খালেদা জিয়ার কারনে ছাত্রীদের বোরকার ব্যবহার বেড়েছে

খালেদা জিয়ার কারনে ছাত্রীদের বোরকার ব্যবহার বেড়েছে

:: সর্দার আমিরুল ইসলাম ::

প্রাচ্যের অক্সফোর্ড খ্যাত ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ছাত্রীদের বোরকার ব্যবহার বেড়েছে। আনুপাতিক হারে অন্যান্য কলেজ-বিশ্ববিদ্যালয়েও বোরকার ব্যবহার বেড়েছে। এই হার খালি চোখেই ধরা পড়ে। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের পুরনো ছবি এমনকি এই সেদিন মধ্য ’৯০ ছবিগুলোতেও দেখা যায়, পোষাক পরিধানে এই বিশ্ববিদ্যালয়ের মেয়েরা বেশ পাশ্চাত্যমুখী ছিলেন। কিন্তু মধ্য ’৯০ থেকে উল্টো স্রোত বইতে শুরু করে এবং শূন্য দশকের পর অর্থাৎ নতুন শতাব্দীতে পোষাকে ব্যাপক পরিবর্তন আসে। আদৃত হতে থাকে বোরকা/পর্দার ন্যায় পোষাক।

বোরকা বা হিজাবের আধুনিকতা/পশ্চাৎমুখিতা নিয়ে বিতর্ক বা চিন্তার সংঘর্ষ চলমান। অনেকেই পঞ্চাশ, ষাট বা সত্তর দশকের ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ছাত্রীদের পরিধেয় পোশাককে আধুনিক বলে থাকেন। আবার এখনকার বোরকা/হিজাবের আধিক্যকে অনাধুনিক বলে থাকেন। বিতর্ক’কে সেদিকে নিয়ে যেতে চাই না। কেননা আমরা বিশ্বাস করতে চাই, সময়ের দাবিই মূলত প্রগতির পরিমাপক। সময় এবং পারিপাশ্বিকতাই আধুনিকতা ঠিক করে দেয়। ‘জোড়াসাঁকোর’ জমিদার পরিবারের নারীরা প্রথম ব্লাউজ নামক এক অদ্ভুত পোশাকের প্রচলন করেছিলেন, যা পরবর্তীতে শাড়ির সাথে দারুণ ভাবে মানিয়েছিল। কুতর্কের খাতিরে বলা যায়, বাড়তি পোষাক জুড়ে দিয়ে ঠাঁকুর বাড়ির নারীরা তবে কি এদেশের নারীদের অনাধুনিকতার দিকে নিয়ে গেছেন? ওদিকে ফিলিস্তিনের মেয়েরা জিনস এবং হিজাব পরেই ইসরাইলি বাহিনীর সামনে পাথর হাতে দাঁড়াচ্ছেন, পোস্ট-মর্ডানিজমের এই পিক পয়েন্টে দাঁড়িয়ে অ্যামাজনের নারীরা বুক খোলা রেখেই জঙ্গল-দখলদারের বিরুদ্ধে শহর ঘেরাও করে চলেছেন- সুতরাং ভৌগলিক ও সময়ের প্রয়োজনে আধুনিকতা পাল্টে যায়, এটাই নিয়ম।

৯০ দশকে খালেদা জিয়ার সরকার মুক্তবাজার অর্থনীতি গ্রহণ করার আগ পর্যন্ত দেশের অর্থনীতি ছিল খুবই দূর্বল। মধ্যবিত্তদের অবস্থা ছিল টান টান আর নিম্নবিত্তদের অবস্থা তো নিদারুণ। অর্থনৈতিক দুরাবস্থার দরুণ সামাজিক নিগ্রহণের মূল ভুক্তভোগী ছিল দেশের নারী সমাজ বিশেষত কন্যা শিশুরা। পুরুষতান্ত্রিক অর্থ ব্যবস্থা আর দরিদ্রতার কারনে কন্যা শিশুদের স্কুলে না পাঠানো, বালিকা বয়সে বিয়ে দিয়ে দেয়া, গৃহকর্মী হিসাবে অন্যের বাড়িতে কাজ করা ছিল অতি স্বাভাবিক ব্যাপার। খালেদা জিয়া এই সোশ্যাল ডিসকোর্স ভেঙ্গে দেন। প্রাইমারি, মাধ্যমিক, উচ্চ মাধ্যমিক এমনকি ডিগ্রী পর্যন্ত নারীর অবৈতিনিক শিক্ষা গ্রহণের অধিকার নিশ্চিত করেন। পাবলিক পরীক্ষার ফি মওকুফ করেন, বিনামূল্যে বই বিতরণের উদ্যোগ নেন। সবচেয়ে যুগান্তকারী ব্যবস্থা হিসাবে ‘ছাত্রী উপবৃত্তি’ চালু করেন। এতে নারী শিক্ষায় অভুতপূর্ব জোয়ার আসে। স্কুল কলেজে বেতন লাগে না, পরীক্ষার ফিস লাগে না, বই পত্র কিনতে হয় না। উপরন্তু ছাত্রীদের হাতে সরাসরি টাকা দেয়ার ফলে বাড়ির মুরুব্বীগণ কন্যাশিশুদের বাল্যবিবাহ বন্ধ করে দেন, গৃহকর্মী হিসাবে অন্যের বাড়িতে কাজ করতে পাঠানোর পরিবর্তে স্কুলে পাঠানো শুরু করেন। সূচনা ঘটে ‘নারী শিক্ষা বিপ্লব’ এর। মাত্র এক দশকের মধ্যে ফলাফল আসতে শুরু করে। বাল্যবিবাহ, দ্রুত বিবাহ, সস্তা গৃহ শ্রম ইত্যাদি বাধা পেরিয়ে নিম্ন মধ্যবিত্ত ও মধ্যবিত্ত পরিবার থেকে মেধাবীরা সহজেই উচ্চ শিক্ষার কেন্দ্রে উঠে আসতে থাকে।

বিশ্ববিদ্যালয় কলেজে পোষাক নিয়ে কথা হচ্ছিল। সময়ের কেন এই উল্টো স্রোত, কি কারণে পোশাক ও স্টাইলে এরকম একটা রিভার্স টার্ন? এটা বুঝতে ঢাকা বিশ্বদ্যিালয়সহ দেশের অন্যান্য স্কুল-কলেজগুলোর বর্তমান ও পূর্বাপর অবস্থা জানার চেষ্টা করি। যে সব ছাত্রীরা হিজাব বা বোরকা সদৃশ পোশাক অভ্যাসের সাথে স্বাচ্ছন্দ্য বোধ করেন তাদের মেধার বিকাশ যেখানে ঘটেছিল সেখানকার আর্থ সামাজিক অবস্থা জানার চেষ্টা করি।

এবং শেষে এই সিদ্ধান্তে উপনীত হই, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়সহ দেশের অন্যান্য কলেজ-বিশ্ববিদ্যালয় সমূহে বোরকা ব্যবহার বেড়েছে- বেগম খালেদা জিয়ার কারনে।

মূলত ’৯০ পর্যন্ত উচ্চ শিক্ষায় যেসব নারীরা অংশগ্রহণ করতো তাদের উল্লেখযোগ্য অংশ আসতো উচ্চ মধ্যবিত্ত বা উচ্চবিত্ত বনেদি পরিবারগুলো থেকে। শিক্ষায়, অর্থ-বিত্তে, সামাজিক প্রতিপত্তিতে তাঁরা ছিলেন সামাজিক বিচারে উপরের শ্রেণীর। তাই তাদের পোষাক পরিচ্ছেদ হত সেই সমাজের মতন পাশ্চাত্যমুখী। স্বাভাবিক ভাবেই এই উচ্চশ্রেণীর মেয়েদের নর্মস ও তাদের পরিহিত পোশাক সে সময় ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে সংখ্যাগরিষ্ঠের আধুনিকতা হিসেবে প্রতীয়মান হয়।

কিন্তু শিক্ষা ব্যবস্থার এই প্যার্টাণ ভেঙ্গে দেন খালেদা জিয়া। টেকসই বাংলাদেশ বিনির্মাণে নারী শিক্ষা, নারী শক্তির স্ফুরণ ও নারীর ক্ষমতায়ণ অতীব জরুরী -এটা তিনি বুঝেছিলেন। ’৯০ দশকে খালেদা জিয়ার সরকার মুক্তবাজার অর্থনীতি গ্রহণ করার আগ পর্যন্ত দেশের অর্থনীতি ছিল খুবই দূর্বল। মধ্যবিত্তদের অবস্থা ছিল টান টান আর নিম্নবিত্তদের অবস্থা তো নিদারুণ। অর্থনৈতিক দুরাবস্থার দরুণ সামাজিক নিগ্রহণের মূল ভুক্তভোগী ছিল দেশের নারী সমাজ বিশেষত কন্যা শিশুরা। পুরুষতান্ত্রিক অর্থ ব্যবস্থা আর দরিদ্রতার কারনে কন্যা শিশুদের স্কুলে না পাঠানো, বালিকা বয়সে বিয়ে দিয়ে দেয়া, গৃহকর্মী হিসাবে অন্যের বাড়িতে কাজ করা ছিল অতি স্বাভাবিক ব্যাপার। খালেদা জিয়া এই সোশ্যাল ডিসকোর্স ভেঙ্গে দেন। প্রাইমারি, মাধ্যমিক, উচ্চ মাধ্যমিক এমনকি ডিগ্রী পর্যন্ত নারীর অবৈতিনিক শিক্ষা গ্রহণের অধিকার নিশ্চিত করেন। পাবলিক পরীক্ষার ফি মওকুফ করেন, বিনামূল্যে বই বিতরণের উদ্যোগ নেন। সবচেয়ে যুগান্তকারী ব্যবস্থা হিসাবে ‘ছাত্রী উপবৃত্তি’ চালু করেন। এতে নারী শিক্ষায় অভুতপূর্ব জোয়ার আসে। স্কুল কলেজে বেতন লাগে না, পরীক্ষার ফিস লাগে না, বই পত্র কিনতে হয় না। উপরন্তু ছাত্রীদের হাতে সরাসরি টাকা দেয়ার ফলে বাড়ির মুরুব্বীগণ কন্যাশিশুদের বাল্যবিবাহ বন্ধ করে দেন, গৃহকর্মী হিসাবে অন্যের বাড়িতে কাজ করতে পাঠানোর পরিবর্তে স্কুলে পাঠানো শুরু করেন। সূচনা ঘটে ‘নারী শিক্ষা বিপ্লব’ এর। মাত্র এক দশকের মধ্যে ফলাফল আসতে শুরু করে। বাল্যবিবাহ, দ্রুত বিবাহ, সস্তা গৃহ শ্রম ইত্যাদি বাধা পেরিয়ে নিম্ন মধ্যবিত্ত ও মধ্যবিত্ত পরিবার থেকে মেধাবীরা সহজেই উচ্চ শিক্ষার কেন্দ্রে উঠে আসতে থাকে।

অল্প সময়ের মধ্যই এই প্রান্তিক ছাত্রীরা বিশ্ববিদ্যালয়ের সংখ্যাগরিষ্ঠ শিক্ষার্থীতে পরিনত হয়। সাথে নিয়ে আসে তাদের মধ্যবিত্ত নর্মস, ভ্যালুজ, ড্রেস আপ সেন্স। স্বভাবতই সংখ্যাগরিষ্ঠের আচার ও চর্চাই সোশ্যাল বা কালচারাল ভ্যালুজ নির্মান করে। তাই এক দশকের মধ্যে মধ্যবিত্ত প্রাকটিসগুলো চলমান উত্তর আধুনিকতাকে রিপ্লেস করে দেয়। এটাই বৈজ্ঞানিক ‘প্রাকৃতিক নির্বাচন’। ফলে পশ্চিমা পোষাকের পরির্বতে বাড়তে থাকে বোরকার ব্যবহার।

শিক্ষাঙ্গণের চলমান প্যার্টাণ ভাঙ্গার সাথে সাথে খালেদা জিয়া নারী ক্ষমতায়নেও হাত দেন। এইজন্য তাকে দেশের পুরুষতান্ত্রিক আর্থ-সামাজিক ব্যবস্থাকে আঘাত করতে হয়েছে। পুরুষতান্ত্রিক সেটেলড সিস্টেমের বিপরীতে এই বিপ্লব সাধন করা খালেদা জিয়ার জন্য সহজ কাজ ছিল না। নারীর ক্ষমতায়নে খালেদা জিয়া কতটা দুরদর্শী ছিল সেটা বোঝা যায় চাকরিতে নারীর ৬০ শতাংশ কোটা সংরক্ষণের আইন পাশ করার মধ্য দিয়ে। তিনি জানতেন অবৈতনিক শিক্ষার ফল দ্রুতই আসতে শুরু করবে। এই বিপুল সংখ্যক শিক্ষিত নারীদের তিনি এমন কিছু সেক্টরে কাজে লাগাতে চাইলেন যেখানে নারীদের কর্মক্ষমতা ও সফলতা হার পুরুষের চাইতে বেশি হবে। প্রাথমিক ও মাধ্যমিক স্কুল শিক্ষক, স্বাস্থ্য কর্মী, সমাজ কল্যাণ অধিদপ্তর ইত্যাদি সেক্টরে তিনি ৬০ ভাগ নারী কোটা নিশ্চিত করেন। নারী শিক্ষা নীতির ফলে দেশের বিপুল সংখ্যক মধ্যবিত্ত ও নিম্ন মধ্যবিত্ত পরিবারের মেয়েরা শিক্ষিত হয়েছে। একই সাথে অর্থনৈতিক নিরাপত্তার অধীনে চলে আসায় নারীগোষ্ঠী স্বয়ং সম্পূর্ণ হয়ে উঠে। সার্বিকভাবে পুরুষতান্ত্রিক কৃষি নির্ভর অর্থনীতিতে দেশে নগদ অর্থের যে কষ্ট ছিল তাও দূরীভুত হয়।

পরিবর্তনের স্বপ্নালু চোখে দরকার চিন্তার স্থিতি, খালেদা জিয়া এখানেই অনন্যা।

বোরকা বা পর্দাপ্রথা একদা রক্ষণশীলতা হিসাবে বিবেচিত হলেও বিশ্ববিদ্যালয় পর্যায়ে এটা সোশ্যাল নর্মস বা পারিবারিক মূল্যবোধ মাত্র। বিশেষত পশ্চাৎপদী শব্দ ‘পর্দা-প্রথা’ বিশ্ববিদ্যালয় আগত নারীকে অবরোধবাসিনী করে তোলে না। যে বালিকা দশ বছর লড়াই করে স্কুল এবং আরও দুই বছর কলেজ গন্ডিতে লড়াই শেষে শত-সহস্র ছেলেকে পিছনে ফেলে বিশ্ববিদ্যালয়ে এসেছে, বোরকা তাকে অবরোধবাসিনীতে পরিনত করতে পারে নাই। বরং বিশ্বের বুকে নারীর ক্ষমতায়নে নিজেদেরকে উদাহরণ হিসেবে প্রতিষ্ঠিত করেছেন। এই বোরকা/হিজাব তার কাছে পারিবারিক মূল্যবোধ কিংবা সামাজিক নর্মস মাত্র। এই মূল্যবোধ কিংবা সামাজিক নর্মস ভবিষ্যতের জন্য কতটুকু প্রাসঙ্গিক তা নিয়ে বির্তক হতে পারে, তবে সেটা অন্য আলাপ- অন্যদিনের জন্য তোলা থাকুক।

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *