মোস্তফা কামাল সৈয়দ ছিলেন সবার স্বজন

মোস্তফা কামাল সৈয়দ ছিলেন সবার স্বজন

:: কামরুননেসা হাসান ::

ইলেকট্রনিক মিডিয়ার বিশাল সাম্রাজ্যের তিনি ছিলেন এক অনন্য দৃষ্টান্ত। মেধা-মননে-চারিত্রিক বৈশিষ্ট্যে তাঁর জুড়ি মেলা ভার। শিল্পী পরিবারের একজন সজ্জন ব্যক্তি—অতি সাধারণ, সহজ-সরল, আন্তরিক কিন্তু অসাধারণ এক ব্যক্তিত্বের অধিকারী ছিলেন।

তিনি মোস্তফা কামাল সৈয়দ বাংলাদেশ টেলিভিশনে উপমহাপরিচালক পদ থেকে ইস্তফা দিয়ে এনটিভির অনুষ্ঠান বিভাগের প্রধান হিসেবে শেষ দিন পর্যন্ত কর্মরত ছিলেন। টেলিভিশন থেকে বিদায় নেওয়াটা খুবই বেদনাদায়ক ছিল। সে সময় আমরা সবাই হতভম্ব হয়ে গিয়েছিলাম। যিনি সারাক্ষণ সব বাধাবিপত্তি, নানা সংকটে বাংলাদেশ টেলিভিশনকে ভালোবেসে বলিষ্ঠ নেতৃত্ব দিয়েছেন, তাঁকে কেন এভাবে বিদায় নিতে হবে? কিন্তু মানীর মান আল্লাহ রাখেন—বাকি জীবন অনেক সম্মানের সঙ্গে, বীরের মতো দেখিয়ে দিয়েছেন কাজের মূল্যায়ন আল্লাহ মানুষকে দেন।

অতি সাধারণ জীবন যাপন করতেন। তাঁর কোনো বাড়তি চাওয়া-পাওয়া ছিল না।

অনুষ্ঠান নির্মাণেও তাঁর মুনশিয়ানা ছিল। পরিচ্ছন্ন মানসম্পন্ন অনুষ্ঠান প্রযোজনা করেছেন। ডিআইটি টেলিভিশন ভবনে সে সময় বেশির ভাগ গানের অনুষ্ঠানের প্রযোজক ছিলেন মোস্তফা কামাল সৈয়দ। বয়োজ্যেষ্ঠ শিল্পীরা আজ তা স্মরণ করতে পারেন। অনেক মানসম্পন্ন নাটক প্রযোজনা করেছেন। অনেকে স্মরণ করতে পারেন—বাংলাদেশ টেলিভিশনে সে সময় দুটো স্টুডিও ছিল। বড়টাতে সাধারণত নাটক রেকর্ডিং হতো। আর ছোট স্টুডিওতে গানের অনুষ্ঠান-আলোচনা অনুষ্ঠান আর পরবর্তী সময়ে অডিটরিয়ামে ম্যাগাজিন অনুষ্ঠান ধারণ করা হতো। অডিও ধারণ করার জন্য কোনো স্টুডিও ছিল না। ২ নম্বর স্টুডিওতে রাত সাড়ে ১১টায় নির্ধারিত অনুষ্ঠান ধারণ শেষে গানের অডিও ধারণ করা হতো। রেকর্ডিংয়ে ছিলেন ফ্রান্সিসদা। খুব ভালো অডিও ধারণ করতেন। দেখা যেত, সুরবিতান বা অন্য কোনো গানের অনুষ্ঠানের আটটি গানের অডিও শেষ হতে অনেক রাত হয়ে যেত।

সহধর্মিণী জিনাত আপা বলতেন, ‘শোনো মেনকা, তিনি একজন সুফি মানুষ—পরিমিত তাঁর খাওয়া, কোনো চাহিদা নেই। মসজিদে যেয়ে নামাজ পড়বেন। কখনো রাগ করেন না। সবার জন্য অফুরন্ত ভালোবাসা।’

আপা কীভাবে এই মর্মবেদনা, চলে যাওয়ার কষ্ট সহ্য করবেন, তা ভাবতে পারি না। আল্লাহ জীনাত আপার সহায় হোন, এই দোয়া করি।

১৯৭৪ সালের কথা। আমি বেতারে অনুষ্ঠান ঘোষণা করি। রেজাউল করিম টেলিভিশনে কাজ করেন আর বেতারে গান করেন। একদিন আমাকে বললেন, আপনাকে খালেদা ফাহ্‌মি (টেলিভিশনের পরিচালক) দেখা করতে বলেছেন। এর আগে টেলিভিশনে দু-একটি অনুষ্ঠানে অংশ নিয়েছি। নির্ধারিত দিনে আপার সঙ্গে দেখা করতে যাই। কামাল ভাই আপার রুমে বসা। তাঁরা আমাকে বললেন, ‘তুমি কি টেলিভিশনে অনুষ্ঠান ঘোষণা করবা?’ মেঘ না চাইতেই জল—মহা আনন্দে সম্মতি জানালাম। কামাল ভাই তখন উপস্থাপনা শাখার অধিকর্তা। পরবর্তীকালে ১৯৮০ সালে প্রযোজক হিসেবে নিয়োগপত্র পেয়ে টেলিভিশনে জেনারেল ম্যানেজার তখন কামাল ভাই, দেখা করতে যাই—আমাকে নিয়ে গেলেন মহাপরিচালকের কাছে। তখন মহাপরিচালক ছিলেন এম এ সাঈদ (পরে তথ্যসচিব এবং নির্বাচন কমিশনার)। স্মৃতিচারণায় আজ অনেক কথা মনে হচ্ছে। দীর্ঘ ২৫ বছর অভিভাবকের মতো ছায়া দিয়েছেন। কীভাবে মেনে নেব এই মহান মানুষটি চলে গেলেন। কর্মক্ষেত্রে কোনো জটিল সমস্যা নিয়ে গেলে অতি সহজেই তা সমাধান করে দিতেন। সততার, নিষ্ঠার সঙ্গে কাজ করার এক অনন্য দৃষ্টান্ত মোস্তফা কামাল সৈয়দ।

বিটিভিতে শিল্পীরা সম্মানীর যে চেক পান, তা তাঁদের অ্যাকাউন্টে জমা দিতে হয়। বেয়ারার সাধারণত হতো না। প্রয়াত বিশিষ্ট সংগীত পরিচালক আনোয়ার পারভেজ একটি অনুষ্ঠানের চেক পাওয়ার পর আমাকে বললেন, ‘বুবু, আমার টাকাটা জরুরি প্রয়োজন, তুমি কি কামাল ভাইকে বলে চেকটি বেয়ারার করে দেবে (একমাত্র জেনারেল ম্যানেজার বেয়ারার করতে পারতেন)। পারভেজ ভাইয়ের অনুরোধে আমি চেকটি নিয়ে কামাল ভাইয়ের কাছে যাই। কোনো কথা না বলে সঙ্গে সঙ্গেই তা সই করে দিলেন। অন্যের কষ্টটা অনুধাবন করতে পারতেন।

‘ছন্দবৃত্ত’ কবিতার একটি অনুষ্ঠান প্রযোজনা করতেন। একবার বরিশাল কলেজের ১০ জন ছেলেমেয়ে অনুষ্ঠানে আবৃত্তি করতে এল। সম্মানী ৫০০ টাকা। ওদের তো কোনো ব্যাংক অ্যাকাউন্ট নেই। পরদিন সন্ধ্যায় লঞ্চে ফিরে যাবে। আবারও বেয়ারার করার ব্যাপার। এতগুলো চেক। একটু দ্বিধা ছিল—আমি বললাম, ওরা তো শিক্ষার্থী। ওদের ব্যাংক অ্যাকাউন্ট নেই। তা ছাড়া আজ সকালে চেক ভাঙাতে পারলে ওদের অনেক সুবিধা হবে। বেয়ারার করে দিলেন। তখন একজন শিক্ষার্থীর কাছে ৫০০ টাকা অনেক কিছু। হয়তো ঢাকা থেকে কিছু কেনাকাটা করে বরিশালে ফিরে গেছে। সেদিনের সে কথাগুলো মনে করে আজও শ্রদ্ধায় নত হই।

শিল্পীদের প্রতি তাঁর অনেক শ্রদ্ধাবোধ ছিল। আস্থার জায়গা। কোনো পক্ষপাত নয়। একবার শিল্পীরা তাঁদের পারিশ্রমিক বাড়ানোর জন্য জোর তৎপর। মন্ত্রণালয়ের সভায় পারিশ্রমিক বাড়ানো হলো। কামাল ভাই এখানেক বড় ভূমিকা রেখেছিলেন। তিনি একটা প্রস্তাব দিলেন, যাঁরা জাতীয় পুরস্কারপ্রাপ্ত, তাঁরা ২৫ শতাংশ বেশি সম্মানী পাবেন। আজও তা বহাল রয়েছে। অভিভাবকের দায়বদ্ধতা থেকেই তিনি শিল্পীদের মূল্যায়ন করতেন। কাজের প্রতি একনিষ্ঠতায় তাঁর জুড়ি মেলা ভার। বড় ভালোবাসতেন কাজকে। নীরবে-নিভৃতে সকাল-সন্ধ্যা কাজ করে যেতেন।

অনুষ্ঠান নির্মাণেও তাঁর মুনশিয়ানা ছিল। পরিচ্ছন্ন মানসম্পন্ন অনুষ্ঠান প্রযোজনা করেছেন। ডিআইটি টেলিভিশন ভবনে সে সময় বেশির ভাগ গানের অনুষ্ঠানের প্রযোজক ছিলেন মোস্তফা কামাল সৈয়দ। বয়োজ্যেষ্ঠ শিল্পীরা আজ তা স্মরণ করতে পারেন। অনেক মানসম্পন্ন নাটক প্রযোজনা করেছেন। অনেকে স্মরণ করতে পারেন—বাংলাদেশ টেলিভিশনে সে সময় দুটো স্টুডিও ছিল। বড়টাতে সাধারণত নাটক রেকর্ডিং হতো। আর ছোট স্টুডিওতে গানের অনুষ্ঠান-আলোচনা অনুষ্ঠান আর পরবর্তী সময়ে অডিটরিয়ামে ম্যাগাজিন অনুষ্ঠান ধারণ করা হতো। অডিও ধারণ করার জন্য কোনো স্টুডিও ছিল না। ২ নম্বর স্টুডিওতে রাত সাড়ে ১১টায় নির্ধারিত অনুষ্ঠান ধারণ শেষে গানের অডিও ধারণ করা হতো। রেকর্ডিংয়ে ছিলেন ফ্রান্সিসদা। খুব ভালো অডিও ধারণ করতেন। দেখা যেত, সুরবিতান বা অন্য কোনো গানের অনুষ্ঠানের আটটি গানের অডিও শেষ হতে অনেক রাত হয়ে যেত।

আমি একদিন কামাল ভাইকে বললাম, যেহেতু অডিটরিয়ামে দিনের বেলায় অনুষ্ঠান ধারণ করা হয়, সকাল ১০টা থেকে বিকেল ৫টা পর্যন্ত। সেখানে বিকেল ৫টা থেকে রাত ১০টা পর্যন্ত অডিটরিয়ামে গানের অডিও ধারণ করা যেতে পারে। আর ফ্রান্সিসদাকে সেখানে বদলি করা হোক।

তারপর থেকে অডিটরিয়ামে অডিও ধারণ করা হতো। এই সিদ্ধান্তগুলো নিতে কামাল ভাই কখনো দ্বিধা করতেন না।

একজন পবিত্র আত্মার মানুষ কামাল ভাই যেখানেই থাকুন, আপনি ভালো থাকবেন। আল্লাহ আপনাকে জান্নাতবাসী করবেন, এই প্রার্থনা করি।

লেখকঃ সাবেক উপমহাপরিচালক, বাংলাদেশ টেলিভিশন। বর্তমানে কনসালট্যান্ট
ব্র্যাক ফিজো কার্যক্রম

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

Shares