আ’লীগ প্রকাশ্যেই জামাতের সাথে মৈত্রী বন্ধনে আবদ্ধ হয়

আ'লীগ প্রকাশ্যেই জামাতের সাথে মৈত্রী বন্ধনে আবদ্ধ হয়

“… বুর্জোয়া রাজনৈতিক দলগুলির মধ্যে আওয়ামী লীগের সমর্থক বুদ্ধিজীবিদের সংখ্যাই সব থেকে বেশি। কিন্তু আশ্চর্যের ব্যাপার যে, ১৯৭০ সালের আগে পর্যন্ত অর্থাৎ আওয়ামী লীগ ক্ষমতায় আসার আগে পর্যন্ত তৎকালীন বুর্জোয়া বুদ্ধিজীবিদের বিপুল অধিকাংশই ছিলেন আওয়ামী লীগের আওতার বাইরে। আওয়ামী লীগের অশিক্ষিত নেতৃত্বের প্রতি তাদের কোন আকর্ষণ ছিলো না। শুধু তাই নয়, বর্তমানে যে সব বুদ্ধিজীবি আওয়ামী সমর্থক পান্ডা ব্যক্তি হিসেবে তত্ত্বাবধায়ক সরকার গঠনের আন্দোলনে সব থেকে বেশি লম্ফ ঝম্ফ করেছে তারাই ছিলো ১৯৭১-এর আগে পর্যন্ত পাকিস্তানী তথ্য সচিব আলতাফ গওহরের নিয়ন্ত্রণাধীন ব্যুরো অব ন্যাশনাল রি-কনস্ট্রাকশন (Bureau of National Reconstruction) বা BNR ও লেখক সংঘ (Writers Guild)-এর পূর্ব পাকিস্তানী সংগঠক ও কর্তাব্যক্তি ও সেই হিসেবে আর্থিক সুবিধাসহ অন্য অনেক সুবিধাভোগী। তাদের এই কীর্তির কারণে তাদেরকে খুব সঠিক অর্থেই ১৯৭১-এর পূর্ববর্তী ‘সাংস্কৃতিক রাজাকার’ হিসেবে আখ্যায়িত করা চলে। যেহেতু বাংলাদেশের বুদ্ধিজীবিদের এই অংশ লুমপেন চরিত্রসম্পন্ন সে কারণে এতে বিস্মিত হওয়ার কিছুই নেই যে, ওপরে উল্লিখিত এই সাংস্কৃতিক রাজাকাররাই বর্তমানে আওয়ামী লীগ সমর্থক বুদ্ধিজীবি হিসেবে সব থেকে অস্থির ও সোচ্চার গণতন্ত্রী।

জাহানারা ইমামের মৃত্যুর আগেই আওয়ামী লীগ নেতৃত্ব গোপনে পর্দার আড়ালে জামাতে ইসলামীর সাথে যে চক্রান্ত করছিলো সেটা অকস্মাৎ তাদের যৌথ বৈঠকের একটি ছবি দৈনিক ইত্তেফাকে প্রকাশিত হওয়ার পর আর গোপন থাকে নি। তারপর থেকে আওয়ামী লীগ ব্যাপারটি নিয়ে আর বিশেষ গোপনীয়তা রক্ষা না করে প্রকাশ্যেই জামাতের সাথে মৈত্রী বন্ধনে আবদ্ধ হয়। তারা অনেক সময় একই মঞ্চে বক্তৃতা করে এবং একই মিছিলে শরীক হয়। স্বাধীনতার “একমাত্র” স্বপক্ষ শক্তি হিসেবে দাবিদার আওয়ামী লীগ স্বাধীনতার অঙ্গীকারাবদ্ধ শত্রু জামাতে ইসলামীর সাথে এইভাবে ঐক্যবদ্ধ হওয়ার মাধ্যমে আওয়ামী লীগের অসাম্প্রদায়িকতা, ধর্ম নিরপেক্ষতা ইত্যাদি যেমন একটি রাজনৈতিক অশ্লীলতায় পরিণত হয়, তেমনি আওয়ামী লীগের সাথে মৈত্রী বন্ধনে আবদ্ধ হওয়ায় জামাতে ইসলামীর রাজনৈতিক স্বরুপও উদঘাটিত হয়।

এই বুদ্ধিজীবি ও সাংস্কৃতিসেবীদের অন্য একটি ভূমিকা হলো, তাদের মৌলবাদ ও জামাতে ইসলামীর বিরোধীতার ব্যাপারে। একথা ঠিক যে, ১৯৯২ সালে নির্মূল কমিটি গঠিত হওয়ার পর এদের অনেকে জাহানারা ইমামের নেতৃত্বাধীন আন্দোলনে সক্রিয় ভূমিকা পালন করেছিলো। কিন্তু এক্ষেত্রে এদের বর্তমান ভূমিকা লক্ষ্য করলে সহজেই বোঝা যাবে যে, ধর্মীয় প্রতিক্রিয়াশীলতা, মৌলবাদ ও ধর্মের রাজনৈতিক ব্যবহারের প্রতি এদের সাংস্কৃতিক ও রাজনৈতিক দৃষ্টিভঙ্গির প্রকৃত চরিত্রটি ঠিক কি রকম।

জাহানারা ইমামের মৃত্যুর আগেই আওয়ামী লীগ নেতৃত্ব গোপনে পর্দার আড়ালে জামাতে ইসলামীর সাথে যে চক্রান্ত করছিলো সেটা অকস্মাৎ তাদের যৌথ বৈঠকের একটি ছবি দৈনিক ইত্তেফাকে প্রকাশিত হওয়ার পর আর গোপন থাকে নি। তারপর থেকে আওয়ামী লীগ ব্যাপারটি নিয়ে আর বিশেষ গোপনীয়তা রক্ষা না করে প্রকাশ্যেই জামাতের সাথে মৈত্রী বন্ধনে আবদ্ধ হয়। তারা অনেক সময় একই মঞ্চে বক্তৃতা করে এবং একই মিছিলে শরীক হয়। স্বাধীনতার “একমাত্র” স্বপক্ষ শক্তি হিসেবে দাবিদার আওয়ামী লীগ স্বাধীনতার অঙ্গীকারাবদ্ধ শত্রু জামাতে ইসলামীর সাথে এইভাবে ঐক্যবদ্ধ হওয়ার মাধ্যমে আওয়ামী লীগের অসাম্প্রদায়িকতা, ধর্ম নিরপেক্ষতা ইত্যাদি যেমন একটি রাজনৈতিক অশ্লীলতায় পরিণত হয়, তেমনি আওয়ামী লীগের সাথে মৈত্রী বন্ধনে আবদ্ধ হওয়ায় জামাতে ইসলামীর রাজনৈতিক স্বরুপও উদঘাটিত হয়।

এ ক্ষেত্রে আপাতদৃষ্টিতে যা বিস্ময়কর মনে হয় সেটা হলো আওয়ামী লীগ সমর্থক ও আওয়ামী পন্থী ঘাতক দালাল নির্মূল কমিটির নেতৃবৃন্দ ও সেই সাথে অন্য অনেক মাতব্বর বুদ্ধিজীবির ভূমিকা। একই সাথে স্বাধীনতার একমাত্র স্বপক্ষ শক্তি হিসেবে দাবি করতে ও জামাতের সাথে প্রকাশ্যে আঁতাতবদ্ধ হতে যেমন আওয়ামী লীগের কোন অসুবিধা হয় নি, তেমনি আওয়ামীপন্থী বুদ্ধিজীবিদেরও কোন অসুবিধা নেই একই মুখে নির্মূল কমিটিতে মাতব্বরি করা এবং আওয়ামী লীগ ও জামাতের যৌথ নেতৃত্বাধীন আন্দোলনে শরীক হয়ে সাপ এবং ব্যাঙ উভয়ের মুখেই চুমু খাওয়ায়।

এদের কেউ কেউ ঘরোযা বৈঠকে জামাতের সাথে আওযামী লীগের এই আঁতাতের সমালোচনা করলেও সে সমালোচনার চরিত্র পরামর্শ প্রদানের বেশি কিছু নয়। তাদের এই ঘরোয়া সমালোচনার আসলেই কোন মূল্য এ কারণেই নেই যে, প্রকাশ্যে বক্তৃতা বিবৃতি ও নিজেদের লেখালেখি অথবা নির্মূল কমিটির মতো সংগঠনের প্রকাশ্য প্রস্তাবের মাধ্যমে তারা এই ঘৃণ্য আঁতাত ও মৈত্রী বন্ধন এবং আওয়ামী লীগ কর্তৃক ধর্মের জঘণ্য রাজনৈতিক ব্যবহারের কোন সমালোচনা তো করেইনি, উপরন্তু তাদের এই ঐক্যবদ্ধ আন্দোলনকে স্বৈরাচার বিরোধী গণতান্ত্রিক আন্দোলন হিসেবে আখ্যায়িত করে প্রকৃতপক্ষে জামাতে ইসলামীর রাজনৈতিক পুনর্বাসনেই সাহায্য করেছে।

এই সব বুদ্ধিজীবিদের ভাবমূর্তিকে তাদের শ্রেণীর বড় লোকদের মালিকানাধীন সংবাদপত্র পত্রিকায় যতই মহিমাময় করার চেষ্টা করুক সেটার কোন প্রকৃত গ্রাহ্যতা নেই। কারণ গণতন্ত্র, স্বৈরতন্ত্র বিরোধীতা, স্বদেশ প্রেম ইত্যাদি বিষয়ে তাদের বহুবিধ ঘোষণা সত্ত্বেও উপরোক্ত বুদ্ধিজীবি ও সংস্কৃতিসেবীদের এই ভূমিকা সম্ভব হয়েছে আওয়ামী লীগ ও বাঙলাদেশের শাসকশ্রেণীর মতই তাদের লুমপেন চরিত্রের জন্য। প্রচার মাধ্যমে দেশের লোকের সামনে তাদের মহা সম্মানজনক ভাবমূর্তি টিকিয়ে রাখার চেষ্টা সত্ত্বেও তাদের এই কলঙ্কজনক ভূমিকা তাদের অন্তর্নিহিত লুমপেন চরিত্রকেই স্পষ্টভাবে উদঘাটিত করে। শুধু তাই নয়, এই বুদ্ধিজীবি ও সংস্কৃতিসেবীদের এই ধরণের কর্মকান্ডের মধ্যেই বাঙলাদেশে বুর্জোয়া শ্রেণীর রাজনৈতিক সংস্কৃতিরও যথার্থ পরিচয় পাওয়া যায়॥”

বদরুদ্দীন উমর / নির্বাচিত প্রবন্ধ ॥ [ অন্যপ্রকাশ – ফেব্রুয়ারী, ২০০০ । পৃ: ৮৯-৯১ ]

“… এর মধ্যে একজন আছে শওকত উসমান। শওকত উসমানের কাছে আমার প্রশ্ন জনাব, ভারত বিভক্তির পরে আপনারা সুন্দর দেশটিতে থাকলেন না কেন? আপনাদের মতো এরকম বহু লোক এসেছেন এখানে। এখানকার কলাটা, মূলাটা চোষার জন্য এবং খেয়েছেন আপনারা। আবার এখন উল্টা বাক্য আওড়ান। উল্টা বাক্য যখন তো দয়া করে দিল্লীতে যান, পশ্চিমবঙ্গে যান, পশ্চিমবঙ্গের স্বাধীনতা চান। তাহলে বুঝবো ওখানের বাঙ্গালীরা স্বাধীনতা চায়।

কিন্তু ঐ বাঙ্গালীরা স্বাধীনতা চান না। আপনারা অখন্ড ভারত চান। আমাদের পরাধীনতা চান। এ পরাধীনতার জন্য কি আমরা রাষ্ট্রভাষা আন্দোলন থেকে আরম্ভ করে, ‘৪৭ থেকে আরম্ভ করে বহু ত্যাগ করেছি, বহু জেল খেটেছি, বহু কষ্ট করেছি? নিজের লেখাপড়া বন্ধ হয়ে গেছে। বিশ্ববিদ্যালয় থেকে এক্সপেল করে দেওয়া হয়েছে। বিশ্ববিদ্যালয় আর পড়তে পারলাম না। বিদেশে আর পড়তে পারলাম না। যেহেতু এখানকার এক্সপালশান আছে আমার। সেহেতু এ রেফারেন্সে সেখানে আর হয় না। বার এট ল’ পড়তে পারিনি।

কিন্তু আপনারা কোনটা খাননি? কোন কলাটা, মূলাটা খাননি? পরাধীন থাকতেও আবার কলাটা, মূলাটা পাবেন। এখানে আইসা আমাদের দয়া করে বাঙ্গালী দাবী করে জ্বালাতন না করে দয়া করে পশ্চিমবঙ্গে যান, পশ্চিমবঙ্গে গিয়া ঐটাকে স্বাধীন করে আসেন। জ্যোতি বসুর সাথে কথা বলেন। আমি দেখতে চাই কেমন ব্যাটাডা হয়েছেন আপনারা।

আমাকে বলেন, আমি পারবো। আমি আগরতলায় আপনার মত পন্ডিতদের বলেছিলাম যে, – আমরা একটা কথা জিজ্ঞেস করি। আমরাও রাওয়ালপিন্ডি, করাচীর বিরুদ্ধে স্বাধীনতা ঘোষণা করে, আপনাদের এখানে আশ্রয় নিতে এসেছি যুদ্ধ করার জন্য। আপনারা এখন পশ্চিমবঙ্গের সাথে। পশ্চিমবঙ্গকে বলেন, আপনারা ত্রিপুরায় বাঙ্গালী বেশী, আপনারা বলেন, আমরা দিল্লীর অংশ হিসেবে থাকবনা। আমরা অখন্ড ভারতের অংশ হিসাবে থাকবনা। আমরাও স্বাধীনতা চাই, সার্বভৌমত্ব চাই, বাঙ্গালীদের জন্য। যেমন শরৎচন্দ্র চেয়েছিল, যেমন সোহরাওয়ার্দী সাহেব চেয়েছিলেন। যেমন কিরণ শংকর রায় চেয়েছিল, যেমন এস এম দাশ গুপ্ত চেয়েছিল। আপনারা দয়া করে এটা করেন। এখন সুযোগ আছে। কিন্তু সাহেব বলে, না, এটা আমরা করবো না। আমরা অখন্ড ভারতের সদস্য হিসাবে নিজেদেরকে গর্ববোধ করি॥” – অলি আহাদ

[ সাক্ষাৎকার । দৈনিক ইনকিলাব – ৪ মার্চ, ১৯৯৮ 

” … ‘জাতীয়’, ‘জাতি’-এ ধরণের শব্দের প্রতি আমাদের বিশেষ এক মোহ আছে। ১৯৪৭ সাল থেকে শেখানো হয়েছিল জাতির পিতা ‘কায়েদে আজম’, জাতির বন্ধু ‘কায়েদে মিল্লাত’। এ শব্দগুলি তাদের পিতৃদত্ত নামের আগে উচ্চারণ না করলে অনেকে ক্রুদ্ধ হতেন। আজ ভুলেও কেউ ঐ সব শব্দ উচ্চারণ করেন না।

বাংলাদেশ হওয়ার পরও এ মোহ আমাদের যায় নি। আবার ফিরে এলো ‘জাতির পিতা’, ‘বঙ্গবন্ধু’, ‘বঙ্গবীর’, ‘পল্লীবন্ধু’ শব্দাবলী। এখনও অনেকে ক্রুদ্ধ হন এসব শব্দ ব্যবহার না করলে। পৃথিবীর আর কোন অঞ্চলে এ ধরণের এতো উপাধি চালু আছে কিনা জানা নেই। একটি কথা সবাই ভুলে যান, আরোপিত কিছুই থাকে না॥” – [১৮.০৫.১৯৯০]

– মুনতাসীর মামুন / সব সম্ভবের দেশে ॥ [পল্লব পাবলিশার্স – ফেব্রুয়ারী, ১৯৯১ । পৃ: ৩১ ]

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

Shares