দেশবিরোধী প্রদীপ চক্রকে ঝেটিয়ে বিদায়ের সময় এসেছে

দেশবিরোধী প্রদীপ চক্রকে ঝেটিয়ে বিদায়ের সময় এসেছে

:: মুজতবা খন্দকার ::

প্রথম অালোকে ধন্যবাদ। তদন্ত প্রতিবেদন প্রকাশ করার জন্য। অার নিন্দা করি সেই তথাকথিত সংবাদ কর্মীকে যিনি এই রিপোর্ট প্রকাশের জন্য বিস্ময়করভাবে স্বরাষ্ট্রমন্ত্রীর কাছে প্রথম অালোর বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেবেন কি না এমন অসাংবাদিকসুলভ,দায়িত্বজ্ঞানহীন বালখিল্য প্রশ্ন ছুড়ে দিয়েছেন।
দেশে বহু ঘটনার পর তদন্ত কমিটি গঠন হয়,কমিটি রিপোর্ট দেয়। কিন্তু কোনোদিন সে রিপোর্ট অালোর মুখ দেখেনা। সিনহা হত্যার পর গঠিত তদন্ত কমিটি রিপোর্ট হাতে পাওয়ার পর স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী স্পষ্ট করে বলেছেন,তদন্ত রিপোর্ট প্রকাশ করা হবেনা। কিন্ত যে ঘটনা সারাদেশে অালোড়ন সৃষ্টি করেছিল,সেই ঘটনার পর গঠিত তদন্ত কমিটির অনুসন্ধান কি সেটা জানার অাগ্রহ সবারই ছিলো। স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী জনগনের সে কৌতুহলের মুখে শুরুতেই পানি ঢেলে দিয়েছিলেন। কিন্তু প্রথম অালো তার পাঠকদের কৌতুহল নিবৃত্ত করেছে। তদন্ত কমিটি কে তদন্ত কমেডির হাত থেকে এ যাত্রা বাঁচিয়েছে। এই জন্য অাবারো প্রথম অালো এবং তাঁর অনুসন্ধিৎসু রিপোর্টারকে ধন্যবাদ জানাই।

সিনহা হত্যার তদন্ত প্রতিবেদন আমাদের অনেক কিছু চোখে আঙ্গুল দিয়ে দেখিয়ে দিচ্ছে.. এই প্রতিবেদনের পর সরকারের আর নাক কান মুখ চেপে কিম্বা দাঁতকপাটি লাগিয়ে বসে থাকার সময় শেষ। এখন সবক্ষেত্রে দেশবিরোধী সব প্রদীপ চক্রকে সরকারের সব জায়গা থেকে ঝেটিয়ে বিদায় করার সময় এসেছে। কিন্তু সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্ন হচ্ছে, জনগনের যথাযথ ম্যান্ডেটবিহিন এবং হিন্দুস্থানের মদদপুষ্টু সরকার সেটা করতে আদৌ উৎসাহ দেখাবে কি?


অাঙ্গুর ফল টক বলে একটা প্রবাদ অাছে,যে রিপোর্টার অাজ স্বরাষ্ট্রমন্ত্রীকে প্রথম অালোর বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেয়ার বিষয়ে স্বরাষ্ট্রমন্ত্রীকে প্রশ্ন করেছেন,সে অাসলে মনের জ্বালা থেকে এটা বলেছেন। কারন, প্রথম অালোতে অাজ ভোরে এই প্রতিবেদন দেখে তার চীফ রিপোর্টার কিম্বা নিউজের বস তাকে অাচ্ছা করে ধাতানি দিয়েছে। অার সেই অপমানের জ্বালা মেটাতে তিনি এই ধরনের প্রশ্ন করেছেন বলে অামার ধারনা। অামিও এক সময় রিপোর্টার ছিলাম। নিজের বিটের কোনো গুরুত্বপূর্ণ কিছু মিস করলে বসের ঝাড়িটা কেমন খেতে হয়, কিম্বা প্রতিদ্বন্দ্বী গণমাধ্যমে যদি তেমন স্কুপ বা ব্রেকিং কিছু প্রকাশ হয়,যেটা অামি পাইনি,সেটা দেখে নিজেকে কতখানি অপমানিত বোধ হয়,সেটা অামি ঢের জানি। একজন রিপোর্টারের লাইফ লাইন হচ্ছে তার সোর্স। সে সোর্স একটি অফিসের পিওন, কম্পোজিটর থেকে টপ মোষ্ট কর্মকর্তা হতে পারে। অার এসব তৈরী করতে হলে তাদের পেছনে সময় দিতে হয়,নার্সিং করতে হয়,মেইনটেনেন্স করতে হয়,ক্ষেত্র বিশেষ কখনো কখনো তাদের অন্যায্য অাবদারও শুনতে হয়। অার যখনই তারা কোনো রিপোর্টারকে অাস্থায় নিতে পারে, বিশ্বাস করতে পারে,তখনই সে তাকে রিপোর্টের ম্যাটেরিয়ালস দেয়।


একজন ভালো সাংবাদিকের ক্যাপিটালই হচ্ছে,তার অনেক রিলায়বল সোর্স থাকা। ছোট্ট একটা ঘটনা বলি, অামি তখন সংবাদে কাজ করি। ল, মিনিষ্ট্রি এবং সুপ্রিমকোর্ট তখন অামার বিট। ২০০৪ সালের কথা বিএনপি নেতৃত্বাধীন জোট সরকার ক্ষমতায়।পঞ্চম সংশোধনী মামলার রায়ে জিয়াউর রহমান সরকারের সব কিছু অবৈধ ঘোষণা করে রায় দিয়ে বিচারপতি খায়রুল হকের হাইকোর্ট বেঞ্চ।অত্যন্ত গোপনে। খবরটি অাইন মন্ত্রনালয় জানেনা, সেই সময়ের অ্যাটর্নী জোনারেল হাসান অারিফ অবশ্য পরে জানতে পারেন।মুন সিনেমার মামলায় যে সংবিধানের খোলনচে বদলে দেয়ার একটা রায় দেবেন সেটা সরকারের অাইন কর্মকর্তা কিম্বা অাইনমন্ত্রী ব্যারিষ্টার মওদুদেরও ধারনার বাইরে ছিলো। য়েদিন রায় হয়, তার দুদিন কি তিনদিন পরে অামি নিউজটা পাই,সংবাদে তখন অামার প্রধান বার্তা সম্পাদক ছিলেন মনজুরুল অাহসান বুল বুল,চীফ রিপোর্টার ছিলেন সাইফুল অামিন। বুলবুল ভাই তখন নিউজ এডিটরেরও কাজ করতেন। তিনি বললেন,স্কুপ নিউজ এটা লীড হবে, পরদিন সংবাদে অামার বাইলাইনে পাঁচ কলামে নিউজটি লীড হয়। অামাকে পরদিন অামার অন্যান্য সহকর্মীরা ছেকে ধরেন,কে দিয়েছে তোমাকে নিউজটা সারাদিন এক সাথে থাকলাম, এমন একটা খবর অামাদের কাছে চেপে গেলে.. তারা যুগপথভাবে বেশ হতাশ এবং ক্ষুদ্ধ। অামি বলতে গেলে অথ বাউন্ড ছিলাম। সোর্স ডিক্লোজ করিনি। অাজও করলামনা। এমনটা হয়,সাংবাদিকতা এমনি.. কখনো কখনো স্বার্থপর হতে হয়। কিন্তু অামার সেই সময়ের সহকর্মীদের কেউতো অামার কিম্বা পত্রিকার বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেয়ার কথা সেই সময়ের অাইনমন্ত্রীকে উস্কে দেননি। যদিও সেই রায়ে অাইমন্ত্রী হিসেবে ক্যাবিনেটে বেশ চাপে পড়তে হয়েছিলো ব্যারিষ্টার মওদুদকে।


ফিরে অাসি অাবার অাজকের প্রসঙ্গে এম্নিতে ডিজিটাল অাইন করা হয়েছে। মতপ্রকাশের অধিকার ক্রমশ সংকুচিত হয়ে অাসছে.. সেই সময়ে একজন সাংবাদিকের এমন দায়িত্বজ্ঞানহীন অাচরণ অনেকটা পাগলকে সাকো নাড়াতে না বলার মত নয় কি!

দুই।
এবার অাসি প্রথম অালোর ওই তদন্ত রিপোর্ট প্রসঙ্গে। রিপোর্টে বলা হয়েছে,
তদন্ত কমিটির জিজ্ঞাসাবাদে টেকনাফ থানার সাবেক ওসি প্রদীপ কুমার দাশ বলেছেন, তাঁর দায়িত্বের সময়ে যেসব বন্দুকযুদ্ধের ঘটনা ঘটেছে, সেখানে বেশির ভাগ জায়গাতেই তিনি নিজের অস্ত্র ব্যবহার করেছেন। কমিটির সদস্যরা তাঁর কাছে জানতে চেয়েছিলেন, ‘আপনার সময়কালে ১০৬টি বন্দুকযুদ্ধের ঘটনায় ১৭৪ ব্যক্তি নিহত হয়েছে—এগুলো কি আপনি সরাসরি নেতৃত্ব দিয়েছিলেন?’ প্রদীপ বলেছেন, বেশির ভাগই তাঁর নেতৃত্বে হয়েছে। কমিটি জানতে চেয়েছিল, ‘আপনি কতবার নিজে গুলি করেছেন, কী অস্ত্র দিয়ে?’ জবাবে প্রদীপ বলেছেন, তিনি ২০–৩০ বার গুলিবর্ষণ করেছেন, ব্যক্তিগত অস্ত্র দিয়ে।

প্রদীপ তদন্ত কমিটিকে জানান, তাঁর সাড়ে ৭ লাখ টাকা দামের একটি ওয়াল্টার পিস্তল আছে। তিনি বলেন, ‘আমার কাছে যেটা আরামদায়ক মনে হয়, আমি সেটা ব্যবহার করি।’ কমিটির প্রশ্নের জবাবে তিনি জানান, জিডি করে নিজের পিস্তলের গুলির হিসাব রাখতেন।

পরিদর্শক লিয়াকত সম্পর্কে এক প্রশ্নের জবাবে ওসি প্রদীপ বলেন, ‘লিয়াকত ঘোড়া ডিঙিয়ে ঘাস খায়। সে আমাকে না জানিয়ে এসপিকে ফোন দেয়।’

কক্সবাজারে টেকনাফ থানার দেয়ালে সাঁটা রয়েছে প্রদীপের বিশাল আকারের ছবি। তদন্ত কমিটির বিস্ময়ভরা প্রশ্ন, একজন সরকারি কর্মকর্তা কোন পর্যায়ে উন্নীত হলে তার প্রতিকৃতি দেয়ালে শোভা পায়! এ ছাড়া তিনি নিয়ম ও আচরণবিধি ভেঙে বিদেশি দূতাবাসে যোগাযোগ করেছেন, প্রটোকলের তোয়াক্কা না করে ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তাদের ফোন করেছেন। এসব তাঁর সীমাহীন ঔদ্ধত্য বলে কমিটি মনে করে।

অামাদের মানে জনগনের প্রশ্ন, প্রদীপ পুলিশবাহিনীর সদস্য। তাকে অাইনশৃংখলা রক্ষা করতে সরকার থেকেই অস্ত্র দেয়া হয় এবং তার ব্যক্তিগত নিরাপত্তার জন্য একটি পিস্তলও দেয়া হয়, তারপরেও তিনি ব্যক্তিগতভাবে অালাদা পিস্তল কেনা এবং দায়িত্বরত অবস্থায় সেটা ব্যবহারের এখতিয়ার রাখেন কি না। অার তাছাড়া তিনি তার পছন্দের ওয়াল্টার পিস্তল যার দাম সাত লাখ টাকা। তিনি সেটা কেনার সার্মথ্য রাখেন কিনা। অার সেই ব্যক্তিগত অস্ত্র দিয়ে তিনি নির্বিকারভাবে মানুষ হত্যা করতেন। কি ঔদ্ধত্ত। কত ডেসপারেট। সে তো পুলিশের চাকরীর অযোগ্য হয়ে পড়েছিলো বহু অাগে,সে হয়ে পড়েছিলো ফ্রাংকেনস্টাইন।


তদন্ত কমিটি বলেছে,সে একটি বিদেশী দূতাবাসে যোগাযোগ করতেন.. একজন পুলিশের পেটি অফিসার প্রদিপ সে কেন,কিসের জন্য কার স্বার্থে বিদেশী দূতাবাসে যোগাযোগ করতো..? কমিটি তাদের প্রতিবেদনে বলেছে,সে প্রটোকল ভেঙ্গে উধ্বর্তন কর্মকর্তাদের সাথে যোগাযোগ করতো। সেইসব উর্ধ্বতন কর্মকর্তা কারা? যাদোর সঙ্গা প্রদিপের এমন দহরমমহরম। এসব প্রশ্নের উত্তর জানা জরুরী। বিশেষ করে বিদেশী দূতাবাসে যোগাযোগ করার বিয়টি বড্ড স্পর্শকাতর। এর সাথে দেশের স্বাধীনতা,স্বার্বভৌমত্বের গুরুতর প্রশ্ন জড়িত। প্রদিপ কি তাহলে সরকারের মধ্যে বসে থাকা বিদেশীদের কোনো একটা পুতুল? অামরা তাহলে দুধ কলা দিয়ে কাদের পুসছি,কালো সাপ নয়তো..


সিনহা হত্যার তদন্ত প্রতিবেদন আমাদের অনেক কিছু চোখে আঙ্গুল দিয়ে দেখিয়ে দিচ্ছে.. এই প্রতিবেদনের পর সরকারের আর নাক কান মুখ চেপে কিম্বা দাঁতকপাটি লাগিয়ে বসে থাকার সময় শেষ। এখন সবক্ষেত্রে দেশবিরোধী সব প্রদীপ চক্রকে সরকারের সব জায়গা থেকে ঝেটিয়ে বিদায় করার সময় এসেছে। কিন্তু সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্ন হচ্ছে, জনগনের যথাযথ ম্যান্ডেটবিহিন এবং হিন্দুস্থানের মদদপুষ্টু সরকার সেটা করতে আদৌ উৎসাহ দেখাবে কি?

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *