গণস্বাস্থ্যের কিট নিয়ে রাজনীতি প্রসঙ্গে

গণস্বাস্থ্যের কিট নিয়ে রাজনীতি প্রসঙ্গে

:: রুমি আহমেদ ::

গণস্বাস্থ্যের কিট নিয়ে যতটা রাজনীতি হয়েছে তার এক সহস্রাংশ যদি বিজ্ঞান হত তাহলে দেশের মানুষের বিজ্ঞান জ্ঞান ড্রামাটিকালি বেড়ে যেত !

আমি বিএসএমএমইউর ১৯ পাতার টেকনিক্যাল রিপোর্টটা পড়ি নি – পাই নি কোথাও| তবে বিএসএমএমইউর ছয় অধ্যাপকের বিবৃতি পড়েছি|

বিবৃতিটা পরে মনে হয়েছে যে যারা বিবৃতি দিয়েছেন তারা গণস্বাস্থ্যের উপর যথেষ্ট হোস্টাইল| মনে হচ্ছিলো এঁরা কখনোই এই কিট টার শুভকামনা করেন নাই|

তবে এই হোস্টাইলিটি টা বাদ দিলে বিবৃতির সায়েন্টিফিক পয়েন্টগুলো কারেক্ট| এই বিবৃতির মাধ্যমে আমি জানতে পেরেছি এই কিট সম্বন্ধে কিছু ক্রুসিয়াল তথ্য|

মোদ্দা কথা হচ্ছে গণস্বাস্থ্যের এই কিট আন্তর্জাতিক মানোত্তীর্ণ হয় নি| গণস্বাস্থ্যের বিজ্ঞানীদের উচিত হবে এই কিটটা আরো ডেভেলপ করা এবং দেশবাসীকে একটা আন্তর্জাতিক মানোত্তীর্ণ কিট উপহার দেয়া |

প্রথম ক্রুসিয়াল তথ্য হচ্ছে গণস্বাস্থ্যের ডটব্লট কিট IgM এবং IgG মধ্যে তফাৎ করতে পারে না| এই একটা তথ্যই গণস্বাস্থ্যের এই ডটব্লট কিট টাকে একটা ডায়াগনোস্টিক কিট হিসেবে বাতিল করে দেয়| ব্যাপারটা একটু বুঝিয়ে বলি| ধরুন দবিরের জ্বর হয়েছে| দবির পাঁচদিন আগে সাবেতের সাথে চা খেতে গিয়েছিলেন| তখন কেউ জানতেন না যে সাবেতের করোনাভাইরাস ইনফেকশন হয়েছে| দুইজন মুখোমুখি কথা বলার সময় সাবেত এর মুখ থেকে ভাইরাস দবিরের নাকে প্রবেশ করেছে| এর পাঁচদিন পর দবিরের ও জ্বর শুরু হয়েছে|

এখন সাবেতের সাথে দেখা হওয়ার পাঁচ থেকে দশ দিনের মধ্যে দবিরের রক্তে করোনাভাইরাস IgM তৈরী হওয়ার কথা| এখন যদি সাবেতের সাথে দেখা হবার সাত দিন পর আমরাএকটা এন্টিবডি কিট দিয়ে দবিরের রক্ত পরীক্ষা করে যদি করোনাভাইরাস IgM সনাক্ত করতে পারি আমরা মোটামুটি বলতে পারি এই এন্টিবডি কিট দিয়ে আমরা দবিরের রোগ সনাক্ত করেছি এবং এন্টিবডি কিট টা রোগ সনাক্তকরণে সফল|


দশ দিন পর দবির ভালো হয়ে গেলো| আমরা যদি সাবেতের সাথে দেখা হবার দুসপ্তাহ পরে দবিরের রক্তে এন্টিবডি চেক করি তখন আমরা সনাক্ত করবো IgG| মানে দবিরের রক্ত পরীক্ষা বলছে যে দবিরের এই মুহূর্তে কোন ইনফেকশন নাই তবে নিকট অতীতে – দুসপ্তা আগে অথবা তিন মাস আগে -দবিরের ইনফেকশন হয়েছিল |

গণস্বাস্থ্যের এই ডটব্লট কিট বলতে পারে না তারা রক্তে কি দেখছে IgM না IgG|

ধরুন কবির সাহেব জ্বর নিয়ে হাসপাতালে ভর্তি হলো| গণস্বাস্থ্যের ডটব্লট কিট টেস্ট পজিটিভ আসলো| এই পজিটিভ টেস্ট দিয়ে আমি কি করবো? কিভাবে আমি নিশ্চিত হবো যে কবির সাহেবের জ্বর আসেনি ডেঙ্গুর কারণে, আর তার গণস্বাস্থ্যের ডটব্লট টেস্ট পজিটিভ এসেছে কারণ কবির সাহেবের তিন মাস আগে এসিম্পটোমেটিক করোনাভাইরাস ইনফেকশন হয়েছিল তার IgG এর কারণে| যে কিট স্পেসিফিক ভাবে IgM সনাক্ত করতে পারে না – তা ডায়াগনোস্টিক টেস্ট হিসেবে গ্রহণযোগ্য হবার প্রশ্নই উঠে না|

বিবৃতির দ্বিতীয় পয়েন্টে জানতে পারলাম দুই সপ্তাহ পরে এই কিট টার সেনসিটিভিটি ৭০ % | যদিও এই কিটটা আলাদা করে বলতে পারে না – তবে যেহেতু দুসপ্তাহ পরে ডিটেক্ট হচ্ছে ধরে নিচ্ছি এই পর্যায়ে এই কিটটা IgG ডিটেকশন করছে এবং এর সেনসিটিভিটি ৭০ % | যদিও বিএসএমএমইউ এর বিবৃতি বলছে এই কারণে এই কিটটা দিয়ে সেরোসার্ভেইলেন্স করা যেতে পারে – আমি মনে করি কোন সায়েন্টিফিক অথোরিটিই যে কিটের সেনসিটিভিটি ৭০ % সেই কিট দিয়ে করা সেরোসার্ভেইলেন্স স্টাডি গ্রহণ করবে না| গ্রহণযোগ্য সেরোসার্ভেইলেন্স স্টাডি করার জন্য আমি চাইবো এমন টেস্ট কিট যার সেনসিটিভিটি ৯৭ % বা তার কাছাকাছি|

তৃতীয় পয়েন্ট -আরো জানতে পারলাম যে গণস্বাস্থ্যের বিজ্ঞানীরা অবশেষে তাদের একটা উদ্ভট দাবির ভুল বুঝতে পেরেছেন এবং এখন আর দাবি করছেন না যে তাদের রক্ত পরীক্ষা এন্টিজেন ডিটেক্ট করতে পারবে না| এখন লালার এন্টিজেন ডিটেক্ট করার জন্য তারা নুতন এন্টিজেন কিট ডেভেলপ করার জন্য কাজ করছেন| এইভাবেই হবার কথা, এন্টিজেন থাকবে লালা তে| আমি বুঝতে পারছি না গণস্বাস্থ্যের বিজ্ঞানীরা এই রুকি মিসটেক (Rookie Mistake) তা কিভাবে করলেন এতদিন ধরে| আমি একজন চিকিৎসক, আমি মলিকুলার বায়োলোজিষ্ট বা ল্যাবরোটরি সায়েন্স এর মানুষ না| কিন্তু আমি যেটা কমন সেন্স দিয়ে বুঝতে পারলাম শোনার সাথে সাথেই দুমাস আগে – এই বিজ্ঞানীদের এটা বুঝতে দুমাস কেন লাগলো? এখন তো আমার এই মানুষগুলোর জ্ঞান আর ক্যাপাবিলিটি নিয়ে সন্দেহ হচ্ছে |

এই টেস্ট কিট নিয়ে আলোচনা করতে গেলে আরো একটা ব্যাপার জানা দরকার| এই নুতন করোনাভাইরাস SARS -CoV-2 ছাড়াও আরো চার ধরণের হিউমেন করভাইরাস মানুষ কে সংক্রমণ করে এবং শীতের সর্দি কাশির এক তৃতীয়ংশ হয় এই হিউমেন করভাইরাস গুলোর কারণে| আমার আশংকা গণস্বাস্থ্যের এই কিট হিউমেন করভাইরাস এবং S ARS -CoV-2 আলাদা করতে পারে না| ফলে এই কিটটা প্রচুর ফলস পজিটিভ দিতে পারে| আমি জানি না বিএসএমএমইউর গবেষক রা হিউমেন করভাইরাস এর এন্টিবডির এগেইনস্ট এ এই কিট টেস্ট করেছেন কিনা|

মোদ্দা কথা হচ্ছে গণস্বাস্থ্যের এই কিট আন্তর্জাতিক মানোত্তীর্ণ হয় নি| গণস্বাস্থ্যের বিজ্ঞানীদের উচিত হবে এই কিটটা আরো ডেভেলপ করা এবং দেশবাসীকে একটা আন্তর্জাতিক মানোত্তীর্ণ কিট উপহার দেয়া |

( আমার এই মতামত বিএসএমএমইউর গবেষণার রেজাল্টের উপর ভিত্তি করে লিখা| যদি বিএসএমএমইউর গবেষণা ভুল হয়ে থাকে তাহলে আমার এই মতামত ইনভ্যালিড হয়ে যায়)

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

Shares