আইয়ুবী শাসনামলে পাকিস্তান লেখক সংঘে বুদ্ধিজীবীদের ভূমিকা

আইয়ুবী শাসনামলে পাকিস্তান লেখক সংঘে বুদ্ধিজীবীদের ভূমিকা

“… ১৯৫৯ সালের ৩১ জানুয়ারি তদানীন্তন পাকিস্তানের প্রেসিডেন্ট আয়ুব খানের প্রেরণায় এবং পৃষ্ঠপোষকতায় নিখিল পাকিস্তান ভিত্তিক এই (পাকিস্তান রাইটার্স গিল্ড বা পাকিস্তান লেখক সংঘ) সাহিত্য প্রতিষ্ঠানের জন্ম হয়। পাকিস্তান সরকারের শিক্ষাসচিব কুদরতুল্লাহ শাহাব ছিলেন এর প্রথম সাধারণ সম্পাদক। উর্দু ও বাংলা ভাষার ১১ জন করে, পাঞ্জাবী, পশতু, সিন্ধী প্রত্যেকটি ভাষার ১ জন করে মোট ২৫ জন সদস্য নিয়ে এর কেন্দ্রীয় কার্যকরী কমিটি গঠিত হয়। প্রথম কার্যকরী কমিটিতে পূর্ব পাকিস্তানের যে সমস্ত সদস্য ছিলেন, তারা হচ্ছেন – প্রিন্সিপাল ইব্রাহীম খাঁ, কবি গোলাম মোস্তফা, কবি জসীম উদ্দীন, ড. সৈয়দ সাজ্জাদ হোসায়েন, বেগম শামসুন্নাহার মাহমুদ, কবি আবদুল কাদির, প্রিন্সিপাল মোহাম্মদ আজরফ, আসকার ইবনে শাইখ, কবি আবুল হোসেন, মুহম্মদ আবদুল হাই ও সৈয়দ ওয়ালিউল্লাহ্। সংঘের প্রাথমিক তহবিল গড়ে উঠেছিল সরকার কর্তৃক বিনাসুদে প্রদত্ত এক লক্ষ টাকা ঋণ দিয়ে। পূর্ব পাকিস্তান লেখক সংঘের মুখপত্র হিসেবে ‘পূরবী’ নামে ত্রৈমাসিক একটি মাত্র সংখ্যা প্রকাশিত হবার পর ‘লেখক সংঘ পত্রিকা’ নামে এর নতুন নামকরণ হয়। মাসিকে রূপান্তরিত পত্রিকাটির কিছুকাল একক সম্পাদক ছিলেন গোলাম মোস্তফা। পরে গোলাম মোস্তফা ব্যক্তিগত কারণে পদত্যাগ করলে মুখপত্রটি ‘পরিক্রম’ নামে সিরাজুল ইসলাম চৌধুরী এবং রফিকুল ইসলামের সম্পাদনায় প্রকাশিত হয়॥”

— ড. মো: আবুল কাসেম / বাংলা সাহিত্যে মুসলিম স্বাতন্ত্র্য চেতনা : ১৯৪০-‘৭০ (অভিসন্দর্ভ) ॥ [ আহমদ পাবলিশিং – ফেব্রুয়ারি, ২০০৯ । পৃ: ৩১ ]

এতো বছর আগের এই ছোট্ট ঘটনাটির কথা এ কারণে বললাম যে, এতে দুটি প্রসঙ্গ বেশ স্পষ্ট। একটি আবুল ভাইয়ের জেনারেশান লেখক সংঘকে মােটামুটি একটি খোলামন নিয়ে গ্রহণ করেছিলেন। কিন্তু তার পরের জেনারেশান অর্থাৎ আমরা এই লেখক সংঘ ব্যাপারটিকে যেমন এক কথায় খারিজ করতে এগিয়ে যাইনি, তেমনি সম্পূর্ণ খোলামন নিয়ে গ্রহণও করতে পারিনি। একটি অনুচ্চারিত দ্বিধা ছিলো আমাদের মধ্যে পাকিস্তান লেখক সংঘকে সরাসরি আমাদের কর্মকাণ্ডে গ্রহণ করতে। কেননা একটা ব্যাপার বেশ পরিষ্কার ছিলো আমাদের কাছে তখন লেখক সংঘের সব চাবিকাঠিই আছে দেড় হাজার মাইল দূরে করাচীতে। সঙ্গত কারণেই তাই পাকিস্তান সাহিত্য সংসদ আমাদের যত কাছের ছিলো – পাকিস্তান লেখক সংঘ ততটা হল না। হতে পারেনি। সুতরাং হাসান যখন এলেন লেখক সংঘের কর্মকাণ্ডে তখন তাকে একদিন সরাসরি প্রশ্ন করলাম আমি, আপনি কেন এলেন লেখক সংঘে?



০২.

“… আইয়ুবী শাসনামলে পাকিস্তান লেখক সংঘের সাথে আমরা যে যুক্ত হয়েছিলাম তার বুঝি একটা ব্যাখ্যা প্রয়োজন। কাজটা ঠিক হয়েছিল কি না সে নিয়ে তখনও প্রশ্ন উঠেছে। পরে প্রশ্ন উঠেছে আরো জোরেশোরে। আমার নিজের দিক থেকে ব্যাপারটা ঘটেছিল এভাবে। লেখক সংঘ সরকারি টাকায় চলে, তার উদ্দেশ্য লেখকদের ওপর পুঁজিবাদের পথ ধরে অগ্রসরমান রাষ্ট্রের আধিপত্য প্রতিষ্ঠা – এসব তো জানা ছিলই, কিন্তু আমার চিন্তা ছিল এই রকমের যে, প্রতিষ্ঠানটির পূর্বাঞ্চলীয় শাখার ওপর যদি আমরা আমাদের নিয়ন্ত্রণ প্রতিষ্ঠা করতে পারি তাহলে প্র্থমত আমাদের হাতে একটা পত্রিকা আসবে, দ্বিতীয়ত আমরা বসবার এবং অনুষ্ঠানাদি করার জন্য একটা জায়গা পাবো – দে দু’টির কোনোটিই তখন আমাদের আয়ত্তে ছিল না, এবং আসবে যে তার সম্ভাবনাও দেখা যায়নি। সর্বোপরি আমরা তো সরকারের দালালি করবো না, বরঞ্চ যারা করতে চায় তাদেরকে প্রতিহত করবো এবং এবং যতদূর পারা যায় প্র্তিষ্ঠানটিকে কাজে লাগাব পূর্ববঙ্গের পক্ষে বলবার জন্য। সেটা আমরা করেছিও। বাংলা হরফের সংস্কার আনবার জন্য একটা সরকারি উদ্যোগ তখন মাথা চাড়া দিয়ে উঠেছিল, লেখক সংঘ থেকে আমরা তার বিপক্ষে আলোচনা সভা করেছি, এবং ‘পরিক্রম’-এ বিশেষজ্ঞদের দ্বারা লিখিত প্রবন্ধ প্রকাশ করেছি। আরো পরে হাসান হাফিজুর রহমান যখন লেখক সংঘের সম্পাদক তখন তিনি খুব বড় আকারে মহাকবি স্মরণোৎসব নামে মধুসূদন, রবীন্দ্রনাথ, ইকবাল ও নজরুলের ওপর পর পর অনুষ্ঠানের আয়োজন করেছেন, যেখানে সাহিত্যবিচারের নিরিখটা ছিল সম্পূর্ণ অসাম্প্রদায়িক। উল্লেখ্য যে সেই সময়ে রবীন্দ্রনাথকে বর্জন এবং নজরুলকে সংশোধনের সরকারি উদ্যোগ বিপজ্জনকভাবে নাড়াচাড়া দিয়ে উঠেছিল। এটা কোন আত্মপক্ষ সমর্থন নয়। লেখক সংঘের কাজে তখন কবি জসীমউদদীন থেকে শুরু করে কাজী মোতাহার হোসেন, মুনীর চৌধুরী, আবদুল গণি হাজারী, খান সারওয়ার মুরশিদ, আসকার ইবনে শাইখ, বোরহানউদ্দীন খান জাহাঙ্গীরসহ আমরা অনেকেই যুক্ত হয়েছিলাম। আমাদের জন্য বিকল্প কোনো সংগঠন গড়া সম্ভব ছিল না। যেটা পরবর্তীকালে উনসত্তরের গণঅভ্যুত্থানের পরে আমরা গড়ে তুলেছিলাম্, লেখক সংগ্রাম শিবির নাম দিয়ে এবং যার কার্যালয় হিসেবে লেখক সংঘের অফিসকেই ব্যবহার করা হয়েছিল, অফিসটি ততদিনে স্থানান্তরিত হয়েছিল পুরানা পল্টনে। লেখক সংঘের সম্মেলন উপলক্ষে আমরা করাচী ও লাহোরে গেছি, এবং সেখানে কুদরতুল্লাহ শাহাব, জমিলুদ্দীন আলী, ইবনে ইনশা, কাতিল শিপাই – এদের সঙ্গে পরিচয় হয়েছে। এরা সবাই প্রগতিশীল ধারার লেখক ছিলেন।

… আদমজী, বাওয়ানী এরা ছিলেন শিল্পপতি। বোধ করি জাতীয় বুর্জোয়া হবার একটা অস্পষ্ট আকাঙ্খা তাদের ছিল। পূর্ববঙ্গে বেশ কিছু শিল্পকারখানা ততদিনে তারা স্থাপন করেছেন, এবং লেখক সংঘের প্রভাবে পড়ে সাহিত্যের জন্য পুরুস্কারও দিচ্ছেন। তারা স্কুল কলেজ বানাচ্ছেন, দাতব্য প্রতিষ্ঠানে চাঁদা দেয়ার কথা শোনা যাচ্ছিল, এবং হাতেনাতেই তো দেখলাম বিশ্ববিদ্যালয়ের ডক্টরেট -করা শিক্ষককে সম্মান করলেন। এরাও নির্ভেজাল পুঁজিবাদীই ছিলেন, এদেরকে আদর্শায়িত করার কোনো অজুহাতই নেই, তবু শিল্পবিনিয়োগ এবং ব্যবসায়ে বিনিয়োগ এই দু’য়ের মধ্যে যে পার্থক্যটুকু আছে সেটা বুঝতে পারি বাংলাদেশ হবার পরে যারা পুঁজির মালিক হয়েছে তাদের সঙ্গে এদের আচরণের পার্থক্যটার কথা ভাবলে। বাংলাদেশ-পরবর্তীরা যখন শিল্পসাহিত্যের পৃষ্ঠপোষকতা করে তখন তাতে একটা ঔদ্ধত্য থাকে, এবং তাদের টাকাটা আসে উৎপাদনের মুনাফা থেকে নয়, সরাসরি লুন্ঠন থেকেই। বাওয়ানীর দরজায় আমরা ধর্ণা দিয়েছিলাম ঠিকই, কিন্তু দুর্বিনয়ের মুখোমুখি হইনি, এখন যেমনটা হবো বলে আশঙ্কা করি॥”

— সিরাজুল ইসলাম চৌধুরী / দুই যাত্রায় এক যাত্রী ॥ [ জাগৃতি প্রকাশনী – ফেব্রুয়ারি, ২০০৮ । পৃ: ৮৭-৯০ ]

০৩.
“… ষাটের দশকের মাঝামাঝি কোনাে এক সময়ে হাসান হাফিজুর রহমান পাকিস্তান রাইটার্স গিন্ডের আঞ্চলিক শাখার সেক্রেটারী নির্বাচিত হন। এ সংবাদটিকে আমাদের অনেকেই তখন খোলামন নিয়ে গ্রহণ করতে পারেনি। পাকিস্তান লেখক সংঘের আমরা যে সরাসরি বিরোধী ছিলাম ঠিক তাও নয়। পাকিস্তান লেখক সংঘ ব্যাপারটি তদানীন্তন পাকিস্তানী লেখকদের জন্যে ভালোই ছিল। কিন্তু বাংলা ভাষার লেখকদের জন্যে সেই লেখক সংঘ কী করছে, কতটুকু করছে বা কী করতে পারবে, সে সম্পর্কে তখনই এক ধরনের সন্দেহ দানা বেঁধে উঠেছিল। যদিও লেখক সংঘের কোনো দলিলেই এ কথা ঘোষণা করা হয়নি যে পাকিস্তান লেখক সংঘ শুধু মাত্র উর্দু ভাষাভাষী লেখক ও কবিদের প্রতিষ্ঠান, তবু আসলে কিন্তু ব্যাপারটি তাই ছিলো।

লেখক সংঘের হেড কোয়ার্টার ছিলো করাচীতে এবং সঙ্গত কারণেই তার প্রধান কর্মকর্তারা সবাই ছিলেন উর্দু ভাষাভাষী লেখক ও কবি। পূর্ব পাকিস্তান থেকে কেন্দ্রীয় কমিটির সভা ডাকা হত করাচীতে, তখন তারা নিমন্ত্রিত হতেন করাচীতে গিয়ে সেই সভায় যোগদানের জন্যে। যেতেনও তারা। কিন্তু গিয়ে সেই সভাগুলোতে বাংলা ভাষা ও সাহিত্য নিয়ে কিছু করতেন কিনা কিংবা করার কোনো সুযোগ তাদের ছিলো কিনা তা বোঝার কোনো উপায় ছিলো না। লেখক সংঘের কেন্দ্রীয় কমিটিতে পূর্ব পাকিস্তান থেকে যারা সদস্য ছিলেন তাদের মধ্যে আমাদের আজকের দিনের দু’জন বিশিষ্ট কবির নাম উল্লেখ করতে পারি একজন কবি আবুল হােসেন অন্যজন কবি শামসুর রাহমান। এরা দু’জনই হাসানের বেশ আগে থেকেই পাকিস্তান রাইটার্স গিন্ডের কেন্দ্রীয় কমিটির সদস্য ছিলেন।

১৯৫৮ সালের পর থেকে দীর্ঘসময়ের মধ্যে আর কারা কারা লেখক সংঘের কেন্দ্রীয় কমিটির সদস্য ছিলেন পূর্ব পাকিস্তান থেকে আজ আর মনে নেই। কেননা তারা সবাই আমাদের দৃষ্টিতে অনেক প্রবীণ ছিলেন, যেমন কবি গোলাম মোস্তফা। তবে একটি ব্যাপারে আমাদের সকলের মনোভাবই প্ৰায় এক রকম ছিলো – পাকিস্তান লেখক সংঘ আসলে পশ্চিম পাকিস্তানেরই একটি প্রতিষ্ঠান এবং এ প্রতিষ্ঠানে বাংলা ভাষাভাষী লেখকদের ভূমিকা সব সময়েই গৌণ ছিল। মূখ্য ভূমিকা, মূখ্য পাওনা এবং মূখ্য কর্মকান্ড সবই ছিলো পশ্চিম পাকিস্তানের উর্দু লেখকদের হাতে। তাদেরকে কেন্দ্র করে।

এমনি লেখক সংঘের কর্মকাণ্ডে যখন হাসান নিজেকে জড়ালেন তখন আমাদের অনেকেই সেটাকে খোলামন নিয়ে গ্রহণ করতে রাজী হলাম না। কেন হলাম না সেটা অবশ্য তখন আমাদের কাছেই স্পষ্ট ছিল না। আমাদের মনের ভাবটা তখন অনেকটা এই রকম, লেখক সংঘ আছে, থাকুক। অনেকেই সেই লেখক সংঘে যাচ্ছেন, যান। কিন্তু হাসান হাফিজুর রহমান কেন? আমাদের তখন মনে হত, বিশেষ করে আমার মনে হত, হাসানকে লেখক সংঘের সঙ্গে কেমন যেন মানায় না। মনে হত আমার — কিন্তু লেখক সংঘের সরাসরি বিরোধী যে আমরা তখনো পর্যন্ত ছিলাম না সে কথা তো আগেই বলেছি।

কিন্তু হাসান হাফিজুর রহমানের মনােভাবটা ছিল সম্পূর্ণ অন্যরকম। যেন কিছু একটা করবার জন্যে মনে মনে স্থির করে ফেলেছেন তিনি। এমনি একটা ভাব। আগেই বলেছি, হাসান তাঁর নিজস্ব সাহিত্যিক এবং রাজনৈতিক বিশ্বাসে স্পষ্ট ও দৃঢ় ছিলেন। যে কোনাে মঞ্চ থেকেই নিজের বিশ্বাসের কাজটি তিনি করে নিতে পারতেন। এবং শেষ পর্যন্ত করলেনও হাসান। সে বিবরণে পরে আসছি। তার আগে লেখক সংঘ সম্পর্কে কয়েকটি কথা বলা প্রয়োজন।

যতদূর মনে পড়ছে পাকিস্তান রাইটার্স গিল্ড ছিলো (পাকিস্তানে এখনাে আছে) সেই সময়ে পাকিস্তান কেন্দ্রীয় সরকারের কেবিনেট সেক্রেটারী কুদরত উল্লাহ্ শাহাবের ব্রেইন চাইল্ড। কুদরতউল্লাহ শাহাব শুধু একজন সেক্রেটারীই ছিলেন না — আইসিএস হলেও তিনি ছিলেন উর্দু ভাষার একজন বড় লেখক। অনেকে তাকে বাংলা ভাষার লেখক আইসিএস অন্নদাশঙ্কার রায়ের সঙ্গে তুলনা করেছেন। অন্নদাশঙ্কর রায়ের মতোই তিনি ছিলেন উর্দু লেখক আইসিএস। কস্মিনকালেও আইসিএস লেখক ছিলেন না। সেই কুদরতউল্লাহ শাহাব এগিয়ে এলেন পাকিস্তান রাইটার্স গিল্ড গঠনের জন্যে। আইয়ুব খান তখন পাকিস্তানের প্রেসিডেন্ট। শাহাবের নীলনক্সা অনুযায়ী করাচীতে পাকিস্তানের নেতৃস্থানীয় সব লেখকদের দাওয়াত করা হলো একটি মহাসম্মেলনে অংশ নেয়ার জন্যে। কয়েক শ’ লেখক অংশ নিয়েছিলেন। সেই লেখক মহাসমাবেশে। পূর্ব পাকিস্তান থেকেও একটি বড় দল গেল এই সম্মেলনে অংশ নেয়ার জন্যে। তখনকার তরুণ লেখকরাও অনেকে গেলেন সম্ভবত মুনীর চৌধুরী, শামসুর রহমান, আবুল হোসেন, হাসান হাফিজুর রহমান, আলাউদ্দিন আল আজাদ, আতোয়ার রহমান এমনি লেখকদের অনেকেই ছিলেন সেই লেখক কাফেলাতে। কবি গোলাম মোস্তফা এবং তার সমসাময়িক প্ৰবীণ লেখকরাও অনেকে ছিলেন করাচীগামী সেই দলে। আমার এখনাে মনে আছে কিছু কিছু — বেশ হৈচৈ তখন লেখক মহলে। পাকিস্তান প্রতিষ্ঠার পর লেখালেখি নিয়ে এতাে বড় অনুষ্ঠান এর আগে আর কখনােই হয়নি। সেদিক থেকে ভাবলে কুদরতউল্লাহ শাহাব একটি ঐতিহাসিক ঘটনা ঘটিয়েছিলেন সেদিন। প্রতিষ্ঠা হয়েছিলো পাকিস্তান রাইটার্স গিন্ডের। কেন্দ্রীয় কমিটিতে ঢাকা থেকেও বেশ কয়েকজন কবি-সাহিত্যিক ছিলেন। গিন্ডের দু’টি আঞ্চলিক অফিস প্রতিষ্ঠা করা হয়েছিলো ঢাকায় আর লাহােরে। করাচীর সেই সময়কার সবচেয়ে বড় হোটেল মেট্রোপোলে এই বিশাল কান্ডটি ঘটলো মহাসমারোহে।

পূর্ব পাকিস্তান থেকে কবি আবুল হােসেন ছিলেন লেখক সংঘের কেন্দ্রীয় কমিটির অন্যতম প্রধান লেখক। আরো নিশ্চয়ই অনেকে ছিলেন ওঁরা আরো সিনিয়ার – কবি গোলাম মোস্তফার মতো। ওঁদের কর্মকাণ্ডের কথা আমার ভালো করে মনে নেই। আবুল ভাই যে লেখক সংঘের কর্মকাণ্ডে বেশ উৎসাহ দিতেন সেটা মনে আছে।

একদিনের একটি ঘটনা বলি।

আবুল ভাই তখন পূর্ব পাকিস্তান সরকারের তথ্য মন্ত্রণালয়ের ডেপুটি ডিরেক্টর। বিল্ডিংটাতে তিনি তখন একটি বেশ বড় রুমে বসতেন। বড় রুম, বড় টেবিল। বেশ একটা বড় আমলা আমলা পরিবেশ। কিন্তু আবুল ভাই স্বভাবে কখনোই আমলা ছিলেন না। তিনি অতি মিষ্টি স্বভাবের একজন পারফেক্ট জেন্টলম্যান। এখনো আছেন। এতো মধুর করে হাসতেন যে হাসি অনেককেই হাসাতো। অন্তত সেই সময় শামসুর রাহমানকে যে ভুলিয়েছিলো তাতে কোনো সন্দেহ নেই। এবং সেই সঙ্গে আমাকেও। আমরা দু’জনেই তখন আবুল ভাইকে বেশ পছন্দ করতাম।

সেই সময় একদিন।

শামসুর রাহমান এসে উপস্থিত আমার কাছে। বেশ হন্তদন্ত ভাব। যেন তাড়াতাড়ি কোথাও যেতে হবে। জিজ্ঞেস করলাম, কী ব্যাপার হস্তদন্ত ভাব কেন? কোথাও যাচ্ছেন নাকি?

হ্যাঁ, চলুন আপনিও যাবেন।

কোথায়?

আবুল ভাই গতকাল ফিরে এসেছেন করাচী থেকে। আর এখন অফিসে থাকবেন। আমাকে যেতে বলেছেন।

আপনিও চলুন। আমি আপনার নামও বলতে বলেছি গেটে। আমার কোনো কাজ ছিলো না। বললাম চলুন। এবং গেলাম আবুল ভাই-এর সেক্রেটারিয়েটের অফিসে।

রুমে ঢুকতেই আবুল ভাই হাসলেন। সেই হাসি। আমলিন উজ্জ্বল অন্তরঙ্গ। তার ফরসা চেহারায় আশ্চর্য মানানসই। বললেন, এসো এসো।

আমরা ভেতরে গিয়ে বসলাম তার সামনের চেয়ারে।

আবুল ভাই হাসলেন আবার। বললেন, তোমার জন্যে একটা ভালো খবর আছে শামসুর রাহমান। এবং যোগ করলেন, বল তো খবরটা কী?

শামসুর রাহমান অবাক, আমিও অবাক। এমনি সুন্দর পরিচ্ছন্ন নাটক আবুল ভাই-এর স্বভাবের মধ্যে আছে, এটা আমরা জানতাম। তবু অবাক হলাম।

শামসুর রাহমান বললেন, খবর তো আপনার কাছে। আমরা কী করে জানবো?

আবুল ভাই এবার ভালো খবরটা দিলেন। শামসুর রাহমান তুমি পাকিস্তান রাইটার্স গিন্ডের কেন্দ্রীয় কমিটির সদস্য নির্বাচিত হয়েছো। এমনভাবে বললেনআবুল ভাই যেন সে সময় শামসুর রাহমানের জন্যে সাহিত্য সম্পর্কিত এর চেয়ে ভালো কোনো খবর হতেই পারে না।

আমাদের তাৎক্ষণিক প্রতিক্রিয়া তেমনটি হলো না যা হওয়া উচিৎ ছিলো। আমার তো লেখক সংঘ সম্পর্কে তেমন কোনো সরাসরি জ্ঞানই ছিলো না তখন। সুতরাং খবরটির গুরুত্ব আমার বােঝার কথা নয়। কিন্তু খবর শুনে শামসুর রাহমানও খুব একটা উত্তেজিত হলেন বলে মনে হল না। মনে হল আবুল ভাই যা ভেবেছিলেন, তার কিছুই ঘটলো না।

এতো বছর আগের এই ছোট্ট ঘটনাটির কথা এ কারণে বললাম যে, এতে দুটি প্রসঙ্গ বেশ স্পষ্ট। একটি আবুল ভাইয়ের জেনারেশান লেখক সংঘকে মােটামুটি একটি খোলামন নিয়ে গ্রহণ করেছিলেন। কিন্তু তার পরের জেনারেশান অর্থাৎ আমরা এই লেখক সংঘ ব্যাপারটিকে যেমন এক কথায় খারিজ করতে এগিয়ে যাইনি, তেমনি সম্পূর্ণ খোলামন নিয়ে গ্রহণও করতে পারিনি। একটি অনুচ্চারিত দ্বিধা ছিলো আমাদের মধ্যে পাকিস্তান লেখক সংঘকে সরাসরি আমাদের কর্মকাণ্ডে গ্রহণ করতে। কেননা একটা ব্যাপার বেশ পরিষ্কার ছিলো আমাদের কাছে তখন লেখক সংঘের সব চাবিকাঠিই আছে দেড় হাজার মাইল দূরে করাচীতে। সঙ্গত কারণেই তাই পাকিস্তান সাহিত্য সংসদ আমাদের যত কাছের ছিলো – পাকিস্তান লেখক সংঘ ততটা হল না। হতে পারেনি। সুতরাং হাসান যখন এলেন লেখক সংঘের কর্মকাণ্ডে তখন তাকে একদিন সরাসরি প্রশ্ন করলাম আমি, আপনি কেন এলেন লেখক সংঘে?

আমার প্রশ্ন শুনে হাসান বললেন, কেন আসবো না, লেখক সংঘের শতকরা ছাপন্ন ভাগ তো আমাদের। ওটা দখল করতে হবে না। সরাসরি স্পষ্ট কথা হাসানের।

হাসানের কথা শুনে বেশ রাগ হল আমার। কী অসম্ভব সব চিন্তা হাসানের। হাতে নেই সেই গিন্ডের ছাপ্পান্ন ভাগ হাসান দখল করবেন। অদ্ভুত সব চিন্তা।

বললাম, কী যে সব অসম্ভব চিন্তা করেন। আপনি হাসান।

আমার স্বাগত সংলাপ শুনে হাসান শুধু সামান্য হেসেছিলেন। বলেছিলেন, তুমি তো আছো আমার সঙ্গে, দেখা কী হয় আগে আগে। যেন গালিবের ভাষায় বলতে চাইলেন, ইবতেদায়ে ইশক হ্যায়, রোতা হ্যয় ক্যায়া। আগে আগে দেখিয়ে হােতা হ্যায় ক্যায়া ।

লেখক সংঘের সদস্য আমি হতে পারিনি কোনোদিন। কিন্তু ছিলাম হাসানের সঙ্গে তখন এবং দেখেছিলাম। আগে আগে কী হয়েছিল কী কী ঘটেছিল। যা শুধু হাসানই ঘটাতে পারেন॥”

— ফজল শাহাবুদ্দীন / হাসান হাফিজুর রহমান

তথ্যসূত্র : হাসান হাফিজুর রহমান স্মারকগ্রন্থ / সম্পা: আনিসুজ্জামান ॥ [ হাসান হাফিজুর রহমান সংসদ – জুন, ২০০০ । পৃ: ১২৩-১২৬ ]

০৪.
“… রণাঙ্গণের সংবাদ খুবই আশাপ্রদ।

এক সাংবাদিক কিভাবে দু’কুল খুইয়েছে সেই কাহিনী শোনা গেল। বঙ্গবন্ধুর অসহযোগ আন্দোলনের সময় তার সমর্থন ছিল পুরোপুরি। বিশেষ সহানুভূতিশীল। কিন্তু শ্বশুর সাহেব বাঙালী আন্দোলনের বিরোধী। পাঁচিশে মার্চের পর বেগতিক জামাইকে রক্ষা করা। মিলিটারী কর্তৃপক্ষ শর্ত দিলো সাংবাদিক যদি বাইরে গিয়ে আর্মির অনুকূলে প্রচার চালায় ওকে মাফ করা যেতে পারে। যথাদেশ। জামাই বিদেশে গিয়ে মিলিটারীদের পোঁ ধরলো। হংকং থেকে বিবিসি’র কাছে এক লম্বা ডিসপ্যাচ পাঠালো। সাংবাদিকের স্ত্রী-পুত্র ঢাকায় পড়ে আছে। সে ওদের বাইরে যাওয়ার টিকেট পাঠিয়ে দিলে। কিন্তু আর্মি রাজি হয় না। ওর পরিবার জামিন থাক – পেছনে এমনই মতলব। সাংবাদিক আর ঘরে ফিরতে পারবে না। মুক্তিফৌজের ভয়ে। মিলিটারীরা তাকে অবিশ্বাস করে বসে আছে। শ্বশুর কী সুখে থাকবে।

লোকটা ইংরেজী লিখতে পারে সেই গুণে সাংবাদিক। নচেৎ পাকিস্তানের দালাল বহুকাল থেকে। ব্যুরো অব ন্যাশনাল রিকনস্ট্রাকশন (B.N.R) নামে একটা প্রতিষ্ঠান ছিল বাঙালীদের মগজ ধােলায়ের জন্যে। প্রবল উত্তেজনা দেশময় এই সাংস্কৃতিক প্রতিষ্ঠানের বিরুদ্ধে কিন্তু শ্বশুর মশাই তখন দেদার লিখছেন, কেন অমন মহৎ প্রতিষ্ঠানটি দেশে থাকা উচিত। পারিবারিক অশান্তি ওকে ধ্বংস করুক।

… মুনীর চৌধুরী বেড়ার উপর বসে থাকো নীতি পালন করলেও তাঁর ছেলে ভাষণ মুক্তিফৌজে যোগ দিয়েছে। এমন লড়াইয়ে কি নিরপেক্ষ থাকা যায়?” (২৪.০৮.১৯৭১)

শওকত ওসমান / ১৯৭১ : স্মৃতিখন্ড মুজিবনগর [ বিউটি বুক হাউসফেব্রুয়ারি, ১৯৯২ পৃ: ৬৬৬৭ ]

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *