স্বাধীনতা যুদ্ধের ঘোষনায় ধর্ম নিরপেক্ষতার উল্লেখ নেই

স্বাধীনতা যুদ্ধের ঘোষনায় ধর্ম নিরপেক্ষতার উল্লেখ নেই

“… ১৯৫৪ সালের নির্বাচন উপলক্ষে গঠিত যুক্তফ্রন্টের ঘোষণানুসারে — 

“কায়েদে আযমের বলিষ্ঠ নেতৃত্বে সংগ্রাম করিয়া ভারতের দশকোর্টি মুসলমান পাকিস্তান প্রতিষ্ঠা করিয়াছে। বিরাট ঐতিহ্য সম্পন্ন একটি মহান জাতির ধর্ম ও সংস্কৃতির জন্য আলাদা রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠা অপরিহার্য ছিল। … মুসলিম লীগের নামে বর্তমান শাসক সম্প্রদায় জনগণকে বিভ্রান্ত করার জন্য যে শ্রেষ্ঠতম কৌশল আবিষ্কার করিয়াছে, তাহাতে আমাদের ধর্ম ও সংস্কৃতি বিপন্ন হইতে চলিয়াছে। … আল্লাহ ও ইসলামের নাম করিয়া ইহারা এমন সব কাজ করিয়া থাকে, যাহাতে আল্লাহর অবমাননা এবং ইসলামের অমর্যাদা করা হয়। আমরা … লীগ শাহীর ধর্মবিরােধী কার্যকলাপের যে পরিচয় দান করিব, তাহাতে দেখা যাইবে যে ইহাদের হাতে শাসন ক্ষমতা থাকিলে পাকিস্তানে ইসলামী হুকুমৎ কোনকালেই কায়েম হইবে না।” (বাংলাদেশের স্বাধীনতা যুদ্ধ : দলিলপত্র, প্রথম খন্ড, পৃ: ৩৭৬-৩৭৭)

১৯৭০ সালের নির্বাচনে বিজয়ী আওয়ামী লীগ বাংলাদেশের প্রথম সরকার গঠন করে। আওয়ামী লীগের আন্দোলনের কোন পর্যায়ে ধর্মনিরপেক্ষতা প্রতিষ্ঠার আহ্বান না থাকলেও ১৯৭২ সালের সংবিধানে ধর্মনিরপেক্ষতাকে রাষ্ট্রীয় চার মূলনীতির একটি হিসেবে গ্রহণ করা হয়। এতদসত্ত্বেও শেখ মুজিব ও আওয়ামী লীগ সরকারের কার্যক্রম থেকে এটি স্পষ্ট হয়ে উঠে যে, সংবিধানে গৃহীত ধর্মনিরপেক্ষতা কার্যক্ষেত্রে বাস্তবায়নে তারা আন্তরিক ছিলেন না। আওয়ামী লীগ প্রধান শেখ মুজিব ১৯৭২ সালের ১০ জানুয়ারী বাংলাদেশকে বিশ্বের দ্বিতীয় বৃহত্তম মুসলিম রাষ্ট্র বলে ঘােষণা দেন। ১৯৭৪ সালে শেখ মুজিব লাহোরে অনুষ্ঠিত ইসলামী সম্মেলন সংস্থার বৈঠকে যোগদান করেন। ১৯৭৫ সালে আওয়ামী লীগ সরকার কর্তৃক ইসলামী ফাউণ্ডেশন পুন: প্রতিষ্ঠিত করা হয়। আওয়ামী লীগের অনুসারী ধর্মীয় নেতাদের সংগঠন আওয়ামী উলামা পরিষদ’ কে ধর্মভিত্তিক রাজনীতি নিষিদ্ধ থাকার সময়েও কার্যক্রম চালাতে দেওয়া হয়।

১৯৫৫ সালে আওয়ামী লীগ মদ, গাজা, বেশ্যাবৃত্তি ইত্যাদি ‘হারাম কাজ’ বন্ধ এবং নামাজ, রোজা, হজ্ব, জাকাত ইত্যাদি শরীয়ত সংগত কাজে জনগণকে উদ্বুদ্ধ করার জন্য সরকারের নিকট তাবলীগ (ধর্ম প্রচার) বিভাগ খোলার দাবী জানায়। (বাংলাদেশের স্বাধীনতা যুদ্ধ : দলিলপত্র, দ্বিতীয় খন্ড, পৃ: ৪২০) 

১৯৭০ সালের নির্বাচনী প্রচারণায় আওয়ামী লীগ মুসলিম জনগণকে কোরআন ও সুন্নাহ বিরোধী কোন আইন পাশ করা হবে না বলে প্রতিশ্রুতি দেয়। নির্বাচনে বিজয় লাভের পর আওয়ামী লীগের সংবিধান কমিটি কর্তৃক প্রণীত খসড়া সংবিধানের প্রস্তাবনায় পাকিস্তানের মুসলমানদের ব্যক্তিগত ও সামষ্টিক জীবনকে কোরআন ও সুন্নাহর আলোকে গড়ে তোলার কথা বলা হয়। (বাংলাদেশের স্বাধীনতা যুদ্ধ : দলিলপত্র, দ্বিতীয় খন্ড, পৃ: ৭৯৩) উক্ত খসড়া সংবিধানের রাষ্ট্রীয় নীতি নির্ধারক মূলনীতিতে বলা হয়েছে। যে  — 

(১) কুরআন ও সুন্নাহ বিরোধী আইন পাশ করা হবে না ও 

(২) কোরআন ও ইসলামীয়াত শিক্ষা দেওয়ার ব্যবস্থা এবং 

(৩) মুসলমানদের মধ্যে ইসলামী নৈতিকতার উন্নয়নে ব্যবস্থা নেওয়া হবে। (বাংলাদেশের স্বাধীনতা যুদ্ধ : দলিলপত্র, দ্বিতীয় খন্ড, পৃ: ৭৯৪) 

১৯৭১ সালের স্বাধীনতা যুদ্ধের ঘোষনায়ও ধর্ম নিরপেক্ষতার কোন উল্লেখ নেই। (বাংলাদেশের স্বাধীনতা যুদ্ধ : দলিলপত্র, তৃতীয় খন্ড, পৃ: ৪) এমনকি মুক্তিযুদ্ধ চলাকালেও বাংলাদেশের উদ্দেশ্য ও লক্ষ্য হিসেবে ধর্মনিরপেক্ষতার ঘোষণা দেওয়া হয়নি।(বাংলাদেশের স্বাধীনতা যুদ্ধ : দলিলপত্র, তৃতীয় খন্ড, পৃ: ৭৯১)

১৯৭০ সালের নির্বাচনে বিজয়ী আওয়ামী লীগ বাংলাদেশের প্রথম সরকার গঠন করে। আওয়ামী লীগের আন্দোলনের কোন পর্যায়ে ধর্মনিরপেক্ষতা প্রতিষ্ঠার আহ্বান না থাকলেও ১৯৭২ সালের সংবিধানে ধর্মনিরপেক্ষতাকে রাষ্ট্ৰীয় চার মূলনীতির একটি হিসেবে গ্রহণ করা হয়। এতদসত্ত্বেও শেখ মুজিব ও আওয়ামী লীগ সরকারের কার্যক্রম থেকে এটি স্পষ্ট হয়ে উঠে যে, সংবিধানে গৃহীত ধর্মনিরপেক্ষতা কার্যক্ষেত্রে বাস্তবায়নে তারা আন্তরিক ছিলেন না। আওয়ামী লীগ প্রধান শেখ মুজিব ১৯৭২ সালের ১০ জানুয়ারী বাংলাদেশকে বিশ্বের দ্বিতীয় বৃহত্তম মুসলিম রাষ্ট্র বলে ঘােষণা দেন। ১৯৭৪ সালে শেখ মুজিব লাহোরে অনুষ্ঠিত ইসলামী সম্মেলন সংস্থার বৈঠকে যোগদান করেন। ১৯৭৫ সালে আওয়ামী লীগ সরকার কর্তৃক ইসলামী ফাউণ্ডেশন পুন: প্রতিষ্ঠিত করা হয়। আওয়ামী লীগের অনুসারী ধর্মীয় নেতাদের সংগঠন আওয়ামী উলামা পরিষদ’ কে ধর্মভিত্তিক রাজনীতি নিষিদ্ধ থাকার সময়েও কার্যক্রম চালাতে দেওয়া হয়। তৎকালীন আওয়ামী লীগ সরকারের একজন মন্ত্রী এক ভাষণে বলেন যে, বাংলাদেশ ইসলামী আদর্শ ও শিক্ষার প্রতি আস্থাশীল এবং সে ইসলামী আদৰ্শ, শান্তি ও বিশ্বভ্রাতৃত্ব প্রতিষ্ঠার জন্য প্রচেষ্টা চালিয়ে যাবে। (সৈয়দ আনোয়ার হোসেন, বাংলাদেশের ধর্মভিত্তিক রাজনীতি, বিচিত্রা, ৩ নভেম্বর, ১৯৮৪)

উপরোক্ত আলােচনার আলোকে একথা স্পষ্টভাবে প্রতীয়মান হয় যে, প্রাক-স্বাধীনতা ও স্বাধীনতা পরবর্তীকালে কোন সময়েই আওয়ামী লীগ ধর্মনিরপেক্ষতার আদর্শ বাস্তবায়নে সত্যিকার অর্থে আগ্রহী ছিল না। মুক্তিযুদ্ধ চলাকালে ধর্মভিত্তিক রাজনৈতিক দলগুলাের বাংলাদেশ বিরােধিতা ও প্রতিবেশী রাষ্ট্র ভারতের প্রত্যক্ষ সাহায্য ও সহানুভূতি লাভের কারণে আওয়ামী লীগ নেতৃত্ব ধর্মনিরপেক্ষতা (ইহজাগতিকতা অর্থে নয়) গ্রহণ করলেও এটি বাস্তবায়নে তারা কোন দৃঢ় উদ্যোগ গ্রহণ করে নি। শেখ মুজিব ও আওয়ামী লীগ সরকার রাজনৈতিক বাস্তবতা অনুধাবন করে এ বিষয়ে ধীরে ধীরে তাঁদের মূল অবস্থানে ফিরে আসতে থাকেন। জিল্লুর রহমান খানের মতে, “Two things prevented Mujib from making any structural change in Bangladesh political system, or to give it an Islamic slant. First, such a posture would have cast doubt in the minds of Hindus. … Second, Islamization of the constitution would have strained Bangladesh relations with India. (Islam and Bengali Nationalism, Rafiuddin Ahmed, p. 24)

… পাকিস্তানের ওলামা নেতৃত্বাধীন ধর্মভিত্তিক রাজনৈতিক দলগুলাের অধিকাংশ কর্তৃক বাংলাদেশের স্বাধীনতা সংগ্রামের বিরােধীতা, শাসনতান্ত্রিক অর্থে ধর্মনিরপেক্ষ প্রতিবেশী রাষ্ট্র ভারত কর্তৃক বাংলাদেশের স্বাধীনতা সংগ্রামে প্রত্যক্ষ সহায়তাদান ইত্যাদি স্বাধীনতা পরবর্তীকালে গঠিত বাংলাদেশ সরকারকে ধর্মনিরপেক্ষ আদর্শ গ্রহণ ও ধর্মভিত্তিক রাজনীতি নিষিদ্ধকরণে অনুপ্রাণিত করে। ফলে বাংলাদেশের ওলামাদের ধর্মভিত্তিক রাজনীতি আইনত নিষিদ্ধ হয়ে যায়। কিন্তু পূর্ববাংলার স্বায়ত্বশাসন আন্দোলন ও স্বাধীনতা সংগ্রাম চলাকালে আলিমদের ভুমিকা যাই হােক না কেন বাংলাদেশের সাধারণ মুসলিম জনগণের ওপর ইসলাম ও আলিমগণের আবেদন সবসময় বিরাজমান ছিল। জনগণের এ ধর্মানুভূতিকে কাজে লাগানোর জন্য স্বাধীনতা সংগ্রাম চলাকালে ও স্বাধীনতা পরবর্তীকালে আওয়ামী লীগ সরকারকেও চেষ্টিত দেখা যায়। আওয়ামী লীগ নেতাদের বক্তব্য বিবৃতি ও আওয়ামী লীগ সরকারের কার্যক্রমে এ বিষয়ক বহু প্রমাণ পাওয়া যায়।

পাকিস্তানের বিভিন্ন সরকারের ন্যায় আওয়ামী লীগ সরকারও ঘােষণা করে যে, বাংলাদেশের সংবিধান ও কোন আইন কোরআন ও সুন্নাহর পরিপন্থী হবে না। ১৯৭২ সালে বন্ধ করে দেওয়া ইসলামী ফাউন্ডেশন ১৯৭৫ সালে আওয়ামী লীগ সরকারের আমলেই পূন: প্রতিষ্ঠিত হয়। ধর্মভিত্তিক রাজনীতি নিষিদ্ধ হওয়া সত্ত্বেও আওয়ামী রাজনীতির সমর্থক ওলামা সংগঠন আওয়ামী উলামা পরিষদকে বৈধভাবে কাজ চালাতে দেওয়া হয়। ধর্মভিত্তিক রাজনীতি নিষিদ্ধ থাকার সময়েও ধর্মভিত্তিক রাজনীতির সমর্থক ওলামা ও রাজনৈতিক কর্মীগণ বিভিন্ন নামে ধর্মীয়, সামাজিক ও সাংস্কৃতিক সংগঠন গড়ে তােলা, এসব সংগঠনের মাধ্যমে দেশব্যাপী ‘মিলাদুন্নবী’, ‘সিরাত মাহফিল’ ইত্যাদির আয়ােজন করে ধর্মভিত্তিক রাজনীতির অনুসারী ওলামা ও রাজনৈতিক কর্মীগণ সংগঠিত হতে থাকে।

আওয়ামী লীগ সরকারের দ্রুত জনপ্রিয়তা হ্রাসের অন্যান্য কারণগুলাের মধ্যে ধর্মনিরপেক্ষতাকে রাষ্ট্ৰীয় আদর্শ ও ভারতের প্রতি দূর্বলনীতি গ্রহণকে গুরুত্বপূর্ণ বলে মনে করা হয়। আওয়ামী লীগ সরকার যে উদ্দেশ্যেই ধর্মনিরপেক্ষতাকে রাষ্ট্ৰীয় আদর্শরূপে গ্রহণ করুক না কেন বাংলাদেশের ব্যাপক ধর্মনিষ্ঠ (সাম্প্রদায়িক নয়) জনগণের নিকট তা সমাদৃত হয়নি।

— প্রফেসর ড. হাসান মোহাম্মদ / বাংলাদেশ : ধর্ম, সমাজ ও রাজনীতি ॥ [ গ্রন্থমেলা – ফেব্রুয়ারি, ২০০৩ । পৃ: ১৩-১৭ / ৬৪-৬৬ ]

০৫.

“… এই রাজনৈতিক সংগঠনের নাম তখন ছিল আওয়ামী মুসলিম লীগ। আনুষ্ঠানিকভাবে সে তার মুসলিম ত্যাগ করে বায়ান্নর রাষ্ট্রভাষা আন্দোলন ও চুয়ান্নর সাধারণ নির্বাচন পার হয়ে ১৯৫৫তে। আওয়ামী লীগের সভাপতি মওলানা ভাসানী ও শামসুল হক উভয়ে খিলাফতে রাশেদীনের মতে রাষ্ট্র ও সমাজ গড়ার কথা ভাবতেন। সে-সময়ে ধর্মনিরপেক্ষতা তাদের চিন্তায় ছিল না, যদিও ছাত্র ও রাজনৈতিক কর্মীদের অগ্রসর অংশের মধ্যে তা ছিল। অনেক পরে ১৯৭০-এ এসে আওয়ামী লীগ যখন ছয় দফার ভিত্তিতে জাতীয় সংসদের নির্বাচনে জনসমর্থন চাচ্ছে তখনও দেখছি শেখ মুজিবুর রহমানের নির্বাচনী আবেদন শুরু হচ্ছে আসসালামে আলায়কুম’ দিয়ে। (বাংলাদেশের স্বাধীতা যুদ্ধ : দলিলপত্র, দ্বিতীয় খন্ড, পৃ: ৫৮১)

যুদ্ধ শুরু হয়ে গেছেনবগঠিত বাংলাদেশ সরকারের নামে নির্দেশাবলী প্রচার করা হচ্ছেতখনও দেখা যাচ্ছে প্রথম প্রচলিত নির্দেশাবলীর কাগজের ওপরে আল্লাহু আকবর লেখা রয়েছে। (বাংলাদেশের স্বাধীতা যুদ্ধ : দলিলপত্র, দ্বিতীয় খন্ড, পৃ: ৬০৮) শেখ মুজিবের ৭ মার্চের বক্তৃতা শেষ হয়েছিল একটি অঙ্গীকারের মধ্য দিয়ে। ‘রক্ত যখন দিয়েছি রক্ত আরাে দেব – এদেশের মানুষকে মুক্ত করে ছাড়ব ইনশাল্লাহ।’ ওই বক্তৃতায় ‘ইনশাল্লাহ’ তিনি ওই একবারই বলেছেন। পঁচাত্তরে এসে সংকটের মুহূর্তে ২৫ জানুয়ারীর বক্তৃতাতে ‘ইনশাল্লাহ’ অনেকবার এসেছে; দীর্ঘ বক্তৃতায় উপসংহারে এসে আহ্বান জানিয়ে তিনি বলছেন, ‘সকলে মিলে নতুন প্রাণ, নতুন মন নিয়ে খােদাকে হাজের নাজের করে, আত্মসমালােচনা করে আত্মশুদ্ধি করে ইনশাল্লাহ কাজে অগ্রসর হন।’ (মাহমুদ হাসান, ‘অমর একুশে স্মরণে’, ‘নতুন দিন’, লন্ডন, ফেব্রুয়ারী ১৯-২৫, ১৯৯৯)

“… ভারতের প্রতি বাংলাদেশের জনসাধারণের মনোভাবের অবনতি ঘটার অনেক ছোটখাট কারন আছে। মনস্তাত্ত্বিক কারন রয়েছেই। পঁচিশে মার্চের আগে অনেক হিন্দুই এ দেশ ছেড়ে চলে গিয়েছিল। তাদের অনেকে ফিরে এসে পূর্বে বিক্রীত জমিজমা দাবী করায় আইনশৃংখলা ঘটিত প্রশ্নের উৎপত্তি হয়েছে এবং বিভিন্ন মহলে আতঙ্কও সৃষ্টি হযেছে। পঁচিশের পরে যারা গিয়েছে, তাদেরও অনেকের অর্বাচীন উক্তিও মানুষের মনে বিরূপ প্রতিক্রিয়ার সৃষ্টি করেছে। এরূপ খবর অনেক স্থান থেকেই পাওয়া গেছে, সেখানে স্থানীয় মুসলমানদের বলেছে, ‘মিঞা সাব এখন আর পাকিস্তান নাই, বুঝে সুঝে চলেন’। বার বার ধমক শুনে অনেক জায়গায় লোকজন বিরক্ত হয়ে উত্তর দিয়েছে, ‘তাই বলে কি হিন্দুস্থান হয়ে গেল নাকি?’ অনেক মুসলমান মনে করে যে ঐ উক্তির তাৎপর্য হল যে, যেহেতু পাকিস্তান নাই সেহেতু হিন্দুস্থান হতে বাধ্য। মুসলমান স্বভাবত:ই আঁৎকে উঠে।

ছোটখাট, এমনকি অনেক সময় হাস্যকর হলেও এইসব খুচরা ব্যাপারগুলিকে উড়ায়ে দেওয়া চলে না। জনসাধারণের মানসিক অবস্থা কি কারণে গঠিত হয় তার প্রতি দৃষ্টি রাখলে এসব কথার গুরুত্ব উপলব্ধি করা সম্ভব হয়।

… আমি নিজে ব্যক্তিগত জীবনে ধর্মীয় জীবনাদর্শে প্রগাঢ় বিশ্বাসী এবং আমার দলও ধর্মীয় চেতনা ও মূল্যবোধ সংরক্ষণে আগ্রহী। জাতীয় জীবনে ধর্মনিরপেক্ষতার অর্থ হচ্ছে রাষ্ট্রীয় ব্যাপারে ধর্মনিরপেক্ষতা অবলম্বন করবে অর্থাৎ কোন ধর্মের প্রতি পক্ষপাতিত্ব প্রদর্শন করবে না। অথচ দূর্ভাগ্যবশত: স্বাধীনতার পর বাংলাদেশে ধর্মকে ঘৃণা করা, ধার্মিকের অবমাননা করা ফ্যাসনে পরিণত হয়েছে। স্বাধীনতার পূর্ব থেকেই যারা ধর্মবিরোধী প্রবণতা প্রকাশ করেছে, বাংলাদেশ ধর্মনিরপেক্ষ রাষ্ট্র হবে শুনে তারা আনন্দে আত্মহারা হয়ে পরেছে, এই ভেবে যে, ধর্মের নিগঢ় থেকে তারা মুক্তিলাভ করল। বলাবাহুল্য মুসলমানের সংখ্যাই অধিক। এরা অন্যধর্ম সম্বন্ধে যৎকিঞ্চিত জ্ঞানলাভ করে থাকলেও ইসলাম সম্বন্ধে বিন্দুমাত্র জ্ঞান লাভ করে নাই এবং ইসলাম বিরোধী লেখকদের পুস্তক-পুস্তিকা পড়ে ইসলাম সম্বন্ধে শুধু অবজ্ঞা অর্জন করতে পেরেছে।

ধর্মনিরপেক্ষতার কদর্থ এখন ধর্মহীনতার স্তর অতিক্রম করে ধর্ম-বিরোধীতার পর্যায়ে চলে এসেছে। তাও অন্য ধর্মের বিরোধীতা নয়। বিরোধিতা শুধু ইসলামের বিরুদ্ধে। মুসলমান ধর্মের কথা তুললেই সাম্প্রদায়িক বা ধর্মান্ধ (communal & fanatic) আখ্যা লাভ করে। অন্যেরা তাদের ধর্ম সম্বন্ধে বক্তৃতা দিলে তাকে পন্ডিত নাম দেওয়া হয়। অনেক পন্ডিত ব্যক্তি যাদের ইসলাম সম্বন্ধে জ্ঞান অত্যন্ত সীমাবদ্ধ এবং যারা ধর্মীয় অনুষ্ঠান পালনে কোনরূপ আগ্রহ দেখান না, তারাও সময়ে অসময়ে অনর্থক ইসলামকে মর্ডানাইজ অর্থাৎ আধুনিক করে তোলার সুপারিশ করে থাকেন। এতে করে অনেকের মনে এই ধারনা জন্মায় যে ইসলাম সত্যিসত্যী সে কালের ধর্ম – বর্তমান কালের পক্ষে একদম অনুপযোগী ইত্যাদি। অর্থাৎ একে আধুনিক পোষাক পরাতে হবে। প্রকৃত ধার্মিক, যে ধর্মেরই হোক না কেন, অন্যধর্মের প্রতি অশ্রদ্ধা প্রকাশ করতে পারেন না। যারা নিজের ধর্মকে অবজ্ঞা করে তারা পরের ধর্মকে ভাল চোখে দেখতে পারে না। তারাই দেশে সাম্প্রদায়িক মনোভাব সৃষ্টি করে॥”

— আতাউর রহমান খান (প্রাক্তন প্রধানমন্ত্রী) / বাংলাদেশ জাতীয় লীগের সভাপতি হিসেবে প্রদত্ত ভাষণ – ১১ নভেম্বর১৯৭২

তথ্যসূত্র : ড: সাঈদ-উর রহমান / ১৯৭২-১৯৭৫ : কয়েকটি দলিল ॥ [ নয়ন প্রকাশন – জুন,২০০৪ । পৃ: ১৫৯-১৬২ ]

০২.

দুই বক্তৃতার মধ্যে পরিমাণগত নয় শুধু গুণগত ব্যবধান রয়েছে। দ্বিতীয় বক্তৃতায় আগের আত্মবিশ্বাস নেই, যাদের শ্রেণীগত স্বার্থকে তিনি এগিয়ে নিয়ে গেছেন তাদের ওপর ভরসা করতে পারছেন না, আত্মসমালােচনা ও আত্মশুদ্ধির কথা বলতে হচ্ছে। বক্তৃতা দিচ্ছিলেন সংসদে; ষড়যন্ত্রকারীদের কেউ কেউ তাঁর পাশেই বসে ছিল, ভাবছিল৷ অন্যের জানবার কথা নয়। কিন্তু উদ্দীপ্ত যে হচ্ছিল না তা ঠিক। ওদের প্রধান খন্দকার মোশতাক আহমদ নিজেকে পীর বংশের সন্তান বলে দাবী করতেন, মাথা থেকে টুপি নামাতে চাইতেন না; অন্য একজন, তাহেরউদ্দীন ঠাকুর, তখন না-হোক পরে ধর্মকর্মের দিকে বিশেষভাবে ঝুঁকে পড়েছিলেন॥”

— সিরাজুল ইসলাম চৌধুরী / বাঙালীর জাতীয়তাবাদ ॥ [ ইউপিএল – ২০১১ । পৃ: ২৫৪ ]

০৩.

“… ৬ দফা বা আমাদের অর্থনৈতিক কর্মসূচী ইসলামকে বিপন্ন করে তুলেছে বলে যে মিথ্যা প্রচার চালানো হচ্ছে – সে মিথ্যা প্রচারণা থেকে বিরত থাকার জন্য আমি শেষবারের মত আহবান জানাচ্ছি। অঞ্চলে অঞ্চলে এবং মানুষে মানুষে সুবিচারের নিশ্চয়তা প্রত্যাশী কোনকিছুই ইসলামের পরিপন্থী হতে পারে না।

আমরা এ শাসনতান্ত্রিক নীতির প্রতি অবিচল ওয়াদাবদ্ধ। কোরাণ ও সুন্নাহর নির্দেশিত ইসলামী নীতির পরিপন্থী কোন আইন এদেশে পাশ হতে বা চাপিয়ে দেয়া যেতে পারে না॥”

— শেখ মুজিবুর রহমান / রেডিও পাকিস্তান থেকে প্রচারিত ভাষণ – ১০.১০.১৯৭০ইং

তথ্যসূত্র : মুজিবরের রচনা সংগ্রহ / সোমেন পাল  ॥ [ রিফ্লেক্ট পাবলিকেশন (কলিকাতা) – জুন, ১৯৭১। পৃ: ৫৫ ]

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *