বাজে সাংবাদিকতা ভাল সাংবাদিকতাকে বাজার থেকে বিতাড়িত করে

বাজে সাংবাদিকতা ভাল সাংবাদিকতাকে বাজার থেকে বিতাড়িত করে

:: সাইফুল আলম চৌধুরী ::

গত কয়েকদিন ধরে ভাবছিলাম শ্রদ্ধেয় বড় ভাই শওগাত আলী সাগরের “মাহবুব উল আলম হানিফ কানাডায় এলেন কীভাবে” শীর্ষক রিপোর্টটি নিয়ে কিছু একটা লিখব। এই রিপোর্টটি সাংবাদিকতার শিক্ষক, শিক্ষার্থী ও নবীন সাংবাদিকদের জন্য উদাহরণ হিসেবে উল্লেখ করার মতো একটি রিপোর্ট। একজন ভাল সাংবাদিক কিভাবে সোর্স ম্যাপিংয়ের মাধ্যমে একটি রিপোর্টকে প্রশ্নাতীতভাবে উপস্থাপন করতে পারেন সেক্ষেত্রে বাংলাদেশের সাংবাদিকতার শিক্ষকগণ সাগর ভাইয়ের এ রিপোর্টটিকে উদাহরণ হিসেবে তুলে ধরতে পারেন। প্রথম আলোতে ছাপা হওয়া এ রিপোর্টটি নিয়ে লিখতে চেয়েছিলাম — বাংলাদেশের ‘বাংলাদেশ’ হয়ে ওঠার জন্য স্বাধীন ও মানসম্পন্ন সংবাদমাধ্যম অত্যন্ত জরুরি। কিন্তু গত দু’দিনে আমার একসময়ের কর্মস্থল প্রথম আলো ফেসবুকে ভাইরাল অন্য একটি কারণে। সেটি হলো দেশের শীর্ষস্থানীয় এই পত্রিকাটি কর্মী ছাটাইয়ের উদ্যোগ নিয়েছে। 

সাংবাদিকদের দৃঢ় হতে হবে। বাংলাদেশের গণমাধ্যম সম্পাদকরা এখন যত না সাংবাদিক তার চেয়ে নিজেদের মালিক ভাবেন বেশি। তাদের ব্যবসায়িক স্বচ্ছতা ও জবাবদিহিতাকে যতদিন প্রশ্নের মুখোমুখি করা না যাবে ততদিন সাংবাদিকদের দুর্দশা কাটবে না। যেনতেন, যখন-তখন গণমাধ্যমের কর্মী ছাটাই বন্ধ করতে হলে সামগ্রিক ও সমন্বিতভাবে অনেক কিছু করতে হবে। অসাংবাদিকের সাংবাদিক হওয়ার পথ বন্ধ করতে হবে। ভূঁইফোড়দের সম্পাদক কিংবা মালিক হওয়ার পথ রুখতে হবে।


বাংলাদেশের সাংবাদিকদের চাকরির নিয়ে অনিশ্চয়তা ও অসন্তুষ্টি নতুন নয়। ২০১৫ সালে পিআইবির অর্থায়নে “পেশাদার সাংবাদিকরা চাকরি নিয়ে কতটা সন্তুষ্ট: একটি গবেষণা মূল্যায়ন” শীর্ষক একটি গবেষণা করেছিলাম। ২০১৭ সালে তা নিয়ে পিআইবি একটি বই প্রকাশ করেছে। ঢাকার ৩৩৪ জন সাংবাদিকের ওপর পরিচালিত এই গবেষণার সবচেয়ে ভয়ঙ্কর ফলাফলটি হলো, ৯২ শতাংশ উত্তরদাতা অর্থাৎ ৩০৭ বলেছিলেন, সাংবাদিকদের চাকরির নিরাপত্তা নেই। এর মূল কারণ হিসেবে তারা বলেছিলেন, যখন-তখন চাকরি চলে যাওয়া, যথাযথ চাকরিবিধি না থাকা এবং কর্তৃপক্ষের মর্জিই সবকিছু। আর ৪৫% উত্তরদাতা বলেছিলেন, তারা সাংবাদিকতা ছেড়ে অন্য কোন পেশায় যোগ দিতে চান। ইতিমধ্যে অনেক ভাল ভাল সাংবাদিক পেশা ছেড়ে দিয়েছেন। ২০১৭ সালে পিআইবিতে একটি সেমিনারে এই গবেষণার রিপোর্ট উপস্থাপনের সময় বলেছিলাম, এমন একটা সময় আসবে বাংলাদেশের সাংবাদিকরা বিনাবাক্যে চাকরি হারাবে। তখন পরিস্থিতি দাঁড়াবে দুর্নীতিবাজ, ধান্দাবাজ সাংবাদিকরা সাংবাদিকতা করবে আর ভাল, সৎ ও পরিশ্রমী সাংবাদিকরা এই পেশা ছেড়ে দিবেন। যেমনটা খারাপ মুদ্রা বাজার থেকে ভাল মুদ্রাকে বিতাড়িত করে। কভিডকালে আমরা সে পরিস্থিতির মুখোমুখি এসে দাঁড়িয়েছি।  


মোটা দাগে বলতে গেলে, বাংলাদেশের সাংবাদিকতায় এখন একটি ক্রান্তিকালে উপস্থিত হয়েছে। প্রশ্ন হলো, বাংলাদেশের সংবাদ মাধ্যমগুলোতে কি হঠাৎ করেই এই যখন-তখন চাকরি যাওয়ার প্রবণতা শুরু হয়েছে? মোটেই না। এটি আগেও ছিল। প্রথম আলো, কালের কণ্ঠের মতো শীর্ষস্থানীয় এবং প্রতিষ্ঠিত পত্রিকাগুলো যখন কর্মী ছাটাইয়ের উদ্যোগ নিচ্ছে তখন সাংবাদিকদের ‘দেয়ালে পিঠ ঠেকে যাওয়ার’ মতো অবস্থা দাঁড়িয়েছে। 


তিনটি কারণ আজকের বাংলাদেশের সাংবাদিকদের এই দুর্দশার জন্য মূলতঃ দায়ী। প্রথমতঃ গণমাধ্যমের নিয়ন্ত্রণহীন বাজারব্যবস্থা। ৯০ দশকের পর থেকে বাংলাদেশের সাংবাদিকতার স্বাধীনতার পেছনে মূল ধারণা ছিল যত বেশি সংখ্যক সংবাদ মাধ্যম দেশে থাকবে তত বেশি স্বাধীনতা থাকবে। অর্থাৎ সংবাদমাধ্যমের স্বাধীনতার নির্ণায়ক হিসেবে সংখ্যাই বিবেচ্য, গুণগত মান নয়। তথ্য মন্ত্রণালয়ের ওয়েবসাইট অনুযায়ী দেশে জাতীয় দৈনিকের সংখ্যা ৭-৮’শ। দেশে ৩০-৪০টি টিভি আছে, আরও আসার অপেক্ষায়। কিন্তু এতগুলো পত্রিকা/টিভির জন্য কি অর্থনৈতিক বাজার এবং দর্শক/গ্রাহক-পাঠক আছে কীনা আমরা সেটি কখনও চিন্তা করি না। বেশিরভাগ পত্রিকা/টিভি সাংবাদিকতা করছে না, বরং এগুলো ব্যবহৃত হচ্ছে অন্য ব্যবসা/রাজনীতির ঢাল হিসেবে। ফলশ্রুতিতে বাজে সাংবাদিকতার সংখ্যা বাড়ছে, ধীরে ধীরে ভাল ও মানসম্পন্ন সাংবাদিকতা প্রশ্নের মুখে পড়ছে। 


দ্বিতীয় কারণটি হলো উদ্দেশ্য ও লক্ষ্যবিহীন গণমাধ্যম ব্যবস্থা। বিশ্বের যেসব দেশে গণমাধ্যম শিল্প হিসেবে প্রতিষ্ঠা পেয়েছে সেখানে দেখা গেছে গণমাধ্যম একটি ব্যবস্থা বা সিস্টেম হিসেবে রূপ লাভ করেছে। গণমাধ্যমকে সিস্টেম হিসেবে দাঁড়াতে হলে ৪টি মূল কম্পোনেন্টের ১২টি উপ-কম্পোনেন্টে সক্ষমতা অর্জন করতে হয়। দুঃখজনক হলেও সত্যি এই কম্পোনেন্টগুলো নিয়ে আমাদের দেশে যেমন কোন গবেষণা হয়নি, তেমনি আমাদের সরকার, সংবাদমাধ্যম শিল্পের সাথে জড়িত কেউ ভাবিনি। যেমন- আমাদের দেশে প্রতি হাজারে কতজন লোক সংবাদপত্র পড়ে এই গবেষণার দায়িত্ব সরকারের হলেও আজ পর্যন্ত এটি হয়নি। সিস্টেম হিসেবে দাঁড়ানোর বা দাঁড় করোনার চিন্তা-ভাবনা না থাকায় যখন যে দল ক্ষমতায় থাকে সে দলের নেতারা একটি পত্রিকা/টিভি/রেডিও খুলে বসেন। আর তাতে কি হয়? হয়, আরো একটি বিষফোঁড়া গোদের ওপর নতুন করে জন্ম নেয়। এভাবে বোঝা বাড়ছে। নতুন পাঠক/দর্শক সৃষ্টি হচ্ছে কীনা, কি পরিমাণ হচ্ছে, সে অনুযায়ী নতুন নতুন পাঠক/দর্শক তৈরিতে করণীয় কি তা নিয়ে আমাদের গণমাধ্যম-সাংবাদিকতার রাঘব বোয়ালরা ভাবেন না। তারা নতুন ডোনার পান পত্রিকা-টিভি খুলে বসেন। কিছুদিন যেতে না যেতে একটি নতুন হাউজে ২/৩টি উপদলের জন্ম হয়। এক দল হঠাৎ করেই বিদায় নেন। এই চিত্র ২০০৫ সাল থেকে বেড়েই চলেছে। উপরন্তু অযোগ্য, অদক্ষ লোক বস হয়ে যাচ্ছে। তাদের একটিই কাজ সকাল-বিকাল, রাত-দুপুর মালিকের তোয়াজ করা, সরকারকে খুশি করা। তিনি/তারা যেটি করছেন সেটি সাংবাদিকতা নয়, সাংঘাতিকতা। ওয়ান ইলেভেনে উত্তর পাড়ায় গিয়ে রাত-দিন শেখ হাসিনার বিরুদ্ধে বলা সাংবাদিকটি এখন সবচেয়ে বড় আওয়ামী লীগার হয়ে গিয়েছে। ‘ক’ লিখতে কলম ভেঙ্গে যাওয়া সাংবাদিকটি এখন সম্পাদক হয়ে গিয়েছে। আর কিছু না পারুক, ১০ হাজার টাকা দিয়ে একটি ওয়েব সাইট বানিয়ে সেটিকে চাঁদাবাজির হাতিয়ার হিসেবে ব্যবহার করছে। 

  
তৃতীয় কারণটি হলো সাংবাদিকদের দলাদলি। পেশার ধরন ও চরিত্র হিসেবে সাংবাদিকরা থাকবেন দল নিরপেক্ষ। এটাই স্বাভাবিক। কিন্তু বাংলাদেশের সাংবাদিক নেতারা দুই ভাগে ভাগ হতেই তাদের বেশি পছন্দ। এ কারণে সাংবাদিকদের এমন কোন কার্যকর ইউনিয়ন আমরা পায়নি যারা সাংবাদিকদের অধিকার নিয়ে বলার মতো কিছু করেছেন। বরং তারা সাংবাদিকদের ত্রাণের লাইনে এনে নামিয়েছেন। সাংবাদিকদের এই দলাদলিতে স্টেট ইন্টারভেনশন বাড়ছে। ফলশ্রুতিতে সত্যিকারের সৎ ও পরিশ্রমী সাংবাদিকরা হতাশ হয়ে পড়ছেন। 


শুধু বাংলাদেশেই যে সাংবাদিকদের চাকরি যাচ্ছে তা নয়, বিশ্বের অনেক দেশে সাংবাদিকদের চাকরি চলে যায়। কিন্তু বাংলাদেশের মত এত অনিরাপদ আর অসন্তুষ্টি নিয়ে অন্য দেশের সাংবাদিকরা কমই চাকরি করেন। প্রথম আলো কিংবা ডেইলি স্টারের গত ১০ বছরে যা আয় হয়েছে তা দিয়ে আগামী তিন বছর ভর্তুকি দিতে পারে। আর শুধু বাংলাদেশ কেন সমগ্র দক্ষিণ এশিয়াতে পাঠকের যে বৃদ্ধি হার তা কমপক্ষে আগামী ১০ বছর বাড়বে। উপরন্তু যে গতিতে এটি কমতে পারে তার চেয়ে বেশি গতিতে অনলাইন আয় বাড়বে। কিন্তু সাংবাদিক কি তার সম্পাদক/মালিককে কখনও প্রশ্নের মুখোমুখি দাঁড় করান? জবাবদিহিতা চান? ওয়ান ইলেভেনের পর ধর-পাকড়ের সুযোগে খুলনার এক ব্যবসায়ী একটি টিভি চ্যানেলের চেয়ারে বসে বেতন দেয়া বন্ধ করে দেন। মিটিংয়ে এক সাংবাদিক ওই ব্যবসায়ীকে চ্যালেঞ্জ ছুঁড়ে দিয়ে বলেন, চ্যানেলটি লাভজনক প্রতিষ্ঠান আপনি না থাকলেও চ্যানেলটি চলবে। আপনি চাইলে চলে যেতে পারেন। পরে তিনি ভৃত্য-পোষ্য টাইপের সাংবাদিককে নিজের পক্ষে ভিড়িয়েও সুবিধা করতে পারেননি। তাই সাংবাদিকদের দৃঢ় হতে হবে। বাংলাদেশের গণমাধ্যম সম্পাদকরা এখন যত না সাংবাদিক তার চেয়ে নিজেদের মালিক ভাবেন বেশি। তাদের ব্যবসায়িক স্বচ্ছতা ও জবাবদিহিতাকে যতদিন প্রশ্নের মুখোমুখি করা না যাবে ততদিন সাংবাদিকদের দুর্দশা কাটবে না। যেনতেন, যখন-তখন গণমাধ্যমের কর্মী ছাটাই বন্ধ করতে হলে সামগ্রিক ও সমন্বিতভাবে অনেক কিছু করতে হবে। অসাংবাদিকের সাংবাদিক হওয়ার পথ বন্ধ করতে হবে। ভূঁইফোড়দের সম্পাদক কিংবা মালিক হওয়ার পথ রুখতে হবে।

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

Shares