কিছু কিছু নেতা কলকাতায় বেশ ফূর্তি করছে

কিছু কিছু নেতা কলকাতায় বেশ ফূর্তি করছে

“… কুঞ্জবনে এসে যখন পৌঁছলাম আমার হাতে বাঁধা এহসানের ঘড়িতে তখন সকাল সাড়ে দশটা। একটা সাদা একতলা বাড়ি। ক্র্যাফট ইন্সটিটিউট থেকে কুঞ্জবনের দূরত্ব অনেক। তবু রিকশা ভাড়া লাগলো মাত্র তিন টাকা। ভাড়া মিটিয়ে আমরা ড্রইংরুমে বসলাম। কুড়ি-পঁচিশ বছরের প্যান্ট-শার্ট পরা যুবক ছেলে এসে বললো, ‘কাকে চান?’  এয়ারভাই বললেন, ‘জহুর আহমদ চৌধুরী, ওয়াহাব সাহেব, ডা: মান্নান, হান্নান সাহেব, চট্টগ্রামের যেকোনো একজনকে খবর দাও, বলো এয়ার মাহমুদ সাহেব এসেছেন।’ ছেলেটা একটু ইতস্তত করে মাথা চুলকিয়ে মুখ টিপে হেসে আস্তে করে বললো, ‘ওনারা একটু বেসামাল আছেন।’ এয়ারভাই বললেন, ‘কী বললে?’ ছেলেটি থতমত খেয়ে বললো, ‘না মানে উনারা এখনো ঘুমাচ্ছেন। তবে হ্যাঁ, চিটাগাংয়ের এম আর সিদ্দিকী সাহেব আছেন। তাকে খবর দিতে পারি।’  এয়ারভাই বললেন, ‘হ্যাঁ হ্যাঁ, তাই দাও।’  ছেলেটা দরজা ঠেলে ভেতরে চলে গেলো। এয়ারভাই বললেন, ‘এটা কাজের ছেলে।’ ছেলেটি যাবার সময় দরজাটা ভালো করে ভেজিয়ে দিয়ে যায়নি। বেশ খানিকটা ফাঁক রয়েছে। দরজায় কোনো পর্দা নেই। আমি যেখানে বসে আছি সেখান থেকে দরজার এই ফাঁক দিয়ে আরেকটি রুম দেখা যায়, যেখানে দেখা যাচ্ছে চিৎ-উপুড় হয়ে মেঝেতেই দু-তিনজন শুয়ে আছে। মনে মনে অবাক হলাম, সকাল ১০টা বাজে, এখনো এমএনএ, এমপিরা ঘুমোচ্ছেন? কথাটা এয়ারভাইকে বললাম।

কলকাতায় অস্থায়ী যে বাংলাদেশ সরকার গড়ে উঠেছিল, তারা সবাই যে একটি স্বাধীন দেশের যথার্থ প্রতিনিধি হিসাবে আত্মপ্রকাশ করেছিলেন এমন কথা বলা যায় না। এদের অভিজ্ঞতা ছিল কম, সংগ্রামের ইতিহাসও ছিল নগণ্য। সুতরাং এমন কথা বলা ঠিক হবেনা যে এরা সবাই পূর্ণ দক্ষতা নিয়ে কাজ করতে সক্ষম হয়েছিলেন। তবে আকস্মিকভাবে কারও উপর দায়িত্বভার অর্পিত হলে সে ক্রমশ দায়িত্বের উপযোগী হয়ে ওঠে, এমন কথা বলা যে যায়না তা নয়। এদের মধ্যে কোন একজনের ব্যক্তিগত চরিত্রও ছিল অত্যন্ত জঘণ্য। সারাক্ষণ মদ্য পান করতেন এবং নারীঘটিত দূর্বলতাও ছিল। একবার রাত্রিবেলা কোন এক অশুভ স্থান থেকে বেরুচ্ছেন যখন তখন পুলিশ তাঁকে তাড়া করে। তিনি তার জীপ নিয়ে দ্রুতগতিতে স্থান ত্যাগের চেষ্টা করেন। বালিগঞ্জ সার্কুলার রোডে জীপ থেকে নেমে অন্ধকার আবাসস্থল ঠাহর করতে না পেরে ডানদিকে মহিষের বাথানের মধ্যে ঢুকে একটি মহিষের গায়ের উপর হোঁচট খেয়ে পড়েন। সে অবস্থায় তার শরীর গোবরে মাখামাখি হয়ে যায়।

এয়ারভাই কিছু বললেন না, হাসলেন। আবার বললাম, ‘আজ তো বুধবার, ছুটির দিনও নয়।’ এয়ারভাই বললেন, ‘আচ্ছা এখানে কি তেমন ধরাবাঁধা কাজকর্ম আছে? এখানে তো সবাই শরণার্থী।’ কথাটা আমি মেনে নিলাম, তা হবে হয়তো।  একটু পরেই দরজা ঠেলে সিদ্দিকী সাহেব এলেন। আমাকে দেখে যেমন অবাক হলেন তেমনি যে আনন্দিত হয়েছেন বোঝা গেল​। বললেন, ‘বোন, আমরা তো শুনেছিলাম ডা: শফীর পুরো পরিবারকেই ব্রাশফায়ার … যাক বোন, কীভাবে কেন তাকে ওরা নিয়ে গেলো?’ আমি বললাম তাকে সব ঘটনা। শুনে তিনি আবার বললেন, ‘থাক বোন, দু:খ করবেন না। এখন দু:সময় কেবল আপনার জন্য নয়, গোটা জাতির। এই কথা মনে করে দু:খকে সয়ে যাবার চেষ্টা করুন।’ এরপর তিনি জানতে চাইলেন কোথায় উঠেছি, ইত্যাদি। এয়ারভাই সব বলে জানতে চাইলেন, ‘শুনলাম বেলালরা নাকি গতকালই মুজিবনগরে চলে গেছে?’ সিদ্দিকী সাহেব বললেন, ‘হ্যাঁ।’ … এসময় অধ্যাপক নুরুল ইসলাম এলেন। তিনিও আমাকে দেখে অবাক। তিনি সিদ্দিকী সাহেবের মতোই বললেন, ‘আশ্চর্য, আমরা তো শুনেছিলাম ডা: শফীর পুরো ফ্যামিলিকে মেরে ফেলেছে।’  … নুরুল ইসলামের কথার মাঝে সিদ্দিকী সাহেব উঠে গেলেন ভেতরে। … সিদ্দিকী সাহেব ফিরে এলেন। একটা মুখবন্ধ খাম আমার হাতে দিয়ে খুব বিনয় এবং সঙ্কোচের সাথে বললেন, ‘বোন এটা রাখুন। আপনি অন্য কিছু মনে করবেন না। আমরা এখানে সবাই শরণার্থী। এভাবে নিয়েই আমরা চলছি।’ আমি কিছু বুঝতে না পেরে তার মুখের দিকে চেয়ে রইলাম। তিনি বললেন, ‘খামের ওপরেই (বেলালের) ফোন নম্বরটা লেখা রয়েছে।’  অধ্যাপক নুরুল ইসলাম ততক্ষণে ভেতরে গেলেন। কেমন একটা পঁচা দূর্গন্ধ পাচ্ছিলাম যতবার দরজা খুলছিলেন। সিদ্দিকী সাহেব উঠে গিয়ে দরজাটা ভালো করে টেনে বন্ধ করে দিয়ে বললেন, ‘ঠিক আছে বোন, এখন আসুন, আমাকে একটু বাইরে যেতে হবে।’ আমরা বিদায় নিয়ে উঠে দাঁড়িয়েছি। দরজা ঠেলে জনাব আহমেদ চৌধুরী এলেন। তাকে খুব অসুস্থ এবং অস্বাভাবিক মনে হলো। আমাকে দেখে চিটাগাংয়ের ভাষায় বললেন, ‘ভাবি আইসোন না? ভালো হইয়ে। আঁরার নুরুন কডে?’  এয়ারভাই বললেন, ‘চেষ্টা করেছি কিন্তু নুরুনের সঠিক খোঁজ পাইনি।’  সিদ্দিকী সাহেব তাড়াতাড়ি বললেন, ‘উনি স্ত্রীর ভাবনায় বেশি মুষড়ে পড়েছেন। কথা শুরু করলে সহজে থামেন না। তাছাড়া ওর শরীরটাও ভালো নেই। আপনারা বরং আসুন।’ আমরা বেরিয়ে এলাম। আসতে আসতে শুনলাম, চাটগাঁর ভাষায় চিৎকার করে বলছেন, ‘এয়ারভাই, আমার নুরুনের খবর পেলে বলে যাবেন।’ পথে নেমেই এয়ারভাই একটু ইতস্তত করে বললেন, ‘জানেন আপা, এরা সবাই ড্রিঙ্ক করে পড়েছিল।’ আমি অবাক। এখানে ড্রিঙ্ক? এরাই না জাতীয় নেতা, মুক্তিযুদ্ধ পরিচালনা করছেন? এয়ার ভাইয়ের কথা বিশ্বাস করতে আমার কষ্ট হলো। রিকশায় বসে খাম খুলে দেখলাম তিনশ টাকা। আরো বিস্ময়। বুকের ভেতরে আরেক রকমের বেদনা আর মুগ্ধতা নিয়ে ফিরে এলাম ক্র্যাফট ইন্সটিটিউট হোস্টেলে॥”

  — বেগম মুশতারী শফী / স্বাধীনতা আমার রক্তঝরা দিন ॥ [ মুর্ধণ্য – ফেব্রুয়ারি, ২০১১ । পৃ: ১৮৯-১৯২ ]


০২

.“… তোমাদের কিছু কিছু নেতা তো কলকাতায় বেশ ফূর্তি করছে, মদ খাচ্ছে এবং মেয়েদের ন্যাংটো নাচ দেখছে॥”— সৈয়দ মুজতবা আলী  

তথ্যসূত্র : গোলাম মোস্তাকীম / সৈয়দ মুজতবা আলী : প্রসঙ্গ অপ্রসঙ্গ ॥ [ স্টুডেন্ট ওয়েজ – জুলাই, ১৯৯৫। পৃ: ৪৬ ]


০৩.

“ … কলকাতায় অস্থায়ী যে বাংলাদেশ সরকার গড়ে উঠেছিল, তারা সবাই যে একটি স্বাধীন দেশের যথার্থ প্রতিনিধি হিসাবে আত্মপ্রকাশ করেছিলেন এমন কথা বলা যায় না। এদের অভিজ্ঞতা ছিল কম, সংগ্রামের ইতিহাসও ছিল নগণ্য। সুতরাং এমন কথা বলা ঠিক হবেনা যে এরা সবাই পূর্ণ দক্ষতা নিয়ে কাজ করতে সক্ষম হয়েছিলেন। তবে আকস্মিকভাবে কারও উপর দায়িত্বভার অর্পিত হলে সে ক্রমশ দায়িত্বের উপযোগী হয়ে ওঠে, এমন কথা বলা যে যায়না তা নয়। এদের মধ্যে কোন একজনের ব্যক্তিগত চরিত্রও ছিল অত্যন্ত জঘণ্য। সারাক্ষণ মদ্য পান করতেন এবং নারীঘটিত দূর্বলতাও ছিল। একবার রাত্রিবেলা কোন এক অশুভ স্থান থেকে বেরুচ্ছেন যখন তখন পুলিশ তাঁকে তাড়া করে। তিনি তার জীপ নিয়ে দ্রুতগতিতে স্থান ত্যাগের চেষ্টা করেন। বালিগঞ্জ সার্কুলার রোডে জীপ থেকে নেমে অন্ধকার আবাসস্থল ঠাহর করতে না পেরে ডানদিকে মহিষের বাথানের মধ্যে ঢুকে একটি মহিষের গায়ের উপর হোঁচট খেয়ে পড়েন। সে অবস্থায় তার শরীর গোবরে মাখামাখি হয়ে যায়। ভারতীয় পুলিশ তখন বাংলাদেশের মন্ত্রীদের অস্থায়ী আবাস থেকে কয়েকজনকে ডেকে তোলে এবং মহিষের বাথানে গোবর মাখা মহাপুরুষকে দেখিয়ে দেয়।পুলিশ অবশ্য আর কিছু করেনি। কিন্তু তাদের খাতাপত্রে আমাদের মানুষদের কীর্তিকাহিনী নিশ্চয়ই লিখে রেখেছে॥” 

  — যখন সময় এল / সৈয়দ আলী আহসান ॥ [ নওরোজ কিতাবিস্তান – ফেব্রুয়ারী, ১৯৯২ । পৃ: ১০৫]

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *