ভারতীয় কুটনীতিক বিশ্বাস করেছিলেন মুজিব নিহত হতে যাচ্ছেন

ভারতীয় কুটনীতিক বিশ্বাস করেছিলেন মুজিব নিহত হতে যাচ্ছেন

অভ্যুত্থানের কিছু সময় পর ঢাকা থেকে প্রকাশিত দৈনিক ইত্তেফাকের তরুণ সম্পাদক আনোয়ার হোসেন মঞ্জু বলেন, “ এই অভ্যুত্থান আমাকে মোটেও অবাক করেনি। কুটনৈতিক মহলে বেশ কিছু দিন ধরে এ নিয়ে গুঞ্জন ছিলো। জুলাই মাসে একজন কুটনীতিক আমার কাছে জানতে চেয়েছিলেন আসন্ন অভ্যুত্থানটি কারা করবে, কট্টর ডানপন্থিরা না কট্টর বামপন্থীরা।

কট্টর ডান বা বাম গোষ্টির মধ্য থেকে ছাড়া আর কারও অভ্যুত্থান করার সম্ভাবনা ছিলো না।

কি কারণে ভারতীয় কুটনীতিক ভেবেছিলেন যে মুজিবকে হত্যা করা হয়েছে, এমনকি রেডিওতে মৃত্যু সংবাদটি শোনার আগেই? যখন এই কুটনীতিককে  এই প্রশ্ন  করা হয়, তখন তিনি জবাব দেন,” তখন খুব একটা উত্তেজনাকর  অবস্থা ছিল, সাধারণ্যে এমন একটা অনুভূতি  কাজ করেছিল যে ভয়ঙ্কর কিছু একটা ঘটতে যাচ্ছে। ”অল্প একটু থেমে তিনি যোগ করেন” বাংলা বর্ষপঞ্জি বাংলাদেশের নেতার ভবিষ্যতবাণী করেছিল।” হয়তো জ্যেতিষ শাস্ত্রের ভবিষ্যতবাণীর কারণে এই কুটনীতিক বিশ্বাস করেছিলেন মুজিব নিহত হতে যাচ্ছেন।

এই দুই গোষ্টির মধ্যে পার্থক্যগুলো এতোটাই অস্পষ্ট যার সাথে তুলনা করা যায় দুটি দেশের যার মাঝ দিয়ে বয়ে গেছে এমন একটা নদী যা প্রায়শ:ই পথ পরিবর্তন করে।”

একটু থেমে মঞ্জু আরো যোগ করেন, শেখ মুজিব বুঝতে পেরেছিলেন যে তার পক্ষে পুরো দেশের সমস্যা সমাধান করা সম্ভব নয়।, তিনি নিজেও তাই আর বাঁচতে চাননি।”

তোফাজ্জাল হোসেন মানিক সবাই যাকে চিনতো মানিক মিয়া নামে তার দ্বিতীয় পুত্র আনোয়ার হোসেন (মঞ্জু)। মঞ্জু দেশ স্বাধীন হওয়ার আগে  ছাত্রলীগের একজন জঙ্গী সদস্য ছিলেন এবং ১৯৬৮ সালে যখন আইয়ুব বিরোধী ছাত্র আন্দোলন তুঙ্গে ছিলো তখন মাঝে মাঝে শেখ কামালের সাথে সেনানিবাসের ভেতরে ঢুকে পড়তেন দেয়ালে শ্লোগান বা পোষ্টার সাঁটানোর জন্য।

মঞ্জু শেখ মুজিবকে চাচা ডাকতেন এবং প্রায় তার বাড়িতে যেতেন সেখানে তাকে পরিবারের অন্যতম সদস্য হিসেবে দেখা হতো।

যাইহোক ১২ আগষ্ট কোলকাতা সফর শেষে মঞ্জু ঢাকা এলেন তখন মুজিবের রাজনৈতিক সহযোগী তোফায়েল আহমেদ তাকে বলেন, বঙ্গবন্ধু তোমার ওপর ক্ষেপে আছেন।তোমার দ্রুতই তার সঙ্গে দেখা করা উচিৎ।”

পরদিন মঞ্জু গণভবনে গেলেন। মুজিব তখন তাহের উদ্দীন ঠাকুরকে সাথে নিয়ে লনে পায়চারী করছেন। মজিব তখন তার হাতের লাঠিটি নিয়ে মঞ্জুর দিকে এমনভাবে তেড়ে যান যেন এটি দিয়ে তিনি মঞ্জুকে আঘাত করবেন এবং বলেন, “ তোমার বন্ধুদের বলে দিও আমি মোটেও ভয় পাইনি”।

যে বাঁশ বেঁকে যায় তা ভাঙ্গেনা।মুজিব ভাঙবেন কিন্তু মচকাবেন না।

এটি অভ্যুত্থানের মাত্র দুদিন আগে ১৩ আগষ্টের ঘটনা।

পাকিস্তানের ট্যাংক দেখে  মুক্তিযোদ্ধারা কখনো ভয় পায়নি এবং রক্ষীবাহিনীর সদস্যরা ছিল মুক্তিযোদ্ধা। তাদের  মধ্যে  অনেক মত বিরোধ ছিল, সার্বিকভাবে তারা সবাই বঙ্গবন্ধুর অনুগত ছিলেন। তাদের যা দরকার ছিল তা হল দিক নির্দেশনা। রক্ষিবাহীর পরিচালক ব্রিগেডিয়ার নুরুজ্জামান ওই সময় লন্ডনে ছিলেন এবং তার দুজন সহকারী তখন ছুটিতে ছিলেন। বাহিনীর চারজন শীর্ষ ব্যক্তির তিনজনই কেন সে সময় দায়িত্বে ছিলেন না তার কোন ব্যাখা  নেই।

তোফায়েল আহমেদ সে সময় রক্ষীবাহিনীকে পাল্টা যুদ্ধ করার নির্দেশ দেয়ার ব্যাপারে দ্বিধান্বিত ছিলেন। তিনি বলেন, তাদের যদি সত্যিই সত্যিই লড়াই করার ইচ্ছা থাকতো এবং আমি যদি বাধা দিয়ে থাকি  তাহলে তাদের উচিৎ ছিল আমাকে হত্যা করা। তার মতে তিনি  নিজেই সে সময় শেরে বাংলা নগরে  রক্ষীবাহিনীর দপ্তরে গিয়েছিলেন এবং এমন কিছু সামরিক কর্মকর্তার সাথে যোগাযোগ করেছিলেন যাদের প্রতিরোধ গড়ে তোলার  সম্ভাবনা ছিল। তাদের মধ্যে একজন  তাকে সে সময় হুমকী দিয়েছিলেন যে তিনি যদি রক্ষিবাহিনীর ক্যাম্প ত্যগ না করেন তাহলে তাকে হত্যা করা হবে।

কি কারণে ভারতীয় কুটনীতিক ভেবেছিলেন যে মুজিবকে হত্যা করা হয়েছে, এমনকি রেডিওতে মৃত্যু সংবাদটি শোনার আগেই? যখন এই কুটনীতিককে  এই প্রশ্ন  করা হয়, তখন তিনি জবাব দেন,” তখন খুব একটা উত্তেজনাকর  অবস্থা ছিল, সাধারণ্যে এমন একটা অনুভূতি  কাজ করেছিল যে ভয়ঙ্কর কিছু একটা ঘটতে যাচ্ছে। ”অল্প একটু থেমে তিনি যোগ করেন” বাংলা বর্ষপঞ্জি বাংলাদেশের নেতার ভবিষ্যতবাণী করেছিল।” হয়তো জ্যেতিষ শাস্ত্রের ভবিষ্যতবাণীর কারণে এই কুটনীতিক বিশ্বাস করেছিলেন মুজিব নিহত হতে যাচ্ছেন।

দেশ স্বাধীন হবার পর  প্রায়ই মুজিব বলতেন যে, একটি বুলেট  আমাকে তাড়া করে ফিরছে।“ কিন্তু তিনি মৃত্যুভয়ে ভীত ছিলেন না। একজন মানুষ যদি মৃত্যু ভয়ে ভীত থাকে তাহলে তার আত্মমর্যাদা কোথায় থাকে? পৃষ্ঠা-৫৯

মুজিব ভেবেছিলেন তাজউদ্দীন তার প্রতি অকৃতজ্ঞ আচরণ করেছিলেন, আর তাজউদ্দীন ভাবছিলেন তার প্রতি অন্যায় করা হয়েছে।

তাজউদ্দীন তার অনুভুতি গোপন করেননি, কিন্তু যখন ১৯৭৫ সালে  দুজন ভারতীয় সাংবাদিক তার সাথে দেখা করেন তখন তিনি প্রকাশ্যে মুজিবের কোনো সমালোচনা করেননি, তিনি বলেছিলেন,তিনি আমার নেতা।“

তাজউদ্দীনের ঘনিষ্ট ছিলেন ঢাকার  এমন একজন প্রখ্যাত আওয়ামী লীগ নেতার মতে ১৯৭৫ সালে কিছু মার্কিন ব্যক্তি তাজউদ্দীনের কাছে প্রস্তাব নিয়ে গিয়েছিলেন, কিন্তু তাজউদ্দীন সে প্রস্তাব  প্রত্যাখান করেছিলেন। ঐ আওয়ামী লীগ নেতা তার শুভাকাংখীদের বলেছিলেন, তাজউদ্দীন এ খবর বঙ্গবন্ধুকে জানিয়েছিলেন এবং তাকে সতর্ক করে দিয়েছিলেন যে তার বিরুদ্ধে চক্রান্ত চলছে।“

– এ. এল. খতিব / কারা মুজিবের হত্যাকারী ॥ [ অনুবাদ: সোয়াদ করিম। শিখা প্রকাশনী – ১৯৯২ । পৃ: ৪৮-৫০,৫৮-১৬৮]

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *