা করে রাখার একটি প্রয়াস। তারা অত্যন্ত জোর দিয়ে বিশ্বাস করতেন, শিক্ষিত হিন্দু সম্প্রদায়ের ক্রমবর্ধমান শক্তি নস্যাতে পূর্ববঙ্গে একটি মুসলিম শক্তিকে বিকশিত হতে উৎসাহ দান করাই হলো ব্রিটিশ সরকারের বঙ্গভঙ্গের মূল লক্ষ্য।অর্থনৈতিক, রাজনৈতিক ও সাম্প্রদায়িক শক্তিগুলো সম্মিলিতভাবে বঙ্গভঙ্গের বিরুদ্ধে আন্দোলনকে তীব্রতর করে তোলে। ভারতীয় বিশেষ করে বাঙ্গালি পত্রপত্রিকাগুলো শুরু থেকেই বঙ্গভঙ্গের বিরুদ্ধে সোচ্চার ছিল। এমনকি ব্রিটিশ ও অ্যাংলো ইন্ডিয়ান পত্রপত্রিকা এবং কোনো কোনো সরকারি কর্মকর্তাও এ উদ্যোগের বিরোধিতা করতে থাকেন। বঙ্গভঙ্গের বিরুদ্ধে পশ্চিমবঙ্গ বিশেষ করে কলকাতা অগ্নিগর্ভ হয়ে ওঠে। এ আন্দোলন ভারতীয় জাতীয়তাবাদী আন্দোলনে গতি সঞ্চার করে। ভারতীয় জাতীয় কংগ্রেস ভারতীয় জাতীয়তাবাদী আন্দোলনের মূল প্লাটফর্মে পরিণত হয়। বঙ্গভঙ্গের বিরুদ্ধে ক্ষোভ ভারতীয় জাতীয় কংগ্রেসকে মধ্যবিত্ত শ্রেণির প্রেশার গ্রুপ থেকে সর্বভারতীয় একটি রাজনৈতিক দল হিসেবে আত্মপ্রকাশে সহায়তা করে। কংগ্রেস বঙ্গভঙ্গকে ‘ডিভাইড এন্ড রুল’ এবং বুদ্ধিজীবী সমাজের প্রতি সরকারের বিদ্বেষের একটি প্রমাণ হিসেবে গণ্য করে। বাঙ্গালি হিন্দুরা বিশ্বাস করতে থাকে যে, বঙ্গভঙ্গ হলো তাদের ‘মাদার প্রভিন্স’ বা ‘মাতৃ প্রদেশ’-এর একটি ব্যবচ্ছেদ। ‘বন্দে মাতরম’ ভারতীয় জাতীয় কংগ্রেসের জাতীয় সঙ্গীতের মর্যাদা লাভ করে। বঙ্গভঙ্গ রোধ করতে না পারায় বাঙ্গালি হিন্দুদের নেতৃত্বে সভা-সমাবেশ হতে থাকে। গ্রামাঞ্চলে আন্দোলন ছড়িয়ে পড়ে। মার্কিন পণ্য বর্জনে চীনাদের অনুকরণে ব্রিটিশের উৎপাদিত পণ্যাদি বর্জনে স্বদেশী আন্দোলনের জন্ম হয়।  


স্বদেশী আন্দোলন স্বরাজ প্রতিষ্ঠার লক্ষ্যে স্বদেশী আন্দোলন এবং ব্রিটিশ পণ্য বর্জন অব্যাহত গতিতে চলতে থাকে। ১৯০৬ সালে কলকাতায় ভারতীয় জাতীয় কংগ্রেসের অধিবেশনে সভাপতির ভাষণে কংগ্রেসের লক্ষ্য হিসেবে দাদাভাই নওরোজী প্রথম ‘স্বরাজ’ শব্দটি উলে¬খ করেন। ১৯০৫ সালের ১৩ জুলাই ‘সঞ্চীবনী’ পত্রিকার সম্পাদক কৃষ্ণ কুমার মৈত্র ও স্যার সুরেন্দ্র নাথ ব্যানার্জীর মতো হিন্দু নেতৃবৃন্দ ব্রিটিশ পণ্য বর্জন, শোক পালন এবং সরকারের সকল সংস্থার সঙ্গে সম্পর্ক ছিন্ন করার জন্য জনগণের প্রতি আহ্বান জানান। ১৯০৫ সালের ৭ আগস্ট কলকাতায় কংগ্রেসের এক সমাবেশে গৃহীত প্রস্তাবে বলা হয়, যতদিন পর্যন্ত বঙ্গভঙ্গ রদ করা না হবে ততদিন নাগাদ ব্রিটিশ পণ্য ক্রয় করা থেকে ভারতীয়রা বিরত থাকবে। দিনটিকে ভারতীয় জাতীয়তাবাদের জন্মদিন হিসেবে গণ্য করা হয়।  বঙ্গভঙ্গের বিরুদ্ধে রাজনৈতিক আন্দোলন ধর্মীয় আন্দোলনে রূপ নেয়। আন্দোলনে ধর্মীয় ভাবগাম্ভীর্য আনয়নে পূজা দেয়া হতে থাকে। ১৯০৫ সালের ২৮ সেপ্টেম্বর ‘মহালয়’ বা নতুন চাঁদের জন্মদিনে হিন্দুদের ধর্মীয় আন্দোলন চূড়ান্ত পর্বে উন্নীত হয়। সেদিন কলকাতার কালি মন্দিরে হাজার হাজার হিন্দু সমবেত হয়। বঙ্গদেশে কালি পূজা বরাবরই অত্যন্ত জনপ্রিয়। শিবের স্ত্রী কালি দেবীকে সংহার ও সৃষ্টির প্রতিভূ হিসেবে বিবেচনা করা হয়। হিন্দুদের কাছে কালি হলেন ‘গ্রেট মাদার’ বা মহা মাতা। বাংলাকে কালি মাতার মতো পবিত্র জ্ঞান করা হতো। কালি দেবীকে মাতৃভূমির একটি প্রতীক হিসেবে গ্রহণ করা হয়। হিন্দু পুরোহিতরা স্বদেশীদের শপথ বাক্য পাঠ করাতেন। ধর্মীয় ভাবাবেগকে কাজে লাগিয়ে রাজনৈতিক আন্দোলনকে বেগবান করে তোলা হয়। কালির নামে শুরু হওয়ায় সাধারণ হিন্দুরা এ আন্দোলনের প্রতি ঝুঁকে পড়ে।১৯০৫ সালের ১৬ অক্টোবরের আগে ও পরে বঙ্গভঙ্গের বিরুদ্ধে হিন্দুরা আন্দোলনে ঝাঁপিয়ে পড়ে। এ আন্দোলনের পার্শ্ব প্রতিক্রিয়া হিসেবে মুসলমানরা ক্ষুব্ধ হয়। অর্থনৈতিক আন্দোলন হিসেবে স্বদেশী আন্দোলনের জন্ম হলে তাতে মুসলমানদের কোনো আপত্তি থাকতো না। এ আন্দোলনে মুসলমানরাও শরীক হতো। কিন্তু এ আন্দোলন বঙ্গভঙ্গের বিরুদ্ধে উত্থিত হওয়ায় এবং তাতে হিন্দু ধর্মের রং চড়িয়ে দেয়ায় মুসলমানরা অসন্তুষ্ট হয়। বঙ্গদেশ বিভক্তির বিরুদ্ধে সৃষ্ট আন্দোলন পাঞ্জাব, সেন্ট্রাল প্রভিন্স, পুনা, মাদ্রাজ, বোম্বাই ও ভারতের অন্যান্য শহরে ছড়িয়ে পড়ে। ভারতীয়রা বিদেশি কাপড়ের পরিবর্তে স্বদেশে তৈরি পোশাক পরার শপথ গ্রহণ করে। বিদেশে তৈরি পোশাককে ঘৃণার চোখে দেখা হতে থাকে। স্বদেশী আন্দোলন কটন মিল থেকে শুরু করে ম্যাচ, গ্লাস, লোহা ও ইস্পাত তৈরির কারখানাকেও স্পর্শ করে। বর্ধিত শিক্ষা ব্যবস্থার দাবি ওঠে। বাঙ্গালি হিন্দু ছাত্র ও শিক্ষকরা ইংরেজি স্কুল ও কলেজ বর্জন করে। জাতীয় শিক্ষা বিস্তারের আন্দোলন গোটা বঙ্গদেশে এমনকি বানারস পর্যন্ত বিস্তার লাভ করে। বানারসে প-িত মদন মোহন মালভিয়া ১৯১০ সালে বানারস হিন্দু বিশ্ববিদ্যালয় প্রতিষ্ঠা করেন। দ্বিজেন্দ্রলাল রায়, রজনীকান্ত ও রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের লেখা কবিতা আন্দোলনে শক্তি যোগায়।  হিন্দু স্বদেশীদের প্রবল আন্দোলনে ব্রিটিশ সরকার ১৯১১ সালে ১২ ডিসেম্বর বঙ্গভঙ্গ রদ করে। 


মূল গান বাউল সঙ্গীত সাধক গগন হরকরা ররবীন্দ্রনাথ ঠাকুর  ১৯০৫ সালে বঙ্গভঙ্গের বিরোধিতা করতে গিয়ে লিখেছেন, ‘আমার সোনার বাংলা, আমি তোমায় ভালোবাসি। এ গানটি শুধু আমাদের বর্তমান রাজনৈতিক স্বাধীনতার বিরোধী তাই নয়, সঙ্গীতের বিচারেও অত্যন্ত নি¤œমানের। গানটি গাওয়ার সময় যেন শরীর ঝিমিয়ে পড়ে। শরীর ও মন চাঙ্গা হওয়া তো দূরে থাক, বরং শরীরের বল যেন কোথায় উবে যায়। এছাড়া এ গান রবীন্দ্রনাথের মৌলিক সৃষ্টি নয়। কুষ্টিয়ার বাউল সঙ্গীত সাধক গগন হরকরার। (সূত্র: রফিকুল ইসলাম ও অন্যান্য সম্পাদিত: কবিতা সংগ্রহ: ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়: তৃতীয় মুদ্রণ: জুলাই, ১৯৯০: পৃষ্ঠা- ৪৫১) রবীন্দ্রনাথের সঙ্গে গগন হরকরার বিশেষ অন্তরঙ্গতা ছিল এবং প্রায়ই দুজনে রসালাপ ও সঙ্গীত চর্চা করতেন। রবীন্দ্রনাথ তার গুণমুগ্ধ ছিলেন। রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর পারিবারিক জমিদারি দেখাশোনা করতে ১৮৮৯ থেকে ১৯০১ সাল পর্যন্ত বাংলাদেশের শিলাইদহ ও শাহজাদপুরে নিয়মিত যাতায়াত করতেন। এ সময় তিনি বাউল গানের প্রতি আকৃষ্ট হয়ে পড়েন। লালন, গোসাঁই গোপাল, ফকির চাঁদ, সর্বক্ষেপী বোস্টমী এবং গোসাইঁ রামলালের মতো অসংখ্য বাউলের সঙ্গে তার পরিচয় হয়। বাউল-ফকিরদের গান তাকে অন্য এক সুরের ভুবনে নিয়ে যেতো। এসব বাউল-ফকিরের মধ্যে রবীন্দ্রনাথের সবচেয়ে প্রিয় ছিলেন গগন হরকরা।   একদিন তিনি বজরার ছাদে বসে পদ্মার শোভা উপভোগ করছিলেন। এমন সময় পোস্ট অফিসের এক পিয়ন চিঠির থলে পিঠে নিয়ে আপন মনে গান করতে করতে সে পথ দিয়ে যাচ্ছিল। সে গান শুনে তিনি মুগ্ধ হয়ে যান। তিনি ডাক হরকরাকে ডেকে পাঠান। গাঁয়ের লোক তাকে গগন হরকরা নামে ডাকতো। কিন্তু তিনি রবীন্দ্রনাথের কাছে নিজের পরিচয় দিতে গিয়ে বললেন, তার নাম গগনচন্দ্র দাম। গ্রামের সাধারণ এক মানুষ, নিজের রচিত গানে নিজেই সুর দেন। রবীন্দ্রনাথ শিলাইদহে গেলেই ডাক পড়তো গগনের। সন্ধ্যার পর নির্জনে বোটের ছাদে বসে কিংবা শিলাইদহের কুঠিবাড়িতে গানের জলসায় গগন গান গাইতেন। রবীন্দ্রনাথ তার বন্ধুবান্ধব ও গুণীদের গগনের গান শোনানোর জন্য উৎসুক হয়ে থাকতেন।    একদিন শিলাইদহের কুঠিবাড়িতে এক জমজমাট আসর বসে। বাড়িতে অতিথি হয়ে এসেছিলেন ডেপুটি ম্যাজিস্ট্রেট দ্বিজেন্দ্রলাল রায়। সাহিত্যিক ও গীতিকার হিসেবে তখন চারদিকে তার বেশ সুনাম। হাসির ছড়া, নাটক আর গানে তার দক্ষতা সকলকে মুগ্ধ করে। দ্বিজেন্দ্রলাল রবীন্দ্রনাথের বিশেষ বন্ধু। তিনি আসরে হারমোনিয়াম বাজিয়ে কয়েকটি গান পরিবেশন করেন। সকলেই তার গানের বেশ তারিফ  করে।  এবার রবীন্দ্রনাথের পালা। কিন্তু সেদিন সকাল থেকেই তার গলায় ছিল অল্প ব্যথা। তিনি বন্ধু দ্বিজেন্দ্রলালকে বললেন, আমার গান তো অনেক শুনেছেন। আজ এক নতুন শিল্পীর গান শুনুন। আসরের এক কোণে সঙ্কুচিত হয়ে বসে থাকা হ্যাংলা এক ব্যক্তির দিকে তিনি নির্দেশ করতেই মানুষটি আরো কাঁচুমাচু হয়ে বললো, রাজাবাবু, সত্যিই কী আমাকে ডাকছেন? রবীন্দ্রনাথ তার বন্ধুকে পরিচয় করিয়ে দিয়ে বললেন, লালনের গান তো শুনেছেন। এবার তার গান শুনুন। গগন শ্রোতাদের সবাইকে নমস্কার জানিয়ে শুরু করেন:
লাগি সেই হৃদয় শশী,সদা প্রাণ হয় উদাসী,পেলে মন হতো খুশি,দিবা-নিশি দেখিতাম নয়ন ভরে।আমি প্রেমানলে মরছি জ্বলে,নিভাই কেমন করে-মরি হায়, হায় রে-ও তার বিচ্ছেদে প্রাণ কেমন করেদেখ না তোরা হৃদয় চিরেকোথায় পাবো তারে,আমার মনের মানুষ যে রে।গগনের এ গান হলো ‘আমার সোনার বাংলা’ গানের  আদি রূপ। রবীন্দ্রনাথের ‘যে তোমায় ছাড়ে ছাড়–ক’ এবং ‘আমার সোনার বাংলা’ গান দুটি গগন হরকরার যথাক্রমে ‘ও মন অসাড় মায়ায় ভুলে রবে‘ ও ‘আমি কোথায় পাবো তারে’ গান দুটির সুরে রচিত হয়।  কোন একদিন আমি কাশ্মীরের নির্যাতিত মুসলিম মহিলাদের মিছিলে একটি গান বাজতে শুনেছি। আমি বার বার শুনেছি। মনে মনে বলেছি, হায় আমাদের যদি এমন একটি জাতীয় সঙ্গীত থাকতো! উর্দুর ওপর দখল না থাকায় গানটির বাণী আমি উল্লেখ করতে পারছি না। কিন্তু গানটির শব্দ ঝংকার শরীরে অপূর্ব হিন্দোলের সৃষ্টি করে। কোন এক অতীন্দ্রিয় জগতে যেন নিয়ে যায়।


বিএসএফের কারসাজি আমাদের কোনো দোষ নেই। ১৯৭১ সালে আমাদের দুঃসময়ে ভারত আমাদের দুর্বলতার সুযোগে রবীন্দ্রনাথের এ গান আমাদের জাতীয় সঙ্গীত হিসেবে চাপিয়ে দেয়। এ কাজটি করেছিল ভারতীয় সীমান্ত রক্ষীবাহিনী (বিএসএফ)। ১৯৭১ সালে বিএসএফ’র ডিজি হিসেবে দায়িত্ব পালনকারী কর্মকর্তা কেএফ রুস্তমজী তার ডায়েরিতে একথা লিখে রেখে গেছেন। রুস্তমজীর ডায়েরি ও নোট অবলম্বনে একটি বই প্রকাশিত হয়েছে। পিভি. রাজগোপাল সম্পাদিত ২০০৯ সালের ডিসেম্বরে প্রকাশিত বইটির নাম ‘দ্য ব্রিটিশ, দ্য ব্যান্ডিটস এন্ড দ্য বোর্ডারম্যান।’ বইটিতে কেএফ রুস্তমজী লিখেছেন, The BSF played a key role in the formation of the Bangladesh Provisional Government, in framing its constitution and in selecting a National Flag and National Anthem.‘বিএসএফ বাংলাদেশের অস্থায়ী সরকার গঠন, দেশটির সংবিধান প্রণয়ন এবং একটি জাতীয় পতাকা ও জাতীয় সঙ্গীত বাছাইয়ে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে।’
দেশে দেশে জাতীয় সঙ্গীত পরিবর্তনজাতীয় সঙ্গীত একবার নয়, প্রয়োজন বোধে শতবার পরিবর্তন করা সম্ভব। জাতীয় সঙ্গীত ঐশী বাণী নয় যে, তাকে পরিবর্তন করা যাবে না ।  গণভোটে নিউজিল্যান্ডের জাতীয় সঙ্গীত ও জাতীয় পতাকা পরিবর্তন করা হয়েছে। কানাডা, অস্ট্রেলিয়া ও সিঙ্গাপুরের জাতীয় সঙ্গীত সংশোধন করা হয়েছে। ‘সিন্ধু’ শব্দ থাকায় ভারতের জাতীয় সঙ্গীত সংশোধন করা হয়। কবি রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের লেখা ভারতের জাতীয় সঙ্গীত ‘জন গণ মন অধিনায়ক জয় হে, ভারত ভাগ্যবিধাতা, পাঞ্জাব, সিন্ধু, গুজরাট, মারাঠা, দ্রাবিড় উৎকল বঙ্গ বিন্ধ্য হিমাচল’-এ ‘সিন্ধু’ শব্দটির সংযোজন ঘটায় ভারতীয়রা আহ্লাদিত হতো। ভারতের জাতীয় সঙ্গীত থেকে এ শব্দটি বাদ দেয়ার জন্য ২০০৪ সালে সুপ্রিম কোর্টে একটি মামলা রুজু করা হয়। মামলার রায়ে সুপ্রিম কোর্ট ভারত সরকারকে জাতীয় সঙ্গীত থেকে ‘সিন্ধু’ শব্দটি বাদ দেয়ার নির্দেশ দেয়। সুপ্রিম কোর্ট অভিমত দেয় যে, ভারতের জাতীয় সঙ্গীতে সিন্ধু শব্দটি সংযোজন করায় পাকিস্তানের সার্বভৌমত্ব ক্ষুণœ হয়েছে। ১৯১১ সালের ডিসেম্বরে সম্রাট পঞ্চম জর্জের অভিষেক উপলক্ষে তার প্রতি স্তুতি প্রকাশে রবীন্দ্রনাথ এ সঙ্গীত রচনা করেছিলেন। একইভাবে পাকিস্তানের প্রথম জাতীয় সঙ্গীত বাতিল করে পরবর্তীতে নতুন করে জাতীয় সঙ্গীত লেখা হয়েছে। পাকিস্তানের প্রথম জাতীয় সঙ্গীত রচনা করেছিলেন কবি জগন্নাথ আজাদ। পরবর্তীতে আবু আল-আসর জলন্ধরী পাকিস্তানের বর্তমান জাতীয় সঙ্গীত রচনা করেন। পৃথিবীর বহু দেশে জাতীয় সঙ্গীত ও জাতীয় পতাকা পরিবর্তন করা হয়েছে। সব দেশে পরিবর্তন করা সম্ভব হলে আমাদের দেশের জাতীয় সঙ্গীত পরিবর্তন করা যাবে না কেন? ভারত নাখোশ হবে এ ভয়ে? আর কতদিন আমাদেরকে ভারতের জুজুর ভয় দেখতে হবে জানি না। আমাদের সংবিধান বহুবার পরিবর্তন করা হয়েছে। কিন্তু কেউ জাতীয় সঙ্গীতে হাত দেয়নি। ভারতের প্রতি দুর্বল সরকার না হয় জাতীয় সঙ্গীতে হাত না-ই দিলো। কিন্তু জাতীয়তাবাদীরা কয়েক দশক সুযোগ পেয়েও কেন একজন বিদেশির রচিত জাতীয় সঙ্গীত বাতিল করতে পারলো না তাই হলো প্রশ্ন। রবীন্দ্রনাথ ছিলেন সাম্প্রদায়িকরবীন্দ্রনাথ ঠাকুর যত বড় কবি বা সাহিত্যিক হোন না কেন, আমাদের এ স্বাধীন ভূখ-ের সঙ্গে তার কোনো সস্পর্ক নেই। তিনি হলেন ভারতীয়। বাংলাদেশে নিযুক্ত ভারতীয় রাষ্ট্রদূত রীভা গাঙ্গুলি দাস ২০২০ সালের ৮ সেপ্টেম্বর নওগাঁর আত্রাইয়ে রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের কাচারি বাড়ি পরিদর্শনে গিয়ে বলেন, রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর ছিলেন অসাম্প্রদায়িক চেতনার মানুষ। রীভা গাঙ্গুলির কথা সত্যি নয়। রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর হলেন বিশুদ্ধ ব্রাহ্মণ কবি। মুসলমানদের প্রতি তার কখনো শ্রদ্ধাবোধ ছিল না। তার বিশাল সাহিত্য কর্মে কাবুলিওয়ালা ছাড়া আর কোথাও কোনো মুসলিম চরিত্র স্থান পায়নি। এ সত্য সবাই জানেন। তারপরও তার রচিত গানকে আমাদের জাতীয় সঙ্গীত হিসেবে চাপিয়ে দেয়া হয়েছে। রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের প্রতি বাঙালি মুসলমানদের শ্রদ্ধা ভক্তি দেখলে অবাক না হয়ে পারা যায় না। হ্যাঁ, স্বীকার করি যে, তিনি হলেন বাংলা সাহিত্যের শ্রেষ্ঠ কবি ও সাহিত্যিক। কিন্তু মুসলমানদের সঙ্গে তার সম্পর্ক কি? তিনি তার সাহিত্যে মুসলমানদের ঠাঁই দেননি।   মুসলমানদের আবার হিন্দু ধর্মে ফিরিয়ে নিয়ে যাওয়ার জন্য একটি কমিটি গঠন করা হয়েছিল।  রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর ছিলেন সেই কমিটির অন্যতম ছিলেন। এই কমিটির কাজ ছিল নি¤œবর্ণের যেসব হিন্দু মুসলিম হয়েছিল তাদের আবার হিন্দু ধর্মে ফিরিয়ে নিয়ে যাওয়া। (সূত্র: রবি জীবনী, ৬ষ্ঠ খ-, প্রশান্ত পাল, পৃষ্ঠা-২০৭ ও ২০৮)   রবীন্দ্রনাথ সতীদাহ প্রথাকে সমর্থন করে কবিতাও লিখেছিলেন। কিন্তু স্বামীর চিতায় জীবন্ত স্ত্রীর আত্মহত্যাকে মুসলমানরা অপছন্দ করায় তিনি তাদের ‘যবন’ বলতেন।জ্বল জ্বল চিতা! দ্বিগুণ দ্বিগুণপরাণ সপিবে বিধবা বালাজ্বলুক জ্বলুক চিতার আগুনজুড়াবে এখনই প্রাণের জ্বালাশোনরে যবন, শোনরে তোরাযে জ্বালা হৃদয়ে জ্বালালি সবেসাক্ষী রলেন দেবতার তারএর প্রতিফল ভুগিতে হবে।(জ্যোতিন্দ্রনাথ ঠাকুরের লেখা জ্যোতিন্দ্রনাথের নাট্য সংগ্রহ, কলকাতা: বিশ্ব ভারতী ১৯৬৯, পৃষ্ঠা: ২২৫)


ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় প্রতিষ্ঠার বিরোধিতারবীন্দ্রনাথ ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় প্রতিষ্ঠার বিরোধিতা করেছেন। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় প্রতিষ্ঠায় বাধা দিলেও এ বিশ্ববিদ্যালয়ে তার জন্ম জয়ন্তী পালন করা হয়। রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরকে আমাদের অনেকে দেবতার মর্যাদা দেয়। তার পারিবারিক জমিদারি ছিল কুষ্টিয়ার শিলাইদহে, পাবনার শাহজাদপুরে এবং রাজশাহীর পতিসরে। এসব অঞ্চল ছিল মুসলিম প্রধান। মুসলিম প্রজারাই তার রাজস্ব জোগাতো। কিন্তু তিনি মুসলমানদের মধ্যে শিক্ষা বিস্তারে একটি প্রাথমিক বিদ্যালয়ও প্রতিষ্ঠা করেননি। ১৯১২ সালের ২৮ মার্চ ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় প্রতিষ্ঠার বিরুদ্ধে কলকাতার গড়ের মাঠে একটি সভা হয়। এ সভার ঠিক দুদিন আগে আরেকটি সভায় ঢাকায় বিশ্ববিদ্যালয় প্রতিষ্ঠা প্রতিহত করার সিদ্ধান্ত নেয় হয়। এতে সভাপতিত্ব করেছিলেন রবীন্দ্রনাথ। (সূত্র: কলকাতা ইতিহাসের দিনলিপি, ড. নীরদ বরণ হাজরা, ২য় খন্ড, চতুর্থ খন্ড)। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় প্রতিষ্ঠার বিরুদ্ধে সেদিন হিন্দু সংবাপত্র, হিন্দু বুদ্ধিজীবী ও হিন্দু নেতৃবৃন্দ আন্দোলনে নেমেছিলেন। পশ্চিমবঙ্গের বর্ণ হিন্দুরা প্রস্তাবিত ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়কে ‘মক্কা বিশ্ববিদ্যালয়’ বলে ব্যঙ্গ করতো। গিরিশচন্দ্র ব্যানার্জী, রাসবিহারী ঘোষ ও কলকাতা বিশ্ববিদ্যালয়ের ভাইস চ্যান্সেলর স্যার আশুতোষ মুখার্জীর নেতৃত্বে হিন্দু এলিটরা ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় প্রতিষ্ঠার বিরুদ্ধে গভর্নর জেনারেল লর্ড হার্ডিঞ্জের কাছে ১৮ বার স্মারকলিপি দেন। (সূত্র: ক্যালকাটা ইউনিভার্সিটি কমিশন রিপোর্ট, চতুর্থ খন্ড পৃষ্ঠা- ১৩০)  ২০০০ সনে আহমদ পাবলিশিং হাউস থেকে ‘আমাদের স্বাধীনতা সংগ্রামের ধারাবাহিকতা এবং প্রাসঙ্গিক কিছু কথা’ শিরোনামে প্রকাশিত একটি বইয়ে তত্ত্বাবধায়ক সরকারের সাবেক উপদেষ্টা মেজর জেনারেল (অব:) এমএ মতিন বলেন, ১৯১২ সালের ২৮ মার্চ কলকাতায় গড়ের মাঠে কবি রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের সভাপতিত্বে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় প্রতিষ্ঠার প্রতিবাদে এক বিশাল জনসভার আয়োজন করা হয়। কিন্তু ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের বাংলা বিভাগের অধ্যাপক বিশ্বজিৎ ঘোষ দাবি করছেন, ১৯১২ সালের ২৮ মার্চ রবীন্দ্রনাথ কলকাতায় ছিলেন না। তিনি ছিলেন শিলাইদহে। ১৯ মার্চ ভোরে কলকাতা থেকে সিটি অব প্যারিস জাহাজে রবীন্দ্রনাথের ইংল্যান্ড যাত্রার জন্য কেবিন ভাড়া করা হয়েছিল। তার মালপত্রও জাহাজে উঠানো হয়েছিল। সেদিন সকালে তিনি অসুস্থ হয়ে পড়েন। তাই তার ইংল্যান্ড যাত্রা স্থগিত হয়ে যায়।    রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের বিরোধিতা সম্পর্কে সৈয়দ আবুল মকসুদ তার ‘ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে ও বাংলাদেশের উচ্চশিক্ষা’ শিরোনামে বইয়ে লিখেছেন ‘শ্রেণিস্বার্থে রবীন্দ্রনাথও ছিলেন কার্জনের ওপর অতি ক্ষুব্ধ। কার্জনের উচ্চশিক্ষা সংক্রান্ত মন্তব্যের তীব্র প্রতিক্রিয়া দেখা দেয় কলকাতার হিন্দু সমাজে। তাতে রবীন্দ্রনাথও অংশগ্রহণ করেন। তিনি যে প্রতিক্রিয়া প্রকাশ করেন তাতে কিছু ছিল যুক্তি। বেশির ভাগই ছিল আবেগ এবং কিছু ছিল ক্ষোভ।’     ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষক এবং গবেষক তৌহিদুল হক বলছিলেন, ‘ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় প্রতিষ্ঠায় যে তিন শ্রেণির মানুষ বিরোধিতা করেছিলেন তাদের মধ্যে আমরা রবীন্দ্রনাথকে তৃতীয় কাতারে রাখতে চাই। কারণ তারা ছিলেন পশ্চিমবঙ্গের উচ্চবর্ণের কিছু হিন্দু সমাজ। তাদের সঙ্গে বিশেষ করে কলকাতা বিশ্ববিদ্যালয়ের উপাচার্য স্যার আশুতোষ মুখোপাধ্যায় আর রাজনীতিক সুরেন্দ্রনাথ ব্যানার্জীর সঙ্গে রবীন্দ্রনাথের একাধিকবার বৈঠক ও আলোচনা হয়েছে শিলাইদহ যাওয়ার আগে।’     

 ১৯২১ সালে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় প্রতিষ্ঠিত হয়েছিল। বিশ্ববিদ্যালয় প্রতিষ্ঠার প্রস্তাব করেছিলেন ব্রিটিশ ভারতের গভর্নর জেনারেল লর্ড হার্ডিঞ্জ। ১৯১২ সালের ২১ জানুয়ারি ঢাকা সফরকালে কয়েকজন নেতৃস্থানীয় মুসলমান তার সঙ্গে দেখা করেন। তারা অভিযোগ করেন যে, বঙ্গভঙ্গ রদ হওয়ায় মুসলমানরা ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। এই ক্ষতি পুষিয়ে দিতে লর্ড হার্ডিঞ্জ ঢাকায় একটি বিশ্ববিদ্যালয়  প্রতিষ্ঠার প্রতিশ্রুতি দেন। সে সময় পূর্ববঙ্গে কোনো বিশ্ববিদ্যালয় ছিল না। লর্ড হার্ডিঞ্জ বিশ্ববিদ্যালয় প্রতিষ্ঠার প্রতিশ্রুতি দেয়ায় মুসলিম সংখ্যাগরিষ্ঠ পূর্ববঙ্গে মুসলমানদের জন্য উচ্চ শিক্ষার দরজা খুলে যায়। সবাই এ প্রস্তাবকে স্বাগত জানায়। পশ্চিমবঙ্গের হিন্দু মনে করেছিল, ঢাকায় বিশ্ববিদ্যালয় হলে কলকাতা বিশ্ববিদ্যালয়ের বাজেট বরাদ্দ কমে যাবে। বাজেট বরাদ্দ হ্রাস পেলে কলকাতা বিশ্ববিদ্যালয় অচল হয়ে যাবে। এই ভয়ে তারা ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় প্রতিষ্ঠার বিরোধিতা করেছিলেন।     লর্ড হার্ডিঞ্জ ঢাকা সফর শেষে কলকাতায় ফিরে গেলে ১৯১২ সালের ১৬ ফেব্রুয়ারি রাসবিহারী ঘোষের নেতৃত্বে একটি প্রতিনিধিদল তার সঙ্গে সাক্ষাৎ করেন এবং ঢাকায় বিশ্ববিদ্যালয় স্থাপনে আপত্তি জানিয়ে একটি স্মারকলিপি পেশ করেন। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় প্রতিষ্ঠার সবচেয়ে ঘোরতর বিরোধী ছিলেন কলকাতা বিশ্ববিদ্যালয়ের উপাচার্য স্যার আশুতোষ মুখোপাধ্যায় ও রাজনীতিক সুরেন্দ্রনাথ ব্যানার্জী। গভর্নর জেনারেল লর্ড হার্ডিঞ্জ স্যার আশুতোষ মুখোপাধ্যায়ের কাছে জানতে চেয়েছিলেন, কিসের বিনিময়ে তিনি ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় প্রতিষ্ঠার বিরোধিতা থেকে বিরত থাকবেন। শেষ পর্যন্ত স্যার আশুতোষ মুখোপ্যাধ্যায় কলকাতা বিশ্ববিদ্যালয়ের জন্য চারটি নতুন অধ্যাপক পদ সৃষ্টির বিনিময়ে বিরোধিতা থেকে বিরত হন। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় প্রতিষ্ঠায় এগিয়ে আসেন ঢাকার নবাব স্যার সলিমুল্লাহ। কিন্তু হঠাৎ ১৯১৫ সালে নবাব স্যার সলিমুল্লাহর মৃত্যু হলে নবাব সৈয়দ নওয়াব আলী চৌধুরী শক্ত হাতে হাল ধরেন। অন্যদের মধ্যে শেরে বাংলা আবুল কাশেম ফজলুল হক হলেন উল্লেখযোগ্য। হিন্দুরা বিরোধিতা করায় ১৯২১ সালের জুলাই পর্যন্ত ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় প্রতিষ্ঠা করা সম্ভব হয়নি। বিশ্ববিদ্যালয় প্রতিষ্ঠার প্রস্তাব আঁতুর ঘরে পড়ে। অবশেষে সমঝোতা হয়। তার মধ্যে ছিল মনোগ্রামে ‘স্বস্তিকা’ এবং ‘পদ্ম’ ফুলের প্রতীক থাকবে। বিরোধিতাকারীরা খুশি হয়। তারপর  ঢাকার স্যার নবাব সলিমুল্লাহ, শেরে বাংলা আবুল কাশেম ফজলুল হক ও ধনগড়ের নবাব নওয়াব আলী চৌধুরীর অক্লান্ত চেষ্টায় ১৯২১ সালে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় প্রতিষ্ঠিত হয়। (সূত্র: ডক্টর কাজী জাকের হোসেন, দৈনিক ইনকিলাব, ১০ মার্চ, ২০০২ সাল)।


  ১৯১২ সালের মে’তে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় প্রতিষ্ঠায় ব্যারিস্টার রবার্ট নাথানের নেতৃত্বে নাথান কমিটি গঠন করা হয়। এ কমিটির ২৫টি সাব-কমিটির রিপোর্টের ভিত্তিতে ভারত সরকার প্রস্তাবিত ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের জন্য রূপরেখা স্থির করে। ভারত সচিব ১৯১৩ সালে নাথান কমিটির রিপোর্ট অনুমোদন করেন। কিন্তু প্রথম বিশ্বযুদ্ধ শুরু হলে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় প্রতিষ্ঠায় প্রতিবন্ধকতা দেখা দেয়। ১৯১৭ সালের মার্চে ইম্পেরিয়াল লেজিসলেটিভ কাউন্সিলে টাঙ্গাইলের ধনবাড়ির নবাব সৈয়দ নওয়াব আলী চৌধুরী সরকারের কাছে অবিলম্বে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় বিল পেশের আহ্বান জানান। ১৯১৭ সালে কলকাতা বিশ্ববিদ্যালয়ের চ্যান্সেলর লর্ড চেমসফোর্ড কলকাতা বিশ্ববিদ্যালয়ের সমস্যা তদন্তে একটি কমিটি গঠন করেন। এ কমিশনকে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় সম্পর্কে পরামর্শ দেওয়ার দায়িত্ব দেয়া হয়। কমিশনের প্রধান ছিলেন মাইকেল স্যাডলার। স্যাডলার কমিশন ঢাকায় একটি বিশ্ববিদ্যালয় প্রতিষ্ঠার সুপারিশ করে। কিন্তু এ কমিশন ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়কে সরকারি বা স্টেট বিশ্ববিদ্যালয় করার নাথান কমিটির প্রস্তাব সমর্থন করেনি।   রবীন্দ্রনাথ মুসলিম প্রধান পূর্ববঙ্গে বিশ্ববিদ্যালয় প্রতিষ্ঠার বিরোধিতা করে বলেছিলেন, তাদের আবার বিশ্ববিদ্যালয় কিসের। তারা তো ভালোভাবে বাংলাই বলতে পারে না। অথচ রবীন্দ্রনাথ পশ্চিমবঙ্গে শান্তিনিকেতন ও বিশ্ব ভারতী বিশ্ববিদ্যালয় প্রতিষ্ঠা করেছিলেন। শান্তিনিকেতনে কোনো মুসলমান ছাত্রের প্রবেশাধিকার ছিল না। বিশ্ব ভারতী প্রতিষ্ঠা করতে গিয়ে তিনি হায়দরাবাদের নিজামের কাছে চাঁদা চেয়েছিলেন। নিজাম তাকে এক লাখ টাকা চাঁদা দেন। রবীন্দ্রনাথ ভাবতে পারেননি যে, নিজাম তাকে এত বেশি টাকা চাঁদা দেবেন। নিজাম চাঁদা দেয়ায় সামান্য মুসলিম ছাত্র বিশ্ব ভারতীতে ভর্তি হওয়ার সুযোগ পায়। সাহিত্যিক সৈয়দ মুজতবা আলী ছিলেন তাদের একজন।  বিজেপি প্রায়ই দাবি করে যে, ভারতের সব মুসলমান হিন্দু। তাই তাদেরকে ঘরে ওয়াপসি করতে হবে। পুরোপুরি হিন্দু হয়ে যেতে হবে। এ কথাটি কিন্তু চালু করেছিলেন রবীন্দ্রনাথ। তিনি বলেছিলেন, মুসলমানরা ইসলামানুরাগী হলেও জাতিতে হিন্দু। কাজেই তারা হিন্দু মুসলমান। (সূত্রঃ অতীত দিনের স্মৃতিঃ আবুল কালাম শামসুদ্দিন, পৃষ্ঠা-১৫০)।
শিবাজির প্রশস্তিআমরা মোগল শাসনের উত্তরাধিকার বহন করছি। মোগলদের নিয়ে আমরা গর্ব করি। কিন্তু রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর গর্ব করেছেন মোগলদের শত্রু মারাঠা নেতা শিবাজিকে নিয়ে। তিনি শিবাজির প্রশস্তি গেয়ে ৫টি কবিতা লিখেছেন। ‘শিবাজি উৎসব’ কবিতায় তিনি লিখেছেন:কোন দূর শতাব্দের কোন এক অখ্যাত দিবসেনাহি জানি আজিমারাঠার কোন শৈলে অরণ্যে অন্ধকারে বসেহে রাজা শিবাজিতব ভাল উদ্ভাসিয়া এ ভাবন তড়িৎপ্রভাবৎএসেছিলে নামি-‘এক ধর্মরাজ্যপাশে খন্ড ছিন্ন বিক্ষিপ্ত ভারতবেঁধে দিব আমি।’সেদিন এ বঙ্গদেশ উচ্চকিত জাগে নি স্বপনেপায় নি সংবাদ-বাহিরে আসে নি ছুটে, উঠে নাই তাহার প্রাঙ্গণেশুভ শঙ্খনাদ-শান্তমুখে বিছাইয়া আপনার কোমল নির্মলেশ্যামলি উত্তরীতন্দ্রাতুর সন্ধ্যাকালে শত পল্লী সন্তানের দলছিল বক্ষে করি।তারপর একদিন মারাঠার প্রান্তর হইতেতব বজ্রশিখাআঁকি দিল দিগদিগন্তে যুগান্তের বিদ্যুৎবহ্নিতেমহামন্ত্রলিখা।


এখানে রবীন্দ্রনাথ শিবাজিকে ভারতের ঐক্যের প্রতীক হিসেবে তুলে ধরেছেন। তিনি বলতে চেয়েছেন, খ- বিখ- বিক্ষিপ্ত ভারতকে ধর্মের ভিত্তিতে ঐক্যবদ্ধ করা ছিল শিবাজির জীবনের উদ্দেশ্য।


সাহিত্যে মুসলমানদের প্রতি অবহেলাকবি কাজী নজরুল হলেন একত্ববাদের প্রতীক এবং কবি রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর হলেন বহুত্ববাদের প্রতীক। দুজনের দুটি কবিতার উদাহরণ দেয়া যাক।‘বিদ্রোহী’ কবিতায় কবি নজরুল লিখেছেন:বল বীর বল উন্নত মম শিরশির নেহারি নত শিরওই শিখর হিমাদ্রিরবল বীর বল উন্নত মম শির।অন্যদিকে ‘গীতাঞ্জলি’ কাব্যগ্রন্থে কবি রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের প্রথম কবিতা হলো:আমার মাথা নত করে দাওহে তোমার চরণ ধূলার তলেসকল অহঙ্কার হে আমারডুবাও চোখের জলেনিজেরে করিতে গৌরব দাননিজেরে করি কেবলি অপমান।  এ দুটি কবিতায় কবিদের নিজস্ব ধর্মীয় উপলদ্ধি ও দর্শনের পরিচয় পাওয়া যায়। ইসলাম এক আল্লাহ ছাড়া কারো কাছে মাথা নত করার শিক্ষা দেয়া না। কবি নজরুলের ‘বিদ্রোহী’ কবিতার এ কয়েকটি লাইনে আল্লাহর একত্ববাদের শ্রেষ্ঠত্বকে স্বীকৃতি দেয়া হয়েছে। কবি এখানে ‘হিমাদ্রি’ বলতে মহান আল্লাহকে বুঝিয়েছেন। তার এ আকুতি প্রকাশ পেয়েছে যে, তিনি আল্লাহ ছাড়া কারো কাছে মাথা নত করতে ইচ্ছুক নন। বিপরীতক্রমে গীতাঞ্জলি’তে উল্লেখিত কবিতায় কবি রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের দেবদেবী অথবা আল্লাহর সৃষ্টির কাছে মাথা নত করার প্রয়াস লক্ষণীয়। এখানে তিনি আল্লাহর শ্রেষ্ঠত্বকে স্বীকৃতি দেয়ার পরিবর্তে তার সৃষ্টিকে শ্রেষ্ঠত্বের আসনে বসিয়েছেন। তাওহিদের পরিভাষায় তাকে বলা হয় ‘শিরক।’ দুজন কবি দুরকমের অভিব্যক্তি প্রকাশ করেছেন। একজন মাথা উঁচু রাখতে চেয়েছেন এবং অন্যজন মাথা নত করতে চেয়েছেন।   রবীন্দ্রনাথ তার সাহিত্য কর্মে মুসলমানদের বর্জন করলেও তার প্রায় সমসাময়িক কবি নজরুল ইসলাম তার সাহিত্যে মুসলমানদের পরম শ্রদ্ধার সঙ্গে ঠাঁই দিয়েছেন। তিনি তার কবিতা ও গানে অজস্র ফারসি, আরবি ও উর্দু শব্দ ব্যবহার করেছেন। নজরুলকে বাদ দিলে বঙ্গীয় মুসলিম সাহিত্য এতিম হয়ে যায়। তাকে ইসলামি জাগরণের কবি বললেও অত্যুক্তি হবে না। একইসঙ্গে নজরুল হিন্দু ভাবধারা ও দর্শনকে অবলীলাক্রমে গ্রহণ করেছেন। তিনি হলেন অসাম্প্রদায়িক কবি। আর রবীন্দ্রনাথ হলেন বিশুদ্ধ সাম্প্রদায়িক কবি। পন্ডিত হিসেবে তিনি নজরুলের চেয়ে কম ছিলেন না। বরং অনেক বেশি বিদ্বান ছিলেন। তাহলে কোন যুক্তিতে তিনি তার সাহিত্য কর্মে ফারসি, উর্দু ও আরবি শব্দ ভান্ডার ব্যবহার করেননি? মরহুম মোতাহার হোসেন চৌধুরী শান্তিনিকেতনে কবি রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরকে জিজ্ঞেস করেছিলেন, ‘আপনার লেখায় ইসলাম ও বিশ্বনবী (সা.) সম্পর্কে কোনো কথা নেই কেন।’ জবাবে তিনি বলেছিলেন, ‘কোরআন পড়তে শুরু করেছিলুম। কিন্তু বেশিদূর এগুতে পারিনি। আর তোমাদের রসূলের জীবন চরিতও ভালো লাগেনি।’

(সূত্র: বিতন্ডা, সৈয়দ মুজিবুল্লাহ, পৃষ্ঠা-২২৯)  (লেখাটি আমার ‘জাতীয় ও বহির্বিশ্ব’ থেকে নেয়া। বইটি প্রকাশ করবে আফসার ব্রাদার্স)

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *