মুজিব হত্যার পূর্বাপর

মুজিব হত্যার পূর্বাপর

“… সৈয়দ নজরুল ইসলাম্, তাজউদ্দিন আহমদ, ক্যাপ্টেন মনসুর আলী, এ. এইচ. এম কামরুজ্জামান, এই লেখক শেখ আবদুল আজিজ ও আবদুস সামাদ আজাদ এ ৬ জনকে ১৯৭৫ সালের ২৩ আগস্ট এক সাথে গ্রেফতার করে পল্টনে কন্ট্রোল রুমে একটি ভাঙা বাড়িতে নেয়া হয়। আমরা বসা অবস্থায় বঙ্গবন্ধুর ভগ্নিপতি সৈয়দ আহমদ তাকে মুক্তি দেয়ার জন্য জনৈক কর্নেল ফারুককে অনুরোধ করেছিলেন। কর্নেল ফারুক উত্তরে বলেছিলেন, আপনাদের সবার ট্রায়াল এখানে হবে। You will be tried first. আমাদের উদ্দেশ্য করে বলা হয়েছিল – You will have to justify your corruption. এ কথা শুনে আমরা স্তব্ধ হয়ে গিয়েছিলাম। ভাবলাম, এটা কোর্ট না, আদালত না, কিভাবে এখানে বিচার হবে? এই পরিস্থিতিতে আমাদের মধ্যে পরস্পরের কথা বন্ধ হয়ে গিয়েছিল।

ইতিমধ্যে মেজর ডালিম এসে এইচ. এম. কামরুজ্জামানের সাথে আস্তে আস্তে কথা বলতে লাগল। কামরুজ্জামান ডালিমকে বলেছিল, “এ রকম তো কথা ছিল না”? তারপর ডালিম চলে গেল। জ্ঞানী পাঠক এ কথা দ্বারা একটা সিদ্ধান্তে পৌঁছতে পারেন॥”

– শেখ আবদুল আজিজ (আওয়ামী লীগের প্রতিষ্ঠাতা সদস্য এবং মন্ত্রী) / রাজনীতির সেকাল ও একাল॥ [ দি স্কাই পাবলিশার্স – ফেব্রুয়ারী২০০৯পৃ৩৭৮ ]

অপরদিকে রুশ-ভারত চক্র নিশ্চেষ্ট বসে ছিল না ওয়াকিবহাল মহলের মতে, এই চক্রটিও ১৫ আগষ্ট (১৯৭৫) শেখ মুজিবুর রহমান-এর পরিকল্পিত ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে সম্বর্ধনা অনুষ্ঠান চলাকালে তাকে হত্যা করে তার স্থলে যুবলীগ  প্রধান শেখ ফজলুল হক মণিকে ক্ষমতায় অধিষ্ঠিত করার নীলনক্সা তৈরী করেছিল।তাদের এই পরিকল্পনার কথা মার্কিনী মহল পূর্বাহ্নেই জেনে যায়।সে কারণে তারা অতিসঙ্গোপনে শেখ মুজিব ও অন্যান্যের হত্যা পরিকল্পনা  ১৪ আগস্ট দিবাগত রাতে বাস্তবায়িত করে।

#০২ 

“… জনাব এ. এইচ. এম কামরুজ্জামান সাহেবের সরকারি বাসভবনে প্রায়ই জলসা বসে। ১৯৭৫ সন। ১৪ই আগস্ট। রাত। সেদিনও তার বাসায় সঙ্গীতের আসর। অনেক রাত হলো। আসর জমে উঠল। এমন সময় মেজর (অব:) ডালিম ঘরে ঢুকল। বলল জরুরি কথা আছে। কামরুজ্জামান সাহেব তখন গানের সুরে জমে আছেন। বলল, রাখ তোর জরুরি কথা। ডালিমের কথায় পাত্তা দিলেন না কামরুজ্জামান সাহেব। বললেন, সকালে আসিস॥”

 অধ্যাপক আবু সাইয়িদ (আওয়ামী লীগ নেতা ও সাবেক তথ্য প্রতিমন্ত্রী) / ফ্যাক্টস এন্ড ডকুমেন্টস : বঙ্গবন্ধু হত্যাকান্ড॥ [ চারুলিপি – জুলাই২০১০পৃ১১৪ ]

#০৩  

“… অপরদিকে রুশ-ভারত চক্র নিশ্চেষ্ট বসে ছিল না। ওয়াকিবহাল মহলের মতে, এই চক্রটিও ১৫ আগষ্ট (১৯৭৫) শেখ মুজিবুর রহমান-এর পরিকল্পিত ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে সম্বর্ধনা অনুষ্ঠান চলাকালে তাকে হত্যা করে তার স্থলে যুবলীগ প্রধান শেখ ফজলুল হক মণিকে ক্ষমতায় অধিষ্ঠিত করার নীলনক্সা তৈরী করেছিল। তাদের এই পরিকল্পনার কথা মার্কিনী মহল পূর্বাহ্নেই জেনে যায়। সে কারণে তারা অতিসঙ্গোপনে শেখ মুজিব ও অন্যান্যের হত্যা পরিকল্পনা ১৪ আগস্ট দিবাগত রাতে বাস্তবায়িত করে।

এখানে উল্লেখযোগ্য যে, একাত্তরের মুক্তিযুদ্ধকালীন প্রবাসী বাংলাদেশ সরকারের প্রধানমন্ত্রী ও মুজিব সরকারের অর্থমন্ত্রী তাজউদ্দিন আহমদকে শেখ মুজিব কর্তৃক ১৯৭৪ সালে মন্ত্রিপরিষদ থেকে অপসারণের পর রুশ-ভারত মহলের নেতৃত্ব তাজউদ্দিনের স্থলে ছাত্রলীগ নেতা ও পরে যুবলীগ নেতা এবং শেখ মুজিবের আপন ভাগ্নে শেখ ফজলুল হক মণির উপর অর্পিত হয়॥”

– সিরাজুল হোসেন খান ( প্রখ্যাত সাংবাদিক এবং শ্রমিকনেতাসাবেকমন্ত্রী ) / উপমহাদেশের সামাজিক– রাজনৈতিক ইতিবৃত্ত॥ [ঝিনুকপ্রকাশ – ফেব্রুয়ারী২০০২পৃ২০০২০২]

#০৪ 

“… তবে হেনা ভাই (মন্ত্রী এ এইচ এম কামরুজ্জামান) আমাকে জানান বঙ্গবন্ধু হত্যার আগে হেনা ভাইয়ের তিন নম্বর রোডের (ধানমন্ডি) বাসায় ডালিম তার সাথে দেখা করতে গিয়েছিল। ডালিম তাকে ডেকেছে। হেনা ভাই নামেননি। হেনা ভাই বললেন, ডালিম আমার সাথে আগেও যোগাযোগ করেছিল এবং প্রস্তাবও নিয়ে এসেছিল। তাই জানতাম, সে কি কথা বলতে এসেছিল। তাই দরজা খুলিনি। হেনা ভাই আমাকে বললেন, ডালিমরা জানিয়েছিল এ রকম একটা ঘটনা ঘটবে। বঙ্গবন্ধুকে খুন করা হবে তা বলেনি – তবে তাকে বাসা থেকে নিয়ে যাবে এবং আবার হেনা ভাইয়ের নেতৃত্বে পাওয়ার নেয়া হবে। হেনা ভাই আমাকে বললেন, ‘আমি তাতে তখন রাজী হইনি। ১৪ই আগস্ট তারিখে তাই নিচে নামিনি। ডালিম পরে গালাগালি করে চলে যায়।’

১৩ কিংবা ১৪ই আগস্ট ১৯৭৫ তারিখেই সৈয়দ নজরুল ইসলাম সাহেবের বাসায় যাই। উনি ভাইস প্রেসিডেন্ট পুরাতন গণভবনে থাকেন। তখন সন্ধ্যা হয়েছে। আমি দেখি উনি পাঞ্জাবী পরে পায়চারী করছেন। সালাম দিলাম। কোন উত্তর দিলেন না। খুব গম্ভীর। উনিতো এমনি একটু কম শুনতেন।

তিনি খুব লার্নড লোক ছিলেন, কিন্তু শেষের দিকে খুব মন খারাপ করে অভিমান করে থাকতেন। তার কারণ আর একদিন সময় করে বলব। যখনই তিনি দেখলেন বঙ্গবন্ধু কারও প্রভাবে এমন একটা পথে গেছেন, যে পথ আমাদের কারও জন্য ভাল ও কল্যাণ বয়ে আনবে না, তখনই তিনি অভিমান করে দূরে সরে থাকতেন। সেটা আরও খারাপ হলো আমাদের জন্য। বঙ্গবন্ধুর অন্তরের বন্ধু প্রকৃত পক্ষে সৈয়দ সাহেব ছিলেন। সৈয়দ নজরুল সাহেব কি ভাবছেন? কি করছেন? প্রশ্নের জবাবে বললাম, স্যার কি হয়েছে?

তিনি বললেন, ‘কী হতে বাকি আছে? আমাদের পায়ের তলায় মাটি নেই – নিজেদের ঘর সামলাতে পার না, আমরা আবার কথা বলি।’ তখন বুঝলাম উনি তো খুব রেগে আছেন। কারণ জানি না। চিন্তা করার জন্য বললাম, ‘স্যার উপরে চলুন, চা খাব।’ উপরে গেলাম। দুই জনে উপরে এক ঘরে বসলাম।

‘এই দেখেন আমি আপনাকে বলি নাই আমাদের সর্বনাশ হয়ে যাবে? দিনের পর দিন কি হচ্ছে? কেউ কথা শুনে না আমার, কারও কথা শুনে না। এখন কি অবস্থা হবে?’

আমি বললাম, কি হয়েছে? কী হবে?

নজরুল সাহেব বললেন, ‘পায়ের তলায় মাটি আছে?’ আমি বললাম, ‘স্যার কার কথা বলছেন আপনি?’ সৈয়দ সাহেব বললেন, ‘কার আবার?’ বঙ্গবন্ধুর কথা বলছেন। আমি বললাম, ‘কেন? কি হয়েছে?’ বললেন, ‘যা দেখছি এতো ভালো মনে হচ্ছে না। আমার কাছে লোক আসছিল। আমার কাছে পাওয়ার দেবার প্রস্তাব নিয়ে আসছিল। কেন? কামরুজ্জামান হেনা সাহেবও ঐ দিন আমাকে বলেছিলেন আজও উনি আমাদের নেতা। ওনাকে দিয়ে চলবে না। ক্ষমতা আমাকে নিতে হবে। এটা কেমন কথা। উনিতো আমার সঙ্গে আলাপ করতে চান না।’

আমি বললাম, ‘আপনি ৩২ নম্বর যান। সেখানে গিয়ে বঙ্গবন্ধুর সাথে কথা বলেন। দেখেন কী করতে পারেন।’ 

সৈয়দ সাহেব বললেন, ‘না। তিনি যখন সব কথা খুলে বলতে চান না, তখন আর কী করব।’

তখন আমি বললাম, ‘তাহলেতো চলবে না। আপনার জন্য আপনি না যান, দেশের জন্য, আমাদের জন্য যান। আজকে যাবেন।’ তিনি বললেন, ‘না।’

তারপর ঠিক হলো পরদিন উনি যাবেন। সে সুযোগ মনে হয় আর হয়নি। হেনা ভাই আর সৈয়দ সাহেবের কথায় মনে হয় খন্দকার মোশতাক সাহেব ছাড়াও অন্য যে কাউকে দিয়ে তারা টেক ওভার করে ফেলতো॥”

[ একান্ত সাক্ষাৎকারে বাকশাল ও মোশতাক মন্ত্রীসভায় মন্ত্রী অধ্যাপক ইউসুফ আলী ]

তথ্যসূত্রঅধ্যাপক আবু সাইয়িদ (আওয়ামী লীগ নেতা ও সাবেক তথ্য প্রতিমন্ত্রী) / ফ্যাক্টস এন্ড ডকুমেন্টস : বঙ্গবন্ধু হত্যাকান্ড॥ [ চারুলিপি – জুলাই২০১০পৃ২৮৬২৮৮ ]

#০৫ 

“… ১৯৭৫ সালের ৪ঠা ও ৫ই নভেম্বর আলম ( আতিকুল আলম। ১৯৭১ সালে রয়টার্স ও বিবিসির স্থানীয় সংবাদদাতা) স্থানীয় কূটনৈতিক মহলের সঙ্গে যোগাযোগ করে একটি তথাকথিত গোপনীয় চিঠি প্রদর্শন করে। চিঠিখানি ঢাকা কেন্দ্রীয় কারাগার থেকে তাজউদ্দিন আহমদ লিখেছেন বলে সে দাবী করে। ঢাকায় নিয়োজিত ভারতীয় হাই কমিশনার সমর সেনের নিকট লিখিত এই চিঠিতে নাকি ক্যু অনুষ্ঠানের পরিকল্পনা এবং এ সম্পর্কিত আয়োজনের কথা উল্লেখ করা হয়। জার্মান দূতাবাসের কূটনৈতিক অফিসারদের চিঠিখানি দেখিয়ে আলম অবিচলিতভাবে দাবী করে, তাজউদ্দিনের স্বহস্তে লিখিত এই চিঠি, খালেদ মোশাররফ কর্তৃক অনুষ্ঠিত ক্যু’র সঙ্গে ভারতীয় কর্তৃপক্ষ জড়িত বলে প্রমাণ করে। বিদেশী কূটনৈতিক অফিসারদের আলম বলে ভারত-সমর্থক তাজউদ্দিন আহমদকে জেল থেকে বের করে প্রেসিডেন্ট পদে প্রতিষ্ঠা করাই এই ক্যু’র উদ্দেশ্য। আলম কর্তৃক এই চিঠি প্রদর্শনের ফলে ক্যু’র সঙ্গে ভারতীয় গোয়েন্দা বিভাগ জড়িত বলে দূতাবাস এলাকায় গুজব ছড়িয়ে পড়ে॥” (মূল: অসমাপ্ত বিপ্লব / লরেন্স লিফশুলৎস)

 আবদুল মতিন বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিব : কয়েকটি প্রাসঙ্গিক বিষয়॥ [ ্যাডিক্যাল এশিয়া পাবলিকেশনস – ফেব্রুয়ারী১৯৯৩পৃ২৪৭২৪৮]

#০৬ 

“… প্রধানমন্ত্রী সেদিন যশোহর ক্যান্টনমেন্টে সেনাবাহিনী পরিদর্শন করে এসেছেন। উৎপাদনশীল কাজে সেনাবাহিনীর ভূমিকা নিয়ে বক্তব্য রেখেছেন। তাদের দ্বিতীয় বিপ্লবের ক্যাডার হওয়ার উপদেশ দিয়ে এসেছেন। তিনি বেশ ক্লান্ত ছিলেন। আমার এই রিপোর্ট ( কলকাতায় ডালিমের সাথে জর্জ গ্রিফিনের সাক্ষাৎ) শোনার পর তিনি স্প্রীং এর মতো চেয়ার থেকে লাফিয়ে উঠলেন। আমার হাত ধরে লনে নিয়ে এলেন। জিগ্গেস করাতে বলেছিলাম, খন্দকার মোশতাকের নেতৃত্বে ক্যু সংগঠিত হবে। তিনি নির্বাক হয়ে গেলেন। 

বহুক্ষণ পায়চারী করার পর তিনি বললেন : ক্যু করলে মোশতাক করবে না – করবে তাজউদ্দিন॥”

– ফ্যাক্টস এন্ড ডকুমেন্টস : বঙ্গবন্ধু হত্যাকান্ড / অধ্যাপক আবু সাইয়িদ (আওয়ামী লীগনেতা ও সাবেক তথ্য প্রতিমন্ত্রী) ॥ [ চারুলিপি – জুলাই২০১০পৃ১১০ ]

#০৭ 

“… পয়লা নভেম্বর একটি মন্ত্রিসভায় খোন্দকার মোশতাক আহমেদ সভাপতিত্ব করেন। কিন্তু ঐ মন্ত্রিসভার কোন সিদ্ধান্ত কোথাও প্রকাশ পায়নি। পরে জানা যায়, ব্রিগেডিয়ার খালেদ মোশাররফের পরিকল্পনা ছিল যে, তারা খোন্দকার মোশতাক আহমদকে দিয়ে একটা ঘোষণা জারি করবেন, যার বলে পরে ঢাকা কেন্দ্রীয় কারাগারে বন্দী দশা থেকে মুক্ত করে নিয়ে এসে মুজিব আমলের ভাইস প্রেসিডেন্ট সৈয়দ নজরুল ইসলামকে প্রেসিডেন্ট, এম. মনসুর আলীকে ভাইস প্রেসিডেন্ট, তাজউদ্দিন আহমদকে প্রধানমন্ত্রী এবং এ এইচ এম কামরুজ্জামানকে স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী করে সংসদীয় পদ্ধতিতে একটি সর্বদলীয় সরকার গঠণের সূচনা করবেন।

এ ধরণের একটি ঘোষণায় স্বাক্ষরদান করতে অস্বীকার করলে অন্য আরেকজন ব্রিগেডিযার খন্দকার মোশতাককে গুলি করতে উদ্যত হন। তখন বঙ্গভবনে ঘটনাস্থলে উপস্থিত মুক্তিযুদ্ধের সর্বাধিনায়ক ও সাবেক মন্ত্রী জেনারেল ওসমানী অবস্থা নিয়ন্ত্রণে আনেন এবং সবাইকে শান্ত করেন।

বঙ্গভবনে যখন এমনি এক টলটলায়মান উত্তপ্ত অবস্থা চলছে তখন এবং যখন শেখ মুজিবুর রহমানকে হত্যাকারী সেনাবাহিনীর অংশের কাছে স্পষ্ট হয়ে উঠে যে, সৈয়দ নজরুল, তাজউদ্দিন আহমদ প্রমুখ দুই-একদিনের মধ্যেই ক্ষমতা গ্রহণ করবেন এবং আওয়ামী বাকশালী রাজত্ব পুন্:প্র্তিষ্ঠা হবে, তখন তারা বলপূর্বক ঢাকা কেন্দ্রীয় কারাগারে প্রবেশ করে উপরোক্ত চারজন আওয়ামী লীগ নেতাকে ২ নভেম্বর দিবাগত রাতে ৩ নভেম্বর হত্যা করে॥”

– সিরাজুল হোসেন খান ( প্রখ্যাত সাংবাদিক এবং শ্রমিকনেতাসাবেকমন্ত্রী ) / উপমহাদেশের সামাজিক– রাজনৈতিক ইতিবৃত্ত॥ [ঝিনুকপ্রকাশ – ফেব্রুয়ারী২০০২পৃ২০০২০২]

#০৮  

“… একি কথা শুনি আজ মন্থরার মুখে! শহীদ সোহরাওয়ার্দীর হাতে গড়া, তার উত্তরসূরি এবং ভাবশিষ্য শেখ মুজিবের কন্ঠে আজ একি শুনছি! সারাজীবন গণতন্ত্রের পথে চলতে চলতে আজ তার একি মতিচ্ছন্ন, না অন্যকিছু? বলা হল বহুদলীয় নয়, একদ্লীয় গণতন্ত্রই উত্তম ব্যবস্থা। আশ্চর্য হয়ে ভাবতে হয়, গণতন্ত্র অর্থই যেখানে শত ফুল ফুটতে দাও, গণতন্ত্রের আদি বক্তব্য যেখানে বহু মত, বহুতর পথ এবং বহুধা দলের অস্তিত্ব অবশ্যই থাকতে হবে, সেখানে একদলীয় প্রথাকে গণতন্ত্র বলা হচ্ছে। চোখ নেই ছেলের নাম পদ্মলোচন।

তিনি এই আজব গণতন্ত্রের ধ্যান-ধারণা কোথা থেকে পেলেন তিনিই জানেন। কিন্তু সকলকেই ধরে ধরে একদলীয় ব্যবস্থার সপক্ষে যুক্তি দেখাতে থাকলেন। আর দলও আমাদের তথৈবচ। নেতা যদি বলেন, এখানে হাঁটু জল, আমরা বলি গভীর জল। নেতা যদি বলেন কোথায় জল? আমরা প্রতিধ্বনি করি, সত্যিই তো এত দেখছি একেবারে শুকনো খটখটে!

… কামরুজ্জামান ভাই, ইউসুফ আলী সাহেব, সোহরাব হোসেন, ওবায়েদ, মঞ্জুর, আমি – আমরা সকলে একত্রে সৈয়দ নজরুল ইসলাম সাহেবের সঙ্গে দেখা করলাম। তাকে সাধ্যানুসারে বুঝাবার চেষ্টা করলাম – নেতা বিভ্রান্ত হয়ে ভুল পদক্ষেপ নিতে যাচ্ছেন, তাকে সামলানো প্রয়োজন। তিনি আমাদের সঙ্গে সম্পূর্ণ একমত হলেন এবং নেতাকে বুঝাবার দায়িত্ব নিলেন। কিন্তু অবস্থা যা দাঁড়াল তাতে তিনি কিছু করেছেন বা করতে পেরেছেন বলে মনে হল না।

জনাব তাজউদ্দীন সাহেবকে ইতিপূর্বে মন্ত্রিসভা থেকে বাদ দেওয়া হয়েছে। ভিতরের কারণ জানি না, কিন্তু স্বাধীনতা যুদ্ধের সফল সংগঠক, মুক্তিযুদ্ধ চলাকালীন বাংলাদেশের অন্তর্বর্তীকালীন সরকারের প্রধানমন্ত্রী, যিনি যোগ্যতার সঙ্গে সে যুদ্ধ পরিচালনায় সমর্থ হয়েছিলেন, তার বিদায়ে প্রায় সকলেই স্তম্ভিত হলেও বোধগম্য কারণেই কোন প্রতিবাদ উচ্চারিত হয়নি। এরও পূর্বে এক চিত্রনায়িকাকে কেন্দ্র করে কিছু অভিযোগের কারণে সেদিনের তথ্যমন্ত্রী মিজানুর রহমান চৌধুরীকেও ক্যাবিনেট থেকে বাদ দেওয়া হয়েছিল। মিজান সাহেবের সঙ্গে আমাদের সম্পর্ক ছিল নিবিড়। তার বিদায়ে ক্রুদ্ধ হয়ে নেতাকে গিয়ে ধরতেই তিনি কিছু আলোকচিত্র দেখিয়েছিলেন। সেসব ছবি দেখার পর মিজান সাহেবের পক্ষে আর কথা বলার মুখ রইল না। কিন্তু তাজউদ্দীন সাহেবের বিষয় ভিন্ন। তার অবদান অনস্বীকার্য এবং বাহ্যিক দোষারোপও কেউ প্রত্যক্ষ করেনি। তার কাছে গেলে তিনি বিরূপ মনোভাব নিয়ে মন্তব্য করলেন – ‘করতে দিন। যত তাড়াতাড়ি করবে তত তাড়াতাড়ি শেষ হয়ে যাবে’।

আমরা তার কথায় অবাক বিস্ময়ে তাকিয়ে রইলাম। তিনি কি ইঙ্গিত করলেন॥”

– শাহ মোয়াজ্জেম হোসেন (মুজিব সরকারের চীফ হুইপ) / বলেছি বলছি বলব॥ [অনন্যা – সেপ্টেম্বর২০০২পৃ১৩৭২৩৯]

#০৯  

“… ১৯৭৯ সালের ১৮ই ডিসেম্বর পূর্ব লন্ডনের “নাজ” সিনেমায় এক জনসমাবেশে বক্তৃতাদানকালে বাংলাদেশ জাতীয় জনতা পার্টির নেতা জেনারেল ওসমানীকে প্রশ্ন করা হয়, – ‘আপনি বঙ্গবন্ধু ও তার পরিবার পরিজনকে নৃশংসভাবে হত্যার প্রতিবাদ করলেন না কেন? বিচার চাইলেন না কেন?’ উত্তরে তিনি বলেন, – ‘বঙ্গবন্ধু হত্যাকান্ডের বিচার চাইতে গেলে তার আগের ও পরের সব হত্যাকান্ডের বিচার চাইতে হয়।’

আরো কয়েকটি প্রশ্নের উত্তর এড়িয়ে যাওয়ার পর তাকে প্রশ্ন করা হয়, – ‘আপনি কি বঙ্গবন্ধুকে জাতির পিতা হিসাবে মানেন?’ উত্তরে তিনি বলেন, – ‘বি.ডি হাবিবুল্লা তার বইতে লিখেছেন, ফজলুল হক জাতির পিতা। আপনারা কয়জন জাতির পিতা চান?’ (সাপ্তাহিক বাংলার ডাক, লন্ডন, ২৬শে ডিসেম্বর, ১৯৭৯)॥”

– আবদুল মতিনবঙ্গবন্ধু শেখ মুজিব : কয়েকটি প্রাসঙ্গিক বিষয়॥ [ ্যাডিক্যাল এশিয়া পাবলিকেশনস – ফেব্রুয়ারী১৯৯৩

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

Shares