মেজর ডালিম ও মেজর নুর ছিলেন তাজউদ্দিনের বিশেষ পরিচিত

মেজর ডালিম ও মেজর নুর ছিলেন তাজউদ্দিনের বিশেষ পরিচিত

সেনাবাহিনী থেকে বরখাস্ত হওয়ার পর মেজর ডালিম ও মেজর নুর ডালিমের কনিষ্ঠ ভাই জহিরুদ্দিন স্বপন বীর প্রতীকের সঙ্গে মিলে ব্যবসা শুরু করেন। পরবর্তীতে কর্নেল আকবর হোসেনের সঙ্গে মিলে এ তিনজন গড়ে তোলেন সান্স ইন্টারন্যাশনাল নামে একটি বাণিজ্যিক প্রতিষ্ঠান। কর্নেল আকবর তখন সবেমাত্র সেনাবাহিনী থেকে অবসর গ্রহণ করেছিলেন। ঠিক তখন মুজিব সরকার থেকে বাদ পড়া অর্থমন্ত্রী তাজউদ্দিন আহমদ খানের সঙ্গে মেজর ডালিমের যোগাযোগ হয়। তবে তাজউদ্দিনের জোষ্ঠ্য কন্যা শারমিন আহমদ উভয়ের মধ্যে অনুরূপ যোগাযোগের কথা অস্বীকার করলেও বি জেড খসরু ও এ এল খতিবের মতো লেখকরা সত্যি বলে সাক্ষ্য দিচ্ছেন। আওয়ামী লীগের প্রবীণ সদস্য ও সাবেক তথ্য প্রতিমন্ত্রী অধ্যাপক আবু সাইয়িদের বই পাঠ করলেও বুঝা যায় যে, তাজউদ্দিনের সঙ্গে মেজর ডালিমের আলাপ আলোচনা হতো। নিরপেক্ষ লেখকদের বর্ণনা অনুযায়ী মুক্তিযুদ্ধকালে তাজউদ্দিন আহমদের নীতির সঙ্গে মেজর ডালিম একমত হতে পারেননি। তবুও তার কিছু ব্যক্তিগত গুণের জন্য ডালিম তাকে সম্মান করতেন।

তাজউদ্দিনের সঙ্গে মেজর ডালিমের দ্বিতীয় বৈঠক হয়। এ বৈঠকে ভারত্-বাংলাদেশ সম্পর্ক নিয়ে আলোচনা হয়।মেজর ডালিম বৈঠকের  জের টেনে বলেন, বাংলাদেশের তিনটি জিনিস ভারত কখনো মেনে নিতে পারে না, ১. বাংলাদেশের স্বাধীন অর্থনীতি।২. বাংলাদেশের ইসলামী শাসন ব্যবস্থা।৩. বাংলাদেশ ও পশ্চিমবঙ্গের ঐক্য। এ ব্যাপারে তার মতামত জানতে চাইলে তাজউদ্দিন বলেন, ‘ভারত উপমহাদেশে তুলনামুলকভাবে একটি পরাশক্তি। সত্যকে পরিহার করলে বাংলাদেশের অস্বিত্বই বিপন্ন হবে। আমাদের বেঁচে থাকার জন্য ভারতের সঙ্গে একটা সৌহার্দপূর্ণ সম্পর্ক বজায় রাখতে হবে।’ উদাহরণস্বরূপ তিনি নেপালের কথা উল্লেখ করে বলেন, ‘নেপালের সঙ্গে অর্থনৈতিক ক্ষেত্রে ভারতের সম্পর্ক অত্যন্ত গভীর্। বহুলাংশে নেপাল অর্থনৈতিক বিষয়ে ভারতের ওপর নির্ভরশীল। তাই বলে নেপালের স্বাধীনতা ও সার্বভৌমত্বের ওপর তো ভারত হস্তক্ষেপ করেনি।’

জবাবে মেজর ডালিম বলেন, ‘নেপাল একটি হিন্দু রাষ্ট্র। আমার জানা মতে নেপালের আভ্যন্তরীণ রাজনীতিতে ভারতের প্রভাব অত্যন্ত প্রচন্ড। কিন্তু নেপাল ও বাংলাদেশ কি এক? বাংলাদেশ ১০ কোটি মুসলমানের দেশ। ১০ কোটি লোককে জাতীয়তাবাদী চেতনায় উদ্বুদ্ধ করে যে কোনো বহি:শক্তির আগ্রাসনের বিরুদ্ধে বাংলাদেশকে একটি দূর্ভেদ্য দূর্গে পরিণত করে গড়ে তোলা অবশ্যই সম্ভব এবং সে চেষ্টাই করা উচিত।’

বি জেড খসরু তার “দ্য বাংলাদেশ মিলিটারি ক্যু এন্ড দ্য সিআইএ লিঙ্ক” শিরোনামে বইয়ের ২০৩/২০৪ পৃষ্ঠায় লিখেছেন,

“… ১৯৭৪ সালের অক্টোবরে মন্ত্রিসভা থেকে তাজউদ্দিনকে বাদ দেয়ার খবর জানামাত্র মেজর ডালিম সেদিন সন্ধ্যায় তার সরকারি বাসভবনে দেখা করতে যান। তাজউদ্দিন বাড়ি ছেড়ে দেয়ার জন্য গোছগাছ করছিলেন। বাড়ির লনে বসেই মেজর ডালিমের সঙ্গে তার আলাপ হয়। আলাপ শেষে বেরিয়ে যাবার সময় তিনি হঠাৎকরে জানতে চাইলেন, ভবিষ্যতে যোগাযোগ করতে চাইলে মেজর ডালিম তার সঙ্গে দেখা করবেন কিনা। জবাবে মেজর ডালিম বললেন, তার তরফ থেকে কোনো বাধা নেই। ঠিক হলো যোগাযোগ হবে গোপনে।

একদিন মেজর ডালিম অফিসে বসা ছিলেন। হঠাৎ তার চাচা শ্বশুর প্রখ্যাত বুদ্ধিজীবী এবং পাকিস্তান আমলে দৈনিক পাকিস্তান টুডের (পরবর্তীতে বাংলাদেশ টুডে) মালিক সিরাজুল ইসলাম চৌধুরী এসে হাযির হন। সম্পর্কে সিরাজুল ইসলাম চৌধুরী এবং তাজউদ্দিন আহমদ ছিলেন ভায়রা ভাই। অপ্র্যাশিতভাবে তাকে দেখে সম্ভ্রমে উঠে দাঁড়িয়ে তাকে বসতে দিয়ে মেজর ডালিম জিজ্ঞেস করলেন, ‘কাকা, আপনি হঠাৎ কি মনে করে? খবর দিলে তো পারতেন। আমি নিজে গিয়ে দেখা করে আসতাম।’

‘বিশেষ প্রয়োজনে এসেছি। তাজউদ্দিন তোমার সঙ্গে জরুরিভাবে দেখা করতে চান।’

‘কোথায়?’ জানতে চান মেজর ডালিম।

‘তাঁতীবাজারে।’

‘লাঞ্চের পর আগামীকাল আমি আর নুর আসবো।’ বললেন মেজর ডালিম।

সিরাজুল ইসলাম চৌধুরী চলে যান। পরদিন সময়মতো গিয়ে পৌঁছতেই তিনি দেখতে পান যে, তাজউদ্দিন অপেক্ষা করছেন। মেজর ডালিম ও মেজর নুর দুজনই ছিলেন তাজউদ্দিনের বিশেষ পরিচিত। কুশলাদি বিনিময়ের পর দোতলার একটি নিভৃত কক্ষে তাদের বৈঠক শুরু হয়।

‘দেশের অবস্থা সম্পর্কে কি মনে করছেন?’ প্রশ্ন করেন তাজউদ্দিন।

‘যে দেশ বানিয়েছেন তার সম্পর্কে ভাবনার কি অন্ত আছে?’

‘দেশ তো আপনারাই স্বাধীন করেছেন।’

‘তাই নাকি? আমরা তো এভাবে দেশ স্বাধীন করতে চাইনি। তাতো আপনার চেয়ে বেশি আর কারো জানার কথা নয়।’ তাজউদ্দিন কোন কথা বলেননি।

মেজর ডালিম বললেন, ‘তাজউদ্দিন সাহেব, একাত্তরে আমাদের যুক্তিগুলোর সত্যতাই কি ক্র্মান্বয়ে এই বাংলাদেশে সত্যে পরিণত হচ্ছে না? যাক, অতীত নিয়ে আলোচনা না করে বলেন কেন ডেকে পাঠিয়েছেন।’ সরাসরি প্রশ্ন করেন মেজর ডালিম।

‘দেশটাকে বাঁচাতে হবে।’

‘অবশ্যই। তবে কি করে?’

‘সমাজতন্ত্রের মাধ্যমেই জনগণের মুক্তি আনা সম্ভব।’

‘এ বিষয়ে বিতর্ক আছে। সারাজীবন আপনারা বুর্জোয়া রাজনীতি করে এসে এখন সমাজতন্ত্র করবেন তা কি করে সম্ভব? আর জনগণই তা বিশ্বাস করবে কেন? আওয়ামী লীগ তো একটা বুর্জোয়া সংগঠন। শেখ মুজিব কেন, কেউই এ দলের মাধ্যমে প্রকৃত সমাজতন্ত্র প্রতিষ্ঠা করতে পারবেন না। আপনিও এ সত্য এতদিনে নিশ্চয়ই অনুধাবন করেছেন। আর সবচেয়ে বড় কথা হলো বাংলাদেশের জনগণের সামনে সমাজতন্ত্রের নামে আপনারা যে বিভীষিকা তুলে ধরেছেন তাতে আগামী ৫০ বছর পরও সমাজতন্ত্রের কথা শুনলে এদেশের লোক আৎকে উঠবে। আপনি বলুন আপনার রাজনৈতিক পরিকল্পনা কি? আপনি একজন সুশিক্ষিত, সৎ ব্যক্তি। আপনার রাজনৈতিক দর্শনের সঙ্গে একমত না হলেও এতটুকু আস্থা রাখতে পারেন যে, আমরা আপনাকে একজন ভালো মানুষ বলেই মনে করি। আর একটা কথা আপনাকে স্পষ্ট করে বলতে চাই, বাংলাদেশের স্বাধীনতা সংগ্রামে ভারত আমাদের জন্য যদি কিছু করে থাকে তবে সেটা তার স্বার্থেই সে করেছে। তবুও আমরা দেশটির প্রতি কৃতজ্ঞ থাকবো। কিন্তু ভারত এবং সোভিয়ে ইউনিয়ন কি করে আমাদের সহায়ক শক্তি হতে পারে? সেটা তো তাদের নিজস্ব স্বার্থের পরিপন্থী। তাদের প্রতি আপনি দূর্বল এ কথা সবাই জানে। এ ব্যাপারে আপনার কাছ থেকেই আপনার অভিমত আমরা জানতে চাই। আর সমাজতন্ত্রের দর্শন অনুযায়ী এটা কায়েম করা যায় শুধুমাত্র সর্বহারা দলের নেতৃত্বে। আপনার দল কোনটি তাও আমাদের জানা দরকার।’

গম্ভীরভাবে মেজর ডালিমের বক্তব্য শুনে যান তাজউদ্দিন আহমদ্। রাজনীতি নিয়ে এটাই ছিল তাদের প্রথম বিশদ আলোচনা।

‘রাজনীত নিয়ে আপনারা সবাই কি এতটা সচেতন?’

‘সবাই বলতে আপনি কি বুঝাচ্ছেন জানি না। তবে সেনাবাহিনীর একটি বৃহৎ অংশ রাজনৈতিকভাবে অবশ্যই সচেতন।’

‘জেনে খুব খুশি হলাম। I can see some silver shining over the dark clouds. সমাজতন্ত্রের নীতিতে আমি বিশ্বাসী। তবে সমাজতন্ত্রের বাস্তবায়ন পদ্ধতি সব দেশে সে দেশের বাস্তব পরিস্থিতির ওপর ভিত্তি করে বের করতে হয়। ভারত একটি ‘সমাজতান্ত্রিক’ দেশ্। তাদের দেশের অর্থনীতিতে সমাজতন্ত্রের যে প্রভাব তা অবশ্যই সোভিয়েত মডেলের না। গণতান্ত্রিক নীতিতে বিশ্বাসী দেশ ভারত নীতিগতভাবে আমাদের জাতীয় মুক্তিসংগ্রামে সাহায্য করেছে এবং সোভিয়েত ইউনিয়নের বেলায়ও এ কথাই বলা চলে। সারা পৃথিবীতে বিভিন্ন দেশের মুক্তিসংগ্রামকে এগিয়ে নিয়ে যেতে সোভিয়েত ইউনিয়ন সব রকম সাহায্য করে চলেছে। রুশ বিরোধিতার মূলে কাজ করছে সাম্প্রদায়িকতা ও সাম্রাজ্যবাদী শক্তি। তাদের এ চক্রান্ত কি দেশের জন্য কোনো মঙ্গল বয়ে আনবে?’

‘দেখেন স্যার, ভারত প্রকৃত অর্থে গণতান্ত্রিক দেশ নয়। গণতন্ত্রের নামাবলী গায়ে চড়িয়ে সেখানে গত ২৫ বছর ধরে চলেছে এক পার্টির তথা এক পরিবারের শাসন। শ্রীমতি ইন্দিরা গান্ধী অখন্ড ভারত কায়েমে পাকিস্তানকে দ্বিখন্ডিত করার পূর্ণ সুযোগ গ্রহণ করেছেন।অনেকেই তাকে সমর্থন করেছেন। কিন্তু আজ কিছুতেই বাংলাদেশ একটি স্বাধীন স্বনির্ভর দেশ হিসেবে viable হয়ে উঠুক তা ভারতের কেন্দ্রীয় সরকার কোনমতেই সমর্থন করতে পারে না। পরিবর্তে তারা চেষ্টা করবে আমাদের অর্থনীতিকে ভারতের অর্থনীতির সঙ্গে আষ্টেপৃষ্ঠে জড়িয়ে আমাদের ওপর তাদের রাজনৈতিক নিয়ন্ত্রণ নিশ্চিত করতে। মানে আমাদের অবস্থা হতে হবে ভুটান বা সিকিমের মতো। এতে করে ভারতের অভ্যন্তরে কেন্দ্রীয় শোষণের বিরুদ্ধে বিভিন্ন অঞ্চলে যেসব জাতীয়তাবাদী আন্দোলনের অঙ্গার আজ জ্বলে উঠেছে তাদের চোখে আঙ্গুল দিয়ে দেখিয়ে দেয়া যাবে যে, স্বাধীন স্বত্তা হিসেবে ভারত থেকে বিচ্ছিন্ন হয়ে উপমহাদেশের কোনো জাতির পক্ষেই আজ স্বতন্ত্রভাবে বেঁচে থাকা সম্ভব নয়। ভারতের আজ্ঞাধীন হয়েই তাদের বেঁচে থাকতে হবে।’

মেজর ডালিমের বক্তব্য শুনে তাজউদ্দিন বললেন, ‘ভবিষ্যতে এ বিষযে আরো আলোচনা হওয়া প্রয়োজন্’। তার রাজনৈতিক দল হিসেবে জাসদের প্রতি ইঙ্গিত করেন তিনি। জবাবে মেজর ডালিম বললেন, ‘জাসদ অবশ্যই আজ সরকার বিরোধী সংগ্রামে অগ্রণী ভুমিকায় আছে। তারা বৈজ্ঞানিক সমাজতন্ত্রের কথাও বলছে। কিন্তু আওয়ামী লীগ থেকে হঠাৎ করে বেরিয়ে আসা এ দল সৃষ্টিকারীরা সত্যিই কি সমাজতন্ত্রী? তাদের নেতৃত্বের প্রায় সবারই আগমন ঘটেছে বুর্জোয়া কিংবা পেটি বুর্জোয়া শ্রেণী থেকে। কতটুকু তারা নিজেদের শ্রেণীহীন করে তুলতে সক্ষম হয়েছে তা ভবিষ্যতই বলতে পারবে। ঠিক এ মুহুর্তে জাসদকে একটি সর্বহারার দল হিসেবে চিহ্নিত করার কোনো যুক্তিসঙ্গত কারণ নেই।’

এভাবেই তাজউদ্দিনের সঙ্গে সেদিন মেজর ডালিমের বৈঠক শেষ হয়। ভবিষ্যতে আবার আলোচনায় বসার আগ্রহ প্রকাশ করে তিনি বেরিয়ে আসেন।

মেজর ডালিম জানতেন যে, তত্ত্বগত দিক থেকে জাসদ নেতৃবৃন্দের একটি অংশ সোভিয়েত ইউনিয়নকে সমাজতান্ত্রিক এবং ভারতকে একটি গণতান্ত্রিক দেশ বলে মনে করে। তাদের ধারণা অনেকটা ছিল তাজউদ্দিনের মতোই। কিন্তু জাসদের সাধারণ সদস্যদের বৃহৎ অংশ ছিল ভারত বিরোধী। নেতৃবৃন্দের মধ্যেও ভারত নীতি নিয়ে দ্বিমত ছিল। সেদিন জাসদের সঙ্গে তাজউদ্দিনের সম্পর্কের কথা জানতে পেরে একটি প্রশ্ন মেজর ডালিমের মনকে নাড়া দেয়। তবে কি জাসদ সত্যিই ভারতের ‘বি টিম?’ তা না হলে কোন যুক্তিতে জাসদ তাজউদ্দিনের নেতৃত্ব মেনে নেয়?

এ প্রশ্নের জবাব খুঁজে পেতে একদিন মেজর ডালিম নারায়ণগঞ্জে কর্নেল তাহেরের বাসায় গিয়ে উপস্থিত হন। তার সঙ্গে বিভিন্ন বিষয় নিয়ে আলাপ করার ফাঁকে মেজর ডালিম জেনে নেয়ার চেষ্টা করেন তাজউদ্দিনের সঙ্গে জাসদের সম্পর্ক কি। কর্নেল তাহের ব্যক্তিগতভাবে জানান যে, তাজউদ্দিনের সঙ্গে জাসদের কোনো সম্পর্ক নেই। এতে মেজর ডালিমের সন্দেহ আরো ঘোলাটে হয়ে ওঠে। তিনি ধারণা করেছিলেন যে, হয়তো কর্নেল তাহের এ সম্পর্কে কিছু জানেন না। কিংবা জাসদের হাইকমান্ডের সঙ্গে কোন বিশেষ গোপন মাধ্যমে তাজউদ্দিন যোগাযোগ রক্ষা করে চলেছেন। যা জাসদ নেতৃবৃন্দের অনেকের কাছ থেকে গোপন রাখা হয়েছে। সেনাপরিষদের আরেকজন সদস্য জাসদের শাজাহান সিরাজের কাছে এ বিষয়ে জানতে চায়। শাজাহান সিরাজও একই জবাব দিয়েছিলেন যে, জাসদের সঙ্গে তাজউদ্দিনের পার্টিগত কোন সম্পর্ক নেই।

কয়েকদিন পর তাজউদ্দিনের সঙ্গে মেজর ডালিমের দ্বিতীয় বৈঠক হয়। এ বৈঠকে ভারত্-বাংলাদেশ সম্পর্ক নিয়ে আলোচনা হয়।

মেজর ডালিম বৈঠকের জের টেনে বলেন, বাংলাদেশের তিনটি জিনিস ভারত কখনো মেনে নিতে পারে না,

১. বাংলাদেশের স্বাধীন অর্থনীতি।
২. বাংলাদেশের ইসলামী শাসন ব্যবস্থা।
৩. বাংলাদেশ ও পশ্চিমবঙ্গের ঐক্য।

এ ব্যাপারে তার মতামত জানতে চাইলে তাজউদ্দিন বল্ন, ‘ভারত উপমহাদেশে তুলনামুলকভাবে একটি পরাশক্তি। সত্যকে পরিহার করলে বাংলাদেশের অস্বিত্বই বিপন্ন হবে। আমাদের বেঁচে থাকার জন্য ভারতের সঙ্গে একটা সৌহার্দপূর্ণ সম্পর্ক বজায় রাখতে হবে।’

উদাহরণস্বরূপ তিনি নেপালের কথা উল্লেখ করে বলেন, ‘নেপালের সঙ্গে অর্থনৈতিক ক্ষেত্রে ভারতের সম্পর্ক অত্যন্ত গভীর্। বহুলাংশে নেপাল অর্থনৈতিক বিষয়ে ভারতের ওপর নির্ভরশীল। তাই বলে নেপালের স্বাধীনতা ও সার্বভৌমত্বের ওপর তো ভারত হস্তক্ষেপ করেনি।’

জবাবে মেজর ডালিম বলেন, ‘নেপাল একটি হিন্দু রাষ্ট্র। আমার জানা মতে নেপালের আভ্যন্তরীণ রাজনীতিতে ভারতের প্রভাব অত্যন্ত প্রচন্ড। কিন্তু নেপাল ও বাংলাদেশ কি এক? বাংলাদেশ ১০ কোটি মুসলমানের দেশ। ১০ কোটি লোককে জাতীয়তাবাদী চেতনায় উদ্বুদ্ধ করে যে কোনো বহি:শক্তির আগ্রাসনের বিরুদ্ধে বাংলাদেশকে একটি দূর্ভেদ্য দূর্গে পরিণত করে গড়ে তোলা অবশ্যই সম্ভব এবং সে চেষ্টাই করা উচিত।’

জবাবে তাজউদ্দিন কিছু বলেননি। তার সঙ্গে দুদিনের আলোচনায় মেজর ডালিম একটা জিনিস পরিষ্কার বুঝতে পারেন যে, ভারত সম্পর্কে তার একটা বিশেষ দূর্বলতা কিংবা বাধ্যবাধকতা রয়েছে যার বাইরে তিনি যেতে পারছেন না। এই দূর্বলতা কিংবা বাধ্যবাধকতা সম্পর্কে তাজউদ্দিন কখনো কাউকে কিছু বলেননি। পরবর্তী বৈঠকগুলোতে মেজর ডালিম ভারত প্রসঙ্গ উত্থাপন করে তাকে আর বিব্রত করেননি॥”

– সাহাদাত হোসেন খান (সাংবাদিক) / স্বাধীনতা উত্তর ট্র্যাজেডি : মুজিব থেকে জিয়া ॥ [ আফসার ব্রাদার্স – ফেব্রুয়ারি, ২০১৬ । পৃ: ১২৬-১৩১]

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *