কিছু সংখ্যালঘু নেতা চেয়েছিলেন বাংলাদেশকে ভারতীয় অংশ করতে

কিছু সংখ্যালঘু নেতা চেয়েছিলেন বাংলাদেশকে ভারতীয় অংশ করতে

….জওহরলাল নেহেরু মনে প্রাণে আসমুদ্র হিমাচল প্রসারিত একটি বৃহত্তর ভারতের স্বপ্ন দেখতেন এবং এই স্বপ্নকে তিনি ভারতের শাসক নেতৃশ্রেণীর মনে ভালো করে চারিয়ে দিতে পেরেছিলেন। জার্মানদের ফাদারল্যান্ড এবং ইহুদীদের হোলিল্যান্ডের মতো বৃহত্তর ভারতের স্বপ্নও ভারতীয় নেতৃশ্রেণীর মর্মের গভীরে গেঁথে গিয়েছিল। তারা মনে করতেন বৃহত্তর ভারতের স্বপ্ন মিথ্যা হওয়ার নয়, প্রশ্নটা শুধু সময়ের।

… ১৯৫২ সালের ভাষা আন্দোলন এবং ১৯৫৪ সালের নির্বাচনে যুক্তফ্রন্টের বিজয়কে ফলাও করে প্রচার করেছিল ভারতীয় প্রচারমাধ্যম এবং পত্রিকাসমূহ। এই প্রচারণা মধ্যে একটি অবহেলিত অঞ্চলের জনগণ যে সংগ্রাম করে আপন ভাষায় কথা বলার অধিকার অর্জন এবং আরও নানা দাবীদাওয়া আদায় করে নিচ্ছেন, তার চাইতে অধিক কিছু ছিল। পাকিস্তানের ভাঙনের বীজটি অঙ্কুরিত হতে দেখে তারা উৎসাহিত হয়েছিলেন। সেই মনোভঙ্গীটুকুও প্র্চারণার সঙ্গে যুক্ত হযেছিল। উলঙ্গ হুঙ্কার এবং হম্বিতম্বির চাইতে ধীরেধীরে সময় বুঝে কাজ করাই ভারতীয় পররাষ্ট্রনীতির বৈশিষ্ট্য।

১৯৬৫ সালের ভারত পাকিস্তান যুদ্ধে ভারতীয় সেনাবাহিনী তাদের আক্রমণ মূলত: পশ্চিম রণাঙ্গনেই সীমিত রেখেছিল। আক্রমণকারী হিসেবে উপস্থিত হলে পূর্ব পাকিস্তানের জনগণের মনোভাব বিগড়ে যাবে এ আশঙ্কা করেই ভারতীয় সেনাবাহিনী বলতে গেলে একেবারে অরক্ষিত পূর্ব পাকিস্তানে স্থলপথে, জলপথে কিংবা বিমানপথে কোনো আক্রমণ করেনি। কোনরকমের সামরিক হামলা না করে পূর্ব পাকিস্তানের জনমতকে জয় করার ইচ্ছাই ছিল তার মূলে, এ কথা স্ব্য়ং ভারতীয় জেনারেল কাউলও তার আত্মকথায় স্বীকার করেছেন।

মুক্তিযুদ্ধ চলাকালীন অস্থায়ী বাংলাদেশ সরকারের সঙ্গে ভারতের কেন্দ্রীয় সরকারের যোগাযোগ রক্ষা করার দায়িত্ব আমার ওপর অর্পিত ছিল। সেই সূত্রে প্রধানমন্ত্রীর ব্যক্তিগত স্টাফদের সঙ্গে আমার হার্দির্ক সম্পর্ক গড়ে ওঠে। প্রধানমন্ত্রীর এক ব্যক্তিগত স্টাফ আমাকে ২৯ ডিসেম্বর ১৯৭১-এ জানান যে, আগের দিন অর্থাৎ ২৮ ডিসেম্বর তিনজন (!) সংখ্যালঘু নেতা, যাদের মধ্যে চিত্তরঞ্জন সূতার ছিলেন একজন, প্রধানমন্ত্রীর সঙ্গে দেখা করেন। তারা তাঁর কাছে বাংলাদেশকে ভারতের অংশ করে রাখার প্রস্তাব রাখেন। প্রধানমন্ত্রী তাদের প্রস্তাবের জবাবে বলেন, “ইয়ে না মুমকীন হ্যায়।” প্রধানমন্ত্রীর ওই ব্যক্তিগত স্টাফ সেই সময় সেখানে ছিলেন। তিনিই ওই সাক্ষাৎকারের ব্যবস্থা করে দেন। পরে আমি বাংলাদেশ সরকারকে বিষয়টি অবহিত করি। কিন্তু তাদের বিরুদ্ধে কোন ব্যবস্থা নেয়া হয় না। আসলে, তারা, কিছু সংখ্যালঘু নেতা চেয়েছিলেন বাংলাদেশকে সিকিম ধরণের ভারতীয় অংশ করতে॥”

১৯৬৫ সালের ভারত পাকিস্তান যুদ্ধের পরে আওয়ামী লীগ শেখ মুজিবুর রহমানের নেতৃত্বে পুনরায় সংগঠিত হয় এবং ছয়দফা আন্দোলন জনগণের মধ্যে ব্যাপকভাবে যে ছড়িয়ে পড়ে তা নিশ্চয় ভারতীয় শাসকবর্গের দৃষ্টি আকর্ষণ করে থাকবে। ছয়দফার অন্তর্ভুক্ত দফাসমূহের একটি ছিল পূর্ব পাকিস্তানের লোক দিয়ে একটা প্যারামিলিটারী বাহিনী গঠন করতে হবে এবং অন্য একটি দফায় ছিল পূর্ব পাকিস্তানের সুযোগ-সুবিধা মতো যে কোনো দেশের সঙ্গে বাণিজ্যচুক্তি সম্পাদন করার অধিকার। ভারত এই ছয়দফার মধ্যে অভীষ্ট সিদ্ধির পথ স্পষ্ট দেখতে পেয়েছিল। পাকিস্তানের দু’অংশ যদি শ্লথভাবে পরস্পরের সঙ্গে সংযুক্ত থাকে, ভারতের প্রতিদ্বন্ধী হিসেবে পাকিস্তানের রাজনৈতিক গুরুত্ব অনেকাংশে কমে আসবে। পাকিস্তান যখন তখন আর যুদ্ধেব্র হুঙ্কার দিতে পারবে না। আন্তর্জাতিক শক্তিবর্গ সংহত পাকিস্তানকে যেভাবে অস্ত্র সাহায্য করে, অর্থের যোগান দিয়ে ভারতের সমপর্যায়ের একটি শক্তি হিসেবে টিকিয়ে রাখত, শিথিল পাকিস্তান বৃহৎ শক্তিবর্গের দৃষ্টিতে সেরকম গুরুত্ব বহন করবে না। পাকিস্তান দূর্বল হয়ে পড়লে তার যুদ্ধংদেহী মনোভাব আপনা থেকেই প্রশমিত হয়ে আসবে। তখন বৃহৎ শক্তিবর্গ দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়ার রাজনৈতিক ভারসাম্য রক্ষা করার জন্যে ভারত-ঘেঁষা নীতি প্রণয়ন করতে বাধ্য হবে।

ছয়দফার একটা দফায় পূর্ব পাকিস্তানের আলাদা বাণিজ্য চুক্তি সম্পাদনের অধিকারের কথা উচ্চারিত হয়েছিল। তাতেও ভারত নিজের স্বার্থটি খুব বড় করে দেখতে পেয়েছিল। পশ্চিম বঙ্গে হুগলির পাটকলগুলো কাঁচামালের অভাবে প্রায় বন্ধ হয়ে পড়েছিল। পূর্ব পাকিস্তান বিদেশে অঢেল পাট রপ্তানী করে এবং তাকে বিদেশ থেকে প্রচুর কয়লা আমদানী করতে হয়। ভারতের কয়লার বিনিময়ে পূর্ব পাকিস্তান থেকে পাট আমদানী করতে পারলে চটকল শিল্পের মতো ভারতের একটি বুনিয়াদি শিল্পের সংকটের সহজ সমাধান হয়ে যায়। ইত্যকার বিষয় বিবেচনা করে শুরু থেকেই ভারতের শাসক কংগ্রেস আওয়ামী লীগ এবং শেখ মুজিবুর রহমানের প্র্তি একটি অনুকুল মনোভাব তৈরি করে রেখেছিল। ছয়দফা আন্দোলন যখন ধাপেধাপে বেগ ও আবেগ সঞ্চয় করে সর্বস্তরের জনগণের মধ্যে ছড়িয়ে পড়ল তার প্রতিটি ধাপে, প্রতিটি উৎক্রান্তিতে আওয়ামী লীগ যে কৌশল এবং প্রচারপদ্ধতি গ্রহণ করেছিল, ভারতের শাসক কংগ্রেস পত্রপত্রিকা এবং প্রচার মাধ্যমগুলোতে যে ঢালাও প্রচার করেছিল, তা ভারতীয় জনগণের মধ্যে শেখ মুজিবুর রহমান এবং তার আন্দোলনের প্রতি একটি স্বত:স্ফূর্ত অনুরাগ জন্মলাভ করতে সহায়ক হয়।

শেখ মুজিবুর রহমান এবং তার দল আওয়ামী লীগ কখনো সুভাষচন্দ্র বসুর মতো তেজোদ্দীপ্ত অনাপোষী ভঙ্গীতে বক্তব্য হাযির করেছেন, কখনো চিত্তরঞ্জন দাশের মতো উদার বাঙালীয়ানার পরিচয় দিয়েছেন। আবার কখনো বা পন্ডিত জওহরলাল নেহেরুর মতো সমাজতন্ত্র ঘেঁষা উদারনৈতিক ধ্যান-ধারণার প্রবক্তা হিসেবে আবির্ভুত হয়েছেন শেখ মুজিবুর রহমান। ছয়দফা আন্দোলনের শেষ পর্বে অহিংস অসহযোগ কর্মসূচী ঘোষণার পরবর্তী পর্যায়ে শেখ মুজিবুর রহমান ভারতীয় জনগণের দৃষ্টিতে মহাত্মা গান্ধীর মানসপুত্র হিসেবে দেখা দিলেন।

অহিংসা ছিল মহাত্মা গান্ধীর জীবনাদর্শ। সর্বকাজে সর্বচিন্তায় নিজেকে হিংসামুক্ত রাখাই হলো গান্ধী-দর্শনের মূলকথা। চৌরিচৌরার সংঘর্ষে মাত্র ক’জন পুলিশ অগ্নিদগ্ধ হয়েছে জেনে মহাত্মা গান্ধী সমগ্র ভারতের জাতীয় আন্দোলন থামিয়ে দিয়েছিলেন। তার জন্যে তাকে কম জবাবদিহি করতে হয়নি। তথাপি তিনি তার সিদ্ধান্ত থেকে একচুল নড়েননি। অন্যদিকে শেখ মুজিবুর রহমানকে মহাত্মা গান্ধীর মতো অহিংসামন্ত্রে বিশ্বাসী বলার কোনো উপায় নেই। তার রাজনৈতিক জীবনের সূচনা থেকে পরিণতি পর্যন্ত সন্ধান করলে এমন প্রমাণ খুঁজে পাওয়া যাবে না যে, তিনি অহিংসার রাজনীতিতে বিশ্বাস স্থাপন করেছিলেন। সুতরাং তিনি অহিংস আন্দোলনকে শুধুমাত্র একটা রাজনৈতিক ট্যাকটিকস হিসেবেই গ্রহণ করেছিলেন।

আর বাংলাদেশ আন্দোলন সত্যিকার অহিংস ছিল না। বিস্তর হিংসাত্মক কার্যকলাপ সংগঠিত হয়েছে। জ্বালানো, পোড়ানো, লুঠতরাজ এবং খুন-জখমের অনুষ্ঠানও হয়েছে বিস্তর। আওয়ামী লীগ হাই-কম্যান্ড এসবের বিরুদ্ধে মৌখিক বক্তব্য রাখলেও থামানোর জন্যে কার্যকর কোনো ব্যবস্থা গ্রহণ করেনি। তার ফলশ্রুতিতে বিহারী এলাকাগুলোতে নানারকম নৃশংস কার্যকলাপের অনুষ্ঠান ঘটে।

এই নৃশংসতা দমনের অছিলা করে পাকিস্তান সেনাবাহিনী পঁচিশে মার্চের রাতের অন্ধকারে ঢাকা শহরের ঘুমন্ত নগরবাসীর ওপর ঝাঁপিয়ে পড়ে। ভারতীয় জনগণের পক্ষে বাংলাদেশী অহিংসা চোখে দেখার উপায় ছিল না। তারা কাগজে দেখেছেন, বেতারে শুনেছেন এবং বিশ্বাস করেছেন। শেখ মুজিবের মধ্যে ভারতীয় জনগণ একই সঙ্গে সুভাষচন্দ্র বসু, চিত্তরঞ্জন দাশ, জওহরলাল নেহেরু এবং মহাত্মা গান্ধীর সাক্ষাৎ লাভ করেছিলেন। তাদের প্রতি ভারতীয় জনগণের যে একটি সুপ্ত শ্রদ্ধাবোধ মনের ভিতরে লুকায়িত ছিল, শাসক কংগ্রেসের প্রচারণায় শেখ মুজিবকে আশ্রয় করেই তা পল্লবিত হয়ে ওঠার সুযোগ পায়। ভারতবর্ষের আপামর জনসাধারণের সামনে একেবারে নব্য-দেবতার বেশে দেখা দিলেন শেখ মুজিবুর রহমান॥”

– আহমদ ছফা / বাংলাদেশের রাজনৈতিক জটিলতা॥ নির্বাচিত প্রবন্ধ॥ [ মাওলা ব্রাদার্স – ফেব্রুয়ারি২০০২। পৃ১৭৮১৮২ ]

#০২ 

“… যদি বাংলাদেশকে একটি ইসলামী প্রজাতন্ত্র হিসাবে ঘোষণা করা হয় তাহলে ভারতের আশ্চর্য হওয়ার কিছু নেই। যেদিন আমার সৈনিকরা বাংলাদেশকে মুক্ত করে সেদিনই আমি এ কথা উপলব্ধি করি। বাংলাদেশীদের কখনোই ভারতের প্রতি তেমন ভালবাসা ছিল না। আমি জানতাম ভারতের প্রতি তাদের ভালবাসা অস্থায়ী। অনুপ্রেরণা লাভের জন্য ভারতের দিকে না তাকিয়ে তারা মক্কা ও পাকিস্তানের দিকে দৃষ্টিপাত করবে। আমাদেরকে সত্যাশ্রয়ী হতে হবে। বাংলাদেশীদের প্রতি আমরা সঠিক আচরণ করিনি। স্বাধীনতার পর বাংলাদেশকে নিজের পায়ে দাঁড়ানোর জন্য আমাদের সব রকমের সাহায্য করা উচিৎ ছিল, কিন্তু আমাদের রাজনীতিবিদরা তা করেননি। তারা বেনিয়ার মতো আচরণ করেছেন॥”

– ফিল্ড মার্শাল মানেকশ’ (ভারতের সাবেক সেনাবাহিনী প্রধান) / ২৯এপ্রিল১৯৮৮

#০৩ 

প্রশ্ন: তিনজন সংখ্যালঘু নেতা ভারতের প্রধানমন্ত্রী মিসেস ইন্দিরা গান্ধীর সঙ্গে দেখা করেন এবং তার কাছে ‘বাংলাদেশকে ভারতের একটি অংশ করে রাখার’ প্রস্তাব দেন। আপনি এ সম্পর্কে কতটুকু জানেন?

হুমায়ুন রশীদ চৌধুরী : মুক্তিযুদ্ধ চলাকালীন অস্থায়ী বাংলাদেশ সরকারের সঙ্গে ভারতের কেন্দ্রীয় সরকারের যোগাযোগ রক্ষা করার দায়িত্ব আমার ওপর অর্পিত ছিল। সেই সূত্রে প্রধানমন্ত্রীর ব্যক্তিগত স্টাফদের সঙ্গে আমার হার্দির্ক সম্পর্ক গড়ে ওঠে। প্রধানমন্ত্রীর এক ব্যক্তিগত স্টাফ আমাকে ২৯ ডিসেম্বর ১৯৭১-এ জানান যে, আগের দিন অর্থাৎ ২৮ ডিসেম্বর তিনজন (!) সংখ্যালঘু নেতা, যাদের মধ্যে চিত্তরঞ্জন সূতার ছিলেন একজন, প্রধানমন্ত্রীর সঙ্গে দেখা করেন। তারা তাঁর কাছে বাংলাদেশকে ভারতের অংশ করে রাখার প্রস্তাব রাখেন। প্রধানমন্ত্রী তাদের প্রস্তাবের জবাবে বলেন, “ইয়ে না মুমকীন হ্যায়।” প্রধানমন্ত্রীর ওই ব্যক্তিগত স্টাফ সেই সময় সেখানে ছিলেন। তিনিই ওই সাক্ষাৎকারের ব্যবস্থা করে দেন।

পরে আমি বাংলাদেশ সরকারকে বিষয়টি অবহিত করি। কিন্তু তাদের বিরুদ্ধে কোন ব্যবস্থা নেয়া হয় না। আসলে, তারা, কিছু সংখ্যালঘু নেতা চেয়েছিলেন বাংলাদেশকে সিকিম ধরণের ভারতীয় অংশ করতে॥”

– বাংলাদেশের স্বাধীনতাযুদ্ধে র এবং সিআইএ / মাসুদুল হক॥ [মীরাপ্রকাশন – ফেব্রুয়ারী২০০১। পৃ১৪০১৪৩]

#০৪

“… পাকিস্তানের পক্ষেও বলিবার কথা আছে। সেটা বাংলাদেশের স্বাধীনতার “বাস্তবতা” সম্বন্ধে ভারত ও বাংলাদেশের কোনও কোনও নেতার অবাস্তব অপব্যাখ্যা। পাঠকদের স্মরণ আছে, বাংলাদেশ স্বাধীন হওয়ার পর-পরই ভারত ও বাংলাদেশের শাসক গোষ্ঠীর এক মহলে ও সংবাদ-পত্রে উলুধ্বনি উঠিয়াছিল, ‘ধর্ম-ভিত্তিক ভারত-বাঁটোয়ারা বাতিল হইয়া গিয়াছে’। ‘পাকিস্তান-দাবি ভ্রান্ত প্রমাণিত হইয়াছে’। আমরা কেউ কেউ ‘ইত্তেফাকে’ প্রবন্ধ লিখিয়া এবং পুস্তক প্রকাশ করিয়া হুশিয়ার করিয়া দিয়াছিলাম। এমন কথার রাজনৈতিক আত্মঘাতী তাৎপর্য, ভারত-বাংলাদেশের সম্পর্কে সন্দেহ-অবিশ্বাস সৃষ্টির ও উপমহাদেশের সার্বিক স্থায়ী শান্তি স্থাপনে নিজের আশংকা সম্পর্কে সতর্কবাণী উচ্চারণ করিয়াছিলাম। আমাদের এই হুশিয়ারিকে কেউ কেউ প্রগতিবিরোধী আখ্যা দিয়াছিলেন। বাংলাদেশের স্বাধীনতাকে আমরা যারা ‘লাহোর প্রস্তাবভিত্তিক ভারত-বাঁটোয়ারার বাস্তব রুপায়ণ’ বলিয়াছিলাম কেউ কেউ তাদেরও তিরস্কার করিয়াছিলেন। কিন্তু আমি ঐ সব রাজনৈতিক নাবালকদের কথায় বিচলিত হই নাই।

আমি প্রথম বিচলিত হই ভারতের কংগ্রেস নেতৃত্ব ও বাংলাদেশের আওয়ামী নেতৃত্বের একাংশের বাস্তবতা-বোধের অভাব দেখিয়া। শিমলা চুক্তির পরে বাস্তববাদী রাজনৈতিক বিচক্ষণতার অসম একটা ঐতিহাসিক দলিল অনুমোদন করিতে গিয়া নিখিল ভারতীয় কংগ্রেস পার্লামেন্টারী পার্টি নিতান্ত অবান্তর্, অপ্রাসঙ্গিকভাবে অনুমোদন প্রস্তাবে বলিলেন, ‘১৯৪৭ সালে ধর্মের ভিত্তিতে ভারত-বাঁটোয়ারাই অবৈধ হইয়াছিল’। আর এদিকে বাংলাদেশ সরকার রাস্তা-ঘাট, বিশ্ববিদ্যালয়ের হল ইত্যাদি হইতে ঐ বাঁটোয়ারার জন্য দায়ী জিন্না সাহেবের নাম মুছিয়া ফেলিলেন। এমনকি ‘জিন্নাটুপির’ বিরুদ্ধে সংবাদপত্রে অভিযান চলিল। প্রমাণিত হইল, বাংলাদেশ সরকার ভারত বাঁটোয়ারার বিরোধী। সেই জন্যই জিন্নার নাম ও স্মৃতি তারা বাংলাদেশ হইতে নিশ্চিহ্ন করিয়া ফেলিতে চান। ‘৪৭ সালের বাঁটোয়ারা বাতিল হইলে বাংলাদেশ ও ভারতের সম্পর্ক কি হইবে, অখন্ড, মানে ‘পুনর্যুক্ত’, ভারতের রাষ্ট্রীয় রুপইবা কি হইবে, হিন্দু-মুসলমান সম্পর্ক কি দাঁড়াইবে ইত্যাদি মীমাংসিত প্রশ্নের পুনরূক্তির মত সুদূরপ্রসারী প্রশ্নের কথা বাদ দিয়াও শুধু পাকিস্তান সরকারের কথাটাই ধরা যাক। পাকিস্তানীদের মনে এইসব উক্তি ও কাজের কি প্রতিক্রিয়া হইয়াছিল তারই বিচার আজ করা যাক।

বাংলাদেশ-ভারত হইতে যেখানে সমস্বরে ধ্বনি উঠিয়াছে : ‘বাংলাদেশের স্বাধীনতা মানেই ‘৪৭ সালের ভারত-বাঁটোয়ারা বাতিল’, ‘পাকিস্তান দাবি ভ্রান্ত’ সেখানে বাংলাদেশের স্বাধীনতা মানিয়া লওয়া মানেই পাকিস্তানের অবলুপ্তি মানিয়া লওয়া। পাকিস্তান সরকার সেটা মানিয়া লইতে পারেন, কোনও কান্ডজ্ঞানী লোক তা – ভাবিতে পারেন? কথাটা শুধু ভুল নয়, শিমলা চুক্তির ভাষা ও ভাবেরও বিরোধী। অতএব, বাংলাদেশ ও ভারতে দাঁড়াইয়া যারা হুংকার দিয়াছিলেন, বাংলাদেশের স্বাধীনতা মানেই ভারত-বাঁটোয়ারার অবসান, তারা বাংলাদেশকে স্বীকার না করিবার জন্যই পাকিস্তানকে উস্কানি দিয়াছিলেন, এমন মনে করা কি অসংগত হইবে?

এর ফলে যা হইবার তাই হইয়াছে। পাকিস্তান সরকার তাদের সুর বদলাইয়াছেন। বাংলাদেশে ‘মুসলিম বাংলা’ স্লোগানে উৎসাহ দিয়াছেন। যে আসগর খাঁ বাংলাদেশকে স্বীকৃতি না দেওয়ায় ভুট্টো সরকারের তীব্র নিন্দা করিতেছিলেন, তিনিও এখন স্বীকৃতির বিরোধী হইয়াছেন। যে দওলাতানা স্বীকৃতির দাবী করিতেছিলেন, পাকিস্তান কাউন্সিল মুসলিম লীগ তাকে সভাপতিত্ব হইতে বরতরক করিয়াছেন। স্বীকৃতির বিলম্বে আমরাও যুদ্ধাপরাধীর বিচারের কথা বলিয়াছি। পাকিস্তান স্বীকৃতিতে যত বেশী টালবাহানা করিতেছে, আমরা ‘যুদ্ধাপরাধী বিচারে’ তত জোর দিতেছি। পাকিস্তানও ‘বাঙালী বিচারে’ তত পাল্টা হুমকি দিতেছে। ‘বিচার’ ও ‘পাল্টা ব্ল্যাকমেইলেরও’ উদ্ভব হইয়াছে এই ভাবেই।

আমাদের স্মরণ রাখিতে হইবে যে, পাক-বাহিনীর আত্মসমর্পণের আগে আমাদের পক্ষের এমন কোনও ঘোষণা ছিল না। আত্মসমর্পণের দলিলেও বিচারের কোনও শর্ত নাই। বরঞ্চ জেনারেল সাম মানিক শাহ পাক বাহিনীকে আত্মসমর্পণের যে আহবান করিযাছেন তাতে জেনেভা কনভেনশনের সকল সুবিধা দেওয়ার প্রতিশ্রুতিও ছিল।

তবু এটা আইনের কথা। আইনের কথার চেয়ে স্থায়ী শান্তির প্রশ্নটাই আমাদের বড় কথা। স্থায়ী শান্তির জন্য আমাদের অতীত ‘ফরগিভ’ ও ‘ফরগেট’ করিতে হইবে। তার উপর আছে আমাদের পাঁচ লাখ আটক বাংগালী উদ্ধারের কথা। এদের বিচারের হুমকিকে ব্ল্যাকমেইল ধরিয়া নিলেও সেটা মানিতেই হইবে। তাতে আমাদের প্রেস্টিজ বা ন্যায়নীতির অমর্যাদা হইবে না। বিমান হাইজ্যাকাররা রোজ এমন ব্ল্যাকমেইল করিয়া কত দন্ডিত কয়েদী উদ্ধার করিতেছে। সে সব ব্ল্যাকমেইল মানিয়া লওয়ায় কোনও সরকারের অমর্যাদা হইতেছে, কেউ মনে করেন না। আটক বাংগালী ত পাঁচ লাখ। আমাদের জনপ্রিয় নেতা ও রাষ্ট্রপতি বংগবন্ধু মুক্তি না দিয়া প্রেসিডেন্ট ভুট্টো যদি তার প্রাণ লইয়া আমাদের ব্ল্যাকমেইল করিতেন তবে আমরা ৯৫ ত দূরের কথা গোটা ৯৩ হাজার পাক সৈন্যকেই তাদের অস্ত্রসহ ফেরত দিয়া বংগবন্ধুর জীবন রক্ষা করিতাম। তেমন ব্ল্যাকমেইল না করায় ভুট্টো সাহেব আমাদের ধন্যবাদ ও কৃতজ্ঞতার পাত্র। বংগবন্ধু নিজে ভুট্টো সাহেবকে ধন্যবাদ দিয়াছেন। আমরাও দিতেছি। কারণ ব্ল্যাকমেইল আজ আর শুধু হাইজ্যাকারের হাতিয়ার নয়, ভদ্রলোক ও সভ্য জাতিরও হাতিয়ার। সমর-সজ্জাই একটা ব্ল্যাকমেইল। এটম বোমা আরও বড় ব্ল্যাকমেইল।

আসল কথা, ন্যায়বিচারও নয়, ব্ল্যাকমেইলও নয়। এ সবই উঠিয়াছে নেতারা আমাদের উপমহাদেশটার বাস্তবতা উপলব্ধি করিতে পারেন নাই বলিয়া। শান্তি সবাই চাহিতেছেন। কিন্তু আমাদের এ কাজটা যে শুধু যুদ্ধ উদ্ভুত সাময়িক সমস্যা নয়, এটা যে আমাদের ভবিষ্যত বংশধরদের জন্যও স্থায়ী শান্তি স্থাপনের প্রশ্ন, সে কথা আমরা বুঝিতেছি না। এ স্থায়ী শান্তি স্থাপন করিতে গেলে যে শুধু অমীমাংসিত প্রশ্নগুলিরই মীমাংসা করিতে হইবে, মীমাংসিত প্রশ্নগুলির পুনরুন্মুক্তি ঘটানো চলিবে না, এ কথাটা আজ আমাদের ভাল করিয়া বুঝিতে হইবে এবং অন্তরের সংগে মানিতে হইবে। শুধু তিন রাষ্ট্রের আপোষ-মীমাংসার কথা মুখে বলিলেই চলিবে না। তিনটি রাষ্ট্রের স্বতন্ত্র রাষ্ট্রীয় সত্ত্বা, জাতীয় স্বকীয়তার বৈধতা ও সে সবের স্থায়িত্ব ও স্থিতিশীলতার যৌক্তিকতা বুঝিতে হইবে। সে সম্বন্ধে পরস্পরের শ্রদ্ধার নিশ্চয়তাও থাকিতে হইবে। এরই নাম সার্বভৌম সমতা॥”

 আবুল মনসুর আহমদ / বেশী দামে কেনা কম দামে বেচা আমাদের স্বাধীনতা॥ [আহমদ পাবলিশিংহাউস। পৃ : ২১০২১৪ / আগস্ট, ‘৭৩]

“… ৪০ সাল থেকে ৪৭ সাল পর্যন্ত যে অসংখ্য তরুণ পাকিস্তান আন্দোলনে ঝাপিয়ে পড়েছিল, আমি তাদের অন্যতম। কৃতিত্বের জন্য একথা বলছি না, নিজের পরিচয় দেবার জন্য কথাটি উল্লেখ করছি। ৪১-৪২ সালে আমি যখন ঢাকা ইউনিভার্সিটির ইংলিশ ডিপার্টমেন্টের ছাত্র, তখন আমাকে সভাপতি করে পূর্ব পাকিস্তান সাহিত্য সংসদ গঠিত হয়। সৈয়দ আলী আহসান ছিল এ সংসদের সেক্রেটারী। আমাদের লক্ষ্য ছিল, বাংলা ভাষায় মুসলিম কালচারের পরিচয় থাকে এমন সাহিত্য সৃষ্টিতে লেখকদের উদ্বুদ্ধ করা। ১৯৪৪ সালে কলকাতা ইষ্ট পাকিস্তান রেনেসাঁস সোসাইটি (এর সভাপতি ছিলেন দৈনিক আজাদ পত্রিকার সম্পাদক আবুল কালাম শামসুদ্দীন) যে সাহিত্য সম্মেলনের আয়োজন করে তাতে ২৪ বৎসর বয়সে সাহিত্য শাখার সভাপতির দুর্লভ সম্মান লাভ করেছিলাম। এরপর সে বছর জুলাই মাসে কলকাতা ইসলামিয়া কলেজে ইংলিশ ডিপার্টমেন্টে লেকচারার হিসাবে যোগ দেই।

আবুল কালাম শামসুদ্দীনের অনূরোধে, দৈনিক আজাদে সম্পাদকীয় প্রবন্ধ লিখতাম। ১৯৪৬ সালে যখন মাওলানা আকরম খাঁ ইংরেজি সাপ্তাহিক কমরেডের স্বত্ব খরিদ করে পত্রিকাটি পুনঃপ্রকাশের ব্যবস্হা করেন, নেপথ্যে থেকে সেটা সস্পাদনার ভারও আমি গ্রহণ করেছিলাম। তখন দু-একঢি ব্যতিক্রমের কথা বাদ দিলে সমগ্র মুসলিম সমাজ এই পাকিস্তান আন্দোলনের জন্য দিনরাত খেটেছে। আমরা এ স্বপ্নে বিভোর হয়েছিলাম যে, ভারতের পূর্বাঞ্চল যদি পাকিস্তানে যোগ দিতে পারে, তাহলে প্রায় দু’শ বছরের গ্লানি এবং অত্যাচার থেকে তারা রক্ষা পাবে।

আমি এ ইতিহাসের উল্লেখ করলাম এই কারণে যে, পাকিস্তানের প্রতি আমার এবং আমার মতো আরো অনেকের যে অনুভূতি সেটা সন্তানের প্রতি জনকের অনুভূতির মতো। এ রাষ্ট্র আমরাই সৃষ্টি করেছিলাম, কায়েদে আজম মুহাম্মদ আলী জিন্নাহ এ আন্দোলনের নেতৃত্ব দিয়েছিলেন। কিন্তু বাংলার মুসলিম জনগণের স্বতঃস্ফূর্ত সমর্থন না পেলে, এ অঞ্চল কখনও পাকিস্তানের অন্তর্ভুক্ত হতে পারত না।

আমি পাকিস্তানের ইতিহাসের সঙ্গে ওতপ্রোতভাবে জড়িত – কর্মী হিসেবে। আমি রাজনীতিক নই, কোনকালে মুসলিম লীগের সদস্যও ছিলাম না। কিন্তু যে আদর্শের ওপর পাকিস্তান প্রতিষ্ঠিত হয়, তার প্রতি ছিল আমার অকুণ্ঠ সমর্থন। অথচ লক্ষ্য করলাম ৪৭ সালের ১৪ই আগস্ট এ নতুন রাষ্ট্র আত্মপ্রকাশ করার সঙ্গে সঙ্গে ষড়যন্ত্র শুরু হয়। এক বছর না যেতেই পূর্ব পাকিস্তানিদের বুঝানো হল যে, তাদের অর্থনীতি এবং তামুদ্দনিক দুর্গতির কারণ পাকিস্তান।

৪৮ সাল থেকে ৭১ পর্যন্ত লক্ষ্য করেছি ষড়যন্ত্রের এ অঙ্কূর কিভাবে বিরাট মহীরুহে পরিণত হয়েছে। এর প্রতিরোধ করার ক্ষমতা আমার মত ব্যক্তির ছিল না। কিন্তু তা করবার যথাসাধ্য চেষ্টা করতাম। কিন্তু নসিবের এমন পরিহাস যে, ১৯৫৯ থেকে আইয়ুব খানের আমলে আমরাই চিহ্নিত হলাম পাকিস্তানের প্রধান শক্র হিসাবে। ঐ সালে যখন রাইটার্স গিল্ড গঠনের আলোচনা হচ্ছিল, তখন পূর্ব পাকিস্তানের ন্যায্য অধিকারের কথা বলায় আইয়ুব খানের সেক্রেটারী কূদরত উল্লাহ শাহাব চিৎকার করে আমাকে শাসিয়েছিলেন প্যরিটি বা সমতার কথা যেন উচ্চারণ না করি।

আমি যেটা দুঃখ ও ক্ষোভের সঙ্গে লক্ষ্য করেছি সে ঘটনা হলো এই যে, একদিকে পূর্ব পাকিস্তানে যেমন পাকিস্তানের বিরুদ্ধে একটা গভীর ষড়যন্ত্র ঘনীভূত হয়ে উঠছিল, অন্যদিকে পশ্চিম পাকিস্তানে কতিপয় রাজনীতিবিদ এবং বুদ্ধিজীবীর অদূরদর্শিতার কারণে পাকিস্তানের ভিত্তি ক্রমশঃ দূর্বল হতে আরম্ভ করে। একবার করাচীতে ডক্টর কোরায়শীর মত ব্যক্তিত্বকে আমি প্রকাশ্য সভায় এই বলে ভর্তসনা করি যে, তিনি অকারণে পাকিস্তানের ভবিষ্যৎ সম্বন্ধে হতাশা ব্যক্ত করতে শুরু করেছেন।

গোলাম মুহাম্মদ যেদিন খাজা নাজিম উদ্দীনকে বরখাস্ত করেন এবং তার কিছু কাল পর গণপরিষদ ভেঙ্গে দেন তখন থেকেই অবক্ষয়ের স্রোত আরো দ্রুত গতিতে প্রবাহিত হতে থাকে। এরপর আসে মিলিটারী শাসন। তখন ক্রমান্বয়ে পাকিস্তানের মৌলিক আদর্শ এবং লক্ষ্য চাপা পড়ে যায়। পাকিস্তানের রাজনীতি পরিণত হয় নিছক একটা ক্ষমতার দ্বন্ধে। এদিকে বিরোধী দলের চাপের মুখে ক্রমশঃ কেন্দ্রীয় এবং প্রাদেশিক, সরকার এমন কতগুলো পদক্ষেপ গ্রহণ করে যার পরিণতিতে বিচ্ছিন্নতাবাদ আরো মজবুত হয়ে দাড়ায়। প্রতিবেশী ভারতের কোন অঙ্গ রাজ্যের যে সমস্ত ক্ষমতা ছিল না, সে সমস্ত ক্ষমতাই পূর্ব পাকিস্তানকে প্রদান করা হয়। রেলওয়ে, সিভিল সার্ভিস সব ব্যাপারেই পূর্ব পাকিস্তানের স্বাতন্ত্র্য স্বীকৃতি হয়েছিল। কিন্তু অর্বাচীন, নির্বোধ রাজনীতিকদের আচরণে বিরোধী দল পাকিস্তানের জনসাধারণকে বুঝাতে সক্ষম হয় যে, তাদের কোন অধিকার নেই। তারা হিন্দু সমাজের অচ্ছুতদের চেয়েও এক নিকৃষ্ট জাতে পরিণত হয়েছে।

সমাজের বহুলোক সত্যি সত্যিই বিশ্বাস করতে শুরু করে যে, পাকিস্তানে আমরা স্বাধীন হতে পারিনি। ১৯৪৭ সালে নাকি শুধু শাসক বদলের ঘটনা ঘটে। ব্রিটিশের পরিবর্তে আসে পাকিস্তানীরা। এই যে, শত সহস্র লোকজন রাজনীতিবিদ, উকিল, ডাক্তার, মোক্তার, ইঞ্জিনিয়ার, ছাত্র যারা ৪৬ সালে ভোট দিয়ে মুসলিম লীগকে জয়ী করেছিল, বেঙ্গল এসেম্বলির যে মুসলিম সদস্যদের ভোটে মাউন্ট ব্যাটেন প্ল্যান গৃহীত হয়, তারা রাতারাতি হয়ে গেলেন বিদেশীদের অনুচর। এখনও এসব কথা শুনি আর ইতিহাসের পরিহাস সম্পর্কে ভাবি।

আরেকটা জিনিস লক্ষ্য করে চিরকালই অত্যন্ত পীড়িতবোধ করি। আমাদের লোকজন অত্যন্ত অস্থিরচিত্ত। যে ফজলূল হক সাহেব ১৯৪০ সালের লাহোর প্রস্তাব পেশ করেন, ১৯৪৬ সালের ইলেকশনে তিনি মুসলিম লীগের বিরোধিতা করেন। যে ভাসানী সাহেব সিলেটের গণভোটের সময় অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করেছিলেন, তিনি ১৯৫৪ সালে কাগমারীতে এক সম্মেলনের অনুষ্ঠান করে প্রায় প্রকাশ্যেই পাকিস্তানের আদর্শের বিরুদ্ধে বিদ্রোহ ঘোষণা করেন। যে সোহরাওয়ার্দী সাহেবের অক্লান্ত পরিশ্রমের ফলে ১৯৪৬ সালে ইলেকশনে মুসলিম লীগের পক্ষে জয়লাভ করা সম্ভব হয়েছিল, তিনি গোস্বা করে মুসলিম লীগ থেকে বেরিয়ে আওয়ামী মুসলিম লীগ প্রতিষ্ঠা করেন। ইউনিভার্সিটির যে সমস্ত মুসলিম শিক্ষকের উৎসাহ এবং অনূপ্রেরণায় ৪০ এর দশকে আমরা ছাত্ররা, পাকিস্তান আন্দোলনে ঝাপিয়ে পড়েছিলাম, কয়েক বছরের মধ্যে তাদের দু’-একজনের মতামতের একটা আমূল পরিবর্তন ঘটে। বাঙালী জাতীয়তাবাদের প্রতি প্রকাশ্যে সমর্থন জানান ডঃ শহীদুল্লাহ। কার্জন হলের এক সভায় ১৯৪৮ সালের ডিসেম্বরে তিনি ঘোষণা করেন, আমরা প্রথমে বাঙালী পরে মুসলমান। অথচ ব্যক্তিগত জীবনে তিনি এত ধার্মিক ছিলেন যে, একটা সময় ছিল যখন তিনি ছবি তোলাকেও নাজায়েজ মনে করতেন। আবুল মনসুর আহমদের মতো তীক্ষ্ণবুদ্ধির লেখক, যিনি লাহোর প্রস্তাব এবং পাকিস্তান আন্দোলনের ইতিহাস জানতেন, তিনি বিশ্বাস করতে আরম্ভ করেন যে, প্রথমাবধি ভারতের উত্তর-পূর্বে এবং উত্তর-পশ্চিম দু’টো আলাদা রাষ্ট্র হলেই ভাল হতো। ৭১ সালে বাংলাদেশ আবির্ভূত হওয়ার পর তিনি ইত্তেফাকে প্রবন্ধ লিখে দেশবাসীকে জানান যে, বাংলাদেশের অভ্যূদয় আসলে লাহোর প্রস্তাবের চূড়ান্ত বাস্তবায়ন। অথচ, তিনি অবশ্যই জানতেন যে, ৪৭ এর ১৪ই আগস্টের আগে আমাদের যে অবস্থা ছিল তাতে, স্বাধীন রাষ্ট্র কায়েম করার মতো কোন সামর্থ্য এ অঞ্চলের ছিল না।

এসব অসংগতির কথা যতই মনে হয় ততই এ বিশ্বাস জন্মে যে, চরিত্রগত কারণেই হয়তো আমরা কোন বিশ্বাসকে বেশীদিন অকড়ে ধরে রাখতে পারি না। চারিত্রিক দূর্বলতার কারণে ইতিহাসে বহুবার আমাদের ভাগ্য বিপর্যয় ঘটেছে। ৭১ সালে শুরু হয়েছিল স্বাধীন রাষ্ট্রকে নতুন করে স্বাধীন করার এক অদ্ভুত নাটক। স্মৃতিকথায় আমি বলেছি, যে সমস্ত ঐতিহাসিক কারণে পাকিস্তান অনিবার্য হয়ে ওঠে, তার কথা স্মরণ থাকলে পূর্ব এবং পশ্চিম পাকিস্তানের ক্ষমতা বন্টনের সমস্যা আমরা অনায়াসে সমাধান করতে পারতাম। আমি আরো দেখিয়েছি যে, ৭১ সালের ২৫শে মার্চ আর্মির যে ক্র্যাকডাউন শুরু হয়, তার পিছনে ছিল ষড়যন্ত্রকারীদের উস্কানি। আর নির্বোধ আর্মি অপরিকল্পিতভাবে জনসাধারণের ওপর হামলা করে ষড়যন্ত্রের এ ফাঁদে পা দেয়।

আমি জানি অনেকেই হয়তো আমার মতামত গ্রহণ করবেন না। কিন্তু আমাদের দিক থেকে যেভাবে সমস্যাটা দেখেছি, তার একটা রেকর্ড ভবিষ্যতের জন্য রেখে যাওয়া অত্যাবশ্যক। যে হারে ইতিহাসের বিকৃতি ঘটছে তাতে আরো কত আজগুবি কাহিনী ৭১ সাল সম্পর্কে শুনতে হবে, তা কে বলবে?

আমার মনে আছে ১৯৭২ সালে আমরা যখন জেলে, তখন ইংরেজী অবজারভার পত্রিকার সম্পাদক মরহুম আবদুস সালাম নতুন বাংলাদেশ সরকারের বৈধতা (Legitimacy) সম্বন্ধে একটা প্রশ্ন তুলেছিলেন। তিনি বলেছিলেন যে, যে উপায়ে বাংলাদেশ প্রতিষ্ঠিত হলো, সেটা একটা বিপ্লব। কিন্তু এই বিপ্লবকে আইনের চোখে বৈধ করতে হলে আরও পদক্ষেপ নেওয়া দরকার। সেদিনকার পত্রিকার সংখ্যা বের হবার সঙ্গে সঙ্গে সালাম সাহেবকে বরখাস্ত করা হয়। কারণ বাংলাদেশ সরকার কোন সমালোচনাই বরদাশত করতে রাজী ছিল না। আজও সে অসহিষ্ণুতার ভাব পুরোপুরি কাটেনি। সে জন্য আমি আশা করি না যে, সব পাঠক সহিষ্ণুভাবে আমার বক্তব্যকে গ্রহণ করবে।

বাঙালী জাতীয়তাবাদ সম্বন্ধে সালাম সাহেব পরোক্ষভাবে যে সংশয় প্রকাশ করেছিলেন এবং যে কথা আমরা আগাগোড়াই বলে এসেছি, তার যথার্থতা প্রমাণিত হয় তখন, যখন – প্রেসিডেন্ট জিয়াউর রহমান ঘোযণা করেন যে, বাংলাদেশী জাতীয়তাবাদই হবে এদেশের মূলনীতি। এ ঘোষণার মধ্যে এই স্বীকৃতিই ছিল যে, এ অঞ্চলে সংখ্যাগুরু সমাজের যে বিশ্বাস এবং জীবনধারা তার উপর নির্ভর করেই নতুন রাষ্ট্রকে এগুতে হবে। বাঙালী জাতীয়তাবাদ বললে বাংলাদেশের রাষ্ট্রীয় স্বাতন্ত্র্যের কোন যৌক্তিকতা থাকে না। একথা ভারতীয় সাংবাদিক বসন্ত চ্যাটার্জী পর্যন্ত স্বীকার করে গেছেন। বাংলাদেশেরই একশ্রেণীর লোক এই দিব্য সত্যকেও মানবে না। তারা মনেপ্রাণে, ভাবাদর্শে এবং জীবনধারায় নিজেদের এক কাল্পণিক প্রাণীতে রুপান্তরিত করার স্বপ্নে মেতে আছেন।

আরো আশ্চর্য লাগে এই ভেবে, যারা পূর্বাঞ্চলের অধিকার এবং বাংলা ভাষার দাবী নিয়ে এ অঞ্চলকে বিচ্ছিনতার সংগ্রামে উদ্বূদ্ধ করেন তাদেরই একদল বাংলাদেশের সার্বভৌমত্ব স্বীকার করতে নারাজ। এরা চাচ্ছে যত শীঘ্র এ অঞ্চলটা ভারতের অন্তর্ভূক্ত হয়, ততই যেন মঙ্গল। এসব প্রস্তাব তারা যখন তোলে তখন বাংলা ভাষার দাবীর কথা তাদের মনে থাকে না, মনে থাকে না এ অঞ্চলের অধিবাসীদের বিভাগপূর্ব দুর্দশার কথা।

৬০ এর দশক থেকে আমাদের অনবরত বলা হতো যে, পশ্চিম পাকিস্তানের শোষণের ঠেলায় এদেশের জনগণ নাকি মৃতপ্রায় হয়ে উঠেছিল। অনেকে বই লিখে এ শোষণের ভয়াবহ চিত্র তুলে ধরেছিলেন। পাকিস্তানের দুই অঞ্চলের অর্থনৈতিক বৈষম্য সম্বন্ধে অভিযোগ ৬০ এর দশকের শেষদিকে এমন পর্যায়ে পৌছায় যে, পশ্চিম পাকিস্তানেও কেউ কেউ বলতে শুরু করেন যে, পূর্বাঞ্চলের লোকেরা যদি পাকিস্তানে থাকতে না চায়, তাদের বেরিয়ে যেতে দিলেই পাকিস্তানের মঙ্গল হবে। ৭০ সালে আমি যে ডেলিগেশনের নেতা হিসেবে তেহরান গিয়েছিলাম তার একজন সদস্য ছিলেন লয়ালপুর এগ্রিকালচার ইউনিভার্সিটির ভিসি। তিনি একদিন কথায় কথায় বললেন যে, ইষ্ট পাকিস্তান যদি সত্যিই বেরিয়ে যেতে চায় তাদের বাধা দেওয়া উচিত নয়। কারণ এই যে, অনবরত অভিযোগের ফলে রাষ্ট্রের কাঠামো দুর্বল হয়ে যাচ্ছে। ‘৭১ সালে যুদ্ধ করে আমরা সত্যিই বেরিয়ে এসেছি। আজ পাকিস্তান পারমাণবিক বোমা তৈরীর ক্ষমতা অর্জন করেছে। তাদের রুপীর মুল্য আমাদের প্রায় তিনগুণ। পাকিস্তান এক সমৃদ্ধ দেশ। কিন্তু আমরা এই বিশ বছরে কী পেয়েছি? আমাদের ভোগান্তির শেষ নেই। কল-কারখানা দুর্নীতির চাপে বন্ধ হয়ে যাচ্ছে। দেশে স্রোতের মত ইন্ডিয়ার পণ্য আসছে, তা নিয়ে কেউ কেউ চিৎকারও করে। দেশের জনগণের অবস্থা ১৯৭০ সালের তুলনায় অনেক নেমে গেছে। বার্মার মত সর্বধিকৃত রাষ্ট্রের সঙ্গে মোকাবেলা করার শক্তিও আমাদের নেই। ওরা যখনই ইচ্ছা লক্ষ লক্ষ শরণার্থীকে বাংলাদেশে ঢুকিয়ে দিচ্ছে। এর জোরালো প্রতিবাদ করার সাধ্য আমাদের নেই।

ইন্ডিয়ার কথা তো আলাদা। ইন্ডিয়ায় মুসলমানদের উপর শত অত্যাচার হলেও আমাদের প্রতিবাদ করার সাহস হয় না। কাশ্মীরের অধিবাসী যারা ইন্ডিয়ার নাগপাশ থেকে মুক্ত হওয়ার চেষ্টা করছে তাদের বাংলাদেশী খবরের কাগজে বিচ্ছিন্নতাবাদী বলতে আমাদের বিন্দুমাত্র দ্বিধা হচ্ছে না। কাশ্মীর নিয়ে ‘৪৭ সালেই বিরোধ সৃষ্টি হয় এবং জাতিসংঘের সামনে প্রশ্নটা উপস্থাপিত হলে সর্বসম্মতিক্রমে স্থির হয় যে গণভোটের মাধ্যমে কাশ্মীরবাসীরা তাদের ভবিষ্যত নির্ধারিত করবে। কিন্তু আজ আমাদের সরকার এ ব্যাপারে কোন উচ্চবাচ্য করতে সাহস পান না। কারণটা স্পষ্ট।

১৯৯২ সালের ৬ই ডিসেম্বর যখন বিজেপি’র লোকেরা চারশত বছরের পুরানো ঐতিহাসিক বাবরী মসজিদ ধূলিসাৎ করে দেয়, তখন এর বিরুদ্ধে সরকার প্রবল প্রতিবাদ করতে পারেনি। সামান্য একটু কথা বলা হয়েছিল তাতেই ইন্ডিয়া উষ্মা প্রকাশ করে। এই তো আমাদের স্বাধীনতার স্বরূপ।

… আমি জন্মগতভাবে পূর্ব বাংলার সন্তান। এ অঞ্চলের স্বাধীনতা বা সার্বভৌমত্ব সম্বন্ধে কথা বলার অধিকার আমার নেই বলে শুনছি। অধিকার দখল করে বসেছেন প্রধানতঃ এমন একদল যারা, ‘৪৭ সালে পাকিস্তান প্রতিষ্ঠার পর রাতারাতি প্রমোশন এবং উন্নতি লাভের আশায় এ নতুন রাষ্ট্রে ছুটে এসেছিলেন। এদের মধ্যে কেউ ছিলেন উকিল, কেউ সাংবাদিক, কেউ লেখক, কেউ শিল্পী, কেউ ডাক্তার-ইঞ্জিনিয়ার যারা কলকাতার জগতে প্রতিযোগিতায় বেশীদূর এগুতে পারতেন না, বিখ্যাত হওয়াতো দূরের কথা। অনেকে নিঃস্ব অবস্থায় এসে পাকিস্তানে বহু সম্পত্তির মালিক হয়েছিলেন। যারা পাকিস্তান না হলে উচ্চ শিক্ষা লাভ করার সুবিধা থেকে বঞ্চিত হতেন তারাই বিশ্ববিদ্যালয়ে উচ্চতম পদগুলো দখল করতে পারলেন। কিন্তু আশ্চর্যের কথা এদের মুখেই শুনলাম শোষণ এবং বঞ্চনার কথা সবচেয়ে বেশী। এবং এদেরই একদল আজ বাংলাদেশকে আবার ভারতে প্রত্যাবর্তনের পরামর্শ দিচ্ছেন।

এই দুঃস্বপ্নের রহস্য আমরা কি করে বুঝবো?

বাংলাদেশ আজ একটা বাস্তব সত্য। এর স্বাধীনতা এবং সার্বভৌমত্ব যদি রক্ষিত হয় তবে আমরা যে স্বকীয়তার কথা বলতাম সেটা কিছুটা রক্ষা পাবে বলে আমার বিশ্বাস। কারণ এ অঞ্চলকে পূর্ব বাংলা, পূর্ব পাকিস্তান, বাংলাদেশ যাই বলি না কেন এর মাটিতে কোন পরিবর্তন ঘটেনি এবং ঘটতে পারে না। সে আকাশ, সে বাতাস, সে গাছপালা, সে নদ-নদী সবই রয়ে গেছে। আমরা এর শুধূ ভৌগোলিক নাম বদলিয়েছি। তবে বর্তমানে যে অপচেষ্টা চলছে তার লক্ষ্য হলো, আমাদের শত শত বছরের ইতিহাস এবং সংস্কৃতিকে একেবারে মুছে ফেলা। জীবনের শেষ প্রান্তে দাঁড়িয়ে এ বিপদের আশঙ্কায় খুবই শঙ্কিত হয়ে পড়তে হয়। আমার বক্তব্য তাই লিপিবদ্ধ করে গেলাম। কেনো পাকিস্তান চেয়েছিলাম, ৭১ সালে আমরা কেনো বিচ্ছিন্নতাবাদের সমর্থন করতে পারিনি এবং বর্তমানে কেন বাংলাদেশের সার্বভৌমত্বের সম্বন্ধে আমাদের উৎকণ্ঠা সবচেয়ে বেশী তার কৈফিয়ত হিসাবে এই স্মৃতিচারণার মূল্য॥” (শেষ কিস্তি)

– সৈয়দ সাজ্জাদ হোসায়েন (সাবেক ভিসি – ঢাবি) / একাত্তরের স্মৃতি॥ [ নতুন সফর প্রকাশনী – নভেম্বর১৯৯২। পৃভূমিকা ]

One thought on “কিছু সংখ্যালঘু নেতা চেয়েছিলেন বাংলাদেশকে ভারতীয় অংশ করতে”

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *