আওয়ামী লীগের স্বীকৃত ও বিকৃত জিয়া

আওয়ামী লীগের স্বীকৃত ও বিকৃত জিয়া

:: মারুফ কামাল খান ::

আমি খুব অবাক হই। অনেকে আওয়ামী লীগের কাছে শুদ্ধ ইতিহাস চর্চা আশা করেন। রাজনৈতিক সততা আশা করেন। সত্য কথন আশা করেন। আশা করেন, তারাও সত্য স্বীকার করবেন। নাবালক ও অজ্ঞরা এমন আশা করলে তা দোষের না। কিন্তু এমন আশা করেন তাদেরও কেউ কেউ যারা নিজেরা রাজনীতি করেন। যারা রাজনীতি সচেতন। এবং যারা অনেকদিন ধরেই দেখে আসছেন আওয়ামী রাজনীতি ও তৎপরতা। তারা এমন আশা করলে অবাক হতেই হয়।


কৌশলের নামে
এই দলটি যখন যেমন সুবিধা তখন তেমন। এটাই হচ্ছে তাদের রাজনীতি। তাদের কোনো স্থির রাজনৈতিক নীতি-আদর্শ কখনো ছিলনা। এখনো নেই। মিথ্যা বলা, ইতিহাস বিকৃত করা, ভুল ও মিথ্যা তথ্য বারবার সবাই মিলে প্রচার করতে করতে মানুষকে বিশ্বাস করানো, গুজব রটনা, প্রতিদ্বন্দ্বীদের চরিত্রহনন করতে যা খুশি করা, জাল-জালিয়াতি, নির্বাচনে কারচুপি এবং জোর থাকলে ভোট ডাকাতি, চক্রান্ত, গুণ্ডামি, ক্ষমতায় থাকলে রাষ্ট্রীয় সন্ত্রাস ও সব কিছু দলীয়করণ করে ফেলা – এগুলোকেই তারা রাজনৈতিক কৌশল বলে মনে করে। খুব খারাপ এই কাজগুলো দক্ষতার সাথে করতে পারাটাই তাদের কাছে রাজনৈতিক দক্ষতা। তাদের আরেকটা কৌশল, বিপদে বিলাই সাজা, আর বিপদ কেটে গেলে নরখাদক বাঘের মূর্তি ধারণ করা। তারা রাজনীতি করার ক্ষেত্রে দু’টি গুণকে সবচেয়ে বেশি অপছন্দ করে। এর একটি নৈতিকতা ও অন্যটি হচ্ছে সহনশীলতা।

মুক্তিযুদ্ধে জিয়াউর রহমানের অবদানের ব্যাপারে দলীয়ভাবে আওয়ামী লীগের স্বীকৃতির আরেকটি রেকর্ড ইতিহাসে পাওয়া যায়। তখন প্রেক্ষাপট ভিন্ন। দেশ স্বাধীন হয়েছে। পাকিস্তান থেকে শেখ সাহেব ফিরে এসে সদ্যস্বাধীন দেশের শাসনভার হাতে নিয়েছেন। আকাশচুম্বী জনপ্রিয়তা সত্বেও মুক্তিযুদ্ধে নিজের অনুপস্থিতির কারণে যুদ্ধকালীন ঘটনাপ্রবাহের ব্যাপারে তিনি খুবই স্পর্শকাতর। উনার অনুপস্থিতিতে নেতৃত্ব দেয়ার কারণে ব্যক্তি তাজউদ্দীন এবং আরো অনেক কিছুকেই তিনি খুব সহজ করে নিতে পারেন না। তাঁকে খুশি রাখতে তখন ঐসব প্রসঙ্গে সকলকেই খুব মেপে কথা বলতে হয়। সেই সময়টাতেই স্বাধীনতার পর পর ১৯৭২ সালের ৭-৮ এপ্রিল আওয়ামী লীগের কাউন্সিল হয় শেখ সাহেবের সভাপতিত্বে। সেই কাউন্সিলে সকলের সম্মতিতে পাস হওয়া সাধারণ সম্পাদকের রিপোর্টে আছে জিয়াউর রহমান সম্পর্কে কয়েকটি কথা। তাতে বলা হয়েছে: ” আওয়ামী লীগ নেতৃবৃন্দের পরামর্শক্রমে চট্টগ্রামে সশস্ত্র সংগ্রামেরত মেজর জিয়াউর রহমান বেতার মারফত বঙ্গবন্ধুর পক্ষ থেকে স্বাধীনতার ঘোষণা প্রচার করেন এবং বাংলাদেশে গণহত্যা রোধ করতে সারা পৃথিবীর সাহায্য কামনা করেন।”

স্বার্থই আদর্শ
আওয়ামী লীগের স্থির নীতি-আদর্শ বলে যে কিছু নেই তার বহু প্রমাণ আছে ইতিহাসের পাতায় পাতায়। মাত্র দু’-একটা উদাহরণ দিই। পাকিস্তান প্রতিষ্ঠার অল্প কিছুদিন পরেই এই দলটির জন্ম হয়েছিল। লক্ষ্য ছিল এ অঞ্চলের মধ্যবিত্ত ও নিম্নমধ্যবিত্ত মুসলমানের রাজনৈতিক স্বার্থ ও আশা-আকাঙ্ক্ষার প্রতিনিধিত্ব করা। কারণ, পাকিস্তান আন্দোলনে নেতৃত্ব দেয়া দল মুসলিম লীগ মুসলিম এলিট, উচ্চবিত্ত ও ভূস্বামীদের করায়ত্ব ছিল। ‘খাজা-গজা-নবাব-জমিদারদের’ কবল থেকে মুসলিম লীগকে রক্ষার জন্য তাই আওয়ামী মুসলিম লীগ বা সর্বসাধারণের মুসলিম লীগ গড়ার ঘোষণা দেন এর প্রতিষ্ঠাতারা। অসাম্প্রদায়িক কিংবা সকল ধর্মের নাগরিকদের সংগঠন ছিলনা সেটি। কিন্তু পরে তারা দলটির অসাম্প্রদায়িক রূপ প্রদান করেন। সেটিও কোনো আদর্শতাড়িত সিদ্ধান্ত ছিল না। ছিল দলীয় স্বার্থে পাল্টানো সিদ্ধান্ত।

দলিত ও কংগ্রেস
সেই আমলে ভারতে এবং পাকিস্তানে জাতীয় কংগ্রেস ছিল মূলতঃ উচ্চবর্ণের হিন্দুদের রাজনৈতিক সংগঠন। নিম্নবর্ণের দলিত বা তফসিলী হিন্দুদের একটি অংশকে পক্ষে রেখে কংগ্রেস-বিরোধী রাজনীতি করতো মুসলিম লীগ। তফসিলি জাতি ফেডারেশন নামে তাদের একটা সংগঠন ছিল। এই সংগঠনের নেতা বাকেরগঞ্জের সন্তান যোগেন্দ্রনাথ মণ্ডলকে দিয়ে পাকিস্তান জাতীয় পরিষদের প্রথম স্পিকারের দায়িত্ব পালন করান মোহাম্মদ আলী জিন্নাহ্। ড.আম্বেদকারের অনুসারী ও হিন্দুদের দলিত সম্প্রদায়ের নেতা যোগেন্দ্রনাথ মণ্ডল পাকিস্তানের প্রথম আইন ও ভূমিমন্ত্রীও ছিলেন। তবে জিন্নাহ্’র মৃত্যুর পর মুসলিম লীগের নেতারা তার সে রাজনীতি আর ধরে রাখতে পারেন নাই কিংবা ইচ্ছা করে রাখেন নাই। অল্প দিনের মধ্যেই পাকিস্তানের রাষ্ট্রীয় ক্ষমতা প্রথমে বেসামরিক আমলাতন্ত্র ও পরে সামরিক অধিনায়কেরা দখল করে নেয়। এরাও খুব শস্তা সাম্প্রদায়িক নীতি অবলম্বন করেই তাদের চলার পথ নির্ণয় করে নেয়। তখন সব জাতগোষ্ঠীর হিন্দুরাই পাকিস্তানে বিপন্ন বোধ করে এবং তাদের অধিকার নিয়ে শংকিত হয়ে পড়ে।
যোগেন্দ্রনাথ মন্ডল শুরুতেই এর প্রতিবাদ জানান। ব্যর্থ হলে পাকিস্তানের সকল পদ ছেড়ে লিয়াকত আলীর হাতে ইস্তফাপত্র দিয়ে ১৯৫০ সালে করাচি থেকে সোজা ইন্ডিয়ায় মাইগ্রেট করে চলে যান তিনি। পৃষ্ঠপোষকতার অভাবে এরপর তফসিলি ফেডারেশন ক্রমে ম্রিয়মাণ হয়ে পড়ে। কংগ্রেস নামে দল চালিয়ে যাওয়াও ঝুঁকিপূর্ণ মনে হতে থাকে দলের নেতাদের কাছে। তবে তখনো পাকিস্তানের জাতীয় ও প্রাদেশিক পরিষদগুলোতে হিন্দু সম্প্রদায়ের প্রতিনিধিত্ব নিশ্চিত করার জন্য পৃথক নির্বাচন ও কোটা পদ্ধতি বহাল ছিল। আওয়ামী লীগ ছিল পৃথক নির্বাচনের বিরুদ্ধে।

অসাম্প্রদায়িক হবার গল্প
সেই প্রতিনিধিত্বের ব্যাপারে আওয়ামী লীগের নেতাদের সংগে নেগোসিয়েশন শুরু হয় হিন্দু নেতাদের। গোপন আলোচনায় তারা অঙ্গিকার করেন যে, কোটা ও পৃথক নির্বাচনের ব্যবস্থা না থাকলেও হিন্দু প্রতিনিধিত্বের আনুপাতিক হার তারা অন্যান্য পন্থায় সব সময় নিশ্চিত করবেন। তখন হিন্দুদের ১২/১৩ শতাংশ ভোট ছিল। কেবল এই রিজার্ভ ভোট ব্যাংক নিশ্চিত করার আশায় তারা আওয়ামী মুসলিম লীগ থেকে ‘মুসলিম’ ছেঁটে একদম অসাম্প্রদায়িক স্মার্ট আওয়ামী লীগ হয়ে যায়। এতে দলে অমুসলিমদের প্রবেশের দরোজা খুলে যায়।
এরপর তদানীন্তন পূর্ব পাকিস্তানের জাতীয় কংগ্রেস নামের দলটি কোনো প্রকাশ্য ঘোষণা ছাড়াই ক্রমান্বয়ে বিলীন হয়ে যায়। কংগ্রেস নেতারাও নীরবে আওয়ামী লীগে আত্মীকরণ হতে থাকেন।
১৯৫৪ সালে আতাউর রহমান খানের নেতৃত্বে আওয়ামী লীগের প্রাদেশিক সরকারে কংগ্রেস নেতা ধীরেন্দ্রনাথ দত্ত মন্ত্রীত্ব গ্রহন করেন। ধীরেন্দ্রনাথ দত্ত পরে দলীয় রাজনীতিতে সক্রিয় না থাকলেও আমাদের স্বাধীনতা যুদ্ধে পাকিস্তানি বাহিনী তাকে হত্যা করে। পরিচিত আরো দু’জন কংগ্রেস নেতার কথা বলি – মনোরঞ্জন ধর ও ফণীভূষণ মজুমদার। তারাও পরবর্তীকালে আওয়ামী লীগের কেন্দ্রীয় নেতা ও মন্ত্রী হন। বাংলাদেশের স্বাধীনতার পরে অবশ্য এখানে আবার কংগ্রেস পুনর্গঠনের একটা উদ্যোগ হিন্দু নেতাদের কেউ কেউ নিয়েছিলেন। তবে সে চেষ্টা হালে পানি পায়নি। সীমান্তের এপার বা ওপারের কারো কাছ থেকে তারা কোনো সায় পাননি। যা হোক, সেটা আলাদা প্রসঙ্গ। আমি শুধু পুরো কাহিনীর একটা অংশ বললাম। দলীয় স্বার্থে আওয়ামী লীগের অসাম্প্রদায়িক চরিত্র গ্রহনের অংশটুকু।

ভোল পাল্টানো বারবার
পাকিস্তানে আওয়ামী লীগ আঞ্চলিক বৈষম্য নিরসন ও স্বায়ত্বশাসনের দাবিতে সোচ্চার দল ছিল। কিন্তু যখনই তারা নিজেদের হাতে ক্ষমতা পেয়েছে তখন বলেছে ৯৮ ভাগ স্বায়ত্বশাসন হয়ে গেছে। এই আওয়ামী লীগই পাকিস্তান আমলে সংখ্যগরিষ্ঠের স্বার্থবিরোধী দুই অঞ্চলের প্রতিনিধিত্বের ক্ষেত্রে উদ্ভট ‘সংখ্যাসাম্য নীতি’ মেনে নেয়। পূর্ব পাকিস্তানে লোক বেশি ও পশ্চিমে কম হলেও সংখ্যাসাম্য নীতি অনুযায়ী দুই অঞ্চলে নির্বাচনী আসনের সমান সংখ্যা মেনে নেয়া হয়।
পাকিস্তান আমলে আগরতলা ষড়যন্ত্র মামলায় শেখ মুজিবুর রহমানের মতন একজন রাজনৈতিক নেতাকে আসামী করা একটি ঐতিহাসিক ঘটনা। অভিযোগ ছিল, ভারতের সঙ্গে যোগসাজস করে কয়েকজন বাঙালি সিএসপি অফিসার, সামরিক বাহিনীর কতিপয় নিম্নপদস্থ অফিসার ও রাজনৈতিক নেতা-কর্মী বিদ্রোহ ঘটিয়ে তদানিন্তন পূর্ব পাকিস্তানকে বিচ্ছিন্ন ও স্বাধীন করার ষড়যন্ত্রে লিপ্ত। এই রাষ্ট্রদ্রোহ মামলায় আওয়ামী লীগ নেতা শেখ মুজিবুর রহমানকেও জড়ানো হয়। অভিযোগ আনা হয়, এ চক্রান্তে তিনিও যুক্ত এবং ভারতীয়দের সঙ্গে মিলে পরিকল্পনা করতে গোপনে সীমান্ত পেরিয়ে তিনি সশরীরে আগরতলা গিয়েছিলেন।
শেখ সাহেব বরাবর এ অভিযোগ অস্বীকার করেছেন। দাবি করেছেন, তিনি কখনো বিচ্ছিন্নতাবাদী নন, খাঁটি পাকিস্তানি। তিনি নিজেকে পাকিস্তান প্রতিষ্ঠার একজন সাচ্চা সৈনিক দাবি করে বলেছেন, প্রকাশ্য রাজনীতিই তার পথ, কোনো গোপন চক্রান্ত নয়। তিনি বলেছেন, প্রাদেশিক বৈষম্য সৃষ্টির হোতারাই প্রকারান্তরে বিচ্ছিন্নতাবাদকে উৎসাহিত করছে। আঞ্চলিক বৈষম্য নিরসনের প্রবক্তা হিসেবে তিনি আসলে পাকিস্তানের সংহতিই জোরদার করেছেন। শেখ সাহেবের তখনকার একটি বিখ্যাত উক্তি হচ্ছে: ইন্দোনেশিয়ার এতগুলো দ্বীপ এক সঙ্গে থাকতে পারলে পাকিস্তানের মাত্র দুটি অঞ্চল কেন আমরা একত্রে থাকতে পারবো না?
আগরতলা ষড়যন্ত্র মামলাকে আওয়ামী লীগের পক্ষ থেকে সব সময় মিথ্যা বলে দাবি করা হয়েছে। এই মিথ্যা মামলা দায়েরের কারণে এর বিরুদ্ধে জনগণও ক্ষুব্ধ হয়। আশ্চর্যের ব্যাপার হচ্ছে, স্বাধীনতার পর আওয়ামী নেতারা, এমনকি শেখ সাহেব নিজেও অনেক আগে থেকেই তারা স্বাধীনতা আনতে সচেষ্ট ছিলেন বলে প্রমান করতে এবং নিজেরা কৃতিত্ব নেয়ার জন্য বলে ওঠেন, আগরতলা ষড়যন্ত্র মামলা পুরোপুরি মিথ্যা ছিলনা কিন্তু।
আওয়ামী লীগ পাকিস্তান আমলে ঘোরতর মার্কিনপন্থী দল ছিল। সমাজতন্ত্রের বিরুদ্ধে প্রকাশ্য অবস্থান ছিল তাদের। আমাদের স্বাধীনতাযুদ্ধকালে যুক্তরাষ্ট্র বৈরি ও সোভিয়েত ইউনিয়ন অনুকূল অবস্থান নেয়। এই বাস্তব পরিস্থিতিতে আওয়ামী লীগ রাতারাতি ভোল পাল্টে সমাজতন্ত্রী সাজে। দীর্ঘদিনের অবস্থান ত্যাগ করে তারা ঘোর মার্কিন-বিরোধী ও সোভিয়েত-পন্থী হয়ে যায়।

তিন থেকে চার মূলনীতি
তারা দাবি করে এবং মুখে ফেনা তুলে বলতে থাকে যে, আমাদের মুক্তিযুদ্ধের মধ্য দিয়ে নাকি চারটি রাষ্ট্রীয় মৌলনীতির উদ্ভব ঘটেছে। সেগুলো হচ্ছে গণতন্ত্র, সমাজতন্ত্র, ধর্মনিরপেক্ষতা ও জাতীয়তাবাদ। অথচ সচেতন পুরনো লোকেরা এবং ইতিহাসের উপকরণ নিয়ে যারা কিছু ঘাঁটাঘাঁটি করেন তারা জানেন যে, আওয়ামী লীগ কন্সটিটিউয়েন্ট এসেম্বলিতে ১৯৭২ সালে পেশ করা খসড়া সংবিধানে তিনটি রাষ্ট্রীয় মূলনীতির কথা উল্লেখ করেছিল। এগুলো ছিল: গণতন্ত্র, সমাজতন্ত্র ও ধর্মনিরপেক্ষতা। জাতীয়তাবাদ রাষ্ট্রীয় মূলনীতি হিসেবে ছিল না। মুক্তিযুদ্ধের সর্বাধিনায়ক ও তখনকার মন্ত্রী অবসরপ্রাপ্ত জেনারেল এম. এ. জি ওসমানী এতে রেগে গিয়ে লম্বা বক্তৃতা করেন। তিনি বলেন, ভাষা আন্দোলন থেকে শুরু করে ধাপে ধাপে যে সব আন্দোলনের মধ্যে দিয়ে আমাদের জাতীয় চেতনার উন্মেষ ও স্ফূরণ ঘটে সেগুলো ছিল জাতীয়তাবাদী আন্দোলন। ছাত্র-তরুণ, সাংস্কৃতিক কর্মী এমনকি বাঙালি সৈনিকদের মধ্যেও সেই আন্দোলন তরঙ্গ তোলে। সেই জাতীয়তাবাদের চেতনাই আমদেরকে অবশেষে স্বাধীনতাযুদ্ধের রণাঙ্গনে টেনে নিয়ে যায়। অথচ সেই স্বাধীনতাযুদ্ধে অর্জিত রাষ্ট্রের মূলনীতিতে জাতীয়তাবাদককেই রাখা হয়নি।
এরপর জেনারেল ওসমানীর আনীত সংশোধনী প্রস্তাবের ওপর বিতর্ক হয়। অবশেষে মূলনীতি হিসেবে জাতীয়তাবাদকেও গ্রহন করা হয়।
অবশ্য এই জাতীয়তাবাদ-এর একটি দিক নিয়ে নাগরিকত্ব বিষয়ক একটি ঐতিহাসিক বিতর্কও তখন অনুষ্ঠিত হয়েছিল। পার্বত্যাঞ্চলের সদস্য মানবেন্দ্র নারায়ন লারমা সেই বিতর্কের সূত্রপাত করে বলেন, অবাঙালি উপজাতীয়দের নৃতাত্ত্বিক সত্ত্বা ও পরিচয় আলাদা। তাই বাঙালি পরিচয়ের মধ্যে তাদের স্বাতন্ত্র‍্য বিলীন হতে পারেনা। তাদেরকেও একোমডেট করার জন্য বাংলাদেশের নাগরিকদের বাংলাদেশি পরিচয় প্রবর্তন করা যেতে পারে। অবশ্য তার প্রস্তাব ও আকুতি সেদিন গ্রাহ্য করা হয়নি।

সিমলা, সাধারণ ক্ষমা এবং…
স্বাধীনতার পর তারা তারস্বরে চিৎকার করে বলেছে ভারতে আটক যুদ্ধাপরাধী পাকিস্তানি সেনাদের বাংলার মাটিতে বিচার হবেই। তাদের সরকার সিমলা চুক্তিতে সায় দিয়ে আটক সব পাকিস্তানি সৈন্যকে কোনো বিচার ছাড়াই মুক্তি দেয়। তাদের বাংলাদেশী সহযোগীদের জন্য ঘোষণা করে সাধারণ ক্ষমা। বহু বছর পর তারাই আবার সেই অবস্থান বদল করে ইচ্ছে পূরণের আইন বানিয়ে চুজ এন্ড পিক ভিত্তিতে অস্বচ্ছ প্রক্রিয়ার ‘যুদ্ধাপরাধীর সাজা’ নামক অনাধুনিক যাত্রাপালা মঞ্চস্থ করেছে। এর মাধ্যমে অন্য কোথাও দেয়া অঙ্গিকার বাস্তবায়ন করেছে।
প্রয়োজনে একদিকে তারা ভুট্টো, বেনজির, ইমরান খানের সাথে খায়খাতির জমাতে কসুর করেনা, আবার দ্বিধা করেনা পাকিস্তানের নাম শুনলেই থুতু ছিটাতে।
গণতন্ত্রের চ্যাম্পিয়ন আওয়ামী লীগের ১৯৭৫ সালে একদলীয় বাকশাল পদ্ধতি কায়েমের কথা সকলেই জানেন। এর আওতায় সরকারি অফিসার, পুলিস ও সশস্ত্রবাহিনীর সদস্যদেরকেও একমাত্র রাজনৈতি দল বাকশাল-এর অন্তর্ভুক্ত করা হয়। তারা অন্য সময়ে প্রজাতন্ত্রের সামরিক-বেসামরিক কর্মচারীদের রাজনৈতিক ভূমিকার নিন্দা করেছে। কিন্তু জেনারেল মইনের ক্যু এবং ব্রিগেডিয়ার খালেদ মোশাররফ ও জেনারেল নাসিমের ক্ষমতা দখলের চেষ্টাকে প্রকাশ্যে সমর্থন দিয়েছে। আবার জনতার মঞ্চ নাম দিয়ে সিভিল প্রশাসনের লোকদের রাজনৈতিক মঞ্চে তাদেরকে তুলে দলীয় স্বার্থ হাসিল করেছে।
স্বাধীনতার পর তারা দেশে ধর্মভিত্তিক রাজনৈতিক দল নিষিদ্ধ করেছে। আবার প্রয়োজন পড়লে এসব দলের সঙ্গে মিলে একই ইস্যুতে আন্দোলন করেছে, লিখিত চুক্তি করে তাদের এজেন্ডা বাস্তবায়ন করে দেয়ার অঙ্গিকার করেছে।
এই সেদিনও শাপলা চত্বরে সশস্ত্র নৈশ অভিযানে নির্মম ভাবে উচ্ছেদের পরেও যাদের বিরুদ্ধে আওয়ামী লীগ কুৎসিৎ ও আক্রমণাত্মক ভাষায় প্রচারণা চালিয়েছে
সেই হেফাজতে ইসলামের সাথেই এখন কী দহরম মহরম তাদের!

শাহবাগের আপ-ডাউন
আওয়ামী লীগের কাছে সবসময় গরজ বড় বালাই। প্র‍য়োজন দেখে শাহবাগে একদল তরুণকে কয়েক বছর আগে এই আওয়ামী লীগ রাষ্ট্রেরও উর্ধে স্থাপন করে কী সার্কাসই না করছে! ওরা বলে দাঁড়াও, দাঁড়িয়ে যায় মন্ত্রীরা পর্যন্ত। ওরা বলে পতাকা তোলো, সচিবালয়েও উঠতে থাকে পতাকা। নামাতে বললে নেমে যায়। তারা আজ কোথায়? প্রয়োজন ফুরালে পুলিশ দিয়ে পিটিয়ে পিঠের ছাল-বাকল তুলে ওদেরকে সময়মতো স্তব্ধ করে দেয়া হয়েছে।
একসময় আওয়ামী লীগের কণ্ঠে ছিল মুজিববাদের জিকির, সেটা থেমে গেছে। তারা কিন্তু এখন আর সমাজতন্ত্রীও নেই মোটেও। জিয়ার তীব্র নিন্দুক দলটি এখন তার বিরাষ্ট্রীকরণ ও মিশ্র অর্থনীতি সহ অনেক কিছুই অনুসরণ করছে। বিএনপির প্রবর্তন করা ভ্যাট তাদেরও খুব দরকার। র‍্যাব গঠন নিয়ে বিএনপিকে তুলোধুনো করলেও দরকার তাদের সেটিও।
কয়টার কথা বলবো? তত্ত্বাবধায়ক সরকারের দাবিতে সন্ত্রাসী ধারার আন্দোলন করে দেশ ছারখার করা আওয়ামী লীগ শুধু ক্ষমতার স্বার্থে কী নির্লজ্জভাবে সেই প্রথা বিলোপ করেছে। নির্বাচনের নামে কী অশ্লীল প্রহসন করে যাচ্ছে তা সকলেরই চোখে দেখা। অথচ শুধু মানুষের ভোট আর ভাতের অধিকার কায়েমের জন্য নিজের জীবন বিলিয়ে দিতে একপায়ে খাড়া বলে কতবার গলায় রক্ত তুলেছেন শেখ হাসিনা। বলেছেন, মানুষের ভোটটা চুরি করে ক্ষমতায় যাবার কোনো নিয়ত তার কখনো নাই। বলেছেন, ক্ষমতার কাঙাল নন তিনি মোটেও। চান শুধু বাংলার মানুষের অধিকার।

ভাঙ্গার জন্য প্রতিশ্রুতি
বিরোধী দলকে মর্যাদা দেয়া, সংখ্যা দিয়ে বিচার না করা, রেডিও-টিভির স্বায়ত্বশাসন, নিজেকে মাত্র সপ্তাহে একদিনের বেশি গণমাধ্যমে উপস্থান না করা, রাষ্ট্রীয় প্রচার মাধ্যমে সব দলের প্রচার নিশ্চিত করা, মন্ত্রী ও এমপিদের প্রতি বছর জনসমক্ষে সম্পদের হিসেব দেয়া, দুর্নীতি উচ্ছেদ সহ আরো কত রঙিন প্রতিশ্রুতি যে এই দল দিয়েছে। সেগুলো আজ কোথায়? দশ টাকা কেজি দরে চাল, ফ্রি সার, ঘরে ঘরে চাকরি, শস্তায় নিত্যপণ্য ও সুলভে রোগের চিকিৎসার অঙ্গিকার তো এখন অনেক দূরের বাদ্য।
এই দলটির কাছে সদাচরণ যাচনা করে যারা গলদঘর্ম হন, তাদেরকে করুণা ছাড়া আর কী-বা করা চলে? আওয়ামী লীগ সারাদিন বিএনপি, জিয়া, খালেদা জিয়ার বদনাম করে, তাদের বিরুদ্ধে কুৎসা রটায়। এতে অনেকে দুঃখ পান। তারা কি আশা করেন ওরা তাঁদের সুনাম করবে? মুখে স্বীকার করুক না করুক আওয়ামী লীগের প্রতিটা লোক খুব ভালো করেই জানে যে, এতো কিছু করার পরেও দেশের লোকের কাছে তাদের তুলনায় জিয়া, বিএনপি এবং খালেদা জিয়ার জনপ্রিয়তা ও গ্রহনযোগ্যতা অনেক বেশি। জানে বলেই মোটামুটি একটা সুষ্ঠু নির্বাচনের ঝুঁকি নেয়ার সাহস নেই তাদের। আর এ অবস্থা যতদিন থাকবে, ততদিন এই কুৎসা এবং যে-কোনো মূল্যে বিএনপি বিনাশই তাদের
রাজনীতির প্রধান করণীয় হয়ে থাকবে।

মুক্তিযুদ্ধের সূচনায় স্বীকৃতি
আরেকটা উদাহরণ দিয়ে এ লেখা শেষ করবো। জিয়াউর রহমান ছিলেন পাকিস্তানী চর, মন থেকে মুক্তিযুদ্ধ করেননি, স্বাধীনতার চেতনার তিনি বারোটা বাজিয়েছেন, সোয়াত জাহাজের অস্ত্র খালাসের জন্য যাবার পথে পাব্লিক জিয়াকে ধরে এনে তাকে দিয়ে রেডিওতে স্বাধীনতার কথা বলিয়ে নেয় – এসব আওয়ামী বয়ান শুনতে শুনতে আমাদের কান পচে গেছে। অথচ জিয়া যখন রাজনৈতিক প্রতিদ্বন্দ্বী হয়ে উঠেননি, ক্ষমতায় আসেননি, দল করেননি তখন আওয়ামী লীগ কি এসব কথা বলেছে? যে আওয়ামী লীগ কখনো কারো কৃতিত্ব পারতপক্ষে স্বীকার করেনা সেই আওয়ামী লীগের সাধারণ সম্পাদক তাজউদ্দীন আহমদ মুক্তিযুদ্ধ শুরুর পর ১৯৭১ সালের ১১ এপ্রিল প্রবাসী সরকারের প্রধানমন্ত্রী হিসেবে জাতির উদ্দেশে দেয়া প্রথম বেতার ভাষণে বলেছিলেন: “চট্টগ্রাম ও নোয়াখালী অঞ্চলের সমর পরিচালনার ভার পড়েছে মেজর জিয়াউর রহমানের ওপর। নৌ, স্থল ও বিমান বাহিনীর আক্রমণের মুখে চট্টগ্রাম শহরে যে প্রতিরোধব্যুহ গড়ে উঠেছে এবং আমাদের মুক্তিবাহিনী ও বীর চট্টলের ভাইবোনেরা যে সাহসিকতার সাথে শত্রুর মোকাবেলা করেছেন, স্বাধীনতা সংগ্রামের ইতিহাসে এই প্রতিরোধ স্টালিনগ্রাডের পাশে স্থান পাবে। এই সাহসিকতাপূর্ণ প্রতিরোধের জন্য চট্টগ্রাম আজও শত্রুর কবলমুক্ত রয়েছে। চট্টগ্রাম শহরের কিছু অংশ ছাড়া চট্টগ্রাম ও সম্পূর্ণ নোয়াখালী জেলাকে মুক্ত এলাকা বলে ঘোষণা করা হয়েছে।”
মুক্তিযুদ্ধের সূচনাতেই জিয়াউর রহমানের বীরত্ব, সাফল্য ও কৃতিত্বের ব্যাপারে যুদ্ধকালীন সরকারের প্রধানমন্ত্রীর ভাষণে মুক্তকণ্ঠে উচ্চারিত এই উচ্ছ্বসিত প্রসংশা আমাদের জাতীয় ইতিহাসের অমোচনীয় রেকর্ড। অথচ অর্বাচীনেরা এখন কী বলে বেড়াচ্ছে!
সেই একই ভাষণে আরেকটি তাৎপর্যপূর্ণ বিষয় উল্লেখ করেন প্রধানমন্ত্রী তাজউদ্দীন। বলেন : “এই প্রাথমিক বিজয়ের সাথে সাথে মেজর জিয়াউর রহমান একটি পরিচালনা কেন্দ্র গড়ে তোলেন এবং সেখান থেকে আপনারা শুনতে পান স্বাধীন বাংলাদেশের প্রথম কন্ঠস্বর। এখানেই প্রথম স্বাধীন বাংলাদেশ সরকার গঠনের কথা ঘোষণা করা হয়।”
বুঝেন তাহলে। কালুরঘাটের বেতার তরঙ্গ মারফত জিয়াউর রহমানের স্বকণ্ঠে দেয়া ঘোষণাকে সেই সময়েই প্রবাসী সরকারের প্রধানমন্ত্রী বলছেন : ‘স্বাধীন বাংলাদেশের প্রথম কণ্ঠস্বর।’ তার অর্থ খুব পরিষ্কার।এই ঘোষণার আগে আর কোনো কণ্ঠ থেকেই উচ্চারিত হয়নি বাংলাদেশের স্বাধীনতার কথা, এটাই প্রথম।
প্রধানমন্ত্রীর দায়িত্বে থেকে সারা দুনিয়ার সামনে দেয়া বেতার ভাষণে তিনি কি নিশ্চিত না হয়ে এই কথা এতো স্পষ্ট করে বলেছিলেন? কেবল তাই নয়, জিয়াউর রহমান নিজেকে অস্থায়ী রাষ্ট্রপতি ও মুক্তিবাহিনীর সাময়িক প্রধান হিসেবে উল্লেখ করে সরকার গঠনের যে ঘোষণা দেন, সে ঘোষণাও তিনি এই বক্তব্যের মাধ্যমে অনুমোদন করেন। এতে সরকার ধারাবাহিকতা পায়। এর আগে পয়লা এপ্রিল তেলিয়াপাড়া চা বাগানে এম এ জি ওসমানীকে প্রধান করে মুক্তিবাহিনীর কমান্ড স্ট্রাকচার গঠিত হলে মুক্তিবাহিনী প্রধান হিসেবে জিয়াউর রহমানের সাময়িক দায়িত্বের অবসান ঘটে। নির্বাচিত জনপ্রতিনিধিদের সমন্বয়ে ১০ এপ্রিল প্রবাসী সরকার গঠিত হলে অবসান ঘটে অস্থায়ী রাষ্ট্রপতি হিসাবে জিয়াউর রহমানের প্রতিকী দায়িত্ব পালনের। এগুলো আওয়ামী লীগ কখনো নিজে থেকে বলা দূরে থাক, কেউ বললেও তা নানা রকম ধানাই পানাই করে অস্বীকার করবে।

অফিসিয়াল স্বীকৃতি
মুক্তিযুদ্ধে জিয়াউর রহমানের অবদানের ব্যাপারে দলীয়ভাবে আওয়ামী লীগের স্বীকৃতির আরেকটি রেকর্ড ইতিহাসে পাওয়া যায়। তখন প্রেক্ষাপট ভিন্ন। দেশ স্বাধীন হয়েছে। পাকিস্তান থেকে শেখ সাহেব ফিরে এসে সদ্যস্বাধীন দেশের শাসনভার হাতে নিয়েছেন। আকাশচুম্বী জনপ্রিয়তা সত্বেও মুক্তিযুদ্ধে নিজের অনুপস্থিতির কারণে যুদ্ধকালীন ঘটনাপ্রবাহের ব্যাপারে তিনি খুবই স্পর্শকাতর। উনার অনুপস্থিতিতে নেতৃত্ব দেয়ার কারণে ব্যক্তি তাজউদ্দীন এবং আরো অনেক কিছুকেই তিনি খুব সহজ করে নিতে পারেন না। তাঁকে খুশি রাখতে তখন ঐসব প্রসঙ্গে সকলকেই খুব মেপে কথা বলতে হয়। সেই সময়টাতেই স্বাধীনতার পর পর ১৯৭২ সালের ৭-৮ এপ্রিল আওয়ামী লীগের কাউন্সিল হয় শেখ সাহেবের সভাপতিত্বে। সেই কাউন্সিলে সকলের সম্মতিতে পাস হওয়া সাধারণ সম্পাদকের রিপোর্টে আছে জিয়াউর রহমান সম্পর্কে কয়েকটি কথা। তাতে বলা হয়েছে: ” আওয়ামী লীগ নেতৃবৃন্দের পরামর্শক্রমে চট্টগ্রামে সশস্ত্র সংগ্রামেরত মেজর জিয়াউর রহমান বেতার মারফত বঙ্গবন্ধুর পক্ষ থেকে স্বাধীনতার ঘোষণা প্রচার করেন এবং বাংলাদেশে গণহত্যা রোধ করতে সারা পৃথিবীর সাহায্য কামনা করেন।”
স্বাধীনতা যুদ্ধ চলাকালে প্রধানমন্ত্রীর ভাষণে জিয়াউর রহমানকে স্বাধীনতা ঘোষণার মোটামুটি একক কৃতিত্ব দেয়া হলেও স্বাধীনতার পর আওয়ামী লীগ বিষয়টাকে একটু মডিফাই করে। এটাকে একেবারে মিথ্যাও বলা যাবেনা। নিজের নামে স্বকণ্ঠে স্বাধীনতার ঘোষণা কয়েকবার দেয়ার পর আওয়ামী লীগের স্থানীয় নেতাদের অনুরোধে শেখ সাহেবের নাম তাতে যুক্ত করেছিলেন জিয়াউর রহমান। কেননা তাঁর নিজের কৃতিত্ব নেয়ার কোনো উদ্দেশ্য ছিল না, লক্ষ্য ছিল স্বাধীনতা। শেখ সাহেব তখন এই অঞ্চলের নির্বাচিত জনপ্রতিনিধিদের নেতা। ঘোষনাটি তাঁর পক্ষ থেকে দেয়া হচ্ছে বললে গ্রহনযোগ্যতা বাড়ে। তাই তিনি সেটা করতে দ্বিধা করেননি।
যাই হোক, শেখ সাহেব নিজে এবং তাজউদ্দীন সহ প্রবাসী সরকারের সব নেতার সম্মতিতে পাস হওয়া রিপোর্টে মুক্তিযুদ্ধে জিয়াউর রহমানের ভূমিকা সম্পর্কে আওয়ামী লীগের এটাই একমাত্র অফিসিয়াল পজিশন এবং এটা ইতিহাসের রেকর্ড। অয়্যারলেস, টেলিগ্রাম বা এর ওর মারফত অন্য কোনো ভাবে অন্য কারো স্বাধীনতা ঘোষণার কোনো ভাষ্য সেখানে নেই। ওই ঘোষণায় জিয়া বাংলাদেশে গণহত্যা রোধে সারা পৃথিবীর সাহায্য চেয়েছেন বলেও স্বীকার করা হয়েছে। জিয়াউর রহমানের স্বকণ্ঠে প্রচারিত ঘোষণাটিকেই আওয়ামী লীগ তাদের ভাষায় ‘বঙ্গবন্ধুর স্বাধীনতা ঘোষণা’ বলে উল্লেখ করে এবং রিপোর্টের পরবর্তী বাক্যেই বলা হয়: “বঙ্গবন্ধুর স্বাধীনতা ঘোষণার কথা জানতে পেরে বাংলার মানুষ এক দুর্জয় প্রতিরোধ আন্দোলন গড়ে তুললো। সারা বাংলাদেশে সামরিক, আধাসামরিক ও বেসামরিক কর্মীরা অপূর্ব দক্ষতা, অপরিসীম সাহসিকতা ও অতুলনীয় ত্যাগের মনোভাব নিয়ে মাতৃভূমির স্বাধীনতা রক্ষার সংগ্রামে অগ্রসর হন।”
কী বুঝলেন? আওয়ামী লীগের সেই ঐতিহাসিক দলিলই বুঝিয়ে দিচ্ছে, আগে কিংবা পরে নয়, অন্য কোনো ভাবেও নয়, জিয়ার কণ্ঠেই উচ্চারিত হয়েছে স্বাধীনতার ঘোষনা। মুজিবের নামাঙ্কিত জিয়ার ঘোষণাই স্বাধীনতার তূর্যধ্বনি। এই ডাকের ফলেই স্বাধীনতার লড়াই শুরু হয়।

টাইম মেশিন

তবুও কি আওয়ামী নেতারা জিয়ার অবদান অস্বীকার করবেন? জিয়া রাজনৈতিক প্রতিদ্বন্দ্বী হয়ে ওঠার পর আওয়ামী লীগ নেতারা তাঁকে তুচ্ছ বা খাটো করার জন্য কত রকমের কেচ্ছা-কাহিনীর যে জন্ম দিচ্ছেন তার ইয়ত্তা এই। নিত্য নতুন সেসব গল্প বলা ফুরায় না। কিন্তু তারা ভুলে যান ইতিহাস তাদের কৃপার ভিখারি নয়। তাদের দেয়া সার্টিফিকেটের জন্য ইতিহাস বসে থাকবে না। জাতীয় জীবনে যখন কোনো বড় কোনো ঘটনা ঘটে যায় তখন বিভিন্ন ব্যক্তি তাতে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখেন। কারো ভূমিকা থাকে জাতীয় স্বার্থের পক্ষে, আবার কারো বিপক্ষে। ঘটনার বিকৃত বয়ান দেয়া যায়, কিন্তু ঘড়ির কাঁটাকে পেছনে ঘুরিয়ে সে ঘটনাকে বদলানো যায় না। কুৎসা রটানো যায়, কিন্তু টাইম মেশিনে চড়ে পেছনে ফিরে গিয়ে পাল্টানো যায় না কারো ভূমিকাকেও। জীবনকালে ইতিহাস নির্ধারিত ভূমিকা পালনের কারণে নন্দিত হয়ে জিয়াউর রহমান মৃত্যুর দুয়ার পেরিয়ে যবনিকার আড়ালে চলে গেছেন। তাঁর সব কর্ম, ভূমিকা ও অবদান এখন ইতিহাসের সম্পত্তি। এগুলো আওয়ামী লীগের বা অন্য কারুর স্বীকৃতি, বিকৃতি বা অস্বীকৃতির তোয়াক্কা করেনা।

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *