জিয়া যেভাবে ফারাক্কার বিরূপ প্রতিক্রিয়া বিশ্ব দরবারে তুলে ধরেন

জিয়া যেভাবে ফারাক্কার বিরূপ প্রতিক্রিয়া বিশ্ব দরবারে তুলে ধরেন

.. ১৯৭৬ সালের মে মাসের ঘটনা। তখন পুরোনাে বিমান বন্দরই আকাশপথে বহির্বিশ্বের সাথে যোগাযোগের গেটওয়ে। নতুন বিমান বন্দর চালু হলো ১৯৮০ তে। নতুন বিমান বন্দর যা আজ জিয়া আন্তর্জাতিক বিমানবন্দর বলে সুপরিচিত, কি করে তিন দিনের মধ্যে বিমান চলাচলের জন্যে প্রথম চালু হলো সে আর এক ইতিহাস।

বিমান বন্দরে উপস্থিত হয়ে অপেক্ষা করছিলাম কখন ডাক পড়ে বিমানে আরোহণের জন্যে। নির্ধারিত সময় পার হওয়ার পরও কারও মুখে কথা নেই, কোথাও নেই সাড়া। এরকম অস্বাভাবিক দেরি শুধু সাংবাদিকের নয় অন্যদের মনেও একটু নাড়া দেবে তাই স্বাভাবিক। সাংবাদিকের স্বাভাবিক কৌতুহলের বশবর্তী হয়ে

এদিক ওদিক ঢুঁ মারলাম, যদি কোন খবর পাওয়া যায়, কেন এ বিলম্ব? দু’একজন উচ্চপদস্থ অফিসারকে খুব বিচলিত অবস্থায় হস্তদন্ত হয়ে ছােটাছুটি করতে দেখে কৌতুহল আরও বাড়লো। দু’জন আলাপরত অফিসারের পাশে নির্লিপ্তভাবে দাঁড়িয়ে কান খাড়া রেখে জানতে পারলাম, একজন বিশেষ যাত্রীর জন্যে বিমান ছাড়তে দেরি হচ্ছে। এই বিশেষ যাত্রী কে হতে পারে, ভেবে পেলাম না। যাহােক, কিছু পরে বেশ গাটাগোট্টা চেহারার এক ব্যক্তিকে নিয়ে এলেন কয়েকজন লোক ভিআইপি লাউঞ্জে। এরমধ্যে আমাদের বিমান আরোহণের জন্যে বলা হলো। আমরা উঠে গেলাম বিমানে, যে যার সিটে বসলাম। তখন গুঞ্জন – এ ফ্লাইটে বিশেষ যাত্রী হলেন লেঃ কর্নেল ফারুক। তাঁকে বিদেশে পাঠিয়ে দেয়া হচ্ছে।তিনি চুপিসারে দেশে ঢুকে বগুড়ায় সশস্ত্র বাহিনীর মধ্যে বিশৃঙ্খলা সৃষ্টির চেষ্টা করেন। উর্ধ্বতন সামরিক অফিসাররা তাঁর এহেন আচরণের জন্যে নির্ধারিত চরম দণ্ড দেয়ার পক্ষে মত দেন। শহীদ প্রেসিডেন্ট জিয়াউর রহমান তখন ছিলেন সশস্ত্ৰ বাহিনী প্রধান ও ডেপুটি চীফ মার্শল ল’ এ্যাডমিনিস্ট্রেটর। তিনি সবার কথা শুনতেন খুব ধৈর্য সহকারে। আর সিদ্ধান্ত দিতেন অত্যন্ত ভেবে চিন্তে। ফারুককে নিয়ে সমস্যা সমাধানের সহজ পথ বাতলে দিয়ে উর্ধ্বতন অফিসাররা অপেক্ষা করছেন সিদ্ধান্তের জন্যে। সেনাবাহিনী প্রধান মেজর জেনারেল জিয়াউর রহমান নির্দেশ দিলেন, ফারুককে তার পছন্দমত স্থান লিবিয়ায় পাঠিয়ে দিতে। এ সিদ্ধান্ত কার্যকর করার জন্যে বিমান ছাড়তে এত দেরি হলো।

 

 

 

১৩ জানুয়ারি ১৯৭৬ সাল, বাংলাদেশের জীবনে একটি অবিস্মরণীয় দিন। এই দিনই প্রথম বিশ্ব দরবারে বাংলাদেশের উপর ফারাক্কার বিরূপ প্রতিক্রিয়ার কথা বিশ্ব দরবারে তুলে ধরা হয়। বলিষ্ঠ কন্ঠে জিয়াউর রহমান ইসলামী পররাষ্ট্রমন্ত্রী সম্মেলনে বললেন, “উই মাস্ট গেট রাইটফুল শেয়ার ব গ্যানজেন্স ওয়াটার’। কনফারেন্স হল স্তব্ধ বিস্ময়ে শুনলো এক জাতীয়তাবাদী নেতার যুক্তিপূৰ্ণ শক্ত-বাঁধুনী বক্তব্য। তিনি সমগ্র মুসলিম বিশ্বের কাছে আবেদন জানালেন, তাঁরা যেন এরকম একটি অতি জরুরী ও গুরুত্বপূর্ণ সমস্যা সমাধানে সাহায্য ও সহযোগিতা করেন।তাঁর বক্তৃতায় তিনি বাংলাদেশ সীমান্তে পার্শ্ববতী রাষট্রের উস্কানিমূলক তৎপরতার কথাও বললেন। সমুদ্র আইন সংক্রান্ত নিউইয়র্ক সম্মেলনে জলসীমারেখা  নির্ধারণের ব্যাপারে বাংলাদেশের ভূমিকার সমর্থন দানের জন্যে জেনারেল জিয়া মুসলিম দেশসমূহের নেতাদের প্রতি কৃতজ্ঞতা জানান। জনারেল জিয়ার বক্তৃতা সম্মেলনে বিশেষ গুরুত্বের সঙ্গে গ্রহণ করা হয়। মুসলিম বিশ্ব ও তৃতীয় বিশ্বের জনগণের ন্যায্য দাবি-দাওয়া পূরণে বাংলাদেশের দ্ব্যরথহীন সমর্থনের উল্লেখ করে বিপুল করতালির মধ্য দিয়ে জেনারেল জিয়া তাঁর বক্তব্য শেষ করেন।

 

 

 

১০ মে, ১৯৭৬ সালের তাপদগ্ধ জৈষ্ঠ্যের পড়ন্ত বিকেলে আমাদের সেই নাটকীয় যাত্রায় আরও যাঁরা ছিলেন, তাঁদের মধ্যে আমাদের স্বগোত্রীয় জনাব সাইফুল বারী অন্যতম। তিনি তখন রেডিও বাংলাদেশের ডেপুটি ডাইরেক্টর জেনারেল। আর ছিলেন তৎকালীন পররাষ্ট্র সচিব তোবারক হােসেন, বর্তমানে জাতিসংঘে বাংলাদেশের স্থায়ী প্রতিনিধি রিয়াজ রহমান ও জার্মানীতে বাংলাদেশের রাষ্ট্রদূত মাহমুদ আলী, এ আর এস দােহা ইরানে বাংলাদেশের রাষ্ট্রদূত, যিনি একই সাথে তুরস্কেও এক্রেডিটেড ছিলেন এবং মিসরে নিযুক্ত আমাদের রাষ্ট্রদূত জনাব বারীও বাংলাদেশ ডেলিগেশনের সদস্য হিসেবে সম্মেলনে যোগ দেন।

সপ্তম ইসলামী পররাষ্ট্রমন্ত্রীদের সম্মেলন বাংলাদেশের জন্যে ছিল অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। তখন দেশে চলছিল খরা মৌসুম। উত্তরবঙ্গ ধু ধু করছে পানির অভাবে। আগস্টর রাজনৈতিক পট-পরিবর্তনের পর আমাদের পার্শ্ববর্তী রাষ্ট পানিকে এক রাজনৈতিক হাতিয়ার হিসেবে ব্যবহার করতে শুরু করে। উদ্দেশ্যনতুন সরকারকে বিপদে ফেলা ও বাংলাদেশকে তাদের ন্যায্য পানির হিস্যা থেকে বঞ্চিত করা।

ফিরে যাই উড়ন্ত হাওয়াই জাহাজে। যাত্রীদের মধ্যে কে ফারুক, এ নিয়ে চলছে মৃদুস্বরে আলাপ-আলোচনা। সাইফুল বারী সাহেব, আমি ও মোজাম্মেল বসেছিলাম একই রো’তে। বারী সাহেব টয়লেটে গেলেন। ফিরে এসে খবর দিলেন, আমাদের সামনের রো’র মধ্যম সিটে বসা ব্যক্তিই হলেন কর্নেল ফারুক। তার দু’দিকে অন্য দু’জন যাত্রীর সজাগ দৃষ্টি কর্নেল ফারুকের দিকে। দুবাই যাত্রা বিরতির সময় দেখলাম ফারুককে নিয়ে তাঁর অন্য সহযাত্রী দু’জন লিবিয়াগামী বিমানে চড়ছেন।

ইস্তাম্বুল পৌঁছে হাঁফ ছেড়ে বাঁচলাম। বিমান বন্দরে খুব কড়াকড়ি। নিচ্ছিদ্র সিকিউরিটি ব্যবস্থা। পৃথিবীর বিভিন্ন জায়গায় চলছে সংঘর্ষ। নির্যাতিত প্যালেস্টাইন, অত্যাচারিত মরো, সোভিয়েত শাসিত অঞ্চলের নিগৃহীত মুসলিম প্রতিনিধিরাও তখন ইস্তাম্বুলে হাজির। যদিও ইসলামী সম্মেলনের সাথে প্রত্যক্ষ বা পরোক্ষ কোন যোগ নেই, তবুও ভারতের বহু কূটনীতিক ইস্তাম্বুলে উপস্থিত।ভারত জানত, বাংলাদেশ পানির ব্যাপারটি ইসলামী পররাষ্ট্রমন্ত্রীদের সম্মেলনে তুলবে।

ডিসিএমএলএ মেজর জেনারেল জিয়াউর রহমান তখন অন্যান্য বিষয়ের সাথে পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের দায়িত্বে নিয়োজিত। মাত্র পাঁচ মাস হলো নতুন সরকার দায়িত্ব গ্রহণ করেছে। জাষ্টিস সায়েম রাষ্ট্রপতি হলেও সরকার পরিচালনার দায়িত্ব মূলত এসে পড়ে শহীদ প্রেসিডেন্ট জিয়াউর রহমানের উপর। দেশে আইন-শৃঙ্খলা পরিস্থিতির উন্নতি এবং সরকারি কর্মকাণ্ডে স্থিতিশীলতা আনয়নের উদ্দেশ্যে নীতি-নির্ধারকরা জিয়ার নেতৃত্বে দিবারাত্র কাজ করে যাচ্ছেন। এ সময় দেখা দিল চরম পানির সমস্যা। অনির্ধারিতভাবে জিয়া ইস্তাম্বুল গিয়ে উপস্থিত হলেন। এ জন্যে পররাষ্ট্র সচিব তোবারক হােসেন ও তাঁর সহকর্মীরা আগেই ক্ষেত্র তৈরি করে রেখেছিলেন। তিনি ইতোমধ্যে বিভিন্ন দেশের  পররাষ্ট্রমন্ত্রীদের কাছে বাংলাদেশের পানি সমস্যার কথা তুলে ধরেন। জিয়াউর রহমানের ইস্তাম্বুল উপস্থিতি অনেককে অবাক করে দেয়। এরমধ্যে কোন পূর্ব ঘোষণা দেয়া হয় নি, ব্যাপারটিকে অত্যন্ত বিচক্ষণতার সাথে হ্যান্ডল করা হয়। জিয়াউর রহমানের সাথে ছিলেন বর্তমান যোগাযোগমন্ত্রী কর্নেল অলি আহমেদ।

ইরান থেকে জনাব দোহা আগেই ইস্তাম্বুল এসে পৌঁছান। তিনি করিৎকর্মা লোক। নিজেকে প্রচার করার তাঁর রয়েছে অদম্য আগ্রহ ও প্রচেষ্টা। জিয়াউর রহমানকে ইস্তাম্বুল বিমান বন্দরে অভ্যর্থনা জানাবার জন্যে তুরস্কের উচ্চপদস্থ অফিসাররা উপস্থিত। তোবারক হােসেন সাহেব, আমি ও মোজাম্মেল গেলাম বিমান বন্দরে। বেশ আগে এসে জনাব দােহা ভিআইপি লাউঞ্জে সমাসীন হয়ে রয়েছেন। ধীর পদক্ষেপে জিয়াউর রহমান ভিআইপি লাউঞ্জে এসে ঢুকলেন, সাথে কর্নেল অলি। দ্রুতগতিতে দােহা সাহেব সবার আগে এগিয়ে গেলেন জিয়াউর রহমানের কাছে। দু’হাত বিমানের পাখার মতো বাড়িয়ে দিলেন জনাব দােহা, উদ্দেশ্য ডিসিএমএল-এর সাথে কোলাকুলি করা, যার ফলে অন্যদের বুঝিয়ে দেয়া

তিনি জিয়ার কতো নিকটের লোক, কতো অন্তরঙ্গ তাঁদের সম্পর্ক। দােহার মুক্ত দু’হস্ত ব্যবহারের দরকার হলো না। জিয়া বাড়িয়ে দিলেনতাঁর দক্ষিণ হস্ত, করলেন করমর্দন প্রাক্তন মেজর দােহার সাথে। জনাৰ তোবারক হােসেন এগিয়ে গিয়ে ব্রিফ করলেন শহীদ জিয়াকে।

বিমান বন্দর থেকে হােটেল শেরাটনে তাঁরা গেলেন একসঙ্গে। ঐ হােটেলে থাকছেন তোবারক সাহেব, জনাব দোহা ও ফরেন অফিসের অপর দু’জন ডাইরেক্টর।

সাংবাদিকদের জন্যে ব্যবস্থা হয়েছে নবনির্মিত হােটেল ইন্টারকন্টিনেন্টালে, ওখানেই প্রেস রুম। সাংবাদিকদের ব্রিফিংয়ের ব্যবস্থা রয়েছে ওখানে। আর ওখানে রয়েছে মুফতে চা কফি বিস্কিট। টাইপরাইটার রয়েছে অনেক। মনে হলো এতো কষ্ট করে আমার পুরোনো যন্ত্রটিকে না আনলে ভার বহনের যন্ত্রণা লাঘব হতো।

১৩ জানুয়ারি ১৯৭৬ সাল, বাংলাদেশের জীবনে একটি অবিস্মরণীয় দিন। এই দিনই প্রথম বিশ্ব দরবারে বাংলাদেশের উপর ফারাক্কার বিরূপ প্রতিক্রিয়ার কথা বিশ্ব দরবারে তুলে ধরা হয়। বলিষ্ঠ কন্ঠে জিয়াউর রহমান ইসলামী পররাষ্ট্রমন্ত্রী সম্মেলনে বললেন, “উই মাস্ট গেট রাইটফুল শেয়ার ব গ্যানজেন্স ওয়াটার’। কনফারেন্স হল স্তব্ধ বিস্ময়ে শুনলো এক জাতীয়তাবাদী নেতার যুক্তিপূৰ্ণ শক্ত-বাঁধুনী বক্তব্য। তিনি সমগ্র মুসলিম বিশ্বের কাছে আবেদন জানালেন, তাঁরা যেন এরকম একটি অতি জরুরী ও গুরুত্বপূর্ণ সমস্যা সমাধানে সাহায্য ও সহযোগিতা করেন।তাঁর বক্তৃতায় তিনি বাংলাদেশ সীমান্তে পার্শ্ববতী রাষট্রের উস্কানিমূলক তৎপরতার কথাও বললেন। সমুদ্র আইন সংক্রান্ত নিউইয়র্ক সম্মেলনে জলসীমারেখা  নির্ধারণের ব্যাপারে বাংলাদেশের ভূমিকার সমর্থন দানের জন্যে জেনারেল জিয়া মুসলিম দেশসমূহের নেতাদের প্রতি কৃতজ্ঞতা জানান। জনারেল জিয়ার বক্তৃতা সম্মেলনে বিশেষ গুরুত্বের সঙ্গে গ্রহণ করা হয়। মুসলিম বিশ্ব ও তৃতীয় বিশ্বের জনগণের ন্যায্য দাবি-দাওয়া পূরণে বাংলাদেশের দ্ব্যরথহীন সমর্থনের উল্লেখ করে বিপুল করতালির মধ্য দিয়ে জেনারেল জিয়া তাঁর বক্তব্য শেষ করেন।

এর পরের দিন অর্থাৎ ১৪ মে ফারাক্কা সম্পর্কে ওআইসি’র ভূমিকা সম্পর্কে আমার এক প্রশ্নের উত্তরে সম্মেলনের মুখপাত্ৰ গিনির থরনো নবিকা ডিয়ালো বললেন, বাংলাদেশের এ দুর্দিনে মুসলিম বিশ্ব নীরব থাকতে পারে না।

পৃথিবীর যে কোন সমস্যা আলোচনার মাধ্যমে সমাধান করা যায়। তবে সে জন্যে প্রয়োজন আন্তরিক সদিচ্ছা ও সহযোগিতার মনোভাব। আমরা আশা করবো, সার্কভূক্ত দেশগুলো আঞ্চলিক সহযোগিতার মনোভাব নিয়ে এ এলাকার গণমানুষের জীবনযাত্রার মানােন্নয়নের লক্ষ্যে সবরকম বিবদমান সমস্যাগুলোর শান্তিপূর্ণ সমাধানে এগিয়ে আসবে। একটি কথা মনে রাখতে হবে, যুদ্ধে বিজয়ী ও বিজেতা কেউ অক্ষত থাকে না। পাশের বাড়িতে আগুন দিলে নিজের বাড়িও পুড়তে পারে॥”

আবদুর রহিম 
সাংবাদিক 
সুপ্রভাত বাংলাদেশ ॥ ননী প্রকাশনী - ফেব্রুয়ারি, ১৯৯৫ । পৃ: ৭৪-৭৭

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *