তাজউদ্দিন স্বেচ্ছায় মন্ত্রীত্বত্যাগের সম্মান থেকে বঞ্চিত হলেন

তাজউদ্দিন স্বেচ্ছায় মন্ত্রীত্বত্যাগের সম্মান থেকে বঞ্চিত হলেন

“… ১৯৭৫ সালের জানুয়ারী মাসে আমি ঢাকায় বার্ষিক ছুটি কাটাতে গিয়েছিলাম। শাসনপদ্ধতির পরিবর্তন ও তাজউদ্দিন আহমদের পদত্যাগ সম্পর্কে তখন বিভিন্ন মহলে তুমুল আলোচনা অব্যাহত ছিল। তার পদত্যাগের কারণ জানার জন্য আমিও উন্মূখ ছিলাম।

তৎকালীন পাইওনিয়ার প্রেসের মালিক আবদুল মোহাইমেন আমার সঙ্গে দেখা করতে আসেন। তিনি আওয়ামী লীগের নেতৃস্থানীয় কর্মী এবং তাজউদ্দিন সাহেবের একনিষ্ঠ সমর্থক ছিলেন। তার বক্তব্য শুনে মনে হয়েছিল, তাজউদ্দিন সাহেবের পদত্যাগের জন্য বঙ্গবন্ধু দায়ী বলে তিনি মনে করেন। আমি তার সাথে দ্বিমত প্রকাশ করে বললাম, ‘ইতিহাসের প্রয়োজনে প্রকৃত তথ্য জানা প্রয়োজন। তার বিরুদ্ধে যেসব গুজব ছড়ানো হচ্ছে, তার প্রতিবাদ হিসেবে একটি লিখিত বক্তব্য থাকা উচিত।’ মোহাইমেন সাহেব বললেন, ‘তা’ হলে তাঁকে (তাজউদ্দিনকে) মেরে ফেলবে।’ কথাটা আমার কাছে অবিশ্বাস্য মনে হয়েছিল। বঙ্গবন্ধু তার ঘনিষ্ঠ সহকর্মীকে হত্যার মাধ্যমে রাজনৈতিক অঙ্গন থেকে সরিয়ে দেবেন, এ ধরণের কথা তিনি কী করে বলতে পারলেন, তা ভেবে আমি অবাক হয়েছিলাম।

বঙ্গবন্ধুর শাসন আমলে গণভবনে যুগ্ম-সচিব পদে কর্মরত মনোয়ারুল ইসলাম লিখেছেন, ‘বঙ্গবন্ধু দীর্ঘ নি:শাস ফেলে বললেন, তাজউদ্দিনের জন্য আমি কী না করেছি। কিন্তু তাজউদ্দিন ভুলে গেছে। এসব নিয়ে প্রতিটি আলোচনার সময়, প্রতিটি সিদ্ধান্ত নিয়ে তাজউদ্দিন আমার মতের বিরুদ্ধে কথা বলতো, মহা বিব্রতকর অবস্থা। আমার আর কোন পথ ছিল না।’ ( বঙ্গবন্ধুর স্মৃতি ঘেরা দিনগুলি, বঙ্গবন্ধু স্মারক গ্রন্থ, দ্বিতীয় খন্ড, পৃ. ১২২০-১২২৪ )

তাঁর একটা দু:খ ছিলো এই যে, মুক্তিযুদ্ধের ‘ন মাসের কথা বঙ্গবন্ধু তার কাছে কোনোদিন জানতে চাননি। দলের মধ্যে তাঁর বিরুদ্ধাচরণ যে চলছিলো,সেকথা তাজউদ্দীন প্রথম থেকেই জানতেন। তাঁর মনে হয়েছিলো, একদিকে খন্দকার মোশতাক আহমাদ অন্যদিকে শেখ ফজলুল হক মনি তাঁর বিপক্ষে কাজ করছেন, বঙ্গবন্ধুকেও নানা কথা বলছেন তাঁরা। আমি তাঁকে পরামর্শ দিয়েছিলাম সরাসরি বঙ্গবন্ধুর সাথে সরাসরি কথা বলতে। তিনি উত্তর দিয়েছিলেন যে, বঙ্গবন্ধু জিজ্ঞাসা না করলে স্বত:প্রবৃত্ত হয়ে তিনি কিছু বলবেননা। আমি জানতে চাইলাম, এই অবস্থা যদি চলতে থাকে,তবে পরিণামে কী হবে? তিনি একটু উদাস কন্ঠে বললেন, ‘জানিনা। তাঁর সূরে কিন্তু ঔদাসীন্য ছিলোনা,অভিমান ছিলো ।

১৯৯৯ সালে প্রদত্ত এক সাক্ষাৎকারে ‘ভাষা সৈনিক’ গাজিউল হক বলেন, ‘বাকশাল যে-সময় গঠিত হয়, সে সময়টিকে তাজউদ্দিন উপযোগী মনে করেনি। আমরা এ ব্যাপারে আলাপ করতে গেলে সে শুধু বলতো, ‘দেখো, এ বিষয়ে এখন কথা বলে কাজ হবে না। এখন শুধু দেখে যাও। দেখো এরপর কি হয়।’ আমরা তাকে বলতাম, ‘তুমি একটু দাঁড়াও। ওই জায়গাটায় দাঁড়াও, স্ট্যান্ড নাও। আমার মতো অনেক লোক আছে যারা তোমার পাশে দাঁড়াবে।’

১৯৭৫ সালের ৩১ মে তারিখে সুপ্রীম কোর্ট বার্ষিক ডিনারের পর তাজউদ্দিন সাহেবের সঙ্গে একান্ত আলোচনার কথা উল্লেখ করে গাজিউল হক বলেন, ‘আমি তাকে বললাম, তোমার একটা কাজ আমার পছন্দ হয়নি। কারণ তুমি তো ‘স্ট্যান্ড’ নিতে পারোনি। তুমি তাকে অন্তত: কিছু কথা বলতে পারতে। সেটা তুমি করনি। তুমি উঁচু মাথা নীচু করে একেবারেই ছেড়ে চলে এলে। এটা তুমি ঠিক করনি।’ আমার এই কথা শুনে সে বললো, ‘তুমি কি চাও যে, ট্রেইটার অপবাদ দিয়ে আমাকে খুন করা হোক? আমি কোন বাঙালীর হাতে বিশ্বাসঘাতক অপবাদ মাথায় নিয়ে মরতে চাই না।’ আমি তাকে বললাম, ‘তাজউদ্দিন তুমি কিছু একটা কর।’ তাজউদ্দিন বললো, ‘আমাকে বোধহয় এরেস্ট করা হবে।’ ( মুক্তিযুদ্ধের নেতা তাজউদ্দিন, গাজিউল হক, দৈনিক জনকন্ঠ, ঈদ সংখ্যা – ২০০৮, পৃ. ৩২ )

পূর্ব বঙ্গের প্রাক্তন প্রধানমন্ত্রী ও প্রবীণ রাজনীতিবিদ আতাউর রহমান খান লিখেছেন, ‘তাজউদ্দিন বলেছিলেন, আমরা ১০৬ জন সদস্য বাকশালের বিরুদ্ধে মতামত দেব। প্রয়োজনে সংসদ থেকে বেরিয়ে আসবো।’

যথাসময়ে এই উদ্যোগ গ্রহণ না করা সম্পর্কে মি. খানের এক প্রশ্নের উত্তরে এক গল্পের ইতি টেনে তাজউদ্দিন বলেন, ‘গল্পটা বললাম এ জন্য, যে ১০৬ জনের প্রতিবাদ করার কথা ছিল, তাদের প্রত্যেকের বিরুদ্ধে কিছু না কিছু দোষ-ত্রুটি রেকর্ড করে রাখা হয়েছে। যদি ওরা আমার সঙ্গে এসে বাকশালের বিরুদ্ধে কথা বলতো, তা হলে মুজিব ভাই প্রত্যেকের বিরুদ্ধেই সেই তালিকা ধরে বিচারের ব্যবস্থা করতেন। এই ভয়েই ওরা কোন প্রতিবাদ করলো না। সবাই নিজের মধ্যে পালিয়ে রইল। আমাদের মাথার উপর তলোয়ার ঝুলছে, বলা যায় না কোন সময় মাথায় ফেলে দেয়। কাজেই নিশ্চুপ থাকাই ভালো।’ ( মনে-প্রাণে গণতন্ত্রী, আতাউর রহমান খান, দৈনিক প্রথম আলো, ঈদ সংখ্যা – ২০০৫)॥”

– আবদুল মতিন / বিজয় দিবসের পর : বঙ্গবন্ধু  বাঙলাদেশ ॥ [ রেডিক্যাল এশিয়া পাবলিকেশান্স – সেপ্টেম্বর২০০৯ । পৃ১১৩১১৬ ]

দুই।

“… ১১ই জানুয়ারি (১৯৭২) টেলিফোন বাজিয়া উঠিল। রিসিভার তুলিয়া একটি পরিচিত কিন্তু অত্যন্ত অপ্রত্যাশিত কন্ঠস্বর শুনিতে পাইলাম। কন্ঠস্বরটি গণপ্রজাতন্ত্রী বাংলাদেশ অস্থায়ী সরকারের প্রধানমন্ত্রী তাজউদ্দিন আহমদের। কলেজ জীবন হইতে বন্ধূ। টেলিফোনে তাজউদ্দিন কুশলাদি জিজ্ঞাসার পর আমাকে বলেন, – “শেখ সাহেবকে প্রধানমন্ত্রী পদে আসীন করিবার সিদ্ধান্ত লইয়াছি এবং প্রস্তাবও করিয়াছি। কারণ তিনি যে কোন পদেই বহাল থাকুন না কেন, তাঁহার ইচ্ছা-অনিচ্ছাতেই রাষ্ট্রীয় প্রশাসন পরিচালিত হইবে। শেখ শাহেবের মানসিক গড়ন তুমিও জান, আমিও জানি। তিনি সর্বাত্মক নিয়ন্ত্রণে অভ্যস্থ্। অতএব ক্ষণিকের ভূল সিদ্ধান্তের জন্য পার্লামেন্টারী কেবিনেট পদ্ধতির প্রশাসন প্রহসনে পরিণত হইবে। তিনি প্রেসিডেন্ট পদে আসীন থাকিলে নিয়মান্ত্রিক নাম-মাত্র দায়িত্ব পালন না করিয়া মনের অজান্তে কার্যতঃ ইহাকে প্রেসিডেন্ট পদ্ধতির প্রশাসনে পরিণত করিবেন। এই দিকে প্রেসিডেন্ট পদে বিচারপতি আবু সাঈদ চৌধুরীকে নির্বাচনের কথা ভাবিতেছি। তোমার মত কি?” তদুত্তরে তাঁহাকে বলি, – “তোমার সিদ্ধান্ত সঠিক। নামমাত্র প্রেসিডেন্টের ভূমিকা পালন শেখ সাহেবের শুধু চরিত্র বিরুদ্ধ হইবে না, বরং উহা হইবে অভিনয় বিশেষ। কেননা, ক্ষমতার লোভ তাঁহার সহজাত।” তাজউদ্দিন টেলিফোনের অপর প্রান্তে সশব্দে হাসিয়া উঠিলেন। বলিলেন, – “আমি জানিতাম, মৌলিক প্রশ্নে তোমার আমার মধ্যে মতভেদ হইবে না॥”

– অলি আহাদ / জাতীয় রাজনীতি : ১৯৪৫ থেকে ১৯৭৫ ॥ [ কোঅপারেটিভ বুক সোসাইটি (পঞ্চম সংস্করণ) – অক্টোবর২০১২ । পৃ৪৩৮৪৩৯ ]

তিন।

দেশ ছাড়ার আগে তাজউদ্দীন আহমদের সাথে একবার দেখা করা দরকার। সেপ্টেম্বরের একেবারে গোড়ায় গেলাম তাঁর কাছে। তিনি তখন প্রস্তুতি নিচ্ছেন মাসকালব্যাপী বিদেশ সফরের। অনেকক্ষন কথা হলো। বললেন, তিনি চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত নিয়ে ফেলেছেন, অক্টোবরে দেশে ফিরে মন্ত্রীসভা থেকে পদত্যগ করবেন।

চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত বললেন এই কারণে যে, পদত্যগের কথা আগেও তিনি ভেবেছিলেন। মনে আছে, দেশ স্বাধীন হওয়ার অল্পকালের মধ্যেই তিনি হতাশা ব্যক্ত করতে শুরু করেছিলেন। প্রসাশনের বিষয়ে কিছু হতাশা ছিলো, তবে রাজনৈতিক কারণেই তার হতাশাটা ছিলো বেশী। সেই ৭২ সালেই-তখনো বাজেট দেয়ার সময় আসেনি-তাঁর বাসভবনের অফিস ঘরে বসে এক সন্ধ্যায় কথা বলছিলাম। টেবিলের ওপরে রাখা একটি ফাইলের দিকে আঙ্গুল দেখিয়ে বললেন, এটা তাঁর জন্যে এক উভয়-সংকট। বিদেশ থেকে সার আমদানি করতে হবে। নানা কারণে -তাঁর মতে, অকারণেই উদযোগ নিতে দেরি হয়ে গেছে সংশ্লিষ্ট মন্ত্রনালয়ের। এখন প্রস্তাব এসেছে, আন্তর্জাতিক টেন্ডার আহবান না করেই,গতবছর যারা সার সরবরাহ করেছিলো,সেই প্রতিষ্ঠানকেই কার্যাদেশ দেয়া হোক। তিনি বললেন, প্রস্তাবে সম্মত হওয়া মানে আমার পক্ষে নিয়মভঙ্গ করা, সম্ভবত দুর্নীতিতে সাহায্য করা; আর টেন্ডার আহবান করতে বলা মানে সময়মতো সার-সরবরাহ  করতে ব্যর্থ হওয়া। যেটাই করি সেটাই অসংগত হবে। এভাবে দেশ চালানো যায়না’।

তবে রাজনৈতিক হতাশা ছিলো প্রগাঢ়। তাঁর একটা দু:খ ছিলো এই যে, মুক্তিযুদ্ধের ‘ন মাসের কথা বঙ্গবন্ধু তার কাছে কোনোদিন জানতে চাননি। দলের মধ্যে তাঁর বিরুদ্ধাচরণ যে চলছিলো,সেকথা তাজউদ্দীন প্রথম থেকেই জানতেন। তাঁর মনে হয়েছিলো, একদিকে খন্দকার মোশতাক আহমাদ অন্যদিকে শেখ ফজলুল হক মনি তাঁর বিপক্ষে কাজ করছেন, বঙ্গবন্ধুকেও নানা কথা বলছেন তাঁরা। আমি তাঁকে পরামর্শ দিয়েছিলাম সরাসরি বঙ্গবন্ধুর সাথে সরাসরি কথা বলতে। তিনি উত্তর দিয়েছিলেন যে, বঙ্গবন্ধু জিজ্ঞাসা না করলে স্বত:প্রবৃত্ত হয়ে তিনি কিছু বলবেননা। আমি জানতে চাইলাম, এই অবস্থা যদি চলতে থাকে,তবে পরিণামে কী হবে? তিনি একটু উদাস কন্ঠে বললেন, ‘জানিনা। তাঁর সূরে কিন্তু ঔদাসীন্য ছিলোনা,অভিমান ছিলো ।

১৯৭৩ সালের গোড়ার দিকে এক সন্ধ্যায় তাউদ্দীন আহমদের বাসভবনে গিয়েছিলাম। বারান্দায় দেখা হলো আরহাম আহমদ সিদ্দিকীর সঙ্গে- তাজউদ্দীন আহমদের সাথে তাঁর দীর্ঘকালের ঘনিষ্টতা। তাঁর সঙ্গে কুশলবিনিময়ের পর আমি ভেতরে ঢুকলাম। তাজউদ্দীন প্রথমেই বললেন, মন্ত্রীসভা ও দল থেকে তিনি পদত্যগ করবেন বলে ভাবছেন। আমি জানতে চাইলাম তারপর তিনি কী করবেন? তিনি বললেন দেখা যাক। জিজ্ঞেস করলাম, রাজনীতি ছেড়ে দেবেন? খানিকটা ম্লান হাসি হেসে বললেন, তা পারবোনা। প্রশ্ন কলাম, তিনি কি অন্য দলে যোগ দেবেন? জাতীয় সমাজতান্ত্রিক দলে যোগদানের আমন্ত্রন তিনি পেয়েছেন বলে কানাঘুষো ছিলো- সেকথা স্বীকার করলেন তিনি, কিন্তু তাতে যে যাবেননা তাও স্পষ্ট করলেন। বললাম তাহলে তো তাঁর বিকল্প নতুন দল গড়া- তিনি কি তা ভাবছেন? তাজউদ্দীন একটু চুপ করে রইলেন, কিন্তু মনে হলো সেটাই তাঁর অভিপ্রায়। জানতে চাইলাম, তিনি যদি আওয়ামী লীগ ছাড়েন, তাহলে দলের কতজন তাঁর অনুবর্তী হবেন? তিনি একটা আনুমানিক সংখ্যা বললেন। বললাম, তাজউদ্দীন ভাই, আজ আপনি অর্থমন্ত্রী। অনেকে নানা কাজে আসেন আপনার কাছে- নানাভাবে আপনাকে সমর্থন করে যান। যেদিন আপনি আর ক্ষমতায় থাকবেননা,সেদিন এঁদের অধিকাংশকেই আর আপনার ধারেকাছে পাবেননা। আমি জানি আপনার অকৃত্রিম বন্ধু-অনুরাগী আছেন অনেকে-তাঁরা আপনার পাশে থাকবেন।যতজন সঙ্গে নিয়ে আওয়ামী লীগ ছাড়বেন বলে  আপনি ভাবছেন,তার দশভাগের একভাগ হয়তো পাবেন আপনার সঙ্গে। এটা আমার অনুমান,প্রকৃত অবস্থা আমার চেয়ে আপনি ভালো বুঝবেন। যদি মনে করেন, দল ছাড়লে দেশের লাভ হবে,আপনার রাজনৈতিক জীবনে উপকার হবে, তবে তা করুণ । নইলে দলের ভেতর থেকে রাজনৈতিক লড়াই করুণ। তিনি চুপ করে থাকলেন। আমার কথা তাঁর মন:পূত না হলেও তিনি ফেলে দেননি।

তাঁর বাড়িতে নানা সময়ে নানাজনের সঙ্গে দেখা হয়ে যেতো। একবার ওপরের বারান্দায় ডেকে পাঠালেন। গিয়ে দেখলাম গাজি গোলাম মোস্তফা বসে আছেন। গাজী  শাহাবুদ্দীনের কাকা হিসেবে ১৯৪৯ সাল থেকে তিনি আমারও মানিক কাকা। তিনি তখন রেড ক্রিসেন্টের চেয়ারম্যান—দেশজুড়ে তাঁর নিন্দাবাদ। আমি তাঁর মধ্যে ক্ষমতার দর্প দেখিনি, দুর্নীতির কথা বলতে পারবো না। তাজউদ্দীনের সঙ্গে তিনি খুবই সৌজন্যপরায়ণ ছিলেন। আরেক সন্ধ্যায় দেখি, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের অপেক্ষাকৃত এক তরুন শিক্ষক বের হয়ে আসছেন তাজউদ্দীন আহমদের ড্রয়িংরুম থেকে। ভেতরে ঢুকে তাজউদ্দীনের কাছে জানতে চাইলাম,ওই ব্যক্তি তাঁর বাড়িতে কেন? তিনি একটু বিস্ময়ের সঙ্গে বললেন, ও তো আমাদের অনেক পূরোনো কর্মী- আপনি চেনেনা ওকে? বললাম,চিনি বলেই জিজ্ঞেস করছি। ঢাকা ইউনিভার্সিটিতে  সম্প্রতি অ্যাপয়েন্টমেন্ট নিয়ে যারা গলযোগ করেছিলো-এ তাদের মধ্যে একজন। বোরহান উদ্ধিন খান জাহাঙ্গিরের যোগদানে বাধা দিতে

 তাঁকে পিস্তল দেখিয়েছিলো। তাজউদ্দীন আরো বিস্মিত। তাঁর চোখেমুখে অবিশ্বাসের ছায়া। বললেন, এ হতে পারেনা, আপনি ভুল শুনেছেন। বললাম, আপনিনা বললেন, বঙ্গবন্ধু তাঁর নিকটজনের বিরুদ্ধে অভিযোগ শুনতে চাননা। বিশ্বাস করেননা। আপনিও তো

তাই করছেন।  তিনি চুপ করে গেলেন। বেদনার্তচিত্তে খানিকক্ষন চুপ করে রইলেন।

আড়াই বছরের মন্ত্রীত্বের বেশীরভাগ সময় তাজউদ্দীনের কেটে ছিলো দ্বিধাদ্বন্দে, সংশয়ের দোলায়,অনুকূল পরিবেশের অভাবে। ১৯৭৩ সালের সেপ্টেম্বরে গৃহীত সংবিধানের দ্বিতীয় সংশোধনী তিনি মন থেকে মেনে নিতে পারেননি। তাঁর মনে হয়েছিলো আমরা গণতন্ত্রের চর্চা করছি না, সমাজতন্ত্রের পথে অগ্রসর হতে পারছি না। এখন ৭৪ সালের সেপ্টেম্বরে এসে চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত নিলেন। অনেক হয়েছে,আর নয়। এই সিদ্ধান্তের বিষয়ে  তাঁকে নিরুৎসাহিত  করার মতো কথা আমি এবারে বলিনি।

তাজউদ্দীনের সফর সূচীতে এবারে অনেকগুলি দেশ ভ্রমনের কথা ছিল। প্রথমে তিনি যাবেন বুলগেরিয়া, চেকোশ্লোভাকিয়া ও সোভিয়েত ইউনিয়নে, তারপর কানাডায় সর্বশেষ মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রে। এই প্রথম তিনি  বিশ্ব্যাংকের সঙ্গে  আনুষ্ঠানিক বৈঠক করতে তাদের দরবারে যাচ্ছেন। বৈদেশিক সাহায্য বিশেষ করে-মার্কিন সাহায্য-গ্রহন করার বিষয়ে তাজউদ্দীনের অনীহার কথা ছিল সর্বজনবিদিত ছিল। বিশ্ব্যাংকের প্রতিও তাঁর মনোভাব অনুকূল ছিলো না এবং তার প্রেসিডেন্ট রবার্ট ম্যাকানামারাকে  মার্কিন প্রশাসনের বড় খুটি জ্ঞান করে  তিনি বেশ অপছন্দ করতেন। বাংলাদেশে ম্যাকানামারা যখন প্রথম বেসরকারী সফরে আসেন, বোধ হয় ১৯৭২ সালে,তখন তাঁর সঙ্গে তিনি সৌজন্যপ্রকাশেরও কুন্ঠিত  ছিলেন। তাঁদের মধ্যে যে- আলোচনা হয়েছিল ঢাকায়, শুনেছি, সেখানেও তাজউদ্দীনের অনাগ্রহ স্পষ্ট হয়ে উঠেছিল। অন্যদিকে, সমাজতন্ত্রের প্রতি  তাজউদ্দীনের পক্ষপাতের কথা জেনেও ম্যাকনামারা নাকি বাংলাদেশের সমাজতন্ত্রিক লক্ষ্য সম্পর্কে  শ্লেষাত্মক  মন্তব্য করতে ছাড়েননি। এখন সমাজতান্ত্রিক দেশ সফরশেষে যুক্তরাষ্ট্রে গিয়ে তাঁকে বাধ্য হয়ে বিশ্ব্যাংকের অআনুখুল্য চাইতে হবে। এই সম্ভাবনা যে তিনি উপভোগ করছিলেন, তা নয়; কিন্তু  দেশের পরিস্থিতি- বিশেষ করে অর্থনৈতিক পরিস্থিতি – যে দিকে  যাচ্ছে তাতে তাঁর সামনে বিকল্প পথও খোলা ছিলো না।

মাসাধিককাল বিদেশ সফরশেষে দেশে ফেরার পথে তাজউদ্‌দীন  আহমদ লন্ডন এলেন অক্টোবরের দ্বিতীয় সপ্তাহে। খবর পেয়ে তার সাথে দেখা করতে গেলাম হোটেলে। অনেক লোকজন ছিলেন সেখানে। আমরা তাঁর শয়নকক্ষে গিয়ে বসলাম। কিন্তু সেখানেও কেউ কেউ ঢুকে পড়লেন। তাজউদ্দীন কথা বললেন একটু ছাড়া-ছাড়াভাবে যেন কিছুটা অন্যমনস্ক। বিভিন্ন দেশ ও বিশ্ব্যাংকের কাছে তিনি খাদ্য সাহায্য চেয়েছেন, বন্যা-নিয়ন্ত্রণে ও অধিকতর সার –উৎপাদনে অবকাঠামোর উন্নয়নের জন্যে তাদের সহযোগিতা কামনা করেছেন। এই মুহুর্তে খাদ্যপরিস্থিতি নিয়ে তিনি বেশী চিন্তিত। সরকারী লঙ্গরখানা খোলা থাকলেও মানুষ অনাহারে মরছে। আইন শৃঙ্খলা- পরিস্থিতিও ভালো নয়। তবে তাঁর সবচেয়ে বেশী দুশ্চিন্তা  এই নিয়ে যে, স্বনির্ভর হওয়ার পথে আমরা এগোতে পারছিনা। রাজনৈতিক সহনশীলতার বড়ো অভাব। মন্ত্রীসভা থেকে পদত্যাগ করার  বিষয়ে তাঁর সিদ্ধান্ত  অপরিবর্তিত। ওয়াশিংটন থেকে দেশে ফিরে তিনি ইস্তফা দেবেন।

তিনি যে মন্ত্রীত্ব ছাড়বেন সেকথা বোধ হয় বেশী লোককে বলে ফেলেছিলেন। ফলে দেশে ফেরার কয়েকদিনের মধ্যে  ফলে দেশে ফেরার কয়েকদিনের মধ্যে প্রধানমন্ত্রীর কাছ থেকে লিখিত নির্দেশ পেলেন পদত্যগ করার। অক্টোবরের শেষেই তিনি পদত্যগপত্র পেশ করলেন, কেবল স্বেচ্ছায় মন্ত্রীত্বত্যাগের  সম্মানটুকু থেকে বঞ্চিত হলেন। এমনকি কি ষায় তিনি পদত্যগপত্র লিখবেন, তাও স্থির করার সুযোগ পাননি। এই অসম্মান তাঁ প্রাপ্য ছিলো না।

আনিসুজ্জামান/বিপুলা পৃথিবী{ প্রথমা প্রকাশন। ফেব্রুয়ারী ২০১৫ পৃ: ১১৭-১১৯-১৩০-১৩১}

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

Shares