এরশাদের প্রথম কবিতা

এরশাদের প্রথম কবিতা

:: কাজী জাওয়াদ ::

সাংবাদিক বন্ধুরা বুকে হাত দিয়ে বলুন, কোন দেশে সামরিক অভ্যুত্থান বা ব্যর্থ অভ্যুত্থান হলে সে দেশের কোন সাংবাদিক সবার আগে তার মূল নায়কের সাক্ষাৎকার নেয়ার চেষ্টা করবেন কি না? ১৯৮৩ সালের মার্চে মনে হয়েছিল এবং এখনও মনে করি যে কোন সাংবাদিকের জন্যই তেমন একটা সাক্ষাৎকার পেশাগত কৃতিত্বের পরিচায়ক।জাতীয় গ্রন্থ কেন্দ্রের সাবেক পরিচালক বর্তমানে প্রকাশনা প্রতিষ্ঠান ইউপিএলের সম্পাদক (বদিউদ্দিন) নাজির ভাই ১৮ জুলাই ফেসবুকে এক স্মৃতিচারণে ইউপিএলের একটা বিজ্ঞাপন ছাপানোর প্রসঙ্গে লিখেছেন কবি শামসুর রাহমান সম্পাদিত সাপ্তাহিকে. . . ইত্যাদি ইত্যাদি।

আহমেদ রফিক লিখলেন ‘সবশালা কবি হতে চায়’। আর এরশাদ বিরোধী আন্দোলনে তাঁর কবিতাও ছাত্র-জনতার ক্রোধের কারণ হয়ে দাঁড়িয়েছিল। শামসুর রাহমান এরশাদের কবিতা প্রকাশ করেছিলেন বলে যে গঞ্জনার শিকার সেটার বিষয়ে তিনি আসলে কিছুই জানতেন না। বিচিত্রার ব্যাপারে তিনি আমাদের পুরো স্বাধীনতা দিয়েছিলেন। পরে শামসুর রাহমানের নির্বাচিত কবিতা হিসেবে এরশাদের কবিতা ছাপার ব্যাপারেও বিচিত্রা সম্পাদকীয় বিভাগের চাপে তিনি নিমরাজী হয়েছিলেন। তিনি এরশাদের কবিতা লিখে দিতেন কিনা জানি না। মনে হয় তিনি তা কখনো করেননি। তিনি অত খারাপ কবিতা ইচ্ছে করলেও লিখতে পারতেন বলে আমি বিশ্বাস করিনা।


সাপ্তাহিক পত্রিকাটার নাম তিনি মনে করতে পারেননি। মন্তব্যে বিবিসি/প্রথম আলোর সাংবাদিক কামাল আহমেদ মনে করিয়ে দিয়েছেন ওটা ছিল সাপ্তাহিক বিচিত্রা। আরেক মন্তব্যে নাজির ভাই এরশাদের কাব্যগ্রন্থের সমালোচনা লেখার বিষয়ে তাঁর ভূমিকা উল্লেখ করেছেন। এ কারণেই বিচিত্রায় কীভাবে এরশাদের কবিতা ছাপানোর কাহিনী জানাতে প্ররোচিত হয়েছি।   চট্টগ্রামে জিয়াউর রহমানের হত্যাকান্ডের পর বিচিত্রার প্রচার সংখ্যা তুঙ্গে। লক্ষ কপি করে কাটতি। এরই মধ্যে একদিন আমরা সম্পাদকীয় বিভাগের কর্মীরা একটি মুনাফা বোনাসের দাবী জানাতে সম্পাদক (কবি শামসুর) রাহমান ভাইয়ের কামরায় গেলাম দুপুরের দিকে। বোনাস দিতে রাহমান ভাইয়ের আপত্তি ছিল না। এক কথাতেই রাজী হয়ে গিয়েছিলেন। তারপর তাঁর সঙ্গে সাম্প্রতিক পরিস্থিতি নিয়ে আলোচনা হচ্ছিল। বিএনপি ক্ষমতা ধরে রাখতে পারবে কিনা এই নিয়ে আলাপের এক পর্যায়ে রাহমান ভাই একটা তথ্য দিয়েছিলেন। কোন এক অনুষ্ঠানে তাঁর সঙ্গে যেচে আলাপ করে জেনারেল এরশাদ বলেছিলেন যে তিনি কবিতা লেখেন এবং রাহমান ভাইকে দেখানোর জন্য কবিতার খাতা নিয়ে যাবেন।১৯৮২ সালের ২৪শে মার্চ জেনারেল এরশাদ সামরিক আইন জারী করেন। তার কয়েক দিন পরেই আমি সেনা সদরে যেয়ে জেনারেল এরশাদের সাক্ষাৎকার চাই। সম্ভবতঃ তখন তার একান্ত সচিব ছিলেন ব্রিগেডিয়ার (পরে মেজর জেনারেল) এ এম এস এ আমিন, আমসা আমিন নামে পরিচিত। সে সময় জেনারেল এরশাদ দফতরে ছিলেন না। ঠিক হলো জেনারেল আমিন সেনা প্রধানের সঙ্গে আলাপ করে সময় ঠিক করবেন আর দুয়েক দিনের মধ্যে আমি একটা প্রশ্নমালা পৌঁছে দেব। উল্লেখ্য শাহাদত ভাইকে না জানিয়েই সাক্ষাৎকার চেয়েছিলাম। অফিসে ফিরে শাহাদত ভাইকে জানালাম। শাহাদত ভাই খুব উৎসাহ দেখালেন না। হয়তো সন্দিহান ছিলেন। তবু আমাকে প্রশ্নমালা তৈরি করতে বললেন। দুটো প্রশ্নে খুব গুরুত্ব দিয়েছিলাম, তার একটা ছিল শেষ প্রশ্ন।

যেটায় তাঁর কাব্যচর্চার বিষয়টা ছিল। উদ্দেশ্য, তার ব্যক্তিগত দূর্বলতার বিষয়ে প্রশ্ন করা যাতে প্রকাশের পরের কোন ঝামেলা এড়াতে সুবিধা হয় আর তাঁর কবিতার মান যাচাই। ভালো হলে একজন কবিকে আবিষ্কারের আর খারাপ হলে বিচিত্রা তাঁর আসল যোগ্যতা প্রকাশ করার কৃতিত্ব পাবে।তখন বিচিত্রার সরাসরি ফোনটি ছিল শাহাদত ভাইয়ের। সেনা সদর থেকে ফোন করে শাহাদত ভাইকে সাক্ষাৎকারের তারিখ ও সময় জানানো হলো। দু’দিন পর দুপুরে সময় পাওয়া গেছে। আগের দিন শাহাদত ভাই আমাকে বললেন সাক্ষাৎকার নিতে তিনি যাবেন, প্রধান সামরিক আইন প্রশাসকের সাক্ষাৎকার নিতে ভারপ্রাপ্ত সম্পদকেরই যাওয়া উচিত। তাঁর সহকারী হিসেবে আমিও যেতে পারি প্রস্তাব করলে তিনি সহকারী সম্পাদক মাহ্ফুজ উল্লাহ্কে সঙ্গে নেয়ার সিদ্ধান্ত নিলেন। লিখিত জবাবের উপর কোন অতিরিক্ত প্রশ্ন করবে মাহফুজ উল্লাহ্ আর শাহাদত ভাই ছবি তুলবেন। তাতে আপত্তি জানিয়ে বলেছিলাম এই কাহিনীর ধারণা এবং প্রশ্নমালা আমার করা। আমি যদি না যাই তাহলে প্রতিবেদক হিসেবে আমার নাম কীভাবে দেয়া যাবে। তিনি সিদ্ধান্ত নিলেন, প্রচ্ছদ কাহিনী যাবে ‘বিচিত্রা রিপোর্ট’ হিসেবে এবং সেটার সম্পাদনার দায়িত্ব থাকবে আমার। পরদিন তাঁরা রওয়ানা হওয়ার আগে বার বার বলে দিয়েছিলাম, কবিতার প্রশ্নে কোন জবাব না দিলে প্রশ্নটা যেন আবার করা হয় এবং তাঁর লেখা একটা কবিতা চেয়ে আনতে হবে।

তাঁরা ফিরে এসেছিলেন অত্যন্ত খুশি মনে। শাহাদত ভাইয়ের বড় ভাই ছিলেন রংপুরে এরশাদের সহপাঠী। সেই সম্পর্ক ঝালাই হয়েছিল। বন্ধুর ছোটভাইকে এরশাদ ‘তুমি’ করেই সম্বোধন করেছিলেন। আর শেষ প্রশ্নের জবাব দিয়েছিলেন উচ্ছসিত হয়ে। একটা কবিতা দিয়েছিলেন। যার নাম ‘কনক প্রদীপ জ্বালো’।কবিতাটা কীভাবে ছাপা হবে তা নিয়ে সামান্য আলোচনা হয়েছিল। আমার যুক্তি ছিল, বস্তুটা কবিতা হিসেবে ছাপার উপযুক্ত না, তাই প্রচ্ছদ কাহিনীতে আলাদা করে ছাপা উচিত। ছাপা হলো। আমার উদ্দেশ্য সফল হয়েছিলো। উস্কানিটা কাজে লাগে। আহমেদ রফিক লিখলেন ‘সবশালা কবি হতে চায়’। আর এরশাদ বিরোধী আন্দোলনে তাঁর কবিতাও ছাত্র-জনতার ক্রোধের কারণ হয়ে দাঁড়িয়েছিল। শামসুর রাহমান এরশাদের কবিতা প্রকাশ করেছিলেন বলে যে গঞ্জনার শিকার সেটার বিষয়ে তিনি আসলে কিছুই জানতেন না। বিচিত্রার ব্যাপারে তিনি আমাদের পুরো স্বাধীনতা দিয়েছিলেন। পরে শামসুর রাহমানের নির্বাচিত কবিতা হিসেবে এরশাদের কবিতা ছাপার ব্যাপারেও বিচিত্রা সম্পাদকীয় বিভাগের চাপে তিনি নিমরাজী হয়েছিলেন। তিনি এরশাদের কবিতা লিখে দিতেন কিনা জানি না। মনে হয় তিনি তা কখনো করেননি। তিনি অত খারাপ কবিতা ইচ্ছে করলেও লিখতে পারতেন বলে আমি বিশ্বাস করিনা।

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *