আল্লামা শফী নিজের লড়াইয়ের ছায়া রেখে গেছেন

আল্লামা শফী নিজের লড়াইয়ের ছায়া রেখে গেছেন

:: খন্দকার রাকিব ::

বাংলাদেশের রাজনীতির গতি প্রকৃতি নিয়ে আমার খুব শ্রদ্ধেয় একজন মানুষ সারা শাহাবুদ্দিন আপুর একটা লেখা পড়েছিলাম অনেক আগে। লেখাটার শুরু ছিল, ১৯৭৩ সালে এক ৯২ বছর বয়স্ক মাওলানা ঢাকা অবরোধের ডাক দিয়েছিলেন, এবং অবরোধের ডাক দেয়ার সেই রাতেই তাকে পুলিশ গৃহঅন্তরীন করে ফেলে। এর ঠিক চল্লিশ বছর পর আরেকজন নব্বই ঊর্ধ্ব মাওলানা ২০১৩ সালে আবার ঢাকা অবরোধের ডাক দেন, এবং তাকেও একটা জায়গায় আটকে রাখা হয়।এই দুইটা উদাহরণের সূত্র ধরে, ইসলাম প্রশ্নে আমাদের দেশের বিদ্যাজগতের যে বোঝাপড়া সেটা নিয়ে কয়েকটা কথা বলব। বিদ্যাজগতের অনেকেই মনে করেন, ১৯৭৩ সালের মাওলানা (ভাসানী) ছিলেন উদারপন্থী, প্রগতিবাদী, ‘সেক্যুলার’ , এবং অন্তত তথাকথিত ‘ইস্লামিস্ট’ না । আর ২০১৩ সালের মাওলানা ছিলেন , ‘ইস্লামিস্ট’, ‘পশ্চাদপদ’। শফীর সূত্র ধরে আবার অনেকে যে আলাপ টা করেন, দেশ একটা ‘ইস্লামীকীকরণের’ দিকে যাচ্ছে, ‘র‍্যাডিক্যালাইজেশান’ হচ্ছে।নৃতত্ত্বের ছাত্র হিসাবে আমি অবশ্য এমন সাধারণ বোঝাপড়ায় অভ্যস্ত নই, বরং আমার এই আলোচনায় কিছু সুনির্দিষ্ট প্রশ্ন আছে। প্রথমত, কেন আমরা আগের মাওলানা (ভাসানী)কে ‘ইস্লামিস্ট’ বলে আলাদা বর্গ না করে পরের মাওলানা(শফী)কে আলাদা বর্গ করছি। দ্বিতীয়ত, বাংলাদেশের, বিশেষত মুসলমান সমাজের মধ্য থেকে একদম অর্গানিক উপায়ে যেভাবে মাওলানা ভাসানীর মত একজন জাতীয় নেতা তৈরি হয়েছিলেন, সেরকম কোন মাওলানার এমন নেতা হওয়ার মত বাস্তবতা এবং শর্ত বর্তমান বাংলাদেশে আছে কিনা। দ্বিতীয় প্রশ্নের উত্তর যদি না হয়, তাহলে বুঝতে হবে আধুনিক সেক্যুলার রাষ্ট্রের অপারেশনের মধ্য দিয়ে বাংলাদেশ রাষ্ট্র যে নাগরিক সত্ত্বা তৈরি করে সেখানে বাংলাদেশের মুসলমান সমাজের মধ্য থেকে ভাসানীর মত এমন মাওলানার মুলধারায় আসার রাস্তাটা এখন বদ্ধ। রাষ্ট্রীয় কাঠামো নিজের প্রয়োজনে যে জনপরিসর এবং ব্যক্তিগত পরিসর তৈরি করেছে, সেখানে সে একদিকে মূলধারার নাগরিক কর্তাসত্তা তৈরি করেছে। অন্যদিকে ধর্মীয় কর্তাসত্তা বলে আলাদা কর্তাসত্ত্বা তৈরি করে ক্রমাগত তাকে মার্জিনালাইজ করে একটা আবদ্ধ কোঠরে নিয়ত উৎপাদন এবং পুনরতপাদন করছে। ফলে আল্লামা শফীর ক্ষেত্রে বাস্তবতা হচ্ছে তিনি এই কোঠরের মানুষ, যে কোঠর রাষ্ট্রীয় মেশিনারীর বাইরের বর্গ, রাষ্ট্রীয় মেশিনারীতে যার কোন অংশীদারিত্ব নেই, হক নেই, হিস্যা নেই।

ঠিক এমন একটা বাস্তবতায় অসংখ্য মানুষের জীবনের নিরাপত্তা আর অধিকারের লড়াইটা-ই করেছেন শফী, যাদের জীবনের অধিকার নিয়ে রাষ্ট্রীয় মূলধারার কর্তাব্যক্তিরা অনেকটা ‘ব্লাইন্ড’ ছিল অথবা ‘অসতর্ক’ ছিল। আল্লামা শফী এই জায়গায় বলব অন্তত কিছুটা হলেও নিজের লড়াইয়ের ছায়া রেখে গেছেন, বিদ্যাজগতের-ই অসংখ্য মানুষ নতুন করে এবিষয়গুলো ভাবছেন, ভিন্নভাবে দেখার চেষ্টা করছেন।

অথচ আজকে থেকে একশ বছর আগেও মুসলমান সমাজের মধ্য থেকে আমরা দেখতাম মওলানা আকরাম খাঁ, মওলানা আজাদ, মৌলভী তমিজ, মৌলভী আবুল মনসুর……এমন অসংখ্য মূলধারার মানুষ। তথাকথিত সাম্প্রদায়িকতার বয়ানের বাইরে গিয়ে যদি হদিস করেন দেখবেন, ভিন্ন ধর্মাবলম্বী সম্পর্কে এই মানুষদের ‘কমিউনালি ড্রাইভেন’ কোন ঘৃণা নেই। পলিটিকালি ভিন্ন অবস্থান হয়ত ছিল। পশ্চিমা ধাচের বহুত্ববাদী বয়ান দিয়েও তাদের ব্যাখ্যায় যাবোনা, কিন্তু তারা সমাজে তাদের ‘অপরে’র প্রতি একদম অসতর্ক ছিলেন এমনও না। মুসলমান সমাজ থেকে এমন অর্গানিক ধাঁচের মানুষ সমাজে তৈরি হওয়া বা পুনুরুতপাদিত হওয়ার তরিকাটা উপনিবেশ উত্তর বাংলাদেশ রাষ্ট্র থেকে ক্রমশঃ সংকুচিত হওয়ার মধ্য দিয়ে আর মাওলানা ভাসানী বা আকরাম খাঁ ধরণের কোন মুসলমান কর্তাসত্তা তৈরি হওয়ার আর কোন বাস্তবতা দেখা যাচ্ছে না। হয় রাষ্ট্রের জনপরিসরের ‘উপযুক্ত’ নাগরিক কর্তাসত্তা তৈরি হচ্ছে অথবা আলাদা ব্যক্তিগত পরিসরের ধর্মীয় কর্তাসত্ত্বা তৈরি হচ্ছে, যেব্যক্তিগত পরিসরে আপনি চান বা না চান এমন আহমদ শফী ধাঁচের কর্তাসত্তা-ই তৈরি হবে।এই শফীকেই আমরা দেখছি ২০১৩ সালে লড়াই করছে।

কিন্তু কেন? কিভাবে? কিসের লড়াই? শফির এই লড়াইটা আমি যে জায়গা থেকে পড়ি সেটা হচ্ছে, রাষ্ট্রীয় মেশিনারী থেকে ক্রমশঃ প্রান্তীকিকরণের জায়গায় দাঁড়িয়ে যখন সে তার অস্তিস্ত্বের জায়গায় হুমকি দেখেছে সেটাকেই সে মোকাবেলা করেছে। মোকাবেলা করার ধরণ, ভাষা, চিহ্ন এসব নিয়ে অসংখ্য প্রশ্ন আছে। সে যে পরিসরে আবদ্ধ সে পরিসরের ভাষা চিহ্ন এমন থাকা-ই স্বাভাবিক না? কিন্তু ভাশা-চিহ্নের চাইতেও যে বিষয়টা গুরুত্বপূর্ণ সেটা হচ্ছে তার লড়াই। এই লড়াইটা এমন সময়ে যখন দুনিয়াজুড়ে সন্ত্রাসের বিরুদ্ধে অনন্ত ‘যুদ্ধ’ চলছে, এবং বাংলাদেশে এই ‘যুদ্ধে’র একটা লোকাল ট্রান্সলেশন ঘটেছে। মুসলমান সমাজকে লিবারেল মুসলমান, র‍্যাডিক্যাল মুসলমান, এক্সট্রিমিস্ট মুসলমান এমন আলাদা আলাদা বর্গ করে এক বিশাল জনগোষ্ঠীর নিত্যদিনের যাবতীয় চর্চাকে হয় ক্রিমিনালাইজ করা হচ্ছে অথবা নিরাপত্তা সংকটের বিষয় বানিয়ে দেয়া হচ্ছে। হরদম গ্রেফতার-জেল-নিপীড়ন-বৈষম্য-আলাদাকরণ। (একটা উদাহরণ দি, আগে বোরকা হিজাবকে লোকাল সংস্কৃতি বা পুরুষতন্ত্রের প্রতীক বলা হলেও এসময় থেকে বলা শুরু হয় এটা র‍্যাডিক্যাল ইসলামের প্রতীক। আগে যাদের প্রতিক্রিয়াশীল পশ্চাদপত বলা হত তাদের ‘টেররিস্ট’, র‍্যাডিক্যাল বলা শুরু হয়।) ঠিক এমন একটা বাস্তবতায় অসংখ্য মানুষের জীবনের নিরাপত্তা আর অধিকারের লড়াইটা-ই করেছেন শফী, যাদের জীবনের অধিকার নিয়ে রাষ্ট্রীয় মূলধারার কর্তাব্যক্তিরা অনেকটা ‘ব্লাইন্ড’ ছিল অথবা ‘অসতর্ক’ ছিল। আল্লামা শফী এই জায়গায় বলব অন্তত কিছুটা হলেও নিজের লড়াইয়ের ছায়া রেখে গেছেন, বিদ্যাজগতের-ই অসংখ্য মানুষ নতুন করে এবিষয়গুলো ভাবছেন, ভিন্নভাবে দেখার চেষ্টা করছেন।

লেখকঃ ব্র্যাক ইউনিভার্সিটির নৃবিজ্ঞানের জ্যেষ্ঠ প্রভাষক

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *