প্রতিষ্ঠাবার্ষিকীতে বিএনপির কাছে প্রত্যাশা

প্রতিষ্ঠাবার্ষিকীতে বিএনপির কাছে প্রত্যাশা

:: হাবিবুর রহমান ::

পহেলা সেপ্টেম্বর স্বাধীন বাংলাদেশে প্রতিষ্ঠিত হওয়া বৃহত্তম রাজনৈতিক দল বিএনপির প্রতিষ্ঠাবার্ষিকী। বিএনপির বিরুদ্ধে সবচেয়ে বড় অভিযোগ বিএনপি ক্যান্টমেন্ট এ প্রতিষ্ঠিত দল। বিএনপির নেতাকর্মীরা বলে থাকেন বিএনপি ক্যান্টমেন্ট এ প্রতিষ্ঠিত হয়নি, বিএনপি প্রতিষ্ঠিত হয়েছে রমনার বটমূলে। রমনার বটমূলে প্রতিষ্ঠিত হয়েছে প্রমাণ করতে পারলেও অভিযোগের ডিফেন্স যথাযথ হয় না৷

কিন্তু বিএনপি যদি স্বীকার করে নেয় হ্যাঁ আমাদের দল ক্যান্টনমেন্টই এ প্রতিষ্ঠিত তাহলে একটা বিষয় সামনে চলে আসে : যে দলটি বিরোধী দলে ২১ বছর ( পাকিস্তান আমলে বিভিন্ন সময়ে মিলিয়ে আওয়ামী লীগ প্রায় দুই বছর ক্ষমতায় ছিল) রাজনীতি করেছে, বিরোধী দলে রাজনীতি করতে গিয়ে দলের শীর্ষ নেতা দীর্ঘ এক যুগ জেল খেটেছেন সেই নেতা ক্ষমতায় এসে সব বিরোধী দল নিষিদ্ধ করে একদলীয় শাসন প্রতিষ্ঠা করলেন। যে ব্যক্তি দীর্ঘদিন পেশাদার সৈনিক হিসেবে সামরিক বাহিনীতে চাকুরি করেছেন সেই ব্যক্তিটি ক্যান্টনমেন্ট থেকে এসে একদলীয় শাসনের বিপরীতে বহুদলীয় গণতন্ত্র পুন:প্রতিষ্ঠা করলেন। ক্যান্টনমেন্ট এ প্রতিষ্ঠিত দলের অভিযোগকারীদের বিএনপি পাল্টা প্রশ্ন করতে পারে, তৃণমূল থেকে গড়ে ওঠা গণমানুষের দল কেন গণতন্ত্র বাতিল করল ? ক্যান্টমেন্ট থেকে আসা দলকে কেন গণতন্ত্র প্রতিষ্ঠার দায়িত্ব নিতে হল ?

জাতীয়তাবাদী রাজনৈতিক দলগুলো পৃথিবীর সব প্রান্তেই অনেক বেশি নির্যাতিত। বর্তমানে লক্ষাধিক মামলায় জর্জরিত হয়েও ঐক্যবদ্ধ আছে, ১৩ বছরেও দলে ভাঙন ধরেনি। বিগত নির্বাচনগুলোর ইতিহাস হিসাব করলে এখনও যেকোন সময়ে সুষ্ঠু নির্বাচন হলে সরকার গঠন করার মত জনসমর্থন দলটির আছে। কিন্তু কূটনৈতিক এবং সাংগঠনিক শক্তির দুর্বলতার কারণে আরও অনেকদিন সংকটের মধ্যে কাটানো বিএনপির জন্য একপ্রকার অনিবার্য। প্রতিষ্ঠাবার্ষিকীতে দলটির কাছে প্রত্যাশা থাকবে কখনও যদি ঘুরে দাঁড়াতে পারে তখন যেন বিএনপিও ফ্যাসিস্ট দলে পরিণত না হয়। যে অত্যাচার নির্যাতনের শিকার তারা হয়েছে ক্ষমতায় গিয়ে সেই একই কাজ যাতে তারা না করে। যে বিএনপি বহুদলীয় গণতন্ত্র পুনঃপ্রবর্তন করে মানুষের গণতান্ত্রিক অধিকার ফিরিয়ে দিয়েছে, সেই বিএনপির গায়ে যাতে কখনো গণতন্ত্র হত্যা, ভোটাধিকার হরণ এবং বাকস্বাধীনতা রুদ্ধ করার কলঙ্ক না লাগে।

বহুদলীয় গণতন্ত্র পুন:প্রতিষ্ঠার সাথে বিএনপির আরেকটা অবদান হচ্ছে ভাষাভিত্তিক জাতীয়তাবাদের বিপরীতে ভৌগোলিক জাতীয়তাবাদের ধারণার মাধ্যমে সমগ্র জাতিকে ঐক্যবদ্ধ করার একটি রূপরেখা প্রণয়ন। ভাষাভিত্তিক বাঙালি জাতীয়তাবাদের কারণে বাংলাদেশের উল্লেখযোগ্য সংখ্যক অবাঙ্গালী জনগোষ্ঠীকে অস্বীকার করা এবং বাংলাদেশের প্রতিবেশী অঞ্চলে বসবাসরত বিপুল সংখ্যক বাঙালী বাদ পরার কারণে ভাষাভিত্তিক জাতীয়তাবাদ মারাত্মক ত্রুটিপূর্ণ প্রমাণিত হয়। কিন্তু ভৌগোলিক ভিত্তিতে বাংলাদেশী জাতীয়তাবাদের আওতায় এক লক্ষ সাতচল্লিশ হাজার বর্গকিলোমিটার ভূখণ্ডে জন্ম নেওয়া প্রতিটি মানুষকে ধর্ম, বর্ণ, জাতি নির্বিশেষে ‘বাংলাদেশী নাগরিক’ পরিচয়ের মাধ্যমে একটি ইনক্লুসিভ জাতীয় ঐক্য প্রতিষ্ঠা করা হয়েছে।

জিয়াউর রহমানের সময়কার প্রেসিডেন্সিয়াল গভর্নমেন্ট পরিবর্তন করে বেগম খালেদা জিয়ার সময়ে ক্যাবিনেট গভর্নমেন্ট প্রতিষ্ঠা করা বাদ দিলে বাংলাদেশ এখন যে স্ট্রাকচারে পরিচালিত হচ্ছে তা সম্পূর্ণ রূপে জিয়াউর রহমানের ডিজাইন করা রাষ্ট্রকাঠামো। ১৯৯২ সালে আওয়ামী লীগ যখন সমাজতন্ত্র পরিহার করে বিএনপিকে অনুসরণ করে জিয়াউর রহমানের মত মুক্তবাজার অর্থনীতিকে নীতি হিসেবে গ্রহণ করে তখন থেকে বিএনপি এবং আওয়ামী লীগের মধ্যে মাত্র দুটি নীতিগত পার্থক্য বিদ্যমান থাকে : এক. বাঙালী / বাংলাদেশী জাতীয়তাবাদ দুই. ধর্মনিরপেক্ষতা/ সর্বশক্তিমান আল্লাহর উপর পূর্ণ আস্থা ও বিশ্বাস। এই দুটি পয়েন্টে বাংলাদেশে বড় ধরনের প্যারাডক্স লক্ষ্য করা যায়। এই প্যারাডক্সের শুরুটা ১৯০৫ সাল থেকে।

যারা বাঙালি জাতীয়তাবাদে বিশ্বাসী তাদের জন্য ১৯১১ সালের বঙ্গভঙ্গ রদ একটি বড় অনুপ্রেরণা, ১৯৭১ সালের মুক্তিযুদ্ধ পাঞ্জাবি এবং বাঙালীদের মধ্যে জাতিগত যুদ্ধের মত, ১৯৭২-৭৫ বাংলাদেশের স্বর্ণযুগ, প্রতিবেশী দেশ ভারত বাংলাদেশের অকৃত্রিম বন্ধু।

যারা বাংলাদেশী জাতীয়তাবাদে বিশ্বাসী তাদের কাছে ১৯০৫ সালের বঙ্গভঙ্গ পূর্ব বাংলার মানুষের উন্নতির জন্য এক ধরনের আশীর্বাদ, ১৯১১ সালের বঙ্গভঙ্গ রদ পশ্চিম বাংলার কায়েমী স্বার্থবাদীদের ষড়যন্ত্র, ১৯৭১ সালের মুক্তিযুদ্ধ পাঞ্জাবি এবং বাঙালীদের মধ্যে জাতিগত যুদ্ধের চেয়ে শোষকের বিরুদ্ধে শোষিতদের সশস্ত্র মুক্তিসংগ্রাম, প্রতিবেশী দেশ ভারত বন্ধুর বদলে প্রভু সুলভ।

বাংলাদেশকে একটি পৃথক জাতিরাষ্ট্র হিসেবে পরিচিত করার অবদান প্রেসিডেন্ট জিয়াউর রহমানের। অর্থনৈতিক পলিসির দিক থেকে বিবেচনা করলে বাকশাল রাজনৈতিকভাবে অঙ্কুরেই ব্যর্থ হওয়ায় এর অর্থনৈতিক সাফল্য শূণ্য। কিন্তু জিয়াউর রহমানের ১৯ দফা প্রকল্প বাংলাদেশের অর্থনীতির মেরুদণ্ড গড়ে দিয়েছে। ৭৪ সালের দুর্ভিক্ষের পরে যে ভঙ্গুর অর্থনীতি দাঁড়িয়েছিল সেখান থেকে দেশকে সঠিক পথে ফিরিয়েছেন জিয়াউর রহমান। ১৯৭৫ এ শুরু হওয়া অভ্যুত্থান এবং পাল্টা অভ্যুত্থানের রক্তক্ষয়ী রাজনীতি থেকে দেশকে স্থিতিশীল অবস্থায় নিয়ে আসেন জিয়াউর রহমান। শেখ মুজিবুর রহমানের আমলে সোভিয়েত – ভারত ব্লকে ঢুকে পড়ার কারণে আন্তর্জাতিক অঙ্গনে বাংলাদেশের অবস্থান মোটেও সুবিধার ছিল না। জিয়াউর রহমান অত্যন্ত বুদ্ধিদীপ্ত কৌশলে আমেরিকা, ইউরোপ, মধ্যপ্রাচ্য, চীন, এমনকি ভারতের দেশাই সরকারের সাথে বন্ধুত্বপূর্ণ সম্পর্ক স্থাপন করে আন্তর্জাতিক অঙ্গনে নিজস্ব অবস্থান সৃষ্টি করে নেয়। স্বাধীনতা উত্তরকালের যে কোন সরকারের চেয়ে জিয়াউর রহমানের সরকারের পররাষ্ট্রনীতি অধিকতর শক্তিশালী ছিল।

রাজনৈতিক দল হিসেবে বিএনপি জিয়াউর রহমানের যথাযথ ব্র্যান্ডিং করতে ব্যর্থ। জিয়াউর রহমানের ১৯ দফা কর্মসূচির তাৎপর্য অনুধাবন করতে এই দলটির নেতাকর্মীরা ব্যর্থ হয়েছেন। বুদ্ধিবৃত্তিক এবং কালচারাল ব্র্যান্ডিং এর প্রয়োজনীয়তা সম্পর্কে বিএনপি উদাসীন। এর প্রমাণ হচ্ছে বিএনপি যখন ক্ষমতায় সেই ২০০৪ সালে বিবিসি বাংলা সেরা বাঙালি নির্বাচনের আয়োজন করে। বিএনপি ক্ষমতায় থাকা অবস্থায় ওই জরিপে জিয়াউর রহমান ১৯ নাম্বারে নির্বাচিত হন যেখানে বেগম রোকেয়া, সত্যজিৎ রায়, লালন শাহ জিয়াউর রহমানের চেয়ে বেশি ভোট পেয়েছেন। একটা দল নিজেদের সম্পর্কে এর চেয়ে বেশি আর কত উদাসীন হতে পারে ?

জাতীয়তাবাদী রাজনৈতিক দলগুলো পৃথিবীর সব প্রান্তেই অনেক বেশি নির্যাতিত। বর্তমানে লক্ষাধিক মামলায় জর্জরিত হয়েও ঐক্যবদ্ধ আছে, ১৩ বছরেও দলে ভাঙন ধরেনি। বিগত নির্বাচনগুলোর ইতিহাস হিসাব করলে এখনও যেকোন সময়ে সুষ্ঠু নির্বাচন হলে সরকার গঠন করার মত জনসমর্থন দলটির আছে। কিন্তু কূটনৈতিক এবং সাংগঠনিক শক্তির দুর্বলতার কারণে আরও অনেকদিন সংকটের মধ্যে কাটানো বিএনপির জন্য একপ্রকার অনিবার্য। প্রতিষ্ঠাবার্ষিকীতে দলটির কাছে প্রত্যাশা থাকবে কখনও যদি ঘুরে দাঁড়াতে পারে তখন যেন বিএনপিও ফ্যাসিস্ট দলে পরিণত না হয়। যে অত্যাচার নির্যাতনের শিকার তারা হয়েছে ক্ষমতায় গিয়ে সেই একই কাজ যাতে তারা না করে। যে বিএনপি বহুদলীয় গণতন্ত্র পুনঃপ্রবর্তন করে মানুষের গণতান্ত্রিক অধিকার ফিরিয়ে দিয়েছে, সেই বিএনপির গায়ে যাতে কখনো গণতন্ত্র হত্যা, ভোটাধিকার হরণ এবং বাকস্বাধীনতা রুদ্ধ করার কলঙ্ক না লাগে।

লেখকঃ ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের আইন বিভাগের শিক্ষার্থী

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *