প্রণব মুখোপাধ্যায়ের প্রতি শ্রদ্ধাজ্ঞাপন ও সমালোচনামূলক পর্যবেক্ষণ

প্রণব মুখোপাধ্যায়ের প্রতি শ্রদ্ধাজ্ঞাপন ও সমালোচনামূলক পর্যবেক্ষণ

:: প্রসেনজিৎ বসু ::

ভারতের প্রাক্তন রাষ্ট্রপতি প্রণব মুখোপাধ্যায়ের প্রয়াণে আমি শোকাহত। ওনার পরিবারের সকল সদস্য এবং অনুগামীদের সমবেদনা জানাই।

৬০-এর দশকের শেষ থেকে কয়েক বছর আগে পর্যন্ত, সুদীর্ঘ পাঁচ দশক প্রথমে রাজ্যসভা এবং পরবর্তীকালে লোকসভার সদস্য হিসেবে জাতীয় রাজনীতিতে প্রণববাবু গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করেছেন। প্রধানমন্ত্রী ব্যতীত সমস্ত সর্বোচ্চ পদে উনি কোন না কোন সময় থেকেছেন – বাণিজ্যমন্ত্রী, অর্থমন্ত্রী, যোজনা কমিশনের ডেপুটি চেয়ারম্যান, প্রতিরক্ষামন্ত্রী, বিদেশ মন্ত্রী থেকে দেশের রাষ্ট্রপতি। সামলেছেন অনেক বড় বড় দায়িত্ব। ভারতের সংসদীয় রাজনীতিতে সাফল্যের উনি একজন বিরল দৃষ্টান্ত। এমন এক ব্যক্তিত্বের চলে যাওয়া সবসময়ই একটি শূন্যতা সৃষ্টি করে।

ইন্দিরা গান্ধীর এমারজেন্সি; অর্থনৈতিক ক্ষেত্রে নেহেরুর সমাজতন্ত্রকে বিসর্জন দিয়ে নয়াউদারবাদ এবং বেসরকারিকরণকে আলিঙ্গন; অতি কেন্দ্রীকরণের মাধ্যমে যুক্তরাষ্ট্রীয় কাঠামোয় রাজ্যের ক্ষমতা হ্রাস করা; জোটনিরপেক্ষতাকে শিকেয় তুলে সামরিক এবং বিদেশনীতির ক্ষেত্রে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের সাথে জোট গঠন; এবং রাম মন্দির-বাবরি মসজিদ প্রশ্নে আরএসএস-বিজেপি-র কাছে বারংবার আত্মসমর্পণ — ১৯৭০-এর দশক থেকে কংগ্রেস দলের এই লাগাতার দক্ষিনপন্থী গমনের সাথে প্রণববাবুকে কি মতাদর্শগতভাবে আলাদা করা যায়?

প্রণববাবুকে ব্যক্তিগত ভাবে চেনার সৌভাগ্য কোনদিন হয়নি। কিন্তু ঘটনাচক্রে, আমার এবং সমমনস্ক বেশ কয়েকজন কমরেডের রাজনৈতিক জীবনে প্রণব মুখোপাধ্যায় একটু অপ্রত্যাশিত ভাবেই জড়িয়ে আছেন।

দ্বিতীয় ইউপিএ সরকারের অর্থমন্ত্রী থাকাকালীন ওনাকে যখন কংগ্রেস রাষ্ট্রপতি পদে প্রার্থী হিসেবে ঘোষণা করে তখন সিপিআইএম পলিটব্যুরো তার প্রার্থীপদ সমর্থন করায় আমি প্রতিবাদে জানিয়ে দল থেকে পদত্যাগ করি, তারিখটা ২২ জুন ২০১২। সেই বিতর্কের জেরে দিল্লিতে আরও অনেকেরই সিপিআইএম-এর সাথে বিচ্ছেদ ঘটে। ওই প্রশ্নে বামদলগুলির মধ্যেও কোন ঐক্যমত ছিল না, সিপিআই এবং আরএসপি সেই সময় প্রণব মুখোপাধ্যায়কে রাষ্ট্রপতি পদে ভোট দেয় নি, তারা ভোটদানে বিরত থাকে।

এই বিতর্কটা কিন্তু মতাদর্শগত এবং রাজনৈতিক। আজকে প্রণববাবুর স্মৃতিচারণ করতে গিয়ে অনেক রাজনৈতিক কথাই উঠে এসেছে কাগজের পাতায়, সবই সপ্রশংস। সেই প্রেক্ষিতে, প্রণববাবুর প্রতি ব্যক্তিগত শ্রদ্ধা জানিয়েই কিছু সমালোচনামূলক আলোচনা এবং প্রশ্নের উত্থাপন করছিঃ

১। পশ্চিমবঙ্গের মুখ্যমন্ত্রী তাঁর স্মৃতিচারণে ধিরুভাই আম্বানির প্রণববাবুর দিল্লীর বাড়িতে যাওয়ার কথা উল্লেখ করেছেন। মন্ত্রী প্রণববাবুর বদান্যতা ছাড়া সেই আম্বানি কি আজকের আম্বানি শিল্পগোষ্ঠী হয়ে উঠতে পারতো? এই বদান্যতা কি ক্রনি ক্যাপিটালিজমের প্রকৃষ্ট উদাহরণ নয়? আজ রাষ্ট্রায়ত্ত ব্যাঙ্কগুলির যেভাবে প্রায় ৭ লক্ষ কোটি টাকার অনাদায়ী ঋণের বোঝায় ধুঁকছে, সেই বিপুল পরিমাণ ঋণ খয়রাতির মতন বণ্টন করা হয় কার আমলে? ইউপিএ আমলে একের পর এক বড় অর্থনৈতিক কেলেঙ্কারির অন্তত কিছুটা দায় কি ইউপিএ-২-এর অর্থমন্ত্রীর উপর বর্তায় না?

২। ইন্দিরা গান্ধীর এমারজেন্সি; অর্থনৈতিক ক্ষেত্রে নেহেরুর সমাজতন্ত্রকে বিসর্জন দিয়ে নয়াউদারবাদ এবং বেসরকারিকরণকে আলিঙ্গন; অতি কেন্দ্রীকরণের মাধ্যমে যুক্তরাষ্ট্রীয় কাঠামোয় রাজ্যের ক্ষমতা হ্রাস করা; জোটনিরপেক্ষতাকে শিকেয় তুলে সামরিক এবং বিদেশনীতির ক্ষেত্রে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের সাথে জোট গঠন; এবং রাম মন্দির-বাবরি মসজিদ প্রশ্নে আরএসএস-বিজেপি-র কাছে বারংবার আত্মসমর্পণ — ১৯৭০-এর দশক থেকে কংগ্রেস দলের এই লাগাতার দক্ষিনপন্থী গমনের সাথে প্রণববাবুকে কি মতাদর্শগতভাবে আলাদা করা যায়?

৩। প্রণববাবু না থাকলে কি বামপন্থী দলগুলির তীব্র বিরোধিতা সত্ত্বেও ভারত-মার্কিন পরমাণু চুক্তি সম্পন্ন হতে পারতো? বামপন্থীদের ভিতরে বিভাজন ঘটিয়ে এই চুক্তি রূপায়নের কাণ্ডারি কে? এই চুক্তি করে ভারতের জনগণের কি লাভ হয়েছে?

৪। সিপিআইএমের সাধারণ সম্পাদক আজকের আনন্দবাজারে ২০০৪ সালে জঙ্গিপুর আসন থেকে প্রণববাবুর জেতা সম্মন্ধে লিখেছেনঃ “প্রণবদা হারলে ভুল বার্তা যেত”। এটা অত্যন্ত আশ্চর্যজনক একটি স্বীকারোক্তি, কারণ প্রণববাবু জঙ্গিপুর কেন্দ্রে সিপিআইএমের প্রার্থী আবুল হাসনাত খানকেই ৩৬৮৬০ ভোটে হারিয়ে প্রথমবার জেতেন। তাহলে কি এই সিপিআইএম নেতা প্রণববাবুকে ২০০৪-এ জেতানোর জন্য নিজের দলের প্রার্থীর বিরুদ্ধে কাজ করেছিলেন?

৫। ২০১২ সালে সিপিআইএম রাষ্ট্রপতি পদে প্রণববাবুকে সমর্থন করার সময় মূলত দুটি যুক্তি দেখিয়েছিলঃ ক। কংগ্রেসের প্রার্থীকে সমর্থন করলে ধর্মনিরপেক্ষতা রক্ষা হবে; খ। এতে পশ্চিমবঙ্গে তৃনমূল এবং কংগ্রেসের মধ্যে বিভাজন হবে, যার ফলে বামফ্রন্টের কৌশলগত সুবিধা হবে। এই অবস্থানগুলির প্রেক্ষিতে যে অভিজ্ঞতা হলো, তাতে কিছু প্রশ্ন জাগেঃ

ক। প্রণববাবু রাষ্ট্রপতি হলেন, অফজল গুরুর কৃপাভিক্ষা অগ্রাহ্য করে তার ফাঁসি সুনিশ্চিত করলেন, রাষ্ট্রপতি হিসেবে বীরভূমে নিজের পৈত্রিক বাড়িতে এসে পৈতেধারি পুরোহিত হয়ে দুর্গাপুজো করলেন। ২০০২-এর গুজরাট দাঙ্গার পর তৎকালীন রাষ্ট্রপতি কে আর নারায়ণন যেভাবে প্রধানমন্ত্রী বাজপেয়ীকে একের পর এক প্রতিবাদী চিঠি লিখে সাম্প্রদায়িক হিংসার বিরুদ্ধে নিজের অবস্থান প্রকাশ করেছিলেন, ২০১৪-তে মোদী সরকার গদিতে আসার পর প্রণববাবুর সেরকম কোন ভূমিকা নিতে দেখা গিয়েছিল কি? বরং ২০১৮-তে প্রথম প্রাক্তন রাষ্ট্রপতি হিসেবে তিনি নাগপুরে আরএসএস-এর অনুষ্ঠানে গিয়ে তাদের বৈধতা দিয়েছেন, রাষ্ট্রীয় স্বয়ংসেবক সঙ্ঘের প্রতিষ্ঠাতা হেডগেওয়ারকে “ভারতমাতার মহান পুত্র” আখ্যা দিয়েছেন। মোদী সরকারই ওনাকে ভারতরত্ন প্রদান করে। আজ আরএসএস প্রধান মোহন ভগবৎ বলছেন যে প্রণববাবু তাদের পথপ্রদর্শক।

তাহলে প্রণববাবুকে রাষ্ট্রপতি বানিয়ে ধর্মনিরপেক্ষতা রক্ষা হলো কি?

খ। ২০১২-তে সিপিআইএম প্রণববাবুকে সমর্থন জানানোর কয়েকদিনের মধ্যেই মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ও ওনাকে দলের পক্ষ থেকে রাষ্ট্রপতি নির্বাচনে সমর্থন জানান। প্রণববাবু ওনার শপথগ্রহণে মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়কে কলকাতা থেকে দিল্লী নিয়ে যাওয়ার জন্য বিশেষ বিমানও পাঠিয়েছিলেন – মুখ্যমন্ত্রী সেই ঘটনার কথা আজ আনন্দবাজারে লিখেছেন বটে, কিন্তু ওটা কার বিমান ছিল সেই প্রসঙ্গ এড়িয়ে গেছেন। এর পর গঙ্গা দিয়ে অনেক জল গড়িয়েছে। ২০১৬-তে প্রণববাবুর আশীর্বাদেই বাম-কংগ্রেস জোট হয়েছে; তা সত্ত্বেও মমতা বন্দ্যোপাধ্যায় কিন্তু মুখ্যমন্ত্রী রয়েই গিয়েছেন, মাঝখান থেকে পশ্চিমবঙ্গে সিপিআইএম আর বামফ্রন্টের প্রায় এক কোটি ভোটার-সমর্থক ২০১৯-এ বিজেপি-র দিকে চলে গেছে; পার্টিটা আজ প্রায় উঠে যাওয়ার মুখে।

সেক্ষেত্রে প্রণববাবুকে রাষ্ট্রপতি পদে সমর্থন করে বা পশ্চিমবঙ্গে কংগ্রেসের সাথে জোট করে সিপিআইএম বা বামফ্রন্টের কৌশলগত কি লাভ হলো?

প্রণববাবু চলে গেছেন। প্রাক্তন রাষ্ট্রপতি হিসেবে আমরা সকলেই তাঁকে শ্রদ্ধা জানাই। তাঁর সুদীর্ঘ রাজনৈতিক জীবনে অনেক ভালো কাজ তিনি করেছেন, যার প্রশংসা অবশ্যই করা উচিৎ। কিন্তু তাঁর মতাদর্শ এবং রাজনীতি মোটেও বিতর্কের ঊর্ধ্বে নয়।

আরএসএস সরসঙ্ঘচালক থেকে সিপিআইএমের সাধারণ সম্পাদক, সকলে একসুরে যখন তাঁর স্তুতিগান গাইছেন, তখন ওনার বিতর্কিত দিকগুলিও মনে করিয়ে দেওয়া প্রয়োজন। সেটা প্রণব মুখোপাধ্যায়কে ব্যক্তি হিসেবে সমালোচনা করার উদ্দেশ্যে নয়, তাঁর মতাদর্শগত-রাজনৈতিক অবস্থানগুলি আদপেও প্রগতিশীল ছিল কিনা সেটা বামপন্থীদের কাছে একটি বিচার্য বিষয় বলে। পশ্চিমবঙ্গে যে গুটিকতক সিপিআইএম এবং বামফ্রন্টের নেতা-কর্মী এখনো অন্য দলে চলে জাননি, তাঁদের প্রশ্নগুলি নিয়ে একটু ভেবে দেখার আবেদন করছি।

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *