৭৩ সালের একুশে ফেব্রুয়ারি

৭৩ সালের একুশে ফেব্রুয়ারি

“… একুশে ফেব্রুয়ারি তেয়াত্তর সন। যে শ্রদ্ধা, যে পূত-পবিত্র অনুভূতি ও মন লইয়া রাজধানীর আবাল-বৃদ্ধ-বণিতা শহীদ মিনারে সেদিন সমবেত হইয়াছিল, এক শ্রেণীর উচ্ছৃঙ্খল ধরণের জঘণ্য কার্যকলাপ শুধু সে মনকে ভারাক্রান্তই করে নাই – শহীদ মিনারের পবিত্র বেদীকে, অমর একুশের পূন্যময় স্মৃতিদিবসকে মসীলিপ্ত করিয়াছে। মেয়েদের উপর বার বার হামলা হইয়াছে, অনেক মহিলার নিরাপত্তা, সম্ভ্রম ও ইজ্জত বিনষ্ট হইয়াছে, দুইটি তরুণীকে শহীদ মিনারের পাদদেশ হইতে হাইজ্যাক করিয়া লাঞ্ছিত করার পর অর্ধচেতন অবস্থায় হাসপাতালে লইয়া যাওযা হইয়াছে – সামগ্রিক অবস্থাদৃষ্টে বারবার সকলের মনকে নাড়া দিয়াছে একটিমাত্র প্রশ্ন – আইন, শৃংখলা, সভ্যতা, শালীনতা যেখানে এক শ্রেণীর উচ্ছৃঙ্খল তরুণের মুঠির মধ্যে, যেখানে শহীদ মিনারের পবিত্র পাদপীঠে স্মৃতি তর্পণের পরিবর্তে নোংরামি চলে সেখানে শহীদ দিবস পালনের সার্থকতা কোথায়? এই দিনের পবিত্রময়তাকে এক শ্রেণীর পশুর কুরুচিসম্পন্ন রসনার অনলে নিক্ষিপ্ত হইতে দিয়া ‘মহান একুশে’ কে অপমানিত করার মধ্যে কি যৌক্তিকতা থাকিতে পারে?

বিশে ফেব্রুয়ারি সন্ধ্যার পর হইতেই শহীদ মিনারে ভিড় জমিতে শুরু করে – কিন্তু অন্যান্য বারের মত এবার শহীদ মিনারের শৃঙ্খলা রক্ষার দায়িত্ব কোন প্রতিষ্ঠানের পক্ষ হইতেই লওয়া হয় নাই। ফলে রাত্রি ১১টার পর হইতে সেখানে অসংখ্য নারী-পুরুষের মধ্যে এক শ্রেণীর সুযোগ-সন্ধানীও সমবেত হইতে থাকে। গতবারের মত এবার শহীদ মিনারে আলোর ব্যবস্থা করা হয় নাই। অন্ধকারের সুযোগ লইয়া এই সুযোগ সন্ধানীর দল যথেচ্ছ কান্ড করিয়াছে। ঢাকা নগর আওয়ামী লীগ মহিলা শাখার মিছিলটি যখন মধ্যরাত্রিতে শহীদ মিনারে পুষ্পমাল্য অর্পণ করিতেছিলেন তখন মিনারের বাঁ পাশের কোণায় উচ্ছৃংখল যুবকদের হাতে তরুণী লাঞ্ছিতা হন। সবচাইতে জঘণ্য ঘটনা ঘটে ভোর চারটা হইতে সাড়ে চারটার মধ্যে। এই সময় বিভিন্ন স্থান হইতে অনেক প্রভাতফেরী শহীদ মিনারে আসিয়া উপস্থিত হয়। পুষ্পমাল্য অর্পণের ক্ষেত্রে অন্যান্যবারের মত এবার মহিলা ও পুরুষদের জন্য কোন পৃথক ব্যবস্থা না থাকায় দেখা যায় যে, উচ্ছৃংখল সুযোগ-সন্ধানীরা এক বিশেষ কায়দায় কয়েকটি মেয়েকে দল হইতে বিচ্ছিন্ন করিয়া ঘিরিয়া শহীদ মিনারের পাদদেশে আনিয়া ফেলিয়াছে। তাহাদের আচরণ এমন এক পর্যায়ে চলিয়া যায় যে, অনেক কিশোরী ও তরুণীর পরিধানের বস্ত্র পর্যন্ত ছিন্ন-ভিন্ন হইয়া যায়। শহীদ মিনারে যে সামান্য প্রদীপসদৃশ আলোর ব্যবস্থা ছিল ভেসপাযোগে কয়েকজন তরুণের উপস্থিতির মাত্র কয়েক মিনিট পরেই অজ্ঞাতকারণে সেগুলি নিভিয়া যায় এবং তখনই এই লংকাকান্ডের সূচনা হয়। শহীদ মিনারের পাদদেশে নারিন্দা হইতে আগতা জনৈকা কিশোরীকে অচৈতন্য অবস্থায় বাড়িতে পাঠাইয়া দেওয়া হয়।

১৭ বৎসর বয়স্কা ও ২২ বৎসর বয়স্কা দুইটি তরুণীও এই সময় নিখোঁজ হয়। তাহাদিগকে নিগৃহীতা ও অচৈতন্য অবস্থায় হাসপাতালে লইয়া যাওয়া হয় এবং পরে তাহাদিগকে প্রাথমিক চিকিৎসা করাইয়া হাসপাতাল হইতে লইয়া যাওয়া হয় বলিয়া নির্ভরযোগ্য সূত্রে জানা গিয়াছে।

জাতির জনক প্রধানমন্ত্রী বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান যখন পুষ্পমাল্য অর্পণের জন্য শহীদ মিনারে আসেন তখনও উচ্ছৃংখল ব্যক্তিদের তৎপরতা দেখা যায়। ধাক্কাধাক্কির ফলে বঙ্গবন্ধুর নিরাপত্তা পর্যন্ত বিপদাপন্ন হইয়া পড়ে।

শহীদ মিনারের পবিত্রতা রক্ষার দায়িত্ব কাহার? সরকারের এ ব্যাপারে অবশ্যই একটি মুখ্য ভূমিকা পালন করার রহিয়াছে। পৃথিবীর অন্যান্য সভ্য দেশে যেখানে স্মৃতিস্তম্ভের পবিত্র বেদী রহিয়াছে, সর্বত্রই তা সংরক্ষণ করার দায়িত্ব সরকারের উপর ন্যস্ত।

লেনিন, কামাল আতাতুর্ক প্রমুখের পবিত্র দেহ যেখানে সমাহিত, সেখানে প্রতিদিনই দর্শক সমাগম হইতেছে। পরিপূর্ণ সরকারি দায়িত্বে ও সামরিক নিয়ন্ত্রণে সেখানকার শৃঙ্খলা রক্ষা করা হয়। জাপানের হিরোসিমাতেও একইভাবে স্মৃতি সৌধের পবিত্রতা রক্ষা করা হয়। অথচ আমাদের দেশে এ ব্যাপারে কর্তৃপক্ষের অনীহা কেন?

অনেকে মনে করেন শহীদ মিনারের সমস্ত এলাকাটিকে সামরিক নিয়ন্ত্রণে আনিয়া সোহরাওয়ার্দী উদ্যানে শ্রদ্ধা নিবেদনকারীদের সমাবেশ এবং সেখান হইতে সুশৃংখল লাইন করিয়া শহীদ মিনারে শ্রদ্ধা নিবেদনের ব্যবস্থা করার মাধ্যমেও শহীদ বেদীর পবিত্রতা রক্ষা করা যাইতে পারে। সোহরাওয়ার্দী উদ্যানে সমাবেশের ক্ষেত্রেও যাহাতে কোন অপ্রীতিকর ঘটনা না ঘটে সেজন্য সতর্ক পরিকল্পনা গ্রহণের প্রয়োজন বলিয়া অনেকে মনে করেন।

পবিত্র শহীদ মিনারের আশেপাশে গাঁজার আসর বসিয়াছিল একুশে ফেব্রুয়ারিতে। গঞ্জিকা সেবনকারীদের সকলেই তরুণ বয়সের। শহীদ দিবসকে যতরকমভাবে অপমানিত ও অপবিত্র করা যায় তাহার চেষ্টা হইয়াছে। উচ্ছৃংখল নৃত্যে গাঁজার আসর জমাইয়া তুলিয়া ‘দম মারো দম’ ফিল্মী গানে উচ্ছৃংখলতার চরম পরাকাষ্ঠা দেখান হইয়াছে॥”

 – দৈনিক ইত্তেফাক / ২৩শে ফেব্রুয়ারি, ১৯৭৩

তথ্যসূত্র : ড: সাঈদ-উর রহমান / ১৯৭২-১৯৭৫ : কয়েকটি দলিল ॥ [ নয়ন প্রকাশন – জুন, ২০০৪ । পৃ: ২২৩-২২৪ ]

 

 

 

 

২ thoughts on “৭৩ সালের একুশে ফেব্রুয়ারি”
  1. এটাই স্বাভাবিক। যুদ্ধ করে যে জাতী স্বাধীন হয়নি, পরের দয়া আর কুটচালে যাহা এলো তাহার আরেক নাম গাঞ্জার আসর দিলে ভুল কি !! আওয়ামী মহলের লোকেরা এখানে বারোমাসই গাঞ্জা খায়। আমি এইখানেই পড়াশোনা করেছি বহু বছর। অর্ধযুগ তো হবেই।

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *