এই সরকার থেকে তাড়াতাড়ি চলে যেতে হবে

এই সরকার থেকে তাড়াতাড়ি চলে যেতে হবে

একদিকে দেশে  বৈজ্ঞানিক সমাজতন্ত্র কায়েমের প্রতিশ্রুতি  আর অন্যদিকে যুদ্ধবিধ্বস্ত এই দেশে  চরশ গণদারিদ্র্য ও অবর্ণনীয় কষ্টের মধ্যে এলিটদের বিলাসিতা বেড়েই চলেছে, শাসক পার্টির  সদস্যদের নানারকম দুর্নীতির কথা মানুষ খোলাখুলি আলোচনা করে চলেছে, সংবাদপত্রেও এ-সন্মদ্ধে প্রচুর লেখালেখি চলছে। জাতীয়কৃত শিল্পগুলির অধিকাংশে আওয়ামী লীগের কর্মী ও সহচরদের উঁচুপদে আসিন করা হয়,যারা এই গুরুদায়িত্ব নিষ্ঠার সঙ্গে পালনের চাইতে লুণ্ঠন ও চোরাকারবারীতে বেশী মনোনিবেশ করে বলে ব্যাপক অভিযোগ শোনা যেতে থাকে। এও স্পষ্ট বোঝা যাচ্ছিল যে এরকম প্রশ্নে শেখ মুজিব তাঁর দলের সহচরদের কাছে মানসিকভাবে দুর্বল ছিলেন।একবার তাঁর অফিসে তাঁকে আমার সামনেই তাঁর কোনো এক বন্ধু  যাঁর নাম আজকে আমার মনে নাই,পার্টির দুর্নীতির কথা বলেন এবং তাঁর এ ব্যাপারে  কিছু করা প্রয়োজন একথাও বলেন। শেখ মুজিব একটু চুপ করে টেবিলের ওপর দৃষ্টি নিবদ্ধ রেখে আস্তে-আস্তে বলেন, “ওঁরা অনেক সাফার করেছে।“ আশা করি এই কথাটির অতল অতল গভীরতা আলোচনা করবার প্রয়োজন নেই। আমি নিজে বুঝতে পারি  যে কোনো আশা নেই, এবং তখনি মনে মনে সিদ্ধান্ত নেই  যে, এই সরকার থেকে যত তাড়াতাড়ি সম্ভব দূরে চলে যেতে হবে।

 — মো: আনিসুর রহমান (অর্থনীতিবিদ) / পথে যা পেয়েছি দ্বিতীয় খন্ড ॥ [ অ্যাডর্ন পাবলিকেশন – দ্বিতীয় মুদ্রন ফেব্রুয়ারী , ২০১৮ । পৃ: ৩৩ ] 

কাকে আগে পূর্নবাসন করা?

এরকম সময় এপ্রিলের দ্বিতীয় সপ্তাহে ঢাকা টেলিভিশনের ডিরেক্টর্-জেনারেলের কাছ থেকে একটি আবেদন এলো। যুদ্ধের আগে টেলিভিশন সেন্টারের জন্য বেশ কিছু নতুন যন্ত্রপাতি আদানি করা হয়েছিল,কিন্তু যুদ্ধের জন্য সেগুলো ইনস্টল করা হয়নি,এখন তাড়াতাড়ি সেগুলি ইনস্টল না করলে সেগুলি নষ্ট হয়ে  যাবে।এরজন্য প্ল্যানিং কমিশনের কাছে সোয়া লাখ টাকার মতো অনুমোদনের অনুরোধ। ফাইলটি আমার কাছে এলো। আমি এই মর্মে লিখে দিলাম, যুদ্ধবিধ্বস্ত দেশে ঢাকা শহরের বিশ হাজারের মতো পরিবারের নৈশ বিরোদনের জন্য এত টাকা সরকারী খাজাঞ্চী থেকে দেওয়া যাবে না। এই টাকার যদি একান্তই প্রয়োজন হয় তাহলে টিভি দর্শকরা যারা এই ব্যয় থেকে লাভবান হবেন তাদের কাছ থেকেই এই টাকা তুলে নেওয়া হোক।“

এই নোট পেয়ে ১৩.০৪.৭২ তারিখে টেলিভিশনের ডিরেক্টক জেনারেল জামিল চৌধুরী আমার অফিসে ছুটে এলেন।বল্লেন, আনিস এই টাকাটা না দিলে  যে যন্ত্রগুলি পচে যাবে।“ আমি বল্লাম দেশেরমানুষ গুলো যে পচে যাচ্ছে, কাকে  আগে রিহ্যাবিরিটেট করবো?” কিছুক্ষণ জামিলের পীড়াপীড়ির পর আমি বল্লাম, এ টাকা তো আমার নিজের নয়, দেশের এবং আমাকে এ খরচের জন্য দেশের কাছে জবাব দিতে হবে। আমাকে এটা ডিফেন্ড করার জন্যে তো  একটা ভালো যুক্তি দিতে হবে। যদি টেলিভিশনের প্রোগ্রাম শুধু বিনোদনের জন্য না করে  দেশের পুর্নবাসন প্রোগ্রামের সঙ্গে যুক্ত করপা যায় তাহলে আমি এই খরচটা ডিফেন্ড করতে পারি।“ জামিল নিজে অত্যন্ত দেশপ্রেমিক, মুক্তিযুদ্ধের জন্য তিনি অনেক বিপদের ঝুঁকী নিয়ে অনেক কাজ করেছেন।। তিনি সঙ্গে সঙ্গে রাজী হলেন টেলিভিশনের প্রোগ্রাম আমূল সংস্কার করে তাকে “গণমুখী” করতে  যে প্রোগ্রামে গণশিক্ষা, পূর্নবার্সন, উৎপাদন ও দেশ পূনর্গঠনের জন্য আলোচনা-পরামর্শ-তথ্যাদি ইত্যাদি থাকবে, এবং আমাকে অনুরোধ করলেন এ ব্যাপারে পরামর্শ দেবার জন্য পরিকল্পনা কমিশনের উদ্যোগে একটা কমিটি করে দিতে।

জাতীয়কৃত শিল্পগুলির অধিকাংশে আওয়ামী লীগের কর্মী ও সহচরদের উঁচুপদে আসিন করা হয়,যারা এই গুরুদায়িত্ব নিষ্ঠার সঙ্গে পালনের চাইতে লুণ্ঠন ও চোরাকারবারীতে বেশী মনোনিবেশ করে বলে ব্যাপক অভিযোগ শোনা যেতে থাকে। এও স্পষ্ট বোঝা যাচ্ছিল যে এরকম প্রশ্নে শেখ মুজিব তাঁর দলের সহচরদের কাছে মানসিকভাবে দুর্বল ছিলেন।একবার তাঁর অফিসে তাঁকে আমার সামনেই তাঁর কোনো এক বন্ধু  যাঁর নাম আজকে আমার মনে নাই,পার্টির দুর্নীতির কথা বলেন এবং তাঁর এ ব্যাপারে  কিছু করা প্রয়োজন একথাও বলেন। শেখ মুজিব একটু চুপ করে টেবিলের ওপর দৃষ্টি নিবদ্ধ রেখে আস্তে-আস্তে বলেন, “ওঁরা অনেক সাফার করেছে।“ আশা করি এই কথাটির অতল অতল গভীরতা আলোচনা করবার প্রয়োজন নেই। আমি নিজে বুঝতে পারি  যে কোনো আশা নেই, এবং তখনি মনে মনে সিদ্ধান্ত নেই  যে, এই সরকার থেকে যত তাড়াতাড়ি সম্ভব দূরে চলে যেতে হবে।

আমি এই প্রশ্নটা প্ল্যানিং কমিশনে আমার কলিগদের কাছে নিয়ে গেলাম এবং সকলেই এটাকে খুব উত্তম প্রস্তাব বলে রাজী হলেন। আমরা তখন প্ল্যানিং সেক্রেটারী ড. গোলাম রাব্বানীকে ডেকে এরকম একটি কমিটি কিভাবে করা যায় জিজ্ঝেস করলাম। ড.রাব্বানী বল্লেন যে  ডেপুটি চেয়ারম্যানের অথরিটিতে প্ল্যানিং কমিশন এরকম একটি কমিটি করতে পারে, এবং ডেপুটি চেয়ারম্যানের কেবিনেট মন্ত্রীর মর্যাদা বলে  এরকম কমিটি প্রেসিডেন্টের নামে ঘোষিত হবে। আমরা তৎকালীন জাহাঙ্গির নগর বিশ্ববিদ্যালয়ের উপাচার্য অধ্যাপক কৈয়দ আরী আহসানকে চেয়ারম্যান করে আমাকে এবং দু’জন মুক্তিযোদ্ধা ডেপুটি সেক্রেটারীকে সদস্য করে কমিটিটা গঠন করলাম এবং ড. রাব্বানীকে বল্লাম, এটা যথারীতি ঘোষণা করে কমিটির কাজের জন্য  প্রশাসনিক ব্যবস্থা করতে।

পরের দিন ২২শে এপ্রিল বিভিন্ন সংবাদপত্রে খবর বেরুল যে, প্রেসিডেন্টের অর্ডারে  টেলিভিশনকে গণমুখী করবার উদ্দেশ্যে পরিকল্পনা কমিশনকে পরামর্শ দেবার জন্য একটি কমিট গঠন করা হয়েছে। 

সেদিন শনিবার। ইউক-এন্ডের আগের দিন সন্ধ্যা ছযটার দিকে কাজের শেষে আমরা পরিকল্পনা কমিশনের সদস্যরা ডেপুটি চেয়ারম্যানের ঘরে আড্ডা দিতে জমায়েত হয়েছি, এমন সময় ডেপুটি চেয়ারম্যানের কাছে প্রধানমন্ত্রীর কাছ থেকে টেলিফোন এলো। প্রধানমন্ত্রীর ভারী গলা আমি পাসে বসেই শুনতে পাচ্ছিলাম।

“ডাক্তার সাহেব,আপনারা পরিকল্পনা কমিশনে খুব বাড়াবাড়ি করছেন। টেলিভিশনের ওপর  কমিটি করতে  আপনাদের কে অধিকার দিয়েছে? আমি এর রিটেন এক্সপ্লানেশন চাই”।

ডেপুটি চেয়ারম্যান মনে হল একটু ঘাবড়ে গেলেন। বল্লেন, “স্যার এক মিনিট” বলে টেরিফোনে একটা হাত চাপা দিয়ে  আমার দিকে ফিরে বল্লেন, “আনিস, প্রধানমন্ত্রী  আমাদের কমিটি করার ওপরে রিটন এক্সপ্লানেশন চাচ্ছেন, কী বলব?” আমি বল্লাম এতে তো কোন সমস্যা নাই- আজকে তো শনিবার,কাল ছুটি,আপনি বলেন যে সোমবার সকালে আমরা তাঁর কাছে গিয়ে রিটন এক্সপ্লানেশন দিয়ে আসব।“ ডেপুটি চেয়ারম্যান প্রধানমন্ত্রীকে তাই বল্লেন। প্রধানমন্ত্রীর  ভারী গলা আবার শুনতে পেলাম: হ্যাঁ , আমি রিটন এক্সপ্লানেশন চাই”।

রবিবার ২৩ এপ্রিল সকালে দেশের সব সংবাদপত্রে খবর বেরুল: টেরিভিশন গণমুখী করবার জন্য পরিকল্পনা কমিশন দ্বারা গীঠত কমিটির কোনো বৈধতা নেই, এবং প্রধানমর্ত্রীর অর্ডারে এই কমিটি বাতিল করা হয়েছে।

এই পরিকল্পনা  কমিশনের ওপর শেখ মুজিবের ভয়নাক আস্থা- অনেকেরই তখন এই ধারনা ছিল, আজো অনেকের আছে।

 আমাদের এখন হাস্যকর অবস্থা,প্রধানমন্ত্রীর সাধের পরিকল্পনা কমিশনের একটি পদক্ষেপ, প্রধানমন্ত্রী পাবলিকলি নাকচ করে দিয়েছেন। তাছাড়া পরিকল্পনা কমিশন তো সরকারেই অবিচ্ছেদ্য অঙ্গ। সেই সরকারের শধ্যে এরকম অর্ন্তদন্দ্ব সরকারের ভাবমুর্থীকেই দুর্বল করে,  দেশের তখনকার-অবস্থায় যখন মানুষ সরকারের কাছ থেকে দৃঢ় সম্মুখ পদক্ষেপ আশা করে। আমার নিজের দৃষ্টিতে  আমাদের কাছে রিটন এক্সপ্লানেশন চেয়ে  আমরা পরের অফিস দিনে  সকালেই এই এক্সপ্লানেশন দেব এই আশ্বাস পাবার  ও তা গ্রহন করবার পরও তার জন্য অপেক্ষা না করে পরিকল্পনা কমিশনকে  প্রকাশ্যে এরকম হাস্যকর অবস্থায় ফেলে প্রধানমন্ত্রী ও পরিকল্পনা কমিশনের মধ্যে অহেতুক দন্দ্বের ইঙ্গিত দিয়ে কমিটিটা বাতিল করে দেওয়া অত্যন্ত অশোভন ও অগ্রহনযোগ্য মনে হলো। আমি লম্বা এক পদত্যাগপত্র  লিখে তাতে জাতীয় স্বার্থে কেন এই কমিটিটা  করা হয়েছিল তা ব্যাখা করে, তারপর সমস্ত ঘটনা ও উদ্ভুত পরিস্থিতির জন্য আমিই দায়ী  কারণ আমিই কমিটিটা ইনিসিয়েট করেছিলাম একথা লিখে  আমার পদত্যপত্র  প্রথমে পরিকল্পনা কমিশনের  মেম্বার ওয়ানের কাছে নিয়ে গেলাম। মেম্বার ওয়ান আমাকে নিয়ে গেলেন ডেপুটি চেয়ারম্যানের কাছে। ডেপুটি চেয়ারম্যান আমাদের সকলকে-মেম্বার টুকেও ডাকিয়ে নিয়ে গেলেন প্ল্যানিং মিনিষ্টার তাজউদ্দীনের  কাছে। তাজউদ্দীন সব শুনে বল্লেন, সত্যিই তো প্রধানমন্ত্রীর এভাবে কমিটি বাতিল করে দেয়া ঠিক হয়নি। এবং বল্লেন “ চলেন আমরা সবাই মিলে প্রধানমন্ত্রীর কাছে যাই”। আমরা সবাই এক সঙ্গে গেলাম প্রধানমন্ত্রীর কাছে।

আমি প্রধানমন্ত্রীর অফিসে ঢুকেই তাঁকে বল্লাম, “ আমি পদত্যগ করতে এসেছি”। প্রধানমন্ত্রী চমকে ওঠে বল্লেন, “ কেন কী হল?”

আমি তখন একরকম মরিয়া হয়ে গেছি, কাকে কী বলচি সেই জ্ঞান নেই। প্রায় আধঘন্টা ধরে আমি আমার মনের সমস্ত ঝাল ঝাড়লাম। যা বল্লাম তার সারাংশ এই:

“ শেখ সাহেব আপনি আমাদের সঙ্গে দেখা হলেই বলেন, সোসালিজম-এর প্ল্যান করে দিতে। আপনাকে বলেছি  খালি প্ল্যান করলে হয় না, সোসালিজম-এর প্ল্যান ইমপ্লিমেন্ট করতে আপনার গুরুত্বপূর্ন মন্ত্রাণালয়গুলির  চার্জে সোসালিষ্ট প্রয়োজন। আপনি আমার কাছে নাম চেয়েছেন, আমি কিছু নামও আপনাকে দিয়েছি, সে প্রস্তাবও আপনি গ্রহন করেন নি। আমি নিজে আপনাকে দেশ গড়বার জন্য প্রথম পদক্ষেপ হিসেবে জাথীয় কৃচ্ছসাধন আহবান করবার প্রস্তাব দিয়েছি, সে প্রস্তাবও  আপনি গ্রহন করেন নি। এদিকে, আমাদের প্ল্যানিং কমিশনে উঁচু পদমর্যাদা দিয়ে বসানোতে ব্যুরোক্রেসীর অনেকেই ক্ষুব্ধ একথা সবাই জানে, এবং তারা নিশ্চই আমাদের বিরুদ্ধে আপনার কানে ক্রমাগত বিষোদগার করে গেছে। এই বিষোদগার এমন এক পর্যায়ে  চলে এসেছে যে, পরশু শনিবার সন্ধ্যাঢ আপনি ডেপুটি চেয়ারম্যানকে টেলিফোন করে তাঁর সঙ্গে এই প্রথম রুঢ়ভাবে কথা বলেছেন। আমাদের সঙ্গে আপনার তো রুঢ়ভাবে কথা বলবার সম্পর্ক নয়। আমরা তো আপনার অফিসার নই। আমরা আপনার অনুরোধে বন্ধু হিসেবে আপনাকে সাহায্য করবার জন্য প্ল্যানিং কমিশনে এসেছি আমাদের ইউনিভার্সির্টির চাকরী ছেড়ে যেখানে আমরা এখানকার চেয়ে বেতনও বেশী পাচ্ছিলাম। যে কোন সময়  আপনার মনে হলে আমরা আপনার তেমন কাজে লাগছিনা, আমাদের বল্লেই আমরা আনন্দে ইউনিভার্সিটি ফিরে যাবো, এর জন্য আমাদের মঙ্গে আপনার রুঢ় ব্যবহার করবার কোনো প্রয়োজন নেই। এখ যে অবস্থায় আমরা এসেছি, আমি ডেপুটি চেয়ারম্যানের কথা জানিনা, তার সিদ্ধান্ত তিনি নেবেন, তবে আমার মনে হয় আপনার সঙ্গে আমার বন্ধু-সম্পর্ক থাকতে- থাকতেই আমার ইউনিভার্সিটি  ফিরে যাওয়া উচিৎ এই সম্পর্ক খারাপ হবার আগে। তাই আপনি অনুমতি দিলে আমি আমার পদত্যাগপত্র পড়ি।“

আমি যখন  এই কথাগুলি বলছিলাম তখন লক্ষ করছিলাম যে তাঁর চেহারা শক্ত হয়ে যাচ্ছে- আমার মনে হচ্ছিল যেন  ড. জেকিল ‘ মি. হাইডে রুপান্তরিত হয়ে যাচ্ছেন। আমার একটু একটু ভয়ও করছিল কিন্তু তখন আমি মরিয়া হয়ে আমার মধ্যকার পুঞ্জিভূত ক্ষোভ ঝেড়ে চলেছি,আমি তখন স্বাভাবিক মানুষ নই। যখন আমার ক্ষোভ ঝাড়া শেষ হল এবং আমি আমার পদত্যাপত্র খুলে পড়তে গেলাম তখন তাজউদ্দীন তাঁর চেয়ার থেকে উঠে এসে খপ করে আমার হাত থেকে  আমার পদত্যাগপত্রটা কেড়ে নিয়ে বল্লেন, “আমি পড়ি!” তিনি কেন আমার পদত্যাগপত্র পড়বেন যেটা  আমি প্রধানমন্ত্রীকে দিতে এসেছি তা বুঝলাম না,আজো বুঝি নাই, যদিও এই প্রশ্নের উত্তরে একটা অনুসিদ্ধান্ত আমার আছে যা পাঠকদের বলব না! কিন্তু যে কারনেই হোক পরিকল্পনা মন্ত্রী নিজে আমার পদত্যাপত্র আমার হয়ে সবার সামনে পড়লেন।“

— মো: আনিসুর রহমান (অর্থনীতিবিদ) / পথে যা পেয়েছি দ্বিতীয় খন্ড ॥ [ অ্যাডর্ন পাবলিকেশন – দ্বিতীয় মুদ্রন ফেব্রুয়ারী , ২০১৮ । পৃ: ৩৮-৪১ ] 

০২.

“… পাঁচটার দিকে আমরা বরাইত গ্রামের দিকে রওয়ানা দিলাম। আমাদের সঙ্গে ছিলেন রােজ বু (সিধু ভাইয়ের স্ত্রী), মাক্কী আপা ও তাঁর স্বামী আফতাব হােসেন, জামিল চৌধুরী ও তাঁর স্ত্রী। রােজ বু আমাদের নিয়ে যাচ্ছিলেন তার মামার বাসায়। পথে দেখা রেহমান সােবহানের সঙ্গে – তাকেও সিধু ভাই (মোখলেসুর রহমান) কালেক্ট করেছেন যেমন আরো অনেক, অনেককে করেছেন – বুদ্ধিজীবী, শিক্ষক, সাংবাদিক, ডাক্তার, বিভিন্ন পেশাজীবী যাদের মিলিটারী খুঁজতে পারে। রেহমানের নাম বদলে হয়েছে “দীন মােহাম্মদ”। আমিও নাম বদলে “আবদুর রশিদ” হয়ে গেলাম। বরাইতে সিধু ভাইয়ের মামা-শ্বশুরের বাসাটা পাকা। সেখানে এর মধ্যে অনেক লােক এসে আশ্রয় নিয়েছে। “দীন মােহাম্মদের” কাছে শুনলাম যে আগের রাতে মিলিটারী তার খোঁজে এসেছিল। প্রথম দুই রাত সে তার বাসাতেই ছিল, সৌভাগ্যবশত তখন আসেনি। তৃতীয় রাতে সে সরে পড়ে এবং গুলশানেই এক বন্ধুর বাসায় রাত কাটায়। ওকে না পেয়ে সেনারা ওর স্ত্রী সালমাকে হােস্টেজ হিসাবে ক্যান্টনমেন্টে নিয়ে যেতে চায়। পাশের বাড়িতে পশ্চিম পাকিস্তানী প্রতিবেশী ছিল, তারা বেরিয়ে এসে বাধা দেয় এবং সেনাদের প্রতিশ্রুতি দেয় যে ওরা সালমার দিকে নজর রাখবে যাতে ও কোথাও চলে না যায়, এবং মিলিটারী যে কোন সময় এসে ওকে জিজ্ঞাসাবাদ করতে পারে। 

ভাের চারটার সময় আমাদের গাইডরা এল। আমরা লুঙ্গী আর শার্ট পরা ছিলাম। হেড গাইড আমাদের তিনজনের আপাদ-মস্তকে চোখ বুলিয়ে বললাে আমাদের দু’জনকে নিয়ে তার কোন চিন্তা নেই, কিন্তু “দীন মােহাম্মদকে” নিয়ে সে নিশ্চিন্ত নয় তার ‘মেড়ো’ চেহারার জন্য! আমাদেরও তার জন্য চিন্তা ছিল – সেতাে বাংলাটাও ভালাে জানতাে না। যাই হােক আমরা বন্ধুদের কাছে বিদায় নিলাম, আমি ডােরার কাছ থেকে, তারপর রওয়ানা দিলাম। 

মাইল চারেক হেঁটে তারপর ফেরী করে একটা নদী পাড়ি, তারপর আরাে কয়েক মাইল হাঁটা, তারপর একটা নৌকোয় করে ন’টার দিকে নরসিংদী পৌছালাম। আরাে হাজার হাজার লােক ওই পথে পালাচ্ছে। পথে একটা চায়ের দোকানে নাস্তা খেয়ে একটা বাসে। কিছুদূর, তারপর রিকশা করে বেলা বারােটার দিকে একটা লঞ্চঘাটে। গিজ গিজ করা মানুষ লঞ্চের জন্য অপেক্ষা করছে। অনেকের মতাে আমরাও একটা নৌকো ভাড়া করে মাইলখানেক এগিয়ে গেলাম লঞ্চ ধরবার জন্য। 

দুটোর দিকে দূর থেকে যখন লঞ্চ দেখা গেল নিজের চোখকে বিশ্বাস করতে পারলাম – বাংলাদেশের পতাকা সামনে নিয়ে লঞ্চ আসছে ! রেলিং টপকে বুনাে মানুষের মতাে গুতাগুতি করে লঞ্চে উঠতে হলাে, নৌকার পর নৌকায় করে যাত্রীরা লঞ্চে উঠবার চেষ্টায় নৌকায় নৌকায় ঠোকাঠুকি, পুরুষ-মেয়ে-শিশুর ঠেলাঠেলি ধ্বস্তাধ্বস্তি। কোন রকমে ম্যানেজ করলাম তাগুতিতে হাতের ঘড়িটা হারিয়ে। 

আমরা তিনজন লঞ্চের ডেকের মেঝেয় বসে ছিলাম। দেখলাম আশেপাশে ও সামনের লােকরা কেমন যেন সন্দিহানভরে আমাদের দেখছে, বিশেষ করে “দীন মােহাম্মদের” দিকে। কেউ কেউ ওর সঙ্গে কথা বলবারও চেষ্টা করছে : আপনি কোথেকে আসছেন, ঢাকার কোন অঞ্চল থেকে, সেখানে কী ঘটেছে, ইত্যাদি। সামনে রেলিং-এর গায়ে ঠেস দিয়ে আমাদের দিকে ফিরে দাঁড়ানাে একজনের হাতে একটা ট্রানজিস্টার রেডিও ছিল, সেটা মনে হল কোন স্বাধীন বাংলা বেতার কেন্দ্র খুলে রেখেছে – তাতে সাবধান করে দিচ্ছে যে পশ্চিম পাকিস্তানী কমান্ডােরা বাঙালির ছদ্মবেশে ঘুরে বেড়াচ্ছে, বলছে যে কেউ শুদ্ধ বাংলা বল্তে না পারলে তাকে সঙ্গে সঙ্গে ধরে যথাযথ ব্যবস্থা করতে! এদিকে “দীন মােহাম্মদের” বাংলাতাে তাকে ধরিয়ে দিচ্ছে! তার কাছে সবাই যে সব প্রশ্ন করছিল আমিই সেগুলির উত্তর দিতে শুরু করলাম এবং কিছু পরে তার সঙ্গে জায়গা বদলে তাকে কিনারে বসিয়ে দিলাম। বােকা আমি – এতে যেকোন কাজ হবে না উল্টে আমার উপরেও সবার সন্দেহ পড়বে সেই বুদ্ধিটুকু হয়নি! সামনের রেডিওটাতে একথাও বলছিল যে পাকিস্তানী কোলাবরেটরদের সঙ্গে ট্রান্সমিটার সেট থাকবে, আর আমার কাঁধের ঝােলা থেকে আমার ট্রানজিস্টর সেটটা উঁকি মারছিল যেটাকে ট্রান্সমিটার সেট বলে ভুল তাে হতেই পারে – লােকে সেটার দিকেও বেশ সন্দেহের চোখে তাকাচ্ছিল ! পরে আমরা জানতে পারি যে কয়েকজন লােক নরসিংদী থেকেই আমাদের সন্দেহ করে ফলাে করছিল; আরাে জানতে পারি যে ওই অঞ্চলে এর আগে দুইজন প্যারাট্রুপারকে ধরে মেরে ফেলা হয়েছে ! 

লঞ্চ একটা ঘাটে এসে থামলাে – মরিচাকান্দি গ্রামে। কেউ একজন আমার ঝােলাটা ধরে টান দিল এবং আমাকে বল্লাে ওখানে নামতে। আমি বললাম এটা আমার ঘাট নয়। তখন লােকটা আমাকে হেঁচড়ে টেনে ওঠালাে, আর শুরু হল আমার উপর এলােপাথাড়ি কিল-চড়-ঘুষি। মুহূর্তের মধ্যে আমার একদিকের চোয়াল ফুলে ঢােল হয়ে গেল। আমি চেঁচিয়ে বললাম যে তারা ভুল করছে, আমি একজন সত্যিকারের বাঙালি, কিন্তু কে শােনে কার কথা। “দীন মােহম্মদ”কেও একইভাবে উঠিয়ে মারছে। ওরা আমার ঝােলা ও চোখের চশমা নিয়ে নিল, কেউ একজন আমার শার্টটা টান দিয়ে তার পকেট থেকে মানি ব্যাগটা আর একটা এনভেলপ যাতে আরাে কিছু টাকা ছিল সেগুলি নিয়ে নিল, টানাটানিতে পকেটটা ছিঁড়ে দিল, পরে আমার শার্ট ও গেঞ্জীও একেবারে ছিঁড়ে গেল। কেউ একজন আমার লুঙ্গী ধরেও টান দিল কিন্তু সৌভাগ্যবশত সেটা ভালাে করে ধরতে পারলাে না এবং আমার আন্ডারওয়ারের পকেটে যে কিছু টাকা ছিল তার নাগাল পেল না। 

আমাকে যখন টেনে তুলে মারতে শুরু করে তখন আমি আমার সত্যিকারের নাম চেঁচিয়ে বলি এবং বলি যে আমি ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের অধ্যাপক। এদিকে “মােখলেস”কে সে আমাদের সঙ্গে থাকলেও কেউ সন্দেহ করে নি সে এতক্ষণ চুপচাপ বসে ছিল বলে। আমাদের মারতে দেখে সে উঠে চেঁচাতে থাকে লঞ্চে কোন ছাত্র আছে নাকি এই বলে। তখন ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের দু’জন ছাত্র এগিয়ে এসে বলে যে তারা ছাত্র, কী হয়েছে? “মােখলেস” তাদের আমাদের আসল পরিচয় দেয় এবং বলে যে “এঁদের ভুল করে মারছে, এদের বাঁচাও”। ছাত্রদুটি ছুটে এসে আমাকে ও “দীন মােহাম্মদকে” এক একজন হাত দিয়ে কর্ডন করে আগলে ফ্যালে। এই প্রক্রিয়ায় তারা নিজেরাও আমাদের উদ্দেশ্যে ছোড়া কিছু কিল-চড়-ঘুষি হজম করে। তারপর তারা আমাদের আগলিয়ে বলে যে আমাদের ওখানেই নেমে স্থানীয় সংগ্রাম কমিটি অফিসে যেতে হবে আমাদের সনাক্ত করবার জন্য। ছাত্রদুটি আমাদের কর্ডন করে মারমুখী জনতার হাত থেকে বাঁচিয়ে পাড়ে নামতে সাহায্য করে। নিচে এর মধ্যে খবরটা ছড়িয়ে গিয়েছিল এবং শত শত গ্রামবাসী তখন পাড়ে, আর কয়েকজনের হাতে একেবারে বল্লম! পরে আমরা জানতে পারি যে আগের দিনই গ্রামবাসীরা দুজন লােককে কোলাবরেটর সন্দেহ করে জ্যান্ত পুঁতে ফেলেছে! বেশ কষ্টে ছাত্র দুজন গ্রামবাসীদের রাজী করায় আমাদের সনাক্তকরণের জন্য সংগ্রাম কমিটির অফিসে যেতে দিতে। সেই অফিসে গিয়ে আমাদের তারা ভেতরে নিয়ে যায়, আর মারমুখী জনতা বাইরে অপেক্ষা করতে থাকে। ছাত্রদুজন তখন আমাদের বলে আমাদের পরিচয় প্রমাণ করতে। “দীন মােহাম্মদ” এর পাসপাের্টটা তার সঙ্গের ব্যাগে ছিল, কিন্তু সেটা তাকে মারবার সময় কেউ ছিনিয়ে নিয়েছিল বলে আর পাওয়া গেল না। আমার সংেগ আমার পাসপাের্ট ছিল না। ছাত্রদুটি ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের কয়েকজন শিক্ষকের নাম বলে জিজ্ঞেস করলাে আমরা তাদের চিনি কিনা। কিন্তু তাদের কাউকে আমি চিনতাম না, আর আমিও তাে কয়েক মাসই হলাে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে ফিরেছি। 

তাই এভাবে কোন সুবিধা হলাে না। একজন ছাত্র জিজ্ঞেস করলাে ঢাকা কলেজের ইংরেজীর অধ্যাপক প্রফেসর নােমানকে চিনি নাকি। আমি বল্লাম হয়তাে দেখলে চিনবাে, যদিও আমাদের মধ্যে অনেক দিন দেখা-সাক্ষাৎ হয় নি। ওটা প্রফেসর নােমানের গ্রাম এবং সে সময় উনিও গ্রামে চলে এসেছেন – তাকে ডাকতে লােক গেল। ইত্যবসরে আমি ছাত্র দুটিকে বল্লাম, “তােমরা বস, আমি তাে মাস্টার, আমি একটা লেকচার দেই”। ছাত্রদুটি বসে বল্লো “কী বলবেন বলেন”। 

আমি ছাত্র দুজনকে আমার জীবনের ইতিহাস কিছুটা বললাম, তারপর আওয়ামী লীগের নেতৃবৃন্দের সঙ্গে আমার পরিচয়, পূর্ব পাকিস্তানের উপর পশ্চিম পাকিস্তানের অর্থনৈতিক শােষণের উপর আমার রচনাবলী এবং ফোরাম সাপ্তাহিকী যাতে এই রচনাবলীর কয়েকটা বেরিয়েছিল, এসমস্তের কথা বললাম। তারপর “দীন মােহম্মদ”কে অধ্যাপক রেহমান সােবহান ফোরামের সম্পাদক এবং পূর্ব পাকিস্তানের স্বার্থ আদায়ের একজন বড়াে প্রবক্তা বলে পরিচিত করিয়ে দিলাম । (এই ছাত্রদুটি অবশ্য ফোরাম পত্রিকা অথবা অধ্যাপক রেহমান সােবহান কারাে নামই শােনেনি।) আরাে বল্লাম কাউকে ‘কমান্ডাে বলে সন্দেহ করলে তাকে নিয়ে কী করা উচিত – তাদের পিটিয়ে মারবার আগে সংগ্রাম পরিষদের অফিসে নিয়ে আসা উচিত প্রশ্নাবাদ করবার জন্য’ ! এই লেকচারে ছাত্রদুটির আমাদের পরিচিতি সম্বন্ধে সন্দেহ দূর হলাে। কিন্তু বাইরে তখনাে জনতা ক্ষেপে আছে আমাদের রক্তের জন্য ! ছাত্রদুটির একজন তখন “স্যার, আপনারা বসেন আমি বাইরে ওদের বুঝিয়ে আসি” এই বলে বাইরে যেয়ে জনতার সঙ্গে কিছুক্ষণ কথা বলে ফিরে এসে বললাে “স্যার আপনি এখন বাইরে এসে কিছু বলেন – ওরা আপনার কাছে কিছু শুনতে চাচ্ছে”। 

ছিন্নভিন্ন কাপড়ে বাইরে গিয়ে বিরাট জনতার সামনে দাঁড়ালাম। জনতার কারাে চোখ উৎসুক, কারাে চোখ যেন তখনাে মারমুখাে ! আমি তাদের উদ্দেশ করে একটা বক্তৃতা দিলাম, বল্লাম ঠিক আছে, সংগ্রামের উত্তেজনায় তারা যা করেছে এমন কিছু অন্যায় করেনি, শুধু – যে কথা ছাত্রদুটিকেও বলেছিলাম তাই আবার বল্লাম – ভুল করছিল যে কাউকে কোলাবরেটর বলে সন্দেহ করলে তাকে মেরে না ফেলে তার কাছ থেকে মূল্যবান তথ্য কী আদায় করা যায় সে জন্য সংগ্রাম পরিষদের অফিসে নিয়ে আসা উচিত। জনতা শুনলাে, কেউ কেউ বল্লো “দ্যাহ, কেমন পরিষ্কার বাংলা কয় !” অন্যে বল্লো, “হ, তাই তাে” । তারপর সকলে মিলে আমার যে সব জিনিস ছিনিয়ে নিয়েছিল সেগুলাে কোনটা কার কাছে আছে খোঁজা শুরু করলাে এবং প্রত্যেকটা জিনিস ফেরত দিল শুধু টাকার এনভেলপটা ছাড়া (আমি নিজেই এটার কথা ওদের বলতে ভুলে গিয়েছিলাম – ওরা আমাকে জিজ্ঞেস করেছিল কী কী জিনিস হারিয়েছি এবং ওরা সেগুলাের কোনটা কার কাছে আছে সবাইকে জিজ্ঞেস করছিল এবং সবাই সহযােগিতা করছিল সেগুলি উদ্ধার করতে)। কিন্তু দীন মােহাম্মদ তার জিনিসগুলি ফেরত পেল না – তার জিনিসগুলি যারা নিয়েছিল তারা মনে হয় লঞ্চেই রয়ে গিয়েছিল, আর লঞ্চ অনেক আগেই চলে গেছে। এরপরে মাফ চাইবার পালা – কেউ কেউ এসে একেবারে আমাদের দুজনের পায়ে হাত দিয়ে বল্লো “স্যার মাফ কইর্যা দ্যান”। একজন ছাত্র তার নিজের শার্টটা খুলে আমাকে পরিয়ে দিল। খবর ছড়িয়ে গেল যে ঢাকা থেকে গণ্যমান্য নেতারা এসেছেন ! আমরা তখন রীতিমতাে দর্শনের বস্তু হয়ে গেলাম ! এটাও অবশ্য আমাদের জন্য নিরাপদ ছিল না, কারণ জনতার মধ্যে সত্যিকারের কোলাবরেটরও তাে থাকতে পারে। ভাগ্য ভালাে যে বিকাল তিনটায় গ্রামবাসীদের একটা মিটিং ছিল প্রতিরােধ স্ট্রাটেজী আলােচনা করবার জন্য এবং স্থানীয় নেতারা ও ছাত্ররা সবাইকে সেখানে যেতে বল্লে আস্তে আস্তে সেখানকার জনতা হাল্কা হয়ে আসলাে। 

সংগ্রাম পরিষদের অফিসে ফিরে আসলে “দীন মোহাম্মদ” আমাকে বল্লো “তুমি আমার প্রাণ বাঁচিয়েছ”! কিন্তু আমারই তাে বাঁচা সম্ভব হতাে না প্রথমে “মােখলেস” এবং পরে সেই ছাত্র দুজন না থাকলে। এর মধ্যে গ্রামবাসীরা আমাদের একটা ভালােরকম মধ্যাহ্নভােজন দেয়, যদিও ঘুষি-খাওয়া ফোলা চোয়াল নিয়ে আমি অনেক কষ্টে খেতে পেরেছি। আমাদের হেড গাইড আর লঞ্চ থেকে নামেনি (কিংবা উধাও হয়ে গিয়েছিল – ঠিক এরকম ঘটনাতাে চুক্তির মধ্যে ছিল না !), কিন্তু তার সহকারী আমাদের সঙ্গে ছিল। যাই হােক আমরা এখন আমাদের ভাগ্য গ্রামের ছাত্রদের হাতে সমর্পণ করাই সাব্যস্ত করলাম। আমাদের গাইডটিকে বল্লাম বরাইতে ফিরে যেতে, বিশেষ করে সেখানে গিয়ে সিধুভাইকে আমাদের নিরাপত্তার খবর দেবার জন্য। ছাত্ররাও বল্লো যে ওই অঞ্চল থেকে বর্ডার পর্যন্ত সমস্ত অঞ্চলটাই তাদের কন্ট্রোলে এবং তাদের মধ্য থেকে চারজন নিজেরা আমাদের সঙ্গে অন্তত ব্রাহ্মণবাড়িয়া পর্যন্ত গিয়ে সেখানকার চার্জে বন্ধুদের হাতে আমাদের সঁপে দেবে বর্ডার পার করে দেবার জন্য। 

শেষ পর্যন্ত সমস্ত ঘটনাটা আমাদের জন্য শাপে বরই হলাে, কারণ আমরা এবার বাকি পথটা যাবার জন্য চোরাকারবারীদের চাইতে স্থানীয় অঞ্চলের সঙ্গে অনেক ঘনিষ্ঠভাবে পরিচিত ছাত্রদের সযত্ন হাতে ন্যস্ত হলাম॥”

— মো: আনিসুর রহমান (অর্থনীতিবিদ) / পথে যা পেয়েছি প্রথম খন্ড ॥ [ অ্যাডর্ন পাবলিকেশন – জুলাই, ২০০২ । পৃ: ৯০-৯৬ ] 

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

Shares