গণপাশ শিক্ষার্থীদের জন্য ভয়ংকর মেধা ফাঁদ তৈরি করবে

গণপাশ শিক্ষার্থীদের জন্য ভয়ংকর মেধা ফাঁদ তৈরি করবে

:: ফয়েজ আহমদ তৈয়্যব ::

গণপাশ শিক্ষার্থীদের ক্যারিয়ারকে গণধর্ষনের সমান। এটা ভয়ংকর মেধা ফাঁদ তৈরি করবে। এই ফাঁদ কিভাবে মুছবে আগামীর বাংলাদেশ?     


পরীক্ষা না নিয়ে ক্যারিয়ারের অন্যতম একটা স্তরে শিক্ষার্থীদের গণপাশ করিয়ে দেয়ার অর্থই হচ্ছে  করনোকালে শিক্ষা ব্যবস্থাপনায় কোনই প্রস্তুতি নেই। সরকার বিশ্ব ব্যবস্থাপনা থেকে কিছুই শিখেনি। কভিড-১৯ যতই দীর্ঘস্থায়ী হোক না কেন, নিউ নরমাল স্বাস্থ্যবিধি মেনে আমাদের শ্রেণী শিক্ষায় ফিরে যেতে হবে একদিন। সেজন্য শ্রেনিকক্ষে শিক্ষার্থীদের সংখ্যার পুনঃ নির্ধারণ দরকার। দেশের অধিকাংশ স্কুলের অবকাঠামো ও শিক্ষক সংকট এমন পর্যায়ে যে শ্রেণীর আকার অনুর্ধ ৪০ এ নামিয়ে আনা উচিৎ। এছাড়া শিক্ষা মান বিবেচনায় আমরা বহু আগেই সরকারকে এই পরামর্শ দিয়েছি যে, একজন শিক্ষকের পক্ষে ঘন্টায় ৪০ এর বেশি শিক্ষার্থীকে পড়া বুঝানোর দায় দেয়া বড়ই অমানবিক। করোনার প্রকট অভিঘাতের পরেও সরকার ও প্রশাসন এসব কারিগরি ও মনস্তাত্ত্বিক দিক  বুঝার চেষ্টা করেনি, দীর্ঘ মেয়াদী শিক্ষা ব্যবস্থাপনা ও শিক্ষা অবকাঠামো  পরিকল্পনা তো দুরের কথা। অন্যদিকে শ্রেণীকে বিভক্ত করে ছোট ছোট ব্যাচে করে শিক্ষার্থীদের ছোট ছোট সময়ের জন্য ক্লাসে ফিরানোর কোন  উদ্যোগ দেখি না। যদিও আমাদের কোচিং গুলোতে বহু আগে থেকেই ‘ক্র্যাশ প্রোগ্রাম’ জনপ্রিয়। শিক্ষা একটি চলমান প্রক্রিয়া, এই থেকে পালাতে আমাদের সরকার কিছু দিন পর পর স্কুল ছুটি দীর্ঘায়িত করেই আর পরীক্ষাহীন অটো পাশ দিয়েই দায়িত্ব সারছে।    উচ্চ মাধ্যমিক, আলিম কিংবা দ্বাদশ শ্রেণীর সমাপ্তি শুধু একটা শিক্ষা স্তরই নয়, এটা শিক্ষা স্তর থেকে কর্ম স্তরের একটা বড় সংযোগের মাধ্যম। এর মাধ্যমে লক্ষ লক্ষ শিক্ষার্থির শিক্ষা স্কিল লাইফ স্কিলে রূপান্তরিত হবার পথে অগ্রসর হয়।  

ব্যবস্থাপনার ‘মান’ এ নির্বোধ আরেক আওয়ামী লীগ সরকার ৭২-৭৩ এ গণ পাশ দিয়েছিল। তার ফলাফল বাংলাদেশ স্বধীনতা উত্তরকালের এই ৫০ বছর ভোগ করেছে। একদল মেধাহীন চাটুকার এদেশের সব পদ পদবী কেড়ে নিয়ে, মেধাবীদের তাড়িয়ে ঘুষ তদবিরের  জঞ্জালে ভরা অযোগ্য প্রশাসনের নেতৃত্ব দিচ্ছে আজো। করোনা দীর্ঘায়িত হলে নিকট আগামীর ৪-৫টি পাবলিক পরীক্ষাতেও গনপাশের সংস্কৃতি প্রতিষ্ঠিত হবে? অস্থির অতীত পেরিয়ে আজকে তরুণরা যখন নতুন বাংলাদেশের স্বপ্ন দেখেছে, তখন শিক্ষা ধ্বংস করে হাম্বা সরকার বাংলাদেশের সুসশান সম্ভাবনায় আবারো কুঠারাঘাত করছে।  


সরকার ২০১৪ সালে বিনা ভোটে পাশ করেছে, পরেরবার রাতের ব্যালটে বন্দুকের নলে অবৈধ সরকার গড়ে পাশ দেখিয়েছে। নিজের অর্জিত চৌর্য অভিজ্ঞতাকে সে শিক্ষা ব্যবস্থাপনায় নিয়ে এসেছে। করোনাকালে বিনা পরীক্ষায় পাশ করার অপসংস্কৃতি দিয়ে শিক্ষায় ফাঁদ তৈরি করেছে। এর মাধ্যমে শিক্ষার্থীদের উচ্চ মাধ্যমিক সনদকে শতভাগ ফালতু বানিয়ে  দিয়েছে। এই ব্যাচের পরিশ্রমী শিক্ষার্থীরা জীবনের প্রতি পদে অপমানিত, অবহেলতি হবেন, ঠকবেন। করোনার ঝুকিমুক্ত বয়স সীমায় থেকেও, ১৭-১৮ বছর বয়সী ছাত্র ছাত্রীরা এই বঞ্চনা সইবেন সারাটি জীবন। এটা অগ্রহণযোগ্য, শাস্তি যোগ্য, এর জন্য জবাবদিহিতা করতে হবে অবশ্যই। 


বিশ্বের সর্বোচ্চ জনঘনত্বের হয়েও বাংলাদেশে কভিড ফ্যাটালিটি তুলনামূলক কম, তবে অর্থনৈতিক, কর্মসংস্থান ও শিক্ষা ক্ষতি মোটেই কম নয়। কারণ মেধাহীন অযোগ্য দুর্বিত্ত সরকার ইন্টেলেকচুয়াল লকডাউন কি সেটা বুঝেনি, চেষ্টাও করেনি। করেছে সত্য লুকানোর গাজোয়ারি, মিথ্যা সার্টিফিকেট ও সুরক্ষা সামগ্রীর ব্যবসা। এখানে শিক্ষা প্রতিষ্ঠান বন্ধের সাথে সাথে শিক্ষাও প্রায় বন্ধ। বিশ্বে কোথাও শিক্ষা বন্ধ নেই, পরীক্ষা বন্ধ নেই। অবাক করা বিষয় যে, বাংলাদেশের হাট-বাজার, অফিস-আদালত, রাস্তা-ঘাট, ট্রান্সপোর্টেশান ব্যবস্থার কোথাও করোনার স্বাস্থ্যবিধি মানার নূন্যতম লক্ষণ নেই। শুধু দায়িত্ব এড়াতে শিক্ষা প্রতিষ্ঠান বন্ধ, বিশ্ববিদ্যালয় বন্ধ, হল বন্ধ। টিউশানি ভিত্তিক অপ্রাতিষ্ঠানিক অর্থনীতি বন্ধ যা দিয়ে লাখো পরিবারের ব্যয় নির্বাহ করেন শিক্ষার্থীরা।  


১৩ বছর ডিজিটাল সরকারের নামে দেশ চালিয়ে, সাড়ে পাঁচ লক্ষ কোটির বাজেট করা সরকার একটা পাবলিক পরীক্ষা ডিজিটাল পদ্ধতিতে আয়োজন করতে পারেন না, কিসের ডিজিটাল এটা? যেখানে দেশের সব পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয় সহ স্কুল কলেজ সব শিক্ষা প্রতিষ্ঠান বন্ধ, স্বাস্থ্যবিধির দুরুত্ব মেনেও সিটের সংকট নেই, সেখানে সামাজিক দুরুত্ব মেনে সারা দেশে সাড়ে তের থেকে ১৪ লাখ ছেলে মেয়ের পরীক্ষা নেয়া মোটেই কঠিন কিছু ছিল না। শিক্ষা নিয়ে কাজ করা প্রতিষ্ঠান শিশির সংক্ষিপ্ত পরীক্ষার প্রস্তাব দিয়েছে। অন্যদিকে নম্বর না কমিয়ে বিষয় কমিয়ে পরীক্ষা নেয়ারও বিকল্প ছিল। ছিল ছোট ছোট গ্রুপে বিভক্ত করে স্কুল মক টেস্টের কিংবা  অপরাপর আধুনিক ডিজিটাল উপায়ের। 


অন্যদিকে দেশের ১৪ লাখে ছেলে মেয়ের জিপিএ গড় করতে ডিসেম্বর লাগবে কেন? ক্যারিয়ারে এই যে বর্ধিত শিক্ষা গ্যাপ, এটাতো কখনই পূরন হবে না। এমনিতেই বাংলাদেশের ছেলে মেয়েরা সেশন জটে পরে অন্য দেশের তুলনায় অন্তত ২ বছর পরে স্নাতক শেষ করে। চার বছর ও আড়াই বছর আগের জিপিএ’র গড় বের তো কম্পিউটারের কয়েক মিনিটের আর দুই দিনের ব্যবস্থাপনা কাজ! কবে এই ছেলে মেয়ে পরবর্তি ধাপে পরীক্ষা দিবে? সেখানে পরীক্ষা না নিয়ে আবারো এই নকল জিপিই ধরে ভর্তি হবে? পারলে করেন না দেখি বিসিএসও এই এভেরেইজে? হিম্মত আছে, তদবিরকারী দলীয় পান্ডাদের বাদ দিতে পরীক্ষা না নিয়ে জিপিএ এভারেইজ দিয়ে জেএসসি ও এসএসসি জিপিএ গড়ে বিসিএস নিয়োগে রাজি হতে?      


পরীক্ষা ও বিকল্প পরীক্ষা যদি এত কঠিনই হয়, তাইলে এই যে ডিজিটাল সরকারের নামে লক্ষ কোটি খরচ হল তার সুফল কই গেল? স্কুল কলেজের নামে কেনা কম্পিউটার কই, ফাইবার নেটোয়ার্ক কই? কই ইন্টারনেটের ব্যবহার। কই অনলাইন এক্সাম? কই ডিস্ট্যান্ট লার্নিং? কই চতুর্থ শিল্প বিপ্লব? ডিজিটাল বাংলাদেশে পরীক্ষা বিহীন গনপাশ কেন? ডিজিটালের প্রয়োগ শুধুই কেন নাগরিক আড়িপাতায়? 
শেখ হাসিনা সরকারের গুন্ডারা শুধু দেশের মা বোনদের ধর্ষণ করেনি। এরা শেয়ার বাজার ধর্ষণ করেছে, ব্যাংক করেছে, ভোটাধিকারকে ধর্ষণ করেছে। এরা পুলিশ বিচার ব্যবস্থা আর নিরাপত্তা বাহিনিগুলোকে ধর্ষণ করেছে। টানা ১০ বছর প্রশ্ন ফাঁস করে শিক্ষা ব্যবস্থা ধর্ষণ করেছে। এখন  গণপাশের গণধর্ষণ কায়েম করেছে। 


ব্যবস্থাপনার ‘মান’ এ নির্বোধ আরেক আওয়ামী লীগ সরকার ৭২-৭৩ এ গণ পাশ দিয়েছিল। তার ফলাফল বাংলাদেশ স্বধীনতা উত্তরকালের এই ৫০ বছর ভোগ করেছে। একদল মেধাহীন চাটুকার এদেশের সব পদ পদবী কেড়ে নিয়ে, মেধাবীদের তাড়িয়ে ঘুষ তদবিরের  জঞ্জালে ভরা অযোগ্য প্রশাসনের নেতৃত্ব দিচ্ছে আজো। করোনা দীর্ঘায়িত হলে নিকট আগামীর ৪-৫টি পাবলিক পরীক্ষাতেও গনপাশের সংস্কৃতি প্রতিষ্ঠিত হবে? অস্থির অতীত পেরিয়ে আজকে তরুণরা যখন নতুন বাংলাদেশের স্বপ্ন দেখেছে, তখন শিক্ষা ধ্বংস করে হাম্বা সরকার বাংলাদেশের সুসশান সম্ভাবনায় আবারো কুঠারাঘাত করছে।  


ভাবা যায়, একদল ছেলে মেয়ে ফাঁস কৃত প্রশ্নে মুখস্তবিদ্যা নির্ভর  জেএসসি কিংবা এসএসসি’তে জিপিএ মেরেছে, এখন তার গড়েই মাধ্যমিক ও উচ্চ মাধ্যমিকের সর্বোচ্চ স্তরের এসে জিপিএ পাবে? ৪ বছর আগে দেয়া জেএসএসি ও আর আড়াই বছর আগের এসএসসির ফল বিবেচনা করে এইচএসসির রেজাল্ট দিয়ে দেয়া হচ্ছে, তাও শিক্ষা বর্ষে ৬ মাস নষ্টের পরে। শিক্ষা ব্যবস্থাপনার সক্ষমতা কতটা নিচু হলে ৬ মাস হাতে পেয়েও নিউ নরমাল স্বাস্থ্যবিধি মেনে একটা পাবলিক পরীক্ষা নেয়া যায় না যে স্তরে আসার আগে প্রাথমিকে ভর্তির প্রায় অর্ধেক শিক্ষার্থীই ঝরে পড়ে। এই শিক্ষা সমাজে ও ব্যক্তির কর্মে ঠিক কি ভূমিকা রাখবে?

এই যে অপরাধ প্রবণ সমাজ, এই কর্মহীন প্রবৃদ্ধির দেশ, এই যে যোগ্য লোকের অভাব, এই যে মেধা ফাঁদ; এই ফাঁদ কিভাবে মুছবে আগামীর বাংলাদেশ?
 এইচএসসি পরীক্ষা পরবর্তি স্তরের ভর্তি পরীক্ষার বিকল্প নয়!  
১। সেসব বেসরকারি বেসরকারি কলেজ/বিশ্ববিদল্যালয় ভর্তি পরীক্ষা নেয় না তাদের এই ফেইক জিপিএ এর উপর নির্ভর করতে বাধ্য করা হচ্ছে। 
২। যারা গ্রাজুয়েশানে বিদেশে যাবে তাদের সার্টিফিকেট ভ্যালু কমে যাবে।  
৩। বুয়েট মেডিকেলের ডিইউ পরীক্ষার ভিত্তি জিপিএ। নির্দিস্ট মার্ক/জিপিএ পেলেই শুধু ভর্তি পরীক্ষা দেয়া যায়, সেখানে আনলিমিটেড স্টুডেন্ট ভর্তি পরীক্ষা দিতে পারে না। ফলে নতুন মেধাবীদের অনেকেই ক্ষতিগ্রস্ত হবেন। 
৪। ১৪ লাখের মধ্যে সর্বোচ্চ সাত লাখ উচ্চ শিক্ষা স্তরে যায়, এর মধ্যে অল্পই (সোয়া লাখ) ভর্তির প্রসেসে পাশ করে মেধাবী বা কিছুটা মেধাবী প্রতিষ্ঠানে যায়। বাকিরা শিক্ষা ও কর্ম জীবনে ডিস্ক্রিমিনিশানে পড়ার ঝুঁকিতে আছে। ইনাদের ভুয়া সার্টিফিকেটের কলঙ্ক বইতে হবে। 
শুধু ভর্তিতে পাশ করা মেধাবীদের নিয়ে দেশ ভাবতে পারে না, সবাইকে নিয়েই দেশের ভাবতে হয়। বাকীদের যারা উচ্চ শিক্ষায় যায় না অর্থাৎ উচ্চ মাধ্যমিক যাদের শেষ শিক্ষা স্তর-সেই বাকি সাত লাখও ক্ষতি গ্রস্ত হবেন। 
৫। যেসব চাকরিতে এইচএসসি পাশ চায়, সেখানে জিপিএ বিচার কিভাবে   করবে নিয়োগদাতা? পরিক্ষাহীন গড়ের সার্টিফিকেট দিয়ে? সেখানে বহু ব্যাচের প্রার্থী থাকবে। ফলে এই ছেলে মেয়ে গুলার অনেকেই তারা কোদালে ঠেলবে, যোগ্য হওয়া স্বত্বেও। একটা পাবলিক পরীক্ষার সাথে ভর্তি পরীক্ষার তুলনা মানে হচ্ছে সব শিক্ষার্থীর পুরা ফ্লো’টা বিবেচনা না করা। 
৬। আমরা কি তাদের সার্টিফিকেট দিব? যারা জেএসসি আর এসএসসি দিসে কিন্তু কলেজে ভর্তি হয় নাই?


বরং আমি বলি কি, এইচএসসি পরীক্ষাকে মান সম্পন্ন করা গেলে বহু ক্ষেত্রেই ভর্তি পরীক্ষা এড়ানো যাবে। প্রায় পঞ্চাশটির মত মানহীন বিশ্ববিদ্যালয়ের আলাদা আলাদা এই হয়রানি ও খুরুচে ভর্তি পরীক্ষা নিজেই একটা জঞ্জাল, টাকা কামানর আরেক ধান্ধা।

পুনশ্চ: জেলায় জেলায় ভ্রমণ করে ভিন্ন ভিন্ন জায়গায় ভর্তি পরীক্ষার প্রক্রিয়া নিজেই পাবলিক পরীক্ষার চেয়ে বেশি ঝুঁকিপূর্ণ। 


পরিমার্জিত, ৮ অক্টোবর ২০২০।

লেখকঃ টেলি যোগাযোগ বিশেষজ্ঞ, টেকসই উন্নয়ন কর্মী, ব্লগার ও অনলাইন অ্যাকটিভিস্ট

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *