জাতির পিতা হয়েইতো বিপদে পড়েছি

জাতির পিতা হয়েইতো বিপদে পড়েছি

“… ১১ই জানুয়ারি (১৯৭২) টেলিফোন বাজিয়া উঠিল। রিসিভার তুলিয়া একটি পরিচিত কিন্তু অত্যন্ত অপ্রত্যাশিত কন্ঠস্বর শুনিতে পাইলাম। কন্ঠস্বরটি গণপ্রজাতন্ত্রী বাংলাদেশ অস্থায়ী সরকারের প্রধানমন্ত্রী তাজউদ্দিন আহমদের। কলেজ জীবন হইতে বন্ধূ। টেলিফোনে তাজউদ্দিন কুশলাদি জিজ্ঞাসার পর আমাকে বলেন, – “শেখ সাহেবকে প্রধানমন্ত্রী পদে আসীন করিবার সিদ্ধান্ত লইয়াছি এবং প্রস্তাবও করিয়াছি। কারণ তিনি যে কোন পদেই বহাল থাকুন না কেন, তাঁহার ইচ্ছা-অনিচ্ছাতেই রাষ্ট্রীয় প্রশাসন পরিচালিত হইবে। শেখ শাহেবের মানসিক গড়ন তুমিও জান, আমিও জানি। তিনি সর্বাত্মক নিয়ন্ত্রণে অভ্যস্থ্। অতএব ক্ষণিকের ভূল সিদ্ধান্তের জন্য পার্লামেন্টারী কেবিনেট পদ্ধতির প্রশাসন প্রহসনে পরিণত হইবে। তিনি প্রেসিডেন্ট পদে আসীন থাকিলে নিয়মান্ত্রিক নাম-মাত্র দায়িত্ব পালন না করিয়া মনের অজান্তে কার্যতঃ ইহাকে প্রেসিডেন্ট পদ্ধতির প্রশাসনে পরিণত করিবেন। এই দিকে প্রেসিডেন্ট পদে বিচারপতি আবু সাঈদ চৌধুরীকে নির্বাচনের কথা ভাবিতেছি। তোমার মত কি?” তদুত্তরে তাঁহাকে বলি, – “তোমার সিদ্ধান্ত সঠিক। নামমাত্র প্রেসিডেন্টের ভূমিকা পালন শেখ সাহেবের শুধু চরিত্র বিরুদ্ধ হইবে না, বরং উহা হইবে অভিনয় বিশেষ। কেননা, ক্ষমতার লোভ তাঁহার সহজাত।” তাজউদ্দিন টেলিফোনের অপর প্রান্তে সশব্দে হাসিয়া উঠিলেন। বলিলেন, – “আমি জানিতাম, মৌলিক প্রশ্নে তোমার আমার মধ্যে মতভেদ হইবে না॥” 

– অলি আহাদ / জাতীয় রাজনীতি : ১৯৪৫ থেকে ৭৫॥ [ কোঅপারেটিভবুকসোসাইটি (পঞ্চমসংস্করণ) – অক্টোবর২০১২পৃ৪৩৮৪৩৯ ]

… আমি তাকে বলেছিলাম, কোথায় কোথায় আমাদের কাকে কাকে হত্যা করা হয়েছে। তিনি রেগে বললেন, ‘শুধু তোদের লোক মরছে, আমার লোককে মারছে না?’  আমি বললাম, ‘আমার লোক আর আপনার লোক এভাবে বলছেন কেন?  আপনি না জাতির পিতা?  সবাই তো  আপনার লোক।’ শেখ মুজিবুর রহমান একটু আক্ষেপের সুরে বলেছিলেন, ‘জাতির পিতা হয়েইতো বিপদে পড়েছি।’… আমরা তাকে স্মরণ করিয়ে দিলাম,  জাসদ নেতারা জেলে আছেন, সিরাজ শিকদারকে হত্যা করা হয়েছে,  কাজী জাফর এখনও পলাতক। এই পর্যায়ে তিনি উত্তেজিত হয়ে বললেন, বিরোধী রাজনীতি আমিও করেছি, জাসদের বাচ্চা ছেলেরা জানেনা  যে দেশে একটা লিগাল সরকার  আছে, তারা বিদেশের দূতাবাসে চিঠি লেখে, সিরাজ শিকদার একটা ডিবচ। আর কাজী জাফর? কি মনে করিস, আমি কি তাকে ধরতে পারি না?  দাঁড়ি রেখে যুব আন্ডারগ্রাউন্ড সেজেছে। এখানে বসে থাক, আমি দুই ঘন্টার মধ্যে তাকে ধরে নিয়ে আসতে পারি॥’

#০২  

” … মনসুর ভাইসহ (ক্যা. মনসুর আলি) ৩২ নম্বরে বঙ্গবন্ধুর বাড়িতে গেলাম।বঙ্গবন্ধু যেনো কি কাজ করছিলেন।মনসুর ভাই বঙ্গবন্ধুর সঙ্গে আমার সম্পর্কটা সহজ করার জন্য বললেন, ‘মিজান, তুমি একটা চুটকি বল।নেতা তো এতো কাজ করছেন তার একটা ডাইভারসন দরকার।’ শুনে বঙ্গবন্ধু একটু রাগত: স্বরেই বললেন, ‘দরকার নেই।আমি ওর কথা শুনতে চাই না।’ আমি বললাম, ‘কেনো কি হয়েছে?’ বঙ্গবন্ধু বললেন, ‘তুমি আমার কথা শুননি।বেয়াদপি করেছো।আমি ইশারা করার পরও তুমি সেদিন সংসদীয় দলের সভায় বাকশালের পক্ষে ভোট দেওনি।’

বঙ্গবন্ধুর সঙ্গে যে আত্মিক সম্পর্ক ছিল সেটার খেই ধরে বললাম, ‘আমি আপনার দীর্ঘ দিনের কর্মী।চতুর্থবারে মতো সংসদ সদস্য।আপনি শাসনতন্ত্রের যে সংশোধনী করেছেন, তা আপনার ইমেজকে জর্জ ওয়াশিংটন বা আব্রাহাম লিংকনের ইমেজে উন্নীত করে, না আইউবের ইমেজে পর্যবসিত করে, এই কনফিউসন বিদূরিত হওয়ার আগ পর্যন্ত আমি কেমন করে ভোট দেই।’

তিনি এর জবাবে অত্যন্ত আবেগের সঙ্গে বললেন, এই পার্লামেন্টারি পদ্ধতির গণতন্ত্র গ্রেট ব্রিটেনে এক ভোটে সরকার রক্ষা করেছে। ভারতে ম্যাডাম গান্ধীর সরকার অল্পের জন্য টিকে আছে।এসব আমি বুঝি, কিন্তু দেশের অবস্থা যে পর্যায়ে গেছে, তাতে আগামী নির্বাচন আওয়ামী লীগের জন্য মারাত্মক বিপর্যয় ডেকে আনবে।২৫ থেকে ৩০টির বেশি আসন আমরা পাবো না। তখন জামায়াত অন্যান্য স্বাধীনতা বিরোধী শক্তির সঙ্গে জোট বেঁধে আওয়ামী লীগ ও স্বাধীনতার পক্ষের শক্তিকে কচুকাটা করবে।এ অবস্থা থেকে দেশকে রক্ষার জন্য আমি এই পদক্ষেপ নিয়েছি এবং এটা অত্যন্ত সাময়িক॥”

 মিজানুর রহমান চৌধুরী (রাজনীতিবিদ এবং সাবেকপ্রধানমন্ত্রী) / রাজনীতির তিনকাল॥ [ হাফেজা মাহমুদা ফাউন্ডেশন – ফেব্রুয়ারি২০০১পৃ১৬০ ]

#০৩  

” … তোরা আমাকে জাতির পিতা বানিয়েছিস। আমি এখন সবার। আমি নতুন পার্টি করবো, নাম সোসালিস্ট পার্টি।

… আমি তাকে বলেছিলাম, কোথায় কোথায় আমাদের কাকে কাকে হত্যা করা হয়েছে। তিনি রেগে বললেন, ‘শুধু তোদের লোক মরছে, আমার লোককে মারছে না?’ আমি বললাম, ‘আমার লোক আর আপনার লোক এভাবে বলছেন কেন? আপনি না জাতির পিতা? সবাই তো আপনার লোক।’ শেখ মুজিবুর রহমান একটু আক্ষেপের সুরে বলেছিলেন, ‘জাতির পিতা হয়েইতো বিপদে পড়েছি।’

… আমরা তাকে স্মরণ করিয়ে দিলাম, জাসদ নেতারা জেলে আছেন, সিরাজ শিকদারকে হত্যা করা হয়েছে, কাজী জাফর এখনও পলাতক। এই পর্যায়ে তিনি উত্তেজিত হয়ে বললেন, ‘বিরোধী রাজনীতি আমিও করেছি, জাসদের বাচ্চা ছেলেরা জানেনা যে দেশে একটা লিগাল সরকার আছে, তারা বিদেশের দূতাবাসে চিঠি লেখে, সিরাজ শিকদার একটা ডিবচ। আর কাজী জাফর? কি মনে করিস, আমি কি তাকে ধরতে পারি না? দাঁড়ি রেখে যুব আন্ডারগ্রাউন্ড সেজেছে। এখানে বসে থাক, আমি দুই ঘন্টার মধ্যে তাকে ধরে নিয়ে আসতে পারি॥’

– হায়দার আকবর খান রনো / শতাব্দী পেরিয়ে॥ [ তরফদার প্রকাশনী – ফেব্রুয়ারি২০০৫পৃ : ৩০৮/৩১৫/৩৪১ ]

“… সেই সময় বঙ্গবন্ধু এভিনিউস্থ (সেই সময়কার জিন্না এভেনিউ) আলফা ইনস্যুরেন্স কোম্পানীর অফিসে মাঝে মাঝে যেতাম। দেখতাম, বঙ্গবন্ধু ও তাজুদ্দিন বসে বসে আলাপ করছেন। আলফা ইনস্যুরেন্সের মালিক ছিলেন জনাব ইউসুফ হারুণ। করাচীর ডন পত্রিকার মালিক ও বিশিষ্ট ব্যবসায়ী ও শিল্পপতি। তিনি ছিলেন বঙ্গবন্ধুর বন্ধু। ইউসুফ হারুণ সম্পর্কে বঙ্গবন্ধু ১৯৭৩ সালের আগস্ট মাসে অটোয়াতে একদিন বললেন, হারুণ পরিবারের সঙ্গে তার সম্পর্ক অনেকদিনের। হারুণরা মুসলিম লীগ করতেন আর শেখ মুজিব আওয়ামী লীগ করতেন। কিন্তু রাজনৈতিক মত-পার্থক্য থাকলেও তা প্রগাঢ় বন্ধুত্বের পথে অন্তরায় হয়নি। বঙ্গবন্ধু গল্প করছিলেন হারুণদের সম্পর্কে। উনি বললেন – যখনই করাচী গিয়েছি, ইউসুফ হারুণ তাকে বাড়ীতে নিয়ে গেছেন্। হারুণের মা লেডী আব্দুল্লাহ হারুণ বলতেন, আমার তিন ছেলে – ইউসুফ, মুজিব, মাহমুদ। ইউসুফ হারুণের মা তাকে নিজের পুত্রের মত ভালবাসতেন।

লাহোরে শেখ মুজিব বাংলাদেশ সফরের আমন্ত্রণ জানালে ভুট্টো ১৯৭৪ সালের ২৬শে জুন দুই দিনের জন্য ঢাকা সফরে আসেন। ১২১ জনের এক বিরাট সফরসংগী নিয়ে পি.আই.এ’র একটি বিশেষ বিমানে ঢাকা অবতরণ করে। ভুট্টো হারুণ পরিবারের মাহমুদ হারুণকে সংগে নিয়ে আসেন। উদ্দেশ্য ছিল তিনি বাংলাদেশের সাথে কূটনৈতিক সম্পর্ক স্থাপন করতে পারবেন এবং জনাব হারুণ হবেন বাংলাদেশে নিযুক্ত প্রথম পাকিস্তানী রাষ্ট্রদূত। কিন্তু তা আর সম্ভব হয়নি॥”

– জাওয়াদুল করিম / মুজিব ও সমকালীন রাজনীতি॥ [ আগামী প্রকাশনী]

#০৪ 

“… বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান ১৯৬৯ সালে জেল থেকে বেরিয়ে আরহাম সিদ্দিকীর (বলিয়াদীর জমিদার পুত্র ও ব্যবসায়ী) গুলশানের বাংলোতে গিয়ে দু’দিন বিশ্রাম নিতে গিয়েছিলেন। বাসায় তার বিশ্রাম নেয়া সম্ভব হতো না। সাক্ষাৎকারীদের ভীড় এড়ানো যেত না, তাই উঠেছিলেন আরহাম সিদ্দিকীর বাংলোয়। সেখানে আলোচনার জন্য ডেকে ছিলেন আবদুল গাফফার চৌধুরীকে।

চৌধুরী: বঙ্গবন্ধু, আপনার দল আওয়ামী লীগে নব্য বাঙ্গালী ধনীদের দ্রুত সমাবেশ ঘটেছে। এরা নিজেদের স্বার্থে ৬ দফাকে ব্যবহার করবে। আপনি তাদের কি করে ঠেকাবেন?

বঙ্গবন্ধু: তুমি কেবল নব্য ধনী ব্যবসায়ী ও পেশাজীবীদের দেখছো? পাকিস্তানের সিভিল ব্যুরোক্রাসি ও আর্মির ভেতরে ছোট হলেও যে বাঙ্গালী অফিসার্স সেকশনটি গড়ে উঠছে, সেদিকে থেকে বিপদের কথা ভাবছো না?

চৌধুরী: তারা কি এতোই শক্তিশালী যে বিপদ ঘটাতে পারে?

বঙ্গবন্ধু: এই বাঙ্গালী সিভিল এবং আর্মি অফিসারদের বাংলাদেশের জনগণের প্রতি কমিটমেন্ট খুব কম। এরা কমবেশি ক্যারিয়ারিষ্ট। পাকিস্তানের বিভিন্ন সরকারের বৈষম্য নীতির দরুণ এদের পদোন্নতি না হওয়াতে এরা ক্ষুব্ধ। এরা জেনারেল হতে চায়। কেন্দ্রীয় সেক্রেটারিয়েটে বড় বড় পদে প্রোমোশন চায়। কিন্তু বাঙ্গালী বলে তাদের জন্য এই দুয়ার রুদ্ধ। 

এরাও তাই এখন ৬ দফার সমর্থক। কিন্তু আন্দোলন করে, সংগ্রাম করে এরা বাংলাদেশের মানুষের হাতে রাজনৈতিক স্বাধীনতা ও অর্থনৈতিক মুক্তি এনে দিতে চায় না। এরা চায় গোপন ষড়যন্ত্র করে, আইয়ুব বা ইয়াহিয়া খানকে হঠাৎ হত্যা করে বাংলাদেশে ক্ষমতা দখল করতে এবং বাংলাদেশে বাঙ্গালী মিলিটারী শাসন কায়েম করতে। 

গাফফার, তোমাকে বলছি এটা এখন প্রকাশ করো না। জেলে থাকতে আমার কাছে কয়েকবার এই বাঙ্গালী মিলিটারি অফিসারেরা প্র্স্তাব পাঠিয়েছে, আপনি ছ’দফা নিয়ে আন্দোলন করবেন না। তাতে আইয়ুব খান সতর্ক হয়ে যাবে। আপনি চুপ থাকুন, আমরা হঠাৎ বাংলাদেশের কয়েকটা ক্যান্টনমেন্ট দখল করে নিয়ে তারপর পিন্ডির সাথে কনফেডারেশন করব। আগরতলা ষড়যন্ত্র মামলা শেষ হবার পর কর্ণেল মোয়াজ্জেমের আমার বিরুদ্ধে বিবৃতি, তার ছয়দফা নয়, একদফা, এসব ইস্তাহার দেখে তোমরা কি কিছু আন্দাজ করতে পারনি?”

– বঙ্গবন্ধুর স্মৃতি কথা / সম্পাদনা : আবদুল ওয়াহেদ তালুকদার॥ [কাকলী প্রকাশন – মার্চ১৯৯৬পৃ৯০৯১]

#০৫  

“… জেনেভায় অস্ত্রোপচার থেকে তার আশু আরোগ্য কামনা করে সেই সময়ে জেনেভা সফররত বেগম নুসরাত ভুট্টো তাকে পাঠালেন তার এবং তার স্বামী জুলফিকার আলি ভুট্টোর তরফ থেকে একগুচ্ছ লাল গোলাপ। সেই অপরাহ্নেই ধন্যবাদ জানিয়ে বঙ্গবন্ধুর তরফ থেকে ফেরত গেল এক বক্স সুইস চকোলেট। রাজনৈতিক লাল গোলাপ বনাম রাজনৈতিক সুইস চকোলেট।”

– ফারুক চৌধুরী (প্রাক্তন কূটনীতিবিদ) / নানা ক্ষণ নানা কথা ॥ [মীরা প্রকাশন – অক্টোবর, ১৯৯৯ । পৃ: ৩৯]

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

Shares