নাসিমের মৃত্যু, মোহাম্মদ এ আরাফাত ও জনগণের পুঞ্জিভূত ঘৃণা

নাসিমের মৃত্যু, মোহাম্মদ এ আরাফাত ও জনগণের পুঞ্জিভূত ঘৃণা

:: পিনাকী ভট্টাচার্য ::

মোহাম্মদ নাসিমের মৃত্যু ও রাজাকার শাবকদের ‘উল্লাস’ শিরোনামে মোহাম্মদ এ আরাফাত ফ্যাসিস্টদের দালাল মিডিয়া বাংলানিউজ২৪ এ একটা কলাম ছাপিয়েছে। সে নিজেকে একজন অধ্যাপক এবং সুচিন্তা ফাউন্ডেশনের চেয়ারম্যান হিসেবে দাবী করে। 


অবশ্য তার মূল পরিচয় হচ্ছে, সে শেখ হাসিনার পুত্র সজীব ওয়াজেদ জয়ের বন্ধু। সে কোথায় অধ্যাপনা করে তা আমার জানা নেই। তবে কিন্তু দুর্ভাগ্যজনকভাবে যারা তার ছাত্র ও যারা তাকে সেই ভাগ্যাহত ছাত্রদের পড়াতে দেন তাদের জন্য আমি উল্লেখিত শিরোনামের লেখার শেষ অংশটা তুলে দিচ্ছি। সেখানে সে লিখেছে: “গণতন্ত্র চান? বন্য পশুদের দিয়ে পশুতন্ত্র হয়, গণতন্ত্র নয়। গণতন্ত্রের জন্য লাগে ‘গণ’, পশুদের দিয়ে গণতন্ত্র হয় না। অন্তরে যাদের এতো ঘৃণা, মানুষের মৃত্যুতে যারা ‘উল্লাস’ প্রকাশ করে। যারা ধর্মের নামে নারী ধর্ষণ করে, রাজনীতির নামে শিশু হত্যা করে, কৌশলের নামে গ্রেনেড ছুড়ে মারে তাদের দিয়ে আপনি ‘গণতন্ত্র’ ‘গণতন্ত্র’ খেলবেন? হবে না। এরা পাশবিক, এদেরকে গণতন্ত্র দিলে এরা গণতন্ত্রকে ছিড়ে খাবে। এরা গণতন্ত্রের যোগ্যই না। এরা গণতন্ত্র চায় মানুষের উপর পশুতন্ত্র প্রতিষ্ঠার জন্য।”
এই লোকের কোন ন্যূনতম  শিক্ষা আছে? এমন মূর্খকে দিয়ে কে ছাত্র পড়ায়?

সরি অধ্যাপক আরাফত, আরো নির্মমতা, আরো গণতন্ত্রহীনতা দিয়ে আপনি জনগণের এই সম্মিলিত পুঞ্জিভূত  ঘৃণা মোকাবেলা করতে পারবেন না। রক্তচক্ষুকে ভয় পাওয়ার দিন শেষ, বাংলাদেশের মানুষ জাগছে, আপনাদের সময় শেষ হয়ে এসেছে।


এই হলো সেই মানুষ, যারা মনে করে গণতন্ত্র সবার জন্য নয় ! ভবিষ্যতে এরা যদি কোন দিন গণতন্ত্রের জন্য লড়াই করে, তখন এই লেখাগুলোই তাদের জন্য ব্যাকফায়ার করবে।


সমাজের মাঝ বরাবর এরা একটা লাল দাগ টেনে দিয়ে দুভাগ করে ফেলেছে: রাজাকার আর মুক্তিযোদ্ধা। যারা অপর, যারা তার বিরোধী তারা রাজাকার আর নিজেরা মুক্তিযোদ্ধা। বড়ই অবাক কাণ্ড।  
সবার জন্য গণতন্ত্র নয়, এই তত্ত্বের সপক্ষে সে যুক্তি দেখিয়েছে যে বাংলাদেশের সংখ্যাগরিষ্ঠ মানুষ সাবেক স্বাস্থ্যমন্ত্রীর মৃত্যুতে উল্লাস প্রকাশ করেছে।


বাংলাদেশের আপামর জনগণ নাসিমের রোগাক্রান্ত হবার সংবাদে আনন্দিত হয়েছিলো তা সত্য। নাসিমের স্ট্রোক করাতে সেই আনন্দ দ্বিগুণ হয়েছিলো। নাসিম মৃত্যুবরণ করাতে জনগণ প্রকাশ্য আনন্দ প্রকাশ করতে দ্বিধা করেনি। 


এর আগে নাসিমের ছেলে তার বাবার আরোগ্যের জন্য দোয়া চেয়েছিলো। সেই সময়ে  জনগণ বলেছে, “দোয়া তো করতে চেয়েছিলাম কিন্তু দোয়া করতে গেলে কোথায় থেকে গায়েবী আওয়াজ এলো, দোয়া করা হয়ে গেছে, বাসায় ফিরে যান।” ঠিক যেভাবে গত নির্বাচনে নাসিমের এলাকা সহ সব এলাকাতেই আগের রাতে ভোটের বাক্স প্রশাসন ও দলীয় গুণ্ডাদেরকে দিয়ে ভর্তি করে রেখে পরদিন নির্বাচনের আসল তারিখে ভোট দিতে গেলে সব ভোটারদেরই বলা হয়েছে, “ভোট দেয়া হয়ে গেছে, বাসায় ফিরে যান”। সেটার অনুকরণেই লোকজন বলেছে, “দোয়া করা হয়ে গেছে, বাসায় ফিরে যান”।

নাসিম ছিলো পলিটিক্যাল ক্রিমিন্যাল। বাংলাদেশকে বদমাশ রাষ্ট্রে রুপান্তর করার কারিগর।

এহেন ক্রিমিন্যালের মৃত্যুতে জনগনের কী প্রতিক্রিয়া হতে পারে সেটা নিয়ে আগেও নানা আলাপ ও বিতর্ক হয়েছে। আরাফাত নামের মূর্খটা হয়তো সেই আলাপগুলো কখনো দেখেনি।


অধ্যাপক আরাফাতকে আমি  হাল আমলে আমেরিকায় ওসামা বিন লাদেনের মৃত্যু সংবাদে সারা আমেরিকায় উল্লাসের পটভুমিতে চলা বিতর্কের আলাপগুলো দেখতে বলবো।

সেখানে ধর্মবিদ, রাজনীতিবিদ, দর্শনের অধ্যাপক, সমাজবিদ, নৃতাত্ত্বিক সবাই এই বিতর্কে অংশ নিয়েছিলেন।

সেই আলাপে দুটো বিষয় উঠে এসেছিলো। প্রথমত, মানুষ তখুনি আরেকজনকে শয়তান বা ইভিল বলে মনে করে যখন সে সেই

ইভিলের থেকে নিজেকে বিচ্ছিন্ন এবং ভিন্ন সত্তা বলে মনে করে। আর দ্বিতীয়ত মানুষ তখুনি প্রতিপক্ষকে শুধু পরাজিত করেই ক্ষান্ত হয়না তাকে নিশ্চিহ্ন করেই নিজের বিজয়কে সম্পূর্ণ বলে মনে করে, যখন তার প্রতিপক্ষ ক্রিমিন্যাল অফেন্সের সাথে যুক্ত আছে বলে বিশ্বাস করে এবং মনে করে সেই প্রতিপক্ষ বেঁচে থাকলে সে আরো অপরাধ করতেই থাকবে।


আওয়ামী লীগ রাষ্ট্রিয় সকল প্রতিষ্ঠান ধ্বংসের জন্য দায়ী। যত দিন গেছে গণতান্ত্রিক প্রতিষ্ঠানগুলো ততো বেশী ধ্বংস হয়েছে। আওয়ামী লীগ যতোদিন ক্ষমতায় থাকবে, ততোদিন বাংলাদেশের ধ্বংস হওয়া চলতে থাকবে। তাই আওয়ামী শাসনের কড়ি বর্গা, নাট বল্টু কারোরই নিশ্চিহ্ন হবার সম্ভাবনা দেখা দিলে মানুষ উল্লসিত হয়।


সিভিল রাইটস অ্যাক্টিভিস্ট ক্ল্যারেন্স ড্যারো বলেছিলেন, “সকলেরই খুন করার মতো আবেগ থাকে; যখন কাউকে কেউ দৃঢভাবে অপছন্দ করে তখন তারা অনিচ্ছাকৃতভাবে কামনা করে যে সে মারা যাক। আমি কখনও কাউকে খুন করি নি, তবে আমি কিছু শোকবার্তা অত্যন্ত সন্তুষ্টির সাথে পড়েছি।”


আওয়ামী লীগ নিজেদেরকে এমন জায়গায় নিয়ে গেছে যে তারা জনগণ থেকে বিচ্ছিন্ন আজ। আর আওয়ামী লীগকে মানুষ ক্রিমিন্যাল, বাংলাদেশ রাষ্ট্রের হত্যাকারী বলে মনে করে।


দুঃখজনকাভাবে দেশবাসী মোহম্মদ নাসিমের মৃত্যুসংবাদ আনন্দের সাথে পাঠ করেছিলো। এটাই স্বাভাবিক। সারা দেশের স্বাস্থ্যব্যবস্থা লুটপাট করে সকল সম্পদ বিদেশে পাচার করে মোহম্মদ নাসিম দেশের মানুষকে যেই ভঙ্গুর স্বাস্থ্যব্যবস্থা উপহার দিয়েছিলেন। করোনাকালে সেই স্বাস্থ্যব্যবস্থার সামনে অসহায়ভাবে দাড়িয়ে থেকে নাসিমকে সে জনতা অভিশাপ দিয়েছে। আমরা একইভাবে অভিশাপ দিয়েছিলাম পাক বাহিনীকে।


খালেদা জিয়া জেলে থাকা অবস্থায় যখন তিনি মারাত্মকভাবে অসুস্থ তখন তিনি নাকি অসুস্থতার ভান করছিলেন এই কথা এবং সাদেক হোসেন খোকাকে পুলিশে মেরে মাথা ফাটিয়ে রক্তাক্ত করে দিলে সেটাকে গরুর রক্ত বলে উপহাস করেছিলো এই নাসিমই। এই নাসিমই নির্লজ্জভাবে রাতের বেলায় ব্যালট বাক্স ভরেছে। নাসিম ছিলো হাসিনার ফ্যাসিস্ট শাসনের অন্যতম খুঁটি। পলিটিক্যাল অপোনেন্টদের গুম-খুন করা, ক্রসফায়ারে ফেলা, তাদের বিরুদ্ধে ভুয়া মামলা করে গ্রেফ্তার করা এসব নাসিমরাই করতো। রাজনৈতিক বিরোধীদের দেশান্তরে বাধ্য করে দেশকে এই নাসিমরাই বাংলাদেশকে বিরুদ্ধ রাজনীতি শূন্য করে দিয়েছে। মানুষের ভোটের অধিকার আর নাগরিক অধিকার কেড়ে নিয়েছে। নিজেদের জন্য সব সুবিধা রেখে সাধারণ মানুষকে এই করোনাকালে ন্যূনতম চিকিত্সা সেবা থেকে বঞ্চিত করেছে। অক্সিজেনের অভাবে করোনা রোগীরা তীব্র কষ্ট নিয়ে তড়পাতে তড়পাতে মারা যাচ্ছে।  


পলিটিক্যাল ক্রিমিন্যালের মৃত্যুকে সাধারণ মানুষের মৃত্যুর সাথে মিলিয়ে ফেললে হবেনা। হিটলারের মৃত্যুতে কী আপনি উল্লাস করবেন না? মুসোলিনির? জল্লাদ ইয়াহিয়ার মৃত্যুতে?


পলিটিক্যাল ক্রিমিন্যালেরা অপরাধ করে জাতি, রাষ্ট্র, মানবতার বিরুদ্ধে। এই ধরণের মানুষের মৃত্যুতে সাধারণ মানুষের উল্লাস খুবই স্বাভাবিক ঘটনা।


শেখ মুজিবের দুঃখজনক মৃত্যুর পরে দেশের মানুষ এভাবেই উল্লাস করেছিলো। কারণ শেখ মুজিব এভাবেই মুক্তিযুদ্ধের চেতনার সাথে বিশ্বাসঘাতকতা করে বর্বর ও নির্মম একদলীয় শাসন উপহার দিয়েছিলো এবং শান্তিপূর্ণভাবে তার অপসারণের সব পথ বন্ধ করে দিয়েছিলো।


সরি অধ্যাপক আরাফত, আরো নির্মমতা, আরো গণতন্ত্রহীনতা দিয়ে আপনি জনগণের এই সম্মিলিত পুঞ্জিভূত  ঘৃণা মোকাবেলা করতে পারবেন না। রক্তচক্ষুকে ভয় পাওয়ার দিন শেষ, বাংলাদেশের মানুষ জাগছে, আপনাদের সময় শেষ হয়ে এসেছে।

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

Shares