পিন্ডি থেকে দিল্লী

পিন্ডি থেকে দিল্লী

… যে মহান রক্তক্ষয়ী সংগ্রামের অন্তে স্বাধীন বাংলাদেশের উদ্ভব হয়েছিল, তার প্রেরণার উৎস ও চালিকাশক্তিতে রাজনৈতিক আশা-আকাঙ্ক্ষার সঙ্গে উজ্জ্বলতর অর্থনৈতিক ও বাণিজ্যিক সম্ভাবনা অঙ্গাঙ্গিভাবে নিহিত ছিল। স্বাধীনতা-পূর্বকালে আমাদের জোর দাবি ছিল তদানীন্তন পূর্ব ও পশ্চিম পাকিস্তানের বাণিজ্যিক লেনদেন, আমদানি-রপ্তানির হিসাব পৃথকভাবে রক্ষিত হােক এবং বিশেষ করে পাট ও পাটজাত দ্রব্য রপ্তানি থেকে আহরিত বৈদেশিক মুদ্রা তদানীন্তন পূর্ব পাকিস্তান (বর্তমান বাংলাদেশ)-এর উন্নয়নকল্পে মূলত ব্যয়িত হােক।

আসলে তদানীন্তন পূর্ব পাকিস্তান বাণিজ্যিক নেলদেনে নেট-উদ্বৃত্ত প্রদেশ (বা দেশ) ছিল না। তখন পূর্ব পাকিস্তান থেকে বহির্বিশ্বে (পশ্চিম পাকিস্তানসহ) রপ্তানি হতাে পাট ও পাটজাত দ্রব্য, চামড়া ও চামড়াজাত দ্রব্য, নিউজপ্রিন্ট, হস্তশিল্প সামগ্রী, দিয়াশলাই, ঝাড় , আগর, পান, কলা ও আনারস ইত্যাদি। প্রথম দুটি রপ্তানি সামগ্রী ছাড়া বাকি রপ্তানি দ্রব্যাদির গন্তব্যস্থল ছিল মূলত পশ্চিম পাকিস্তান। বহির্বিশ্ব থেকে আমদানির মধ্যে ছিল তেল, ভারী শিল্পজাত সামগ্রী, বৈজ্ঞানিক উপকরণ, ওষুধ ও চিকিৎসা উপকরণ, চাল ও গম, তুলা, কাপড়, সিমেন্ট, বিটুমিন, নির্মাণ উপকরণ, মাঝারি ও হালকা শিল্পজাত দ্রব্যাদি, ক্রীড়া উপকরণ, শুষ্ক ও কয়েক প্রকারের টাটকা ফল, পশমী দ্রব্য, ইস্পাতজাত সামগ্রী ইত্যাদি। প্রথম দু-তিনটে আমদানি সামগ্রী ছাড়া বাকি প্রায় সবগুলােই মুখ্যত আমদানি হতাে তদানীন্তন পশ্চিম পাকিস্তান থেকে। সব মিলিয়ে বাণিজ্যিক অবস্থান ছিল আমাদের প্রতিকূল।

স্বাধীন বাংলাদেশের প্রথম যুগ্ম বাণিজ্য সচিব হিসেবে ‘৭১-এর ডিসেম্বরের শেষ সপ্তাহ থেকে ‘৭২-এর জানুয়ারির প্রথম সপ্তাহে ব্যালান্স-অব- ট্রেডের হিসাব নিতে গিয়ে দেখি, অবস্থা আমাদের সাধারণ্যে প্রচলিত ধারণার পরিপন্থী। আমাদের বাণিজ্যিক ব্যালান্স ঘাটতির কোঠায়। তখন আশা করা গিয়েছিল প্রতিবেশী রাষ্ট্র ভারতের সঙ্গে স্বাধীন বাংলাদেশের বন্ধুত্বপূর্ণ সম্পর্ক আমাদের বাণিজ্যের দিক থেকে অনুকূল হবে, আমাদের উৎপদিত দ্রব্যসামগ্রী ভারতে বাজার পাবে, আমদানিও হবে তুলনামূলকভাবে কম খরচে। মার্চ মাসে হলাে ভারতের সঙ্গে প্রথম রাষ্ট্রীয় পর্যায়ে বাণিজ্য চুক্তি নিয়ে আলােচনা। বাংলাদেশের রপ্তানি-গন্তব্যের স্থান তখন খুব সীমিত। পাকিস্তানের বাজার অবলুপ্ত। আমরা তাই খুব আশা করে ছিলাম যে, এই বাণিজ্য চুক্তি আমাদের এক নতুন সম্ভাবনার দিগন্ত উন্মােচন করবে।

ওই বাণিজ্য আলােচনায় বাংলাদেশ দলের নেতৃত্ব দিয়েছিলেন তৎকালীন বাণিজ্যমন্ত্রী মরহুম জনাব এম. আর. সিদ্দিকী, সঙ্গে ছিলেন বাণিজ্য সচিব মরহুম জনাব এম, এল, রহমান আর যুগ্ম সচিব হিসেবে আমি। আলােচনার শুরুতেই বাংলাদেশের কতিপয় প্রস্তাবকে ভারতীয় দল ‘অসম্ভব এবং গ্রহণযোগ্য নয় বলে প্রত্যাখ্যান করে। এর একটি ছিল পারস্পরিক শুল্ক সুবিধা আর আরেকটি ছিল কোনাে কোনাে পণ্যের দাম নির্ধারণ সরবরাহ ও পরিবহনের খরচভিত্তিক করা।

উদাহরণস্বরূপ কয়লার কথা উল্লেখ করা যায়। বাংলাদেশে তখন জ্বালানি ও ধ্বংসপ্রাপ্ত বাড়িঘর, রাস্তা ইত্যাদির নির্মাণ কার্যে প্রচুর কয়লার প্রয়ােজন ছিল। আমাদের আশা ছিল বাংলাদেশ সন্নিকটবর্তী ঝরিয়া-রানীক্ষেত ইত্যাদি অঞ্চল থেকে হয়তাে পরিবহন খরচ আন্তর্জাতিক আমদানির চেয়ে কম হবে। কিন্তু ভারত আন্তর্জাতিক পণ্য-মূল্যের নিচে দাম নামাতে রাজি হলাে না। আরাে কয়েকটি ব্যাপারে সুবিধা পাওয়া তাে দূরের কথা, সাধারণ আলােচনায়ও মতান্তর হলাে। বাংলাদেশের পক্ষ থেকে নেপালের সঙ্গে বাণিজ্য বৃদ্ধির জন্য ট্রানজিট সুবিধা চাইতে গেলে ভারতীয় দলের নেতা তদানীন্তন বাণিজ্যমন্ত্রী এল. এন. মিশ্র বলেন, ‘নেপালের সঙ্গে কী আমদানি-রপ্তানি হবে? আমার বাড়ি উত্তর বিহারে। নেপালের বাণিজ্যের হাঁড়ির খবর আমার জানা। নেপাল থেকে যা আমদানি করবেন, তা ভারতেই পাবেন, আর রপ্তানির জন্যও ভারতই অধিকতর সুবিধাজনক হবে। তাছাড়া ওই সুযােগ দিলে ভারতে চোরাকারবারি প্রচণ্ডভাবে বেড়ে যাবে।’ এই বলে বাংলাদেশের প্রস্তাব তখন প্রত্যাখ্যাত হয়েছিল।

তদুপরি ওই বাণিজ্য চুক্তিতে বাংলাদেশের মধ্য দিয়ে ভারতের এক স্থান থেকে অন্য স্থানে পরিবহনের জন্য তারা ‘ট্রানজিট’ চুক্তির জন্য চাপ সৃষ্টি করেন। বস্তুতপক্ষে চূড়ান্ত খসড়ায় এ ধরনের একটি অনুচ্ছেদ তারা সংযােজন করেন। আমাদের প্রতিবাদ ও প্রস্তাবানুসারে তখন সেই খসড়ায় পরিবর্তন করে এটা স্থির হয় যে, উভয় দেশের স্বার্থের অনুকূল পরিবেশ নির্ণিত হলে ট্রানজিট সুবিধা দেওয়ার কথা সুবিবেচিত হবে। একটি সীমিত সীমান্ত বাণিজ্য চুক্তি হয়েছিল। কিন্তু তা ফলপ্রসূ না হওয়ায় পরবর্তীকালে পরিত্যক্ত হয়। মুদ্রাবিনিময় ও ট্রেড পেমেন্টের পদ্ধতি বিষয়েও মতান্তর হয়।

সর্ব প্রথম ওই বাণিজ্য আলােচনাকালে বাংলাদেশ দলের আশাভঙ্গ হয়েছিল। বাংলাদেশ দল অবশ্য দৃঢ়ভাবেই তাদের মতামত ব্যক্ত করে। ভারত সম্ভবত ওটা পছন্দ করেনি। দিল্লিতে থাকাকালেই গুজব শােনা গিয়েছিল যে, আমাদের বাণিজ্য সচিবকে সরিয়ে দেওয়া হবে। ফিরে আসার কিছু দিনের ভেতরেই ঝানু, নীতিনিষ্ঠ ও দেশপ্রেমী বাণিজ্য সচিব এম. লুৎফর রহমান বদলি হয়ে গেলেন। আরাে কিছু টানা-হঁচড়াও হয়েছিল।

মােদ্দাকথা হলাে, বাহাত্তরের সেই সােনালি সম্পর্কের দিনগুলােতেও ভারত-বাংলাদেশ বাণিজ্যিক ভিত্তি সুষম ও দৃঢ়ভাবে গড়ে উঠতে পারেনি। এ ব্যাপারে আমরা সুস্পষ্টভাবে ভারতীয়দের দূরদর্শিতা, সমমর্মিতা, যৌক্তিকতা ও বাস্তববােধের অভাব লক্ষ্য করেছি॥”

— ইনাম আহমেদ চৌধুরী / ভাবনায় বাংলাদেশ ॥ [ হাসি প্রকাশনী – মে, ২০০৯ । পৃ: ২১-২২ ]

অথচ জনগণের কাছে এ মৈত্রীর অর্থ ভিন্ন। তারা দেখল, পাকিস্তানি বর্বরদের কোণঠাসা করে ফেলার পর সবার আগে ইস্টবেঙ্গল রেজিমেন্ট, তারপর বাঙালি ফৌজ, তারপর মুক্তিবাহিনীর গেরিলাদের এগিয়ে দিয়ে ১০০ মাইল পেছন থেকে অতি নিরাপদে কামান দাগতে দাগতে ভারতীয় সৈন্যরা এসে ঢুকল বাংলাদেশে। মুক্তিপাগল বাঙালি তরুণরা মরণপণ লড়াই করছিল যখন, তখন ভারতীয় ফৌজ পাক সেনাদের বাঙ্কারগুলোতে জড়ো করা টাকা-পয়সা, অস্ত্র-স্বর্ণালঙ্কার ট্রাকে পুরে ১৬ ডিসেম্বরের পর থেকে সারা দেশে ভারতীয় সেনাবাহিনী কেনাকাটার উত্সব শুরু করল ব্যাঙ্কার থেকে লুট করা পাকিস্তানিদের টাকা দিয়ে।এরপর ক্রমাগত চললো বাংলাদেশে যানবাহন, অস্ত্র, অর্থ, মূল্যবান ধাতু, মূল্যবান বস্ত্র, জিনিসপত্র ভারতে পাচার করার লুটতরাজ। একটানে ৪ হাজার কোটি টাকার অস্ত্র, ১০ হাজার কোটি টাকার সম্পদ পার হয়ে গেল সীমান্তের ওপারে। এরপর মৈত্রীর বাণী নিয়ে এলো ভারতীয় মাড়োয়ারি ব্যবসায়ীরা। হলো আরেক দফা লুণ্ঠন। তারপর শুরু হলো ভারত সরকারের দ্বারা সংগঠিত ব্যবসায়ী দস্যুদলের নিয়মিত লুণ্ঠন।



০২.
“… আমাদের জীবনের সব চাইতে মূল্যবান সম্পদ স্বাধীনতা থেকে আজ আমরা বঞ্চিত। দুইশত বছর আগে বিশ্বাসঘাতক মীরজাফর জগৎ শেঠরা গদীতে বসার লোভে আমাদের দেশকে ইংরেজ দস্যুদের হাতে তুলে দিয়েছিল। দুইশত বৎসর পর সেই মীরজাফরদের বংশধর শেখ মুজিব, তাজউদ্দিন, মণি সিং, মোজাফফররা আমাদের প্রিয় মাতৃভুমিকে রাশিয়া ও ভারতের বেনিয়াদের নিকট বেঁচে দিয়েছে। এই নতুন মীরজাফরেরা ৭টি গোপন চুক্তি এবং একটি প্রকাশ্য চুক্তির মাধ্যমে যেরূপ হীন দাসত্বের সনদে স্বাক্ষর করেছে, তারা আমাদের প্রতি ও দেশের প্রতি যেরূপ বিশ্বাসঘাতকতা করেছে, অতীতে মীরজাফররাও এতখানি করেনি।

ভারতে থাকাকালে দেশদ্রোহী তাজউদ্দিন-নজরুল সাহেবরা ইন্দিরার সাথে যে সাতটি গোলামীর চুক্তি করেন তা দেশবাসীর নিকট তখনও গোপন রাখা হয় এবং এখনও গোপন রাখা হয়েছে। কিন্তু দেশদ্রোহীদের মধ্যেই গুতাগুতির ফলে তার কিছু কিছু তথ্য আজ ফাঁস হয়ে গেছে। ঐ গোপন সাতটি গোলামী চুক্তির কিছু কিছু শর্ত প্রকাশ্যে এনে দেশদ্রোহীদের সর্দার শেখ মুজিব ইন্দিরা দেবীর সাথে অষ্টম চুক্তিটি স্বাক্ষর করেছেন। আর এই হীন দাসত্বমূলক চুক্তিটির নাম দেওয়া হয়েছে “ভারত-বাংলাদেশ মৈত্রী, শান্তি ও রক্ষা চুক্তি”।

… তাজউদ্দিনের পর শেখ মুজিব রাশিয়া ও ভারতের আশ্রিত সরকারের সুবেদারী নিয়ে গোপন সাতটি চুক্তি বহাল রেখে তার কয়েকটি ধারা প্রকাশ্যে এনে ভাল ভাল কথার আবরণে অষ্টম চুক্তিটি স্বাক্ষর করেন।

… এই দাসত্বমূলক চুক্তিগুলির ফলে আমরা আমাদের সব চাইতে মূল্যবান সম্পদ স্বাধীনতাকে হারিয়েছি। আমরা হারিয়েছি রাজনৈতিক, অর্থনৈতিক, সামাজিক, সাংস্কৃতিক সর্বক্ষেত্রে স্বাধীনতা।

এই চুক্তিগুলির ফলেই রাশিয়ার সাহায্যে বলীয়ান হয়ে এবং দেশদ্রোহী তাজউদ্দিন-মণি সিংদের সাথে যোগসাজশে ইন্দিরা তার সেনাবাহিনী দিয়ে আমাদের দেশকে জবরদখল করে নিয়েছে, আমাদের ভারতের একটি আশ্রিত রাজ্যে পরিণত করেছে, বন্দুকের জোরে তাদেরই হাতে গড়া শেখ মুজিব-তাজউদ্দিনদের পুতুল সরকারকে আমাদের ঘাড়ে চাপিয়ে দিয়েছে, বন্দুকের জোরে এই পুতুল সরকারকে টিকিয়ে রাখছে, অন্যদিকে শেখ মুজিব তাজউদ্দিন প্রভৃতি মীরজাফরদের দল ভারতীয় সেনাবাহিনীর সাহায্যে গদিতে বসা ও টিকে থাকার উদ্দেশ্যে লিখে দিয়েছে গোলামীর দাসখত॥”

কমরেড মোহাম্মদ তোয়াহা / কমিউনিস্ট পার্টি (এমএল) কর্তৃক প্রচারিত (১৯৭৩)

তথ্যসূত্র : : সাঈদউর রহমান / ১৯৭২১৯৭৫ : কয়েকটি দলিল [ নয়ন প্রকাশনজুন, ২০০৪ পৃ: ১০১১০৩ ]

০৩.
“… As I write this chapter, reflecting on the present state of Indo-Bangladesh relations, I am reminded of a conversation I had with the nephew of the late Sheikh Mijibur Rehman, a youngster named Sheikh Moni, sometime towards the end of 1974. Moni was a true blue member of the Mukti Bahini and a strong believer in Indo-Bangladesh friendship. He also believed that Bangladesh could become a modern and prosperous country only if it structured itself as a pluralistic society without assuming an extremist Islamic identity. It was generally known that I would be moving away from Bangladesh to Washington at the time when this conversation took place. Moni told me that he and many of his friends would miss me when I left Dhaka. I told him that postings and transfers would not erase the profound memories which I carried about Bangladesh’s struggle for liberation, and that Bangladesh would always have a special place in my thoughts. Moni disagreed. He asserted : “You may keep memories of the Bangladesh liberation struggle, but they will become a matter of historical interest only.” He further stated : “Dada, in ten years time, attitudes will change. We will go back to the mental state of paranoia about India, and will take refuge in an Islamic identity. If you ever come to Dhaka ten years or fifteen years later, most of us will not even have Chakshu Lajja – sufficient shame in the eye – to look at all of you in the face to tell you that we are not keen on your friendship despite all that you have done for us.”

J. N. Dixit / My South Block Years : Memoirs of A foreign Secretary. [ UBS Publishers – 1996 / P. 154-155 ]

০৪.
“… স্বাধীনতার পর পঁচাত্তরের বিপ্লব-পূর্ব বাংলাদেশের রাজনীতি ছিল ভারতের প্রভাবাধীন। স্বেচ্ছায় হোক, অনিচ্ছায় হোক শেখ মুজিবের সরকারকে এটা মেনে নিতে হয়েছিল।

শেখ মুজিব সরকারের ভারতমুখিতা সম্পর্কে মওলানা ভাসানীর উক্তিঃ

‘… পরিপূর্ণ স্বাধীনতা ও মুক্তি আমাদের আসে নাই, কেননা আগেকার প্রাদেশিক গভর্ণর ও মন্ত্রীদের চাইতে অধিকতর নগ্নভাবে বাংলাদেশের মন্ত্রীরা নয়াদিল্লীতে সপ্তায় সপ্তায় গমন করেন, সেখান হইতে যে নির্দেশ দেওয়া হয়, ভারতীয় কিসিঞ্জার বাংলাদেশের অসরকারী প্রধানমন্ত্রী ডিপি ধর (হালে ইন্দিরা গান্ধীর বিশ্বস্ত হাত পশ্চিম বাংলার মুখ্যমন্ত্রী সিদ্ধার্থ বাবুরা) আসিয়া যে নির্দেশ দিয়া যান, ঠিক সেভাবই দেশ চালানোর এস্তেমাল হইতেছে। বাংলাদেশের বাৎসরিক উন্নয়ন পরিকল্পনা দিল্লীর অনুমতি ছাড়া প্রকাশ করা যায় না, বাণিজ্য চুক্তি আলোচনার নাম করিয়া অর্থমন্ত্রী নয়াদিল্লীর প্রভুদিগকে উন্নয়ন পরিকল্পনার খসড়া দেখাইয়া আনেন। সবচাইতে লজ্জার ব্যাপার হইল, একটি স্বাধীন ও সার্বভৌম দেশের জনগণের পবিত্রতম সনদ শাসনতন্ত্রটিও খসড়া হইবার পর জনগণের কাছে প্রকাশের আগে দিল্লী পাঠানো হইয়াছে। জুন মাসে (১৯৭২) আইনমন্ত্রী কামাল হোসেন শাসনতন্ত্রের খসড়া বগলদাবা করিয়া বিলাতে যাইবার নাম করিয়া দিল্লীর প্রভুদের খেদমতে হাজির হইয়াছেন। মৎস্য বিভাগ এমনকি সমবায়ের মত অনুল্লেখযোগ্য দপ্তরের মন্ত্রীরাও এদেশের প্রধানমন্ত্রীর নির্দেশ লইবার আগে নয়াদিল্লী কোলকাতা বোম্বাই দৌড়াইয়া ভারতীয় সংশ্লিষ্ট মন্ত্রীদের নির্দেশ ও ফরমায়েশ লইয়া আসেন।’ (আওয়ামী লীগের কথা ও কাজ ওয়াদাভঙ্গের এক নজির / মওলানা আব্দুল হামিদ খান ভাসানী)

অন্যদিকে ভারতীয়দের পক্ষ থেকে বাংলাদেশকে অধীনস্থ একটা প্রদেশের বেশী মর্যাদা দেয়া হতো না। কিন্তু ১৯৭৫ সালের ১৫ই আগস্টের বিপ্লবের পর ভারতীয় এই প্রভুত্বের অবলুপ্তি ঘটে এবং বাংলাদেশের রাজনীতি স্বাধীন হয় এবং স্বরূপে ফিরে আসে। এই অবস্থায় ভারতের স্বার্থবাদী মহল ধীরে ধীরে বাংলাদেশের স্বাধীনতা, সার্বভৌমত্ব ও বাংলাদেশের স্বতন্ত্র জাতি-সত্তা বিরোধী ষড়যন্ত্রমূলক রাজনৈতিক তৎপরতায় নানাভাবে ব্রতি হয়।

… বিজেপি, আরএসএস ও হিন্দু মহাসভাদের রাজনীতি মূল্যহীন অধার্মিক যাই হোক, তাদের ব্রাহ্মণবাদী রাজনীতি আজ ভারতে ব্যাপক প্রভাবশীল। তাদের দলীয় বিস্তার ও শক্তি ক্রমবর্ধমান। ১৯৯৪ সালের নির্বাচনে বিজেপি ভারতের লোকসভায় আসন পেয়েছিল মাত্র ২টি, পরবর্তী নির্বাচনের পায় ৮৮টি আসন। ১৯৯১-এর অন্তর্বর্তী নির্বাচনে আসন পায় ১১৯টি। ১৯৯৬ সালের নির্বাচনে বিজেপি জোট সংখ্যাগরিষ্ঠতা পায়। কিন্তু বিজেপি’র কোয়ালিশন সরকার টেকেনি। ১৯৯৮ সালের নির্বাচনে বিজেপি একাই ১৮২ আসন পায় এবং জোটসহ পায় ৩০৩টি আসন। বিজেপি’র কোয়ালিশন সরকার গঠিত হয়। ২০০৪ সালের নির্বাচনে বিজেপি মোট ১৯২ আসন পেয়ে হেরে যায়। বাবরী মসজিদ ভাঙ্গার যে দায় মাথায় নিয়ে বিজেপি নির্বাচন করেছে, তাতে বলতে গেলে বিজেপি আশাতীত ভাল ফল করেছে।

আর বিজেপি যদি ভারতীয় রাজনীতিতে আরও পেছনে হটে যেতো, কিংবা যায়, তাতে ভারতীয় রাজনীতির কোন হেরফের আমরা দেখিনা। কংগ্রেস ও বিজেপি’র মধ্যে কার্যত কোন পার্থক্য নেই। বিজেপি যে কথা প্রকাশ্যে বলে, সে কথাটা কংগ্রেস সযতনে গোপন রেখে সে অনুসারেই কাজ করে। পার্থক্য শুধু এইটুকু। তাছাড়া আভ্যন্তরীণ ব্যাপারে যাই হোক, বাংলাদেশ নীতির ক্ষেত্রে তাদের মধ্যে কোনই পার্থক্য নেই। দেশ বিভাগ পর্যন্ত হিন্দুমহাসভা ও আরএসএস যেমন রাজনৈতিক ব্যাপারে, বিশেষ করে মুসলমানদের স্বার্থ সম্পর্কিত রাজনীতির ক্ষেত্রে কংগ্রেসের সাথে সার্বিকভাবে একাত্ম ছিল, তেমনি তারা এই ব্যাপারে আজও একাত্ম রয়েছে। কংগ্রেস ও হিন্দুবাদী বলে পরিচিত দলগুলোর সর্বসম্মত এই বাংলাদেশ নীতিটা কি?

শ্রীলংকার সাথে রাজীব গান্ধী বহু প্রতীক্ষিত চুক্তি সম্পাদনে সমর্থ হবার পর সমীক্ষক সুনন্দা কে. দত্ত রায় মন্তব্য করেছিলেন,

‘… Now Srilanka appears to have accepted that its foreign policy, defence strategy and even domestic social and political programmes must be governed by the requirements of the government of India’s security —-Jowaharlal Neheru tried to use his stature, experience and mastery of statecraft to awe the region into submission —-Mrs. Gandhi hoped to do the same through the brute force at her command. Her son (Rajib Gandhi) has neither his grandfather’s prestige nor his mother’s strength, but has succeeded where both failed.’

অর্থাৎ, শ্রীলংকা রাজী হয়েছে যে, তার বিদেশনীতি, প্রতিরক্ষা কৌশল এবং এমনকি তার আভ্যন্তরীণ সামাজিক ও রাজনৈতিক কর্মসূচী নিয়ন্ত্রিত হবে ভারতের নিরাপত্তার প্রয়োজনকে সামনে রেখে। জওহরলাল নেহেরু তার ব্যক্তিত্ব, অভিজ্ঞতা ও রাষ্ট্রনীতির দক্ষতা দ্বারা এই অঞ্চলকে ভয় দেখিয়ে অনুগত রাখতে চেয়েছিলেন। আর মিসেস গান্ধী চেয়েছিল তার শক্তির নগ্ন ব্যবহারের মাধ্যমে। তার ছেলে রাজীব গান্ধীর মাতামহের মত প্রভাব ছিল না, আবার মা’র মত শক্তিও ছিল না, তবু তিনি সফল হলেন যা করতে তারা ব্যর্থ হয়েছিলেন। (India’s Monroe Doctrine / Sunanda K. Datta Ray ॥ Holiday – September 4, 1987)

শ্রীলংকাকে এইভাবে অনুগত করার মধ্য দিয়ে গোটা অঞ্চলকে ভারতের প্রতি আনুগত্যের শৃঙ্খলে বাঁধার মাতামহ ও মাতার ইচ্ছার পূর্ণতা দান সম্পর্কে বলতে গিয়ে সুনন্দা দত্ত উল্লেখ করেছেন,

‘… Rajib Gandhi’s success has to be viewed in the context of traditional relation with neighbors. Sikim was swallowed up 12 years ago. Bangladesh, Nepal and Bhutan are uneasy prisoner of geography, their treaties and even more, the tone and substance of political and commercial exchanges reflection of dependence.’

অর্থাৎ, প্রতিবেশীদের সাথে সম্পর্কের যে ঐতিহ্য ভারতের, রাজীব গান্ধীর সাফল্য তারই একটা অংশ। সিকিমকে ১২ বছর আগে ভারত গ্রাস করেছে। বাংলাদেশ, নেপাল এবং ভুটান তাদের ভৌগলিক, চুক্তিসমূহ, এমনকি তাদের রাজনৈতিক ও বাণিজ্যিক দিক দিয়ে ভারত-নির্ভরতার অসহায় নিগড়ে বন্দী। ভারতের সাথে সম্পর্কের এ দিকটা এতই প্রকাশ্য যে তা কাউকে বলে দেবার প্রয়োজন নেই’। (India’s Monroe Doctrine / Sunanda K. Datta Ray ॥ Holiday – September 4, 1987)

কিন্তু বাংলাদেশকে ঘিরে ভারতের তৎপরতা শুধু এটুকুর মধ্যে সীমাবদ্ধ নেই আজ। এই শতকের প্রথম দশকে এবং তৃতীয় দশকে হিন্দু রাজনীতির যে সংহার মূর্তি দেখা গেছে এবং ’৪৭ পর্যন্ত তারা অখণ্ড ভারতের শ্লোগানের আড়ালে সমগ্র উপমহাদেশ কুক্ষিগত করার যে রাজনীতি অনুসরণ করেছে, সেই রাজনীতিই এখনও ভারতে মুখব্যাদান করে রয়েছে।

১৯৭৫ সালের আগস্ট বিপ্লবের পূর্ব পর্যন্ত বাংলাদেশে ভারত অনেকটা ক্লাইভের ভূমিকা পালন করেছে। এসময় পর্যন্ত ভারত বাংলাদেশে তার শোষণ জারি রাখাসহ বাংলাদেশ সরকারের একটি প্রদেশসুলভ আনুগত্য আদায়ে ব্যাপৃত ছিল। কিন্তু আগস্ট বিপ্লবের পর ভারতের এই রাজনীতি বাংলাদেশে বন্ধ হয়ে যায়। তারপর চলে দীর্ঘ কূটনৈতিক যুদ্ধ এবং চাপ প্রয়োগের রাজনীতি। ফারাক্কা, তিন বিঘা করিডোর, দক্ষিণ তালপট্টি, পার্বত্য চট্টগ্রামের তথাকথিত শান্তিবাহিনী সৃষ্টি করা হয় বাংলাদেশের উপর। কিন্তু পঁচাত্তরের আগষ্ট-পূর্ব সেই দিন ভারতের আর ফিরে আসেনি।

অবশেষে নব্বই-এর দিকে গণতান্ত্রিক আন্দোলন জোরদার হওয়া এবং অবাধ বাক স্বাধীনতার সুযোগে বাংলাদেশে একটি মহলের মধ্যে ভারতের স্বার্থের কণ্ঠ শ্রুত হতে থাকে। কেয়ারটেকার সরকারের আমলে এই কণ্ঠ আরও শক্তিশালী হয়। স্রোতের মত বের হতে থাকে দৈনিক ও সাপ্তাহিক পত্রিকা। এর অনেকগুলোতে এবং একশ্রেণীর রাজনীতিক ও সংস্কৃতিসেবীদের কণ্ঠে ভারতের রাজনীতির কথা ধ্বনিত-প্রতিধ্বনিত হতে থাকে। ভারতীয় এ রাজনীতির মূলকথা হলো দ্বি-জাতিতত্ত্ব অবাস্তব ও জিন্নার ষড়যন্ত্র ছিল এটা এবং ভারত বিভাগ ছিল বিরাট এক ভুল। এই ভুল নিরসনের জন্যে অখণ্ড ভারত গঠন অর্থাৎ ’৪৭ পূর্ব অবস্থায় ফিরে যাবার জন্যে তাদের তরফ থেকে আহবান করা হচ্ছে। এই আহবান ভারতীয় পত্র-পত্রিকায় আজ খোলাখুলিই জানানো হচ্ছে।

Statesman ভারতের ৮৪ বছর বয়সের একটা দায়িত্বশীল দৈনিক। এই দৈনিকে ‘Reunion of India’ শীর্ষক নিবন্ধে সম্প্রতি বলা হয়ঃ

‘… Now is the time of work for a united states of India with the merger of this country Bangladesh and…’

অর্থাৎ ‘বাংলাদেশ ইত্যাদিকে ভারতের সাথে মিলিয়ে ভারতীয় যুক্তরাষ্ট্র গঠনের এটাই সময়’। (Reunion of India / M. Roy ॥ Statesman – Vol-CXXIV, No. 258012)

কোলকাতার যে আনন্দবাজার গ্রুপের পত্রিকা ‘দেশ’ বাংলাদেশকে ‘তথাকথিত’ বলে আখ্যায়িত করে এর স্বাধীন অস্তিত্বের প্রতি অস্বীকৃতি জানিয়েছিল, সেই আনন্দবাজার গ্রুপেরই পত্রিকা দৈনিক টেলিগ্রাফ ‘Bangladesh are voting against partition with their feet’ শীর্ষক নিবন্ধে বাংলাদেশী হাজার হাজার মুসলমানের ভারত চলে যাবার কল্পিত কাহিনীর উল্লেখ করে লিখে,

‘… তারা (বাংলাদেশী মুসলমানরা) ভারতে সাথে পুনর্মিলিত হচ্ছে। কারণ যখন তারা তাদের সন্তানের চোখ দিয়ে অবলোকন করেছে, দেখেছে ধ্বংস এবং জীবন বিনাশী হতাশা। তারা ভালোভাবেই বুঝে পাকিস্তান স্বপ্ন ছিল না, ছিল আগুন বর্ষণকারী দানব। পাকিস্তানকে প্রত্যাখ্যান করেছে তারা ১৯৭১ সালে। এখন দ্বিতীয়বার তারা প্রত্যাখ্যান করছে দেশ-বিভাগকে। পাকিস্তান ছিল প্রথম স্বপ্ন, দ্বিতীয় স্বপ্ন হয়ে দাঁড়িয়েছিল বাঙালী মুসলিম জাতীয়তাবাদ যা রূপ পেয়েছিল বাংলাদেশ রাষ্ট্রে। এই দ্বিতীয় স্বপ্ন বাংলাদেশকেও তারা আজ প্রত্যাখ্যান করছে।’ (Bangladeshis are Voting against partition with their feet / The Telegraph – October 25, 1992)

ভারতের রাজনীতিক, বুদ্ধিজীবী ও পত্র-পত্রিকাগুলো একদিকে ‘বাংলাদেশ রাষ্ট্র’-এর নাম মুছে ফেলে ভারতের বুকে একে লীন করার কসরত ও প্রচার-প্রপাগান্ডা চালাচ্ছে, অপরদিকে হিন্দু ধর্মকে মুসলমানদের জন্যে গ্রহণযোগ্য করার লক্ষ্যে একে ‘সুগার-কোটেড’ করে কখনও ‘শান্তিবাদী’, ‘মানবতাবাদী’, আবার কখনও সর্বরোগহরা ‘ধর্মনিরপেক্ষতাবাদী’ করার আপ্রাণ প্রয়াস চালাচ্ছে। এই লক্ষ্যে ইতিহাস পাল্টে দেয়া হচ্ছে এবং ইতিহাসের চরম সাম্প্রদায়িক লোকদেরকে মানবতাবাদী রূপ দিয়ে সামনে আনা হচ্ছে।

কোলকাতার দৈনিকStatesman লিখছে, ‘… বংকিমচন্দ্র চট্টোপাধ্যায় বলেছেন প্রকৃত হিন্দু কখনও গোঁড়া ও সাম্প্রদায়িক হতে পারে না। কংগ্রেসের জন্মের অনেক আগে ‘মনের পবিত্রতা’য় বংকিমচন্দ্র চট্টোপাধ্যায় লিখেছেন, ঈশ্বরের প্রতি ভক্তি, মানুষের প্রতি ভালোবাসা এবং মনের শান্তি – এই তিন নিয়ে হিন্দুবাদ গঠিত।’ (Reunion of India / M. Roy ॥Statesman – Vol-CXXIV, No. 258012)

এই ‘Statesman’ ই আবার লিখেছে, ‘… ধর্মনিরপেক্ষতাবাদ প্রতিষ্ঠার যুদ্ধে যদি আমরা জিততে চাই, তাহলে রামমোহন রায়, বংকিমচন্দ্র এবং রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের ঐতিহ্যকে পুনরুজ্জীবিত করতে হবে যা আমাদেরকে ধর্ম ও গোত্র-চিন্তার ক্ষুদ্র গণ্ডীর ঊর্ধ্বে উঠতে শিক্ষা দেয়।’ (Secular Order / Subrata Mukherjee॥Statesman – July 2, 1993)

স্টেটসম্যান-এর এই দুই উদ্ধৃতিতে বংকিমচন্দ্র, রামমোহন ও রবীন্দ্রনাথ যা নন সেই রূপ তাদের উপর আরোপ করা হয়েছে এবং হিন্দুধর্মকে দেয়া হয়েছে শান্তিবাদী ও মানবতাবাদী রূপ, যা ইতিহাস এবং বাস্তবতা উভয়েরই পরিপন্থী। শুধু বংকিম-রামমোহন-রবীন্দ্রনাথ নয়, গোটা ইতিহাসকেই পাল্টে দেবার চেষ্টা করা হচ্ছে এবং মুসলমানদের নির্মূলকামী শুদ্ধি আন্দোলনের নেতা স্বামী দয়ানন্দ সরস্বতী ও তার আর্য সমাজকেও ‘সুগার-কোটেড’ করার চেষ্টা চলছে। বলা হচ্ছে, ‘… ‘৪৭ পর্যন্ত সংগ্রামকে হিন্দু-মুসলমানদের বিরোধ বলা যাবে না, বলতে হবে মুসলিম লীগ ও কংগ্রেসের দ্বন্দ্ব, আর্য সমাজীদেরকেও হিন্দু সংগঠন নামে অভিহিত করা যাবে না, তারা যে ‘হিন্দুবিপ্লব’ ঘটাতে চেয়েছিল তাও মুখে উচ্চারণ করা যাবে না। বলতে হবে এসব মৌলবাদী প্রচারণা।’ (আনন্দবাজার পত্রিকা’র সম্পাদকীয় / ১৬ই জুলাই, ১৯৯৩)

অর্থাৎ আর্য সমাজ এবং স্বামী দয়ানন্দদেরকেও ধর্মনিরপেক্ষতার মুখোশ পরানো হচ্ছে। অথচ ইতিহাস স্বাক্ষী, স্বামী দয়ানন্দ সরস্বতী, স্বামী শ্রদ্ধানন্দ প্রমুখ হিন্দু নেতাদের ‘আর্য সমাজ’ হিন্দু-মুসলমান সম্পর্ক যতটা বিচ্ছিন্ন করেছে, যতো সাম্প্রদায়িকতার প্রচার করে এদেশের শান্তি শৃঙ্খলা নষ্ট করেছে, আর কোন হিন্দু সংগঠন ততটা পারেনি। আর্য সমাজ শুদ্ধির মাধ্যমে মুসলমানদের হিন্দুকরণ করার যে অভিযান চালিয়েছিল তার একটা দৃষ্টান্ত উদাহরণ হিসেবে আনন্দবাজার পত্রিকা থেকেই তুলে ধরা যায়। ৭০ বছর আগে আনন্দবাজার পত্রিকা খবর দিয়েছিল, ‘… আর্য সমাজীদের চেষ্টায় আগরার শিকারা গ্রামের ৬০০ মুসলমানকে শুদ্ধ করিয়া লওয়া হইয়াছে। অন্যান্য গ্রামের ২০০ (দুই শত) শুদ্ধি কার্যে যোগ দিয়াছে।’ (আনন্দবাজার পত্রিকা । ১৩৩০ (১৯২৩) সালের ২রা আষাঢ় সংখ্যা) ইতিহাসের এই জ্বলজ্যান্ত সাক্ষ্যগুলোকে চাপা দিয়ে সাম্প্রদায়িক হিন্দুধর্মকে এবং এর সাম্প্রদায়িক নেতাদেরকে মানবতাবাদী, শান্তিবাদী রূপে দাঁড় করানো হচ্ছে।

এইভাবে একদিকে ভারত-বিভাগকে ভুল বলে বাংলাদেশ রাষ্ট্রকে ভারত-রাষ্ট্রের বুকে লীন করার চেষ্টা চলছে, অন্যদিকে দ্বি-জাতিতত্ত্বকে অবাস্তব অবাঞ্ছিত অভিহিত করে মুসলমানদেরকে ইসলাম থেকে সরিয়ে এনে ‘ধর্মনিরপেক্ষ’, ‘মানবতাবাদী’, ‘শান্তিবাদী’র পোশাক পরিয়ে হিন্দুধর্মের সাথে লীন করার চেষ্টা করা হচ্ছে। একেই বলে ‘Final Solution’ বা ‘শেষ সমাধান’। এই ‘শেষ সমাধানের’ই চেষ্টা করছে ভারতের রাজনীতিক ও বুদ্ধিজীবিরা’। এই ‘শেষ সমাধান’ এর জন্য ‘শেষ যুদ্ধও’ শুরু করা হয়েছে। এই ‘শেষ যুদ্ধ’-এর কথা বলা হয়েছে ভারতের শাসক দল কংগ্রেসের পূর্বাঞ্চলীয় কমিটির এক বৈঠকে॥”

আবুল আসাদ / একশবছরের রাজনীতি [ বাংলাদেশ কোঅপারেটিভ বুক সোসাইটিমে, ২০১৪ পৃ: ৩১৪৩২২ ]

০৫.
“… ভারত-বাংলাদেশ মৈত্রী ষোলকলায় পূর্ণ হয়েছে, এটা কেউ অস্বীকার করছে না। ভারতীয় সেনারা মেঘালয় সীমান্তে ঘাঁটি ও খুঁটি উপড়াবার পর, ভারতপ্রেমিক মণি সিংয়ের এককালের রাজনৈতিক আস্তানা ময়মনসিংহের দুর্গাপুর থেকে ভারতীয় সৈন্যদের ছত্রচ্ছায়ায় ভারতীয় লোকেরা ধান কেটে জবরদস্তি নিয়ে যাওয়ার পর, রাজশাহী সীমান্তের ওপারে অভ্যন্তরভাগে সব কেনাকাটার পর মাড়োয়ারি ভারতীয়রা জমির ধান ফসল জমিতেই কিনতে শুরু করেছে।

সারা বাংলাদেশে ভূত ভবিষ্যত্ ইয়াবড় হা করে ভারত গিলে ফেলেছে—এরপরও যদি মৈত্রী ষোলকলায় পূর্ণ না হয়ে থাকে তো কখন হবে। অবশ্য আওয়ামী লীগ এবং তাদের সর্বনাশের সাথী মণি-মোজাফফরদের মতে এ পূর্ণতা পূর্ণিমা-আলো ঝলমল স্বপ্নিল পরিবেশ এনে দিয়েছে। আমাদের মতে এ পূর্ণতা এনেছে ঘনঘোর অন্ধকার, এ পূর্ণতা অমাবস্যার। বাংলা-ভারত মৈত্রীর আলোর প্লাবন যারা দেখেছে তাদের ব্যক্তিগত জীবনের দিকে তাকালে তাদের উপলব্ধির কারণ স্পষ্ট হয়ে ওঠে। ক্ষেতজিরাত করে যে আওয়ামী লীগ নেতারা সংসার চালাতেন, টানা-হেঁচড়ার মধ্যে তাদের আজ গাড়ি-বাড়ি হয়েছে। মণি সিংসহ কমিউনিস্ট দলের যেসব নেতা ভারতে গিয়েছিল পালিয়ে এখন শহরের অভিজাত এলাকায় শীতাতপ নিয়ন্ত্রিত ভ্যালভেট সজ্জিত বেহেশতি অফিস করেছে। নিজেদের হাই সোসাইটি মার্ক সন্তানদের সদলবলে মস্কো পাঠাচ্ছে উচ্চ শিক্ষার্থে। (ভাবখানা এই, এদেশে পড়াশোনা আর থাকা মনুষ্য সন্তানের পক্ষে সম্ভব নয়, থাকতে পারে ইতর জনেরা) মুজাফফর দলের নেতারা গাড়ি চাপছেন, তাদের বগলদাবা ‘শান্তি’র পায়রা এখন তাদের সুখের পায়রা করে তুলেছে। ভারতের অধীনতামূলক মিত্রতার দালালির বদৌলতেই তাদের এই প্রাপ্তি। তারা এ মৈত্রীকে বেহেশতি মেওয়া বলবেন না তো বলবেন কে?

অথচ জনগণের কাছে এ মৈত্রীর অর্থ ভিন্ন। তারা দেখল, পাকিস্তানি বর্বরদের কোণঠাসা করে ফেলার পর সবার আগে ইস্টবেঙ্গল রেজিমেন্ট, তারপর বাঙালি ফৌজ, তারপর মুক্তিবাহিনীর গেরিলাদের এগিয়ে দিয়ে ১০০ মাইল পেছন থেকে অতি নিরাপদে কামান দাগতে দাগতে ভারতীয় সৈন্যরা এসে ঢুকল বাংলাদেশে। মুক্তিপাগল বাঙালি তরুণরা মরণপণ লড়াই করছিল যখন, তখন ভারতীয় ফৌজ পাক সেনাদের বাঙ্কারগুলোতে জড়ো করা টাকা-পয়সা, অস্ত্র-স্বর্ণালঙ্কার ট্রাকে পুরে ১৬ ডিসেম্বরের পর থেকে সারা দেশে ভারতীয় সেনাবাহিনী কেনাকাটার উত্সব শুরু করল ব্যাঙ্কার থেকে লুট করা পাকিস্তানিদের টাকা দিয়ে।

এরপর ক্রমাগত চললো বাংলাদেশে যানবাহন, অস্ত্র, অর্থ, মূল্যবান ধাতু, মূল্যবান বস্ত্র, জিনিসপত্র ভারতে পাচার করার লুটতরাজ। একটানে ৪ হাজার কোটি টাকার অস্ত্র, ১০ হাজার কোটি টাকার সম্পদ পার হয়ে গেল সীমান্তের ওপারে। এরপর মৈত্রীর বাণী নিয়ে এলো ভারতীয় মাড়োয়ারি ব্যবসায়ীরা। হলো আরেক দফা লুণ্ঠন। তারপর শুরু হলো ভারত সরকারের দ্বারা সংগঠিত ব্যবসায়ী দস্যুদলের নিয়মিত লুণ্ঠন।

এ মৈত্রী আমাদের গরিব জনগণকে অনেক কিছু দিয়েছে, দিয়েছে ১ টাকার চাল সোয়া টাকা হওয়ার আশীর্বাদ, ৪ টাকার লুঙ্গি বারো টাকা হওয়ার খেদমত, আট আনার মাছ দু’টাকা হওয়ার সেবা। এদেশের সরল মানুষদের প্রয়োজন অনেক কম। মোটা ভাত, মোটা কাপড় আর মৃত্যুর পর একটু শেষকৃত্য—এই তারা চেয়েছে। কিন্ু্ত ভারতীয় বন্ধুত্বের অভিশাপ তাদের এই সামান্য চাহিদাটুকুকেই করে তুলেছে আকাশ ছোঁয়ার স্বপ্নের মতো। মুজিব-ইন্দিরা সরকার মিলে ইন্দিরা মঞ্চ নির্মাণ করেছে ঢাকার রেসকোর্স ময়দানে। কিন্ু্ত তারা লৌহকঠিন চাকার নিচে কোটি কোটি মানুষ নিষ্পিষ্ট হয়ে মরণ চিত্কার ছাড়ছে, গলায় দড়ি দিয়ে মরছে। তাদের হাড় দিয়ে একটা আশ্চর্য ইন্দিরা মঞ্চ তৈরি করা হলে ভারতীয় মৈত্রীর আসল অর্থ স্পষ্ট হয়ে উঠত। জনগণ যদি এই মৈত্রীর পূর্ণতাকে ঘনঘোর অমাবস্যা বলে ভাবে, তাহলে তাদের দোষ দিয়ে লাভ কী?”

আসুন আমরা মরা মানুষের হাড় দিয়ে আরেকটি ইন্দিরা মঞ্চ গড়ি / সাপ্তাহিক হক কথা২২ সেপ্টেম্বর ১৯৭২

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

Shares