নির্যাতন অন্যায়কারী অপশক্তি একদিন পরাভূত হবেই

নির্যাতন অন্যায়কারী অপশক্তি একদিন পরাভূত হবেই

একদিন সন্ধ্যায় থানায় কাজ করছি। এমন সময় মাঝ বয়েসী এক হিন্দু ভদ্রলোক হঠাৎ করেই আমার কক্ষে ঢুকে নি:শব্দে সোজা আমার পা জড়িয়ে ধরে কান্না জড়িত কন্ঠে বলতে লাগলেন, ‘স্যার আমাকে বাঁচান।’ তার এই চাপা কান্নার উদ্দেশ্য হলো অন্যরা যাতে কেউ না জানতে পারে। শেষে যদি তার এই থানায় আসার খবর অত্যাচারী নব্য ক্ষমতাধরদের কানে যায়, তবে তার পরিণতি হবে আরো ভয়াবহ। তাকে অভয় দিলাম, আশ্বস্ত করলাম। কি তার সমস্যা নির্ভয়ে বলতে বললাম। তবুও ভদ্রলোক বলতে লাগলেন, ‘স্যার ওরা জানতে পারলে আমাকে খুন করে ফেলবে।’ আমি আবারো দৃঢ়তার সাথে অভয় দিলাম, শেষে বললাম, ‘আপনাদের এবং জনগণের যদি জানমালের কোনো নিরাপত্তাই না-দিতে পারলাম, তবে আমার এখানে থাকার প্রয়োজন কি? আপনি বলুন আপনার কি সমস্যা?’

পরে শুনেছিলাম মন্ত্রী মহোদয় তাদের দু’জনকে সাথে করে ঢাকাতে নিয়ে গেছেন। তারও কিছুদিন পরে শুনেছিলাম উঁচু মহলের আশীর্বাদপুষ্ট হয়ে তারা ফুলের মালা নিযে ফিরে এসেছিলো। তাদের আচরণের কোনো পরিবর্তন হয়নি, ধরণগুলো পাল্টেছিলো মাত্র। মানুষ অতিষ্ঠ হয়ে উঠেছিলো। পরবর্তী সময়ে আমি যখন সারদাতে আইন প্রশিক্ষক ছিলাম, তখন শুনেছিলাম দু’জনের একজন প্রকাশ্য দিবালোকে ঝালকাঠি শহরের প্রাণকেন্দ্রে কোনো এক সেলুনে বসে সেভ করছিলো, হঠাৎই পিছন থেকে আততায়ী এসে স্বয়ংক্রিয় অস্ত্র দিয়ে তাকে গুলি করে হত্যা করে। আইনের বিচার আততায়ীরা হতে দেয়নি। লোকটার জন্য মায়া হয়। শক্তিধর একজন উদীয়মান তরুণের ভালো কাজের স্বীকৃতি যেমন দিগবিদিক ছড়িয়ে পরে এবং সে সবার কাছে নমস্য হয় তেমনি আবার সে যদি কোনো কুকাজ করে তবে তার প্রতিফলও সে হাতে নাতেই পায়। অপেক্ষা শুধু মাত্র কিছু সময়ের। অত্যাচারীর খড়গ-কৃপাণ যত শক্তিশালীই হোক, প্রতাপ তার যত দোর্দন্ডই হোক, পতন তার একদিন অবশ্যাম্ভাবী। নির্যাতন অন্যায়কারী অপশক্তি একদিন পরাভূত হবেই। কিন্তু ইতিহাসের এই শিক্ষা কেউই নেয় না। পৃথিবীতে নতুন নতুন মানুষ আসছে, এদেরই মাঝে কিছু মানুষ আবার আসছে অপশক্তি হয়ে। এটাও বুঝি প্রকৃতিরই নিয়ম।”


ভদ্রলোক বলতে শুরু করলেন। তিনি একজন বর্ধিষ্ণু হিন্দু পরিবারের প্রতিষ্ঠিত ব্যবসায়ী ছিলেন এই শহরে। পাকবাহিনী আর তার দোসর দালালরা তার বাড়ি ঘর, ব্যবসা প্রতিষ্ঠান পুড়িয়ে দিয়েছে। তিনি সোমত্ত মেয়ে নিয়ে এক গরিব আত্মীয়ের বাড়িতে উঠেছেন। সেখানে প্রতি রাতে কতিপয় শক্তিশালী রাজনীতির দুর্বৃত্ত সেই বাড়িতে গিয়ে আমার মেয়ের উপর জোরপূর্বক পাশবিক নির্যাতন চালায়। আমি অসহায়ের মতো নিরুপায় হয়ে থানা আওয়ামী লীগের সভাপতিকে জানিয়েছি। কিন্তু তিনি কোনো সমাধান দিতে পারেন নাই। স্যার আমি এখন কি করবো?’


যাদের নাম তিনি উল্লেখ করলেন, তারা নব্য মুজিববাদী তত্ত্বের ধ্বজাধারী যুবক। যারা এখন ধরাকে সরা জ্ঞান করে। কোনো আইনী শক্তি তাদেরকে পরাভূত করতে পারে না, এমন দোর্দন্ড প্রতাপ নিয়েই সকল বিষযের উপর একচেটিযা কর্তৃত্ব প্রতিষ্ঠিত করেছিলো তারা। নব্য ফাসিস্ট কায়দায় সব ধরণের নিপীড়নের উন্মত্ততায় তাদের অপরাধের পরিধি বেড়ে যেতে লাগলো।


… আমি দাঁড়িয়ে মাটিতে বসা নির্যাতিতা মেয়ের সেই পিতার দু’বাহু ধরে দাঁড় করালাম। একজন অসহায় পিতা সমাজে বাস করার সকল রকম মানসিক শক্তি হারিয়ে ফেলেছেন, তিনি বিধ্বস্ত। সমাজ তাকে এই অবস্থা থেকে পরিত্রাণের কোনো সহায়তা দিচ্ছে না। মানবিকতার এতো বড় অপমান আর পরাজয় আমাকে উদ্বেলিত করলো। এ লজ্জা যেনো আমার, এ পরাজয় যেনো আমার। আমার ব্যর্থতার জন্যই এই অপশক্তি মাথাচারা দিয়ে উঠেছে। 


যাদের নাম বললেন মেয়েটির পিতা, তাদের দু’জনকে আমি চিনি। আমার সাথে দেখা হলে ওরা বিনয়ী হয়ে সালাম দেয়। যেহেতু আমি তাদের চাইতে উঁচুদরের মুক্তিযোদ্ধাই ছিলাম, তাই বুঝি এটুকু মান্যতা দেখায়। ক্ষমতার দাপটে হয়তো করুণা করার ভাব দেখায়। কিছুদিন আগে অন্য একজনের জায়গার উপর অনভিপ্রেত চাপ প্রয়োগের বিষয় কানে এলে ওদেরকে বলেছিলাম এই সমস্ত হাইহ্যান্ডনেস থেকে বিরত থাকতে। হেসে হেসে তারা বিষয়টি অস্বীকার করেছিলো। এতোটাই আত্মবিশ্বাস ছিলো যে, কেউ ওদের এই অপকর্মের বিষয় থানায় জানাতে সাহস পাবে না। আর পেলেও ওসি সাহেব কোনো মামলা নিতে সাহস পাবে না এবং এ জাতীয় কাজের আগে স্থানীয় নেতাদের মাধ্যমে তারা জানতে পারবে।


মেয়েটির বাবাকে আস্বস্ত করে তার কাছ থেকে সেই অপরাধীদের বিরুদ্ধে নিজ হাতে এজাহার লিপিবদ্ধ করলাম। তাকে বললাম, মেয়েকে দূরে কোনো নিকট আত্মীয়ের বাড়িতে সকালে রেখে আসতে কয়েকদিনের জন্য। এজাহার গ্রহণ শেষে একজন বিশ্বস্ত কনস্টেবলকে তার সাথে পাঠালাম তাকে পৌঁছে দিতে। 


নিয়ম অনুযায়ী এজাহারের তিন কপি করতে হয়। প্রথম কপি কোর্টে প্রেরণ করতে হবে, দ্বিতীয় কপি পুলিশ সুপারের অফিসে এবং তৃতীয় কপি থানার এজাহার বইতে থাকবে। আমি গোপনীয়তার স্বার্থে তিন কপি এজাহার সঙ্গে সঙ্গে বই থেকে পৃথক করে আমার ড্রয়ারে তালাবদ্ধ করে রাখলাম। 


দু’দিন আগে সরকার ১০/৫ টাকার নোট ডিমোনিটাইজের ঘোষনা দিয়ে স্থানীয় ব্যাংকে জমা দিতে নির্দেশ দিয়েছে। ব্যাংকের পাশে রাস্তায় লম্বা লাইন ধরে অসংখ্য মানুষ বাতিলকৃত টাকা জমা দিতে যখন ভোগান্তির চরম সীমায়, তখন ঐ সন্ত্রাসী গ্রুপটি সেই লাইনে গিয়ে তাদের কাছ থেকে সেইসব টাকাগুলো জোর করে কেড়ে নিয়ে তাদের নিজেদের নামে ব্যাংকে জমা দিতে লাগলো, বিশেষ করে যারা দূর-দূরান্ত থেকে আসছে, তাদের টাকা । দুপুরে থানায় বসা ছিলাম। রাজারপুর থানার এমন দু’জন থানাতে এসে কান্নাজড়িত কন্ঠে অসহায়ভাবে ওদের বিরুদ্ধে অভিযোগ করলো। তাদের কাছ থেকে নিজ হাতে লিখে এজাহার নিলাম। একইভাবে এজাহারের সব কপি তালাবদ্ধ করলাম। রাতে এসডিও সাহেবকে বিষয়টি জানিয়ে রাখলাম টেলিফোনে। পরদিন সকালে তিনি ঝালকাঠি এলেন। তারপর তার সাথে আলোচনা করে সিদ্ধান্ত নিলাম। ঐ সমস্ত ব্যক্তিদের কাছ থেকে আজই রাতে কারফিউ দিয়ে অস্ত্র উদ্ধার করতে হবে।

এসডিও সাহেব তার সেকেন্ড অফিসারকে নিয়োজিত করলেন একাজে। রাত ন’টার দিকে শহরে কারফিউ ঘোষণা করা হলো। পুলিশ বিডিআর মিলে ম্যাজিস্ট্রেটসহ সন্দিগ্ধ স্থান ও বাড়িতে তল্লাশি করে অস্ত্র পাওয়া গেলো। শীর্ষ প্রভাবশালী তিন চারজনকে গ্রেফতার করে থানায় নিয়ে এলাম। রাতেই অস্ত্র মামলা রুজু করা হলো। বলা বাহুল্য আসামীরা এ দু’দিনের থানায় রুজু হওয়া মামলার এজাহারে পিন্সিপাল অফেন্ডার। গ্রেফতারকৃতদেরকে তখনকার সদ্যজারিকৃত সিডিউল অফেন্সে গ্রেফতার করলাম। এই আইনটির বিশেষত্ব হলো তারা জামিন পাবে না এবং কোর্টের জামিন দেবার ক্ষমতা খর্ব ছিলো। নিয়মিত মামলাগুলোতে Shown arrest-এর prayer দিয়ে সমস্ত কাগজপত্র রাতেই তৈরি করলাম এবং একজন এসআই-এর নেতৃত্বে ফোর্সসহ সকালে আসামীদের বরিশাল নিয়ে যাবার সকল ব্যবস্থা ঠিক করে ফেললাম। কারণ আমার যেনো কেনো মনে হলো এদের জন্য বড়ো ধরণের তদবির আসবেই। 


প্রায় ভোরবেলার দিকে বাসায় এসে হাত মুখ ধুয়ে চোখে পানির ঝাপটা দিয়ে ভালো করে মুছে বিছানায় শুয়ে পড়লাম। ঘুম আসছিলো না। এপাশ ওপাশ করছি। কখন ঘুমিয়ে গেছি। ডাকাডাকির আওয়াজে ঘুম ভেঙ্গে গেলো। ঘুম থেকে জেগে শুয়েই বললাম, কে? অনেকটা অস্থিরভাবে উত্তর এলো, স্যার আমি এএসআই শাহ আলম। ঢাকা থেকে মন্ত্রী সাহেবের পিএস ফোন করেছেন, লাইনে আছেন, আপনার সাথে কথা বলবেন। 

রাতের ডিউটিতে আজ এএসআই শাহ আলমের পালা ছিলো। আমি বললাম, আপনি থানায় যান, আমি আসছি। ঘড়ির দিকে তাকিয়ে দেখলাম সকাল পৌনে আটটা বাজে। আপাতত: সিভিল শার্ট-প্যান্ট পরে থানার দিকে রওনা হলাম। আমার রুমে ঢোকার আগে হাজতের দিকে তাকিয়ে দেখলাম আসামীরা তখনো হাজতে। একজনের সাথে চোখাচোখি হতেই সে মাথা নিচু করে রইলো। ঠিক একজন অপরাধী যে রকম অনুশোচনামূলক স্বভাব হওয়া দরকার সেরকম মনে হলো।


টেলিফোনের রিসিভারটা তখনো আমার টেবিলের উপর বাম পাশে রাখা। চেয়ারে বসে কানে ধরলাম। দেখি সোঁ সোঁ করে একটানা আওয়াজ হচ্ছে। হ্যালো, বলে লম্বা স্বরে আওয়াজ করলাম।


ওপার থেকে সেই সোঁ সোঁ আওয়াজের মধ্যেই ভেসে এলো, কে? ওসি সাহেব বলছেন?আমি সেই লম্বা আওয়াজেই আবার বললাম, জ্বী বলছি। এবার ভেসে এলো, আমি স্বরাষ্ট্রমন্ত্রীর পিএস বলছি – তখন স্লামালিকুম স্যার, বলে লম্বা সুরে সালাম জানালাম।তিনি হাজতে থাকা দু’জন আসামীর নাম ধরে বললেন, তাদেরকে কেনো গ্রেফতার করেছি এবং এখনই ছেড়ে দিতে বললেন।আমি তাৎক্ষণিক বললাম, স্যার এইমাত্র তাদেরকে কোর্টে পাঠিয়ে দিয়েছি। স্টিমারে বরিশালের পথে রওনা হয়ে গেছে।  জানি না মিথ্যা হলেও এমন বুদ্ধি কি করে মাথায় এসেছিলো। তিনি আর কিছু জানতে চাইলেন না। হয়তো থানা হাজতে থাকলে এমন একটা কাজ আমাকে করতে হতো যা কিনা সম্পূর্ণ আইন বিরোধী। থানায় বসে থাকলাম। পূর্ব নিয়োজিত সেই অফিসার আমার রুমে ঢুকে সালাম করলেন এবং জানালেন আসামীদের নিয়ে বরিশালের উদ্দেশ্যে লঞ্চঘাটে রওনা হচ্ছেন। আমি জেনারেল ডায়েরি সেদিনের জন্য ওপেন করে শুধু জেনারেল ডায়েরি লেখার জন্য সেকেন্ড অফিসারকে এনডোর্স করে বাসায় এলাম। 


চাকরি জীবনের প্রথম এই ধরণের উচ্চ পর্যায়ের টেলিফোন পেয়ে নিজেকে কিছুটা অসহায় মনে হতে লাগলো। বিষয়টি চেন অব কমান্ডের মাধ্যমে এসপি সাহেব হযে আমার কাছে জানতে চাওয়া হলে স্বস্তি থাকতো, কিন্তু সরাসরি উচ্চ পর্যায়ের এমন নির্দেশ পাওয়া নিজের কাজের যে উদ্যম এবং আইনের যে স্বকীয় গতি তার লাগাম টেনে ধরার মতো। নাস্তা খেয়ে এসে মামলাগুলোর তদন্ত করে থানায় ফিরলাম। পরদিন বিকেল তিনটে বেজে গেছে। লাঞ্চে যাবার সময় পেরিয়েই যাচ্ছে। উঠবো এমন সময় এসপি সাহেব টেলিফোন করলেন। এখনই বরিশাল যেয়ে তার সাথে দেখা করতে। তিনি ঐ আসামী দুজনের নাম উল্লেখ করে বললেন, কেন তাদেরকে গ্রেফতার করা হয়েছে, আমি সংক্ষেপে তাদের অপরাধ বিষযে এসপি সাহেবকে অবহিত করলাম এবং তাদের বিরুদ্ধে চারটি মামলা হয়েছে তাও জানালাম। টেলিফোন রেখে বাসায় এসে দ্রুত লাঞ্চ শেষ করে একজন কনস্টেবল সাথে নিয়ে এজাহার ফরওয়ার্ডিং রিপোর্ট-এর কাগজপত্রসহ বরিশালের উদ্দেশ্যে স্টিমার ঘাটে রওনা হলাম। লঞ্চ ছেড়ে যাবার আগ মুহুর্তে থানার এএসআই আব্দুল লতিফ হন্তদন্ত হয়ে লঞ্চে উঠে এসে বললেন, স্যার এসডিও সাহেব ফোন করেছিলেন। আমি বলেছি, আপনি এসপি সাহেব ডেকেছেন তাই বরিশাল যাবার জন্য লঞ্চ ঘাটের উদ্দেশ্যে একটু আগে রওনা হযে গেছেন। এসডিও সাহেব বলেছেন, ওসি সাহেব যেনো তার সাথে বরিশাল অফিসে দেখা করেন।


… এসপি সাহেব অফিসেই ছিলেন। এসপি সাহেব আসামীদের নাম ধরেই বললেন, তাদের বিরুদ্ধে কি কি আছে তা কালই স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ে রিপোর্ট করতে হবে। এসডিও সাহেবের অফিসটি এসপি সাহেবের সাথেই বলা যায়। একই কম্পাউন্ডে। এসডিও সাহেবের অফিসে ঢুকে স্যালুট দিলাম। তিনি মুচকি হেসে আসুন বলে বসতে বললেন। বসলাম আমি। এসডিও সাহেব বললেন, আপনার ঝালকাঠি নিয়েই এখনো বসে আছি। এই নিন পড়ুন বলে টাইপ করা একটি কাগজ বাড়িয়ে দিলেন আমার দিকে। হাতে নিয়ে পড়তে শুরু করলাম। ইংরেজিতে লেখা এসডিএম কোর্টের অর্ডার সিটের কপি। তাতে লেখা – আসামী অমুক অমুককে ঝালকাঠি থানা পুলিশ সিডিউল অফেন্সে গ্রেফতার করে কোর্টে হাযির করেছে। আসামীদ্বয়ের জামিনের আবেদন দেখলাম। জনাব অমুক মিছিল সহকারে শ্লোগান দিয়ে আদালতে হাযির হয়ে জানান অমুক সাহেব ঢাকা থেকে বলেছেন এসডিও সাহেব যেনো আসামীদের জামিন দেন। শুনলাম যেহেতু সিডিউল অফেন্সে জামিন দেবার বিধান নাই, তাই আমি ডিসি সাহেবের সাথে টেলিফোনে আলাপ করলাম। তিনি মিটিং করছিলেন। ডিসি সাহেব সববিষয় শুনে আমাকে আসামীদের জামিন দিতে বললেন। অতএব, আসামীদের দুইজন সিওরিটিসহ পাঁচ দিনের জন্য জামিন মঞ্জুর করা হলো। আসামীগণ প্রতিদিন একবার আদালতে হাজিরা দেবে। ওসি ঝালকাঠি থানাকে পাঁচদিনের মধ্যে প্রতিবেদন দিতে নির্দেশ প্রদান করা হলো। 


আমি এই অদ্ভুত রকম আদেশনামাটি আমার হ্যান্ড ব্যাগে রেখে দিলাম। তারপর এসডিও সাহেবের কাছ থেকে বিদায় নিয়ে এসপি সাহেবের স্টেনো আর আমি প্রায় দেড় ঘন্টা যাবৎ বসে প্রতিবেদনে দাঁড় করালাম। প্রতিবেদনে আসামীদের কার্যকলাপ এবং তাদের বিরুদ্ধে মামলাগুলোর সংক্ষিপ্ত বিবরণী এবং জন-প্রতিক্রিয়াসহ সকল বিষয়ই উল্লেখ করলাম। শেষে এসপি সাহেবের নিকট থেকে বিদায় নিয়ে রাতের স্টিমার ধরে ভোর রাতে ঝালকাঠি পৌঁছলাম।


এসডিও সাহেবের সেই আদেশনামায় উল্লেখিত আমার প্রতিবেদন দেবার পাঁচ দিনের সময় সীমার দু’দিন আগেই বরিশাল থেকে স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী মহোদয়ের বরিশাল আসার প্রোগ্রাম জানানো হলো। এসপি সাহেব এবং আমি যেনো পৌরসভার সভাকক্ষে আগামী কাল সকাল ১০টায় হাযির থাকি।


… কিছুক্ষণের মধ্যেই মন্ত্রী সাহেব এসে নামলেন। এসপি সাহেব পিছনের গাড়ি থেকে নামতেই আমি তার পাশে গিয়ে স্যালুট দিয়ে সিআই সাহেবসহ আমরা রাতে এসেছি এবং সিআই সাহেব হঠাৎ অসুস্থ হয়ে পড়েছেন তা জানালাম। তিনি মন্ত্রী মহোদয়ের পিছে পিছে হাঁটতে হাঁটতে বললেন, ঠিক আছে আপনি থাকেন। মিটিং শেষে আপনার সাথে কথা বলবেন মন্ত্রী মহোদয়। টেনশনের মাত্রা আরো একধাপ বাড়লো আমার। অনাহূতের মতোই মিটিংয়ে আগত অভ্যাগতদের শেষের সারিতে আমি একাই বসে থাকলাম। 
আমার ডাক পড়লো আর আমি পিছন দিকেই বসা ছিলাম। সামনে এসে মন্ত্রী মহোদয়কে স্যালুট দিয়ে দাঁড়ালাম। মন্ত্রী মহোদয় মৃদুভাবে মাথা ঝুঁকিয়ে জবাব দিলেন স্যালুটের। তারপর সেই দু’জন গ্রেফতারকৃতদের নাম ধরে বললেন, তাদের বিরুদ্ধে কি অভিযোগ? কেনো তাদের গ্রেফতার করেছেন? আমি মন্ত্রী মহোদয়কে একজন শিক্ষিত অসহায় বাবা তার মেয়ের সম্ভ্রম না রক্ষা করতে পারার যে আকুতি তার বর্ণনা দিলাম এবং আসামীদের ভয়ে নিরূপায় হয়ে আমার পা জড়িয়ে ধরে তার কান্নার বর্ণনা দিলাম। জোরপূর্বক ব্যাংকে জমাদানকারী লোকদের প্রকাশ্যে অস্ত্র উঁচিয়ে বাতিল ঘোষিত নোট ছিনিয়ে নিয়ে নিজ নামে জমা দেওয়াসহ অন্যান্য অপকর্মের বর্ণনা দিলাম। শেষে বললাম, আমি একজন মুক্তিযোদ্ধা অফিসার হিসেবে এমন অপরাধীকে যদি গ্রেফতার না করতাম তা হলে আমার এই সরকারি পোশাকের অবমাননা হতো বলে আমি মনে করি। মুজিবনগর থেকে এসে প্রথমেই আমি দালাল গ্রেফতার করেছি। মন্ত্রী মহোদযের পাশে বসা পিএস সাহেব মামলাগুলোর নাম্বার জানতে চাইলেন। আমি আমার সাথে রাখা কাগজপত্র থেকে তাকে কেস নাম্বারগুলো দিলাম। তিনি নোট করলেন। আমাকে বিদায় দিলে আমি মন্ত্রী মহোদয়কে স্যালুট করে বের হয়ে এলাম।


পরে শুনেছিলাম মন্ত্রী মহোদয় তাদের দু’জনকে সাথে করে ঢাকাতে নিয়ে গেছেন। তারও কিছুদিন পরে শুনেছিলাম উঁচু মহলের আশীর্বাদপুষ্ট হয়ে তারা ফুলের মালা নিযে ফিরে এসেছিলো। তাদের আচরণের কোনো পরিবর্তন হয়নি, ধরণগুলো পাল্টেছিলো মাত্র। মানুষ অতিষ্ঠ হয়ে উঠেছিলো। পরবর্তী সময়ে আমি যখন সারদাতে আইন প্রশিক্ষক ছিলাম, তখন শুনেছিলাম দু’জনের একজন প্রকাশ্য দিবালোকে ঝালকাঠি শহরের প্রাণকেন্দ্রে কোনো এক সেলুনে বসে সেভ করছিলো, হঠাৎই পিছন থেকে আততায়ী এসে স্বয়ংক্রিয় অস্ত্র দিয়ে তাকে গুলি করে হত্যা করে। আইনের বিচার আততায়ীরা হতে দেয়নি। লোকটার জন্য মায়া হয়। শক্তিধর একজন উদীয়মান তরুণের ভালো কাজের স্বীকৃতি যেমন দিগবিদিক ছড়িয়ে পরে এবং সে সবার কাছে নমস্য হয় তেমনি আবার সে যদি কোনো কুকাজ করে তবে তার প্রতিফলও সে হাতে নাতেই পায়। অপেক্ষা শুধু মাত্র কিছু সময়ের। অত্যাচারীর খড়গ-কৃপাণ যত শক্তিশালীই হোক, প্রতাপ তার যত দোর্দন্ডই হোক, পতন তার একদিন অবশ্যাম্ভাবী। নির্যাতন অন্যায়কারী অপশক্তি একদিন পরাভূত হবেই। কিন্তু ইতিহাসের এই শিক্ষা কেউই নেয় না। পৃথিবীতে নতুন নতুন মানুষ আসছে, এদেরই মাঝে কিছু মানুষ আবার আসছে অপশক্তি হয়ে। এটাও বুঝি প্রকৃতিরই নিয়ম।”

শফিউল ইসলাম, সাবেক এআইজি

পুলিশ জীবনের সারি বাধা পথে, মুক্তচিন্তা – ফেব্রুয়ারি, ২০০৮ । পৃ: ৮৭-৯৭

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *