বাকশাল শেখ মুজিবের পতনের মুখ্য কারণ

বাকশাল শেখ মুজিবের পতনের মুখ্য কারণ

“… আওয়ামী লীগ-বাকশালের বাইরে ওই সময় সবচেয়ে বড় রাজনৈতিক দল ছিল জাসদ। জাসদের প্রধান নেতা সিরাজুল আলম খান তখন দেশে নেই। দলে একাধিক ‘কেন্দ্র’। গণবাহিনীর ইউনিটগুলো বিভিন্ন জেলায় মোটামুটি স্বাধীনভাবে কাজ করছে নিজেদের শক্তি-সামর্থ্যের ওপর নির্ভর করে। ঘটনার আকস্মিকতায় সবাই হতচকিত, বিহ্বল। জাসদের মধ্যে যারা ষাটের দশকের রাজনৈতিক সংগ্রামের উত্তরাধিকার বহন করে চলেছেন, ১৫ আগস্টের মতো একটা ঘটনা ঘটতে পারে, এটা তারা কখনো চিন্তা করেননি।

১৫ আগস্ট সকালে ঢাকা নগর গণবাহিনীর সদস্য মীর নজরুল ইসলাম বাচ্চুর সঙ্গে তিতুমীর কলেজের সহসভাপতি কামালউদ্দিন আহমদ, আবদুল্লাহ আল মামুন, ওয়াহিদুল ইসলাম সুটুল, নওশের ও রতন ধানমন্ডিতে তাজউদ্দীনের বাসায় যান। কামালের বাড়ি ঢাকার কাপাসিয়া থানায়। তার বড় ভাই নৌবাহিনীর সাবেক লিডিং সি-ম্যান সুলতানউদ্দিন আহমদ আগরতলা মামলায় অভিযুক্ত এবং জাসদের কেন্দ্রীয় কমিটির প্রচার সম্পাদক ছিলেন। তাজউদ্দীনের সাথে তার পূর্বপরিচয় ছিল এবং একই এলাকায় বাড়ি বলে তাদের মাঝেমধ্যে দেখাসাক্ষাৎ হতো।

এইভাবে একক পার্টির শাসন প্রবর্তনে দেশের চিরাচরিত পার্লামেন্টারি শাসনের বলপূর্বক অবসান ঘটানো হল। অনেকেই ভাবলেন এই শাসন পদ্ধতি প্রবর্তনের জন্য জনগণের রায় নেওয়ার একান্ত প্রয়োজন ছিল। ফলে এই স্বেচ্ছাচারী ব্যবস্থায় তারা অসন্তুষ্ট হলেন। যে নির্বাচনী প্রচারপত্রের ভিত্তিতে আওয়ামী লীগ ইলেকশনে জয়যুক্ত হয়েছিল তাতে সংসদীয় বহুদলীয় শাসনের অবলুপ্তি করার কোন আভাষ ছিল না এবং উহাতে শেখ মুজিবকে তদ্রুপ অন্যান্য দলের এবং তাদের সদস্যদের বিলোপ করার ক্ষমতা দেওয়ার কথাও ছিল না। শেখ মুজিবের এই পদক্ষেপকে অনেকে বে-আইনী এবং স্বেচ্ছাচারী পদ্ধতি বলে মনে করলেন। ইহাকেই শেখ মুজিবের পতনের মুখ্য কারণ বলে গণ্য করা হয়। লোক যদিও প্রকাশ্যে এই পদ্ধতির বিরোধিতা করে নাই কিন্তু অন্তরে তারা অসুখী ও ব্যথিত হলো।

তাজউদ্দীনের বাসায় গিয়ে তারা শুনলেন, তিনি গোসল করছেন। তারা বাইরের ঘরে অপেক্ষা করতে থাকলেন। মিনিট দশেক পর তাজউদ্দীন এলেন। পরনে একটি পায়জামা, গায়ে হাতাওয়ালা গেঞ্জি। সিলিং ফ্যানের নিচে দাঁড়িয়ে দুই হাতের আঙুল দিয়ে ব্যাকব্রাশের মতো ভঙ্গিতে চুল থেকে পানি ঝরাচ্ছিলেন। পানির ঝাপটা কামালের চোখে-মুখে এসে লাগছিল।

তাজউদ্দীন উত্তেজিত হয়ে বলতে থাকলেন, ‘বোকার দল – লাল বাহিনী বানায়, নীল বাহিনী বানায়। কোনো বাহিনী তাকে বাঁচাতে পারল?’

বাচ্চু বললেন, ‘আপনাকে আমাদের সঙ্গে যেতে হবে।’ তাজউদ্দীন বললেন, ‘কোথায় যাবো? কেন তোমাদের সঙ্গে যাবো?’ বাচ্চু বারবার বলছিলেন, ‘যেতেই হবে।’

তাজউদ্দীন কামালকে বললেন, ‘নান্নু, এটা কারা করল? রাইটিস্টরা না লেফটিস্টরা? লেফটিস্টরা হলে আমাকে আর জীবিত রাখবে না।’ নান্নু কামালের ডাকনাম। তাজউদ্দীন তাকে এই নামেই ডাকতেন। লেফটিস্ট বলতে তিনি পিকিংপন্থীদের বোঝাচ্ছিলেন। বাচ্চুর কথার জবাবে তিনি বললেন, ‘সিরাজ কোথায়? ও যদি বলে তাহলে যেতে পারি। তাকে নিয়ে আসো।’ বাচ্চু বেরিয়ে গেলেন। আধা ঘণ্টা পর তিনি ফিরে এসে জানালেন, সিরাজুল আলম খান কোথায় আছেন, তা জানা যায়নি। বাচ্চু জানতেন না, তিনি দেশে নেই। অগত্যা তাজউদ্দীনকে ছাড়াই তারা ফিরে এলেন।

তাজউদ্দীনকে কোথায় নিয়ে যাওয়া হবে এবং কেন, এটা বাচ্চু ছাড়া তার অন্য সহযোগীরা জানতেন না। বাচ্চুর সাথে যাওয়ার সময় কামালের মনে হয়েছিল, তাজউদ্দীনকে বোধ হয় কোনো নিরাপদ জায়গায় সরিয়ে নেয়া হবে। ২৬ নভেম্বর ভারতীয় হাইকমিশনে একটি অভিযানে বাচ্চু নিহত হলে বিষয়টি চাপা পড়ে যায়। এটা আর হয়তো কোনো দিনই জানা যাবে না যে কে বাচ্চুকে পাঠিয়েছিল এবং কী উদ্দেশ্যে।

১৫ আগস্ট সকালে মুহসীন হলের ছাত্র নূর মোহাম্মদ ঢাকা গণবাহিনীর উপপ্রধান আবুল হাসিব খানের কাছে ঢাকা নগর গণবাহিনীর কমান্ডার আনোয়ার হোসেনের একটি চিরকুট নিয়ে আসেন। চিরকুটে প্রকৌশল বিশ্ববিদ্যালয় ছাত্র সংসদের অফিসে ঢাকা নগর গণবাহিনীর জরুরি সভা হবে বলে উল্লেখ ছিল। সভা শুরু হলে আনোয়ার হোসেন উপস্থিত সবাইকে বলেন, ‘ভাইজান (লে. কর্নেল আবু তাহের) সকালে রেডিও স্টেশনে গিয়েছিলেন। তিনি মেজর ডালিমকে বকাঝকা করে বলেছেন, ‘**র মেজর হয়েছ, এখন পর্যন্ত একটা মার্শাল ল প্রক্লেমেশন ড্রাফট করতে পারলে না। জানো, কাল ইউনিভার্সিটিতে কারা বোমা ফাটিয়েছিল? দে আর মাই বয়েজ।’

লে. কর্নেল আবু তাহের গোপনে গণবাহিনী গড়ে তুলছিলেন। ডালিম ও নূর তার সাথে নিয়মিত যোগাযোগ রাখতেন। তাহের ও ডালিমের চিন্তাধারা ছিল একই রকম। তাহের ১৫ আগস্টের অভ্যুত্থানে সরাসরি অংশ নেননি। তবে ওই দিনই তিনি অভ্যুত্থানকারীদের সাথে যোগাযোগ স্থাপন করেন।

লে. কর্নেল আবু তাহের মেজর রশিদের অনুরোধে সকাল ৯টায় ঢাকা বেতারকেন্দ্রে যান। সেখানে তিনি খন্দকার মোশতাক আহমদ, তাহেরউদ্দিন ঠাকুর, মেজর ডালিম ও মেজর জেনারেল খলিলুর রহমানকে দেখতে পান। অভ্যুত্থানকারীদের যত তাড়াতাড়ি সম্ভব সশস্ত্র বাহিনীর তিন প্রধানের সঙ্গে যোগাযোগ করতে বলেন তিনি। তিনি খন্দকার মোশতাককে পাঁচটি প্রস্তাব দেন। প্রস্তাবগুলো ছিল :

১. অবিলম্বে সংবিধান বাতিল করতে হবে; 

 ২. সারা দেশে সামরিক আইন জারি এবং এর প্রয়োগ করতে হবে;

 ৩. দলনির্বিশেষে সব রাজনৈতিক বন্দীকে মুক্তি দিতে হবে; 

 ৪. বাকশালকে বাদ দিয়ে একটি সর্বদলীয় জাতীয় সরকার গঠন করতে হবে; 

 ৫. অবিলম্বে একটি গণপরিষদ তথা পার্লামেন্টের জন্য সাধারণ নির্বাচনের ব্যবস্থা করতে হবে।

সামরিক শাসন জারির দাবি ছিল তাহেরের একান্ত নিজস্ব। এ বিষয়ে তিনি গণবাহিনীর কেন্দ্রীয় কমান্ড কিংবা জাসদের পার্টি ফোরামের সাথে আলোচনা করেননি এবং এসব প্রস্তাব উত্থাপনের জন্য পার্টি তাকে কোনো ম্যান্ডেট দেয়নি। প্রকৃতপক্ষে এই প্রস্তাব ছিল জাসদের মূলনীতির সাথে পুরোপুরি সাংঘর্ষিক। বিশেষ করে, সামরিক আইন জারির প্রস্তাবটি বাংলাদেশে গণতান্ত্রিক আন্দোলনের মধ্য থেকে গড়ে ওঠা যেকোনো সুস্থ রাজনৈতিক দলের জন্যই অপমানজনক এবং প্রগতিশীল রাজনীতির চেতনাবিরোধী। তাহের সব সময় শেখ মুজিবের ‘ফ্যাসিবাদী’ রাজনীতির বিরোধী ছিলেন এবং তার সরকারের উৎখাত চাইতেন। জাসদও একই দাবি করেছে। কিন্তু জাসদ কখনোই দেশে সামরিক শাসন চায়নি।

খন্দকার মোশতাক আহমদ বঙ্গভবনে রাষ্ট্রপতি হিসেবে শপথ নেন। মেজর রশিদ শপথ গ্রহণ অনুষ্ঠানে তাহেরকে উপস্থিত থাকতে অনুরোধ করেছিলেন। তাহের যখন দুপুরে বঙ্গভবনে পৌঁছান, ততক্ষণে শপথ অনুষ্ঠান শেষ হয়ে গেছে। তাহের আগস্ট হত্যাকাণ্ডের সঙ্গে জড়িত মেজর রশিদসহ সেনা কর্মকর্তাদের সাথে বৈঠক করেন এবং সকালে খন্দকার মোশতাককে দেয়া তার প্রস্তাবগুলো আবার উল্লেখ করেন। আলোচনার একপর্যায়ে তিনি সেনাবাহিনীর উপপ্রধান জেনারেল জিয়াউর রহমানকে ডেকে নেন। সবাই তাহেরের প্রস্তাবগুলো সময়োচিত বলে একমত হন।

দু’দিন পর সকালে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ছাত্র নঈম জাহাঙ্গীর নারায়ণগঞ্জে তাহেরের বাসায় যান পরিস্থিতি সম্পর্কে আঁচ করতে। ১৯৭১ সালে নঈম ১১ নম্বর সেক্টরে তাহেরের সহযোদ্ধা ছিলেন এবং প্রায়ই তার সাথে দেখাসাক্ষাৎ করতেন। তাহের আক্ষেপ করে নঈমকে বললেন, ‘ওরা বড় রকমের একটা ভুল করেছে। শেখ মুজিবকে কবর দিতে অ্যালাও করা ঠিক হয়নি। এখন তো সেখানে মাজার হবে। উচিত ছিল লাশটা বঙ্গোপসাগরে ফেলে দেয়া।’

১৫ আগস্টের পর গণবাহিনীর পক্ষ থেকে একটি লিফলেট প্রচার করা হয়। লিফলেটের শিরোনাম ছিল, ‘খুনি মুজিব খুন হয়েছে – অত্যাচারীর পতন অনিবার্য’॥”

– মহিউদ্দিন আহমদ / জাসদের উত্থান পতন : অস্থির সময়ের রাজনীতি ॥ [ প্রথমা প্রকাশন : জানুয়ারি২০১৫ (তৃতীয় সংস্করণ) । পৃ: ১৭৬-১৭৯ ]

#২  

“… শেখ মুজিবের পতনের অনেক কারণ দেখানো হয়। অনেকের মতে হত্যার পূর্বে জনগণ তার সরকারের উপর আস্থা হারিয়ে ফেলেছিল। এর প্রধান কারন স্বরূপ দেশের তদানীন্তন দূরবস্থা ও দুর্ভিক্ষের কথা উল্লেখ করা হয়। ১৯৭৫ এর ফেব্রুয়ারির মাঝামাঝি দেশের অবস্থা সম্বন্ধে আমার ডায়েরীতে লিখেছিলাম:

”গেল বছর (১৯৭৪) কত সহস্র লোক না খেয়ে মরে গেল। কত কান্না, কত আহাজারিতে বাংলার আকাশ বাতাস অনুরণিত হল। এবারেও একই অবস্থার পুনরাবৃত্তি হবার আশঙ্কা রয়ে গেছে। এখন মাঘ মাস গেল মাত্র। এরই মধ্যে মানুষকে না খেয়ে ফুটপাতে পড়ে থাকতে দেখা যাচ্ছে। গ্রামের ঘরে ঘরে হা অন্ন। বোরো ফসলের এখনও দেরী। শীতের ফসলও ভাল হয়নি। কি উপায় হবে। সরকার অবশ্য চেষ্টার ত্রুটি করছেনা। কিন্তু উৎপাদনের পথে যে শত অন্তরায়। ঘোড়াশাল সার কারখানার এমোনিয়া প্লেন্ট বোমায় উড়ে গেল – আজও তার মেরামত হয়নি। কেমিকেল সারের দারুণ অভাব। গ্রামে বিদ্যুত যায়নি, পাম্প চালাতে হয় ডিজেলে। আর ডিজেলের ঘাটতি লেগেই আছে। তাছাড়া যন্ত্রাংশের অভাবে পাম্প অকেজো হয়ে পড়ে থাকে। আরো কত কি বাস্তব সমস্যা রয়ে গেছে। সর্বোপরি আছে আইন শৃঙ্খলা অবস্থার অবনতি, চোর-ডাকাত আর সন্ত্রাসবাদীদের উৎপাতে গ্রামের লোক ঘুমাতে পারেনা। এরপর উল্লেখ করা যায় রক্ষী বাহিনীর অত্যাচার, নতুন বাকশাল শাসন ব্যবস্থার প্রবর্তন, মুজিব পরিবারের কিছু লোকের অপকীর্তি ইত্যাদি।”

… ০১/০৬/১৯৭৭ তারিখে আমার ডায়েরীতে ইংরেজীতে লেখা কিছু অংশের বঙ্গানুবাদ:

“শেখ মুজিব হত্যার ব্যাপারে সাধারণভাবে যেসব কারণ উল্লেখ করা হয় সেগুলি নিম্নরূপ।

বাঙ্গালী শেখ মুজিবুর রহমানকে জাতির পিতা মেনে নিয়েছিল। জাতীয় পরিষদে তার দলের ছিল একচ্ছত্র সংখ্যাগরিষ্ঠতা। আর পার্টির উপর তার এত প্রচন্ড প্রভাব ছিল যে তার অভিমতের সমালোচনা করার সাহস কারো ছিলনা এবং তার মুখের কথাই ছিল দেশের আইন। এমনি ক্ষমতার বলেই তিনি যদৃচ্ছা দেশের সংবিধানের সংশোধন ও পরিবর্তন করতে সমর্থ হন। তার ইচ্ছামাফিক দেশ হতে পার্টি ভিত্তিক সংসদীয় শাসন তুলে দেওয়া হল এবং দেশে একদলীয় শাসনের প্রবর্তন করা হল। আর এই পার্টির নাম করা হলো বাংলাদেশ কৃষক শ্রমিক আওয়ামী লীগ সংক্ষেপে বাকশাল। সংশোধিত শাসনতন্ত্র অনুযায়ী একমাত্র বাকশালই দেশ শাসন করবে এই হল সিদ্ধান্ত।

আরো সিদ্ধান্ত গ্রহণ করা হলো দেশে উক্ত একক দল ছাড়া আর কোন রাজনৈতিক দলের অস্তিত্ব থাকতে পারবেনা। পার্লামেন্টে অন্যান্য দলের সদস্যদের অপশন দেওয়া হল যে, হয় তারা বাকশালে যোগ দিবেন, না হয় তাদের পার্লামেন্টের সভ্যপদ পরিত্যাগ করবেন। ফলে পার্লামেন্টের সব সদস্যই বাকশালী হয়ে গেলেন। এদের মধ্যে কেহ কেহ মনে করলেন তারা ভয়ের ফলে বাকশালে যোগ দিতে বাধ্য হলেন কিন্তু তাদের এই দলত্যাগের পেছনে নির্বাচক মন্ডলীর মতামত গ্রহণ করা হলনা।

এইভাবে একক পার্টির শাসন প্রবর্তনে দেশের চিরাচরিত পার্লামেন্টারি শাসনের বলপূর্বক অবসান ঘটানো হল। অনেকেই ভাবলেন এই শাসন পদ্ধতি প্রবর্তনের জন্য জনগণের রায় নেওয়ার একান্ত প্রয়োজন ছিল। ফলে এই স্বেচ্ছাচারী ব্যবস্থায় তারা অসন্তুষ্ট হলেন। যে নির্বাচনী প্রচারপত্রের ভিত্তিতে আওয়ামী লীগ ইলেকশনে জয়যুক্ত হয়েছিল তাতে সংসদীয় বহুদলীয় শাসনের অবলুপ্তি করার কোন আভাষ ছিল না এবং উহাতে শেখ মুজিবকে তদ্রুপ অন্যান্য দলের এবং তাদের সদস্যদের বিলোপ করার ক্ষমতা দেওয়ার কথাও ছিল না। শেখ মুজিবের এই পদক্ষেপকে অনেকে বে-আইনী এবং স্বেচ্ছাচারী পদ্ধতি বলে মনে করলেন। ইহাকেই শেখ মুজিবের পতনের মুখ্য কারণ বলে গণ্য করা হয়। লোক যদিও প্রকাশ্যে এই পদ্ধতির বিরোধিতা করে নাই কিন্তু অন্তরে তারা অসুখী ও ব্যথিত হলো।

এতদ্ব্যতীত দেশে এক অত্যাচারী শাসন প্রবর্তনের জন্য অনেকে তাকে দায়ী করেন। তিনি দেশে রক্ষীবাহিনী নামে এক সামরিক জাতীয় (প্যারামিলিটারি) বাহিনী গঠন করেন। এই বাহিনীর সদস্যদেরকে দেশের অভ্যন্তরে নিয়োগ করা হয় এবং অনেকের মতে বাকশালের বিরুদ্ধে সকল প্রকার প্রচার বন্ধ করাই ছিল তাদের দায়িত্ব। এমন অভিযোগও আনা হয়েছিল যে, যেকেহ সরকারের বিরোধিতা বা সমালোচনা করেছে তাকেই গ্রেপ্তার করা হয়েছে এবং তাকে যন্ত্রণা ও উৎপীড়ন করে ঘায়েল করা হয়েছে। তদুপরি ব্যক্তিগত হিংসা-দ্বেষ প্রণোদিত হয়ে নেতৃস্থানীয় ব্যক্তিগণ রক্ষীবাহিনী দ্বারা লোকের উপর অত্যাচার করেছেন বলেও অভিযোগ আনা হয়েছে। এই অবস্থায় দেশে এক অরাজক এবং নিরাপত্তাবিহীন পরিস্থিতির সৃষ্টি হয়েছিল বলে অনেকের ধারণা।

দেশের ক্রমবর্ধমান আইন শৃঙ্খলার অবনতি লোকের অন্তরে তাহার বিরুদ্ধে বিদ্বেষের সৃষ্টি করে। দলীয় নেতৃবর্গ আইন-সংরক্ষণ ও আইন প্রয়োগকারী সংস্থাগুলির কাজে বাধা দিতে লাগল। তাহাদের সহায়তায় দুষ্ট লোক আইনের আওতার বাইরে থাকতে সমর্থ হত। এই অবস্থায় দায়িত্ব-জ্ঞানহীন রাজনীতিবিদদের আত্মীয় স্বজন ও আশ্রিতগণ বেপরোয়াভাবে দুষ্কর্ম করতে সমর্থ হল। ফলে নির্দোষ সাধারণ আইন অনুগত নাগরিকগণের জন্য এক সঙ্কটজনক পরিস্থিতির সৃষ্টি হয় এবং জীবন-সম্পত্তির নিরাপত্তা লুপ্ত হয়। এই অবস্থায় সরকার জনপ্রিয় থাকতে পারে না।

শুধু অপরিপক্ক রাজনৈতিক নেতা হিসাবেই নয় শেখ মুজিবকে একজন অনভিজ্ঞ প্রশাসক হিসাবেও অভিযুক্ত করা হয়। তার বিরুদ্ধে স্বজনপ্রীতি, পক্ষপাতিত্ব এবং স্বেচ্ছাচারীতার অভিযোগও আনয়ন করা হয়। তিনি যে সব সংস্কার প্রবর্তন করেন সেগুলি অবিমৃষ্যকারী বলে মনে করা হয়। তিনি এমন এক প্রশাসন ব্যবস্থা প্রবর্তন করতে চেষ্টা করেন যার ফলে রাজনীতিবিদগণ জেলার গভর্ণর হিসাবে নিযুক্ত হতেন এবং তারা স্থানীয় বাকশাল নেতাদের কথামত শাসন পরিচালনা করতেন। অনেকের মনে আশঙ্কা দেখা দেয় যে এইসব গভর্ণররা নিজেদের দলের লোককে সমর্থন ও পরিতোষণ করবেন এবং তারা তাদের বিপক্ষের লোকদের উপর অত্যাচার চালাবেন।

তিনি এমন কতগুলি আইন প্রবর্তন করেন যেগুলিকে কালো আইন বলা চলে এবং যেগুলি সমর্থনের অযোগ্য। তিনি ৯ নং আদেশ নামক এক আইনের বলে সরকারী কর্মচারীদের শাস্তি প্রদান করেন এবং এই আইনে তাদের নিজেদের পক্ষে কারণ দর্শানোর সুযোগের ব্যবস্থা নাই। তিনি নিজের এবং প্রতাপশালী দলীয় লোকদের বন্ধু ও আত্মীয় স্বজনদেরকে চাকুরী প্রদান ও চাকুরীতে প্রমোশন দিয়েছেন বলেও অভিযোগ করা হয়েছে। ফলে সরকারী কর্মচারীদের মনে অনিশ্চয়তা ও ভীতির সৃষ্টি হয় এবং প্রশাসনের ক্ষতি হয়। তিনি পুলিশকে কতগুলি বিশেষ ক্ষমতা প্রদান করেন যার বলে তারা মানুষকে গ্রেফতার করে বিনাবিচারে আটক রাখতে সমর্থ হয়। সহস্র সহস্র লোককে এই ভাবে বন্দী করে রাখা হয়েছিল বলে মনে করা হয়।

তিনি লোকায়ত শাসন এবং সমাজতন্ত্র প্রবর্তনের চেষ্টা করেন। ধর্মপরায়ণ লোকেরা ইহা অপছন্দ করেন। এতদ্ব্যতীত জনগণ তাদের সম্পত্তি নিরাপদ নয় বলে ভয় পেয়ে যায়। শুধু শিল্প, ব্যবসা-বাণিজ্য ও পরিত্যক্ত অর্থনৈতিক প্রতিষ্ঠানগুলিই রাষ্ট্রায়ত্ত করা হলনা, সরকার বাংলাদেশীদের প্রতিষ্ঠানগুলিও রাষ্ট্রায়ত্ত করে ফেলল। এতে কিছু প্রতিপত্তিশালী লোকের মনেও অসন্তোষ ও ক্ষোভের সৃষ্টি হয়। তদুপরি পার্টির অনভিজ্ঞ লোকদের রাষ্ট্রায়ত্ত শিল্প প্রতিষ্ঠান গুলির পরিচালক হিসাবে নিয়োগ করা হয়। ফলে এইসব প্রতিষ্ঠানের প্রশাসনে বিশৃঙ্খলা দেখা দেয়। শুধু তাই নয়, রাষ্ট্রায়ত্ত সেক্টরে দূর্নীতি ও কর্মদক্ষতার অভাব দেখা দেয়। পরিণামে উৎপাদন হ্রাস পায় এবং দেশে দ্রব্য এবং বিভিন্ন সুযোগ সুবিধার অভাব দেখা দেয়। ফলে মূল্য বৃদ্ধি পেয়ে যায় এবং মানুষ কষ্টে পরে।

উপরন্তু আরো অভিযোগ আনা হয়েছে যে তার আমলে দেশের সীমান্ত প্রায় উন্মুক্ত করে দেওয়া হয় এবং অত্যাবশ্যকীয় দ্রব্য যেমন, চাল এবং অন্যান্য খাদ্য দ্রব্য এবং বিদেশ হতে আমদানীকৃত দ্রব্য যেমন, ঔষধ দেশের বাইরে পাচার হয়ে যেতে লাগল। এতে দেশে খাদ্যাবস্থার অবনতি ঘটল, এমন কি সঙ্কটজনক অবস্থার সৃষ্টি হল। চালের দাম বেড়ে গেল এবং সীমিত আয়ের লোকদের দূরবস্থা দেখা দিল।

অবস্থার অবনতির আরো অনেক কারণ উল্লেখ করা সম্ভব। তবে সবচেয়ে উল্লেখযোগ্য যেটা সেটা হল শেখ সাহেব একজন সত্যিকারের ডিক্টেটর হয়ে বসলেন। আর তার কতক আত্মীয় ক্ষুদে ডিকেটটরের রূপ ধারণ করল। এই ভাবে অতি অল্প সময়ের মধ্যে বাকশাল শাসনে বাংলাদেশের লোকের শ্বাসরোধ হয়ে পরল। তদুপরি দেশের প্রেস ও অন্যান্য সংবাদ সংস্থার মুখ বন্ধ করে দেওয়া হল ও বাক্যের স্বাধীনতা হরণ করা হল। এই জন্যই এই শাসন ব্যবস্থা ধ্বংসের কারণে কারো চোখে অশ্রু ঝরে নাই॥”

– মাহবুবুর রহমান (তৎকালীন সংস্থাপন সচিব এবং বাকশাল কেন্দ্রীয় কমিটির সদস্য) / কিছু স্মৃতি কিছু ধৃতি ॥ [ নওরোজ সাহিত্য সংসদ – মে১৯৮৭ । পৃ: ১৭৩-১৭৮ ]

One thought on “বাকশাল শেখ মুজিবের পতনের মুখ্য কারণ”
  1. আপনার কলাম আমার খুবই ভালো লাগে নিয়মিত পড়ি এবং অনেক কিছু জানতে পারছি আপনি বিস্তারিত আরও লেখেন মানুষের জানার প্রয়োজন আছে আসলে বঙ্গবন্ধুর শাসনামল কেমন ছিল।

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *