জিয়ার অনুসারীদের জিয়ার রাজনীতির কাছেই ফিরতে হবে

জিয়ার অনুসারীদের জিয়ার রাজনীতির কাছেই ফিরতে হবে

:: মারুফ কামাল খান ::

রাজনীতি একটি সামষ্টিক উদ্যোগ। রাজনীতি একটি প্লুরালিস্টিক বা বহুবাচনিক কর্মকাণ্ড। রাজনীতি মানে “আমরা”, কখনো “আমি” নয়। রাজনীতিতে ‘আমি’ ‘আমি’ করা মানেই স্বার্থপরতা। স্বার্থপর দিয়ে রাজনীতি হয়না। রাজনীতির নামে আত্মপ্রচারণা তাই রাজনীতির ক্ষতি করে। আত্মপ্রচার সামষ্টিকতাকে ব্যক্তিকেন্দ্রিক করে এবং সমষ্টি থেকে বিচ্ছিন্ন করে ফেলে।আত্মপ্রচার নয়, নেতৃত্ব অর্জনের পথ ভিন্ন, কঠিন ও শ্রমসাধ্য।

রাজনীতিতে আত্মপ্রচার ও লবিয়িংয়ের মাধ্যমে যদি কোনো পরিচিতি, পদ-পদবি, মনোনয়ন জোটে তাহলে সেটা নেতৃত্ব নয়। কৃত্রিম কিছু। পদবিধারী এই কৃত্রিম বা নকল নেতৃত্ব স্বার্থপর হয়। এরা রাজনীতির কাছ থেকে কিছু পাবার জন্য আসে। দেয়ার জন্য আসে না। এরাই রাজনীতির ক্ষতি করে। রাজনীতিকে বিকৃত করে। রাজনৈতিক দল-সংগঠনকেও করে ফেলে হীনবল ও ক্ষতিগ্রস্ত।
রাজনীতি এই আধুনিক যুগে রাষ্ট্রে বসবাসকারী সকল নাগরিকের জীবনের প্রায় প্রতিটি দিক-দিগন্তকেই স্পর্শ ও প্রভাবিত করে। তিনি রাজনীতিতে জড়িত থাকুন বা না থাকুন। তিনি রাজনীতি পছন্দ করুন বা না করুন। কাজেই রাজনীতির ভালো-মন্দের ওপর একটি দেশ, জাতি, সমাজের ভালো-মন্দ নির্ভর করে।
রাজনীতি একটি মহত্তম সমাজবিজ্ঞান। রাজনীতি মানুষের সামষ্টিক জীবনকে সুন্দর করার এক সুনিপুণ শিল্পচর্চা। মানুষের প্রতি ভালোবাসা ও দেশপ্রেমে দীপ্র এক ত্যাগনিষ্ঠ সাধনা। রাজনীতি খুব সোজাসাপ্টা এবং শস্তা বিষয় নয়। রাজনীতি শস্তা এবং যার তার হাতের খেলার পুতুল হলে তার পরিণাম ও পরিণতি যা হবার তা তো আমরা প্রতিনিয়ত খোলা চোখেই দেখছি। ভোগ করছি এর প্রতিফলও।


শহীদ জিয়া প্রতিটি সংকটকালে রাজনৈতিক নেতাদের জনগণের কাছে চলে যেতে বলেছেন। তাদের সঙ্গে মিশে যাবার পরামর্শ দিয়েছেন। জনগণকে সংগঠিত করে তাদের ভেতরে থেকে শক্তি সঞ্চয়ের কথা বলেছেন। বলে গেছেন, সংকট উত্তরণের পথ সাধারণ মানুষের কাছ থেকেই বেরিয়ে আসবে। আজকের এই ঘোর সংকটকালে জনগণের কাছে না গিয়ে, তাদের আশা-আকাঙ্ক্ষা, সুখ-দুঃখ, তাদের হৃদস্পন্দন অনুভব না করে দফতরে বসে নিত্য বিবৃতি পাঠ, ডিজিটাল সভা, ফটো সেশনের জন্য সাজানো কর্মসূচি, আর মানববন্ধনে বন্দী রাজনীতি কি শহীদ জিয়ার নির্দেশিত পথ?


নিজস্ব প্রভাব-প্রতিপত্তি, ক্ষমতা, সম্পদ ও সুবিধা অর্জনের ব্যক্তিগত অভিলাষ এ-দেশের রাজনীতিকে যথেষ্ট কলুষিত করেছে। মেধাহীন, আত্মপ্রচারসর্বস্ব ও আদর্শবর্জিত লোকেরা রাজনীতিকে পণ্য ও শস্তা করে ফেলেছে। নেতৃত্বের প্রতিযোগিতাও হয়ে পড়েছে অসুস্থ।


এখন আমাদের দেশে আর কেউ নিজের যোগ্যতা দিয়ে কাউকে অতিক্রম করতে চায়না। আত্মপ্রচার করে আগাতে চায়। একদল ভাড়াটে স্তাবক রেখে আগাতে চায়। যে-কোনো মূল্যে পদ-পদবি, মনোনয়ন বাগিয়ে নিয়ে আগাতে চায়। ল্যাং মেরে বা চরিত্রহনণ করে অন্যকে পিছে ফেলে নিজে সামনে আগাতে চায়। এই ব্যাধি ক্রমে সর্বস্তরে সংক্রমিত হচ্ছে।


এই বিকৃত ও রুগ্ন রাজনীতিকে রাষ্ট্রীয় স্বৈরতন্ত্র খুব সহজেই কব্জা ও নিয়ন্ত্রণ করতে পারে। সেটা আমাদের দেশেও এখন বাস্তবতা। আর তাই দেশে সত্যিকারের কোনো রাজনীতি এখন আর নেই। আছে অদৃশ্য হাতে নিয়ন্ত্রিত এক প্রক্রিয়া। এটা রাজনীতি নয়, অন্যায়ের শাসনকে কবুল করা এক ইভেন্ট ম্যানেজমেন্ট মাত্র। ‘স্ট্যাটাস-কো’ বজায় রেখে স্বৈরব্যবস্থা থেকে ব্যক্তির নিরাপত্তা, সম্পদ ও স্বার্থরক্ষা ছাড়া এর আর কোনো লক্ষ্য-উদ্দেশ্য নেই। যারা আত্মসমর্পণ করে এতে সায় দেয়নি তাদেরকে সাজানো মামলা ও নিবর্তনমূলক নানান পন্থায় রাজনীতি ও নির্বাচনী প্রক্রিয়া থেকে নিষিদ্ধ ও নির্বাসিত করা হয়েছে। সত্যিকারের দলও এখন আর নেই, আছে কোন্দল এবং কুৎসিত অযোগ্য ব্যক্তিবন্দনা। রাজনীতির নামে রাজনীতির কদাকার ও বিকৃত এই রূপ আমরা আমাদের দেশে দেখে আসছি অনেকদিন ধরেই।
অসংখ্য অগণিত নিবেদিত ও ত্যাগী নেতা-কর্মী-সমর্থক ও সহানুভূতিশীলেরা এর জন্য দায়ী নয়। নকল, বিকৃত, স্বার্থপর একশ্রেণীর লোক যারা পদ-পদবি অধিকার করে রাজনীতির নামে, সংগঠনের নামে ব্যক্তিস্বার্থ অর্জনের মহড়া ও তৎপরতায় লিপ্ত দায়ী সেই দু’নম্বরি নেতারাই।


গতানুগতিক ধারাকে বাদ দিয়ে রাজনীতিকে কঠিন করার অভিপ্রায় ব্যক্ত করেছিলেন শহীদ জিয়াউর রহমান। তাঁর আদর্শের অনুসারী হতে হলে এই অতি শস্তা, স্বার্থপর, বিকৃত রাজনীতির পথ ছাড়তে হবে। দেশপ্রেম, প্রজ্ঞা, সততা, দূরদর্শিতা, সাহস, শ্রম ও জনঘনিষ্ঠতায় তাঁকে অনুসরণ করতে হবে।


শহীদ জিয়া প্রতিটি সংকটকালে রাজনৈতিক নেতাদের জনগণের কাছে চলে যেতে বলেছেন। তাদের সঙ্গে মিশে যাবার পরামর্শ দিয়েছেন। জনগণকে সংগঠিত করে তাদের ভেতরে থেকে শক্তি সঞ্চয়ের কথা বলেছেন। বলে গেছেন, সংকট উত্তরণের পথ সাধারণ মানুষের কাছ থেকেই বেরিয়ে আসবে।


আজকের এই ঘোর সংকটকালে জনগণের কাছে না গিয়ে, তাদের আশা-আকাঙ্ক্ষা, সুখ-দুঃখ, তাদের হৃদস্পন্দন অনুভব না করে দফতরে বসে নিত্য বিবৃতি পাঠ, ডিজিটাল সভা, ফটো সেশনের জন্য সাজানো কর্মসূচি, আর মানববন্ধনে বন্দী রাজনীতি কি শহীদ জিয়ার নির্দেশিত পথ?


জিয়ার অনুসারী যারা তাদেরকে জিয়ার রাজনীতির কাছেই ফিরতে হবে। কেবল তাঁর নামে স্লোগান দিলে বা তাঁর ছবি বুকে লটকে রাখলেই চলবে না।

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *