প্রিয়ভাষিণীকে কোলাবরেটরের অভিযােগ এনে চাকরিচ্যুত করা হয়

প্রিয়ভাষিণীকে কোলাবরেটরের অভিযােগ এনে চাকরিচ্যুত করা হয়

“… বাংলাদেশের বিশিষ্ট ভাস্কর শিল্পী ফেরদৌসী প্রিয়ভাষিণী মুক্তিযুদ্ধের নয় মাস খুলনার ক্রিসেন্ট জুট মিলে কর্মরত অবস্থায় পাকফৌজ ও তাদের সহযােগীদের হাতে বন্দি অবস্থায় নির্যাতনের শিকার হন। তারপরও তাঁকে বিয়ে করেন আসানউল্লাহ। তিনি ফেরদৌসী প্রিয়ভাষিণীকে বলেছিলেন : “আমাদের চেয়ে অনেক বড় মুক্তিযােদ্ধা তুমি। পাকিস্তানীরা কী করেছে এ নিয়ে বিন্দুমাত্র ভাববে না। আমার কাছে তুমি যেমন ছিলে তেমনই আছাে” (বিচিত্রা ২য় বর্ষ, ৪র্থ সংখ্যা, পৃষ্ঠা ৩১)।

ফেরদৌসী প্রিয়ভাষিণী বলেন, “সেপ্টেম্বরের শেষের দিকে আমি অনুভব করলাম আমার গর্ভে পাকিস্তানী পশুদের বিষাক্ত বীজের স্পন্দন। আতংকে দিশেহারা হয়ে পড়ি। তখন আমার পাশে এমন কেউ ছিলেন না যাকে আমার এ মানসিক নির্যাতনের অংশীদার করতে পারি। একাই সিদ্বান্ত নিলাম গর্ভপাতের। খুলনার ডা. কাদেরকে আমি চিনতাম। তার কাছে গিয়ে যখন আমার সিদ্বান্তের কথা জানালাম, তিনি বললেন, টাকা জোগাড় করে আনুন, আমি ব্যবস্থা করে দেবাে। তিনি ২৫০ টাকা চেয়েছিলেন। আমি সাতদিন ঘুরে ২০০ শত টাকা জোগাড় করি। ডাক্তার কাদেরের কাছে যাওয়ার পর তিনি বলেন, আমি আড়াইশত টাকার কম নিই না। তাকে অনুরােধ করলাম, বললাম এর বেশি আমার পক্ষে যোগাড় করা সম্ভব নয়। তখন তিনি বললেন, আপনার স্বামীর সম্মতি লাগবে। স্বাধীন বাংলাদেশে ফেরদৌসী প্রিয়ভাষিণীর বিরুদ্ধে কোলাবরেটরের অভিযােগ এনে তাকে চাকরি থেকে বরখাস্ত করা হয়॥”


এদেশের কিছু অসৎ মানুষ ফেরদৌসী প্রিয়ভাষিণীকে তুলে দিয়েছিল পাকিস্তানী হানাদার বাহিনীর হাতে। জি. এম ফিদা তাঁকে বলেছিলেন, “তােমার ভাইরা মুক্তিযুদ্ধে গেছে। তুমি কোনাে অবস্থায় আর্মির হাত থেকে রক্ষা পাবেনা। এর মাসুল দিতে হবে।” সে মাসুল দিতে হয়েছে ফেরদৌসীকে। তিনি আক্ষেপ করে বলেছিলেন : “একাত্তরের মুক্তিযােদ্ধাদের অনেক বীরত্বের কথা শুনেছি। দেশ হানাদার মুক্ত হওয়ার পর তাদের সেই বীরত্ব দেখিনি। তাদের কেউ কথিত বীরাঙ্গনাদের পাশে এসে দাঁড়াননি। একাত্তরে যখন নারীরা পাকিস্তানীদের হাতে নির্যাতিত হয়েছিলেন, তখন তাদের পিতা, স্বামী, ভাই কিংবা পরিবারের অন্য পুরুষ সদস্যরা পালিয়ে গেছেন অথবা হানাদার বাহিনীর হাতে জীবন দিয়েছেন। পালিয়ে যাবার পথ জানা ছিলনা বলে তখন এতাে বেশি নারী পাকিস্তানীদের নৃশংস নির্যাতনের শিকার হয়েছিলেন।” (বিচিত্রা ২য় বর্ষ, ৪র্থ সংখ্যা, পৃষ্ঠা ২৩)

“একজন বীরাঙ্গনাকে বিয়ে করতে চাই”- এই শিরােনামে একটি চিঠি এসেছিল দৈনিক আজাদ পত্রিকায় ২৮ চৈত্র, ১৩৭৮ সালে। পত্র লেখক ছিলেন নােয়াখালী জেলার পশ্চিম ছাগলনাইয়া গ্রামের অধিবাসী জনৈক নুরুজ্জামান চৌধুরী। পত্রিকার তরফ থেকে তাকে নির্ধারিত ঠিকানায় যােগাযােগ করতে বলা হয়েছিল। কিন্তু পত্র লেখক কি সত্যি সত্যি একজন বীরাঙ্গনাকে বিয়ে করতে চেয়েছিলেন এ ব্যাপারে আর কিছু জানা যায়নি। পুনর্বাসন কেন্দ্রের কর্মীরা বীরাঙ্গনা অনুসন্ধান করার কাজে নেমে বুঝেছিলেন অনুদার রক্ষণশীল ও সংস্কারাচ্ছন্ন সমাজের বৈরিতা ধর্ষিতা নারীদের পরিবার ও সংসারে পুনর্বাসনের ক্ষেত্রে কত বড় বাধা। ধর্ষিতা নারীদের পুনর্বাসনের কাজ একটি জটিল এবং কঠিন – এই সত্যটি তারা মর্মে মর্মে উপলব্ধি করেন। প্রকৃত ঘটনা ও তথ্য প্রকাশিত হলে ধর্ষিতা নারীদের স্বাভাবিক জীবনে পুনর্বাসন যখন প্রায় অসম্ভব তখন তড়িঘড়ি করে বীরাঙ্গনা সংক্রান্ত সব তথ্য ও সাক্ষ্য প্রমাণাদি নষ্ট করে ফেলা হয়।
ফেরদৌসী প্রিয়ভাষিণী তার মুক্তিযােদ্ধা ভাইয়ের অনুরােধে কৌশলে যশাের গিয়ে মেজর একরামের আস্তানা থেকে যশােরের গুরুত্বপূর্ণ কতােগুলাে জায়গার ম্যাপ পেতে সাহায্য করেছেন। এই ম্যাপ পাওয়াতে মুক্তিযােদ্ধারা যশােরের টেলিফোন টাওয়ারসহ কয়েকটি স্থানে সফল অপারেশন করতে পেরেছেন। ফেরদৌসী তার ভাইয়ের জন্য গর্বিত ছিলেন কিন্তু ওরই জন্য তাকে যন্ত্রণা সইতে হয়েছে প্রচুর। তিনি নিজে বলেছেন, “সেজভাই শিবলী যখন যুদ্ধে যায় তখন ওর জন্য কী গর্ব না হয়েছিল। অথচ ওরই জন্য আমার এ দুর্দশা। ধিক্কার দিয়েছি নিজেকে, ধিক্কার দিয়েছি গােটা পৃথিবীকে। বারবার মনে হয়েছে আমার চেয়ে অসহায় মানুষ দ্বিতীয়টি কোথাও নেই। যদিও অনেক মৃত্যু দেখেছি, নারী নির্যাতনের কথা শুনেছি, কিন্তু কখনাে ভাবিনি আমি তার শিকার হবাে।” (বিচিত্রা ১২ নভেম্বর ১৯৯৯, পৃষ্ঠা-২৭)


ফেরদৌসী প্রিয়ভাষিণী বলেন, “সেপ্টেম্বরের শেষের দিকে আমি অনুভব করলাম আমার গর্ভে পাকিস্তানী পশুদের বিষাক্ত বীজের স্পন্দন। আতংকে দিশেহারা হয়ে পড়ি। তখন আমার পাশে এমন কেউ ছিলেন না যাকে আমার এ মানসিক নির্যাতনের অংশীদার করতে পারি। একাই সিদ্বান্ত নিলাম গর্ভপাতের। খুলনার ডা. কাদেরকে আমি চিনতাম। তার কাছে গিয়ে যখন আমার সিদ্বান্তের কথা জানালাম, তিনি বললেন, টাকা জোগাড় করে আনুন, আমি ব্যবস্থা করে দেবাে। তিনি ২৫০ টাকা চেয়েছিলেন। আমি সাতদিন ঘুরে ২০০ শত টাকা জোগাড় করি। ডাক্তার কাদেরের কাছে যাওয়ার পর তিনি বলেন, আমি আড়াইশত টাকার কম নিই না। তাকে অনুরােধ করলাম, বললাম এর বেশি আমার পক্ষে যোগাড় করা সম্ভব নয়। তখন তিনি বললেন, আপনার স্বামীর সম্মতি লাগবে। (বিচিত্রা ১২ নভেম্বর ১৯৯৯, পৃষ্ঠা ২৯)
স্বাধীন বাংলাদেশে ফেরদৌসী প্রিয়ভাষিণীর বিরুদ্ধে কোলাবরেটরের অভিযােগ এনে তাকে চাকরি থেকে বরখাস্ত করা হয়॥”


– ড. নিবেদিতা দাশ পুরকায়স্থ / নারী ও বাংলাদেশ ॥ [ সূচীপত্র – ফেব্রুয়ারি, ২০১০ । পৃ: ৩০-৩৫ ]

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *