আ’লীগ সরকার ভারতভূমির যোগ্য লীজ গ্রহনকারী সত্তা

আ'লীগ সরকার ভারতভূমির যোগ্য লীজ গ্রহনকারী সত্তা

“… দিল্লিতে আলাপ-আলোচনার আরও কয়েকটি দিক ছিল। একটি হলো, আমি সত্যি যুদ্ধ করতে এসেছি কি না, নাকি আমি পাকিস্তানের চর বা অন্যের চর হয়ে গিয়েছি, এটা জানা। দ্বিতীয়ত, আমার কাছ থেকে পাকিস্তান সম্পর্কে যতটুকু সম্ভব তারা জানার চেষ্টা করল — এটাও স্বাভাবিক। তৃতীয়ত, এই যুদ্ধে আমাদের পক্ষে কী কী করা সম্ভব। এখানে একটা কথা বলে রাখি — উইং কমান্ডার বাশার ও সুলতান মাহমুদ — এদেরও একই সঙ্গে নিয়ে যাওয়া হয় অন্যত্র। এটা করা হলো আমাদের যাচাই-বাছাই করা, অর্থাৎ আমাদের আনুগত্য ও বিশ্বস্ততা ইত্যাদি পরীক্ষা এবং গোয়েন্দাবিষয়ক সংবাদ গ্রহণের জন্য। আমি এই সময় ১৮ মে থেকে চার-পাঁচ দিন দিল্লিতে ছিলাম। পরে দিল্লিতে এম কে বাসার, সুলতান মাহমুদ আমার সঙ্গে যোগ দেন। তারপর আমরা ওখান থেকে একত্রে আগরতলা যাই। সেখান থেকে আমি আমার পরিবারসহ কলকাতায় আসি। উইং কমান্ডার বাসারও তার পরিবারসহ আমাদের সঙ্গে আসেন। গ্রুপ ক্যাপ্টেন বাদামিও আমাদের সঙ্গে ছিলেন।

ভারতীয় সেনাবাহিনীর অধিনায়কের কাছে পাকিস্তানী সেনাবাহিনীর আত্মসমর্পণের মধ্য দিয়ে প্রকৃতপক্ষে ১৬ই ডিসেম্বর, যাকে আমরা বিজয় দিবস হিসেবে অভিহিত করি, সেই দিন থেকেই বাঙালীর মুক্তিযুদ্ধকে সরাসরি অস্বীকার করা হয়েছে। ১৬ই ডিসেম্বর মুক্তিযোদ্ধাদের ‘বিজয় দিবস’-এর পরিবর্তে ভারতীয় সেনাবাহিনীর ‘বিজয় দিবস’ হিসেবে ইতিহাসে আনুষ্ঠানিকভাবে চিহ্নিত করা হয়েছে। এই ষড়যন্ত্রের পেছনে আসল উদ্দেশ্য হচ্ছে বাঙালীর স্বাধীনতা সংগ্রামকে অস্বীকার করা এবং পাক-ভারত যুদ্ধে পূর্বাঞ্চলের রণাঙ্গনে ভারতীয় সেনাবাহিনীর বিজয় ঘোষনা করা। এই বিজয়ে বাংলাদেশের মুক্তিপিপাসু জনগণ এবং মুক্তিযোদ্ধারা ছিল নীরব দর্শক, আওয়ামী লীগ নেতৃত্ব ছিল বিনয়ী তাবেদার এবং কর্ণেল ওসমানী ছিলেন অসহায় বন্দী। এ যেন ছিল ভারতের বাংলাদেশ বিজয় এবং আওয়ামী লীগ সরকার এই নব বিজিত ভারতভূমির যোগ্য লীজ গ্রহনকারী সত্তা। সুতরাং যেমন সত্তা তেমনই তার শর্ত – আর যায় কোথায়॥”

সেই সময় একটা বিষয় আমি স্পষ্ট বুঝতে পারছিলাম যে, তখন পর্যন্ত ভারত সরকার নির্দিষ্টভাবে কী করতে যাচ্ছে, কী করতে পারে বা কী করবে — এই সম্পর্কে কোনো সুস্পষ্ট সিদ্ধান্ত তাদের নেওয়া হয়নি। তবে একটা বিষয় বুঝতে পারছিলাম, বাংলাদেশের ব্যাপারটা তাদের জন্য একটা সুযোগ, আরেকটা সুযোগ হলো বাংলাদেশের মানুষের একটা দেশ পাওয়ার আকাঙ্খা — দুটো সুযোগই একটা জায়গায় এসে মিলেছে। এই সুযোগটা ছাড়ার কোনো প্রশ্ন আসে না। যদিও তারা কী করবে, বাংলাদেশকে কীভাবে সাহায্য করবে, কীভাবে তারা এই যুদ্ধে অংশগ্রহণ করবে, সে ব্যাপারে কোনো স্পষ্ট সিদ্ধান্ত ছিল না। তবে আমার ধারণা হয়েছিল, বাংলাদেশের মুক্তিযুদ্ধকে সাহায্য করা এবং বাংলাদেশ যাতে স্বাধীন হয়, সে সম্পর্কে বোধহয় একটা অলিখিত কিংবা বেসরকারি সিদ্ধান্ত হয়ে গিয়েছিল। সেখানে আমার দেখা হযেছিল ভারতীয় সামরিক বাহিনীর কয়েকজন ব্রিগেডিয়ার এবং একজন মেজর জেনারেলের সঙ্গে। এখন তাদের সবার নাম আমার মনে নেই। তাদের সঙ্গে কথা বলে ভারত সরকারের সিদ্ধান্ত জানা সম্ভব ছিল না। যেহেতু তারা সবাই গোয়েন্দা বিভাগের লোক ছিলেন। তার পর তখন আমার একটা ধারণা হয়েছিল যে ভারত সরকার এমন একটা পদক্ষেপ নেবে, যাতে বাংলাদেশ স্বাধীন হয়। আর পাকিস্তান যাতে ভবিষ্যতে বড় শক্তি হিসেবে দাঁড়াতে না পারে বা তাদের জন্য বড় ধরণের হুমকি হতে না পারে, এ সুযোগটা ভারত গ্রহণ করবে, যে সুযোগটা তারা পেয়েছে॥”

এ. কে. খন্দকার / মুক্তিবাহিনীর উপপ্রধান সেনাপতি তথ্যসূত্র : মুক্তিযুদ্ধের পূর্বাপর : কথোপকথন / এ কে খন্দকার (মুক্তিবাহিনীর উপপ্র্ধান সেনাপতি), মঈদুল হাসান (প্রবাসী বাংলাদেশ সরকারের প্রধানমন্ত্রীর বিশেষ সহকারী), এস আর মীর্জা (মুক্তিযোদ্ধাদের জন্য গঠিত যুব শিবিরের মহাপরিচালক)॥ [ প্রথমা প্রকাশন – ডিসেম্বর, ২০০৯ । পৃ: ৩৮-৩৯ ]

০২.
“… কেবল মনোবল এবং মানসিক প্রস্তুতিই যুদ্ধের জন্য যথেষ্ট নয়, সাথে সাথে আধুনিক সমর অস্ত্রও যুদ্ধ জয়ের জন্য অত্যাবশ্যকীয়। অস্ত্র সংকট আমাকে সব সময়েই ভাবিয়ে তুলত। তাই সমগ্র ৯নং সেক্টরকে কয়েকটি সাব সেক্টরে বিভক্ত করে ট্রেনিংয়ের ব্যবস্থা চালু রেখে আমি একুশে এপ্রিল কয়েকটি মোটর লঞ্চ সহকারে সুন্দরবনের পথ ধরে ভারতের উদ্দেশ্যে রওয়ানা করি। প্রধান লক্ষ্যই ছিল ভারতের কাছ থেকে অস্ত্র সংগ্রহ করা। বরিশাল সদর থেকে নির্বাচিত জনপ্রিয় সংসদ সদস্য (প্রাদেশিক) জনাব নুরুল ইসলাম মঞ্জুর ইতিপূর্বেই পশ্চিমবঙ্গ ঘুরে বরিশাল ফেরত এসে আমাকে জানালেন যে, লেঃ জেনারেল অরোরা ভারতের পূ্র্ব অঞ্চলীয় সর্বাধিনায়ক এবং তিনি মুক্তিযুদ্ধে অংশগ্রহণকারী বাঙালী সামরিক অফিসারের কাছে অস্ত্র সাহায্য প্রদান করতে প্রস্তুত আছেন।

এই তথ্য লাভের মাত্র ১ দিন পরই আমি কিছু মুক্তিযোদ্ধা সহকারে ভারত অভিমুখে রওয়ানা হয়ে প্রথমে পৌঁছি পশ্চিম বাংলার বারাসাত জেলার হাছনাবাদ বর্ডার টাউনে। ঐ অঞ্চলের বি.এস.এফ-এর কমান্ডার লেঃ কমান্ডার শ্রী মুখার্জীর সঙ্গে হয় প্রথম আলোচনা। কমান্ডার মুখার্জী অত্যন্ত সুহৃদ বাঙালী অফিসার। তিনি সর্বান্তকরণেই আমাকে সহযোগিতার হাত বাড়িয়ে সরাসরি লেঃ জেনারেল জগজিৎ সিং অরোরার কাছে নিয়ে গেলেন।

কলকাতার ফোর্ট উইলিয়ামে তাঁর হেড কোয়ার্টার। তিনি আমাকে প্রথম সাক্ষাতেই সম্পূর্ণভাবে বিশ্বাস করতে পারলেন না। সাক্ষী-প্রমাণ দাবী করলেন আমার। তখনই আমাকে সদ্য ঘোষিত স্বাধীন বাংলা সরকারের প্রধানমন্ত্রী জনাব তাজউদ্দীন এবং সর্বাধিনায়ক কর্ণেল ওসমানী সাহেবের নাম নিতে হয়েছে। উত্তরে জেনারেল অরোরা সাহেব আমাদের নেতৃবৃন্দ সম্পর্কে যা বাজে মন্তব্য করলেন, তা কেবল ‘ইয়াঙ্কী’দের মুখেই সদা উচ্চারিত হয়ে থাকে। সোজা ভাষায় তার উত্তর ছিল ‘ঐ দু’টা ব্লাডি ইঁদুরের কথা আমি জানিনা, ওদের কোন মূল্য নেই আমার কাছে। অন্য কোন সাক্ষী থাকলে বলো।’ মহা মুশকিল দেখছি। এই ভারতের মাটিতে আমার মত একটা নাম না জানা তরুণ মেজরকে কোন দুঃখে কেউ চিনতে যাবে? ব্যাটা বলে কি? আমার স্বাধীন বাংলায় প্রথম প্রধানমন্ত্রী এবং সেনাবাহিনীর প্রথম সর্বাধিনায়ক শ্রদ্ধেয় ব্যক্তিদের সম্পর্কেই যে ব্যক্তি এরূপ কদর্য উক্তি করতে ছাড়েননি, তিনি আমার মত চুনোপুঁটিদের যে কি চোখে দেখবেন, তা অনুধাবন করতেই একটা অজানা আতঙ্কে আমার সর্বাঙ্গ শিউরে উঠল। অমনি আমি জেনারেল অরোরাকে অতি স্পষ্ট ভাষায় একজন বিদ্রোহীর সুরে জানিয়ে দিলাম যে, আমার অস্ত্রের কোন প্রয়োজন নেই, আমি শূন্য হাতেই দেশের অভ্যন্তরে ফিরে গিয়ে যুদ্ধ করতে করতে মৃত্যুবরণ করব তবু তাঁর কাছে আর অস্ত্রের জন্য আসব না। আমার এই বিদ্রোহী ভূমিকায় জেনারেল রীতিমত চমকে উঠেন এবং আমাকে জিজ্ঞাসাবাদের জন্য তাঁর সিকিউরিটি এবং ইনটেলিজেন্স-এর লোকদের কাছে হাওয়ালা করেন। চারদিন বন্দী অবস্থার মধ্য দিয়ে আমাকে বিভিন্ন বিষয়ে জিজ্ঞাসাবাদ করা হয়। বিশেষ করে পাকিস্তান সেনাবাহিনী সম্পর্কে তথ্য সংগ্রহ করাই ছিল তাদের মূল উদ্দেশ্য। আমার দ্রুত মুক্তি এবং মুক্তিযুদ্ধের জন্য অস্ত্র সংগ্রহ করার লক্ষ্যকে সামনে রেখেই আমি পাকিস্তান সেনাবাহিনী সম্পর্কে কিছুটা তথ্য প্রদান করি। পূর্ব অঞ্চলের ‘চীফ অব স্টাফ’ জেনারেল জ্যাকব আমার দেয়া তথ্য বিশেষ প্রয়োজনীয় মনে করেন এবং আমাকে যে কোন ধরনের অস্ত্রপাতি যোগান দেয়ার আশ্বাসও প্রদান করেন। এভাবে কোলকাতার সেই ব্রিটিশ রচিত দূর্গ ফোর্ট উইলিয়ামের অন্ধকূপ থেকে আমি মুক্তি পেয়ে জনাব তাজউদ্দীন সাহেবের সাক্ষাৎ করতে যাই।

দেশের সাধারণ শান্তিপ্রিয় জনগণকে হিংস্র দানবের মুখে ঠেলে দিয়ে কোলকাতার বালিগঞ্জের আবাসিক এলাকার একটি দ্বিতল বাড়ীতে বসে প্রধানমন্ত্রী তাঁর মন্ত্রীসভা সহকারে (খোন্দকার মোশতাক বাদে) নিরাপদে তাস খেলছিলেন দেখে আমি সে মুহূর্তে কেবল বিস্মিতই হইনি, মনে মনে বলছিলাম ‘ধরণী দ্বিধা হও’। ধরণী সেদিন দ্বিধা না হলেও আমি কিন্তু সেদিন থেকেই আওয়ামী লীগ নেতৃত্বের প্রতি চরমভাবে আস্থাহীন এবং বীতশ্রদ্ধ হয়ে পড়েছি। এর ফলাফল ব্যক্তিগতভাবে আমার জন্য মঙ্গলজনক না হলেও, আমি আমার সকল ক্ষতিকে নীরবে মাথা পেতে নিয়েই আওয়ামী লীগের এই দায়িত্বহীন, উদাসীন এবং সৌখিন মেজাজসম্পন্ন নেতৃত্বের বিরুদ্ধে আপোষহীন সংগ্রাম অব্যাহত রাখার জন্য অঙ্গীকারাবদ্ধ হয়ে পড়েছিলাম। দেশ ও জাতির স্বার্থে বাস্তবেও আমি করেছি তাই। বাংলাদেশের রাজনৈতিক ইতিহাসই তার স্বাক্ষী। যে জাতির নির্বাচিত প্রতিনিধিবৃন্দ জনগণকে যুদ্ধে লেলিহান শিখার মধ্যে নিক্ষেপ করে কোন নিরাপদ আশ্রয়ে বসে বেকার, অলস যুবকদের মত তাস খেলায় মত্ত হতে পারে, সে জাতির দুর্ভাগ্য সহজে মোচন হবার নয়। মুক্তিযুদ্ধের ইতিহাসে আওয়ামী লীগ নেতৃত্বের আচরণে এ ধরণের ভূরি ভূরি নমুনা রয়েছে। যুদ্ধকালীন অবস্থায় তাদের আরাম-আয়েশী জীবনধারা কোলকাতাবাসীদেরকে করেছে হতবাক।ব্যক্তিজীবন পদ্ধতিতে সীমাহীন ভোগ-লালসার কারণেই আশ্রয়দানকারী ভারত কর্তৃপক্ষ আওয়ামী লীগ নেতৃত্বের দূর্বলতাসমূহ অতি সহজেই নির্ণীত করে নিয়েছে এবং তাদের ভোগ-বিলাসে কোনরূপ বাধা প্রদান করা থেকে বিরত থেকেছে। এ ব্যাপারে ভারতীয় কর্তৃপক্ষের ঔদার্য আমাদের মুক্তিযুদ্ধের ইতিহাসকে উত্তরোত্তর কলঙ্কময় করে তুলতে সহায়তা করেছে। অপরদিকে কোলকাতার ৮ নম্বর থিয়েটার রোডে স্বাধীন বাংলাদেশের অফিস থাকলেও ক্ষমতার সকল উৎসই ছিল ভারতীয় কর্তৃপক্ষ। স্বাধীনতা যুদ্ধের সর্বাধিনায়ক কর্ণেল ওসমানী সাহেব একজন ‘সম্মানিত বন্দীর’ জীবন যাপন করা ব্যতীত আর তেমন কিছুই করার সুযোগ ছিল না তাঁর। সেক্টর পরিদর্শন করা তো দূরের কথা তাঁর তরফ থেকে লিখিত নির্দেশও তেমন কিছু পৌঁছতে পারেনি সেক্টর কমান্ডারদের কাছে। ভারতীয় কর্তৃপক্ষ মুক্তি যোদ্ধাদেরকে অস্ত্র সরবরাহ করার আগ্রহ প্রদর্শন যা করেছে তার তুলনায় অধিকতর উৎসাহ এবং আগ্রহ প্রদর্শন করেছে তথ্য সংগ্রহ করার ব্যাপারে। বাংলাদেশের মুক্তিযোদ্ধাদের হাতে অস্ত্র প্রদান নয়, পাকিস্তান সেনাবাহিনী এবং বাংলাদেশ সম্পর্কে জরুরী তথ্য সংগ্রহই ছিল যেন ভারতীয় কর্তৃপক্ষের মূল উদ্দেশ্য। তাদের এ ধরণের আচরণই তাদের গোপন লালসা পূরণের ‘নীল নকশা’ তৈরি করার ইঙ্গিত প্রদান করেছে। আমার এ সন্দেহ সত্য বলে প্রমাণিত হতে খুব বেশী সময়ের প্রয়োজন হয়নি।

… ঐতিহসিক ১৬ই ডিসেম্বর ১৯৭১ সন বাংলাদেশের মুক্তিযুদ্ধের আনুষ্ঠানিক অবসানের দিন। হানাদার পাকিস্তানী বাহিনী ভারতের পূর্বাঞ্চলীয় কমান্ডের অধিনায়ক লেঃ জেনারেল জগজিৎ সিং অরোরার কাছে ঢাকা রেস কোর্স ময়দানে আত্মসমর্পণ করে। যে যুদ্ধ বাঙালীদের সশস্ত্র গণবিষ্ফোরণ এবং মুক্তিযুদ্ধের মধ্য দিয়ে শুরু হয় তার শেষ হয় ভারতীয় সেনাবাহিনীর অধিনায়কের কাছে হানাদার পাকিস্তানী বাহিনীর অধিনায়কের আত্মসমর্পণের মধ্য দিযে। হিসেব মিলছে না কেন? হিসেবের এই গরমিলের জন্য দায়ী কে বা কারা? যারা মুক্তিযুদ্ধ শুরু করেছিল যুদ্ধ শেষে পরাজিত শত্রুপক্ষ সেই মুক্তিযোদ্ধাদের কাছে আত্মসমর্পন করল না কেন? পাকিস্তান এবং ভারতরে মধ্যে তো কোন মুক্তিযুদ্ধ হয়নি। মুক্তিযুদ্ধ সংগঠিত হয়েছিল হানাদার পাকিস্তানী সেনাবাহিনী এবং মুক্তিকামী বাঙালী জনগণের মধ্যে। ভারতীয় সেনাবাহিনীর কাছে পাকিস্তানী সেনাবাহিনীর আত্মসমর্পণের হেতুটি দেখা দিল কেন – কোন উদ্দেশ্যে? মুক্তিযুদ্ধের সর্বাধিনায়ক কর্ণেল ওসমানীর কাছে পাকিস্তানের পরাজিত জেনারেল নিয়াজী আত্মসমর্পন করলেন না কেন? আত্মসমর্পণের সময় কর্ণেল ওসমানী অনুপস্থিত ছিলেন কেন? আত্মসমর্পণের বেশ কয়েকদিন পরে কর্ণেল ওসমানী ঢাকায় এলেন কেন? এ সময়কাল তিনি কোথায় ক্ষেপন করেছিলেন? তিনি কি তাহলে সত্যি কোলকাতায় বন্দী ছিলেন? আজো বাংলাদেশের জনমনে নানান প্রশ্নের ভীড় জমছে। এ সব প্রশ্নের উত্তর দেশবাসী আওয়ামী লীগের কাছে থেকে প্রত্যাশা করছে, কিন্তু আওয়ামী লীগ নেতৃত্ব এবং ভারতে অবস্থানরত প্রবাসী আওয়ামী লীগ নেতৃত্ব এ সকল প্রশ্নের জবাব দেয়ার আজ পর্যন্ত কোন তাগিদই বোধ করেনি। তাছাড়া আত্মসমর্পনের প্রায় ১ সপ্তাহের পরে প্রবাসী আওয়ামী লীগ সরকার বাংলাদেশে ফিরে এসে বিনা প্রশ্নে গদিতে বসেন। মুক্তিযুদ্ধের সর্বাধিনায়ক ঐতিহাসিক আত্মসমর্পন অনুষ্ঠানে কেন অনুপস্থিত ছিলেন, সে সত্যটি উদঘাটন করার জন্য আজ পযন্ত কোন তদন্ত কমিটি গঠন করা হল না। অথচ মুক্তিযুদ্ধের এই অসহায় মহানায়ক কর্ণেল ওসমানীর কতই না প্রশংসা। কেন এই মিছেমিছি প্রশংসা? এর অন্তরালে কি রহস্য?

রহস্য তো নিশ্চই রয়েছে। ভারতীয় সেনাবাহিনীর অধিনায়কের কাছে পাকিস্তানী সেনাবাহিনীর আত্মসমর্পণের মধ্য দিয়ে প্রকৃতপক্ষে ১৬ই ডিসেম্বর, যাকে আমরা বিজয় দিবস হিসেবে অভিহিত করি, সেই দিন থেকেই বাঙালীর মুক্তিযুদ্ধকে সরাসরি অস্বীকার করা হয়েছে। ১৬ই ডিসেম্বর মুক্তিযোদ্ধাদের ‘বিজয় দিবস’-এর পরিবর্তে ভারতীয় সেনাবাহিনীর ‘বিজয় দিবস’ হিসেবে ইতিহাসে আনুষ্ঠানিকভাবে চিহ্নিত করা হয়েছে। এই ষড়যন্ত্রের পেছনে আসল উদ্দেশ্য হচ্ছে বাঙালীর স্বাধীনতা সংগ্রামকে অস্বীকার করা এবং পাক-ভারত যুদ্ধে পূর্বাঞ্চলের রণাঙ্গনে ভারতীয় সেনাবাহিনীর বিজয় ঘোষনা করা। এই বিজয়ে বাংলাদেশের মুক্তিপিপাসু জনগণ এবং মুক্তিযোদ্ধারা ছিল নীরব দর্শক, আওয়ামী লীগ নেতৃত্ব ছিল বিনয়ী তাবেদার এবং কর্ণেল ওসমানী ছিলেন অসহায় বন্দী। এ যেন ছিল ভারতের বাংলাদেশ বিজয় এবং আওয়ামী লীগ সরকার এই নব বিজিত ভারতভূমির যোগ্য লীজ গ্রহনকারী সত্তা। সুতরাং যেমন সত্তা তেমনই তার শর্ত – আর যায় কোথায়॥”

মেজর (অবঃ) এম এ জলিল / অরক্ষিত স্বাধীনতাই পরাধীনতা ॥ [ কমল কুঁড়ি প্রকাশন – ফেব্রুয়ারি, ২০১৫ । পৃ: ৩৪-৩৬ / ৪৮-৫০ ]

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *