চঞ্চল চৌধুরীর ইউনিলিভারের পিওর ইটের বিজ্ঞাপন প্রসঙ্গে

চঞ্চল চৌধুরীর ইউনিলিভারের পিওর ইটের বিজ্ঞাপন প্রসঙ্গে

:: মুজতবা খন্দকার ::

চঞ্চল চৌধুরী বহুজাতিক বিজ্ঞাপনি সংস্থার হয়ে একটি বিজ্ঞাপনে হিন্দুস্থান ইউনিলিভারের পিওর ইটের বিজ্ঞাপনে অংশ নিয়ে ওয়াসার পানিকে তাচ্ছিল্যভরে ফেলে দিচ্ছে। এটা দেখানো হলো। অথচ ওয়াসার পানির জন্য আমরা প্রতি মাসে টাকা দেই। এক সময় আমরা নির্দ্ধিধায়  এই পানি পান করতাম।এখন সেটা ফুটিয়েও পান করলেও দুর্গন্ধমুক্ত করা যায়না। অথচ এই সরকারী সংস্থাটির চেয়ারম্যান তাকসিম চৌদ্দ বছর ধরে প্রতিষ্ঠানটির সর্বসময় ক্ষমতার অধিকারী হয়ে বসে রয়েছেন। নগরবাসীকে সুপেয় পানি দিতে পারা যাদের কোনো যোগ্যতাই নাই,তারা শুরু করেছে উল্টো বোতলজাত পানির ব্যবসা! নাম দিয়েছে শান্তি।

আর ওদের তিনস্তরের, চারস্তরের পরিশোধিত পানির মূল উপকরণ কিন্তু ব্লিচিং পাউডার। অর্থ্যাৎ একই পন্য বিভিন্ন মোড়কে বাজারজাত করে ব্যবসায়িক ফায়দা হাসিলের চেষ্টা। আর ফিল্টারের কিটগুলো  ৩০০০ লিটার পরপর পাল্টানো লাগে যাতে শুধুমাত্র ব্লিচিং পাউডারই থাকে। চাতুরী আর কাকে বলে!

আহা কি শান্তি ওয়াসার। এসব পানি জোর করে সরকারী অনুষ্ঠানে দেওয়া হচ্ছে,আর সবাইকে বাধ্য করা হচ্ছে সেটা খেতে। সরকারী প্রতিষ্ঠানের এমনি নগ্ন বানিজ্য আমরা ঢাকাবাসী দিনের পর দিন সেটা দেখে যাচ্ছি। আমার কারো মুরোদ নেই,বলা,সরকারী প্রতিষ্ঠান এভাবে বানিজ্য করতে পারেনা। তাদের একমাত্র লক্ষ্য হবে জনগনকে সুপেয় স্বাস্থ্যসম্মত  পানি সরবরাহ করা। কিন্তু আমরা জনগন প্রতিমাসে পানির বিল দিয়ে নিজস্ব তদারকিতে পানি ফুটিয়ে অথবা বিকল্প উপায়ে আমরা  স্বাস্থ্যসম্মত পানি তৈরী করে ব্যবহার করছি।

ওয়াসাার বর্তমান এমডির বিরুদ্ধে এন্তার অভিযোগ। প্রতিদিন তাকে নিয়ে গণমাধ্যমে খবর হচ্ছে তবু তাকে সরানোর কোনো লক্ষন দেখিনা। 

কিন্তু কেন জানিনা! 

এবার আসি হিন্দুস্থান লিভারের পিওর  ইট প্রসংগে।               

আমাদের দেশে দূর্নীতিটা মূলত বেশিরভাগ ক্ষেত্রে ভিআইপি,প্রভাবশালী আর আমলারা মিলেমিশে করে! সাধারণ মানুষের ক্ষেত্রে দূর্নীতি করা সম্ভব না। সুযোগও নেই।

ইউনিলিভারের পিওর  ইট  প্রথম যখন মার্কেটে আসল তখন তার বিজ্ঞাপন করে প্রচার করলো এই পানি  ফুটানো পানির মতই নিরাপদ।

অনেকে তখন ভাবল, তাহলে এই ফিল্টার কেন কিনব? পানি ফুটিয়েই পান করব। তবে অনেকে এই আধুনিকতার ছোয়া গ্রহণ করলো (বিশেষ করে যারা টাকা খরচ করার জন্য রাস্তা খুঁজে পাচ্ছে না,অবৈধ ইনকাম আছে এবং নতুন জিনিসটা সবার আগে কিনে চমকে দিবে এ টাইপের লোকেরা)।

তখন ইউনিলিভার কিছু ব্যবসা করে ফেলেছে কিন্তু তা আশানুরূপ নয়।

এরপর ইউনিলিভার তাদের ভাষা পরিবর্তন করলো,বিজ্ঞাপন দিয়ে বলা শুরু করলো এই পানি  ফুটানো পানির চেয়ে নিরাপদ। 

তখন অনেকে চিন্তা করল, ফুটানো পানি একটু কম নিরাপদ এ আর এমন কিছু না। তবুও বেশিরভাগ লোকেই ফুটানো পানিই খেত। ফলে তাদের ব্যবসাটা মনমত হচ্ছে না।

আর এজন্য তারা ইদানীং বিজ্ঞানেরর মাধ্যমে বলা শুরু করল, ফুটানো পানি নিরাপদ না একমাত্র ইউনিলিভার এর পিওর  ইট  নিরাপদ। ফুটানো পানি নাকি টিডিএস এর মান কমাতে পারেনা।

অথচ মানুষের শরীর ৩৫০ পর্যন্ত টিডিএস গ্রহণ করতে পারে,এর বেশি হলে সমস্যা হয়।

আর ওদের তিনস্তরের, চারস্তরের পরিশোধিত পানির মূল উপকরণ কিন্তু ব্লিচিং পাউডার। অর্থ্যাৎ একই পন্য বিভিন্ন মোড়কে বাজারজাত করে ব্যবসায়িক ফায়দা হাসিলের চেষ্টা। আর ফিল্টারের কিটগুলো  ৩০০০ লিটার পরপর পাল্টানো লাগে যাতে শুধুমাত্র ব্লিচিং পাউডারই থাকে। চাতুরী আর কাকে বলে!

এর আগেও আমরা রং ফর্সা করার ক্রিমের কত আপডেট ভার্সন দেখেছি? যেটা কিনতাম তার ঠিক কয়েকমাস পরে দেখতাম এটা ভালো না এটার চেয়ে এটা ভালো। ফিল্টারের বেলায় ও তারা ইতিমধ্যেই কয়েক ধরনের ফিল্টার বাজারে নিয়ে এসেছে। আপনি একটা কিনে কয়েক মাস ব্যবহার করার পরে বিজ্ঞাপনে দেখতে পারবেন,আপনার যেটা আছে সেটা পুরোপুরি জীবাণু কিল করতে পারেনা। এজন্য এটা বাদ দিয়ে নতুনটা কিনতে হবে। এখন প্রশ্নঃ আপনি একজীবনে কয়টা ফিল্টার কিনবেন? সবার তো সে সামর্থ্য নেই। 

আমার কথা হচ্ছে সাবান,ফেয়ার এ্যান্ড লাভলি এগুলো ব্যবহার না করলেও কিছু আসে যায়না, এগুলো সবার জন্য প্রযোজ্য না কিন্তু পানি তো সবাইকে খেতে হবে! তাহলে আপনারা আপনাদের প্রোডাক্ট চালানোর জন্য একমুখে কতকথা বলেন। ফুটানো পানি পান করার জন্য একসময় সরকার ও বিভিন্ন এনজিও সংস্থা প্রচার করেছে যাতে পানিবাহিত রোগ থেকে আমরা বাঁচতে পারি। আর এখন ইউনিলিভার প্রচার করছে ফুটানো পানি নিরাপদ না। 

“বিশুদ্ধ পানির অপর নাম জীবন” তাহলে এরকম স্পর্শকাতর বিষয়ে বিজ্ঞাপন প্রচার করার জন্য ইউনিলিভার কি জনস্বাস্থ্য অধিদপ্তরের অনুমতি নিয়েছে? আর যদি অনুমতি না নেয় তাহলে ইউনিলিভার এর বিরুদ্ধে মামলা করা জনস্বাস্থ্য অধিদপ্তরের দায়িত্ব। এবার আসি একটু অন্য প্রসংগে।  চঞ্চল চৌধুরী দেশের একজন সেলিব্রেটি অভিনেতা। তারও কিছু দায়িত্ব আছে,টাকার জন্য নিজের নীতি বিসর্জন দেয়া কোনো দায়িত্বশীলতা নয়। তিনি নাকি মঞ্চ নাটক করে এসেছেন। মঞ্চ নাটক কিম্বা এর অভিনেতা অভিনেত্রীরা হয় সাধারনত: সমাজের গণমানুষের মানুষের প্রতিনিধি। কর্পোরেট কোনো প্রতিষ্ঠান  চাইলেও এসব শিল্পীদের দিয়ে তাদের পারপাস সার্ভ করতে পারেনা। আমার এ প্রসংগে হঠাৎ মনে পড়লো,বিখ্যাত সংগিত পরিচালক,সুরকার এবং গীতিকার সলিল চৌধুরীর কথা। গোদরেজ কোম্পানীর কোনো একটা কসমেটিক পন্য তার সুরে হেমন্ত মুখোপাধ্যায়ের  একটি এলপির স্পনসর হতে চেয়েছিলো.. যে গানে হেমন্তর রানার গানটি ছিলো,আরো ছিলো ক্ষণজন্মা কবি সুকান্তের একটি কবিতা। তিনি রাজী হননি। বলেছিলেন,হেমন্ত বাবু এখানে নেই,তবু আমি দায়িত্ব নিয়ে বলছি,আমাদের কোনো স্পনসরের দরকার নেই। গনসংগীত গেয়ে, রচনা করে ততদিনে সলীল বাংলাগানের একটি বিশিষ্ট স্থান দখল করেছিলেন। 

তাই বলছি,দেশ এবং দেশের মানুষের প্রতি কমিটমেন্ট থাকতে হয়।চঞ্চল চৌধুরীর বোঝা উচিৎ ছিলো, তার বিজ্ঞাপনে কত মানুষ প্রভাবিত হতে পারে।

চঞ্চল চৌধুরীর মত অভিনেতা যেখানে ফুটানো পানি ফেলে দেয়, সেখানে এটা নিশ্চয় একটা চিন্তার বিষয়। এরকম ধারনা অনেকেরই হতে পারে..তাই তারকাদের উচিৎ সামাজিক দায়িত্বের কথা মাথায় রাখা।

তবে সবাইকে অনুরোধ,পানি যতই খারাপ হোক ফুটিয়ে খেলে কোনো সমস্যা নেই। সেটাই শত পার্সেন্ট পিওর!  আমি দায়িত্ব নিয়ে বলছি।

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

Shares