কে বলে আওয়ামী লীগে নেতা নাই?

কে বলে আওয়ামী লীগে নেতা নাই?

“আমি (মুজিব) চার বছর মওলানার সেক্রেটারী ছিলাম। তার কাছ থেকে মিথ্যা কথা বলা ছাড়া শেখার কিছু নাই॥” 

– বদরুদ্দীন উমর / আমারজীবন (তৃতীয়খন্ড)॥ [ জাতীয়সাহিত্যপ্রকাশ – জুন২০০৯।পৃ৫২

লিডার মরার আগে :

“… আবুল মনসুর একদিন তাঁকে (মুজিবকে) ডেকে জিজ্ঞেস করলেন, ‘এটা তুমি কি করছ? নেতার নির্দেশ লঙ্ঘন করছ। তুমিই তাঁর নির্দেশের কথা আমাদের বলেছ’। শেখ মুজিব বললেন, ‘নেতা যদি দেশে না-ই ফিরেন, তা হলে আমরা কি হাত পা গুটায়ে বসে থাকব? যে দেশে সোহরাওয়ার্দী নাই, সে দেশের মানুষ কি রাজনীতি করে না’? আবুল মনসুর স্তম্ভিত॥”

লিডার মরার পরে :

“… কে বলে আওয়ামী লীগে নেতা নাই? অন্য কোন নেতার প্রয়োজনীয়তাই বা কি? শহীদ সোহরাওয়ার্দী কবর থেকেই নেতৃত্ব দেবেন॥”

– আতাউর রহমান খান (প্রাক্তনপ্রধানমন্ত্রী) / স্বৈরাচারেরদশবছর॥ [নওরোজকিতাবিস্তান – ১৯৭০।পৃ২৬৬]

 “বঙ্গবন্ধু” উপাধি প্রদানে কোন আপত্তি কারোই ছিল না বা নাই। কিন্তু ছাত্র সংগ্রাম পরিষদের কাউকে না জানিয়ে যে পদ্ধতিতে তার মতো নেতাকে  এই উপাধি দেয়া হয়, তা না করে উচিৎ ছিল আনিষ্ঠানিকভাবে কেন্দ্রীয় ছাত্র সংগ্রাম  পরিষদের সভায় সিদ্ধান্ত নিয়ে তাকে “বঙ্গবন্ধু” উপাধি প্রদান করা।এটি আমাদের গণতান্ত্রিক রাজনৈতিক সংস্কৃতির সংকটের একটি নমুনা  হিসেবে ইতিহাসে চিহ্নিত থাকবে।যিনি দলীয় নেতা থেকে জাতীয় নেতা এবং মুক্তিযুদ্ধের বিজয়ের মাধ্যমে  বাংলাদেশ রাষ্ট্রের জনক হিসেবে স্বীকৃত তার ক্ষেত্রে ঐ সংকীর্ণতার কোন প্রয়োজন ছিল না॥”

#

“… গণসংবর্ধণা অনুষ্ঠান নিয়ে কেন্দ্রীয় ছাত্র সংগ্রাম পরিষদের ২২ ফেব্রুয়ারী (১৯৬৯) দিবাগত রাতে সমস্ত রাত ইকবাল হলের প্রভোস্ট অফিসে আমাদের তদানীন্তন প্রভোস্ট আবদুল মতিন চৌধুরীর রুমে সভা অনুষ্ঠিত হয়। উক্ত সভায় – কে কে বক্তৃতা দেবেন, মঞ্চে কোন কোন রাজনৈতিক নেতা উপস্থিত থাকবেন – ইত্যাদি অনেক আলোচনা হয়। শেষ পর্যন্ত সিদ্ধান্ত হয় যে, শেখ সাহেব একাই বক্তৃতা করবেন। এবং মঞ্চে মণি সিংহ, মাওলানা ভাসানী, মোজাফফর আহাম্মদ প্র্মুখ নেতৃবৃন্দও থাকবেন। কিন্তু ছাত্রলীগ জননেতা শেখ মুজিব ছাড়া অন্য কোন দলের কোন নেতার মঞ্চে থাকার বিরোধিতা করেন। এমতাবস্থায় মানিক ভাই ছাড় না দেওয়ার জন্য আমাকে বার বার স্মরণ করিয়ে দেন। কিন্তু কমিউনিস্ট পার্টির নেতা মোহাম্মদ ফরহাদের একটি চিরকূট পাওয়ার সাথে সাথে আমার সাথে পরামর্শ না করেই সংগ্রাম পরিষদের সভা মঞ্চে আর কেউ থাকার প্রয়োজন নাই বলে প্রস্তাব দেন। আমি অবাক হয়ে যাই কারণ তিনিই আমাকে ছাড় দিতে না করেন। মানিক ভাই ছিলেন সংগঠনের সভাপতি তাই স্বাভাবিকভাবেই তার মতামতই চূড়ান্ত হবে। কিন্তু তিনিই তো আমাকে শক্ত থাকতে বলেন। যাই হোক, আমি ছাত্র ইউনিয়নের কেন্দ্রীয় সম্পাদক মন্ডলীর সভা আহবান করি এবং সেখানে মানিক ভাইয়ের প্রস্তাব অনুমোদন করে।

২২ ফেব্রুয়ারী কেন্দ্রীয় ছাত্র সংগ্রাম পরিষদের সারারাত ধরে যে মিটিং হয় সেই মিটিং-এ ছাত্রলীগের পক্ষ থেকে কেউ কোন প্রস্তাব দেননি যে, শেখ মুজিবুর রহমানের সংবর্ধনায় তাকে “বঙ্গবন্ধু” উপাধি প্রদান করা হবে। আমি মনে করি একজন নেতা তার জীবনবাজী রেখে বাঙালির স্বাধিকার অর্জনের জন্য যে সংগ্রাম করেছেন, জেল-জুলুম ও সামরিক আদালতের প্রহসনের রায়ের মৃত্যুদন্ডাদেশের পরোয়া না করে জাতীয় নেতায় উন্নীত হওয়ার গৌরব অর্জন করেছেন – তাকে “বঙ্গবন্ধু” উপাধিতে ভূষিত করার বিরোধিতা কেউ করত বলে মনে করি না। এহেন পরিস্থিতিতেও সংবর্ধনা অনুষ্ঠানে হঠাৎ করে তোফায়েল আহমেদ তাকে “বঙ্গবন্ধু” উপাধি প্রদান এবং লক্ষ লক্ষ মানুষের দুই হাত তুলে সমর্থন দান খুবই স্বাভাবিক থাকলেও একটি বিষয় রাজনৈতিক ইতিহাসে জানার স্বার্থেই আমি উল্লেখ করছি মাত্র। সেই বিষয়টি হচ্ছে “বঙ্গবন্ধু” উপাধি প্রদানে কোন আপত্তি কারোই ছিল না বা নাই। কিন্তু ছাত্র সংগ্রাম পরিষদের কাউকে না জানিয়ে যে পদ্ধতিতে তার মতো নেতাকে এই উপাধি দেয়া হয়, তা না করে উচিৎ ছিল আনিষ্ঠানিকভাবে কেন্দ্রীয় ছাত্র সংগ্রাম পরিষদের সভায় সিদ্ধান্ত নিয়ে তাকে “বঙ্গবন্ধু” উপাধি প্রদান করা। এটি আমাদের গণতান্ত্রিক রাজনৈতিক সংস্কৃতির সংকটের একটি নমুনা হিসেবে ইতিহাসে চিহ্নিত থাকবে। যিনি দলীয় নেতা থেকে জাতীয় নেতা এবং মুক্তিযুদ্ধের বিজয়ের মাধ্যমে বাংলাদেশ রাষ্ট্রের জনক হিসেবে স্বীকৃত তার ক্ষেত্রে ঐ সংকীর্ণতার কোন প্রয়োজন ছিল না॥”

– মোসামসুদ্দোহা (‘৬৯এরছাত্রনেতাএবং১১দফারপ্রণেতা) / ইতিহাসেরঅল্পকথা॥ [অঙ্কুরপ্রকাশনী – জুলাই২০০০পৃ৯০৯১

#

” …. ২ রা এপ্রিল (১৯৫৪) জনাব ফজলুল হককে আনুষ্ঠানিক ভাবে যুক্তফ্রন্টের পার্লামেন্টারী পার্টির নেতা নির্বাচিত করা হইল।

ইতিমধ্যে অন্য একটি অভাবিত ব্যাপার ঘটিয়া গেল। শেখ মুজিবুর রহমান নির্বাচনী কেন্দ্রের ফলাফল প্রকাশের একদিন কি দুইদিন পর ঢাকায় আসিয়া পৌঁছিলেন। ঐ দিন রাতেই তিনি সোজা জালালউদ্দিন ও আবদুল হামিদ সমভিব্যাহারে ‘ইত্তেফাক’ অফিসে আসিয়া আমাকে লইয়া প্যারামাউন্ট প্রেসে গেলেন। তিনি আমাকে বলিলেন যে, ‘মোহন মিঞা ও আবদুস সালাম খান নাকি ফরিদপুরে বলিয়াছেন, শেখ মুজিব কেমন করিয়া মন্ত্রী হয় তা তারা দেখিয়া লইবেন’। শেখ মুজিব আরও বলিলেন যে, মন্ত্রী হইতে তিনি ইচ্ছুক নহেন, তবে তাদের এই কথার পর ব্যাপারটা তার মর্যাদার প্রশ্নে দাঁড়াইয়াছে। শহীদ সাহেবকে এ ব্যাপারটা জানাইবার জন্য তিনি আমাকে অনুরোধ করিলেন। আমি বিব্রতবোধ করিলাম। শেষে শহীদ সাহেবকে কথাটা বলিলে তিনি অবাক হইলেন। তার ইচ্ছা ছিল, ফজলুল হক সাহেবের অধীনে কাজ শিখাইবার জন্যে তিনি শেখ মুজিবকে ফজলুল হক সাহেবের পলিটিক্যাল সেক্রেটারী করিবেন।

… শেখ মুজিবুর রহমান নির্যাতন ভোগ করিয়াছেন। তিনি সক্রিয় রাজনীতিতে আছেন। তার রাজনৈতিক অভিজ্ঞতা আমার অপেক্ষা অধিক। কিন্তু আমি আমার সাধারণ জ্ঞান-বুদ্ধি দিয়া বুঝিতে পারি নাই যে, যে যুক্তফ্রন্ট তিন নেতার (শেরে বাংলা এ কে ফজলুল হক, হোসেন শহীদ সোহরাওয়ার্দী এবং মাওলানা ভাসানী) সমন্বয়ে গঠিত হইয়াছিল, সেই যুক্তফ্রন্টকে ভাঙ্গিবার দায়িত্ব কেমন করিয়া তার উপর বর্তাইল। আমাদের বক্তব্য ছিল, জনাব ফজলুল হকের আচরণ অবাঞ্ছিত ও যুক্তফ্রন্টের স্বার্থের পরিপন্থী হইলে, শহীদ সাহেব আর মাওলানা ভাসানীর উপস্থিতিতেই ব্যবস্থা গ্রহণ করা উচিত ছিল। ইতিমধ্যে হক সাহেব যদি প্রকাশ্যে গোলাম মুহাম্মদের সহিত হাত মিলাইতেন তাহা হইলে আওয়ামী লীগ তাকে বর্জন করিলে আওয়ামী লীগের ভূমিকা সম্পর্কে দেশবাসীর মনে কোন বিতর্কের সৃষ্টি হইত না॥”

– তফাজ্জল হোসেন (মানিক মিয়া) / পাকিস্তানী রাজনীতির বিশ বছর॥ [বাংলাদেশবুকসইন্টারন্যাশনাললি:- মে১৯৮১পৃ৫৬৫৭]

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

Shares